Home •ইসলাম নবীজী(সাঃ)র অবমাননা ও অবহেলিত নবী-আদর্শ

Article comments

নবীজী(সাঃ)র অবমাননা ও অবহেলিত নবী-আদর্শ PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 30 September 2012 23:24

রোগাগ্রস্ত পাশ্চাত্য

পাশ্চত্যের রোগ শুধু সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবশিক আধিপত্যবাদ নয়;বরং গভীর ভাবে আক্রান্ত বস্তুবাদ,বর্ণবাদ,নাস্তিকতা,পার্থিবতা,যৌনতা ও পুঁজিবাদের ন্যায় নানারূপ জটিল রোগে।অসুস্থ্য মানুষেরা শুধু দেহে নয় আচরণেও অসুস্থ্য হয়।সে রোগের প্রকাশ ঘটে সিম্পটমের মধ্য দিয়ে। পাশ্চাত্যবাসী এ রোগগুলির সিম্পট নিয়ে আজ বিশ্ববাসীর সামনে হাজির হচেছ। পাশ্চাত্যের রোগগুলি যে শুধু শাসকচক্রের -তা নয়,মহামারির ন্যায় ছড়িয়ে পড়েছে জনগণের মাঝেও। ফলে “হোয়াইট হাউস” থেকে যেমন ত্রুসেড ঘোষিত হয় (আফগানিস্তানে হামলার শুরুতে জর্জ বুশ যেমন বলেছিলেন),তেমনি কোরআন জ্বালানোর হুমকি আসে ও নবীজীর বিরুদ্ধে ফিল্ম ও কার্টুন নির্মিত হয় জনগণের স্তর থেকে। নবীজী(সাঃ)ন্যায় মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ এ মানুষটির উপর কেন বার বার হামলা হয় সেটি বুঝতে হলে পাশ্চাত্যের এ রোগগুলি অবশ্যই বুঝতে হবে।

সবগ্রামে ডাকাত দল গড়ে উঠে না,ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদও তেমনি সবদেশে জনপ্রিয়তা পায় না। এজন্য জনগণের নৈতীক পচনটি গভীর হওয়া জরুরী। নইলে ডাকাত দল যেমন ডাকাত পায় না,ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদও তেমনি সৈন্য পায়না। অথচ সে পচনটি পাশ্চাত্যে এতই অধিক যে লোকবল পেতে তাদের সমস্যা নেই। মানুষের মাথায় আনবিক বোমা ফেলার মত সৈনিক পেতে অতীতে যেমন বেগ পায়নি,তেমনি আজও  অসুবিধা হচ্ছে না কোরআনে আগুণ দেয়া,যাত্রীভর্তি বিমানে মিজাইল মারা,লাশের উপর প্রশ্রাব করা,বিয়ের আসরে বোমা ফেলা বা কয়েদীদের দিয়ে পিরামিড বানাতে রাজী এমন অসুস্থ্য বিবেকের সৈন্য পেতে। এমন এক অসুস্থ্য পরিবেশে ইসলামের মহান নবী (সাঃ)র প্রতি অবমাননায় বহু কার্টুন বা ফিল্ম নির্মিত হবে তাতে কি বিস্ময়ের কিছু আছে?

 

এরূপ অসুস্থ্য মানুষদের কবলে দুইশত বছরের অধিক কালের জন্য আটকা পড়েছিল তৃতীয় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি শুধু দুর্বলদের সম্পদে হাত দেয় না,ধর্মেও হাত দেয়। ব্রিটিশেরা তাই ভারতে শাসনক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর শত শত বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত শরিয়তী আইন-আদালতকে আবর্জনায় ফেলেছে।সে স্থলে প্রতিষ্ঠিত করেছিল আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক আইন।।যে আইনে মদ,জুয়া,সূদ,ঘুষ,পতিতাবৃত্তি,সমকামিতা ও ব্যাভিচারির ন্যায় অপরাধগুলিও হালাল। মার্কিনীরা একই কাজ করেছে আফগানিস্তানে। ইসলামের বিরুদ্ধে এ হলো তাদের সবচেয়ে বড় কুকর্ম। তবে তাদের কুকর্মগুলি শুধু শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে নয়,মুসলিম ইতিহাসে যারা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বা icon তাদের বিরুদ্ধেও। ফলে লাগাতর হামলা হচ্ছে তাদের ভাবমুর্তি বিনাশে। কারণ, সমাজ ও সভ্যতার নির্মানে তারাই তো মডেল। তাদের ভাবমুর্তি বেঁচে থাকলে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি যে মুসলিম দেশে বাজার পাবে না সেটি তারা জানে। অপরদিকে মডেলের বিনাশ হলে মানুষ আদর্শ শূণ্য হয়,আদর্শশুণ্য সে মানুষদের বিভ্রান্ত করার কাজটি তখন সহজ হয়। আগ্রাসী শত্রুশক্তি এ জন্য শুধু রাষ্ট্র মুসলিম রাষ্ট্রের বিনাশই চায় না,বিনাশ চায় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের ইমেজের। তাই জীবননাশী হওয়ার সাথে তারা iconoclastic তথা চরিত্রবিনাশীও হয়। ফলে মহান নবীজী (সাঃ)র বিরুদ্ধে ইসলামের শত্রুদের আজ যত গালিগালাজ,ফিল্ম বা কার্টুন তৈরীর উদ্যোগ সেটি ই্টলারের বিরুদ্ধে নেই। সালমান রুশদিরা এজন্যই পাশ্চাত্যে এত কদর পায়। মুসলমানদের চেতনায় নবীজী (সাঃ)র অবস্থানটি তারা জানে। নবীজী (সাঃ)কে তারা আযানে,নামাযে,দোয়ায়,আলোচনায় নিয়মিত স্মরণ করে। তাঁর নাম শুনামাত্র উপর দরুদ পাঠ করে। নিজ প্রাণের চেয়েও তারা তাঁকে বেশী ভালবাসে। সে ভালবাসায় স্খলন আনতে তারা নবী-চরিত্রের উপর মিথ্যা অপবাদ দিতে শুরু করেছে।এভাবে মু’মিনের মনের ভূবনে নবীজী(সাঃ)র অবস্থানকে তারা ধ্বংস বা দুর্বল করতে চায়। নইলে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি তাদেরকে আত্মসমর্পিত করা যে অসম্ভব সেটি তারা বুঝে।

 

পাশ্চাত্যের সহিংস আক্রোশ যে শুধু কুরুচিপূর্ণ ফিল্মে বা কার্টুণে তা নয়। বরং আগ্রাসী আক্রোশ প্রকাশ পাচ্ছে মুসলিম দেশগুলির প্রতি পাশ্চাত্য দেশগুলোর বিদেশ নীতিতেও। কার্টূনে বা ফিল্মে নবীজী (সাঃ)কে গালি দেয়ায় ইসলামের যে ক্ষতি হচ্ছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী ক্ষতি হয় মুসলিম দেশগুলি তাদের হাতে অধিকৃত হওয়ায়। ইসলামের শত্রুরা নবীজী(সাঃ)কে বিগত চৌদ্দশত বছর ধরে বহু কুৎসিত গালি দিয়েছে। পাশ্চাত্যের বহু লেখক নবীজী(সাঃ)র নামটিও শুদ্ধ ভাবে লিখেতে রাজী হয়নি। কিন্তু বিপদ বেড়েছে তখন যখন সে গালির সাথে মুসলিম দেশগুলি তাদের হাতে অধিকৃত হয়েছে। অধিকৃত দেশের প্রতিটি জনপদ তখন পরিণত হয়েছে গোয়ান্তোনামো বে,আবু গারিব ও বাগরাম জেলের ন্যায় কারাগারে। বন্দী মুসলমানদের দিয়ে তখন পিরামিড গড়া,লাশের উপর প্রস্রাব করা এবং কোরআনে আগুনে দেয়া শুধু মামূলী বিষয় হয়ে দাঁড়ায় না,অসম্ভব করা হয়ে পড়ে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও। এভাবে অসম্ভব করা হয় ইসলামের পূর্ণ পালন।অধিকৃত ইরাক,আফগানিস্তান,ফিলিস্তিনে তো সেটিই হচ্ছে।

