নিরপেক্ষতা যখন মহাঅপরাধ Print
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 01 January 2011 21:11

ইসলাম-অনৈসলামের দ্বন্দ নিত্যদিনের। এ দ্বন্দের মাঝে কি নিরপেক্ষতা চলে? অন্যায়কে ন্যায়ের, অসত্যকে সত্যের সমকক্ষতা দিলে কি ন্যায়পরায়ণ বা সত্যবাদী বলা যায়? এমন নিরপেক্ষতা শুধু পক্ষপাতিত্বই নয়, প্রচন্ড প্রতারণাও। নিরপক্ষতার খোলসে সত্যকে পরাস্ত করার এটি ষড়যন্ত্র। মুসলিম বিশ্বে ধর্মরিপেক্ষ গোষ্ঠিটি এমন কর্মে লিপ্ত রয়েছে নিছক ইসলামকে পরাস্ত করার স্বার্থে। নিরপেক্ষতা এ লক্ষে বাহানা মাত্র। নিরপেক্ষতার গুরুত্ব রয়েছে ঘটনা বা তথ্যের বস্তুনিষ্ঠ বিচারে। এমনকি পবিত্র কোরআনেও নিরপেক্ষ নিরীক্ষণে তাগিদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ইসলামে কবুলের পর মুসলমান আর নির্দলীয় বা নিরপেক্ষ থাকে না, প্রবেশ করে ইসলামের পক্ষে। সে তখন আল্লাহর পক্ষের শক্তি, কোরআনী পরিভাষায় ‘হিযবুল্লাহ বা আল্লাহর দলভুক্ত’। ইসলাম ও মুসলামদের উপর হামলার মুখে নিরপেক্ষ থাকা তখন গোনাহই নয়, তার কাছে সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য হয়।

 

আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ই একজন ঈমানদারের জীবনে সর্বোচ্চ বাসনা। এমন  বিজয়ে শুধু সে ভোটই দেয় না, অর্থ-শ্রম-সময়, এমনকি রক্তও দেয়। তার মন থেকে তখন বিলুপ্ত হয় নিরপেক্ষতার নামে ইসলামকে অন্য ধর্মের সম-পর্যায়ভূক্ত করার প্রবণতা। কারণ এমন সমকক্ষতা দিলে তার ঈমানই থাকে না। মুসলমান হওয়ার শর্র্ত্বই হল ইসলামকে আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্মরূপে কবুল করা এবং সর্বক্ষেত্রে ইসলামের পক্ষ নেয়া। ধর্ম গ্রহনে জবরদস্তি নেই, কিন্তু ইসলাম কবুলের পর ইসলাম-অনৈসলামের দ্বন্দে নিরপেক্ষ থাকার সামান্যতম অবকাশ নেঈ। সেনা বাহিনীতে যোগ দেওয়াটি যে কোন ব্যক্তির ইচ্ছা –অনিচ্ছার বিষয়। কিন্তু যোগ দেওয়ার পর যুদ্ধরত দুইটি পক্ষের মাঝে নিরপেক্ষ থাকা বা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার অনুমতি বিশ্বের কোন সেনাবাহিনীই দেয় না। কারণ নিরপেক্ষ লোকদের দিয়ে আর যাই হোক সেনাদল গড়া যায় না। বরং সেনাবাহিনী গড়তে হয় তাদের দিয়ে যারা দেশের জন্য শুধু প্রাণপণে যুদ্ধই লড়বে না, প্রয়োজনে প্রাণও দিবে। সৈনিকদের থেকে প্রতিদেশে এটিই নূণ্যতম প্রত্যাশা। তাই কোন সৈনিকের যুদ্ধত্যাগ প্রতিদেশেই জঘন্য রকমের গাদ্দারী। এর জন্য সৈনিকের কোর্ট-মার্শাল হয়, এবং কঠরতম শাস্তিও হয়। তেমনি অবস্থা প্রতিটি মুসলমানের।  ইসলামের পক্ষত্যাগীদেরকে ইসলামে মুরতাদ বলা হয়।  তাদের গাদ্দারী শুধু ইসলাম বা মুসলিম উম্মাহর সাথে নয়, বরং সেটি মহান রাব্বুল আ’লামিনের সাথে। তাই তাদের শাস্তিও সর্বোচ্চ, এবং সেটি মৃত্যদন্ড। আলেমদের মাঝে নানা বিষয়ে মতভেদ থাকলেও  এ নিয়ে কোন দ্বিমত নেই।

