বাংলাদেশে সেকুলারিষ্টদের অপরাধ Print
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 02 January 2010 08:10

অপরাধ বীভৎস ও বহুমুখি
বাংলাদেশে সেকুলারিষ্টদের অপরাধ অনেক। সবচেয়ে বড় অপরাধঃ নিরেট মিথ্যাচার। সেটি অতি বিচিত্র ও বীভৎসভাবে। দ্বিতীয় অপরাধঃ মুসলমানদের বিপুল সম্পদহানী, প্রাণহানী, শক্তিহানী ও ইজ্জতহানী। বাংলাদেশকে তারা তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি বানিয়ে ছেড়েছে। তৃতীয় অপরাধঃ দুর্বৃত্তির সীমাহীন প্রসার। এবং চতুর্থ অপরাধঃ স্বাধীনতার মুখোশ পড়িয়ে দেশটিকে একনিষ্ঠ গোলামে পরিণত করেছে ভারতের। বিশ্বের প্রায় দুই শত দেশকে পর পর ৫ বার হারিয়ে বাংলাদেশ যে দুর্বৃত্তিতে শিরোপা পেল সেটিও এই সেকুলারিষ্টদের একক অবদান। দূর্নীতিকে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে ব্যবহার করেছে দেশের রাজনীতি, পুলিশ, প্রশাসন, সেনাবাহিনী, শিক্ষাব্যবস্থাকে। আগামী হাজারো বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশ আর কোন গৌরব নিয়ে না হোক অন্ততঃ এ অর্জন নিয়ে বিশ্ববাসীর স্মৃতিতে প্রবলভাবে বেঁচে থাকবে। আজ পার পেলেও এ অপরাধ নিয়ে শত বছর পরও বাংলাদেশের মাটিতে অবশ্যই বিচার বসবে। আগামী দিনের প্রজন্ম অবশ্যই প্রশ্ন তুলবে, “আমাদের পূর্বপুরুষগণ কি এতটাই অযোগ্য ও অপদার্থ ছিল যে এমন দুর্বৃত্তদেরও মাথায় তুলেছিল?”

 

অবাক বিস্ময়ে আগামী বংশধরেরা এ প্রশ্নও তুলবে, এসব দুর্বৃত্তদের তারা আবার বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছে! নেতা বলে মাথায়ও তুলেছে! তবে অপমান শুধু দেশের অতীত এবং বর্তমানকে নিয়ে নয়, ভয়াবহ দূর্দীন সামনেও। কারণ, এ বিপর্যয়কে ভবিষ্যতে আরো ভয়ানক করার প্রস্তুতি তাদের বিশাল। দেশটির ড্রাইভিং সিটে এখন তারাই। বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানের উপর তাদেরই পুরা দখলদারি। আর বুদ্ধিব্যক্তির ময়দানটি যাদের দখলে যায় তারাই দখলে নেয় দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতি। পাল্টে যায় তখন সাধারণ মানুষের ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধ। ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন তার মগজ, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তেমনি হলো বুদ্ধিজীবীগণ। হাত-পা ও দেহের অন্য অঙ্গগুলো যেমন মগজ থেকে নির্দেশ পায়, তেমনি দেশের রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও প্রশাসন নির্দেশনা পায় বুদ্ধিজীবীদের থেকে। ফলে রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে দুর্বৃত্তি ঢুকলে দুর্বৃত্তিতে শিরোপা পাওয়াটিই অতিসহজ হয়ে যায়। তখন আযাব আসতেও দেরী হয় না। দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের যে ভয়ানক বিপর্যয় সে জন্য দায়ী কি দেশের ভূ-প্রকৃতি বা জলবায়ু? দায়ী কি সাধারণ মানুষ? দেশের উপর তাদের দখলদারি তো সামান্যই। একজন বেহুশ, বিভ্রান্ত বা উদভ্রান্ত মানুষকে দেখে নিশ্চিত বলা যায়, লোকটির মাথা ঠিক নাই। তেমনি দেশের রাজনৈতিক বা নৈতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেও। তখনও নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, দেশের বুদ্ধিজীবীরা সঠিক পথে নেই।

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, পুলিশ, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর উপর সেকুলারিষ্টদের দখলদারি নিছক একাত্তর থেকে নয়, বরং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই। তবে এর আগেও যে তারা ছিল না তা নয়। তবে তাদের জোয়ার বইতে শুরু করে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর। প্যান-ইসলামিক চেতনার জোয়ারের দিন তখন শেষ হয় এবং শুরু হয় লাগাতর ভাটা। আজও সে ভাটার টান শেষ হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ইসলামি চেতনার পক্ষের বুদ্ধিজীবীরা ভেবেছিল, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে এবার গণিমতের মালে ভাগ বসাবার পালা। তারা ভূ্লেই গিয়েছিল বা তাদের অজানা ছিল, বুদ্ধিবৃত্তির লড়াই কখনো শেষ হয়না। সীমান্তের লড়াই আপাত শেষ হলেও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চলে অবিরাম। বরং রুঢ় বাস্তবতা হলো, বিশ্বসংসারে যুদ্ধ কখনই শেষ হয় না। সাময়িক হার-জিতের পর নীরবে আরেকটি যুদ্ধের প্রস্তুতি চলে মাত্র। এজন্যই যুদ্ধ শেষে কোন দেশেই সেনাসদস্যদের ঘরে পাঠানো হয়না। রাষ্ট্রীয় বাজেটের বিশাল অংশ ব্যয় হয় আরেক যুদ্ধের প্রস্তুত নিতে। আর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইটি প্রতিদিন চলে সৈনিক প্রতিপালনে মনবল, নৈতিক বল ও আর্থিক বল জোগানের কাজে। তাই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে পরাজিত হলে রণাঙ্গণে স্বপক্ষে সৈনিক পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। একাত্তরে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছিল। তখন কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে যে সব বাঙালী সৈনিকেরা পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় লড়াই করবে বলে কসম খেয়েছিল এবং বহুকোটি টাকা ব্যয়ের প্রশিক্ষণ নিয়েছিল, তাদেরই অনেকে সে চেতনার সাথে সেদিন গাদ্দারী করেছিল। পাকিস্তানী সহযোদ্ধাদের খুন করতে পেরে তারা ততটাই খুশী হয়েছিল যেমন একজন ভারতীয় কাফের সৈনিক হয়ে থাকে। অথচ ১৯৪৮ বা ১৯৬৫ সালে সেটি অভাবনীয় ছিল। তাই একাত্তরে পাকিস্তানের পরাজয়টি যতটা না ছিল সামরিক, তার চেয়ে অনেকগুণ বেশী ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক। সেকুলারিষ্টদের হাতে ইসলামপন্থিদের একই রূপ পরাজয় এসেছিল আরব ভূমিতে ও তুরস্কে। সে পরাজয়ের ফলে নির্মূল হয়েছে ওসমানিয়া খেলাফত। ব্রিটিশ সৈনিকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এসব সেকুলারিষ্টরা সেদিন হাজার হাজার মুসলিম হত্যা করেছে। এমনকি মক্কার পবিত্র ভূমিতেও। অখন্ড আরব ভূমিতে তারা জন্ম দিয়েছে বিশটিরও বেশী রাষ্ট্রের। আর এভাবেই সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে যোগসাজসে বিলুপ্ত করে দিয়েছে সে আমলের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের। একাত্তরে তারা বিলুপ্ত করে তৎকালের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে। ফলে মুসলিম উম্মাহর শক্তিহানী করার মিশনে তাদের সফলতা বিশাল। আর তাদের বর্তমান মিশন, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে লাগাতর শত্রুশক্তির পদতলে রাখা। আজকের বাংলাদেশ তারই শিকার।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন পড়েনি, প্রয়োজন হয়েছিল প্রকান্ড এক বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের। লড়াইটি ছিল সেকুলারিজমের সাথে প্যান-ইসলামিক চেতনার। ভারতবর্ষে তখন জাতীয়তাবদী সেকুলার দর্শনের পতাকাবাহী ছিল কংগ্রেস। কংগ্রেস হিন্দু-মুসলিম মিলে অখন্ড ভারত প্রতিষ্ঠার ডাক দেয়। কিন্তু মুসলমানের কাছে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই বড় কথা নয়। কলকারখানা গড়া ও রাস্তাঘাট নির্মাণও বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, সে রাষ্ট্রে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও মুসলমানের ইহলৌকিক কল্যাণের পাশাপাশি পরকালীন কল্যাণের পথপ্রাপ্তিও সহজ হতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলিমদের সাথে মিলে রাষ্ট্র গড়লে সংখ্যালঘু মুসলমানদের সে সুযোগ থাকে না। ১৯৪৭এ পৃথক পাকিস্তান নির্মানের প্রয়োজনীয়তা এতটা প্রকট রূপ নেয় তো একারণেই। ভারতীয় হিন্দুরা বুঝতে ভূল করেনি, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেলে সেটি হবে সমগ্র বিশ্বে সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। তাতে ভারতীয় মুসলমানেরা আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে। তাই ভারত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে শুরু থেকেই মেনে নিতে পারেনি। মেনে নিতে রাজী ছিল না ব্রিটিশ সরকারও। কিন্তু উপমহাদেশের মুসলমানেরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার চেতনায় এতটাই উজ্জিবীত হয়েছিল যে সে দাবী মেনে না নিলে বিশাল রক্তক্ষয় লড়াই এড়ানো অসম্ভব হতো। ফলে পাকিস্তান দাবীকে মেনে নিতে বাধ্য হয়। তবে সে সময় চাপের মুখে মেনে নিলেও পাকিস্তানের ভবিষ্যতকে বিপন্ন করতে কোন সুযোগই ভারত হাতছাড়া করেনি। বরং লাগাতর আঘাত হানতে শুরু করে পাকিস্তানের আদর্শিক ভিত্তির উপর তথা প্যান-ইসলামিক দর্শনের উপর। বুদ্ধিবৃত্তিক সে লড়াইয়ে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করে সেকুলারিজমকে।

সেকুলারিষ্টদের মূল এজেন্ডা

সেকুলারিজমের আভিধানিক অর্থ পার্থিবতা। অর্থাৎ দুনিয়াবী জীবনের কল্যাণ নিয়ে ভাবা, কাজ-কর্ম করা এবং রাজনীতি করা। এবং সে সাথে অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও ভূগোল নির্মাণ করা। সেরূপ পার্থিব স্বার্থচেতনা থেকেই সেকুলারিজমের গর্ভ থেকে জন্ম হয় সমাজতন্ত্র, কম্যিউনিজম, জাতিয়তাবাদসহ নানাবিধ মতবাদের। আর এখানেই সেকুলারিজমের সাথে ইসলামের লড়াই। কোরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা হলো, শুধু ধর্ম-কর্ম নয়, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, যুদ্ধ-বিগ্রহ, এমন কি রাষ্ট্র নির্মানের প্রেরণা আসতে হবে পরকালীন জীবনে কল্যাণ লাভের আগ্রহ থেকে। তাই মুসলমানের রাজনীতি, অর্থনীতি বা শিক্ষা-সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রে ইসলামের প্রতিষ্ঠা কতটুকু বাড়লো এবং মুসলমানের পার্থিব কল্যাণের পাশাপাশি পরকালীন সাফল্যই বা কতটুকু অর্জিত হলো সেগুলো। নিজেদের জন্য যদি সে কল্যাণ অর্জন অসম্ভব হয়ে উঠে তবে অন্য মুসলমান ভাইদের জন্য অন্ততঃ সে মহাকল্যাণটি মনেপ্রাণে আশা করবে। প্রয়োজনে তাদের কল্যাণে কোরবানীও দিবে। এমন এক নিরেট ইসলামি চেতনা থেকেই পশ্চিম বাংলা, বিহার, উত্তর-প্রদেশ, মধ্য-প্রদেশ, বোম্বাই, গুজরাত, রাজস্থান, আসামসহ অন্যান্য প্রদেশের মুসলমানেরা পাকিস্তানের সমর্থন করেছিল। তারা জানতো, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের নিজেদের লাভ হবে না। কিন্তু তারা এটিও জানতো, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেলে তাতে প্রচন্ড লাভ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর। এতে জন্ম নিবে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের। মুসলিম উম্মাহ তাতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হবে, অন্ততঃ উপমহাদেশে। মুসলিম উম্মাহর এমন এক স্বার্থ চেতনায় তারা এতটাই উদ্বুদ্ধ হয়েছিল যে, পাকিস্তানের দাবীতে কোলকাতা, বোম্বে, মাদ্রাজ, দিল্লি, এলাহাবাদ, পাটনার মত শহরে তারা বিপুল সংখ্যায় রাজপথে নেমে আসে। অথচ তারা জানতো, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে এসব শহরে অবস্থিত তাদের পৈত্রিক ঘরবাড়ী, ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে পাকিস্তানের অজানা শহরের ছিন্নমূল উদ্বাস্তুর জীবন গ্রহণ করতে হবে। পাকিস্তান দাবীর প্রতি একাত্ম ঘোষণার কারণেই বিহারের হাজার হাজার মুসলমানদেরকে উগ্র হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। শত শত মুসলিম নারীকে ধর্ষিতও হতে হয়েছে।