 

ডবল স্টান্ডার্ড

পাশ্চাত্যবাসীর বড় রোগ তাদের ডবল স্টান্ডার্ড। পাশ্চাত্যবাসী বিশ্বটাকে কখনোই একই মানদন্ডে বিচার করতে রাজী নয়। নিজেদের জন্য তারা এক বিশেষ মানদন্ড খাড়া করেছে,অন্যদের বিচারে খাড়া করেছে আরেক মানদ্ন্ড। অন্যদের দেশ দখল করা তাদের কাছে দেশপ্রেম,আর সে দখলদারির বিরুদ্ধে জিহাদ হলো সন্ত্রাস। ইরাক¸আফগানিস্তান,লেবানন বা গাজা’র ন্যায় দেশের জনগণের মাথার উপর হাজার হাজার টন বোমা ফেলাটি তাদের মানবিক অধিকার,আর সে বোমা হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলো মৌলবাদ। এমন আচরণ শুধু পাশ্চাত্য দেশগুলির সরকারি নীতি নয়,বরং একই রূপ চেতনা ও নীতি নিয়ে বেঁচে আছে এসব দেশের জনগণের মাঝেও। আর সেটির নগ্ন প্রকাশ ঘটে যখন কোন দেশের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ শুরু হয়। সমগ্র দেশবাসী তখন সকল ভেদাভেদ ভূলে হামলাকারি নেতার পক্ষে একতাবদ্ধ হয়। সে সব যুদ্ধে হাজার হাজার টন বোমা ও শত শত মিজাইল বর্ষণই শুধু নয়,পারমানবিক বোমা নিক্ষেপও তখন বিপুল জনসমর্থন পায়। হিরাশিমা ও নাগাসাকির জলন্ত মানুষগুলো তাই মার্কিন মুলুকে খুব একটা সহানুভুতি পায়নি। অথচ সমগ্র মানব-ইতিহাসের এ ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ। কিন্তু সে অপরাধে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের যেমন দণ্ড হয়নি,তাকে পদত্যাগও করতে হয়নি।

 

যক্ষা বা ক্যান্সারের ন্যায় দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষুধা লোপ পায়।তেমনি সাম্রাজ্যবাদী চেতনায় যে ব্যাক্তি আক্রান্ত তার থাকে না নৃশংসতার বিরুদ্ধে নিন্দার সামর্থ। ফলে যুদ্ধ শুরু হলে সাম্রাজ্যবাদী দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বি হয়। আগ্রাসী হামলাকে সমর্থণ করা সাম্রাজ্যবাদী দেশের জনগণের কাছে তখন দেশপ্রেম গণ্য হয়। এবং গাদ্দারি মনে করে বিরোধীতাকে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধীতা করায় মুক্তিযুদ্ধা মহাম্মদ আলীকে শুধু গাদ্দারই বলা হয়নি,শাস্তিও দেয়া হয়েছে। প্রেসেডেন্ট জর্জ বুশের জনপ্রিয়তা দুই বার মার্কিন ইতিহাসে রেকর্ড অতিক্রম করেছিল। প্রথমবার যখন সে আফগানিস্তানের উপর হামলা শুরু করেছিল। দ্বিতীয়বার যখন ইরাকের উপর হামলা করে। মার্কিন সিনেট ও কংগ্রেসে রিপাবলিকান ও ডিমোক্রাট উভয় দলের সদস্যরা উভয় যুদ্ধেই একজোট হয়ে তাকে বিপুল ভাবে সমর্থণ করেছিল। সমগ্র দেশ তখন একটি মাত্র টিমে পরিনত হয়। সে অভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী চেতনা প্রতিফলন ঘটে পাশ্চাত্য মিডিয়াতেও। ইরাকের উপর হামলার লক্ষ্যে বি-৫২ বিমানগুলো যখন ব্রিটেনের বিমানঘাটি থেকে গগণ কাঁপিয়ে উড়াল দিত বা বিমানবাহি যুদ্ধজাহাজ থেকে লাগাতর মিজাইল নিক্ষিপ্ত হত তখন সে হামলার উল্লাসটির প্রকাশ ঘটতো যেমন টিভি সাংবাদিকদের মুখের ভাষায়,তেমনি দেহের ভাষায়ও। আগ্রাসনের কবলে পড়া নিরীহ আফগান ও ইরাকীদের মৃত্যু ও তাদের জনপদের ধ্বংসযজ্ঞ সেদিন তাদের কাছে উৎসবযোগ্য গণ্য হয়েছিল। সেটি শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের কাছেই নয়,উৎসবে পরিনত হয়েছিল বিবিসি,সিএনএন,ফক্স টিভির ন্যায় পাশ্চাত্য টিভির সাংবাদিকদের কাছেও। অথচ ইরাকের বিরুদ্ধে অন্যায্য এবং মানবতাবিধ্বংসী সে যুদ্ধটি শুরু হয়েছিল সম্পূণ্য মিথ্যা অভিযোগের উপর ভিত্তি করে।সাংবাদিকদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সে সত্যকে গোপন করা,এবং বর্বর হামলাকে ন্যায্য রূপে খাড়া করা।

 

মিডিয়ার কাজ শুধু খবর পরিবেশন নয়,বরং ইমেজ গড়ে তোলা।মিথ্যাচার তখন শিল্পে পরিণত হয়। মিডিয়ার বদৌলতেই হত্যাযোগ্য অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে নিরীহ আফগান ও ইরাকী জনগণ,আর হিরো হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে জর্জ  বুশ ও টনি ব্লেয়ার। একই কৌশলে মুজিবের ন্যায় স্বৈরাচারিকে সর্বশ্রষ্ঠ বাঙালীর খেতাব দেয়া হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত ফিল্মে নবীজী (সাঃ) বিরুদ্ধে যে অপবাদ আনা হয়েছে সেটিও এক রাজনৈতীক লক্ষ্যে। তারা স্রেফ আফগান তালেবান বা ফিলিস্তিনী হামাস বা লেবাননি হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী ও নারী-নির্যাতকারি রূপে চিত্রিত করে খুশি নয়। সে অপবাদটি ইসলামের শেষ নবীর উপরও আরোপ করতে চায়। এভাবে সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে বর্বর রূপে চিত্রিত করতে চায়। এখানে মূল লক্ষ্যটি হলো,মুসলমানেদের বিরুদ্ধে নব্য ক্রসেড শুরুর উর্বর প্রেক্ষাপট তৈরা করা। মধ্যযুগে রক্তক্ষয়ী এক ক্রসেডকে অনিবার্য করার লক্ষ্যে সমগ্র ইউরোপ জুড়ে একই রূপ মিথ্যাচার অতি ব্যাপক ভাবে চালানো হয়েছিল। সে প্রচারে মূল ভূমিকা পালন করেছিল খৃষ্টান চার্চ। আর আজ সে দায়িত্ব নিয়েছে মিডিয়া। বুদ্ধিবৃত্তি ও চেতনার এমন এক ভয়ংকর ভ্রষ্টতার কারণে অপরাধীরা যে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবে,কোরআনে আগুণ দেয়া হবে বা মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষটির বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদে ফিল্ম বানানো হবে বা কার্টুন আঁকা হবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়?