 

আল্লাহতায়ালার উপর বিশ্বাসের পূর্বে অন্যসব ’ইলাহ’ বা উপাস্যকে অবশ্যই অবিশ্বাস করতে হয়। আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান আনতে তাই ‘ইল্লাল্লাহ’ বলার পুর্বে ’লা ইলাহ’ বলতে হয়। অন্যান্য ধর্ম ও উপাস্যকে অবিশ্বাস করা মুসলমান হওয়ার পূর্ব শর্ত্ব। শুধু মুখের কথা‘য় নয়, কাজের মধ্য দিয়ে সেটির প্রকাশও ঘটাতে হয়। জঘন্য অপরাধীও নিজেকে মুসলমানরূপে দাবী করতে পারে। মুসলমানের রক্তে যাদের হাত রঞ্জিত বা যাদের রাজনীতির কারণে কোরআনের আইন বা শরিয়ত মুসলিম দেশের প্রশাসন ও বিচারালয় থেকে অপসারিত এমন দাবী তারাও করে থাকেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এমন কপট চরিত্রের লোকগণ আসীন হলে ইসলামের বিরুদ্ধাচারন তখন বীভৎস রূপ নেয়। রাজনীতির অঙ্গণটি মূলত ঈমান ও আমল যাচায়ের অতি নিখূঁত ক্ষেত্র। কে কতটা ইসলামের পক্ষের বা বিপক্ষের সে বিষয়ে তার অবিকল আসল রূপটি প্রকাশ পায় এখানে। সৈনিক কোন পক্ষে যুদ্ধ করছে সেটি ধরা পড়ে তার পোষাক, ব্যাজ, পতাকা বা বাহিনীর পরিচয় থেকে। ব্যক্তির বিশ্বাস বা ঈমান অদৃশ্য, কিন্তু সেটি ধরাপড়ে তার পছন্দনীয় দল, ভোটদান, রাস্তার শ্লোগান ও রাজনৈতিক অঙ্গিকারের মধ্য দিয়ে। এটি এমন এক ক্ষেত্র যেখানে অতিশয় কপট মুনাফিকও তার কপটতাকে গোপন রাখতে পারে না। অথচ এ কপটতা মসজিদের জায়নামাজে ধরা পড়ে না। ধরে পড়ে না রোজাতে বা হজ্বে। এমনকি নবীর যুগেও বহু মুনাফিক তাদের কপট বিশ্বাসকে বছরের পর বছর লুকিয়ে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু সে মুনাফেকি স্বমুর্তিতে ধরা পড়েছে যখন তাদেরক ইসলাম ও অনৈসলামের লড়ায়ে কোরবানী পেষে আহবান করা হয়েছে। সে হক ও বাতিলের সে লড়ায়ে তারা হয় নিরপেক্ষতার ভান করেছে অথবা কুফরি শক্তির পক্ষ নিয়েছে। নবীজীর (সাঃ) যুগে মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও তার অনুসারিরা ধরা পড়েছিল জিহাদের এ ময়দানে এসেই।

 