কিন্তু  রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে ইসলাম কি বলে, কোরআন কি বিধান দেয়, নবীজী (সাঃ) কি শিখিয়ে গেলেন, -সেটি নিয়ে সেকুলারদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। আগ্রহ নেই সেটি জানা নিয়েও। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও ভূগোলের নির্মাণে ইসলামের কোন প্রভাবকে তারা মানতে রাজী নয়। ধর্মের কর্মসীমাকে তারা জায়নামাযে সীমিত করতে চায়। এক্ষেত্রে তাদের চেতনা কংগ্রেসী হিন্দুদের খেকে অভিন্ন। এজন্যই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সৃষ্টি সেকুলারিষ্টদের কাছে অনাসৃষ্টি মনে হয়েছে। ইসলাম উপমহাদেশের ভূগোল ও রাজনীতি পাল্টাতে এতবড় ভূমিকা রাখবে সেটিকে তারা ভাবতে পারেনি। মেনে নিতেও পারেনি। তাই শুরু থেকেই সেকুলার বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের মিত্র হতে পারেনি। বরং সব সময়ই সুযোগের সন্ধানে ছিল এ দেশটির বিনাশে। তাই শেখ মুজিব পাকিস্তানের জেল থেকে বেরিয়ে এসে ১০ই জানুয়ারি সহরোওয়ার্দী ময়দানে যখন বললেন, “বাংলাদেশ স্বাধীন করার কাজ একাত্তর থেকে নয়, শুরু করেছিলাম সাতচল্লিশ থেকে” তখন তিনি মিথ্যা বলেননি। চিন্তা-চেতনা ও মতবাদের বিশেষ বৈশিষ্ট, ভৌগলিক সীমান্ত মানে না। তাই কোন মতবাদের অনুসারিগণ শুধু দেশেই নয়, প্রতিবেশী দেশে, এমনকি বহু হাজার মাইল দূরেও সতীর্থ বন্ধু পেয়ে যায়। এজন্যই বাংলাদেশের সেকুলারেরা ঘনিষ্ট বন্ধু পেয়ে যায় ভারতে এবং আরো বহু দেশে। তাদের সাথে গড়ে উঠে তাদের রাজনৈতিক মিত্রতা ও সামরিক সহযোগিতাও। সে মিত্রতাই তাদেরকে ১৯৭১য়ে ভারতীয় সৈনিকদের সাথে একই রণাঙ্গণে হাজির করে এবং সেটি একটি মুসলিম দেশের বিনাশে।

মুসলমান হওয়ার অর্থ, জীবনের প্রতি পদে কোরআনী রোডম্যাপের অনুসরণ। সেটি যেমন নামায-রোযার ক্ষেত্রে, তেমনি রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও আইন-আদালতের ক্ষেত্রে। আল্লাহর কোন বিধানকে কি অমান্য করা যায়? কিন্তু সেকুলারিষ্টগণ ইসলামের এমন পূর্ণাঙ্গ অনুসরণে রাজী নয়। তারা রাজনীতি-সংস্কৃতি-অর্থনীতি-আইন-আদালতসহ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোকে আল্লাহর বিধানমুক্ত রাখতে চায়। তাদের যুক্তি, এগুলো পার্থিব বিষয়, ধর্ম ও পরকালের ভাবনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। তাদের লক্ষ্য, পার্থিব এ ক্ষেত্রগুলোতে নিজেদের নিরংকুশ দখলদারিত্ব। ইসলামপন্থিদের সাথে সেকুলারিষ্টদের মূল বিবাদ এখানেই। বাংলাদেশে এ বিবাদের শুরু পাকিস্তান আমলের শুরু থেকেই। বাংলাদেশের এমন সেকুলার দর্শনের অন্যতম গুরু ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা এবং সে সাথে কলামিষ্ট। সেকুলারিজমের পক্ষে তিনি বহু লিখেছেন। এক সময় তিনি পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রী ছিলেন। তাঁর বক্তব্য, “যারা ধর্মকে রাজনীতি সাথে একীভূত করতে চায় তারা নতুন কিছু বলে না। মানবসভ্যতার শুরু থেকে দুটোই একীভূত ছিল। যুগের দাবী ও যুগের অভিজ্ঞতা দুটোকে আলাদা করতে শেখায়। মানুষের কল্যাণ ও ধর্মের কল্যাণের স্বার্থেই দুটো পৃথক। -(ধর্ম ও রাষ্ট্র আলাদা কীরূপে? দৈনিক ইত্তেফাক, ১লা ফেব্রেয়ারি ১৯৭০) ধর্ম ও রাজনীতি সভ্যতার শুরু থেকে যে একীভূত ছিল - আবুল মনসুর আহমদের সেটা অজানা ছিল না। তিনি জানতেন, নবীদের আমলেও সেটি ছিল। হযরত দাউদ (আঃ) ও সুলাইমান (আঃ) একাধারে যেমন নবী ছিলেন, তেমনি শাসকও ছিলেন। হযরত মুহম্মদ (সাঃ) নিজে রাসূল ছিলেন, আবার শাসকও ছিলেন। নবী-জীবনের বড় সূন্নত হল এটি। সাহাবাগণ সে সূন্নতের আজীবন অনুসরণ করে গেছেন। ঈমানদারদের জন্য সর্বকালে ও সর্বস্থানে সেটি অনুকরণীয়। কিন্তু আবুল মনসুর আহমদদের দাবী, ধর্ম ও রাজনীতি -এ দুটোকে অবশ্যই পৃথক করতে হবে। কারণ, যুগের অভিজ্ঞতা নাকি সেটাই শেখায়। তাঁর কাছে যুগের অভিজ্ঞতাই গুরুত্বপূর্ণ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শিক্ষা নয়। ধর্ম ও রাজনীতির এমন বিভক্তিকে তিনি মানুষের জন্য ও ধর্মের জন্য কল্যাণকর বলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নবীগণ রাজনীতি ও ধর্মকে একীভূত করে কোন অকল্যাণটি করেছেন? সে বিবরণ তিনি দেননি। প্রশ্ন হলো, যুগের দাবী ও যুগের অভিজ্ঞতা বলতে তিনি কি বুঝিয়েছেন? যুগ কি নিজে কথা বলতে বা দাবী জানাতে জানে? কোন একটি যুগে বাস করে নানা জাতের ও নানা মতের বিভিন্ন মানুষ। সেখানে পাপাচারি কাফের-মুনাফিক যেমন থাকে, তেমনি ঈমানদার মুসলমানও থাকে। নিছক কাফের বা বেঈমানদের দাবীকে কি যুগের দাবী বলা যায়? তাদের অভিজ্ঞতাকে কি যুগের অভিজ্ঞতা বলতে চান? পাশ্চাত্যের নাস্তিক পাপাচারি বা ভারতের কাফেরগণ যা বলছে আবুল মনসুর আহমদ সেটিকেই যুগের দাবী বলেছেন। তাদের অভিজ্ঞতাকে বলছেন যুগের অভিজ্ঞতা। আর তাদের পক্ষে ওকালতি করতে গিয়ে জনাব আবুল মনসুর আহমদ ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে আস্তাকুঁড়ে ফেলতে বলছেন।

যে বিদ্রোহ আল্লাহর বিরুদ্ধে

মুসলমানের কল্যাণ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-প্রদত্ত বিধানের অনুসরণে। এটি ঈমানী দায়বদ্ধতা। সে বিধানের বিরুদ্ধে যে কোন বিদ্রোহ বিপর্যয় ডেকে আনে। ইসলামের পরিভাষায় এমন বিদ্রোহ হলো কুফরি। অথচ আবুল মনসুর আহমদ সে বিদ্রোহে উৎসাহ জুগিয়েছেন। ইসলাম ও ইসলাম অনুসারি জনগণের বিরুদ্ধে আবুল মনসুর আহমদের মত সেকুলারিষ্টদের এটি হলো সবচেয়ে বড় অপরাধ। এমন বিদ্রোহের অপরাধে হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) অনেককে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন। তাদের অজ্ঞতা ইসলামের মূল শিক্ষা নিয়ে। ইসলামের দৃষ্টিতে পার্থিব জীবন পরকালীন জীবন থেকে পৃথক নয়, বরং সরাসরি সম্পৃক্ত। পার্থিব জীবনের প্রতি পদে কোরআনী রোডম্যাপকে কতটা অনুসরণ করা হয় তার উপরই নির্ভর করে পরকালের সফলতা। ইসলাম ব্যক্তিকে তার ধর্ম মসজিদে রেখে রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও আইন-আদালতের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নামতে শেখায় না। বরং ধর্মের প্রকাশ ঘটাতে হয় প্রতিকর্মে ও আচরণে। আর সেকুলারিষ্টদের সাথে ইসলামের মুল বিরোধ এখানেই। তাঁরা বরং উৎসাহ জুগিয়েছেন, ইসলাম যা শেখায় তার বিরুদ্ধাচারণে। তিনি যে এটিকে যুগের অভিজ্ঞতা বলেছেন, সেটিও তো আধুনিক নয়। বরং সেটি প্রাচীন যুগের অভ্যাস। প্রাচীন যুগের রাজারাও নিজেদের স্বেচ্ছাচারে ধর্মের দখলদারি মেনে নিত না।

আবুল মনসুর আহমদের যুক্তি, রাজনীতিকে ধর্ম থেকে আলাদা করার মধ্যেই মানুষের ও ধর্মের কল্যাণ। তার এ কথা নতুন নয়, এ নীতির প্রতিষ্ঠা ইউরোপে বহু বছর ধরে। ধর্মকে তারা বহু শত বছর পূর্বেই গীর্জায় আটক করেছে। ধর্মযাজকদের হাতে নিষ্ঠুরতা ঘটেছে, সেটি সত্য। ক্রসেড যুদ্ধ যে রক্তপাত ঘটিয়েছে সেটি আজও ইতিহাসে সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম বর্বরতার প্রতীক। কিন্তু সে সেকুলারিষ্টগণই বা কোন কল্যাণটি করেছে? পূর্বে মানুষ ধর্ম থেকে অনুপ্রেরণা পেত। কিন্তু সেকুলারিষ্টগণ অনুপ্রেরণা খুঁজে জাতীয়, দলীয় বা বর্ণগত স্বার্থচেতনা থেকে। সে স্বার্থচেতনা থেকেই জন্ম নেয় উগ্র জাতিয়তাবাদ, ঔপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ। অন্য ভাষা, অন্য বর্ণ ও অন্য ভূগোলের মানুষকে শ্রদ্ধা দূরে থাক, তাদেরকে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজ তখন রাজনীতির মূল উপাদানে পরিণত হয়। এমন এক তীব্র ঘৃণাবোধের কারণে ইউরোপীয় সেকুলারিষ্টদের হাতে জন্ম নেয় অবিরাম যুদ্ধবিগ্রহ, কোন কোন যুদ্ধ শত বছর ধরেও চলেছে। সর্বশেষে জন্ম দেয় দুটি বিশ্বযুদ্ধের যা ছয় থেকে সাত কোটির মানুষের মৃত্যু ঘটায়। উৎসবে পরিণত হয়েছিল মানবহত্যা, হত্যাকে ভয়ানক করতে ব্যবহার হয়েছে আণবিক বোমা। মানব জাতির ইতিহাসে এত বড় বিপর্যয় কি কোন ধর্মীয় শাসনামলে ঘটেছে? যুগে যুগে মানবের হাতে বহু অমানবিক কর্ম হয়েছে। ধর্ম নিয়ে বহু ব্যবসা পূর্বে যেমন হয়েছে, তেমনি এখনও হচ্ছে। ইসলামের আগমন তো ধর্মের নামে এরূপ অধর্ম ও রক্তপাত দূর করতে। ধর্ম যে কীরূপ মহাকল্যাণ ঘটাতে পারে তার বড় দৃষ্টান্ত নবীজী (সাঃ) ও খোলাফায়ে রাশেদা। তখন মানব তার মানবিক পরিচয়টি ফিরে পায়। শাসক তখন চাকরকে উটের পিঠে বসিয়ে টেনেছেন। মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো, ইসলামের সে গৌরবময় দিনের দিকে ফিরে যাওয়া। সেকুলারিষ্টদের পথ এজন্যই তাদের পথ হতে পারে না। ভারতীয় কংগ্রেস সে সেকুলার আদর্শ পেশ করেছিল, কিন্তু উপমহাদেশের মুসলমানেরা সেটি গ্রহণ করেনি। তখন রাজনীতি পরিচালিত হয়েছিল ধর্মীয় প্রেরণা থেকে। নইলে বাঙালী, বিহারী, পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচ কি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় কখনও এক কাতারে জমা হতে পারতো? ধর্ম ছাড়া তাদের মধ্যে আর কোন বাঁধনটি ছিল? কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর সেকুলারিষ্টরা ভাতৃত্বের সে বন্ধনটিই কাটতে শুরু করে। পাকিস্তান এবং ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের মূল দুষমনিটা প্রকাশ পায় এভাবেই। পাকিস্তানের ভবিষ্যতকে একই ভাবে বিপদাপন্ন করার লক্ষ্যে ১৯৪৭ থেকেই লিপ্ত ছিল ভারত। ফলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টদের কোয়ালিশন গড়ে উঠতে সময় লাগেনি। এবং সেটি চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছায় ১৯৭১য়ে। ফলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টদের কাছেও অতি উৎসবের ঘটনায় পরিণত হয় ১৯৭১য়ে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়াটি। কাফেরদের সাথে মিলে মুসলমানেরাও এভাবে একত্রে উৎসব করেছে, সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে এরূপ ঘটনা বিরল। মুসলমানদের উৎসব ও বিষাদের দিনগুলো কাফেরদের থেকে যুগে যুগে যেরূপ পৃথক থেকেছে একাত্তরে সেটি থাকেনি। বরং একাকার হয়ে গেছে। আর সেটি সম্ভব হয়েছে, ভারতীয় সেকুলারিষ্টদের সাথে বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টদের চেতনা একাকার হয়ে যাওয়ায়।

