Home •স্যেকুলারিজম বাংলাদেশে সেক্যুলারিস্টদের স্বৈরাচার ও দুর্বৃত্তি
বাংলাদেশে সেক্যুলারিস্টদের স্বৈরাচার ও দুর্বৃত্তি PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 02 May 2015 13:42

কান্ড নরপশুদের

বাংলাদেশে আজ যে সংকট ও দুর্বৃত্তি তার কারণ কোন দুর্বৃত্ত রাজা বা রাজতন্ত্র নয়। সামরিক স্বৈরাচারও নয়।ভূমিকম্প,সুনামী,মহামারি বা হিংস্র জীবজন্তুর তাণ্ডবও নয়।কৃষি,শিল্প বা অর্থনীতির ব্যর্থতাও নয়।এ বিপর্যয়টি নিতান্তই নৈতিক ও চারিত্রিক।এ কান্ড নরপশুদের।এ অসভ্য নরপশুদের কারণে বাংলাদেশের মাটিতে একটি সভ্য নির্বাচনও অকল্পনীয়।ফলে দেশ ধেয়ে চলেছে যুদ্ধাবস্থার দিকে। অথচ নির্বাচন অনুষ্ঠান চাঁদে মানুষ পাঠানো বা আনবিক বোমা আবিষ্কারের ন্যায় কঠিন কর্ম নয়। সেটি বাংলাদেশ সৃষ্টির ১৭ বছর আগে ১৯৫৪ সালে বাংলার মাটিতে সম্ভব হয়েছিল।নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যা অপরিহার্য তা হলো সৎ নিয়েত ও চরিত্র,অর্থ বা প্রযুক্তি নয়।নরপশুদের সেটি থাকে না। অর্থনৈতিক মন্দা,দুর্যোগ বা মহামারির নাশকতা যত বিশালই হোক তাতে কোন দেশ বা জাতি ধবংস হয় না।মানুষ তাতে মানবিক পরিচয় হারিয়ে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট ইতর প্রাণীতে পরিণত হয় না।দেশের ললাটে তাতে কালিমা লাগে না। অথচ জাতীয় জীবনে ধ্বংস ও বিশ্বজোড়া অপমান নেমে আসে দেশবাসীর নৈতিক ও চারিত্রিক ব্যর্থতায়। মানবিক পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠা তখন অসম্ভব হয়।এমন দেশের পক্ষে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে বার বার প্রথম হওয়া যেমন সম্ভব হয়,তেমনি সম্ভব হয় দিনে-দুপুরে নারীর বস্ত্রহরন,শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণে সেঞ্চুরির ন্যায় বর্বরতা নিয়ে উৎসব।।বাংলাদেশে আজ তেমনি এক দেশ।

 

ইসলামে এজন্যই সবচেয়ে মহৎ কর্ম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত রাস্তাঘাট,কৃষি,শিল্প বা কলকারখানা গড়া নয়।সেটি চরিত্রবান মানুষ গড়া এবং মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে মানবরূপী পশু হওয়া থেকে বাঁচানো।নামায-রোযা,হজ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতগুলির মূল লক্ষ্য মানবকে সে পূণ্যময় চরিত্র নিয়ে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। পৃথিবীপৃষ্ঠে লক্ষাধিক নবী-রাসূল প্রেরীত হয়েছেন এবং অনেকগুলি ধর্মগ্রন্থ নাযিল হয়েছে তো সে মহান কাজটি শেখাতে;কৃষি,শিল্প বা বিজ্ঞানের পাঠ দিতে নয়। সে লক্ষ্যে পবিত্র কোরআন হলো মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত সর্বশেষ গ্রন্থ। মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ সে কাজকে মানব জীবনে মিশন রূপে প্রতিষ্ঠা দিতেই নবীজী (সাঃ)কে লাগাতর জিহাদ করতে হয়েছে,এবং শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবাকে শহীদ হতে হয়েছে।এবং রাষ্ট্রকে শ্রেষ্ঠ মানব গড়ার কারখানা রূপে গড়ে তোলার প্রয়োজনে খোদ নবীজী (সাঃ)ও তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহাবাদেরকে রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে বসতে হয়েছে। ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে নবীদের সে মিশন বাঁচে না।তখন অসম্ভব হয়ে চরিত্রবান মানুষ তৈরী। সমগ্র রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি তখন দুর্বৃত্ত উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়।

 

বাংলাদেশের বর্তমান সংকট ও বিপর্যয়ের মূলে দেশটির সেক্যুলারিস্ট শাসকচ্ক্র। দেশের রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতিকে মানবতাহীন ও নৈতিকতাহীন করার কাজে তারাই আজ নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রতারণাকে তারা বিশাল শিল্পে পরিণত করেছে। এ শিল্পে তাদের মূল পুঁজি হলো মিথ্যাচার। মিথ্যাই শয়তানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।তাই আল্লাহর পথে লড়াইয়ের অর্থ মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই। রাজনীতির মাঠে নানারূপ মিথ্যার বীজ বুনে সেক্যুলারিস্ট দুর্বৃত্তগণ বিপুল ফসলও ফলিয়েছে।নিজেদেরকে তারা নিরপেক্ষ নির্বাচন,স্বাধীনতা,বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক মানবিক অধিকারের পক্ষের শক্তি রূপে পেশ করে। এবং সেটি নিছক ধোকা দেয়ার জন্য সেটি প্রমাণিত হতে বেশী সময় লাগে না। চোরডাকাত যেমন ভাল মানুষ সেজে সমাজে চলাফেরা করে,এরাও তেমনি গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি রূপে নিজেদের জাহির করে। নানারূপ মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নেয় এবং নির্বাচনে বিজয়ীও হয়।কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে আত্মপ্রকাশ করে আসল রূপে।সে রূপটি নিষ্ঠুর স্বৈরাচারের।হিংস্র নেকড়ের নখরে পড়লে প্রাণ বাঁচে না। তেমনি গণতন্ত বাঁচে না দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারিদের খাঁচায় বন্দী হলে। নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথটাই তারা বন্ধ করে দেয়। তখন নির্বাচিত চোর-ডাকাত ও তাদের সহচরদের হাতে ব্যাংক-ডাকাতি,শেয়ার মার্কেট ডাকাতি,টেন্ডার-ডাকাতি ও চাঁদাবাজী তখন দেশে স্বাভাবিক রীতি হয়ে দাঁড়ায়।সেক্যুলারিস্টদের ভন্ডামী ও মিথ্যাচারের নমুনাঃ এক).ইসলামের সনাতন শিক্ষার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েও তারা সেক্যুলারিজমের অর্থ করে ধর্মনিরপেক্ষতা বলে।দুই).ইসলাম ও ইসলামের শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠার বিরোধী হয়েও পরিচয় দেয় মুসলিম রূপে। তিন).আচরনে নৃশংস স্বৈরাচারি হয়েও মুখে খৈ ফোটায় গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার নামে।

 

সেক্যুলারিস্টদের অপরাধ

সেক্যুলারিস্টদের অপরাধ বহুবিধ। সেটি যেমন ধর্মের বিরুদ্ধে,তেমনি মৌলিক মানবিক অধিকার ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে। তাদের অপরাধ দেশের স্বাধীনতা,শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতির বিরুদ্ধেও। তাদের ডিকশেনারিতে মানবাধিকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বলে কিছু নেই। সেটি যেমন মুজিবের আমলে ছিল না, তেমনি হাসিনার আমলেও নাই্। ক্ষমতায় গিয়ে তারা নির্বাচন করে স্রেফ নিজ দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করতে। সে নির্বাচনে বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের কোন স্থান নেই।নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনকে তারা অসম্ভব করে দিয়েছে। তারা এতটাই স্বৈরাচারি যে জনগণকে ভোটাধিকার,বাক-স্বাধীনতা,সম্ভ্রম ও শ্লীলতা -এমনকি বেঁচে থাকার অধিকার দিতেও রাজী নয়। তাদের কাছে চাঁদাবাজি,লুটতরাজ,সন্ত্রাস,হত্যা,গুম ও ধর্ষণের ন্যায় ভয়ানক অপরাধগুলো আর অপরাধ নয়,পরিণত হয় রাজনীতির আরোধ্য সংস্কৃতিতে।