 

নির্মূলের সংস্কৃতি

দেহ-হননের ন্যায় চরিত্র-হননও যে কোন সভ্যদেশে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দেহ হনন হয় অস্ত্রে, আর চরিত্র হনন হয় মিথ্যাচারে ও মিথ্যা দোষারূপে। দুটিই শান্তিবিনাশী। অতীতে এমন সহিংস ঘৃনা ও মিথ্যাচারে জন্ম নিয়েছে বহু রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ। তাই ভদ্র সমাজ শুধু মানবহত্যাই রুখে না,চরিত্র-হননও রুখে। ইসলামের চরিত্র-হনন তো এজন্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মিথ্যা রটনাকারিকে চাবুক মেরে শাস্তি দেয়া হলো শরিয়তের বিধান। অথচ পাশ্চাত্যে সেটি শুধু জায়েজই নয়,বরং প্রচুর পুরস্কার আনে যদি সে মিথ্যাচার ইসলাম ও ইসলামের মহান নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)র বিরুদ্ধে হয়। এখানে কাজ করে অন্যধর্ম ও অন্যসংস্কৃতির মানুষের বিরুদ্ধে নির্মূলের সংস্কৃতি। ইসলাম ও তার নবীর বিরুদ্ধে এমন মিথ্যাচারের ফলে পাশ্চাত্যবাসীর পক্ষে অসম্ভব হয়ছে ইসলামের সঠিক পরিচয় লাভ। মহান আল্লাহতায়ালা,আল্লাহর রাসূল ও ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা কুৎসা রটনার জন্য পুরস্কার দেয়া হয়েছে সালমান রুশদিকে। ‘সাটানিক ভার্সেস’এর রচিয়তা এই লেখককে ব্রিটিশ সরকার স্যার উপাধিতে ভূষিত করেছে। কিন্তু কোন বইয়ে বা পত্রিকায় রাজপরিবারের ইজ্জতহানির কোন ঘটনা ঘটলে ব্যাপারটি অন্যরূপ হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি প্রিন্স উইলিয়ামের স্ত্রী কেটের অশ্লিল ছবি ছেপেছে ফ্রান্সের পত্রিকা। তাতে ক্ষেপেছে ব্রিটিশ রাজপরিবার। পত্রিকার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে। অথচ কেটের সে নগ্ন ছবিগুলি মিথ্যা ছিল না। ইসলাম ও তার নবীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার যেখানে পুরস্কার আনে,কেটের নগ্নতার প্রামাণিক ছবি সেখানে ব্রিটিশ রাজপরিবারে আক্রোশের জন্ম দেয়।তেমনি ইসরাইল ও ইহুদীদের বিরুদ্ধে সত্য কিছু বলাও পাশ্চাত্যে নিন্দনীয় অপরাধ। ব্যক্তিস্বাধীনতার বুলি তখন হাওয়ায় হারিয়ে যায়।

 

পাশ্চাত্যের মূল নীতিটি হলো যা কিছু তাদের নিজ স্বার্থ-বিরোধী তাকে ঘৃনা করা,এবং সম্ভব হলে নির্মূল করা। নির্মূলের মধ্য দিয়েই নিজ ধর্ম,নিজ সভ্যতা ও নিজ সংস্কৃতির জন্য তারা স্থান করে নিতে চায়। অন্য ধর্ম ও অন্য সংস্কৃতির মানুষদের তারা পাশ্চাত্য ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার অধিকার দেয়,কিন্তু নিজ পরিচয় নিয়ে বাঁচার অধিকার দেয় না। এটাকেই তারা বলে সাংস্কৃতিক ইন্টিগ্রেশন। এমন এক আগ্রাসী চেতনার জন্মভূমি হলো ইউরোপ। ভিন্ন বর্ণ,ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন ধর্মের মানুষদের প্রতি নির্মূলের জেদ তাদের মধ্যে এতটাই বেশী যে সমগ্র ইউরোপে খৃষ্টান ধর্মের বাইরে অন্য কোন ধর্মকে অতীতে বেড়ে উঠতে দেয়নি। অন্য ধর্মের মানুষদের নির্মূল করা হয়েছে অতি সহিংস ভাবে। স্পেন থেকে ৭০০ বছরের মুসলিম সভ্যতাকে শিকড়সহ উপড়ে ফেলার মূলে তো এমন নির্মূলমুখি চেতনা। অথচ এমন ঘটনা এশিয়াতে ঘটেছে শুধু ভারতে। সেটি রাজা হিন্দুদের রাজশক্তির দ্বারা বৌদ্বদের নির্মূল করায়। কিন্তু আফ্রিকাতে সেটি ঘটেনি।

 

ইসলামের কেন্দ্রভূমি হলো মিশর,সিরিয়া,লেবানন ও ইরাক। এ দেশগুলির প্রতিটিতে রয়েছে বিশাল অমুসলিম জনসংখ্য। পাশ্চাত্যের কোন দেশে এত অখৃষ্টান জনসংখ্যা নাই। ফলে ভিন ধর্মের মানুষের পাশে একত্রে বসবাসের অভ্যাস ইউরোপ বা আমেরিকায় গড়ে উঠবে কীরূপে? সমগ্র পাশ্চাত্য জুড়ে এক্ষেত্রে চলছে এক সাংস্কৃতিক দুর্ভিক্ষ। মিশরে খৃষ্টান জনসংখ্যা মূল জনসংখ্যার শতকরা ১০ ভাগের বেশী। বাংলাদেশে হিন্দুদের যে হার এটি তার চেয়েও অধিক। লেবাননে খৃষ্টানদের সংখ্যা শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ। সিরিয়াতেও অমুসলিম জনসংখ্যা শতকরা প্রায় ১০ ভাগ। ইরাকেও বহু খৃষ্টানের বাস। এসব ঐতিহ্যবাহি মুসলিম দেশগুলিতে অমুসলিমদের শান্তিপূর্ণ বসবাস হাজার বছরের বেশী কাল ধরে। মুসলিম শাসনামলে তাদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা বাধানো হয়েছে, গীর্জা জ্বালানো হয়েছে বা নির্মূলের চেষ্টা হয়েছে সে নজির নেই।

 

স্পেনে মুসলিম শাসনের শুরু হয়েছিল উমাইয়া শাসনামলে। তাদের নির্মূল করা হয় ১৪৯২ সালে। নির্মূল কর্মটি এতটাই সফল ছিল যে, মুষ্টিমেয় কয়েটি প্রাসাদ ছাড়া দীর্ঘ মুসলিম শাসনের কোন আলামতই রাখা হয়নি। মুসলিম জনসংখ্য সেখানে শতকরা একভাগও অবশিষ্ঠ ছিল না। ইউরোপীয় নৃশংসতার এ হলো দলিল। নেকড়ে যেখানে যায় সেখানে হিংস্রতা সাথে নিয়েই যায়। পাশ্চাত্যের সে সহিংস সংস্কৃতির কারণে প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী জনগণ। তবে ইউরোপ-আমেরিকায় আজ  উল্টো স্রোত বইতে শুরু করেছে। পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে দ্রুত বৃদ্ধি ঘটছে মুসলিম জনসংখ্যার। কিন্তু সেটি মেনে নিতে প্রচণ্ড মানসিক কষ্ট হচ্ছে পাশ্চাত্যবাসীর। তারা চায়,মুসলমানগণ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ভূলে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মেল্টিং পটে বিলুপ্তি হয়ে যাক। কিন্তু সেটি ঘটছে না। কারণ মুসলমানগণ নির্মূল হলেও স্রোতে ভাসে না। তাদের কাজ তো স্রোত সৃষ্টির। নিজ সংস্কৃতি নিয়ে বাঁচাই মুসলমানের ধর্ম,নইলে ঈমান বাঁচে না। আর এখানেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের ক্ষোভ ও সে সাথে প্রচণ্ড আক্রোশও। সে ক্ষোভ ও আক্রোশের ফলে পাশ্চাত্য দেশে বাড়ছে মুসলিম বিদ্বেষ ও সহিংসতা। হামলা হচ্ছে মসজিদে ও মুসলমানদের দোকানপাটে। তবে যারা পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে বিলীন হয়ে গেছে এবং পরিণত হয়েছে তাদের বিশ্বস্ত সৈনিকে তাদেরকে তারা পুরস্কৃতও করছে। সালমান রুশদীর ন্যায় মিথ্যাচারির স্যার উপাধি লাভ এবং জালমাই খলিলজাদের ন্যায় এক আফগানির জাতিসংঘে মার্কিন দূত হওয়ার মূল রহস্যটি তো এখানেই।