রাজনীতি হল রাষ্ট্রীয় অঙ্গণে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জ্বিহাদ বা লড়াই। মুসলমান শুধু নামাজ-রোযা-হজ্ব-যাকাতে ক্ষান্ত দেয় না, রাষ্ট্রীয় জীবনেও আল্লাহর হুকুমের  পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চায়। ইসলামের বিপক্ষ শক্তির সাথে সংঘাত এখানে অনিবার্য। মুসলমান যতই শান্তিবাদী হোক এ লড়াই এড়িয়ে চলা অসম্ভব। এড়াতে পারেননি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শান্তিবাদী নেতা শেষ নবী হযরত মহম্মদ (সাঃ)। শুধু নামায-রোযার মাঝে ধর্মকে সীমাবদ্ধ রাখলে জিহাদের মত সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতের প্রয়োজন হত না। এতে প্রতিষ্ঠা পেত না ইসলাম। সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনে ইসলামের বাস্তবায়ন ঘটাতে গিয়ে আল্লাহর প্রিয় রাসূল (সাঃ)কে বহুবার যুদ্ধে নামতে হয়েছে, প্রতিটি যুদ্ধে মৃত্যৃর মুখোমুখী দাঁড়াতে হয়েছে। কিন্তু যারা ইসলামে অঙ্গিকারহীন তাদের কাছে এমন জ্বিহাদ গুরুত্বহীন। এমন যুদ্ধে নেমে নিজেদের জীবনকে তারা বিপন্ন করতে চায় না। তাই নামাজের জায়নামাজে অসংখ্য মুনাফিকের অনুপ্রবেশ ঘটলেও জিহাদের কাতারে সেটি ঘটেনি। সত্যিকার মুসলমান বাছাইয়ে জিহাদ এভাবে ফিল্টার বা ছাঁকুনীর কাজ করে। ফলে ভন্ড মুসলমানদের পক্ষে রাজনীতিতে বা জ্বিহাদের ময়দানে ইসলামের পক্ষ রক্ত ও অর্থদান অসম্ভব। দ্বন্দ-সংঘাতে নিরপেক্ষ হওয়াটি মহৎ গুন - এ কপট শ্লোগানে এরা শান্তির অবতার সাজে এবং আড়াল করে নিজেদের ইসলাম-বিরোধী জঘন্য শত্রতাকে। অথচ সুযোগ পেলে এরাই হালাকু চেঙ্গিজ সাজে। এমন ঘটনায় ইতিহাস ভরপুর। নবীজী (রাঃ) রক্তাত্ব সংঘাতে শুধু পক্ষই নেননি, বরং সে পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ইসলামের শত্র“ হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। আল্লাহর দূষমনের বিরুদ্ধে  কঠোরতাই মোমেনের অতি মহৎ গুণ। নইলে কি তাকে সভ্য বলা যায়? পশুও হামলার মুখে ধেয়ে আসে। ইসলামী বিধান ও মুসলিম উম্মাহ হামলার মুখে পড়বে এবং সে হামলার মুখে মুসলমানগন প্রতিবাদহীন উদ্ভিদ জীবন পাবে ইসলামের আগমন সে জন্য ঘটেনি। ইসলাম এসেছে সভ্যতর সমাজের নির্মানে। আর এ নির্মানকাজে সংঘাততো অনিবার্য। নবীজীর (সাঃ) আমলে মুসলমানতো দূরে থাক, মুনাফিকরাও প্রকাশ্য লোকালয়ে নিজেদেরকে ধর্ম-নিরপেক্ষ বলার সাহস পায়নি। কারণ, এমন নিরপেক্ষতা ছিল ইসলামের প্রকাশ্য বিরোধীতা। নিছক ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে মুসলামনরা যেখানে নির্মূল হয়, লাখে লাখে আহত ও নিহত হয় এবং বিতাড়িত হয় ঘরবাড়ী থেকে, সেখানে কি নিরপেক্ষতা চলে? পবিত্র কোরআনে ঈমানদারের গুলাবলীর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে ’আশাদ্দু আলাল কুফ্ফার’ অর্থাৎ কাফেরদের বিরুদ্ধ তারা নির্মম। আগাছা ও আবর্জনার বিরুদ্ধে নির্মম না হলে ফলবান বৃক্ষের চাষ হয় না। তাছাড়া উম্মাদ ও মৃতরা ভিন্ন এ সমাজে কেউ কি নিরপেক্ষ? যেব্যক্তি স্বার্থ আছে, তার একটি পক্ষও আছে। ধর্মের পক্ষে যারা নয়, নিশ্চিত ভাবেই তারাই বিপক্ষে। জানমাল বাঁচাতে ও প্রতিষ্ঠিত কায়েমী স্বার্থের হেফাজতে তারা নিরপেক্ষতার ভান করে।

 