পাকিস্তান আমলে সেকুলারিজমের আরেক বাঙালী গুরু ছিলেন জনাব আবুল ফজল। আবুল মনসুর আহমদের মত আওয়ামী লীগের আরেক বুদ্ধিজীবী। মুজিব তাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি বানিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, “জাতীয়তা ও জাতীয় সংহতির ভিত্তি যদি ধর্ম হয় তবে মুসলিম আরব রাষ্ট্রগুলির পরিণতি অন্যরূপ হত। তাদের ধর্ম, ভাষা এবং সংস্কৃতি অভিন্ন। এরপরও তাদের মাঝে কোন একতা নাই। সেখানে রয়েছে এমন এক শত্রু রাষ্ট্রের উপস্থিতি যা তাদের সবার শত্রু কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা কেন একতাবদ্ধ হতে ব্যর্থ হয়?”-(রাজধানি বনাম জাতীয় সংহতি, দৈনিক ইত্তেফাক, ৭ই ফেব্রেয়ারি ১৯৭০)। দেখা যাক, ইসলাম সম্মন্ধে আবুল ফজলের নিজের কি ভাবনা। তিনি লিখেছেন, “ধর্ম কখনই গণতান্ত্রিক রাজনীতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। সত্যি কথা হলো, যত প্রকার রাজনীতি আছে কোন প্রকারের রাজনীতির সাথেই ধর্মের সমন্বয় সম্ভব নয়। রাজনীতি বিশেষ করে আধুনিক রাজনীতি হলো পুরাপুরি সেকুলার, কিন্তু ধর্মকে কখনই আধুনিক বা অ-আধুনিক এভাবে সংজ্ঞায়ীত করা যায় না। রাজনীতির ক্ষেত্র শুধুমাত্র পার্থিব সমস্যাগুলি নিয়ে। কিন্তু ধর্মের ক্ষেত্র ভিন্নতর। রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো, রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের কল্যাণ। তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা। ধর্ম ও রাজনীতির মিলন কখনই সম্ভব নয়।” পাকিস্তানের ইসলামিক দলগুলো নিয়ে তাঁর ধারণা হলো, “এই দলগুলোর মূল লক্ষ্য ইসলামের প্রচার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা। ধর্মকে বা ইসলামকে ব্যবহার করছে শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে।”-(ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিপদ, সমকালীন চিন্তা, আবুল ফজল)।

ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি এক হওয়া সত্ত্বেও আরবগণ যেহেতু একতাবদ্ধ নয়, সেটিকে দলীল ধরে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, মুসলমানদের সংহতির মাধ্যম ধর্ম নয়। তার কথা, ধর্ম হলে তারা কি বিভক্ত হতো? তিনি মূল রোগ ধরতেই ভূল করেছেন। রোগকেই তিনি স্বাভাবিক স্বাস্থ্য গণ্য করছেন এবং তার উপর থিসিস খাড়া করেছেন যে, ধর্ম কখনই সংহতির বৈধ ভিত্তি নয়। এক ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি হওয়া সত্ত্বেও আরবগণ যে আজ বিভক্ত এটি তো আরবদের রোগ, এটি ইসলাম নয়। রোগাগ্রস্ত আরব মুসলমানদেরকে তিনি অনুকরণীয় মডেল চরিত্র রূপে খাড়া করেছেন। বলতে চেয়েছেন, বাঙালী মুসলমানদেরও নানা ভাষা, নানা অঞ্চল ও নানা গোত্রের নামে বিভক্ত হওয়া উচিত। “এবং তোমরা আল্লাহর রশিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না” -তাদের বিভক্তি হলো আল্লাহর এ হুকুমটির বিরুদ্ধে স্পষ্ট বিদ্রোহ। এমন বিভক্তি কোন কালে কোন স্থানের মুসলমানের জন্যই অনুকরণীয় হতে পারেনা। মুসলমানদের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া নিছক রাজনীতি নয়, এটি ইবাদত। আর সে ঐক্য হতে আল্লাহর রশি তথা আল-কোরআনের শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরার মধ্য দিয়ে। তিনি লিখেছেন, “ধর্ম কখনই গণতান্ত্রিক রাজনীতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না।” ইসলামের কাছে তার এ আব্দারটাই প্রমাণ করে তিনি ইসলামের মূল বিষয়টি নিয়ে কীরূপ বিভ্রান্তির মাঝে ছিলেন। প্রশ্ন হলো, ইসলাম কেন রাজনীতির সাথে তাল মিলিয়ে চলবে? বরং ইসলাম পথ দেখাবে রাজনীতির। তাই রাজনীতিকে বরং তাল মিলিয়ে চলতে হবে ইসলামের সাথে। এটাই কি নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের শিক্ষা নয়? আবুল ফজলের আরেক যুক্তি, “রাষ্ট্রের দায়িত্ব সকল নাগরিকের কল্যাণ সাধন। তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা। প্রশ্ন হলো, খোলাফায়ে রাশেদার সময় কি মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিম বাস করতো না? বরং বাংলাদেশে শতকরা যতজন অমুসলিমের বাস তার চেয়ে বেশী হারে অমুসলিম বাস করতো খোলাফায়ে রাশেদার আমলে মুসলিম রাষ্ট্রে। লেবাননের এক তৃতীয়াংশ নাগরিক আজও অমুসলিম। মিশরের শতকরা প্রায় ১০জন খৃষ্টান। সেকালে হয়তো আরো বেশী ছিল। তাদের কল্যাণ এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তাকে কি তখন নিশ্চিত করা হয়নি? আবুল ফজলের অভিযোগ তাই সাংঘাতিক। তার এ অভিযোগ ইসলামী ন্যায়নীতি ও সভ্যতার বিরুদ্ধে এ এক চরম বিষোদগার। ইসলামের বিরুদ্ধে তার মন যে কত বিষপূর্ণ ছিল এ হলো তার নমুনা। এমন এক ইসলাম-বিদ্বেষী মনভাবের কারণেই ভারতীয় হিন্দু নেতাদের রাজনীতি তাদের কাছে আপন ও আদর্শনীয় মনে হয়। সেকুলার ভারতে আজ মসজিদে আগুন দেওয়া হচ্ছে। মুসলিম নারীদের ধর্ষণ এবং ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হচ্ছে। মুসলমানদের দোকানপাট মালামাল লুটে নেওয়া হচ্ছে এবং লুন্ঠনের পর পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদের বিনাশ রাতের আঁধারে কতিপয় দুস্কৃতকারির কাজ ছিল না। দিনে দুপুরে হাজার দুস্কৃতি সেটি উৎসব ভরে করেছে। এমন ঘটনা কি খোলাফায়ে রাশেদার সময় একদিনের জন্যও ঘটেছে? ইসলামের বিধান কি অমুসলিমদের উপর এরূপ বর্বরতার অনুমতি দেয়? এমন আচরণ তো ইসলামে হারাম। ভারতে মুসলমানগণ ৬শত বছরের বেশী সময় ধরে শাসন করেছে। অথচ লাখ লাখ মন্দির ও বৌদ্ধ মন্ডপের গায়ে সে আমলে একটি আঁচড়ও লাগেনি। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী মানুষ হিন্দুই রয়ে গেছে। মুসলমানদের সংখালঘিষ্ঠতাই প্রমাণ করে মুসলমানগণ কারও ধর্ম বা মত পরিবর্তনে জোরজবরদস্তি করে না। “ধর্ম ও রাজনীতির মিলন কখনই সম্ভব নয়” –আবুল ফজলের এমন মন্তব্য কি প্রচন্ড মিথ্যাচার নয়?  ইতিহাস-বিরুদ্ধ এমন মিথ্যাচারই সেকুলারিষ্টদের রাজনীতির মূল পুঁজি। তারা মানুষকে বোকা বানায় ও ধোঁকা দেয় এমন মিথ্যাচার দিয়েও। রাজনীতিতেই এটি তাদের আসল হাতিয়ার। তাই মূল দ্বন্ধ এখানে মিথ্যাচারের সাথে ইসলামের। আল্লাহর নবী (সাঃ) নিজে শাসক হয়ে ধর্ম ও রাজনীতির মিলন যে সম্ভব সেটি প্রমাণ করে গেছেন। তাঁর উম্মতকে সেটির পূর্ণ অনুসরণের তাগিদ দিয়ে গেছেন। নবীজী (সাঃ)র কোন অনুসারী কি সে সূন্নতের প্রতি সামান্য অবহেলা দেখাতে পারেন? সেটি করলে কি তার ঈমান থাকে? অথচ ইসলামের বিরুদ্ধে এমন মিথ্যাচারে আবুল ফজল একা নন, তার সাথে যোগ দিয়েছে আজকের সেকুলারিষ্টগণও। একাত্তরের পর সে মিথ্যাচারের প্রচারে মুসলমানদের রাজস্বের অর্থও ব্যয় হচ্ছে। ফলে তাতে পাপ বাড়ছে সাধারণ মানুষের।


বিভক্তি ও বিপর্যয় যখন অনিবার্য

আরবদের এবং সে সাথে মুসলমানদের আজকের বিপর্যয়ের বড় কারণ তাদের বিভক্তি। বিভক্তি পুষ্টি পায় সেকুলারিজম তথা পার্থিব স্বার্থ চেতনা থেকে। অপরদিকে পরকালে প্রাপ্তির ভাবনা ও হারানোর ভয় বিলুপ্ত করে স্বার্থের মোহ। ব্যক্তি তখন আল্লাহমুখি হয়। তখন প্রগাঢ় অঙ্গিকার বাড়ে আল্লাহর হুকুমের অনুসরণে। তখন গুরুত্ব পায় অন্য মুসলমান ভাইয়ের কল্যাণ-চিন্তা। তাই যে সমাজে ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার প্রগাঢ়, সে সমাজে একতা গভীর। অপরের কল্যাণ-চিন্তাও প্রকট। অন্য দিকে সেকুলারিজম তথা পার্থিবতায় প্রকটতর হয় স্বার্থপরতা। তখন ঘুষ বাড়ে, দুর্বৃত্তিও বাড়ে। স্বার্থ তথা অর্থের খোঁজে একের হাত তখন অপরের পকেটে ঢুকে। বাড়ে বিদেশী শক্তির দালালী ও পদলেহী চরিত্র। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বিগত পুরা সময়টি এমন সেকুলার ধারণার পরিচর্যাই গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে জাতীয় চরিত্রে কদর্যতা আজ থেকে শত বছর আগের তুলনায় হাজার গুণ বেড়েছে। ফলে তখন বাঙালীর কাছে অবাঙালী মুসলমানদের যতটা আপন মনে হতো এখন তা হয় না। বরং বন্ধুত্ব বেড়েছে কাফের, ফাসেক ও জাহান্নামের পথযাত্রীদের সাথে।