 

পাশ্চাত্যে ইসলামভীতি

খৃষ্টান ধর্মের প্রতিপক্ষ হিন্দু ধর্ম,বৌদ্ধ ধর্ম,শিখ ধর্ম বা অন্য কোন প্রাচ্যধর্ম নয়,বরং ইসলাম। অন্য ধর্মগুলো তার দাঁত হারিয়েছে বহুশত বছর আগেই। অথচ ইসলামের আদর্শিক,আধ্যাত্মীক,নৈতীক ও রাজনৈতীক অস্ত্রটি আজও  পূর্বের ন্যায় অতি ধারালো। বরং দিন দিন তা আরো তীব্রতর হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রচার মাধ্যম ইসলামের সে সামর্থকে বরং বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসলামই বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত প্রসারমান ধর্ম। ইসলামের প্রসার বাড়ছে এমন কি পাশ্চাত্যের কেন্দ্র ভূমিতে। আগামী বিশ বছর বা তারও কম সময়ের মধ্যে লন্ডন,প্যারীসের ন্যায় ইউরোপের বড় বড় শহরের সিকি ভাগ নাগরিক হতে যাচ্ছে মুসলমান। এখন সে সংখ্যা শতকরা দশ ভাগের বেশী। আর এতে নিজেদের জন্য বিপদ ভাবছে খৃষ্টান ধর্ম ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অভিভাবকেরা। ফলে প্রচণ্ড ভাবে বাড়ছে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামভীতি। বাড়ছে আক্রোশ। আর আক্রোশপূর্ণ ব্যক্তি আচরণে অশালীন হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। সেটিই ধরা পড়ছে নবীজী(সাঃ)বিরুদ্ধে নির্মিত অশালীন কার্টুনে ও ফিল্মে।

 

অন্য ধর্মে ও অন্য বর্ণের মানুষের সাথে মুসলমানদের বসবাসের ইতিহাস ইসলাম প্রচারের শুরু থেকেই। অন্য ধর্মের মানুষদের তারা কোথাও উচ্ছেদের বা নির্মূলের চেষ্টা করেনি। উচ্ছেদের বা নির্মূলের চিন্তা তো আসে ভীতি থেকে। পাশ্চাত্যে আজ যেমন ইসলাভীতি, সেভাবে মুসলমানদের মাঝে কখনোই খৃষ্টানভীতি বা হিন্দুভীতি কাজ করেনি। ভারতে প্রায় ৭০০ বছরের শাসনের পরও তারা যেভাবে ভারতে সংখ্যালঘু রয়ে গেছে তা থেকেই প্রমাণ মেলে তারা কোথাও তরবারির জোরে ধর্ম প্রচার করেনি। একই ঘটনা ঘটেছে স্পেনে। দেশটিতে ৭০০ বছরের অধিক কাল মুসলিম শাসনকে কখনোই ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শাসন বলা যাবে না।ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শাসনের ধারণা তো ইউরোপীয় আবিস্কার। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের ন্যায় মুসলমানগণ স্পেনের সম্পদ নিয়ে মক্কা-মদিনায় প্রাসাদ গড়েনি। বরং নিজেদের ভাগ্যকে সেদেশের অধিবাসীদের সাথে একাত্ম করে নিয়েছিল। ফলে স্পেনে যেমন বহু সমৃদ্ধ নগর গড়েছে, তেমনি সেসব নগরে প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ও গড়েছে। সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউরোপের নানা দেশ থেকে ছাত্ররা আসতো। ইউরোপীয় রেনেসাঁর মুলে হলো স্পেনের এ মুসলিম শাসন।

 

দেশবাসীর কল্যাণ ও অগ্রগতির মূলে হলো শিক্ষা। শাসকদের মাঝে জনগণের কল্যাণ-চিন্তাটি ধরা পড়ে দেশবাসীর মাঝে তাদের জ্ঞানবিতরনের আগ্রহ থেকে। শাসকের সবচেয়ে বড় অপরাধটি তাই জনগণের মাঝে শিক্ষা-প্রসারে অবহেলা। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী চেতনায় এমন কল্যাণ-ভাবনা আসে না। তার প্রমাণ বাংলাদেশে ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন। তাদের এ দীর্ঘ শাসনে বাংলাদেশে শিক্ষার হার শতকরা ১০ জনেও পৌঁছায়নি। দেশটিতে কর্ডোভা বা গ্রানাডার মাপে কোন শহর নির্মাণ করেনি। যা কিছু করার তা অক্সফোর্ড,কেম্ব্রিজ বা লন্ডনের ন্যায় ব্রিটিশ নগরগুলিতে করেছ। বাংলাদেশে আজ  সরকারি-বেসরকারি মিলিযে প্রায় অর্ধশত বিশ্ববিদ্যালয়,কিন্তু ১৯০ বছরে ব্রিটিশরা ঢাকাতে প্রতিষ্ঠা করেছিল একটি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়,এবং সেটিও শেষের দিকে এসে। এরূপ জনকল্যাণ-বিরোধী হওয়াটাই সাম্রাজ্যবাদীদের রীতি। অধিকৃত দেশে সমৃদ্ধি আনা তাদের রাজনৈতীক লক্ষ্য নয়। এ লক্ষ্যে তারা বহু সমুদ্র ও বহু দেশ পাড়ি দিয়ে অন্য দেশে গিয়ে অর্থ,শ্রম ও রক্ত বিণিয়োগ করে না। মূল লক্ষ্যটি এখানে নিরেট শোষন,এবং সে শোষণের অর্থে সমৃদ্ধি আনা নিজ দেশে। দিন-দুপুরে ডাকাতির এটি এক রাষ্ট্রীয় প্রকল্প। অথচ প্রকৃত মুসলমান শুধু ধর্ম প্রচারে মিশনারি নয়,বরং মিশনারি জীবনের প্রতিটি কর্মে ও রাজনীতিতে। মিশন এখানে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল। ভিশন এখানে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। মুসলমানের যুদ্ধজয়ে কোন জনগোষ্টি নির্মূল হয় না।দেশজয় বা রাজনীতি বরং প্রকৃত মুসলমানের কাছে ইবাদত,রাজনীতি এখানে মানব-কল্যাণের রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার। তাই মুসলিম শাসনে এজন্যই স্পেনে যেরূপ কর্ডোভা,গ্রানাডা গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ শাসনে বাংলায় সেটি ঘটেনি। কিন্তু এতবড় কল্যাণ-কর্মের পরও মুসলমানদেরকে সেদেশ থেকে পূর্ণভাবে নির্মূল করা হয়েছে। মুসলমানদের রক্তে স্পেনের রাজপথ ও অলিগলি রঞ্জিত করা হয়েছে। ভিন্ জাতি-ধর্মের নির্মূল চেতনা ইউরোপীয় আচরণে যে কতটা প্রকট এ হলো তার নমুনা। সে চেতনা যে এখনও বেঁচে আছে সে প্রমাণ কি কম? এমন এক চেতনার কারণেই বসনিয়ার সেব্রেনিৎসা শহরে জাতিসংঘের ক্যাম্প থেকে ৭ হাজার মুসলমানকে উঠিয়ে দিনে দুপুরে নিয়ে সার্ব বাহিনী নির্মম ভাবে হত্যা করে। ডাচ পাহারাদারগণ তাদের বাঁচাতে কোন উদ্যোগই নেয়নি।