 

ইসলামের বিরুদ্ধে সেক্যুলারিস্টদের মিথ্যাচারটিও অতি বিশাল ও শত্রুতাপূর্ণ।খোদ নবীজী (সাঃ)যেভাবে শাসকের আসনে বসেছেন এবং খেলাফত,শরিয়ত,জিযিয়া ও জিহাদের নীতিকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন –সেক্যুলারিস্টদের লাগাতর যুদ্ধটি সে ইসলামের বিরুদ্ধেও। নবীজী(সাঃ)র প্রতিষ্ঠিত মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব, শরিয়ত,জিহাদ ও খেলাফতের ইসলামকে এমনকি ইসলাম বলতেও তারা রাজী নয়। যখনই নবীজী (সাঃ)র ইসলামকে রাষ্ট্রের বুকে প্রতিষ্ঠিত করার কথা বলা হয় তখনই সে ইসলামকে গালি দেয় ধর্মীয় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ বলে। পবিত্র জিহাদ চিহ্নিত হয় সন্ত্রাস রূপে। তাদের দাবী,মুসলমানদের বাঁচতে হবে নবীজী (সাঃ)র প্রতিষ্ঠিত ও কোরআনে বর্নিত ইসলামকে বাদ দিয়েই।ইসলামকে বাদ দিয়ে বাঁচার সে চেতনাকে তারা বলে একাত্তরের চেতনা। মুসলমানগণ যখন তাদের সে দাবী মানতে নারাজ তখনই চিত্রিত হয় শত্রু রূপে এবং শুরু হয় তাদের বিরুদ্ধে লাগাতর যুদ্ধ। নামে মুসলমান হলেও বাংলাদেশী সেক্যুলারিস্টদের এজেন্ডা তাই কাফেরদের এজেন্ডা থেকে আদৌ ভিন্ন নয়। তাই ইসলামের নির্মূলে তাদের যুদ্ধটিও বিশ্বের কাফের শক্তিবর্গের সাথে কোয়ালিশন গড়ে।ভারতের শাসক শক্তির সাথে তাদের সম্পর্ক এজন্যই এতো গভীর। প্রশ্ন হলো,ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে লাগাতর একটি যুদ্ধে নিয়োজিত থাকার পরও সেক্যুলারিস্টগণ ধর্মনিরপেক্ষ হয় কি করে? মুসলমানই বা থাকে কি করে? তাদের মিথ্যাচার ইসলামের মূল আক্বীদার বিরুদ্ধেও।তারা বলে,যে ইসলামে জিহাদ,শরিয়ত ও খেলাফত আছে সেটি প্রকৃত ইসলাম নয়। তারা সেটিকে উগ্রপন্থিদের মনগড়া ব্যাখা বলে অভিহিত করে।যেন শরিয়ত,জিহাদ ও খেলাফতের ন্যায় বিষয়গুলো ইসলামে কোন কালেই ছিল না।

 

ধর্মের প্রতি নিরপেক্ষতা বলে সেক্যুলারিজমে কিছু নাই। সেটি অতীতেও ছিল না।বরং সব সময়ই সেটি নির্মূলমুখি। সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ পার্থিব স্বার্থ নিয়ে বাঁচার চেতনা। রাজনীতিতে সেটি স্রেফ ইহজাগতিক কল্যাণ সাধনের নীতি। এ নীতি ধর্মীয় চেতনা ও পরকালের ভাবনাকে ব্যক্তি পর্যায়ে সীমিত রাখার নসিহত দেয়। পরকালীন কল্যাণের ভাবনাকে তারা বড় জোর মসজিদের জায়নামাজে নেয়ার অনুমতি দেয়;রাজনীতি,আইন-আদালত,শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গণে তা নিষিদ্ধ।তবে ধর্মকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখার বিষয়ে সেক্যুলারিস্টদের নসিহতটিও যে মিথ্যা ও প্রতারণাপূর্ণ সে প্রমাণও কি কম? কোরআনের জ্ঞানার্জন,পুরুষের দাড়ি-টুপি ও মহিলাদের হিজাব –এগুলি নিতান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু সেগুলি ব্যক্তিগত পর্যায়ে পালিত হলেও তাতে তারা খুশি নয়,ব্যক্তিগত পর্যায়ে ধর্মপালনের উপরও তারা পুর্ণ নিয়ন্ত্রণ চায়। তারা পূর্ণ নিয়ন্ত্রন চায়,মসজিদের খোতবাতে কি বলা হলো বা কোথায় কি দরস দেয়া হলো সেগুলির উপরও। হিযাবধারি মহিলারা বিপুল সংখ্যায় রাস্তায় নামলে,দাড়ি-টুপিধারিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে বা কোরআন-হাদীস শিক্ষায় জনগণের আগ্রহ বাড়লে সেক্যুলারিস্টদের মাথা বিগড়ে যায়। এগুলির মাঝে তারা নিজেদের বিপদ দেখতে পায়। ফলে ফ্রান্সের ন্যায় বহু পাশ্চত্য দেশে মহিলাদের হিজাবকে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রন আনা হয়েছে স্কুল-মাদ্রাসায় কোরআন শিক্ষার সিলেবাসে। অতীতে তুরস্ক,ইরান,তিউনিসিয়ার ন্যায় মুসলিম দেশের সেক্যুলারিস্ট শাসকগণ হিযাবকে ব্যক্তিগত পর্যায়েও পালনের অধিকার দেয়নি। বাংলাদেশেও ক্ষমতাসীন সেক্যুলারিস্টদের কাছে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলো ইসলাম বিষয়ক বই পাঠ -বিশেষ করে সে বই যদি শরিয়ত,জিহাদ,খেলাফত বিষয়ে হয়। সে অপরাধে পুলিশ ঘরে ঘরে গিয়ে বই বাজেয়াপ্ত করে এবং ছাত্রদের গ্রেফতার করে। শরিয়ত,জিহাদ,খেলাফত –এগুলি যেন ইসলাম-বহির্ভুত বিষয় এবং সেসব বিষয়ে মুসলমানের জ্ঞানার্জনের কিছু নেই! অপর দিকে মহান আল্লাহতায়ালার শরয়ী হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা বাড়লে তাদের মনে পুলক শুরু হয়। তারা তো খুশি হয় বর্ষবরণ,বসন্তবরণ,থার্টি ফাস্ট নাইট, ভাষা দিবস ও ভালবাসা দিবসের ন্যায় অনুষ্ঠানে বিপুল জনসমাগম হলে। এবং উৎসবের উম্মাদনা শুরু হয় নারীদের অশ্লিল,মাতাল,গায়িকা ও নর্তকীর বেশে দেখতে পেলে।এই হলো সেক্যুলারিস্টদের ধর্মনিরেক্ষতার নমুনা!