মুসলিম ও ইসলাম এ শব্দ দু’টি এসেছে আরবী ক্রিয়াপদ আসলামা থেকে। আসলামার অর্থ আÍসমর্পন করা। আল্লাহতে যে আÍসমর্পন করে তাকেই বলা হয় মুসলিম। আর আত্ম-সমর্পিত ব্যক্তি নিরপেক্ষ বা অন্য পক্ষ্যের হয় কি করে? আল্লাহর সকল নির্দেশের প্রতি আনুগত্যই হলো আÍসমর্পনের মূল কথা। আল্লাহ চান তার দ্বীন সমগ্র জগতের উপর বিজয়ী হোক (’লি ইয়ুযহিরাহু আলা দ্বীনে কুল্লিহি’)। আল্লাহর প্রতি আত্ম-সমর্পিত ব্য্িক্ত হিসাবে মুসলমানের দায়িত্ব হল আল্লাহর সে ইচ্ছা পূরণে আÍনিয়োগ করা। কাফের হওয়ার জন্য আল্লাহর সকল নির্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়া জরুরী নয়। ইবলিস অবাধ্য শয়তানে পরিণত হয়েছে মাত্র একটি হুকুম না মানার কারণে। আর সেটি ছিল হযরত আদমকে সিজদার করার নির্দেশ। অথচ এর পূর্বে তার সমগ্র জীবন কেটেছিল আল্লাহর বন্দেগীতে। পবিত্র কোর’আনে বার বার নির্দেশ এসেছে জানমাল দিয়ে জ্বিহাদের। নির্দেশ এসেছে সমাজ ও রাষ্ট্রে শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগের। কোন মুসলমান কি সে নির্দেশ অমান্য করতে পারে? অমান্য করলে সে কি মুসলমান থাকে? মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও তার অনুসারিরা নামায-রোযার প্রতি অবাধ্যতা দেখায় নি। বরং মসজিদে দাঁড়িয়ে নবীজীর (সাঃ) প্রশংসাও করেছে। কিন্তু বিরুদ্ধাচারণ করেছিল জ্বিহাদেরও এবং ইসলামের বিজয়ের। মিত্রতা গড়েছিল ইসলামের প্রতিপক্ষে কাফেরদের সাথে। এজন্যই সে চিহ্ণিত হয়েছে ঘৃণীত মুনাফিক রূপে।

 

বর্তমান বিশ্বে অতি কপট মতবাদ হল সেকুলারিজম। ইসলামের প্রচন্ড ক্ষতি হয়েছে এ মতবাদটির কারণে। রাজনীতির ময়দানে ধর্মনিরপেক্ষতার শ্লোগান দিলেও কার্যত ব্য্িক্তকে এটি ইসলামের বিজয়ে অঙ্গিকারশূন্য করে। ইসলামের বিজয়ে ব্যক্তির এমন অঙ্গিকার চিত্রিত হয় সাম্প্রদায়িকতা রূপে। মুসলিম দেশের আইন-আদালত, শিক্ষালয় বা সাংস্কৃতিক ময়দানে ইসলামকে পরাজিত হতে দেখেও সেকুলার ব্যক্তির বিবেকে এ জন্যই কোন মাতম জাগে না। ইসলামকে বিজয়ী করার কোন আগ্রহও দেখা দেয় না। বরং সকল আগ্রহ রাষ্ট্রীয় ময়দানে ইসলামকে পরাজিত করায়। সেকুলারজিম মানুষকে যে কতটা ইসলামশূণ্য করে এটি হল তার প্রমাণ। ইসলামে এজন্যই এটি হারাম। কোন ব্যক্তির মুসলমান হওয়ার অর্থই হল, কোরআনী সত্যের পক্ষে সে শুধু কথা ও কাজের মধ্য দিয়ে সে সাক্ষ্যই দিবে না বরং সেটির বিজয়ে জানমাল নিয়ে ময়দানেও নামবে। ইসলামে অঙ্গিকারবদ্ধ এমন একবটি চেতনায় নিরপেক্ষতা প্রশ্রয় পায় কি করে? ইসলামের পক্ষ নেওয়ার কারণেই তো মুসলমানরা মুসলমান। নইলে তাদের প্রয়োজনটি কি? কাজই বা কি? পাপাচারির জীবন থেকে যেমন পাপকে আলাদা করা যায় না, তেমনি ধার্মিকের জীবন থেকে আলাদা করা যায় না তার এ ইসলামি চেতনাকে। ব্যক্তির মন ও মননের অবিচ্ছেদ্য বিষয় হল তার চেতনা। দেহ থেকে ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আলাদা করা গেলেও তার অস্তিত্ব থেকে এ চেতনাকে আলাদা করা যায় না। জীবন্ত ব্যক্তি যেখানেই যায়, তার চেতনাকে সে সাথে নিয়েই যায়। পাপাচারি বা ধর্মবিরোধী ব্যক্তির চেতনা তাই স্বাভাবিক কারণেই ধরা পড়ে তার রাজনীতিতে। মুখে সে যতই ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলুক, রাজনীতিতে তার ধর্ম-বিরোধীতা প্রকাশ পাবেই। তার পক্ষপাতদুষ্টতা ইসলামের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পেলে এ পক্ষটি ধর্মবিরোধী কাজ কর্মেরই ব্যপ্তি ঘটায়। ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে কামাল পাশা ও তার অনুসারিরা তুরস্কে ইসলামের এমন জঘন্য বিরোধীতা করেছে যা অমুসলিম শাসকদের হাতেও ঘটেনি। তারা আরবীতে আযান দেওয়া নিষিদ্ধ করেছে। পানির ন্যায় অবাধ করেছে মদকে। বাণিজ্যরূপে প্রতিষ্ঠা করেছে বেশ্যাবৃত্তিকে। মুর্তি গড়েছে পথে ঘাটে। নিষিদ্ধ করেছে মহিলাদের স্কার্ফ পড়াকে, এবং উলঙ্গতাকে আর্ট বা শিল্প রূপে চালু করেছে। ইসলামী অনুশাসনের এমন উগ্র বিরোধীতার পরও তাদের দাবী তারা ধর্ম-নিরপেক্ষ। তথাকথিত সেকুলার এপক্ষটি যে দেশেই ক্ষমতায় গেছে সেখানেই ধর্মের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আর এ পক্ষপাতদুষ্টতারই তারা নাম দিয়েছে নিরপেক্ষতা! এপক্ষটি বাংলাদেশে ইসলামের পক্ষের রাজনীতিকে আইন করে নিষিদ্ধ করেছিল। কঠোর বিরোধী তারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার। তারা পবিত্র কোরআনের আয়াতকে পাঠ্যবই থেকে তুলে দিয়েছিল। তারা শুধু মুর্তি বা মিনারই  গড়ছে না, বরং মুর্তি বা মিনারের সামনে ফুল দেওয়া বা সম্মান প্রদর্শনের ন্যায় জঘন্য শির্ককে রাষ্ট্রীয় রীতিতে পরিণত করেছে।