 

যে কুকুর্ম মুসলিম দেশে ঘটেনি

কোন মুসলিম দেশে হযরত ঈসা (আঃ) বা হযরত মূসা (আঃ)এর উপর কদর্য লেপন করে ফিল্ম তৈরী হয়েছে বা বই লেখা হয়েছে তার কোন নজির নেই। মুসলমানের দ্বারা কৃষ্ণ, রাম বা গণেশের বিরুদ্ধে কোন কার্টুন বের হয়েছে সে প্রমাণও নাই। এমন কুকর্ম মুসলিম দেশে কোন কালেই ঘটেনি।অথচ অমুসলিম দেশ শাসন করা মুসলিম ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। ভারতের উপর শাসন করেছে প্রায় সাত শত বছর।শত শত বছর শাসন করে স্পেন,গ্রীস বুলগেরিয়া, ক্রয়েশিয়া, সার্বিয়া, বসনিয়া,আলবেনিয়া,কসভো,ক্রিমিয়া,সাইপ্রাসসহ সহ বহু ইউরোপীয় দেশ। কিন্তু স্পেন থেকে যেভাবে মুসলমানদের নির্মূল করা হলো এবং সম্প্রতি যে চেষ্টা বসনিয়াতে হলো সেরূপ নির্মূলের নজির কি মুসলিম ইতিহাসে আছে?

 

খৃষ্টানধর্মের জন্মভূমি জেরুজালেম। সেখানে মুসলিম শাসনের ইতিহাস হাজার বছরের বেশী। এ শহরটি দখলে মুসলমানদের হাতে কোন রক্তপাত ঘটেনি। সে শহর থেকে খৃষ্টানদের কখনোই নির্মূলের চেষ্টা হয়নি। মুসলমানদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক খৃষ্টান এবং ইহুদী সেখানে শুরু থেকেই বসবাস করতো,কোনরূপ হানাহানি বা দাঙ্গা হয়নি। কিন্তু রক্তপাতের তখনই শুরু যখন শহরটি ইউরোপীয় ক্রসেডারদের হাতে অধিকৃত হয়। তখন রচিত হয় নতুন ইতিহাস। সে ইতিহাস মুসলমানের রক্তে জেরুজালেম প্লাবিত হওয়ার। ঘোড়ার হাটু ডুবে গিয়েছিল সে রক্তে। সে বীভৎস্য রক্তপাতের বিবরণ মেলে দিয়েছেন এমন কি বহু ইউরোপীয় ঐতিহাসিকের লেখায়। রক্তপাতের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় ফিলিস্তিনের উপর ইহুদী দখলদারি প্রতিষ্ঠায়। ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে একই রূপ সহিংস ঘৃনা ও নির্মূলের সংস্কৃতি নিয়ে হাজির হয় নবাগত ইহুদীরা। ফলে ফিলিস্তিনে চলছে এখনো রক্তপাত।

 

মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংস আক্রোশটি পাশ্চাত্যে আজও  যে কতটা প্রবল ভাবে বেঁচে সেটির প্রমাণ শুধু নবীজী(সাঃ)র বিরুদ্ধে নির্মিত কার্টুন বা ফিল্মেই মেলে না,ধরা পড়ে মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত আজকের যুদ্ধগুলিতেও। তেমন এক সহিংস চেতনার কারণেই জর্জ বুশ আফগানিস্তানের উপর মার্কিন হামলাকে ক্রসেড রূপে ঘোষণা দিয়েছিলেন। ব্রিটিশদের হাতে ১৯১৭ সালে জেরুজালেম অধিকৃত হওয়ার পর দেশটি যাতে পুনরায় মুসলমানদের হাতে ফিরে না যায় তার জন্য সমগ্র পাশ্চাত্য শক্তি এক স্থায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে। সেটি সেখানে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। পূ্র্বের ক্রসেডারদের ব্যর্থতা,জেরুজালেম কবজা করলেও তারা শহরটির উপর বিজয়কে ধরে রাখতে পারিনি। মুসলমানগণ পুণরায় দখলে নিয়েছে। কিন্তু আজকের নব্য ক্রসেডারগণ স্ট্রাটেজী ভিন্ন। ইহুদীদেরকে তারা ঘনিষ্ট মিত্র রূপে গ্রহণ করেছে। তাদের হাতে তারা পারমানবিক বোমাও তুলে দিয়েছে।

 

নিজগৃহে গাদ্দার

নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ “তোমার প্রাণের চেয়ে আমি যদি তোমার কাছে প্রিয় না হই তবে তুমি মুসলমান নও”। এখানে প্রকাশ পায় মু’মিন থেকে নবীজী(সাঃ)র প্রত্যাশা। প্রশ্ন হলো,সে প্রত্যাশাটি কি অযৌক্তিক? রাজার বেতনভোগী সেপাহীরা রাজার জন্য শুধু শ্রমই দেয় না,যুদ্ধে প্রাণও দেয়। অথচ নবীজী(সাঃ) দিয়েছেন জান্নাতের পথ। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেতনও কি এর সাথে তূল্য? হিমালয়-সম সোনা দিয়ে জান্নাতের একইঞ্চি ভূমিও কি কেনা যায়? নবীজী(সাঃ) না হলে যা জুটতো তা তো নিরেট পথভ্রষ্টতা। তখন অনিবার্য হতো জাহান্নাম। অথচ নবীজী (সাঃ)র কারণে জান্নাতের পথ আজ  মু’মিনের হাতের মুঠোয়। তাঁর ও তাঁর পূর্বপুরুষের এ মহাকল্যাণটি তো নবীজী (সাঃ)র মেহনতের বরকতে। সত্যের এ পথ দেখাতে তিনি তায়েফের ময়দানে পাথর খেয়েছেন। তরবারির আঘাতে আহত হয়েছেন ওহুদের ময়দানে,ভেঙ্গে গেছে তাঁর দাঁত। অবর্ণনীয় কষ্ট সয়েছেন শেবে আবু তালেবে। সেখানে তিনি কাটিয়েছিলেন তিন বছরের অবরুদ্ধ জীবন। নবী-জীবনে সে সময়টি ছিল সবচেয়ে কষ্টের,খাদ্যাভাবে গাছের পাতাও তখন খেয়েছেন। এত কষ্টের মাঝে নবীজী (সাঃ) সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো,আল্লাহর দ্বীনকে তিনি মানুষের কাছে পরিপূর্ণ ভাবে পৌছে দিতে পেরেছেন। এবং সে সাক্ষ্যটি দিয়েছেন খোদ আল্লাহতায়ালা। ফলে প্রতিটি মুসলমানই তাঁর কাছে ঋণি। কথা হলো,সে ঋণ পরিশোধের সামর্থ কি কারো আছে? নবী(সাঃ)র প্রতি অবমাননায় কোন মু’মিন ব্যক্তি কি তাই নীরব থাকতে পারে? প্রতিবাদে মিছিলে অংশ নেয়া তো অতি ক্ষুদ্র প্রয়াস।

 