 

উল্লাস শয়তানের

স্রেফ পার্থিব জীবনের আনন্দে বা সাফল্যে ঈমানদারের বাঁচার এজেন্ডা পূরণ হয়না। তাকে তো এ জীবনের প্রতি মুহুর্ত বাঁচতে হয় আখেরাতে কী ভাবে সফল হওয়া যায় সে ভাবনা নিয়ে। অথচ সেক্যুলারিজমে অনন্ত-অসীম কালের আখেরাতের জীবনটিই বাঁচার এজেন্ডা থেকে বাদ পড়ে যায়। তাতে আখেরাতে যে বিশাল ক্ষতি হয়,মৃত্যুর পর সে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার কোন উপায় থাকে না।সেক্যুলারিজিমে দীক্ষা নেয়ার মূল বিপদ তো এখানেই। ইসলামে সেক্যুলারিজম এজন্যই হারাম। রোগজীবাণু যেমন রোগ ছড়ায়,দুষিত ধ্যানধারণাগুলিও তেমনি চেতনারাজ্যে রোগ ছড়ায়। সেক্যুলারিস্টগণ তাই চায়,অন্যরাও তাদের ন্যায় স্রেফ দুনিয়াবী স্বার্থচিন্তা নিয়ে বাঁচতে অভ্যস্থ হোক। তাদের মূল যুদ্ধটি মানুষকে আখেরাতমুখিতা থেকে ফিরিয়ে ব্যক্তিকে দুনিয়ামুখি করা। ফলে তাদের যুদ্ধটি মু’মিনের জীবনের মূল এজেন্ডার বিরুদ্ধে।এবং এটিই হলো শয়তানের এজেন্ডা। শয়তান শুধু মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণকে ভূলিয়ে দেয় না,ভূলিয়ে দেয় আখেরাতের কল্যাণ চিন্তাও।এবং সেটি পার্থিব জীবনে নগদ নগদ কিছু পাওয়ার লোভ দেখিয়ে। ব্যক্তির জীবনে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি অর্থাভাবে বা খাদ্যাভাবে হয় না,সেটি হয় জীবনে পথচলায় মূল গন্তব্যস্থলটির কথা ভূলে যাওয়ায়। পথচলায় প্রতিকদমে পা ফেলতে হয় আসল গন্তব্যস্থলের কথা মনে রেখে। পশ্চিমে চলা ব্যক্তি তাই কখনো পূর্ব দিকে পা ফেলে না। মানব জীবনে সে গন্তব্যস্থলটি হলো আখরাত। কিন্তু যার এজেন্ডার আখেরাতের স্মরণই নেই সে লক্ষ্যে পথ চলবে কি করে? বিরামহীন পথচলায় তখন ক্লান্তি আসে বটে,কিন্তু সে ক্লান্তি কখনোই জান্নাতে পৌছায় না। মানবজীবনে এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর আছে কি? পুরা জীবনের বাঁচাটাই তাতে ব্যর্থ হয়ে যায়। সে মহাক্ষতিটা করে সেক্যুলারিস্টগণ। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে এরাই হলো সবচেয়ে ভয়ংকর জীব। কোন বন্যপশুর দ্বারা মানবজাতির এত বড় ক্ষতি হয় না, যা হয় শয়তানের সেক্যুলারিস্ট সেবাদাসদের দ্বারা।ঈমানদারকে তাই শুধু হিংস্র পশুগুলোকে চিনলে চলে না, মানবরূপী এ জঘন্য শত্রুদেরও চিনতে হয়।নইলে এ জীবনের বাঁচাটিই পুরা ব্যর্থ হয়ে যায়। বাংলাদেশের জনগণের সে ব্যর্থতা কি কম? দেবদেবীদের মন্ডপে যত পূজা দেয়া হয় তার চেয়ে বেশী পূজা দেয় দেশের সেক্যুলারিস্ট নেতা-নেত্রীদের নামে।এ ক্ষতিকর জীবদের জাতির নেতা,নেত্রী,বন্ধু ও পিতার আসনেও বসানো হয়েছে!এমন আচরনে কি ১৫ কোটি মুসলমানের দেশে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয় আসে? মহান আল্লাহতায়ালাও কি তাতে খুশি হন?

 

প্রশ্ন হলো,আখেরাতকে ভূলে থাকা ব্যক্তিগণ পার্থিব জীবনেই বা কতটা সফল হয়? পার্থিব জীবনের সুখ-শান্তিও কি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া জুটে? মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে কি সেটি সম্ভব? নিজ চেষ্টায় কেউ সেটি অর্জন করতে পারে –এমনটি বিশ্বাস করলে কি ঈমান থাকে? মহান আল্লাহতায়ালার অনুমতি ছাড়া গাছের একটি ফুলও ফুটে না,পাতাও পড়ে না। ফলে শান্তি আসে কীরূপে? পার্থিব জীবনে শান্তির জন্য তো জরুরী মহান আল্লাহর প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীমে অবিরাম পথ চলা এবং তাঁর অনুগত খলিফা রূপে আমৃত্যু কাজ করা। এ দায়িত্বপালনে কোন বিরাম নেই, কোন অবসরও নাই।কিন্তু সেক্যুলারিজমে দীক্ষা নিলে ব্যক্তির জীবনে সিরাতুল মুস্তাকীমের ধারণা আসে না।মহান আল্লাহতায়ালার খেলাফতের দায়িত্ববোধও সৃষ্টি হয় না। সিরাতুল মুস্তাকীমের সন্ধান ও সে পথে টিকে থাকার ফিকর তো একমাত্র তাদের মাঝেই প্রবল যাদের মনে রয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার ভয় এবং জান্নাত লাভের প্রবল তাড়না। সেক্যুলারিস্টদের মাঝে সে চেতনা না থাকায় তারা বাঁচে শয়তানের খলিফা রূপে। শয়তানের খলিফাদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে রাষ্ট্রের সকল সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের লোকবল,অর্থবল ও অস্ত্রবল তখন শয়তানের লক্ষ্য পূরণে কাজ করে। তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সমূহের মূল কাজটি হয়,মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ ও আখেরাতকে ভূলিয়ে দেয়া। তখন লক্ষ লক্ষ নারীপুরুষ বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গ্রামেগঞ্জে নামে। লক্ষ লক্ষ নারী নামে পতিতাপল্লিতে। সরকারি অর্থে গড়ে উঠে হাজার হাজার নাট্যশালা,যাত্রাদল,সিনেমা হল ও নানারূপ পাপের আখড়া। রাজস্বের অর্থে নিরাপত্তা পায় সূদ,ঘুষ,জুয়া,মদ্যপান ও ব্যাভিচারের ব্যবসা। সূদ,ঘুষ,জুয়া নাচগান, নাট্যশালা ও পতিতাপল্লির আসরে বসে কি আল্লাহ ও আখেরাতে স্মরণ থাকে? তখন সিরাতুল মুস্তাকীমের অনুসন্ধান এবং সে পথে পথচলার কোন গুরুত্ব লোপ পায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তখন জান্নাতের পথ ছেড়ে জাহান্নামমুখি হয়। সেক্যুলারিস্ট শাসনের সবচেয়ে ভয়ংকর ক্ষতিটি তো এটাই।ঈমানদারদের সে ভয়ানক ক্ষতিতে বাড়ে শয়তান ও শয়তানি শক্তিবর্গের গগনবিদারী উল্লাস। বাংলাদেশের বুকে সেক্যুলারিস্ট শক্তির তাই বছরের প্রতিদিনই উৎসবের দিন।

 