যে ব্যক্তি প্রচন্ড অনুপ্রেরণা পায় হাজার হাজার কোটি টাকা পাওয়ার প্রতিশ্রুতিতে, তার কাছে শত টাকা বা হাজার টাকার কি কোন গুরুত্ব থাকে? যে ব্যক্তি কোটি কোটি বছরেও শেষ হবার নয়, এমন এক অনন্ত-অসীম জীবনের নেয়ামত ভরা জীবনের স্বপ্ন দেখে তার কাছে ক’দিনের মন্ত্রীত্ব বা এমপিগিরি কি একপয়সার মুল্যও রাখে? অথচ পার্থিব স্বার্থ শিকারী সেকুলারিষ্ট রাজনীতিবিদের কাছে মন্ত্রী হওয়া বা এমপি হওয়াই জীবনের বড় অর্জন। সেটির অর্জনে বিদেশী শক্তির এজেন্ট হতেও সে রাজী। বাংলাদেশের সেকুলার নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ তো এ যাবত সেটিই করেছে। শেখ মুজিব নিজে সে কাজের শুরু করেছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে। ফলে এ দলটির মধ্য থেকে ভারত যত এজেন্ট ও তাঁবেদার পেয়েছে তা অন্য দল থেকে পায়নি। অবশ্য এখন সেকুলারিজম তথা পার্থিবতার স্রোতে ভাসা শুরু করেছে কোন কোন ইসলামী দলের নেতা-কর্মীগণও। এসব তথাকথিত ইসলামী নেতাদের কাছে মন্ত্রী হওয়া বা এমপি হওয়াই মূল প্রায়োরিটি। প্রকৃত ঈমানদার তো এমন দুর্বৃত্ত মন্ত্রীদের পাশে নিজের লাশের কবর হোক সেটাতেও ঘৃণা বোধ করবে।

স্বার্থপরতায় আর যাই হোক, ভাতৃত্ব বা একতা অসম্ভব। বরং দূরত্ব বাড়ে এমনকি নিজ ভাইয়ের সাথেও। তখন ভাইয়ে ভাইয়ে মিলে একত্রে পরিবার, কৃষি বা দোকান চালনাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন মুসলমানের ভিটামাটি, দোকানপাট বা কৃষিজমিই শুধু টুকরো টুকরো হয় নয়, দেশও টুকরো টুকরো হয়ে যায়। নবীজী(সাঃ)র আমলে আরবগণ সম্পদশালী ছিল না। তাঁদের হাতে তেল ও গ্যাসের ন্যায় বিশাল গুপ্তধনও ছিল না। যা কিছু ছিল তা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জন করতে হয়েছিল। এরূপ অবস্থায় মক্কার মোহাজিররা যখন মদিনায় পৌছলো তখন গরীব আনসারগণ তাঁদের গৃহ ও সম্পদের অর্ধেক ছিন্নমূল মোহাজির ভাইদের দিয়েছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন শীসাঢালা দেয়ালের ন্যায় উম্মাতে ওয়াহেদা। কোরআনের ভাষায় এমন ঐক্যকেই বলা হয়েছে বুনিয়ানূম মারসুস। এমন ঐক্যচেতনার কারণেই সেদিনের মুসলমানেরা বাংলাদেশের চেয়ে ৫০ গুণ বৃহৎ মানচিত্রের ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল -যার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছতে ৬ মাস লাগতো। অথচ আবুল ফজলের ন্যায় সেকুলারিষ্টদের চোখে সে গভীর ঐক্য ধরা পড়েনি। অথবা ধরা পড়লেও সেটিকে আড়াল করেছেন একটি জঘন্য মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজনে। সেকুলারিষ্টদের সে আকাশচুম্বি মিথ্যাটি হলো, ধর্ম কখনও সংহতির জনক হতে পারে না। ১৯৪৭ সালে বাঙালী, বিহারী, পাঞ্জাবী, পাঠান, বেলুচ, সিন্ধি সবাই মিলে যে রাজনৈতিক সংহতির প্রকাশ ঘটালো এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করলো, সে সংহতি কি জনাব আবুল ফজল দেখেননি? তখন সে সংহতির পিছে কি কোন ভাষা, বর্ণ বা জলবায়ু কাজ করেছিল? পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যে লক্ষ লক্ষ মুসলমান ভারত থেকে উদ্বাস্তু হয়ে পাকিস্তানে আশ্রয় নিল এবং তাদের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ অর্থ ও জমি দিয়ে বাসস্থান গড়ে দিল, সেটিও কি ধর্মীয় কারণে ছিল না? সেকুলারিজম কখনও কি বাংলাদেশসহ কোন মুসলিম দেশে এমন সংহতি গড়তে পেরেছে? বরং এ বিধ্বংসী মতবাদটি প্রচন্ড সাফল্য দেখিয়েছে মুসলিম উম্মাহর মধ্য থেকে ভাতৃত্ববোধকে কেড়ে নিতে। দেওয়ালের সিমেন্ট খুলে গেলে যেমন ইট খসে পড়ে এবং দেওয়ালও ধ্বসে যায়, তেমনি সেকুলারিজম ধ্বসিয়ে দিয়েছে মুসলিম একতা। মুসলমানদের বিরুদ্ধে সেকুলারিজমের এটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ। ফলে যে মুসলমানরা ১৯৪৭য়ে অবাঙালী মুসলমানদের জন্য জায়গা দিল, অর্থ দিল, খাদ্য দিল তারাই তাদেরকেই একাত্তরে তাদের নিজ গৃহ থেকে বের করে বস্তিতে পাঠিয়ে দিল। এবং বহু হাজারকে হত্যাও করলো। শত শত অবাঙালী নারীকে ধর্ষণও করলো। হাজার হাজার বছর ধরে সেকুলারিষ্ট বাঙালীদের এমন অপরাধ ইতিহাসে বেঁচে থাকবে। প্রশ্ন হলো, এমন অপরাধের কারণ কি এই, বাংলাদেশের জলবায়ু বা ভূ-প্রকৃতিতে তখন আমূল পরিবর্তন এসেছিল? আমূল পরিবর্তন এসেছিল ঠিকই, তবে সেটি জলবায়ু বা ভূ-প্রকৃতিতে নয়, বরং চেতনার জগতে। এবং সেটি প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব থেকে সেকুলার বাঙালী জাতিয়তাবাদে দীক্ষা নেওয়ার কারণে। ফলে সেকুলার জাতিয়তাবাদের প্লাবনে ভেসে তখন মারা যায় মুসলিম ভাতৃত্ববোধ। একই রূপ সেকুলার ট্রাইবালিজম ও আঞ্চলিকতার জোয়ার বইছে আজ আরব ভূমিতে। তাই প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব সেখানে আস্তাকুঁড়ে গিয়ে পড়েছে। ইসলামি ভাতৃত্বের চেতনা তো আসে পরকালীন স্বার্থ চেতনা থেকে। প্রকৃত ঈমানদার তো মহান আল্লাহর হুকুমের মান্যতা দেয় তো এমন চেতনার মাধ্যমেই। তখন অন্য বর্ণ বা অন্য অঞ্চলের মুসলিম ভাইয়ের কল্যাণে কিছু করা ইবাদত রূপে গণ্য হয়। ইসলামি ভাতৃত্বের চেতনা এভাবেই মুমিনের আমলনামায় নেকীর অংক বাড়ায়। সেকুলার তথা ধর্মের প্রতি অঙ্গিকারহীনতায় সেটি ঘটে না।

সেকুলারিজম একটি জনগোষ্ঠিকে যে কতটা স্বার্থপর করে এবং দেশে বিভক্তি ডেকে আনে তার প্রমাণ শুধু বাংলাদেশ নয়, বড় প্রমাণ আরবগণও। বাঙালী সেকুলারিষ্টদের ন্যায় আরব সেকুলারিষ্টদের কুকীর্তিগুলোও যাদুঘরে রাখার মত -যা থেকে প্রকৃত ঈমানদারগণ যুগে যুগে শিক্ষা নিতে পারে। আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগে আরবের বুকে যে ট্রাইবাল বিভক্তি ছিল আরবগণ সে বিভক্তির যুগেই ফিরে গেছে। আরব বিশ্বে আজ বিপুল তেল ও গ্যাস। এর কোনটাই কি তাদের নিজেদের অর্জন? পুরা সম্পদ দিয়েছেন মহান আল্লাহতায়ালা নিজে। অথচ বিনা মেহনতে অর্জিত সে বিপুল সম্পদের বন্টনেও তাদের কত কার্পণ্য ও খেয়ানত! পুরা মালিক বনে গেছে তারা। বিশ্ব-মুসলিমের কল্যাণে আর কি দিবে, ভাগ দিচ্ছে না এমন কি নিজ দেশের গরীব মুসলমানদেরও। আরব দেশগুলীর সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি। অথচ ২০০৯ সালের ইউএনডিপি-র রিপোর্টে প্রকাশ, প্রায় ১৪ কোটি আরব বাস করে দরিদ্র সীমার নীচে। পার্থিব স্বার্থ চেতনা থেকেই জন্ম নেয় ব্যক্তি বা পারিবারিক বা গোত্রীয় স্বার্থ। সেকুলারিজম তাই শুধু জাতি বা আঞ্চলিক বিভক্তিই গড়ে না, গড়ে সামাজিক ও শ্রেণীগত বিভাজনও। এমন স্বার্থপরতা থেকেই তারা অখন্ড আরব ভূ-খন্ডকে বহু খন্ডে বিভক্ত করে নিজেরা ভোগ করছে। সে পারিবারিক বা গোত্রীয় স্বার্থকে স্থায়ী করতে তার বিপুল অর্থ দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোকে। এসব বিদেশী শক্তির কাজ দাঁড়িয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভক্ত মানচিত্রকে সযত্নে পাহারা দেওয়া এবং সে সাথে ইসরাইলকে দীর্ঘজীবী করা।

মুসলমানের কাছে অর্থনৈতিক উন্নতি বা রাজনৈতিক ক্ষমতালাভই বড় কথা নয়। মুসলিম উম্মাহর একতা, ইজ্জত ও শক্তির বিষয়টিকেও তাকে গুরুত্ব দিতে হয়। কারণ, মহান আল্লাহর কাছে নামায-রোযার সাথে এগুলীও জবাবদিহিতার বিষয়। কিন্তু সেকুলারিষ্টদের কাছে নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অর্জনটাই মূল। সেগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়াকে তারা বলে রিয়েল পলিটিক বা রাজনৈতিক রিয়েলিজম। সেটি পাওয়ার স্বার্থে তারা তার মুসলিম ভাইকে হত্যা করাটাও জায়েজ করে নেয়। এবং সে হ্ত্যাকে জায়েজ করতে তার চরিত্রহনন ও তার মুখে কালি লেপনও জায়েজ করে নেয়। সেকুলারিজম থেকে তখন যেটি জন্ম নেয় সেটি হলো গোয়েবলসীয় মিথ্যাচার। এমন মিথ্যাচারের প্রমাণ মিলে একাত্তরে। তখন বাঙালী সেকুলারিষ্টগণ ৭০-৮০ বছরের বৃদ্ধ ইসলামপন্থি নেতাকেও অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ার কারণে খুনি, ধর্ষনকারী ও ধর্ষকদের কাছে নারী সরবরাহকারিও বলেছে। পরে হত্যাও করেছে। অপরদিকে জায়েজ করে নিয়েছে কাফের শক্তির সাথে সহযোগিতা। যুগে যুগে মুসলমানদের মধ্য থেকে যেরূপ শত শত মীরজাফর তৈরী হয়েছে তারা এসেছে এমন পার্থিব স্বার্থশিকারী সেকুলারদের মধ্য থেকে। পাকিস্তানের ২৩ বছরে এমন এক স্বার্থপরতা নিয়েই ভয়ংকর ঘৃনা ও সামাজিক বিভাজন গড়ে তুলেছিল সেকুলারিষ্টগণ। মানুষের মনকে তারা এতটাই বিষপূর্ণ করেছিল যে মাতৃভাষা বাংলা না হওয়ার অপরাধে (?) হাজার হাজার অবাঙালী মুসলমানকে তারা একাত্তরে হত্যা করেছে। পরকালে জবাবদিহিতার ভয় ও আল্লাহর দ্বীনের প্রতি সামান্য অঙ্গিকার থাকলে সে কি এমন অপরাধে অংশ নিতে পারে? এমন মিথ্যাচার এবং হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণ তো তার এ জীবনে বাঁচার পুরা লক্ষ্যটাই ব্যর্থ করে দেয়। কিন্তু সেকুলারিষ্টদের কাছে এমন অপার্থিব চেতনা হলো ধর্মীয় গোড়ামী।