তবে মুসলিম দেশে ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য শাসকদের এজেন্ডাই ভিন্ন। তারা ব্যস্ত স্রেফ নিজেদের স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষায়। ইসলাম ও ইসলামের নবীর উপর হামলা তাদের কাছে গুরুত্বই পায়না। এরাই নিজ গৃহের গাদ্দার। এদের কারণে মুসলিম দেশের রাজপথে প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও সে ঝড় রাজপ্রাসাদে উঠে না। সত্তরের দশকে ব্রিটেনে এক সৌদী রাজকণ্যার জীবন নিয়ে ‘Death of a Princess’ নামে একটি সিনেমা নির্মিত হয়েছিল। তাতে ইজ্জতহানি হয়েছিল সৌদি রাজপরিবারের। সে ক্ষোভে সৌদি রাজা ব্রিটেনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিয়েছিল। অথচ নবীজী(সাঃ)র প্রতি অবমাননা দেখিয়ে যখন কার্টুন আঁকা হয় বা ফিল্ম বানানো হয় তখন সৌদিদের ক্ষোভ বাড়ে না। নির্মাতা দেশের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের কথাও তারা মুখে তুলে না। বরং তাদের সাথে সৌদিদের সম্পর্ক আরো মজবুত হয়। উল্টো ক্ষোভ বাড়ে তাদের বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। অথচ বন্ধু রূপে কাদেরকে গ্রহণ করতে হবে সে বিষয়েও মহান আল্লাহতায়ালার সুস্পষ্ট নির্দেশ ও হুশিয়ারি রয়েছে। বলা হয়েছেঃ “হে মু’মিনগণ! তোমাদের আপনজনদের ব্যতীত অপর কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।তারা তোমাদের অনিষ্ট করতে ত্রুটি করবে না,যা তোমাদের বিপন্ন করে তারা তাই কামনা করে। তাদের মুখে বিদ্বেষ প্রকাশ পায় এবং তাদের হৃদয়ে যা গোপন থাকে তা আরো গুরুতর। তোমাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করেছি যদি তোমরা অনুধাবন করো।-(সুরা আল ইমরান,আয়াত ১১৮)।

 

যে অবমাননা মুসলিম দেশে

নবীজী(সাঃ)র অবমাননা কি শুধু তাঁকে নিয়ে কার্টুন আঁকায়? শুধু কি কদর্যতাপূর্ণ ফিল্ম বানানোয়? বরং ভয়ানক অবমাননা হলো সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর অনুসৃত শরিয়তি বিধানকে আস্তাকুঁড়ে ফেলা। কারো প্রতি সন্মান দেখানোর মাধ্যম কি শুধু তাঁর নামে জপ করা? “মান্য করি বা ভালবাসি” এরূপ কথা বার বার বলা? বরং শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের মাধ্যম,তিনি যা চান সেটি নিষ্ঠার সাথে পালন করা। এবং যে পথ দেখিয়ে গেছেন সে পথে চলা। সেটি না হলে যেমন অবাধ্যতা হয়,তেমনি অবমাননাও হয়। অথচ সে ভয়ানক অপরাধটি হচ্ছে প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে। এবং মুসলিম নামধারিদের হাতে। পবিত্র কোরআনে বার বার বলা হয়েছে “আতিউল্লাহা ও আতিয়ুররাসূল” অর্থাৎ “আনুগত্য করো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের”। বলা হয়েছে “তোমরা যদি আল্লাহকে অনুসরণ করতে চাও তবে অনুসরণ করো রাসূলকে।” তাই ইসলামে আল্লাহর হুকুমের আনুগত্যই শুধু ফরয নয়,ফরয হলো নবীজী(সাঃ)র হুকুমের আনুগত্যও। নবীজী(সাঃ)র অবাধ্যতা তাই হারাম। এতে অবাধ্যতা হয় মহান রাব্বুল আলামীনের। ফলে উম্মুক্ত হয় জাহান্নামের পথ। সাহাবায়ে কেরামের আমলে নবীজীর সূন্নতের অবাধ্যতা যে হয়নি তা নয়,তবে সে অবাধ্যতার সাথে সাথে শাস্তিও হয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদার আমলে অবাধ্যদের এমন কি মৃত্যুদন্ড দেয়া হত। হযরত আবু বকর (রাঃ)র আমলে সেরূপ অপরাধ হয়েছিল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাকাত দিতে অস্বীকার করায়। হযরত আবু বকর (রাঃ) ঘোষণা ছিল,“নবীজী(সাঃ)র আমলে মানুষ যাকাতের উঠের সাথে উঠের গলার রশিটিও দিত। কিন্তু আজ  যদি কেউ উঠের সাথে রশিটা না দেয় তবে আমি তাকে কঠোর শাস্তি দিব।” নবীজী(সাঃ)র বিধানের প্রতি এই হলো শ্রদ্ধার নমুনা। অথচ বাংলাদেশে সে আল্লাহ ও সে সাথে নবীর হুকুমের অবাধ্যতার ন্যায় ভয়ানক অপরাধটিই হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে।সেটি শুধু যাকাত আদায়ের সূন্নত পালনে নয়,বরং শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠায়।

 

মানুষকে মানুষ রূপে সৃষ্টি করা হয়েছে, ফেরেশতা রূপে নয়। ফলে ফেরেশতা হওয়া তার দায়িত্ব নয়। ফেরেশতাদের দায়িত্ব পৃথিবীর বুকে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ নয়। তাদের কাজ আদালত চালানোও নয়। ফেরেশতাদের তাই রাষ্ট্র গড়তে হয় না, আদালতেও বসতে হয়। অথচ মু’মিনের ইসলামি রাষ্ট্রগড়া যেমন অপরিহার্য, তেমনি অপরিহার্য হলো আ।দালত গড়া এবং সে আদালতে শরিয়তি আইন অনুসারে বিচার করা। নইলে চরম অবাধ্যতা হয় মহান আল্লাহর। রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিগণ বেশী বেশী রাস্তাঘাট বা কলকারখানায় গড়ায় ব্যর্থ হলে কোন শাসক জাহান্নামে যাবে না। কিন্তু জাহান্নামে যাবে ক্ষমতা হাতে পেয়ে আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না করলে। কারণ শাসক হিসাবে এটিই সরকারের উপর অর্পিত মূল দায়ভার। সে দায়ভার পালিত না হলে বিদ্রোহ হয় মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে। প্রতিটি মুসলিমকে তাই তার কাজের প্রায়োরিটি বুঝতে হয়। মুসলিম শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ন্যায় জালেম হতে পারে,গোনাহগারও হতে পারে। কিন্তু কাফের হতে পারে না। কাফের তো হয় শরিয়তের বিরুদ্ধবাদী হয়ে। কোরআনের ঘোষনা,“আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে বিধান অনুযায়ী যারা বিচারকার্য পরিচালনা করে না তারাই কাফের,…তারাই যালেম,..তারাই ফাসেক।সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪,৪৫,৪৭  )।ঔপনিবেশিক কাফের শাসনের পূর্বে মুসলিম বিশ্বের শাসকদের মাঝে এ নিয়ে অজ্ঞতা ছিল না। ফলে মুসলিম দেশগুলিতে বহু জালেম শাসক এলেও দেশের আইন-আদালতগুলি চলতো শরিয়তের ভিত্তিতে।

 