সেক্যুলারিস্টদের নাশকতা

মুসলমানদের মূল শত্রু এখন আর মুর্তিপুজারি,গো-পুজারি কাফেরগণ নয়।খৃষ্টান বা ইহুদীগণও নয়।এরা হলো সেক্যুলারিস্টগণ।সেক্যুলারিস্টগণ সে নাশকতাটি ঘটায় জীবনে বাঁচার মূল গোলপোষ্টটি পাল্টে দিয়ে।এতে ব্যক্তির পার্থিব জীবনের সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টাই বিফল হয়ে যায়। ঈমানদারদের বিরুদ্ধে এটিই হলো সেক্যুলারিস্টদের সবচেয়ে বড় নাশকতা।সেক্যুলারিস্টদের এরূপ ঈমানবিনাশী নাশকতার কারণে শুধু অমুসলিম দেশে নয়,খোদ মুসলিম দেশেও মুসলমানদের বসবাসটি বিপদজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অপরাধটি শুধু মুসলমানদের বিরুদ্ধে নয়,সেটি সমগ্র মানবজাতির বিরুদ্ধে। কোন দেশ যদি সেক্যুলারিস্ট স্বৈরাচারিদের হাতে অধিকৃত হয় তবে সে নাশকতা আরো ভয়ংকর রূপ নেয়।ফিরাউনের হাতে রাষ্ট্রের সকল সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানসমুহের লোকবল,অর্থবল ও অস্ত্রবল থাকায় মিশরবাসীর পক্ষে সত্যের পক্ষ নেয়া তথা ইসলাম কবুল অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়া কয়েকজন যাদুকর ছাড়া হযরত মূসা (আঃ)এর ওয়াজ ও মোজেজা ফিরাউনের অধীনস্থ প্রজাদের কাউকেই মুসলমান করতে পারিনি।অথচ মুসলমানদের হাতে মিশর বিজয়ের সাথে সাথে সে দেশে ইসলাম কবুলের জোয়ার শুরু হয়।তখন কোন মোজেজা দেখাতে হয়নি,দীর্ঘ ওয়াজও শোনাতে হয়নি।সেটি সম্ভব হয়েছিল ধর্ম,শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে মানুষকে বিভ্রান্ত করা ও জাহান্নামে টানার যে বিশাল বিশাল অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল সেগুলি বিলুপ্ত করার ফলে। আজও  কি এছাড়া বিকল্প পথ আছে? বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোতে স্বৈরাচারি সেক্যুলারিস্টগণ যেভাবে জেঁকে বসেছে এবং মানুষকে সত্যবিমুখ করার যে বিশাল অবকাঠামো গড়ে তুলেছে সেগুলির উপস্থিতিতে স্রেফ কোরআন-হাদীসের ওয়াজ শুনিয়ে কি লাভ হবে? লাভ হবে কি মোজেজা দেখিয়ে?

 

মানব জীবনের কর্মস্থল আখেরাত নয়,সেটি এই পার্থিব জীবন। আখেরাত হলো ফলভোগের স্থান। তাই জান্নাতে কীরূপে জীবন কাটাতে হবে তা নিয়ে পবিত্র কোরআনে কোন ওয়াজ বা নসিহত নেই। নবীজী (সাঃ)র কাছে নাযিলকৃত মহান আল্লাহতায়ালার ওয়াজের সবটুকুই এই পার্থিব জীবনকে সুখী,সমৃদ্ধ ও শান্তিময় করা নিয়ে। সে লক্ষ্য পূরণে কোরআনী ওয়াজে যেমন শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠার কথা আছে,তেমনি জিহাদ,মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও খেলাফতের কথাও আছে। পার্থিব জীবনের প্রতি অঙ্গণে কোরআনী বিধান অনুসরণের মাঝেই তাদের আখেরাতের কল্যাণ। তাই মু’মিনের আখেরাতে ভাবনা তার রাজনীতি¸অর্থনীতি,শিক্ষা-সংস্কৃতি ও যুদ্ধিবগ্রহে পড়তে বাধ্য। অথচ সেক্যুলারিস্টগণ সেটি হতে দিতে রাজী নয়। তারা যেমন কোরআনের ওয়াজ শুনতে রাজী নয়,তেমনি রাজী নয় কোরআনের বিধানের প্রতিষ্ঠা হতে দিতেও। কোরআন অনুসরণের বিষয়কে তারা আধ্যাত্মিকতা ও আখেরাতের বিষয় বলে; রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনে সে ওয়াজের প্রতিষ্ঠায় সামান্যতম স্থানও ছেড়ে দিতে তারা রাজি নয়। অর্থনীতি,শিক্ষা-সংস্কৃতি, যুদ্ধবিগ্রহ ও রাষ্ট্রীয় নীতি থেকে পরকালের কল্যাণ চিন্তাটিই তখন বিলুপ্ত হয়। বিলুপ্ত হয় জিহাদের ধারণা। মহান আল্লাহতায়ালার মহাপ্রজ্ঞাময় ওয়াজ তখন বন্দী হয় পবিত্র কোরআনের পাতায়।তখন ষড়যন্ত্র এবং সে সাথে লাগাতর যুদ্ধ শুরু হয় রাসূল প্রেরণ ও কোরআন নাযিলের ন্যায় মহান রাব্বুল আ’লামীনের প্রজেক্টকে ব্যর্থ করে দেয়ার। অথচ সমগ্র মানব জাতির কল্যাণে এটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট। সেক্যুলারিস্টগণ এভাবেই আবির্ভূত হয় মানবজাতির সবচেয়ে ক্ষতিকর শত্রু রূপে।

 

ইসলামে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত তাই নামায-রোযা, হয-যাকাত নয়,সেটি হলো রাষ্ট্রের বুক থেকে শয়তানী শক্তির দখলদারি নির্মূল ও তাদের হামলার বিরুদ্ধে নিয়মিত প্রতিরক্ষা দেয়া। জায়নামাযে প্রাণ গেলে সরাসরি জান্নাতপ্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি নাই। নামাযী মুনাফিকও হতে পারে। তার জীবনে তাই কবরের আযাব আছে,পুলসিরাত আছে আলামে বারযাখ ও রোজহাশরের বিচারদিনের সওয়াল-জবাবও আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের উপর থেকে ইসলামের শত্রুশক্তির নির্মূলে যে মু’মিন প্রাণ বিলিয়ে দেয় তার জীবনে সে সবের বালাই নাই। তার জন্য রয়েছে মাগফিরাত ও মৃত্যুহীন প্রাণের প্রতিশ্রুতি।রয়েছে সরাসরি জান্নাতে প্রবেশের ওয়াদা। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ যেটি জানতেন। তাই শতকরা শতভাগ সাহাবা জেনে বুঝে জিহাদের পথটিই বেছে নিয়েছিলেন।তাদের মধ্য থেকে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদও হয়েছেন। তাদের অর্থ ও আত্মদানে নির্মিত হয়েছিল বিশ্বের বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে ইসলামি রাষ্ট্র।এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব। এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তাঁরই প্রদত্ত শরিয়তি আইন। অথচ আজ কের মুসলমানদের মাঝে সে শ্রেষ্ঠ ইবাদতে আগ্রহ নাই। সে অনাগ্রহের কারণে মুসলিম দেশগুলো আজ  ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত। ফলে ইতিহাস নির্মিত হচ্ছে নীচে নামায়।

 