মিথ্যাচারের নমুনা
একাত্তরে সেকুলারিষ্টদের পক্ষ থেকে পরিচালিত মিথ্যাচারের একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। তাদের অভিযোগ, সোনার বাংলা শ্মশান হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণের ফলে। তাদের কথা, বাংলাদেশের যত দূর্ভোগ সেটির কারণ পাকিস্তান। ষাটের দশকে সেকুলারিষ্টগণ কুঁড়ে ঘর আর ছেঁড়া কাঁথা লাঠির মাথায় বেঁধে ঢাকার রাজপথে বড় বড় মিছিল করেছিল। বলা হয়েছিল দেশে ‍‍‌কুঁড়ে ঘর আর ছেঁড়া কাঁথার জন্য দায়ী পাকিস্তান। যেন ১৯৪৭ এর আগে বাংলাদেশে কোন ‍‍‌কুঁড়ে ঘর ও ছেঁড়া কাঁথা ছিল না। 'পূর্ব বাংলা শ্মশান কেন?' –এই শিরোনামে আওয়ামী লীগ লক্ষ লক্ষ পোষ্টার ছেপে সারা দেশে টানিয়েছে। প্রশ্ন হলো, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে কি পূর্ব বাংলা সত্যই সোনার বাংলা ছিল? বাংলাদেশের অভাবের জন্য কি সত্যই পাকিস্তান দায়ী? অথচ প্রকৃত সত্য হলো, অভাব অনটন ও খাদ্যাভাব বাংলার মানুষের ঘরে লেগেই থাকতো। ১৯৪৭ সালের আগে বাংলার মুসলমানের ঘরে ইট বা টিন ছিল? কয়টি ঘরে একখানি কাঠের দরজা ছিল? ছেড়া মাদুর বা ছেড়া মাদুরের স্থানে ক‌য়জনের গৃহে কার্পেট ছিল? পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে সারা পূর্ব বাংলায় কি কোন পাটকল ছিল? ছিল কি কোন কাগজের বা ইস্পাতের কল? ছিল কি ঔষধ নির্মাণের ফাক্টরি? বাংলায় ভয়ানক দূর্ভিক্ষ হয়েছে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ৪ বছর আগে। ১৯৪৩ সালের সে দূর্ভিক্ষে পূর্ব বাংলার বহু লক্ষ মানুষ মারা যায়। দূর্ভিক্ষ হয়েছে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার মাত্র তিন বছর পরে ১৯৭৪ সালে মুজিবামলে। তখনও লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায়। মানুষ তখন আস্তাকুঁড়ে উচ্ছিষ্ঠ খুঁজতে কুকুর বিড়ালের সাথে লড়াই করেছে। ভয়ানক দূর্ভীক্ষ হয়েছে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলেও। বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল ১৭৭৬ সালের সে ভয়ানক দূর্ভীক্ষে। এই হলো সোনার বাংলার প্রকৃত চিত্র। এবং যে প্রকান্ড সত্যটি তারা বলে না এবং ইচ্ছা করেই লুকিয়ে রাখে তা হলো, বাংলার বুকে বিগত আড়াই শত বছরের ইতিহাসে যদি কোন সময় দূর্ভীক্ষ না হয়ে থাকে সেটি হলো পাকিস্তানী আমল। তখন খাদ্যে টান পড়ার সাথে সাথে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তড়িৎ চাউল আমদানীর ব্যবস্থা করা হতো। ফলে ১৯৭০ সালে প্রলয়ংকারী জলোচ্ছ্বাস ও একাত্তরের ৯ মাস যুদ্ধকালীন সময়েও কোন পূর্ব পাকিস্তানীকে না খেয়ে মরতে হয়নি। পাকিস্তানে ২৩ বছরে অনেক স্বৈরাচারি শাসক এসেছে সেটি সত্য। কিন্তু প্রকান্ড অসত্য বলা হবে, যদি বলা হয়, তাদের কেউ শেখ মুজিবের চেয়ে বেশী স্বৈরাচারি ছিল বা বেশী দায়িত্বহীন ছিল। অন্ততঃ কেউ তখন একদলীয় বাকশাল কায়েম করেনি এবং সরকার বিরোধী পত্রিকাগুলোকেও নিষিদ্ধ করেনি। সর্বোপরি দেশকে তারা ভিক্ষার ঝুলিতেও পরিণত করেনি এবং একটি ভয়ানক দুর্ভিক্ষও উপহার দেয়নি। ইতিহাসে এ কথাগুলো লেখা না হলে ইতিহাসই অপূর্ণ থেকে যাবে। অথচ এগুলোই বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টদের বড় অবদান।     

এটি সত্য যে পাকিস্তানের জন্মকাল থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিরাট বৈষম্য ছিল। কিন্তু চরম অসত্য হলো, যখন বলা হয়, সে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে পাকিস্তান। অস্বীকারের উপায় নেই যে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে কোন পূর্ব-পাকিস্তানী জেনারেল ছিল না, কোন ব্রিগেডিয়ার ছিল না, কোন কর্ণেল বা মেজরও ছিল না। তেমনি সেক্রেটারিয়েটে কোন সেক্রেটারী বা ডেপুটি সেক্রেটারিও ছিল না। ছিল না কোন বাঙ্গালী মিল-মালিক ও শিল্পপতি। এমন কি পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বা হকি টিমেও কোন বাঙ্গালী খেলোয়াড় ছিল না। সমগ্র পূর্ব বাংলাতে একখানি দৈনিক পত্রিকাও ছিল না। ছিল না কোন সমুদ্র বন্দর। এ বৈষম্যগুলো বিশাল। কিন্তু সে বৈষম্যের জন্য কি পশ্চিম পাকিস্তানকে দায়ী করা যায়? বাঙালী ও অবাঙালীর সে বৈষম্য তো বহু শত বছরের। অথচ সেটিকে চিত্রিত করা হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানীদের দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানের শোষণের দলিল রূপে। কোনদিনও সেকুলারিষ্টগণ এ বৈষম্যের কারণ খুঁজার চেষ্টা করেনি। বরং ইচ্ছা করেই সেটি করেনি। ইচ্ছা করে এ কথাও বুঝতে চেষ্টা করেনি যে, কয়েক শত বছর ধরে গড়ে উঠা এ বৈষম্য অতিদ্রুত দূর করাও সম্ভব ছিল না। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য পাশ করা কোন বাঙালী ছাত্রকে জেনারেল বা ব্রেগেডিয়ার বানিয়ে রাতারাতি সেটি দূর করা সম্ভব ছিল না। তেমনি সেক্রেটারি বা ডেপুটি সেক্রেটারীও বানানো যায় না। জেনারেল বা সেক্রেটারি বানানোর কাজ তো লাগাতর ২৩/২৪ বছরের ট্রিনিং ও অভিজ্ঞতার। একই অবস্থা ক্রিকেট বা হকি টিমের বেলায়ও। সেক্ষেত্রেও তো আন্তর্জাতিক মানের খেলার দক্ষতা জরুরী। অথচ বাঙালী সেকুলার বুদ্ধিজীবীগণ সেটি বুঝতেও রাজী ছিল না। বরং সে বৈষম্যকে পাকিস্তানের সংহতি বিপন্ন করতে প্রপাগান্ডায় ব্যবহার করে। অথচ প্রধানমন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ার জন্য সেরূপ অভিজ্ঞতা বা ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন না থাকায় পূর্ব পাকিস্তানীরা সমান হারে সে পদগুলীতে বসেছেন। তিনবার প্রধান মন্ত্রীও হয়েছেন। গভর্নর জেনারেল বা সংসদের স্পীকারও হয়েছেন। কিন্তু সে ইতিহাস সেকুলারিষ্টগণ ইচ্ছা করেই বলে না। তারা বলেন, পূর্ব পাকিস্তান পাঞ্জাবীদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। অথচ কায়েদ আযম, লিয়াকত আলী খান, খাজা নাজিমুদ্দিন, মহম্মদ আলী বোগড়া, সোহরোওয়ার্দি, ইসকান্দার মির্জা, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান – অর্থাৎ যারা ২৩ বছর ধরে পাকিস্তান শাসন করেছেন এরা কেউই পাঞ্জাবী ছিলেন না। আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান ছিলেন পাঠান। খাজা নাজিমুদ্দিন, মহম্মদ আলী বোগড়া, সোহরোওয়ার্দি ছিলেন বাংলার। আমলাদের বেশীর ভাগ ছিলেন মোহাজির যারা ব্রিটিশ আমলেই প্রশাসনিক চাকুরিতে ঢুকে, ১৯৪৭ য়ে পাকিস্তানে চলে আসেন। তাই এ বিষয়টিতেও তারা গুরুতর মিথ্যা বলেন।

তাদের আরেক অভিযোগ ছিল, অবাঙালীরা পূর্ব পাকিস্তানে কলকারখানার মালিক হয়ে শোষণ করেছে। অথচ এটি ছিল চরম মিথ্যাচার। বিশ্বের বহুদেশেরই নিজ দেশের সকল শিল্পে পুঁজি বিণিয়োগের সামর্থ থাকে না। এমনকি ইংল্যান্ডেরও সে সামর্থ নেই। নাই ভারতেরও। কারণ এ জন্য শুধু পুজি লাগে না, দক্ষতাও লাগে। সে অভাব পূরণ করতে তারা নিজ দেশে বিদেশীদের দাওয়াত করে। তাদেরকে অনেক সুবিধাও দিতে হয়। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানী মুসলমানদের পুঁজি ও দক্ষতার কোনটাই ছিল না। অথচ ১৯৪৭য়ের পূর্ব থেকেই ইস্পাহানী, আদমজী, বাওয়ানীদের ভারতে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা ছিল। ফলে তাদের হাতে পুঁজি ছিল, প্রয়োজনীয় দক্ষতাও ছিল। সে সময় বাংলায় বিশ্বের পাটের শতকরা ৭০ ভাগ উৎপাদিত হলেও কোন পাটকল ছিল না। পাট ব্যবসা নিয়ন্ত্রিত হতো কোলকাতার মাড়োয়ারীদের হাতে। ফলে ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের পাটচাষীরা কোলকাতার হিন্দু ব্যবসায়ীদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন অবাঙালী মুসলমানেরা তাদের মেধা ও পুঁজির বিণিয়োগ করে পূর্ব পাকিস্তানে। ফলে নারায়নগঞ্জে গড়ে উঠে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ পাটকল আদমজী জুটমিল। কয়েক বছরের মধ্যে খুলনার খালিশপুর, ঢাকার ঢেমরা, টঙ্গিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে প্রায় ৭০টি পাট কল। বহু লক্ষ মানুষের এতে কর্মসংস্থান হয়। পাট তখন সোনালী আঁশের পরিচয় পায়। অর্থনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার হয়। কোলকাতার পাটশিল্প তখন বিপর্যয়ে পড়ে। কিন্তু পুর্বপাকিস্তানের সে অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখন ভারতের ভালো লাগেনি। ভাল লাগেনি দেশের সেকুলারিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদেরও। এসব অবাঙালী শিল্পমালিকদের তারা বাঙালীর শত্রু রূপে চিত্রিত করে। তারা অবাঙালী-বিরোধী দাঙ্গা শুরু করে দেয় এসব অবাঙালীদের শিল্প প্রতিষ্ঠানে। পঞ্চাশের দশকেই বহু অবাঙালী কর্মচারীদের হত্যা করা হয় আদমজী জুটমিলে এবং চট্টগ্রামের অবাঙালী শিল্প প্রতিষ্ঠানে। ভারত থেকে আগত এসব মুহাজিরগণ পশ্চিম পাকিস্তানেও শিল্প প্রতিষ্ঠা করেছিল, কিন্তু তাদের সেসব কলকারখানায় এরূপ রক্তপাত একটি দিনের জন্যও ঘটেনি। সেকুলারিষ্টগণ এভাবে অবাঙালী পাকিস্তানীদের জন্য পূর্ব পাকিস্তানে পুঁজি বিণিয়োগ অসম্ভব করে তোলে। অথচ বাংলাদেশে তখন বাটা, লিভার ব্রাদার্স, গ্লাক্সোর ন্যায় আরো অবাঙালী শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু সেখানে তারা এমন রক্তাত্ব দাঙ্গা গড়েনি। অথচ সমীক্ষায় দেখা গেছে, আদমজী, বাওয়ানী, ইস্পাহানীদের ন্যায় শিল্পমালিকগণ তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানেই শিল্প প্রতিষ্ঠা করেছে, পূর্ব পুরুষদের ঠিকানা ভারতে নিয়ে যায়নি। পশ্চিম পাকিস্তানেও নিয়ে যায়নি। তাদের লাভের অর্থেই গড়ে উঠেছে বায়তুল মোকাররম (বাওয়ানীদের অর্থে), আদমজী কলেজ (ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে), বাওয়ানী স্কুল, ইসলামীয়া চক্ষু হাসপাতাল (ঢাকার ফার্মগেটে) এর ন্যায় বহু প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে ১৯৭১ এর পূর্বে ও পরে বহু দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠান শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, কিন্তু ক’টি প্রতিষ্ঠান এ অবধি এধরণের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে? পুঁজি সবসময়ই নিরাপদ স্থান চায়, পাকিস্তানে সে সময় এমন নিরাপদ স্থানের অভাবও ছিল না। ফলে পুঁজি চলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। কোলকাতার শিল্প মালিকদের তখন আনন্দে ডুগডুগি বাজানোর দিন। আর একাত্তরে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর মুজিব সরকার পাটশিল্প ধ্বংসের বাঁকি কাজটি তড়িৎ ও সুচারুভাবে সম্পাদন করে। আওয়ামী লীগ কোলকাতার হাতে পাটশিল্পের প্রধান কেন্দ্র হবার হৃত গৌরবটি আবার ফিরিয়ে দেয়। বাংলাদেশের সমৃদ্ধির প্রতি এই হলো সেকুলারিষ্টদের অবদান।

এরা এতটাই কূপমন্ডক যে ইতিহাস থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করেনি। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যে দেশে যত ইমিগ্রেন্ট সেদেশে তত উন্নয়ন। কোন দেশেই সবাই দেশ ছাড়ে না। দেশ ছাড়ে তারাই যারা নিজেদের ভাগ্য-উন্নয়েনে নতুন ক্ষেত্রের সন্ধান করে। ফলে তাদের হাতপায়ের ন্যায় মগজগুলোও নতুন কিছু করার জন্য উগগ্রীব। যে কোন দেশে ইমিগ্রান্টরা হয় সবচেয়ে কর্মঠ ও উদ্যোগী। তাই বিশ্বের বড় বড় সভ্যতাগুলো ইমিগ্রেন্টদের সৃষ্ট। এমনকি ইসলামি সভ্যতাও। আজকের বিশ্বে সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সে সমৃদ্ধি এনেছে সেদেশের আদিবাসীরা নয়, বরং অন্যান্য দেশ থেকে আগত ইমিগ্রান্টরা। এখনো মার্কিনীরা প্রতিভাবান বিদেশী সাদরে গ্রহণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় আরেক উদাহরণ ছিল পাকিস্তান। করাচীর ন্যায় পাকিস্তানের যে শহরগুলীতে মোহাজিরদের সংখ্যা অধিক সে শহরে উন্নয়নও হয়েছে বেশী। পূর্ব পাকিস্তানে এজন্যই ভারত থেকে আগত অবাঙালীরা আদিবাসী বাঙালীদের চেয়ে শিল্প, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে দ্রুত এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অবাঙালীদের সে উন্নয়নকে হিংসা ও ঘৃনার চোখে দেখার মত পরশ্রীকাতর লোকের অভাব ছিল না। বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টগণ সহ্যই করতে পারেনি। তাদের অভিযোগ, অবাঙালীরা কেন বাংলাদেশে কলকারখানার মালিক হবে? অথচ অবাঙালীদের স্থাপীত কারখানায় যারা চাকুরী করেছে তাদের বেশীর ভাগই ছিল বাঙালী। লক্ষণীয় হলো, আওয়ামী লীগ ও তার সেকুলার মিত্ররা অবাঙালী পাকিস্তানী শিল্পমালিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাংদেহী আচরণ করলেও অবাঙালী মাড়োয়াড়ীদের বিরুদ্ধে কোন সময় সামান্যতম আক্রোশও দেখায়নি।      

ধর্ম এবং পাকিস্তান নিয়েও তাদের প্রতারণাটি কি কম জঘন্য ছিল? আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, “আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে পাকিস্তানের নিরাপত্তা নিয়ে, ইসলামের নিরাপত্তা নিয়ে নয়। পাকিস্তানের জন্মের আগেও ইসলাম ছিল। পাকিস্তানের কপালে যদি কোন দূর্ঘটনা ঘটে তবুও ইসলাম বেঁচে থাকবে। সেরূপ অবস্থায় ইসলামের কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু পাকিস্তানের মুসলমানেরা তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএর আসুন পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি, ইসলামের ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়।”-(পাকিস্তানী জাতিয়তাবাদ বনাম মুসলিম জাতিয়তাবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, ১৫ই মার্চ ১৯৭০)। ১৯৭০ সালে তিনি লিখেছেন, “পাকিস্তানের কপালে যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে তবে মুসলমানেরা তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” একাত্তরে পাকিস্তান ভয়ানক বিপর্যয়ে পড়েছিল। মুসলমানেরাও তাতে প্রচন্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাকিস্তানীদের মুখে চুনকালি লেগেছে এজন্য যে, তাদের ৯০ হাজার সৈন্য ভারতের হাতে বন্দী হয়েছিল। আর বাঙালী মুসলমানদের মুখে চুনকালি লেগেছে একারণে যে, বাংলাদেশ বিশ্বমাঝে “তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি” রাষ্ট্র রূপে পরিচিতি পেয়েছে। এবং দেশটিতে নেমে এসেছে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। তবে যে ভন্ডামীটি এখানে দেখবার মত তা হলো, জনাব আবুল মনসুর আহম্মদ তাঁর নিবন্ধে পাকিস্তান দুর্ঘটনায় পড়তে পারে তা নিয়ে পাঠকদের মনযোগী হতে বলেছেন। অথচ তাঁর এবং তাঁর মত সেকুলারিষ্টগণ একাত্তরে দুর্ঘটনা-কবলিত সে পাকিস্তানকেই বিফল করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। এবং এমন এক চেতনার কারণেই পাকিস্তানের সে দূর্দীনটিই তাদের কাছে উৎসব রূপে গণ্য হচ্ছে।

অপরাধ ইসলামে অঙ্গিকারহীন করার

সেকুলারিষ্টগণ জানতো, পাকিস্তান ততদিনই টিকে থাকবে যতদিন উভয় প্রদেশের নাগরিকদের মাঝে ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার অটুট থাকবে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে এছাড়া আর কোন বন্ধনই ছিল না। তাই ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার লোপ পেলে বিলুপ্ত হবে পাকিস্তান –সেটিই স্বাভাবিক ছিল। তাই আবুল মনসুর আহমদ ও আবুল ফজলের মত সেকুলার বুদ্ধিজীবীদের প্রধান কাজ হয়, জনগণকে ইসলামে অঙ্গিকারহীন করা। অর্থাৎ পাকিস্তানের শিকড় কাটা। জনাব আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, “ইসলামের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার কোন প্রয়োজেন নেই।” অথচ সে ভাবনাটিই একজন সত্যিকার মু’মিনের সবচেয়ে বড় ভাবনা। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের অর্থ, শ্রম ও রক্তের সবচেয়ে বড় কোরবানী হয়েছে ইসলামের নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠাকে সুনিশ্চিত করতে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাও।”-সুরা সাফ। প্রশ্ন হলো, আল্লাহর সাহায্যকারি হওয়ার অর্থ কি কোরআন তেলাওয়াত করা? শুধু কি নামায-রোযা আদায়? বা সীমান্ত পাহারা দেওয়া? বরং সেটি হলো, রাষ্ট্রে মহান আল্লাহর কোরআনী বিধানের প্রতিষ্ঠায় সাহায্যকারি হয়ে যাওয়া। ইসলামের বিপক্ষ শক্তিকে প্রতিহত করা। “যাতে আল্লাহর দ্বীন সকল ধর্মের উপর বিজয়ী হয়।”-সুরা সাফ। কোরআন নাযিলের মূল উদ্দেশ্যই তো সেটি। মুসলিম জীবনে বাঁচা-মরার এটিই তো মূল মিশন। কিন্তু সেকুলারিষ্টদের শত্রুতা সে মিশনটির সাথে। কারণ তাতে অসম্ভব হয় সেকুলারিষ্টদের রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ ও স্বার্থ শিকার। তাই সেকুলারিষ্টদের সর্বাত্মক চেষ্টা ইসলামের প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের অঙ্গিকারহীন করায়। তাছাড়া পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার যে কথাটি তিনি বলেছিলেন সেটিই কি কম ভন্ডামীপূর্ণ? ১৯৭১য়ে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়াতে যারা অতিশয় খুশি হয়েছিলেন তিনি ছিলেন তাদেরই একজন। একাত্তরের পর বাংলাদেশের সৃষ্টিকে তিনি বলতেন ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন বলে। অথচ তিনি ইচ্ছা করেই বলেননি, লাহোর প্রস্তাবে ভারতের পূর্বাঞ্চলে যে সার্বভৌম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র গঠনের কথা ছিল সেটি ছিল সমগ্র বাঙলা নিয়ে, ক্ষুদ্র গ্রামীন পূর্ব বাংলাকে নিয়ে নয়। স্বাধীন বাংলার সে মানচিত্রে কোলকাতাও অন্তর্ভূক্ত ছিল। কিন্তু সে ধারণাটি আস্তাকুঁড়ে যায় যখন কংগ্রেস কোলকাতাসহ পশ্চিম বাংলাকে ভারতভূক্তির দাবী তুলে। ব্রিটিশ সরকার মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবী মেনে নেওয়ার সাথে বাঙালী হিন্দুদের দাবীও মেনে নেয়। শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ হিন্দু অধ্যুষিত কোলকাতাকে পাকিস্তানভূক্ত করার প্রশ্নই উঠে না -সেটি মুসলিম লীগকে তারা জানিয়ে দেয়। লাহোর প্রস্তাব পাশ হয়েছিল ১৯৪০ সালে। তখন বাংলা-বিভাগের বিষয়টিই ধর্তব্যের মধ্যেই আসেনি। ১৯৪৬ সালের নতুন পরিস্থিতিতে মুসলিম লীগের সামনে তখন অনিবার্য হয়ে পড়ে নতুন কৌশল প্রণয়ন। ঐ বছরেই দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী পার্টির সভায় বাংলার প্রধানমন্ত্রী জনাব সহরোওয়ার্দী প্রস্তাব দেন খন্ডিত পূর্ববাংলার পাকিস্তানভূক্তির এবং সে প্রস্তাব বিপুল ভোটে পাশ হয়ে যায়। অথচ সেকুলারিষ্টগণ এ বিষয়টি নিয়ে কত বানায়োট কথাই না বলে। তাদের কথা, পূর্ববাংলা পাকিস্তানভূক্ত হয়েছে কায়েদে আযম মহম্মদ আলী জিন্নাহর ষড়যন্ত্রের ফলে। তারা ১৯৪৭য়ের পাকিস্তানভূক্তিকে পূর্ববাংলার উপর পাকিস্তানীদের ঔপনিবেশিক শাসনের শুরুর পর্ব বলে। তাদের কথা, বাঙালীর স্বাধীনতা অর্জন ১৯৭১ সালে, ১৯৪৭ নয়। অথচ বাস্তবতা হলো, ১৯৪৭ সালে পূর্ববাংলায় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কোন অবকাঠামোই ছিল না। এক টুকরো জমিন, একটি পতাকা বা কিছু নেতা থাকলেই স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায় না। পানি ধরে রাখতে হলে ছিদ্রহীন পাত্র দরকার, তেমনি স্বাধীনতা ধরে রাখতে হলে অপরিহার্য হলো শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, দক্ষ প্রশাসন, পর্যাপ্ত পুলিশ, উন্নত যোগাযোগ, সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সার্ভিস এবং দায়িত্বশীল মিডিয়ার ন্যায় প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো। সেটি না থাকলে কি হয় তা মার্কিনীরা ইরাক ও আফগানিস্তানে টের পাচ্ছে। অথচ সে সময় বাঙালী মুসলমানদের দিয়ে রাতারাতি একটি সামরিক বাহিনী গঠন করা যেত? ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালী মুসলমান সেপাহীদের সংখ্যা তখন কয়েক শতের বেশী ছিল না। মেজর পর্যায়েরও কোন অফিসার ছিল না। ছিল না প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ। ছিল না দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা। এমন অবস্থায় পূর্ব বাংলা স্বাধীন হলে কি অবস্থা কাশ্মীরের ন্যায় হত না? কাশ্মীরের পাশে তো পাকিস্তান ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের তিন দিক ঘিরে হলো ভারত। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরকে ভারত ১৯৪৮ সালেই দখল করে নিয়েছে। জাতিসংঘ সে দখলদারির বৈধতা না দিলে কি হবে, তাতে কি কাশ্মীর স্বাধীনতা পেয়েছে? ১৯৭১য়ে ভারত যে বাংলাদেশে আগ্রাসন চালাতে পারেনি তার কারণ, পাকিস্তানের ২৩ বছরে বাংলাদেশে একটি অবকাঠামো গড়ে উঠেছিল। ১৯৪৭ সালে কি সেটি সম্ভব ছিল? সে সময়কার নাজুক অবস্থা বুঝেই অবিভক্ত বাংলার আইনসভার সকল মুসলিম সদস্যগণ পূর্ব বাংলার পাকিস্তান ভূক্তির পক্ষে রায় দেন। সে সিদ্ধান্তের সাথে জড়িত সহরোওয়ার্দি, ফজলুল হক ও খাজা নাজিমুদ্দিনের মত নেতারাও। ফলে এমন একটি সিদ্ধান্তের ফলে ১৯৪৭য়ে পূর্ব-পাকিস্তান যখন পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হলো সেটিকে বাংলাদেশের উপর পাকিস্তানের ঔপনিবেশীক শাসনের শুরু বলা যায় কি করে? অথচ সেটিই বলছে বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টগণ। এহলো তাদের ইতিহাস বিকৃতি ও মিথ্যাচারের নমুনা।