সেকুলারিজমের লক্ষ্য শুধু রাজনীতি, প্রশাসন ও আইনআদালত থেকে ইসলামের অপসারণ নয়, ইসলাম থেকেও ইসলামের বহু মৌলিক বিধানকে তারা বিলোপ করতে চায়। তারা জিহাদমুক্ত করতে চায় ইসলামকে। এমন এক অভিন্ন লক্ষ্যে সেকুলার রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশী ধর্মীয় ময়দানে আবির্ভূত হয়েছে বহু সেকুলার ধর্মীয় দল। এদের অনেকে দ্বীনের তাবলীগ করেন বটে, তবে মুসলমানদের রাজনীতিতে ইসলামের বিজয় বা মুসলিম উম্মাহর উপর হামলার প্রতিরোধে জ্বিহাদের কথা মুখে আনেন না। অথচ মুসলমানতো তাকেই বলা হয় যিনি ইসলামের তাবলীগই শুধু  করে না, নিজের অর্থ ও রক্ত ব্যয়ে তার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী হবে। যেমনটি  নবীজীর (সাঃ) যুগে হয়েছে। নেকী অর্জনের পথ এ নয় যে শুধু মুখে দ্বীনের তাবলীগ করবে, অথচ ধর্মের সাথে অধর্মের লড়াইয়ে নিজেকে নিরপেক্ষ বলবে। তাবুক যুদ্ধের কালে যে কয়েকজন সাহাবী নিছক গড়িমসির কারণে যুদ্ধে যোগ দেননি তাদেরকে তৎকালীন মুসলিম সমাজ বর্জন করেছিল। অথচ কাফেরদের বিরুদ্ধে সে যুদ্ধে তারা নিরপেক্ষ ছিলেন না। প্রশ্ন হল, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে আজ যারা ইসলামী চেতনাকে মৌলবাদী বলে নির্মূল করতে চায়, নাস্তিক ও অমুসলিমদের সাথে মিত্রতা গড়ে যুদ্ধের হুংকার দেয় তাদেরকে কি বলা যাবে? 