সেক্যুলারিস্টদের পূজা ও পূজামন্ডপ

ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে দেশ অধিকৃত হলে দেশের রাজনীতি,শিক্ষা-সংস্কৃতি ও আইন-আদালতে ইসলামের জন্য কোন স্থান থাকে না। দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হয় অদিম জাহিলিয়াতের। এবং প্রতিষ্ঠা পায় অসভ্য ও অশ্লীল সংস্কৃতি। আবব জাহেলদের সংস্কৃতিতে মিনার মাঠে বিশাল মেলা বসতো। সেখানে নানারূপ অশ্লিলতার প্রদর্শণী হতো। মক্কায় ক্বাবাকে ঘিরেও উলঙ্গ তাওয়াফের প্রথা ছিল। ছিল মুর্তি গড়া ও মুর্তিপুজার সংস্কৃতি। সে সাথে ছিল সন্ত্রাস,মদ-জুয়া,ব্যাভিচার ও ধর্ষনের সংস্কৃতি। জাহেলিয়াতের সে আদিম সংস্কৃতি ফিরে এসেছে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের জীবনে।ফলে  চালু হয়েছে বর্ষবরণ,বসন্তবরণ,ভালবাসা দিবস,থার্টিফাস্ট নাইটের ন্যায় নানা দিবস ও নানা উৎসব। লক্ষ্য একটিই,সেটি মহান আল্লাহর স্মরণকে ভূলিয়ে দেয়া;এবং ফলশ্রুতিতে তাদের ঘাড়ে শয়তানকে চাপিয়ে দেয়া। নাচের আসরে,গানের আসরে, যাত্রা ও নাটকের আসরে ও উলুধ্বনির মাঝে বসলে কি মহান আল্লাহর ভয় থাকে? থাকে কি পরকালের ভাবনা। সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে দূরে সরিয়ে মানুষকে জাহান্নামের পথে নেয়ার এ কাজটি এখন এক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মিশনে পরিণত হয়েছে। এ কাজে বিপুল সংখ্যক পুরোহিত যেমন আছে,তেমনি পূজামন্ডপও আছে।দেশজুড়ে তারা পূজামন্ডপ গড়েছে শহীদ মিনারের নামে। পূজামন্ডপগুলি দেশের প্রতি শহরের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। মুসলিম যুবক-যুবতীদের বিভ্রান্ত করার এটি এক ভয়ানক কুটকৌশল। পূজামন্ডপে ডাকলে কোন মুসলিম সন্তান কি সেখানে যায়? অথচ সেখানে রীতি পূজামন্ডপের ন্যায়। পূজামন্ডপে হাজিরা দেয়ার ন্যায় তথাকথিত শহীদ মিনারেও ফুল নিয়ে নগ্ন পায়ে হাজির হতে হয়। এভাবে বাঙালী মুসলিম জীবনে বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ এনেছে চরম সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতা। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সেক্যুলারিস্টদের এ অপরাধটি অতি গুরুতর। ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনও মুসলমানদের ঈমান-আক্বীদায় এতটা বিচ্যুতি আনতে পারিনি যা এনেছে এ সেক্যুলারিস্টগণ।

 

পূজামন্ডপকে শহীদ মিনার নাম দিয়ে তারা অবমাননা করেছে ইসলামের দুটো পবিত্র পরিভাষাকে। “শহীদ” ও “মিনার” –এ দুটোই আরবী শব্দ। শহীদ তো তারাই যারা আত্মদান করে একমাত্র মহান আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করতে বা মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসী শত্রুদের প্রতিহত করতে। ভাষা,বর্ণ,শ্রেণী ও গোত্রীয় স্বার্থে বহু নাস্তিকও প্রাণ দেয়। কিন্তু তাদেরকে শহীদ বলার রীতি ইসলামে নাই। শহীদগণ মুসলিম সমাজে আদর্শপুরুষ।ইসলামকে বিজয়ী করতে মুসলমানগণ সেসব শহীদদের থেকে আত্মদানে অনুপ্রেরণা পায়। অথচ পুজামন্ডপে নগ্ন পদে হাজির হওয়াতে ইসলামকে বিজয়ী দেখার আগ্রহ বাড়ে না। বরং যা বাড়ে তা হলো ইসলামকে পরাজিত করার অঙ্গিকার। বাংলাদেশে শহীদ মিনারের নামে যে পূজা মন্ডপ গড়া হয়েছে তাতে তো সেটিই বেড়েছে। অপর দিকে “মিনার” শব্দের অর্থ তো তাই যা থেকে আল্লাহর দ্বীনের নূর তথা আলো ছড়ায়। মিনারের সাথে রয়েছে আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত নূরের সম্পর্ক। মুসলিম সমাজে সেটি হলো মসজিদ। মহল্লায় মহল্লায় মসজিদগুলো হলো মহান আল্লাহতায়ালার প্রজ্বলিত আলোর বাতিঘর। মসজিদের মিনার থেকেই ধ্বনিত হয় পবিত্র আযান। মিনার তাই একমাত্র মসজিদে শোভা পায়,স্কুল-কলেজ বা ক্লাবের অঙ্গণে নয়। মসজিদের এ মিনারের সাথে সেক্যুলারিস্টদের গড়া এ মিনারের সাদৃশ্য কোথায়? তাছাড়া শহীদদের নামে মিনার গড়ার সংস্কৃতি থাকলে মদিনা শহরটি শত শত শহীদ মিনারে ভরে উঠতো। কারন সাহাবাদের মধ্য থেকে যে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন তাদের বাস ছিল এ মদিনায়।

 

ব্যর্থতাটি মানুষ রূপে বেড়ে না উঠায়

বাংলাদেশীদের ব্যর্থতা শুধু রাজনীতির ময়দানে নয়,সেটি মূলত শিক্ষা,সংস্কৃতি ও দর্শনে। বাংলাদেশ যে কারণে ৫ বার দুর্বৃত্তিতে বিশ্বচাম্পিয়ান হলো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে নারীরা বর্ষবরণে যেভাবে শ্লীলতা হারালো -সেটি শিল্পখাতে,কৃষিখাতে বা পশুপালনে ব্যর্থতার কারণে নয়।সেটি ব্যর্থতা মনুষ্যপালনে। বাঙালী মুসলমানের এরূপ অসভ্যতা বার বার ধরা পড়লেও সর্বপ্রথম বিকট ভাবে ধরা পড়ে ১৯৭১য়ে। সে সময় প্রায় ৪ লাখ বাঙালী বাস করতো তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে যা আজকের বর্তমান পাকিস্তান। সেসব প্রবাসী বাঙালীদের ঘরে লুটপাট হয়েছে বা বাঙালী রমনীদের শ্লীলতাহানী হয়েছে বা তাদের ঘর থেকে নামিয়ে বস্তিতে পাঠানো হয়েছে সে প্রমাণ নেই। তাদের সবাই নিজ নিজ অর্থ,বস্ত্র ও গহনা নিয়ে নিরাপদে বাংলাদেশে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছে। অথচ তাদের লোকদের হাতে পশ্চিম পাকিস্তানের হাজার হাজার অবাঙালী সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি পূর্ব পাকিস্তানে নিহত হয়েছিল। আরো ঘটনা হলো,১৯৭১য়ে যে পাকিস্তানকে বাঙালীরা ভারতীয়দের সাথে নিয়ে ভাঙ্গলো সে পাকিস্তানে একাত্তরের পর জীবীকার খোঁজে গিয়ে উঠেছে ১০ লাখের বেশী বাঙালী। কিন্তু তাদের কি করাচী,লাহোর বা পিন্ডির বস্তিতে নামানো হয়েছে?

 

সে তুলনায় বাঙালীদের আচরন? ১৯৭১য়ে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) বাস করতো পায় ৬-৭ লাখ অবাঙালী যারা বিহারী নামে পরিচিত। কিন্তু সেসব অবাঙালীগণ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসে বাংলার বুকে ঘর বাঁধেনি। তারা এসেছিল ভারতের বিহার বা অন্যান্যা অবাঙালী এলাকা থেকে। তারা যে ইচ্ছা করে বাংলাদেশে এসে জুড়ে বসেছে তাও নয়। তারা নিজেদের ঘরবাড়ি,ব্যবসা-বাণিজ্য খুঁইয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতীয় হিন্দুদের হামলা থেকে প্রাণ বাঁচাতে। বেশীর ভাগ ভারতীয় মুসলমান তখন আশ্রয় নিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। কিন্ত যারা পূর্ব পাকিস্তানের আশ্রয় নিয়েছিল একাত্তরে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার পর তাদের জানমাল ও ইজ্জত আবরু সেদিন বাঙালীদের হাতে রক্ষা পায়নি। হাজার হাজার বিহারী নারী-পুরুষ ও শিশুদের সেদিন নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে। সেদিন ধর্ষণের শিকার হয়েছে বহু অবাঙালী নারী। তাদের গড়া ঘর-বাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে তাদেরকে নামিয়ে সেগুলো বাঙালী দুর্বৃত্তরা দখলে নিয়েছে। বিহারীদের সেদিন রাস্তায় নামানো হয়েছে। এবং সেদিন থেকে আজও  তাদের অবস্থান রাস্তার নর্দমার পাশের বস্তিতে।একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশের সরকারগুলি সে নির্মম অসভ্যতাকে বৈধতা দিয়েছে,এবং অবৈধ দখলদারদের নামে বিহারীদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটের মালিকানা লিখে দিয়েছে। বিহারীদের সবাই ফেরেশতা ছিল না। বাঙালীদের মত তাদের মধ্যেও অনেকে নানারূপ অপরাধ করেছে। কিন্তু সে অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে শাস্তি দেয়া যেত। কিন্তু সেজন্য সকল বিহারী নারীপুরুষ,বৃদ্ধ ও শিশুকন্যাদের নির্বিচারে ঘরবাড়ি থেকে নামিয়ে পথে বসাতে হবে -এটি কোন সভ্যতা? মহান আল্লাহতায়ালার কাছে কি এরূপ কবিরা গুনাহর হিসাব দিতে হবে না? এমন গুনাহ কি স্রেফ তাওবায় মাফ হয়? এরূপ হারাম ভাবে দখলকৃত ঘর ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে বসে সারা রাত নামায পড়লে বা দোয়ায় চোখের পানি ফেললেও কি তা কবুল হয়? এমন অসভ্য বর্বরতা বাংলার মুসলিম ইতিহাসে কি কোন কালেও ঘটেছে? অথচ সেটি হয়েছে সেক্যুলারিষ্টদের হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ায়।

 

গত পহেলা বৈশাখে (১৪/০৪/১৫) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে নারীদের শ্লীলতাহানীর যে অসভ্য তাণ্ডবটি ঘটলো সে অসভ্যতার বীজ তো একাত্তরেই বপন করা হয়েছিল।বিগত ৪৪ বছর ধরে সে বীজের গোড়ায় শুধু পানি দেয়া হয়েছে। এখন সে বীজের ফসলই দুর্বৃত্তগণ ঘরে তুলছে। বাংলাদেশে আজ যারা সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী,লেখক বা সাংবাদিক তাদের বিবেক যে কতটা মৃত সেটি প্রমাণের কি কোন গবেষণা লাগে? সেটির প্রমাণে একাত্তরে বিহারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বাঙালী বর্বরতা নিয়ে তাদের দীর্ঘ নীরবতাই কি যথেষ্ঠ নয়? তাদের ভাবটা এমন,একাত্তরের বাঙালী-বর্বরতার কিছুই তারা দেখেনি,এবং কিছু শুনেওনি।বাঙালীর মানুষ রূপে বেড়ে উঠার নিদারুন ব্যর্থতা নিয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রচন্ড দুঃখবোধ ছিল।তিনি লিখেছেন,“হে বিধাতা! ৭ কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙালী করে,মানুষ করোনি।” অথচ তখন বাংলার কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বিপুল সংখ্যক নারীর শ্লীলতাহানীর ঘটনা ঘটেনি। বাঙালীদের দ্বারা কোন অবাঙালী জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে একাত্তরের ন্যায় নৃশংস অসভ্যতাও ঘটেনি।বিশ্বমাঝে দুর্বৃত্তে ৫ বার চাম্পিয়ানও হয়নি। প্রশ্ন হলো,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখন বেঁচে থাকলে কি বলতেন?

 

রোগমুক্তি কীরূপে?

বাঙালী মুসলিমের রোগ এখন মহামারিতে রূপ নিয়েছে।শুরু হয়েছে ভয়ানক আত্মপচন। অশ্লীলতা,সন্ত্রাস ও স্বৈরাচারের আজ যে প্রচন্ড তাণ্ডড -সেগুলি আসল রোগের সিম্পটম মাত্র।পচনটা এখানে দেহের নয়, বিবেকের বা আত্মার। মানব দেহ যেমন খাদ্য চায়,খাদ্য চায় তেমনি আত্মাও। দেহের খাদ্য পশুপাখি,কীটপতঙ্গ,এমনকি উদ্ভিদও জোগার করতে পারে। পারে যে কোন মানব সন্তানও। কিন্তু আত্মার খাদ্য জোগারে সবাই সফল হয় না। সকল সমাজে সেটি সহজপ্রাপ্যও নয়।কাফের-ফাসেক-জালেম অধিকৃত রাষ্ট্রে সে খাদ্যের জোগার আরো অসম্ভব হয়ে উঠে। অথচ মানবিক গুনে বেড়ে উঠার জন্য সেটি অপরিহার্য। নইলে মানব শিশু পশুর স্তরেই থেকে যায়। এর প্রমাণ,পাপুয়া নিউগিনি ও আন্দামানের বহু মানুষ এখনও বন্যপশুর ন্যায় বনেজঙ্গলেই রয়ে গেছে। আত্মার খাদ্য ভাত-মাছ বা দুধ-মাংস থেকে আসে না,সে খাদ্যটি আসে মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদ্ত্ত জ্ঞান থেকে। মানব শিশুকে মানব রূপে বেড়ে উঠাটি নিশ্চিত করতেই মহান আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। যারা মানবিক পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠতে চায় তাদের জন্য সে প্রদর্শিত পথের অনুসরণ ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ তো সেটিই। কোরআনের জ্ঞানার্জন এজন্যই ইসলামে অতি পবিত্রতম ইবাদত। একমাত্র এ পথেই মানব আল্লাহতায়ালার খলিফার মর্যাদা পায়। বাঙালী মুসলমানের এখানেই মূল রোগ। বাংলাদেশের স্কুল-কলেজের এখানেই বিশাল ব্যর্থতা। শিক্ষাব্যবস্থাকে সেক্যুলারাইজড করলে কি তা দিয়ে ছাত্রদের ঈমানদার বা মুসলমান করা যায়? আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ থেকে দূরে সরলে মুসলমান হওয়া দূরে থকা, মানব রূপে বেড়ে উঠাও যে কতটা অসম্ভব হয় তার প্রমাণ তো আজকের বাংলাদেশ।

 

দেহের ন্যায় আত্মার স্রষ্টাও তো মহান আল্লাহতায়ালা। ফলে কিসে সে আত্মার পুষ্টি ও রোগমূক্তি সেটি মহান আল্লাহতায়ালা চেয়ে আর কে ভাল জানে? ফলে প্রেসক্রিপশটিও দিয়েছেন তিনিই। সে প্রেসক্রিপশনটি মানুষের কাছে পৌঁছাতেই  ফেরেশতাদের মাধ্যমে ধর্মগ্রন্থ নাযিল করেছেন। পবিত্র কোরআন হলো মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশেষ প্রেসক্রিপশন।এ প্রেসক্রিপশনে রয়েছে রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক,নৈতিক,অর্থনৈতিক ও আধ্যাত্মীক রোগসহ যাবতীয় রোগের চিকিৎসা।এ প্রেসক্রিপশনটি মহাপ্রজ্ঞাময় জ্ঞানের। এ কোরআনী জ্ঞান ছাড়া মানবজাতির কখনোই মিথ্যামুক্তি ঘটার কথা নয়। তাই ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো সে প্রেসক্রিপশনের জ্ঞানলাভ। কোরআনী জ্ঞানলাভের সে ইবাদতটি সঠিক না হলে অন্যান্য ইবাদতও সঠিক হওয়ার কথা নয়। ইসলামের সর্বশেষ রাসূল মহান নবীজী(সাঃ) ছিলেন মহাজ্ঞানী। তাঁর অর্জিত জ্ঞানের উৎস্যটি ছিল পবিত্র কোরআন। সে জ্ঞান বলেই তিনি মাত্র ২৩ বছরে পত্তন ঘটিয়েছেন মানব ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার। সে কোরআনী জ্ঞানদানকে অনিবার্য করতেই নবীজী (সাঃ)কে সুরা মুজাম্মেলে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল রাতের অর্ধেক বা তার চেয়ে কিছু কম সময় ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে কোরআন তেলাওয়াতের। কোরআনী জ্ঞানার্জনের সে ফরযটি শুধু নবীজীর উপর নয়,প্রতিটি ঈমানদারদের উপরও ফরয। ইসলামের শুরুতে নামায-রোযা,হজ-যাকাতের ন্যায় ফরয ইবাদত ছিল না। তখন শ্রেষ্ঠ ইবাদত ছিল পবিত্র কোরআন পাঠ। এবং সেটি হতো রাতের দীর্ঘভাগ জুড়ে। তাদের রুহ বা আত্মা তখন পুষ্টি পেয়েছে কোরআনী জ্ঞান থেকে। ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে গর্বের ও সবচেয়ে সবল চরিত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ গড়ে উঠেছে তো সে মক্কী আমলেই। তার মূলে ছিল এই কোরআনী জ্ঞান।

 

যে মহাপাপ কোরআনের জ্ঞানে অজ্ঞ থাকায়

কোরআনের জ্ঞানার্জনের কাজটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ,তেমনি বিশাল। মানব এ জীবনে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ দ্বিতীয়টি নেই।অতিশয় এ বিশাল কাজটি কি অবসরের ফাঁকে বিশেষ কিছু আয়াত,কিছু হাদীস বা কিছু ফিকহী মসলা পাঠে সম্ভব? জুম্মার দিনে আধা ঘন্টা খোতবা শুনে বা মাঝে মধ্যে তাফসির মহলে হাজিরা দিয়ে কি জ্ঞানার্জনের এ বিশাল কাজ সমাধা হয়? একাজে ব্যয় করতে হয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়,শ্রম ও মেধা। সে কোরআনী জ্ঞান লাখে মেধা, সময় ও সামর্থের নিবীড় বিনিয়োগ না হলে ডাক্তার,ইঞ্জিনীয়ার,বিজ্ঞানী বা ব্যবসায়ী রূপে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব হলেও অসম্ভব হয় সত্যিকার মুসলমান হওয়া। ব্যক্তির জীবনে সবচেয়ে বড় পাপটি হলো কোরআনের জ্ঞানে অজ্ঞ থাকা। এ পাপ থেকে আরো বড় বড় পাপের জন্ম হয়। অর্থ না বুঝে বার বার কোরআন খতম করায় কি জ্ঞানার্জনের ফরজ আদায় হয়? হয় কি পাপমুক্তি? জ্ঞানের বানী যত মহামূল্যবানই হোক,অর্থ না বুঝায় ফলাফলটি তো শুণ্য।ফলে কোরআন থেকে একজন মুর্খ মানুষের অর্জন তো শূণ্যের কোঠায়। তখন মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ এ দান থেকে এমন মুর্খ ব্যক্তি আদৌ লাভবান হতে পারে না। অথচ কোরআন নাযিলের মূল উদ্দেশ্য তো এটাই, মানুষ এ গ্রন্থ থেকে লাভবান হবে এবং তার খলিফা রূপে দায়িত্ব পালন করবে। মহান আল্লাহর কাছে এজন্যই অতি অপছন্দের কাজ হলো,অর্থ না বুঝে কোরআন তেলাওয়াত। মদ যখন হারাম ছিল না তখন অনেকেই মাতাল অবস্থায় নামাযে দাঁড়াতো। ফলে তারা বুঝতেই পারতো না,নামাযে দাঁড়িয়ে কি তেলাওয়াত করছে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সেটি পছন্দ হয়নি। তাই নিষেধ করে দিলেন,মাতাল অবস্থায় কেউ যেন নামাযে না দাঁড়ায়। মদ আজ  হারাম, ফলে মাতাল অবস্থায় কেউ মসজিদে আসে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো,মদ খেয়ে মাতলা না হয়েই বা ক’জন মুসলিম নামাযে তেলাওয়াত করা পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলো বুঝতে পারে? কোটি কোটি মুসলমানের এরূপ মুর্খতায় কি মহান আল্লাহতায়ালা আদৌ খুশি হতে পারেন?

 

কোরআনের আয়াত না বুঝে নামায আদায়ে মহান আল্লাহতায়ালা যে খুশি হন না সেটি মিশর,সূদান,মরক্কো,তিউনিসিয়া,আলজিরিয়া,লিবিয়া,সিরিয়া,ইরাকের মুসলমানগণ ১৪শত বছর পূর্বেই বুঝতে পেরেছিল। ফলে মহান আল্লাহতায়ালঅকে খুশি করতে তারা নিজ নিজ মাতৃভাষাকে দাফন করে কোরআনের ভাষাকে আপন ভাষা রূপে গ্রহণ করেছিলেন। আজকের আরবদের ব্যর্থতার কারণ,তারা আরবী ভাষাকে ব্যবহার করছে বটে,কিন্তু ছেড়ে দিয়েছে কোরআন থেকে শিক্ষা নেয়াটি। অপরদিকে বাঙালী মুসলমানদের ব্যর্থতার কারণ,কোরআন থেকে তারা শিক্ষা নিতে চাইলেও কোরআন বুঝার সামর্থটি তাদের নাই। ইংরেজী ভাষাসহ বিশ্বের নানা ভাষা শিখলেও কোরআনের ভাষা শেখাকে তারা সীমিত রেখেছে কায়দা পাঠ ও অর্থ না বুঝে কোরআন তেলাওয়াতের মাঝে। এতে কি জ্ঞানার্জনের ফরয আদায় হয়? তারা ব্যর্থ হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান পবিত্র কোরআন থেকে আত্মায় পুষ্টি জোগাতে।ফলে মারা পড়ছে তাদের বিবেক। কোরআনের সাথে এরূপ আচরনে মহান আল্লাহতায়ালা কি খুশি হবেন? মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদটি তেল,গ্যাস,স্বর্ণ বা মনিমুক্তা নয়,সেটি হলো পবিত্র কোরআন। এই কোরআনের বরকতেই মুসলমানগণ অতীতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা গড়তে পেরেছিল।অথচ কোরআন না বুঝা এবং কোরআন থেকে শিক্ষা না নেয়ার কারণে মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ এ দানটি থেকে আজ তারা কোনরূপ লাভবানই হতে পারছে না। ফলে বাঙালী মুসলিম চরিত্রে জ্ঞানের চেয়ে অজ্ঞতা ও মুর্খতার প্রতিফলনই হচ্ছে বেশী। নামাযী বা রোযাদার হয়েও তারা ব্যর্থ হচ্ছে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠতে।

 

প্রজেক্ট মানবপশু উৎপাদনের!

বিপদের আরো কারণ,বাংলাদেশে সেক্যুলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ হয়েছে মানবশিশুদের ইসলাম থেকে দূরে সরানো।আর যারা ইসলাম থেকে দূরে সরে তারা তো আর মানুষ থাকে না।  মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে গবাদী পশুর চেয়েও অধম বলেছেন।তাদের নিয়ে পবিত্র কোরআনের বর্ণনাটি হলো “উলায়েকা কা’আল আনয়াম,বালহুম আদাল” অর্থঃ “তারাই হলো গবাদীর পশুর ন্যায়,বরং তার চেয়েও ইতর”। মহান আল্লাহতায়ালার এ সংজ্ঞায়ন নিয়ে কি কোন সন্দেহ করা চলে? আর সামান্যতম সন্দেহ জাগলে সে ব্যক্তি অর মুসলমান থাকে? মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালার বর্ণনা যে কত নির্ভূল তা এ বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ নিজেরাই প্রমাণ করেছে। লক্ষ লক্ষ সেক্যুলারিস্টদের স্থলে বাংলাদেশে যদি বহু কোটি গরু-ছাগলও জন্ম নিতো তবে কি নির্বাচনের নামে তাদের হাতে ভোট ডাকাতি হতো? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে কি নারীদের শাড়ী খুলে শ্লীলতাহানি করা হতো? নেমে আসতো বাকশালী স্বৈরাচার? অনুষ্ঠিত হতো কি শাপলা চত্বরের গণহত্যা? দেশ কি দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ান হতো?

 

শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে বাংলাদেশে সেক্যুলারিস্ট স্বৈরাচারিদের প্রজেক্ট হলো মানব শিশুদের মানবরূপী পশু রূপে গড়ে তোলা। এতে ফল দাঁড়িয়েছে,যে বাঙালী বালকটি বড় জোর গ্রামের পথে দাঁড়িয়ে মেয়েদের লক্ষ্য করে অঙ্গভঙ্গি করতো সে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে বলাৎকারে নেমেছে।কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে না ঢুকলে যে শিশুটি বড় জোর ছিঁচকে চোর হতো সে এখন মন্ত্রী, এমপি বা রাজনৈতিক নেতাকর্মী হয়ে ভয়ংকর ডাকাত হয়েছে। অফিসার হয়ে সে এখন মানুষের পকেটে হাত দেয়। ছাত্র রাজনীতির নামে সে এখন ক্যাম্পাসে পিস্তল বা রাইফেল উঁচিয়ে চলাফেরা করে। সে এখন ব্যাংক,শেয়ার মার্কেট,সরকারি টেন্ডার ও বিশ্বব্যাংকের তহবিল লুন্ঠনের সাহস পায়। এদের কারণেই বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে। যখন দেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ ছিল না তখনো কি এমন চারিত্রিক পতন ঘটেছে? এরূপ দুর্বৃত্ত ডাকাতদের থেকে অর্থ বাঁচাতে বিশ্বব্যাংক গুটিয়ে নিয়েছে তাদের পদ্মা সেতু প্রকল্প।এ চোর-ডাকাতদের হাত থেকে বিশ্বব্যাংক বাঁচলেও বাংলাদেশ বাঁচেনি। ফলে যে পদ্মা সেতুটি এতদিনে নির্মিত হয়ে যেত ও যার উপর দিয়ে ইতিমধ্যে গাড়ি চলাচল শুরু হতো -তা এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে।স্বৈরাচারি সরকার সবসময়ই নিজ স্বৈরাচারের আয়ু বাড়াতে এরূপ চোর-ডাকাতদের প্রটেকশন দেয়। তারা তো ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সৈনিক। ফলে ব্যাংক,সরকারি প্রকল্প,রাজস্বভান্ডার ও শেয়ার মার্কেট থেকে হাজার হাজার কোটি লুন্ঠিত হলেও এ অবধি সংশ্লিষ্ঠ চোর-ডাকাতদের কেউ গ্রেফতার হয়নি,কারো কোন শাস্তিও হয়নি। ফলে সাহস বেড়েছে দুর্বৃত্তদের।যে ইতর কীটগুলো স্কুলের বা কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে মেয়েদের উদ্দেশ্যে অশ্লীল কটুক্তি করতো,তারা এখন সে অসভ্যতার মাঝে নিজেদের কুকর্মকে সীমিত রাখতে রাজী নয়।এতদিন যে পাপাচার দেশের আনাচে কানাচে গড়ে উঠা পতিতালয়গুলোতে সীমিত ছিল,সেগুলিকে সেখানে সীমিত রাখতে তারা রাজী নয়।তারা সেটিকে নামিয়ে আনতে চায় লোকালয়ে।

 

ঈমানদারগণ কি আঙ্গুল চুষবে?

দেশীয় বাজারে যৌন-উত্তেজনা সৃষ্টিকারি সাহিত্য যেমন প্রচুর তেমনি ফিল্ম-ভিডিও বিস্তর। এবং ঘরে ঘরে ইন্টারনেট খুলে দিয়েছে যৌনতার নতুন দিগন্ত। যৌন ক্ষুধা মেটাতে পাশ্চাত্যে গড়ে উঠেছে ফ্রিসেক্স ও বিশাল সেক্স ইন্ডাস্ট্রী। গড়ে উঠেছে বহু বিলিয়ন ডলারের সেক্স ট্যুরিজম।সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি সেখানে স্কুল-কলেজে বিপুল সংখ্যায় কনডম বিলায়। ব্যাভিচার সেখানে কোন অপরাধ নয়। কিন্তু বাংলাদেশে সে সুযোগ সীমিত। অথচ যৌনক্ষুধায় বৃদ্ধি আনা হয়েছে অতি প্রকট ভাবে। দেশের পতিতালয়গুলো তাদের চাহিদা মেটাতে পারছে না। ফলে ক্ষুধার্ত দুর্বৃত্তরা এখন নারীদেহ খুঁজছে রাজপথে ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। ফলে সুযোগ পেলেই বাসে,রাস্তায় বা পার্কে নারীদের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের রাজপথ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এরূপ ক্ষুধার্ত পশুদের সংখ্যা যে কীরূপ তা কি এখনো বুঝতে বাঁকি আছে? ফলে নিরাপত্তাহীন বাড়ছে মহিলাদের জীবনে। তাই দেশে রাজনৈতিক বিপর্যয়,সন্ত্রাস ও অরাজকতার সাথে সুনামীর ন্যায় ধেয়ে আসছে সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ও।

 

বাংলাদেশের মুসলমানদের এমন চারিত্রিক বিপর্যয়ে ইসলামচ্যুত সেক্যুলারিস্টগণ যে উৎসব মুখর হবে এবং আনন্দে ডুগডুগি বাজাবে সেটিই তো স্বাভাবিক। প্রচন্ড খুশি হবে ভারতসহ কাফের-শাসিত রাষ্ট্রগুলিও। কারণ,তারা তো সেটিই চায়।তারা তো বিক্ষুব্ধ হয় মুসলিম শিশুদের ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার নিয়ে বেড়ে উঠাতে।সেরূপ বেড়ে উঠাকে তারা মৌলবাদি সন্ত্রাস বলে।মহিলাদের হিজাবের মধ্যেও তারা জিহাদী জঙ্গিবাদ দেখে। হিজাব হলো মুসলিম মহিলাদের প্রতিরক্ষা-বাংকার। এটি হলো ঈমানের প্রকাশ। বেপর্দাগী হলো মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা।হিজাবের বাংকারে থেকে মহিলাগণ যুদ্ধ করে শয়তানি সংস্কৃতির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। হিজাব খুলে ফেলা মানে শত্রুর হামলার মুখে নিজেকে প্রতিরক্ষাহীন করা। বাংলাদেশে শ্লীলতাহানীর বেশী শিকার হচ্ছে বাংকার থেকে বেরিয়ে আসা বেপর্দা নারীগণ।

 

বাংলাদেশের সামনে এখন ভয়ানক দুর্যোগ। সেটি স্রেফ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নয়, বরং আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে বড় জোর দুঃখ বাড়ে, কিন্তু তাতে দেশ ও দেশের সংস্কৃতি ধ্বংস বা বিলুপ্ত হয় না। কিন্তু আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ে শুধু দেশের অস্তিত্বই বিপন্ন হয় না,তাতে সংকটে পড়ে জনগণের নিজ ধর্ম নিয়ে বেঁচে থাকাটি। তখন বিপদ বাড়ে আখেরাতে। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের যারা শত্রু এবং বিদেশী শত্রু শক্তির যারা সেবাদাস -তারা তো সেটিই চাইবে। প্রশ্ন হলো,যাদের মাঝে এখনো ঈমানের আলো অবশিষ্ঠ আছে এবং নিজেদেরকে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে ভাবে,মুসলিম উম্মাহর এ বিপদ কালে তারা কি বসে বসে আঙ্গুল চুষবে? এ বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠিকে কি তারা ফিরিয়ে নিবে না রোগমূক্তির পথে? রোগমুক্তির সে পথটি তো হলো কোরআনী জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ায় এবং পবিত্র কোরআনে প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকীমে পথ চলায়।একমাত্র এ পথেই তো জান্নাত জুটে।নইলে জাহান্নাম যে অনিবার্য তা নিয়েও কি কোন সন্দেহ আছে? কথা হলো,নিজ দেশবাসীকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচানোর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ইবাদতই বা আর কি হতে পারে? ০২/০৫/২০১৫



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.