নবী-আদর্শের অবমাননা যেখানে রাষ্ট্রীয় নীতি

বাংলাদেশে মার্কিন ফিল্মের বিরুদ্ধে বিশাল বিশাল প্রতিবাদ মিছিল হচ্ছে। দেশ জুড়ে হরতালও হয়েছে। লাখ লাখ তৌহিদী মানুষ নেমে এসেছে দেশের রাজপথে। এটি প্রচন্ড আশাপ্রদ দিক। কিন্তু রোগ শুধু মার্কিন মুলুকে নয়,খোদ বাংলাদেশেও। বাংলাদেশের নিজ চেহারাটিও তাদের দেখতে হবে। দেশটি আজ অধিকৃত ইসলামের শত্রু পক্ষের হাতে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে মূল প্রায়োরিটি নবীজী(সাঃ)র আদর্শের প্রতি সম্মান প্রদর্শণ নয়। জনসেবা বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো শেখ হাসিনার পিতার সম্মান পাহারা দেয়া। সে লক্ষ্যে এমনকি দেশের শাসনতন্ত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে মর্যাদাহানি কথা বললে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। অথচ মুজিবের দ্বারা বাংলার মানুষের কোন কল্যাণটি হয়েছে? মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মূল কাজটি হলো জনগণকে সিরাতুল মোস্তাকীমের সন্ধান দেয়া,এবং জাহান্নামের পথ থেকে তাদের মুক্তি দেয়া। নবীজী (সাঃ) শুধু ধর্মের প্রচারক ছিলেন না, তিনিই ছিলেন মুসলিম উম্মাহর প্রথম শাসক। তাই মুসলিম দেশে সব শাসকের দায়ভার হলো তাঁর সে অনুসৃত শাসন-নীতিকে পূর্ণ ভাবে অনূসরণ করা। নইল চরম অবমাননা ও অবাধ্যতা হয় নবীজী(সাঃ)র। নবী-আদর্শের এমন অবহেলায় কারো ঈমান বাঁচে না। অথচ শেখ মুজিব যে নীতির অনুসরণ করেছেন সেটি নবীজী (সাঃ)র নয়,সেটি প্রতিষ্ঠিত কাফেরদের। কাফেরদের প্রণীত সমাজতন্ত্র,জাতিয়তাবাদ,সেক্যুলারিজম ন্যায় ভ্রষ্ট মতবাদকে শাসনতন্ত্রের মূলনীতি বানিয়ে দেশবাসীকে তিনি পথভ্রষ্টতার দিকে ধাবিত করেছেন। মুজিবের বড় অপরাধটি গণতন্ত্র হত্যা নয়। অর্থনীতি ধ্বংসও নয়। বরং সেটি নবী-আদর্শের সাথে গাদ্দারি এবং খোদ আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। আল্লাহর বিরুদ্ধে তাঁর সে নগ্ন বিদ্রোহ ও অবাধ্যতাকে মুজিব বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত করেছিলেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা-হরণ,বাকশালী শাসনের প্রতিষ্ঠা, শোষনমূলক ভারতের দাসত্ব, দেশের শিক্ষা-শিল্প ও অর্থনীতিও ধ্বংস এসব অপরাধ যত জঘন্যই হোক তা আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেয়ে জঘন্যতর নয়।দেশধ্বংসের সাথে ঈমান ধ্বংস ছিল তাঁর প্রায়োরিটি। অথচ এ অপরাধীর ইজ্জত রক্ষায় বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসনের দায়িত্ব হয়ে দাড়িয়েছে মৃত মুজিবের সন্মান পাহারা দেয়া। অথচ যে নবীজী(সাঃ)র কারণে পূর্ব পুরুষদের সাথে আমরাও পুতুল পুঁজা থেকে মু্ক্তি পেলাম এবং সন্ধান পেলাম জান্নাতের পথের সে নবীজী (সাঃ)র অবমাননার বিরুদ্ধে সরকারের কোন মাথা ব্যাথা নেই। দেশের সংবিধানেও কোন বিধান নেই। বরং ঘটেছে উল্টোটি। নবীজী (সাঃ)র প্রতি অবমাননার প্রতিবাদে যারা রাজপথে নামে তাদেরকে পুলিশ দিয়ে পেটানো হয় এবং গ্রেফতার করা হয়।

 

বাংলাদেশে নবীজী (সাঃ)র অবমাননা হচ্ছে কার্টুন এঁকে বা ফিল্ম বানিয়ে নয় বরং নবীজী (সাঃ)র সূন্নতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। শেখ হাসিনা তাঁর পিতার প্রবর্তিত আল্লাহর বিরুদ্ধে অবাধ্যতার সে ধারাকেই পদে পদে অনুসরণ করে চলেছেন। আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানকে যারা রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাদেরকে তিনি সন্ত্রাসী বলে কারারুদ্ধে করছেন। তাদের উপর অকথ্য নির্যাতনও করছেন। একাজে তিনি কাফেরদের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। প্রতিবেশী ভারতে ইসলামপন্থিদের উপর এমন নির্যাতন হয় না যা হচ্ছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশে দুর্বৃত্তদের যেমন মন্ত্রী হওয়ার অধিকার আছে,তেমনি মিছিল করারও অধিকার আছে। বস্তুত দেশের রাজনীতি ও প্রশাসন তো এমন দুর্বৃত্তদের হাতেই জিম্মি। অপরদিকে শত শত আশেকে রাসূল (সাঃ)কে গ্রেফতার হচ্ছে শুধু এ অপরাধে যে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত ফিল্মের নির্মাতাদের শাস্তি চায়। সরকার যে কোন পক্ষে সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে?

 

ও ধর্মের দোহাই অনেকে নবীজী(সাঃ)র বিরুদ্ধে অবমাননার ঘটনাকে ভূলে যেতে বলেন। কেউ বা নীরবে সয়ে যাওয়াকেই হিকমত মনে করেন। অনেকে ছবক দেন ধৈর্য্য ধারণের। প্রশ্ন হলো,নিজের পিতামাতা, নিজের স্ত্রী-কন্যা বা খোদ নিজের বিরুদ্ধে এমন কদর্য হামলা হলে কি তারা ছুপ করে বসে থাকতেন? হামলার মুখে বসে থাকার পক্ষের লোক মুসলিম সমাজে সব সময়ই ছিল, এখনও আছে। এদের কারণেই মুসলিম বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী শাসন শতাধিক বছরব্যাপী প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এবং এখন অধিকৃত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দালালদের হাতে। মৃত-দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে কুকুর-শৃগাল টানাটানি করলেও সেদেহে প্রতিবাদ উঠে না। অথচ জীবন্ত দেহে মাছি বসলেও সবল হাত তেড়ে আসে। এটিই তো জীবনের লক্ষণ। মুসলিম বিশ্বের সে জীবন আজ ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। সে কারণেই নবীজী(সাঃ)র বিরুদ্ধে কার্টুন বা ফিল্ম নির্মিত হলে তার বিরুদ্ধে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তুমুল ঝড় উঠে। মুসলিম বিশ্বের এরূপ জেড়ে উঠায় ইসলামের শত্রুগণ যেমন ভীতু,তেমনি ভিতু মুসলিম নামধারি তাদের সেক্যুলার মিত্রগণ। তারা মুসলিম বিশ্বে যেমন জিহাদ চায় না,তেমন প্রবল প্রতিবাদও চায় না। এজন্যই তারা জেগে উঠা মুসলমানদের আবার ঘুম পাড়াতে চায়। তাই হামলার মুখে এরা ছবর ধারণের নছিহত দেয়।

 

নবীজী (সাঃ)র প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন কীরূপে?