 

পবিত্র কোরআনের ঘোষণা, ’যারা আল্লাহর নির্দেশিত বিধান অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করে না তারা কাফের’ (সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৫)। ফলে কাফের হওয়ার জন্য নিছক পুতুল-পুজারি বা নাস্তিক হওয়া শর্ত্ব নয়। আল্লাহর নির্দেশিত বিধান প্রতিষ্ঠায় অমনোযোগী হওয়াই এজন্য যথেষ্ট। এরপরও কি রাজনীতিতে মুসলমানের ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার অবকাশ থাকে? মসজিদ যেমন ইবাদতের স্থান, রাজনীতিও তেমনি জিহাদের ময়দান। মুসলমান লা-শরিক আল্লাহর ইবাদত করে উভয় স্থানেই। নামাজের যেমন বিধি-বিধান আছে তেমনি রাজনীতিতেও ইসলামের রীতি-নীতি আছে। মানবকে এজন্য সৃষ্টি করা হয়েছে যে সে আল্লাহর ইবাদত করবে (ওয়া মা খালাকতুল জিন্না ওয়াল ইনসা ইল্লা লি ইয়াবুদুন, সুরা আদ্ দারিয়া ৫৬)। অর্থাৎ প্রতিটি কর্মকে ইবাদতে রূপ দিবে। শুধু নামাজ রোযা নয়, তার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, রাজনীতিসহ সকল কর্মকান্ডই হবে ইবাদত। রাজনীতির ন্যায় বিস্তৃত গুরুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্রকে ইবাদতের বাইরে রেখে কি সেটি সম্ভব? অথচ সেকুলারিজম সেটিই চায়। প্রশাসনের বিশাল অঙ্গণে ইসলামের এ পবিত্র ইবাদতকেই এরা নিষিদ্ধ করে। এভাবে প্রতিবন্ধকতা গড়ে আল্লাহর হুকুম পালনের বিরুদ্ধে। এজন্যই ইসলামে এটি কুফরি। এটি অতি বিপদজনক আরেকটি কারণেও। ঈমানদার মাত্রই আল্লাহর খলিফা। খেলাফতের এ দায়িত্বপালন মসজিদের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ হলে রাষ্ট্রের বাঁকী অংশে কর্তৃত্ব পায় শয়তান ও তার প্রতিনিধিরা। শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতির মত গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলো তখন শয়তানের আজ্ঞাবহ হয়। ফলে প্রচন্ড গতিতে বাড়ে জাহিলিয়াত। বাংলাদেশের মত মুসলিমদেশে আদিম অজ্ঞতা বা জাহিলিয়াত ফিরে এসেছে বস্তুতঃ একারণেই। দূর্নীতি, সস্ত্রাস ও অশ্লিল-অসভ্যতায়  দেশটি ইতিহাসের সকল কদর্যতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছ। অন্য দলের সমর্থকদের পিটিযে হত্যার ন্যায় অতি বর্বর কর্মটিও গন্য হচ্ছে রাজনীতির উৎসব রূপে। উৎসব হয় এমন কি ব্যভিচার নিয়েও । নারীরা পণ্যরূপে বিদেশে রফতানি হয়। মানুষকে মানুষ বানানোর শিল্প ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে মহিলাদের বিবস্ত্র করে উল্লাস করা হয়।

 

রাষ্ট্রের প্রশাসন জাতীয় জীবনে ইঞ্জিনের কাজ করে। এটি যেদিকে যায় জাতিও সেদিকে যায়। মুসলিম দেশগুলী আজ যে ধর্ম ছেড়ে বিপথে এগিয়েছে সেটি ধর্মপরায়নদের দখলে প্রশাসন না থাকার ফলে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাফল্যের বড় কারণ, চালকের সিটে নবীজী (সাঃ) স্বয়ং নিজে বসেছিলেন। এবং তাঁর মৃত্যুর পর খোলাফায়ে রাশেদার ন্যায় মহান ব্যক্তিগণ বসেছিলেন। এবং এটিই ইসলামের ঐতিহ্য। আজকের মুসলমানগণ প্রচন্ড ব্যর্থ হল, ইসলামের সে মহান ঐতিহ্যকে তারা ধরে রাখতে পারিনি। ফলে ব্যর্থতা উপচে পড়ছে প্রতি ক্ষেত্রে।

 