অপরাধ সত্য ইতিহাস লুকানোর

সেকুলারিষ্টদের হাতে মিথ্যাচার ও ইতিহাস বিকৃতির আরেক প্রমাণ, তারা বলে বাংলার বিভক্তির জন্য দায়ী মুসলিম লীগ এবং তার নেতা কায়েদে আযম মহম্মদ আলী জিন্নাহ। অথচ প্রকৃত সত্য হলো, বাংলা ভাগ হয় কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা ও অন্যান্য হিন্দু দলগুলীর প্রচন্ড দাবী ও আন্দোলনের প্রেক্ষিতে। ১৯৩৫ সালের ব্রিটিশ সরকারের ভারত শাসন আইন পাশের পর ১৯৩৭ সাল থেকে যখন নির্বাচন শুরু হয় তখন অবিভক্ত বাংলার উপর শুরু হয় মুসমানদের শাসন। এবং সে শাসন জারি থাকে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি পর্যন্ত। এই তের বছরের মুসলিম শাসনের মধ্য দিয়ে বাংলার কোলকাতা কেন্দ্রীক বর্ণহিন্দুগণ পরিস্কার বুঝতে পারে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমান বাঙালীদের কারণে অবিভক্ত বাংলার উপর তাদের প্রতিপত্তির দিন শেষ। কোলকাতার শতকরা ৭০ জন হিন্দু হলে কি হবে সে শহরে বসে প্রধানমন্ত্রী রূপে শাসন চালিয়েছেন জনাব ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দীন ও জনাব সহরোওয়ার্দী। তখন নিদারুণ হতাশা নেমে আসে কোলকাতার প্রতিপত্তিশীল হিন্দুদের মাঝে। এ অপমান সহ্য করার সামর্থ বর্ণ হিন্দুদের ছিল না। অপমানের জ্বালায় মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বর্ণহিন্দুদের ক্রোধ তীব্র আকার ধারণ করে ১৯৪৬ সালে। তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী জনাব সহরোওয়ার্দী। ঐ বছরের ১৬ই আগষ্টে কোলকাতার গড়ের মাঠে ছিল মুসলিম লীগের জনসভা। জনসভা শেষে ফেরার পথে নিরস্ত্র মুসলমানদের উপর কোলকাতার রাস্তায় রাস্তায় হিন্দু গুন্ডাদের পরিকল্পিত হামলা শুরু হয় এবং তাতে বহু হাজার মুসলমান নিহত হয়। রাস্তায় পড়ে থাকা মুসলমানদের লাশ তখন কুকুর-শেয়ালের খাদ্যে পরিণত হয়। তাদের লক্ষ্য শুধু হত্যাকান্ডই ছিল না, সে হত্যাকান্ডের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলার বিপর্যয় মুসলিম সরকারের পতন। মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে তাদের ঘৃণা যে কতটা তীব্র ছিল তার একটি নমুনা দেওয়া যাকঃ
“সোহরোওয়ার্দীকে জানিয়ে দাও যে, হিন্দুরা এখনও মরে যায়নি, এবং সে বা তার দুশ্চরিত্র সাঙ্গোপাঙ্গোরা হিন্দুদের ভয় দেখিয়ে শাসন করতে পারবে না… এখন থেকে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো বিদ্রোহ এবং প্রতিশোধ গ্রহণ। এসো, আমরা মুসলিম লীগের বর্বরদের সাথে যুদ্ধ করি। বাংলা ভাগ না হওয়া পর্যন্ত এবং হিন্দুদের স্বদেশভূমি থেকে লীগ কর্মীদের বের করে না দেওয়া পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ থেকে বিরত হব না।”  (অমৃত বাজার পত্রিকার সম্পাদকের কাছে প্রেরিত মুন্ময়ী দত্তের লেখা পত্র যা আটক করা হয়, তারিখ ১৯শে এপ্রিল ১৯৪৭ সূত্রঃ জয়া চ্যাটার্জী, ২০০৩, পৃষ্ঠা ২৭৭)।

সে লক্ষ্যে তাদের প্রস্তুতিও ছিল অনেকদিনের। তার একটি নমুনা হলো এরূপঃ
১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হিন্দু মহাসভার স্বেচ্ছাসেবক শাখা ভারত সেবাশ্রম সংঘ একটি সভা অনুষ্ঠিত করে। সে সভায় হিন্দু মহাসভা নেতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী সভাপতিত্ব করেন। এ সভায় ২,৬০০ লোক যোগদান করে বলে জানা যায়। সভায় বক্তারা বলেন, সাবেক দন্ডিত পুলিন দাস ও সতীন সেনের সাহায্য নিয়ে তাদের আখড়া তৈরি করে দৈহিক গঠনের প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত যাতে হিন্দুরা আক্রান্ত হলে যেন এক হাজার লাঠি উত্তোলিত হয়।..এর মধ্যে একটি পোষ্টার ছিল, “এখনই অহিংসার চেতনা ত্যাগ করো, প্রয়োজন হলো পৌরুষ।” এর দুমাস পর ভারত সেবাশ্রম সংঘের অন্য একটি সভার প্লাকার্ডে বাংলায় লেখা ছিল, “হিন্দুরা জাগ্রত হও এবং অসুরদের হত্যার শপথ গ্রহণ করো।”
এর পরের বছর ৭ তারিখে (এপ্রিল, ১৯৪০) সেবাশ্রম সংঘের উদ্যোগে মহেশ্বরী ভবনে একটা হিন্দু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। .. হিন্দুদের সামরিক মানস গড়ে তোলার জন্য সেখানে বক্তৃতা করা হয়। ত্রিশূলসহ শিবের একটা বড় চিত্র প্রদর্শিত হয়। ..স্বামী বিজনানন্দ বলেন যে, অসুরকে ধ্বংস করার জন্য হিন্দু দেবদেবীরা সব সময় বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকতেন। স্বামী আদিত্যনন্দ …মন্তব্য করেন যে, তিনি হিন্দুদের সেবা করার জন্য একটি লাঠি নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন যে, হিন্দুর শত্রুদের মুন্ডচ্ছেদ করতে হবে। ত্রিশুলসহ শিবের চিত্রের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন যে, তাঁর অনুসারীদের অস্ত্র, কমপক্ষে লাঠি হাতে এগিয়ে আসতে হবে.. স্বামী পণবানন্দ পাঁচ লাখ লোকের একটা প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তুলতে চান..তিনি মাড়োয়ারিদের কাছে অর্থ সাহায্যের আবেদন জানান..হরনাম দাস প্রত্যেক হিন্দুকে সৈনিক হওয়ার আহবান জানান। পাঁচ লাখ হিন্দুর একটা প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তোলার সংঘের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এতে সন্তুষ্টির সাথে উল্লেখ করা হয় যে, ইতিমধ্যে বারো হাজার লোককে সংগ্রহ করা হয়েছে। -( জয়া চ্যাটার্জী, ২০০৩, পৃষ্ঠা ২৭২)। ১৯৪৬ সালে অক্টোবর মাসে রাসবিহারী এভিনিউতে একটা পোষ্টার সুস্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা হয় – এতে বলা হয়ঃ
“কুকুর সোহরাওয়ার্দীর মুন্ড চাই     
সাদা চামড়ার রক্ত চাই।” -( জয়া চ্যাটার্জী, ২০০৩, পৃষ্ঠা ২৮০)।

হিন্দুদের বিদ্বেষ ও শত্রুতা শুধু মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না। সেটি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের বৈধ শাসনাধিকারের বিরুদ্ধে। অথচ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এ থেকে তাদের মুক্তিরও কোন রাস্তা ছিল না। ফলে তারা দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয়, বাংলাকে খন্ডিত করে হিন্দুপ্রধান পশ্চিম বাংলা গড়ার। সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেয় কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা। হিন্দুদের প্রাধান্য ফিরিযে আনার খাতিরে কংগ্রেস তার সেকুলারিজমের বুলি আস্তাকুঁড়ে ফেলে উগ্র বর্ণহিন্দুদের পক্ষ নেয়। তাদের বক্তব্য ছিল, বাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্পে যা কিছু উন্নয়ন তা হিন্দুদের অবদান। সংখ্যাগরিষ্ট হওয়ার কারণেই মুসলমানেরা বাংলার উপর শাসনের অধিকার পেতে পারে না। তখন বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে “হিন্দু মহাসভা” দলের নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মূল্যায়ন ছিলঃ “বাঙলা যদি পাকিস্তানে রূপান্তরিত হয়, বাঙলার হিন্দুরা স্থায়ীভাবে মুসলমান শাসনের অধীন হয়ে যাবে। হিন্দু ধর্ম ও সমাজের ওপর যেভাবে আঘাত আসছে তা বিবেচনা করলে বলা যায়, এটা হল বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির সমাপ্তি। কিছু নিম্ন শ্রেণীর হিন্দু থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত ব্যক্তিকে শান্ত করতে হলে অতি প্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতিকেই বিসর্জন দিতে হবে।” -(জয়া চ্যাটার্জী, ২০০৩, পৃষ্ঠা ২৬৯)

বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টদের আরেক মিথ্যাচার হলোঃ স্বাধীন বাংলা নির্মাণে যে পরিকল্পনা সহরেওয়ার্দী ও আবুল হাশেম নিয়েছিলেন সেটি নাকি জিন্নাহ সাহেব সফল হতে দেননি। তাদের কথা, সেটি হলে কোলকাতা বাংলাদেশে আসতো। কোলকাতা হারানোর জন্য এভাবে দোষ চাপানো হয় জিন্নাহর উপর। এটি চরম অসত্য এবং প্রকৃত সত্য হলো, মুসলিম লীগের দিল্লি বৈঠকে সহরোওয়ার্দী যখন জিন্নাহর কাছে অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার প্রস্তাব রাখেন তখন জিন্নাহ সাহেব জবাবে বলেন, “Go ahead”. অর্থাৎ “এগিয়ে যাও”। তবে সে সাথে আরো বলেছিলেন, গান্ধি ও প্যাটেল সেটি হতে দিতে দিবে না। এবং জিন্নাহর কথাই ঠিক হয়েছিল। তখন বাঙালী হিন্দুদের বাঙলা ভাগের দাবির প্রতি জোর সমর্থন জানিয়ে কংগ্রেস নেতা ও পরবর্তীকালে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বল্লবভাই প্যাটেল বলেছিলেন, “ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে বাঙলা পৃথক হতে পারে না। স্বাধীন বাঙলা সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রের ধারণা হল বোকার মত মুসলিম লীগের খপ্পরে পড়ার জন্য অপ্রত্যাশিত প্ররোচনাপূর্ণ একটা ফাঁদ। বাঙলার এই অবস্থা সম্পর্কে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সম্পূর্ণ সচেতন এবং আপনাদের ভয় পাওয়ার আদৌ প্রয়োজন নেই। অ-মুসলিম জনগণের বেঁচে থাকার জন্য বাঙলাকে অবশ্যই বিভক্ত হতে হবে।” -(জয়া চ্যাটার্জী, ২০০৩, পৃষ্ঠা ২৯৭)।  সে সময় বাংলার হিন্দুগণ কতটা বাংলা বিভাগের পক্ষে ছিল তা বোঝা যায় সে সময় উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক পত্রিকা অমৃত বাজারের একটি রিপোর্টে। ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে আত্মতৃপ্তির সাথে এক রিপোর্টে উল্লেখ করে যে, “বাঙলার বিভক্তি নিয়ে পত্রিকার জনমত যাচাই-এ কার্যত সর্বসম্মত আস্থার রায় পাওয়া গিয়েছে, হাঁ সূচক ভোট দিয়েছে শতকরা ৯৮.৬ভাগ লোক। যুক্ত বাঙলার পক্ষে যারা রায় দিয়েছে তারা সংখ্যালঘিষ্ঠ একটি ক্ষুদ্র অংশ, তাদের অবস্থান দশমিক বিন্দুরও পরে। -(অমৃত বাজার পত্রিকা, ২৩শে এপ্রিল, ১৯৪৭)। তখন কংগ্রেসে হাইকমান্ডের কি নীতি ছিল সেটি জানা যায় ত্রিপুরার কংগ্রেস নেতা জনাব আশরাফউদ্দীন চৌধুরীকে লেখা এক পত্রে যাতে লেখা হয়ঃ “এখন কংগ্রেস যা করতে চায় তা হল মুসলিম লীগের হুমকিপূর্ণ কর্তৃত্ব ও পাকিস্তান থেকে যত লোককে সম্ভব উদ্ধার করা। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাধীন ভারতীয় ইউনিয়নের জন্য তা যতটা সম্ভব এলাকা রক্ষা করতে চায়। এ কারণে তারা পাঞ্জাব ও বাঙলা ভাগ করতে চায়।”- (জয়া চ্যাটার্জী, ২০০৩, পৃষ্ঠা ২৯৭)।

জনাব সোহরোওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে জনাব আবুল মনসুর আহমদ কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রি ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রথমসারির নেতা ও বুদ্ধিজীবী। কিন্তু তার মগজে ইসলামের বিরুদ্ধে যে কতটা ঘৃণা ছিল তা বুঝা যায় তার লেখা পড়লে। তিনি লিখেছেন, “যারা কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিক আইনের প্রতিষ্ঠা চায় তারা কি মহিলাদেরকে শিক্ষা ও স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করে পর্দার পিছনে ঠেলে দিতে চায়? তারা কি মহিলাদের শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত সকল স্কুল-কলেজকে বন্ধ করতে চায়? তারা কি ফটোগ্রাফি, আর্ট কলেজ, সিনেমা ও নাটক, নাচ-গান, মহিলাদের জন্য ধাত্রীবিদ্যা ও ডাক্তারি শিক্ষা বন্ধ করতে চায়? যদি তারা হাঁ বলে তবে তারা একটি আধুনিক রাষ্ট্র চালানোর অযোগ্য। আর যদি না বলে তবে তারা ইসলামের ধোঁয়া তুলে মুসলমানদের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বিভ্রান্ত করছে। -(ধর্মশাসিত রাষ্ট্র না রাষ্ট্রশাসিত ধর্ম, দৈনিক ইত্তেফাক, ৮ই ফেব্রেয়ারি ১৯৭০)। উপরুক্ত এ ধারণাগুলো আবুল মনসুর আহমদের একার নয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ সেকুলারিষ্টদের। তাঁর ধারণা, ইসলাম মহিলাদের শিক্ষা দানের বিরোধী। এটি ইসলামের বিরুদ্ধে এক বিষোদগার। কোন ঈমানদার কি ইসলামের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলতে পারে? তাঁর আরো অভিযোগ, ইসলাম নারীদের জন্য ধাত্রীবিদ্যা ও ডাক্তারি শিক্ষা বন্ধ করতে চায়। কিন্তু এমন কথা কোথায় বলা হয়েছে সে উদ্ধৃতি তিনি দেননি। এভাবে মিথ্যা অভিযোগ এনেছেন ইসলামের বিরুদ্ধে। অথচ ইসলামে জ্ঞানার্জন করা বা আলেম হওয়া শুধু পুরুষের উপর ফরয নয়, এটি ফরয নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই। এটা ঠিক, বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষায় পশ্চাদপদ। কিন্তু সেটি কি ইসলামের জন্য? বাংলাদেশের মুসলমানেরা তো কত কিছু্তেই পশ্চাদপদ। কিন্তু সেজন্য কি ইসলামকে দায়ী করা যায়? প্রশ্ন হলো, কোথায় সে ইসলামের প্রয়োগ? দেশে ইসলামের পূর্ণ প্রয়োগ হওয়ার পর এমন অবস্থা সৃষ্টি হলে তখন ইসলামকে দায়ী করা যেত। কিন্তু পুরা দেশ তো দখলকৃত সেকুলারদের হাতে। সকল ব্যর্থতা ও বিপর্যয়ের জন্য তো দায়ী তারা। তাঁর অভিয়োগ, ইসলামের অনুসারিরা আধুনিক রাষ্ট্রপরিচালনার অযোগ্য এবং ইসলামি বিধান প্রয়োগের প্রচেষ্টাকে তিনি ধোঁয়া তুলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। তবে আধুনিক রাষ্ট্রের অর্থ যদি ইসলামি অনুশাসন বিবর্জিত সেকুলার রাষ্ট্র হয়, তবে তিনি ঠিকই বলেছেন। ইসলামের প্রকৃত অনুসারিরা সে কাজের অনুপোযুক্ত। কারণ তারা সেকুলারিজমে বিশ্বাসী নয় এবং সেকুলারিজমের প্রতিষ্ঠা দেওয়া তাদের কাজও নয়। বরং অঙ্গিকার সেটিকে কবরস্থ করায়। কারণ কোন মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলাম ও সেকুলারিজমের সহ-অবস্থান হলে তাতে চরম অবমাননা হয় ইসলামের। ঈমানদার রাষ্ট্র-পরিচালনার অনুপ্রেরণা পায় পরলোকে জবাবদিহীতার ভয় থেকে, সেকুলার দর্শন থেকে নয়। আর ইসলামের ধোঁয়া তুলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার যে অভিযোগ তিনি এনেছেন, সেটি তো সেকুলারিষ্টদের বেলায় প্রযোজ্য। কারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করায় তো তারাই সিদ্ধহস্ত যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট। ইসলামী অনুসরণ ও প্রতিষ্ঠার যারা বিরোধী তাদেরকে আর যাই হোক সত্যপথ-প্রাপ্ত বলা যায় না।   

সেকুলারিষ্টরা যে শুধু ইসলামের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে তাই নয়, তাদের নিষ্ঠা ও অঙ্গিকার নেই মুসলমানদের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির প্রতিও। সম্ভবতঃ মুসলমানদের কল্যাণ ও সমৃ্দ্ধিকেও তারা সাম্প্রদায়িকতা ভাবেন। সবাই জানে, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। ফলে মুসলিম লীগ সে বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করে। পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা তখন মনে করে, পূর্ব বাংলা তাদের জালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে বিরোধীতায় নামে পশ্চিম বাংলার সাম্প্রদায়ীক হিন্দুগণ। অথচ সেটির সমর্থনে এগিয়ে আসেন শহিদুল্লাহ কায়সারের মত একজন চিহ্নিত সেকুলার বুদ্ধিজীবী। লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে পারিচালিত হিন্দুদের আন্দোলন সম্পর্কে তিনি বলেন, “এটি হলো উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় গণআন্দোলন। এ আন্দোলন মুসলমানদের অনুপ্রাণিত করতে পারেনি। এবং এর কারণ, মুসলমানদের শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা। তিনি আরো বলেন, ব্রিটিশরা মুসলিম লীগের বেড়ে উঠায় সাহায্য করেছে।” -(দৈনিক সংবাদ, ২৭শে এপ্রিল, ১৯৭০)।  কংগ্রেসের ন্যায় এসব মুসলিম নামধারী সেকুলারদেরও ধারণা, মুসলিম লীগ বেড়ে উঠেছে ব্রিটিশের সহায়তায়। কংগ্রেসের সাথে সুর মিলিয়ে তাদের অনেকে একথাও বলেন, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ছিল একটি ব্রিটিশ প্রজেক্ট। অথচ তারা ভুলে যান, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ফলে উপমহাদেশের মুসলমানদের একটি বিরাট অংশের জীবনে যে বিশাল মহাকল্যাণটি এসেছে সেটি। অবিভক্ত ভারতে সেটি অসম্ভব ছিল। ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মুসলমানদের চেয়েও অধিক। অথচ করাচী বা ঢাকা শহরের মত একটি শহরে মুসলমানদের মাঝে যে সংখ্যক ডাক্তার-ইঞ্জিনীয়ার ও অন্যান্য শিক্ষিত প্রফেশনাল গড়ে উঠেছে বা শহরটিতে যে পরিমাণ উন্নত ঘরবাড়ী, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদ জমা হয়েছে তা কি সমগ্র ভারতের মুসলমানদের মাঝেও আছে?

কিন্তু বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টদের চোখে সে বিশাল অর্জনও ধরা পড়েনি। আর এটিই সেকুলারিষ্টদের বড় অক্ষমতা। আর এরূপ অক্ষমতায় সত্য-উপলদ্ধি ও সেটি গ্রহণ করার সামর্থ থাকে? তখন প্রকান্ড ঘটনাও তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় এত মিথ্যাচার এবং বহু সত্য বিষয়ের এত অনুপস্থিতি। সেকুলারিষ্টগণ যে নিজেরা মিথ্যার মাঝে ডুবে আছে তা নয়, তারা সে মিথ্যার গভীরে ডুবাচ্ছে নতুন প্রজন্মকেও। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিথ্যা রটনার ন্যায় মহা অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তো একারণেই। ফলে বিপর্যয় বাড়ছে আগামী দিনের বাংলাদেশের জন্য। কারণ সত্য-উপলদ্ধির সামর্থই মানবের বড় সামর্থ। এ গুণটির বদৌলতেই মানুষ তার মানবিক গুণ নিয়ে বেড়ে উঠার সামর্থ পায়। নইলে নিয়তি হয় দুর্বৃত্তিতে রেকর্ড গড়া । এজন্যই মিথ্যাচর্চা এ বিশ্বসংসারে সবচেয়ে বড় অপরাধ। এবং ইসলামে এটাই সবচেয়ে বড় পাপ। অথচ সে অপরাধে কুশলতা অর্জন বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টদের কাছে শুধু পেশা নয়, শিল্পে পরিণত হয়েছে। ফলে সত্য এখন অতি অপরিচিত বাংলাদেশে। সেটি যেমন ইসলামকে নিয়ে, তেমনি একাত্তরকে নিয়েও।  (Pdf Version)

সূত্রঃ
জয়া চ্যাটার্জী, ২০০৩; বাঙলা ভাগ হল, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ বিভাগ ১৯৩২-১৯৪৭, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, রেড ক্রিসেন্ট বিল্ডিং, ১১৪ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা ১০০০।



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Saturday, 01 January 2011 23:02