কার্টুনে বা ফিল্মে নবীজী(সাঃ)র বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা হলে নবীজী(সাঃ)র যে অসম্মান হয় তা নিয়ে কারো বিরোধ নেই। এটি যে নিন্দনীয় সেটি বহু কাফেরও বিশ্বাস করে। বহু অমুসলিম নেতা এমন দুষ্কর্মের নিন্দাও করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নবীজী(সাঃ)র প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাজ্ঞাপনই বা কীরূপে হয়? সেটি কি শুধু প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দেয়া বা কারো কুশপুত্তিলিকায় আগুন দেয়ায়? প্রতিবাদ জানানোর মধ্য দিয়ে মুসলমানের দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং মূল দায়িত্বটি হলো নবীজী (সাঃ)র শিক্ষার পূর্ণ প্রয়োগ। দায়িত্ব হলো,নিজ দেশে ও নিজ সমাজে নবীজী(সাঃ)র শত্রুদের নির্মূল। নইলে কি সম্ভব ইসলামর বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা? আবু জেহল ও আবুল লাহাবের মত ইসলামের শত্রুদের নির্মূল তো নবীজী(সাঃ)রই পবিত্র সূন্নত। মুসলমানের হাতে নির্মূলের সে কাজ পালীত না হলে নবীপ্রেম প্রমাণিত হয় কি করে? বরং তাতে শক্তি বাড়ে শত্রু শক্তির। এজন্য মুসলমানদের শুধু জঙ্গলের হিংস্র জানোয়ারগুলোকে চিনলে চলে না,ইসলামের শত্রুপক্ষ ও তাদের অপরাধগুলোকেও চিনতে হয়। এমন জ্ঞানলাভ ইসলামে ফরয।নইলে নামাযী এবং রোযাদারও শত্রুপক্ষের সৈনিকে পরিণত হয়।

 

মুসলিম দেশগুলিতে সেক্যুলার শাসকগোষ্টির অপরাধ অনেক। তবে দেশে শরিয়তি শাসনে প্রতিষ্ঠা না করাই তাদের মূল অপরাধ। এখানে অপরাধটি দেশবাসীকে শাসনতান্ত্রিক ভাবোব ভা কুফরের দিকে ধাবিত করার। অথচ এ পথেই নবীজীর সবচেয়ে বড় অবমাননা হচ্ছে প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে। নবীজী (সাঃ) শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের বিধান শিখিয়ে যাননি। কিভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিচার-আচার করতে হবে সেটিও শিখিয়ে গেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিচার-আচারের সে বিধানকে সুস্পষ্ট করতে শত শত বছর ধরে গড়ে উঠেছে বিশাল ফিকাহ শাস্ত্র। কোন মুসলমান কি সে মূল্যবান সম্পদকে অব্যবহৃত রাখতে পারে? অথচ মুসলিম দেশে সেক্যুলারিস্টদের দ্বারা সে অপরাধটিই সংগঠিত হচ্ছে।

 

প্রশ্ন হলো,শরিয়ত পালন ছাড়া কি ইসলাম পালন সম্ভব? শুধু সাহাবাগণ নয়,এমনকি উমাইয়া,আব্বাসীয় এবং উসমানিয়া আমলেও কি মুসলমানগণ একটি দিনের জন্য শরিয়তি বিধানর বাইরে বসবাস করেছেন? শরিয়তহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শুরু তো ঔপনিবেশিক কাফের শত্রুদের হাতে। খৃষ্টান ধর্মকে তারা যেমন গীর্জায় বন্দী করেছে সেটিই তারা ইসলামের সাথে করতে চায়। মুসলিম দেশগুলিতে এটি তো অমুসলিম কাফেরদের প্রজেক্ট। এরা শরিয়তী বিধানকে বিচারালয় থেকে উঠিয়ে আস্তুকুঁড়ে ফেলেছে। কাফির-প্রচলিত সে ধারাকেই অবিরাম অব্যাহত রেখেছে তাদের সেক্যুলারিস্ট খলিফাগণ। কোন মুসলমান কি এমন প্রজেক্টের অংশীদার হতে পারে?

 

ধর্ম পালনে অসঙ্গতি

নবীজী (সাঃ)র প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে মুসলমানদের নিজেদের অসঙ্গতিটিও বিশাল। সেটি যেমন শাসকদের,তেমনি সাধারণ মুসলমানদের। শাসকদের ভন্ডামীটা হলো,একদিকে তারা যেমন মুসলিম দেশে মার্কিন বাহিনীর সাথে মুসলিম হত্যায় সহযোগিতা করছে,অপরদিকে মার্কিন ফিল্মের বিরুদ্ধে নিন্দাজ্ঞাপনও করছে। এদিক দিয়ে নজির সৃষ্টি করেছেন পাকিস্তানের রেল মন্ত্রী জনাব বিলৌর। নবীজী(সাঃ) বিরুদ্ধে ফিল্ম নির্মাতাকারিকে যে হ্ত্যা করবে তাকে তিনি নিজের তহবিল থেকে এক লাখ ডলার পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। অপরদিকে জনগণের অসঙ্গতিটা হলো,পাশ্চাত্য দেশে নবীজী (সাঃ)র অবমাননায় ফিল্ম বা কার্টুন নির্মিত হলে তারা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। অথচ নিজ দেশে যাদেরকে তারা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করছে তাদের রাজনীতি,সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মূল ভিত্তিটা হলো নবীজী(সাঃ)র অনুসৃত নীতির অবাধ্যতা। সে অবাধ্যতাটি ঘটছে রাষ্ট্রে শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠা না করার মাধ্যমে। ফলে রাজপথে কার্টুন বা ফিল্মের বিরুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের মিছিল হলেও তাদের ভোটে ক্ষমতায় বার বার অধিষ্ঠিত হচ্ছে নবী-আদর্শের বড় বড় দূষমনেরা। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও সরকার তো এমন অবাধ্যদেরই প্রতিনিধি। যে শরিয়তি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য নবীজী আজীবন কষ্ট করে গেলেন এবং তাঁর সাহাবাদের প্রায় ৬০ ভাগ শহিদ হয়ে গেলেন সে রাষ্ট্রীয় বিধানকে ইসলামের এ শত্রুপক্ষটি এক দিনের জন্যও প্রতিষ্টা করতে রাজী নয়। মুসলিম দেশে নবীজী (সাঃ)র আসল শত্রু তো এরা। শত্রুতা এখানে তাঁর আদর্শের সাথে। বিদ্রোহ এখানে আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে। নবীজী (সাঃ)র প্রতি প্রকৃত ভালবাসা ও তার ইজ্জতের প্রতি সামান্য দরদ থাকলে শুধু বিদেশী অবমাননাকারিদের চিনলে চলবে না,এসব দেশী অবমাননাকারিদেরও চিনতে হবে। শুধু ফিল্ম বা কার্টুন বিরোধী মিছিল নয়,মুসলিম দেশের প্রশাসন ও রাজনীতি থেকে শরিয়তের শত্রুদের নির্মূলের দায়িত্বও নিতে হবে। সেটিই তো নবীজী (সাঃ)মহান সুন্নত। নবীজী (সাঃ)র প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের প্রকৃত উপায় তো এ সূন্নত পালনে। সাহাবায়ে কেরাম শুধু অর্থ,শ্রম ও মেধা নয়,রক্ত ও প্রাণের বিণিয়োগ করেছেন সে সূন্নত পালনে।ঈমানদার হওয়ার এটাই তো দায়ভার। নইলে মহান আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হবে কীরূপে? ৩০/০৯/২০১২



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Comments (2)
go ahead plz.
2 Friday, 23 June 2017 15:13
Rakibul Hasan

Your every articles are thoughtful & amazing. I pray to Allah Sub'hana wa Ta'la. InshAllah your  writings will suppress the untrue information.


GO AHEAD PLEASE.

Comment
1 Tuesday, 02 October 2012 12:59
Monirul Islam

Alhamdulillah. Thank you very much for your writing. I think it is a symbol of Iman. We all have to show such type of feellings. May Allah (SWT) give you power to observe the duties of actual muslims.

Last Updated on Monday, 01 October 2012 20:21
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.