এটি সত্য যে ধর্মের নামে অধর্ম ইতিহাসে প্রচুর হয়েছে। যেমন প্রচুর ”চ্ছ খাদ্যের নামে অখাদ্যের তান্ডব। তাই বলে খাদ্যকে অস্বীকার করলে দেহ বাঁচে না। তেমনি ধর্মকে অস্বীকার করলে মানবতাও বাঁচে না। তখন বিধস্ত হয় মূল্যাবোধ, নীতিবোধ, শান্তি ও শৃঙ্খলা। আরবের অসভ্য মানুষগুলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হয়েছিল ইসলামের কারণেই। আজও ইতিহাসে তা অনন্য। মূল্যোবোধ বা নীতিবোধ লেবোরেটরিতে আবিস্কারের বিষয় নয়। সেটি অসম্ভব বলেই পাশ্চাত্যের সেকুলার সমাজ আজ ব্যর্থতার প্রতীক। ফলে সমাজে সম্পদের জৌলুস বাড়লেও  তাদের অনৈতিকতা পশুকেও হার মানিয়েছে। তারা নিজ হাতে নিজেদের যে ক্ষতি করেছে তা বণ্য পশুও করেনি। এ ক্ষতি ইতিহাসে তুলনাহীন। বিধস্ত হয়েছে তাদের পরিবার। উলঙ্গতাও স্টাইলে পরিণত হয়েছে। ধর্ষন বেড়েছে মহামারীর ন্যায়। একমাত্র ইউ.কেতেই বছরে ২ লাখ ৯৫ হাজার মহিলা (প্রতিদিন গড়ে ৮০৮ জন) ধর্ষিতা হয়েছে (সূত্রঃ স্বরাষ্ট্র দফতরের রিসার্চ রিপোর্ট, গার্ডিয়ান, ১৮ ফেব্রেয়ারি, ২০০০)। একমাত্র দুটি বিশ্বযুদ্ধে তারা ছয় কোটির বেশী মানুষকে তারা হত্যা করেছে। এবং বর্তমান প্রস্তুতি হলো সমগ্র বিশ্ব বিধ্বংসের। পাশ্চাত্যের সাথে পাল্লা দিয়ে ব্যর্থতার ইতিহাস গড়েছে মুসলিম দেশের ধর্মনিরপেক্ষবাদীরাও।

প্রতিটি মুসলিম দেশে মূল বিষয় নিছক নামাযী বা রোযাদারের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়। বরং সেটি হল, পরিপূর্ণ মুসলমানরূপে বেড়ে উঠা ও বেঁচে থাকার বিষয়। এ জন্য যেটি অপরিহার্য সেটি হল, রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে যে দুর্গন্ধময় আবর্জনা জমেছে সেটি দূর করা। কারণ, আবর্জনার স্তুপে একমাত্র  মশামাছিরই বংশ বৃদ্ধি ঘটে; পরিচ্ছন্ন চেতনার মানুষ সেখানে বাঁচে না। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে ভাল মানুষের আকালতো এ কারণেই। ফলে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠার স্বার্থেই অনিবার্য প্রয়োজন হল আবর্জনা মূক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মান। তবে এ কাজে লড়াইও অনিবার্য। কারণ সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি অঙ্গণে জেঁকে বসা ইসলামবিরোধী সেকুলার পক্ষ বিনা লড়ালে ক্ষমতা ছাড়বে না। মশা মাছি যেমন আবর্জনা থেকে পুষ্টি পায়, তেমনি দুর্বত্ত সেকুলারগণও পুষ্টি পায় এ কলুষিত সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে। ফলে যে কোন মূল্যে তারা এ কলূষিত সমাজের সুরক্ষাও চায়। ফলে লড়াইও অনিবার্য়। ইসলামী সমাজের নির্মানে যে লড়াই  নবীজী (সাঃ) এড়াতে পারেননি সে লড়াই এড়িয়ে আজও ইসলামের বিজয় অসম্ভব। বহু দেশে সে লড়াই শুরুও হয়েছে। কথা হল, কোন মুসলমান কি ইসলাম ও অনৈসলামের এ লড়াইয়ে নিরপেক্ষ থাকতে পারে? সে নিরপেক্ষতায় কি তার ঈমান বাঁচবে? লন্ডন, ১০/০১/২০০৫



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites