Home •সংস্কৃতি ও সমাজ সমাজ-বিপ্লবের ধারণা এবং ইসলামী সমাজ-দর্শন
সমাজ-বিপ্লবের ধারণা এবং ইসলামী সমাজ-দর্শন PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Thursday, 05 August 2010 19:12

সমাজ-বিপ্লব কী?

সমাজ-বিপ্লব বলতে বুঝায়? সময়ের তালে সমাজ বা রাষ্ট্রে বহু কিছ্ই বদলে যায়। সেসব পরিবর্তন ঘটে যেমন বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্ম-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে , তেমনি ঘটে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ-বিগ্রহ,দেশের মানচিত্র-বদল, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বার বার পরিববর্তন,ভয়াবহ মহামারি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে। এরূপ পরিবর্তনে বহুলক্ষ বা বহুকোটি মানুষের মৃত্যু হলেও বা কালের স্রোতে জাতীয় জীবনে বহুশত বছর অতিক্রান্ত হলেও সমাজ বদলায় না, বিপ্লবও আসে না। সমাজ পরিবর্তন বা বিপ্লবের অর্থ নিছক রাষ্ট্রগড়া নয়, কোন রাজবংশের নিপাত নয়, সরকার পরিবর্তনও নয়। কিছু রাস্তাঘাট, দালানকোঠা বা কলকারখানা নির্মানও নয়। সমাজে কতটা পরিবর্তন বা বিপ্লব আসলো সেটি পরিমাপের কিছু সুনির্দ্দিষ্ট মানদন্ড আছে। সেটি যাচাই হয় জীবন ও জগত নিয়ে মানুষের ধ্যাণ-ধারণা, ধর্ম, রুচী, ন্যায়বোধ, মূল্যবোধ, বিচার-আচার, বসবাস ও জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিল্প ও সংস্কৃতি, পোষাক-পরিচ্ছদ, সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে কতটা পরিবর্তন আসলো তা থেকে।



বিচারের এ মাপকাঠিতে ফরাসী বিপ্লব বা সোভিয়েত রাশিয়া ও চীনের কম্যুনিষ্ট বিপ্লবই বা কতটা সমাজ বিপ্লব? এটা ঠিক, এসব বিপ্লবের ফলে পূর্বের স্বৈরাচারি সরকার বিলুপ্ত হয়েছিল, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নতুন ধরণের সরকার, সোভিয়েত রাশিয়া ও চীনে নতুন ধরণের চাষাবাদ এবং অর্থনীতিও প্রচলিত হয়েছিল। কিন্তু কতটা পরিবর্তিত হয়েছিল জীবন ও জগত নিয়ে সাধারন মানুষের ধারণা? কতটা বিলুপ্ত হয়েছিল সামাজিক বৈষম্য এবং কতটা পাল্টিয়ে গিয়েছিল সংস্কৃতি? কতটা পরিবর্তন এসেছিল সাধারণ মানুষের অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে? ফরাসী বিপ্লবের ফলে পুর্বের রাজার পতন হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পুরোন সে রাজার বদলে ফ্রান্সে কি নেপোলিয়নের ন্যায় আরেক স্বৈরাচারি সম্রাট এসে ভর করেনি? জারের বদলে রাশিয়ায় কি কম্যুনিষ্ট পার্টির নেতাদের নিষ্ঠুর দলীয় স্বৈরাচার চেপে বসেনি? বিলুপ্ত হয়েছিল কি মানুষে মানুষে বিভেদ ও বৈষম্য? বিভাজন বেড়েছিল অন্যভাবে ও অন্যনামে। এদিক দিয়ে অভূতপূর্ব ইতিহাস গড়েছিল ইসলাম। এটিই ছিল সমগ্র মানব-ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ও সামগ্রিক বিপ্লব যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হযরত মহম্মদ (সাঃ)।এ বিপ্লবের ফলে মানুষের ধর্মই শুধু পাল্টে যায়নি, পাল্টে গিয়েছিল খাদ্য-পানীয়, পোষাক-পরিচ্ছদ এবং জীবন ও জগত নিয়ে বিশাল এক জনগোষ্ঠীর ধারণা। পাল্টে গিয়েছিল সামাজিক বৈষম্য। খলিফার ভৃত্যও তখন যাত্রাপথে খলিফার সাথে উঠের পিঠে চড়ার সমান সুবিধা পেয়েছিল। নারী পেয়েছিল পুরুষের সম-মর্যাদা এবং পেয়েছিল সম্পদের অধিকার। সমাজ-বিপ্লব কোন সমাজেই সহজে আসে না। বিশ্বের বহু দেশে ও বহু সমাজে হাজার বছরেও কোন পরিবর্তন আসেনি। বলা হয়ে থাকে, খৃষ্টীয় ৫০০ সাল থেকে ১৭০০ সাল পর্যন্ত চীনের মানুষের জীবনে বা সমাজে কোন পরিবর্তনই আসেনি। অথচ এই ১২০০ সালের মাঝে চীনে বহু রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। বহু দেশী-বিদেশী রাজবংশ সেখানে শাসন চালিয়েছে এবং বহু রাজবংশ বিলুপ্তও হয়েছে। কুবলাই খানের মত মোঙ্গল রাজারাও সেখানে বহু যুগ মহা দাপটে শাসন করেছে, কিন্তু চীনা মানুষ হাজার বছরের বেশীকাল ধরে বেঁচেছে একই ধরণের ধর্মীয়-বিশ্বাস, অভিন্ন মূল্যবোধ, প্রযুক্তি ও সামাজিক প্রথা নিয়ে। তাদের জীবনে উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তনই আসেনি। মানুষ যে ভিটায় বা যে গ্রামে জন্ম নিত, এবং পিতামাতা বা পূর্ব পুরুষের যে বিশ্বাস নিয়ে তারা বেড়ে উঠতো সে বিশ্বাস নিয়ে একই ভিটায় বা একই গ্রামেই তারা মারা যেত। শত শত বছর ধরে সেটি একই ধারায় অবিরাম চলেছে। ভারত বা বাংলাদেশেও কোন রূপ পরিবর্তন ছাড়াই সমাজে একই রূপ রীতি-নীতি, পানাহার, চাষাবাদ, শিল্প ও গৃহনির্মান কৌশল চলেছে হাজার বছর ধরে। ভারতে বহু জাতের বহু শাসক এসেছে। মুসলমানগণ সাত শত বছর শাসন করেছে। ১৯০ বছর শাসন করেছে ব্রিটিশেরা। কিন্তু তাদের সে শাসনরীতি ভারতের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুজনগনের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং তাদের জাতিভেদ, বর্ণভেদ ও চাষাবাদে সামান্যতম পরিবর্তন আনতে পারেনি। একেই বলে সামাজিক স্থবিরতা।


প্রলয়ংকারি প্রাকৃতিক দুর্যোগে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রানহানি ঘটাতে পারে বটে তবে সেগুলি সে স্থবিরতায় সামান্যতম পরিবর্তনও আনতে পারে না। তেমনি বড় রকমের একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু তাতে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, জীবন-যাত্রা, মূল্যবোধ বা রুচীতে কোন পরিবর্তন আসে না। একটি দেশে কতটা সমাজ-বিপ্লব এলো সে বিচারে যেটি সবচেয়ে যেটি গুরুত্ব পায় তা হলো মানুষের নিজের গুণগত মানটি। যে সমাজে মানুষের নিজের মানে কোন পরিবর্তন আসে না সে সমাজ স্থবির। সেখানে উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠে না। এমন দেশে শুধু একটি নয়, অসংখ্য তাজমহল বা পিরামিড নির্মিত হলেও সে নিদেশ সমাজ বিপ্লব আসেনা। তাই মোঘলদের হাতে ভারতে বা ফিরাউনদের হাতে মিশরে যথাক্রমে বিস্ময়কর তাজমহল ও পিরামিড নির্মিত হলেও তাতে ভারতে বা মিশরে কোন সমাজ বিপ্লব হয়নি। কারণ, মোঘল বা ফিরাউনদের দীর্ঘ-দিনের শাসনে দেশ দু’টির মানুষের জীবনে গুণগত বা চরিত্রগত কোন বিপ্লব আসেনি। পরিববর্তন আসেনি তাদের চিন্তুা-চেতনা, ধর্মকর্ম, রুচী,জীবনবোধ ও মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিতে। অথচ ইসলামের বিজয়ের সাথে এসব ক্ষেত্রে আমূল বিপ্লব এসেছিল আরবে, এবং পাল্টে গিয়েছিল মানুষের বিশ্বাস,কর্ম,চরিত্র ও বাঁচবার সংস্কৃতি। প্রতিটি সমাজই মূলতঃ রক্ষণশীল ও স্থবিরতামুখি। সে স্থবিরতাকে স্থায়ীত্ব দেওয়ার জন্য একত্রে কাজ করে বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। সামাজিক স্থবিরতা বা রক্ষণশীলতার বড় হেফাজতকারি এসব অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র। যে সমাজে এ প্রতিষ্ঠানগুলো বেশী শক্তিশালী সে সমাজে সে স্থবিরতাটিও বেশী প্রবল। এ জন্যই সমাজ বিপ্লব প্রতিদেশেই অতিদুরূহ। অনেক সমাজবিজ্ঞানী তো এসব সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকই সমাজ-বিপ্লবের প্রধান শত্রু মনে করে, এবং তাই সেগুলোর নির্মূলও চায়। ফরাসী বিপ্লবের যারা বুদ্ধিবৃত্তিক গুরু ছিলেন এমন ধারণ ছিল তাদেরও। এমন ধারণা ছিল সেন্ট সাইমন, রুশো ও এ্যাডাম স্মিথের। কিন্তু সমস্যা হলো, যেসব বিপ্লবীরা এসব প্রতিষ্ঠান শত্রু মনে করেছেন তারাই আবার বিপ্লবের পর বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখাকে অপরিহার্য মনে করেছেন। সেগুলীকে তারা ব্যবহার করেছেন শত্রুদের বিরুদ্ধে নিজেদের লড়াইয়ে হাতিয়ার রূপে। বরং তারা সেসব প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী করেছেন। কার্ল মার্কস বলতেন, রাষ্ট্র হলো পুঁজিবাদী শোষনের হাতিয়ার, এবং সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্র অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে। কিন্তু রাশিয়ায় কম্যুনিষ্ট বিপ্লবের পর ঘটলো উল্টোটি। কম্যুনিষ্টদের হাতে রাষ্ট্র বিলুপ্ত না হয়ে বরং শক্তিশালী হয়েছে। বরং সেটি আরো নির্মম দমনকারি প্রতিষ্ঠান রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

সমাজ বিপ্লবের বিবিধ মতবাদ

কার্লমার্কসের ঐতিহাসিক অনিবার্যতার ধারণা

সমাজ বিপ্লব নিয়ে নানা মতবাদ। তবে গুরুত্বপূর্ণ মতবাদগুলির একটি হলো কার্লমার্কসের ঐতিহাসিক অনিবার্যতার ধারণা। কার্লমার্কসের কথা হলো, প্রতি সমাজে সমাজ বিপ্লব অনিবার্য। এবং সেটি ঘটবে বিবর্তনবাদের অনিবার্য ধারাবাহিকতায়। কার্ল মার্কসের থিওরি, বিবর্তনের ধারায় পুঁজিবাদের পরিপক্কতা আসবেই এবং তারই ধারাবাহিকতায় আসবে সাম্যবাদী সমাজবিপ্লব। সেটি ঘটবে শ্রেণী সংঘাতের মধ্য দিয়ে এবং সেটি রুখবার ক্ষমতা কারো নেই। তার কথা,পুঁজিবাদ যেখানে যত অগ্রসর সেখানে সে বিপ্লবের সম্ভাবনা ততোই আসন্ন। এমন একটি বিপ্লবকে তিনি বলেছেন সমাজ বিবর্তনের ঐতিহাসিক অনিবার্যতা (Historical imperative)। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পূর্ব পর্যন্ত এটিই ছিল সমগ্র বিশ্বে অতি প্রবল মতবাদ। বহু রাষ্ট্রে এ মতবাদের অনুসারিগণ ক্ষমতাও দখল করেছিল। কিন্তু লক্ষণীয় হলো, কার্ল মার্কস যে বিপ্লবকে অনিবার্য বললেন সেটি আজও কোথাও সেভাবে ঘটেনি। কম্যুনিষ্টগণ বিপ্লব ঘটিয়েছেন রাশিয়ার মত পুঁজিবাদের দিক দিয়ে অনগ্রসর এবং কৃষিভিত্তিক একটি সামন্ত্রতান্ত্রিক দেশে। এবং এসেছে অত্যাচারী জারের বিলাসী, সুবিধাভোগী ও অত্যাচারি অফিসারদের বিরুদ্ধে সাধারণ সৈনিকদের বিদ্রোহের কারণে। পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে মজদূর বা প্রলেতারিয়েতের বিদ্রোহের কারণে নয়। ফলে বলশেভিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কম্যূনিষ্টগণ রাশিয়ায় ক্ষমতা দখলে সফল হলেও সে বিপ্লব ভ্রান্ত প্রমাণিত করেছে কার্ল মার্কসের শ্রেণীযুদ্ধের মতবাদ। সে সময় পুঁজিবাদ সবচেয়ে অগ্রসর ও পরিপক্ক ছিল গ্রেট ব্রিটেন ও জার্মানীতে। অথচ এ দুটি দেশে শ্রমিক ও পুঁজির মালিকের মাঝে শ্রেণীযুদ্ধ অনিবার্য হওয়া দূরে থাক, বরং রুশ বিপ্লবের প্রায় শতবছর পরও কম্যুনিষ্ট পার্টি তেমন কোন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। গ্রহণযোগ্যতা পায়নি পুঁজিবাদের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও। ফলে কার্ল মার্কস যা বলেছিলেন ইতিহাসে তার উল্টোটি ঘটেছে। তারই প্রমাণ, পুঁজিবাদ যেখানে যত শক্তিশালী হচ্ছে সেখানেই এমন সাম্যবাদী বিপ্লব অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাছাড়া কার্ল মার্কসের কথা মত সাম্যবাদী বিপ্লবের পর সোভিয়েত রাশিয়ায় প্রতিষ্ঠান রূপে রাষ্ট্র দুর্বল বা বিলুপ্তও হয়নি, বরং দ্রুত পুঁজিবাদের কাছেই তারা আবার আত্মসমর্পণ করেছে।

ফেবিয়ান সমাজবাদী মডেল

সমাজ পরিবর্তনের আরেক ধারণা হলো ফেবিয়ান সমাজবাদী মডেল। এ মতবাদ প্রবল জনপ্রিয়তা পায় গ্রেট ব্রিটেনে। এ জনপ্রিয়তার কারণ, এ মতবাদের পিছনে বার্নাড শ’র মত জনপ্রিয় নাট্যকার ও বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু প্রফেসর, বহু নামকরা কলামিষ্ট ও লেখক। তাদের কথা হলো, সমাজে সুবিচার এবং সাধারণের মানুষের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কল্যান আনতে হবে আইনী ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে। এর জন্য বিপ্লব জরুরী নয়, অনিবার্যও নয়। তাদের যুক্তি, রাষ্ট্রকে পরিণত করতে হবে জনকল্যাণের হাতিয়ারে। ব্রিটেন যে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায় সেটি মূলতঃ এ মতবাদের প্রবল জনপ্রিয়তার কারণেই। শুধু শ্রমিক দল নয়, এমনকি রক্ষনশীল দলও এমন একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রয়জনীয়তা অগ্রাহ্য করতে পারিনি। এদেশটির সাধারণ শ্রমিকগণ কর্মক্ষেত্রে যে নিরাপত্তা এবং আর্থিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে যে সুবিধাগুলি পেয়ে থাকে তা কোন কম্যুনিষ্ট শাসনাধিক রাষ্ট্রের শ্রমিকগণ কল্পনাও করতে পারে না। অবশেষে একই ধরণের সামাজিক নিরাপত্তার ধারণা ছড়িয়ে পড়ে জার্মান, ফ্রান্স ও স্কান্ডেনিভিয়ান দেশসহ সমগ্র পশ্চিম ইউরোপে। তবে এ পরিবর্তনকে সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিবর্তন বলা গেলেও বিপ্লব বলা যায় না। কারণ, এতে জীবন ও জগত নিয়ে পাশ্চাত্যবাসীর ধর্ম, দর্শন, সংস্কৃতি, জীবনবোধ ও মূল্যবোধে তেমন কোন পরিবর্তন আসেনি।

নৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক সংস্কারের ধারণা

সমাজ পরিবর্তনের অপর একটি ধারণা হলো নৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক সংস্কারের ধারণা। অনেকের বিশ্বাস, সমাজে পরিবর্তন আসতে পারে মানবিক বা নৈতিক উন্নয়নের পথ ধরে। এক্ষেত্রে তাদের উদাহরণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দাসপ্রথার বিলোপ। একথা ঠিক, নৈতিক পবিবর্তনের ফলে একটি দেশে কিছু সামাজিক পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু তাতে কি একটি সমাজ পুরাপুরি পাল্টে যায়? তাছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোথায় সে নৈতিক পরিবর্তন? অনেকেই বলেন, দাসপ্রথার বিলোপের অনেক আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেটি অলাভজনক হয়ে পড়ে। কারণ, বেশীর ভাগ দাসই তখন সক্রিয় ভাবে মালিকের সাথে অসহযোগতা শুরু করে। তাদের উপর চালানো নির্মম অত্যাচারের ফলে তারাও কাজে ফাঁকি দেওয়া বা সক্রিয় অসহযোগিতার নানারূপ কৌশল আবিস্কার করে ফেলে। ফলে দারুণ ভাবে কমে যায় কৃষি উৎপাদন। অপর দিকে বেড়ে যায় দাসদের প্রতিপালন, তাদের উপর পাহারাদরীর খরচ। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ভাগের রাষ্ট্রগুলোতে দাসদের বদলে বেতনভোগীদের কাজে লাগানো শুরু হয় এবং সেটিই লাভজনক প্রমানিত হয়। ফলে অর্থনৈতিক স্বার্থেই দাসপ্রথার বিলুপ্তি অপরিহার্য হয়ে পড়ে। একই ভাবে ভারতীয়দের লাগাতর অসহযোগ, ব্রিটিশ পণ্যবর্জন, রাজনৈতিক সংঘাত, ব্রিটিশ-বিরোধী মারমুখী চেতনার দ্রুত প্রসার ও সহিংসা –ইত্যাদী কারণে অলাভজনক হয়ে পড়ে ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসন। তাছাড়া দুইটি বিশ্বযুদ্ধ কোমড় ভেঙ্গে দেয় ব্রিটিশদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির। ভারত তখন ১৭৫৭ বা ১৮৫৭ সালের ভারত ছিল না। সমগ্র ভারত জুড়ে তখন রাজনৈতিক জাগরন এসেছিল এবং তারা পরাধীনতা থেকে মূক্তি চাচ্ছিল। তখন ভারতের মত বিশাল দেশকে ধরে রাখার সামর্থই ব্রিটিশদের ছিল না। এবং সে চেষ্টা করা হলে তাতে বরং বৃটিশদের ক্ষতি অংকই বাড়তো। তাই পরিস্থিতির বিচারে দাসপ্রথার বিলুপ্তি বা ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানকে কখনই মানবতার বিজয় বলা যাবে না। বরং এগুলি ছিল সে সময়ের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক অনিবার্যতা। পাশ্চাত্য শক্তির হাতে আফগানিস্তান ও ইরাক দখল এবং সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের হত্যা কি প্রমাণ করে যে পাশ্চাত্য দেশের সরকারি ও সামরিক নীতিতে আদৌ কোন মানবিক উন্নয়ন এসেছে? ১৭৫৭ সালে বাংলা দখলে ব্রিটিশ বাহিনী যে রক্তপাত ঘটিয়েছিল তার চেয়ে বরং বহুগুণ বেশী রক্তপাত ঘটিয়েছে ইরাক ও আফগানিস্তানে। পাশ্চাত্য দেশে নৈতিকতা ও মানবতার যে কতটা আকাল -সেটি কি এভাবেই প্রমানিত হয় না?

সমাজ পরিবর্তনের বৃত্তিক ধারণা

সমাজ পরিবর্তন নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদটি হলো সমাজ পরিবর্তনের বৃত্তিক ধারণা। এ ধারণার প্রবক্তা হলেন অসওয়ার্লড স্পেঙ্গলার। তার কথা, কোন সভ্যতার বিজয় বা সমাজ-বিপ্লবের ধারা চিরকাল থাকে না। সময়ের তালে তাতে পরাজয় বা তার বিলুপ্তিও আসে। বৃত্তিক পরিবর্তনের সে ধারায় গ্রীক ও রোমান সভ্যতা যেমন টিকেনে, তেমনি টিকবে না পাশ্চাত্য সভ্যতাও। এ মতবাদের প্রভাব ব্যাপক। এবং সে প্রভাবের ফলেই অনেকে পাশ্চাত্য সভ্যতার বিদায়ের দিন গুণছেন। তবে সরকিন ও আরনল্ড টয়েনবি এ মতের বিরোধী। তাদের কথা,যে সব কারণে একটি সমাজে পরাজয় বা বিলুপ্তি আনে সেগুলি যথাসময়ে নির্ণয় ও তার প্রতিকার করতে পারলে সে পরাজয় বা বিলুপ্তি থেকে রেহাই অসম্ভব নয়। তাদের কথা, এজন্য চাই সামাজিক রোগব্যাধীকে সনাক্ত করার লাগাতর পদ্ধতি। চাই লাগাতর চিকিৎসা। চাই লাগাতর সোসাল রিজেনারেশন। এ মতবাদের কারণে পাশ্চাত্যে সমাজবিজ্ঞানীদের কদর বেড়েছে। তাদের কদর বেড়েছে সোসাল ইঞ্জিনীয়ার রূপে। মুসলিম সমাজে এমন একটি কাজটি করেন মোজাদ্দেদগণ।

সমাজবিজ্ঞানীদের বিফলতা

সমাজবিজ্ঞানীদের বড় বিফলতা হলো, একটি দেশে সমাজ বিপ্লব কেন হবে এবং কীভাবে হবে তা নিয়ে পূর্বাভাস দেওয়ার অসক্ষমতা। তাই ১৯৭৯ সাল ইরানে বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার ক’দিন আগেও তারা বলতে পারিনি যে সেখানে কোন বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে। তেমনি তাদের কাছে ফিলিস্তিনে হামাস বা লেবাননে হিজবুল্লাহর সামর্থ নিয়েও কোন আগাম পূর্বাভাস তারা দিতে পারিনি। ভিয়েতনামে মার্কিনী জবর দখল যে আদৌ গ্রহণযোগ্যতা পাবে না সেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় সমাজ বিজ্ঞানী প্রফেসরদের চোখে ধরা পড়েনি। আজও ধরতে পারছে না মুসলিম দেশেগুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা ও প্রতিরোধের মূল কারণটি। সমাজবিজ্ঞান পদার্থবিজ্ঞান বা রাসায়নিক বিজ্ঞানের ন্যায় কোন ফিজিকাল সায়েন্স নয়। সমাজ বিপ্লবের কাজ কোন খালী জায়গায় বা কোন ল্যাবরেটরীতে ঘটে না। বরং এখানে নীরবে কাজ করে বহু অদৃশ্য ফ্যাক্টর যা যথা সময়ে যে কোন সমাজে বিস্ফোরণ বা বিপ্লব ঘটাতে পারে। তাছাড়া প্রতিটি সমাজই ভিন্ন।তাই কোন ভিন দেশের মানুষের পক্ষে অতি দুরূহ হলো, অন্য দেশে গিয়ে বিপ্লবের কারণ বা পূর্বাভাস খুঁজে বের করা। কারণ বিপ্লবের দর্শন ও অনুপেরণা নীরবে কাজ করে মনের গভীরে। পাশ্চাত্যের রাডারে বহু কিছু ধরা পড়লেও বিপ্লবী মানুষের মনের গভীরের সে প্রবল প্রত্যয়টি সহজে ধরা পড়ে না। এজন্যই সেগুলোর অবিরাম বিস্ফোরণ ঘটছে পাশ্চাত্য শক্তির নাকে ডগার উপর। আগ্রাসী পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে ইসলামি বিপ্লবীদের এটিই হলো বড় সুবিধা। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ এজন্যই ব্যর্থ মুসলিম বিপ্লবীদের শক্তির মূল ঘাঁটিতে আঘাত হানতে। তাছাড়া মিজাইল বা বোমায় ঈমানদারের সে বিশ্বাস বা দর্শন ধ্বংস হবারও নয়।

সমাজ পরিবর্তনে সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং

সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং ও সমাজ পরিবর্তন সমাজ পরিবর্তনের এ ধারণা এসেছে আধুনিক কালের সমাজ বিজ্ঞানীদের পক্ষ থেকে। বিশেষ ধাঁচের শিক্ষা, বিশেষ প্রশিক্ষণ, আইন-আদালত, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে মানুষের মনমগজে ও সমাজে পরিবর্তন আনা যেতে পারে। পাল্টে দেওয়া যেতে পারে মানুষের দর্শন। মনজগতের সে পরিবর্তনের ধারায় যে কোন সমাজে আসতে পারে ব্যাপক সাংস্কৃতিক, সামাজিক,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন। তাদের কথা এজন্য প্রয়োজন নেই কোন রাষ্টীয় বিপ্লবের। এ মতবাদটি কোন বিবর্তনবাদী ধারাও নয়, বিপ্লবী ধারাও নয়। এখানে পরিবর্তন আসে ধীরে ধীরে। সেটি প্রথমে শুরু হয় একটি শ্রেণীর মাঝে, তারপর ব্যাপক ব্যাপ্তি বাড়তে থাকে বৃহত্তর জনগণের মাঝে। পাশ্চাত্যদেশের সমাজবিজ্ঞানীর অনেকেই এখন মতবাদে বিশ্বাসী। তারা এখন পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিশ্বজোড়া বিজয় দেখছে সমাজ পরিবর্তনের এ কৌশলের মধ্য দিয়ে। এককালে নিজেদের দর্শন, ঈমান-আক্বিদা ও সংস্কৃতির বিজয় আনতে নানা দেশে যুদ্ধ লড়তে হত, এখন আর সেটির দরকার নেই। সেটি সম্ভব হতে পারে সুপরিকল্পিত সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের মাধ্যমে। বাংলাদেশের মত প্রতিটি মুসলিম দেশের মুসলমানদের পরাজয়ের মূল আশংকা তাই কোন শক্তির সামরিক আগ্রাসন নয়, বরং সেটি হলো সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং। পাশ্চাত্যশক্তি একাজে এখন জাতিসংঘকেও কাজে লাগছে। ইউনিসেফ, ইউএনডিপি, ইউএনএফপি – জাতিসংঘের এসব অঙ্গসংগঠনের কাজই হলো এ সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিংকে দেশে দেশে বাস্তবায়ীত করা। লক্ষ্য এক দর্শন, এক সংস্কৃতি, এবং এক মূল্যবোধের গ্লোবাল ভিলেজ গড়া। এবং সেটি হবে পাশ্চাত্য মডেলের। তাই জাতিসংঘ শুধু ইসরাইলের অন্যায় ও অবৈধ প্রতিষ্ঠা, ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন হামলাকেই বৈধতা দেয়নি, পরিকল্পিত ভাবে মুসলমানদের ঈমানের ভূবনেও হাত দিয়েছে। এককালে মিশনারীরা সে লক্ষে মুসলিম দেশে স্কুল খুলতো। কিন্তু তাদের কর্মসীমা ও প্রভাব ছিল সীমাবদ্ধ। এখন ইউনিসেফের বদৌলতে সকল সরকারি স্কুলই পরিনত হয়েছে মিশনারি স্কুলে। ফলে মুসলিম দেশের ছাত্রগণ নামে মুসলিম হলেও কার্যতঃ পরিণত হয়েছে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ধারক ও বাহকে। ফলে তার দ্রুত দূরে সরছে্ ইসলাম থেকে। এরফলে নবীজী (সাঃ)র প্রচারিত প্রকৃত ইসলাম মুসলিম দেশেই অপরিচিত থেকে যাচ্ছে। সে ইসলামের অনুসারিদের মৌলবাদী বা সন্ত্রাসী বলে মহাধুমধামে হত্যাও করা হচ্ছে।

সমাজ পরিবর্তনের প্রভাবশালী ফ্যাক্টর

যুদ্ধবিগ্রহ ও সমাজ পরিবর্তন

যুদ্ধবিগ্রহ সমাজ পরিবর্তনের এটি এক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হলো যুদ্ধবিগ্রহ। যুদ্ধ একটি জাতির জীবনে যেমন ধ্বংস আনে তেমনি সৃষ্টিমুখিও করে। জাতির জীবনে আনে অর্থনৈতীক, রাজনৈতীক ও সামাজিক গতিময়তা। মানুষ তখন নিজ জন্মস্থান থেকে বহু দূরের ভিন দেশে ও ভিন শহরে যেয়ে ঘর বাঁধে। মানুষ তখন পুরাতন ঘরের সাথে পুরাতন অভ্যাসকেও ছাড়তে শেখে। মুসলমানের জীবনে আনে হিজরত। আসে বিচিত্র দেশ ও বিচিত্র জনপদ দেখার সুযোগ। সেগুলি স্বচোখে দেখার পাশাপাশি সুযোগ পায় নানা দেশের নানা মানুষ থেকে বেশী বেশী জানার। সৃষ্টি হয় নানা ভাষার নানা দেশের মানুষের সাথে মিশ্রণ। আসে বহুমুখীতা। কোন ফুলের বাগানই এক জাতের ফুলের দ্বারা গড়ে উঠে না। এর জন্য নানা জাতের নানা রঙের ফুলের দরকার হয়। তেমনি একটি সুন্দর জাতির নির্মানে নানা ভাষার নানা গুণের মানুষের দরকার। ইসলামী সভ্যতার নির্মানে আরবদের পাশাপাশি ইরানী,তুর্কী,কুর্দী,মুর,আফগানদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সভ্যতা নির্মানের একাজ শুধু আরবদের হাতে সীমিত থাকলে ইসলাম কোনকালেও বিশ্বজনীন সভ্যতার জন্ম দিতে পারতো না। বিশ্বশক্তিরও জন্ম দিতে পারছে না। যুদ্ধ যেমন জাতির জীবনে উলোট-পালট আনে তেমনি মিশ্রণও আনে। ব্যক্তির জীবনে তখন আসে পার্শ্বমুখি এবং উর্দ্ধমুখি গতি। এমন মানুষদের কারণেই সমাজ স্থবিরতা থেকে মূক্ত হয়। সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যক্তি-জীবনের এমন গতিময়তা এটি এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ইসলামের প্রাথমিক যুগে খুব কম সংখ্যক মুসলমানই এমন ছিল যে নিজ পিতামাতার নগরে বা গ্রামে মৃত্যু বরণ করতে পেরেছিলেন। অনেকে জীবনের বহু দশক,এমন কি আজীবন কাটিয়ে দিয়েছেন নিজ জন্মভূমি থেকে হাজার মাইল দূরের কোন জনপদে। মুসলিম সমাজে তখন যেমন নানা ভাষার ও নানা ভূগোলের মানুষের মাঝে সংমিশ্রণ ঘটেছিল তেমনি বেশী পরিবর্তন ও সমৃদ্ধিও এসেছিল। বলা যায় ইউরোপেও শিল্প ও কৃষি বিপ্লব শুরূ হয় ক্যাথলিক ও প্রটেষ্টান্টদের মাঝে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর। যুদ্ধ তাই ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি একটি জাতিকে প্রচন্ড ভাবে সৃষ্টিশীল ও সমৃদ্ধও করে। বিজ্ঞানের বহু আবিষ্কার হয়েছে নিতান্তই যুদ্ধের তাগিদ মিটাতে গিয়ে।

রাজনৈতিক মানচিত্র

রাজনৈতিক মানচিত্র সামাজিক বিপ্লব বা সভ্যতার নির্মানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হলো দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বা ভূগোল। বাংলাদেশ, কুয়েত, বা কাতারের মত ক্ষুদ্র একটি ভূগোলের দেশে আর যাই হোক কোনকালেই কোন বিজয়ী বা গৌরবজনক সভ্যতা নির্মিত হয় না। এসব ক্ষুদ্র দেশের দ্বারা সভ্যতা নির্মান দূরে থাক, স্বাধীনতার সুরক্ষাও সম্ভব নয়।তাদের বেচে থাকতে হয় অন্যদের কৃপার উপর ভরসা করে। ইসলাম যদি মক্কা-মদিনা বা নজদ-হিজাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো তবে ইতিহাসে কোনদিনই ইসলামী সভ্যতা নির্মিত হত না। মুসলমানগণ কখনই বিশ্বশক্তি রূপে গড়ে উঠতে পারতো না। মুসলমানদের তাই ভূগোল বাড়াতে হয়েছে। একতাবদ্ধ থাকতে হয়েছে। নবীজী (সাঃ)তাই মৃত্যুর আগে সাহাবাদেরকে রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কন্সটান্টিনোপল দখলের নসিহত করে গিয়েছিলেন। মুসলিম ইতিহাসে হযরত ওমর (রাঃ)এর গুরুত্ব, মহাত্ব ও অবদান এই জন্যই এত অধিক। তাঁর শাসনামলেই মুসলমানগণ সে আমলের দুইটি প্রধান বিশ্বশক্তি রোমান সামাজ্য ও পারস্য সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ রাষ্ট্রের পত্তন করেছিলেন। নিছক নামায-রোযা বা দরবেশী ভাব বাড়লে কোনকালেই সভ্যতা নির্মিত হতো না। যে কোন সভ্যতা ও সংস্কৃতির বেড়ে উঠার জন্য নিারাপদ পরিবেশ চাই। সে লক্ষ্যে স্বাধীন ভূগোলও চাই। সে আমলে সে পরিবেশ এবং ভূগোল সৃষ্টি হয়েছিল বলেই ইসলাম মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা রূপে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছিল। মার্কিনীরা এবং সে সাথে পাশ্চাত্যের মানুষ সেটি বুঝে বলেই হাজার হাজার বিলিয়ন ডলার খরচ করে নিজ দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে ইরাক ও আফগানিস্তানে গিয়ে যুদ্ধ করছে। এবং বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ঘাঁটি নির্মান করছে। নিজ দেশে অর্থনৈতিক সংকট, কলকারখানা বন্ধ বা বিকারত্ব বাড়লে কি হবে তারা সে লক্ষ্যে একটুও ঢিল দিতে রাজী নয়। আত্মসচেতন মানুষ কখনই দারিদ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে না। আজকের মুসলমানদের বড় সমস্যা তাই সম্পদে নয়, জনশক্তিতে নয়, তেলগ্যাসেরও নয়। বরং সেটি হলো বিভক্ত ভূগোলের। মুসলিম বিশ্বের এ খন্ডিত ভূগোল নিয়ে বহু কুয়েত, সৌদিআরব বা বাংলাদেশ বানানো যায়, কিন্তু তা নিয়ে ইসলামী সভ্যতার নির্মান সম্ভব নয়। মুসলমানদের জন্য নিরাপদ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টিও সম্ভব নয়।

ভূ-প্রকুতি ও জলবায়ু

ভূ-প্রকুতি ও জলবায়ু জলবায়ুর পরিবর্তন যে একটি সভ্যতার কতটা বিপর্যয় ঘটাতে পারে তার উদাহরণ হলো মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা ও তাক্ষশিলার সভ্যতা। নদীর গতিপথ পরিবর্তনই সভ্যতাগুলির মৃত্যু ডেকে আনে। এক সময় ফিলিস্তিনের ভূমি ও সিরিয়ার পাহাড়গুলি উচুগাছে পরিপূর্ণ ছিল। সেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাতও হতো। কিন্তু রোমানদের যুদ্ধ জাহাজ বানাতে গিয়ে ধ্বংস হয় সে বনরাজি। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার সামর্থ হারায় তৃণশূণ্য পাহাড়গুলি। ফলে আস্তে আস্তে সমগ্র এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হয়। ফলে বিপর্যয় নেমে আসে এ এলাকার জনগণের ভাগ্যে।এমন এক বৈরী প্রাকৃতিক পরিবেশে সভ্যতার নির্মান বা উচ্চতর সমাজ বিপ্লব দূরে থাক, সাধারণ মানুষের সহজ ভাবে বেঁচে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। চার. রোগব্যাধী ও মহামারি রোগব্যাধী এবং মহামারি যেমন বিপর্যয় আনতে পারে তেমনি বিপ্লবও আনতে পারে। বলা হয়ে থাকে ইউরোপে কৃষিবিপ্লব আসে প্লেগের মহামারিতে দেশের প্রায় সিকিভাগ মানুষের মৃত্যুর পর।সে সময় লাঙ্গল টানতো গরু বা মানুষ। মানুষের অভাবে ফন্দি বের করে কীভাবে ঘোড়াকে কাজে লাগোনা যায়। আর এতে ইউরোপে কৃষি উৎপাদন রাতারাতি দ্বিগুণ হয়ে যায়। তখন কৃষকের হাতে বিপুল উদ্বৃত্ত অর্থ এসে যায়। ফলে বিণিয়োগের সুযোগ আসে বাণিজ্য ও শিল্পখাতে। এতে শুরু হয় শিল্প বিপ্লব।

জনসংখ্যা

জনসংখ্যা মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো মানব। যে কোন মহান সৃষ্টিকাজ এ শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির কমতিতে সম্ভব নয়। তাই মার্কীন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চত্যের শিল্পোন্নত দেশগুলো শুধু বিশ্বজোড়া সম্পদের তালাশেই ব্যস্ত নয়, ব্যস্ত সেরা মগজগুলোর তালাশেও। তবে সম্পদ হওয়ার বদলে মানব অতি ক্ষতিকর আবর্জনাতেও পরিণত হতে পারে যদি বিলুপ্ত হয় মানবতা এবং মানুষ বঞ্চিত হয় উপযোগী শিক্ষা থেকে। জনসংখ্যা তখন প্রকৃত অর্থেই আপদ হয়ে দাঁড়ায়। যেমনটি বাংলাদেশের ন্যায় তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রে হয়েছে।

সামাজিক অসঙ্গতি ও অশান্তি

সামাজিক অসঙ্গতি ও অশান্তি সামাজিক অসঙ্গতি ও অশান্তি যে সমাজে প্রকট আকার ধারণ করে সে সমাজের সামনে পথ মাত্র দুটি। একটি বিপর্যয়ের। অপরটি বিপ্লবের। প্রকট সামাজিক অসঙ্গতি ও অশান্তি দেশের মানুষকে একটি বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করে তুলে। কোন রোগ যখন তার সকল সিম্পটম নিয়ে প্রকাশ পায় তখন সে রোগীকে চিকিৎসায় আগ্রহী করে তোলে। সে তার সকল আর্থিক সামর্থ নিয়ে চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়। অথচ যে ভয়ানক রোগ নীরবে মৃত্যু ডেকে আনে তার বিরুদ্ধে রোগী চিকিৎসার সুযোগই পায়না। নীরবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া রোগীর সামনে আর কোন পথ থাকে না। তেমনি একটি সামাজিক অসঙ্গতি ও অশান্তি বিরাজ করছিল আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগে আরবে। ফলে দলে দলে মানুষ সেদিন ইসলামে দীক্ষা নিয়েছিল। ইরানে ইসলামি বিপ্লবের কারণ এ ছিল না যে মহম্মদ রেজা শাহের আমলে সাধারণ মানুষ বড় অর্থনৈতিক সংকট বা নির্যাতের শিকার ছিল। বরং ইরানে শাহ অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যপ্রাপ্যের অনেক স্বৈরাচারি শাসকদের চেয়ে বেশী করেছিল। কিন্তু প্রচন্ড সমস্যা দেখা দিয়েছিল অন্য ক্ষেত্রে। এবং সেটি হলো,মহম্মদ রেজা শাহ ইরানে পাশ্চাত্য ধারার সংস্কৃতির দ্রুত প্রসার ঘটিয়েছিল। আইন করে পর্দাকে নিষিদ্ধ করেছিল। মদ্যপানকে পানির চেয়েও সহজলভ্য করেছিল। প্রসার ঘটিয়েছিল পতিতাবৃত্তির। অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল মুসলমানদের পক্ষে মুসলমান থাকাই । ফলে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠার স্বার্থে ইরানী জনগণ শাহকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে। একই কারণে সেকুলারগণ পরাজিত হয়েছে তুরস্কে।

সাংস্কৃতিক অসঙ্গতি আজ অতি দ্রুতগতিতে বাড়ছে বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের ১৯০ বছরে বাংলায় যত না পাশ্চাত্যকরণ হয়েছে তার চেয়ে বেশী পাশ্চাত্যকরণ হয়েছে বিগত তিরিশ-চল্লিশ বছরে। ব্রিটিশ শাসন দীর্ঘস্থায়ী করার কারণ তারা সমাজের চলমান রীতির সাথে সংঘর্ষে যায়নি। সতিদাহ প্রথার নামে শত শত নারীকে পুড়িয়ে মারা হলেও তারা সেটি বন্ধ করেনি। বন্ধ হয়েছে তখন যখন হিন্দু সমাজের ভীতর থেকে আন্দোলন উঠেছে। মুসলিম মেয়েদের পর্দা, পুরুষের দাড়ী বা পোষাক-পরিচ্ছদের বিরুদ্ধেও কোন ববস্থা নেয়নি। অথচ আজ ইসলামের মূল শিক্ষা ও আদর্শের সাথে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম-প্রধান দেশগুলীর আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রশাসন ও রাজনীতির কোন সঙ্গতিই নেই। এগুলি চলছে ঈমান-আক্বিদার বিপরীত ধারায়। নানা কৌশলে মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে পাশ্চাত্যের ডি-ইসলামাইজেশন প্রজেক্ট। এবং সেটি সমাজের সবচেয়ে চরিত্রহীন রাজনীতিবিদদের দ্বারা। এর ফলে প্রতিটি মুসলিম দেশে দ্রুত বেড়ে উঠছে প্রচন্ড গণ-অসন্তোষ।তাই এদেশগুলি আজ বিপ্লবের অতি উর্বর ক্ষেত্র। অপেক্ষায় আছে শুধু বীজ-বপন ও তা থেকে ফসল তোলার।

সমাজ বিপ্লবের ইসলামী দর্শন

সমাজ-পবিবর্তন বা সমাজ-বিপ্লবের ইসলামী ধারণা সেটিই যা পবিত্র কোরআনে বলা হযেছে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালার মূলনীতিটি হলো, “ইন্নাল্লাহা লা ইউগাইয়েরু মা কি কাউমি হাত্তা ইউগাইয়েরু হাত্তা মা বি আনফুসিহীম” -সুরা রায়াদ, আয়াত ১১। অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা কোন জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদেরকে পরিবর্তন না করে। অর্থাৎ ব্যক্তির এবং সে সাথে জাতির অবস্থার পরিবর্তনের দায়ভার ব্যক্তিকেই নিতে হবে। একাজ ফেরেশতাদের নয়। মানুষের মূল পরীক্ষা তো হয় এ ক্ষেত্রটিতেই। তার সমগ্র জীবনের প্রকৃত অর্জনটির মূল হিসাব হবে একাজে তার নিজ অবদানটির ভিত্তিতে। পরিবর্তনের একাজে মহান আল্লাহতায়ালা একমাত্র তাকেই সহায়তা করেন যে একাজে নিয়েত বেঁধেছে এবং সে লক্ষ্যে সর্বশক্তি বিণিয়োগও করেছে। চেতনায় কে মৃত আর কে জীবিত, কে স্থবির আর কে উদ্যোগী, কে দায়িত্বহীন আর কে দায়িত্ববান -সে পরীক্ষাটি তো হয় এক্ষেত্রটিতে। পশুর ন্যায় যে ব্যক্তি শুধু পানাহার ও বংশবৃদ্ধি করেই জীবনসাঙ্গ করলেো এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে কোন অবদানই রাখলো না, এমন কি নিজের জীবনদর্শন, মূল্যবোধ এবং বাঁচবার প্রক্রিয়াতেও কোন পরিবর্তন আনলো না, -তবে তার বাঁচায় সার্থকতা কোথায়? মহান নবীজী (সাঃ)র সময় এমন কোন সাহাবা ছিলেন না যারা নিজেদের এবং সে সাথে সমাজের অবস্থার পরিবর্তনে সর্বশক্তি দিয়ে আত্মনিয়োগ করেননি। নিজের সে পরিবর্তনের সে কাজটি শুরু করেছিলেন জ্ঞানার্জনের মধ্য দিয়ে। তাদের সে উদ্যোগে সেদিন আরবের নিরক্ষর ব্যক্তিগণ মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীব্যক্তিতে পরিণত হতে পেরেছিলেন। রাষ্ট্রের পরিবর্তনে বা বিপ্লবে তাঁরা নিজেদের অর্থ, সময় এবং প্রাণের বিণিয়োগ করেছিলেন। কিছু অতিবৃদ্ধ,পঙ্গু,অন্ধ ও বধির ছাড়া সে সময় এমন কোন সাহাবাই ছিলেন না যারা সেদিন যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর সামনে প্রাণদানে হাজির হননি।

পরিবর্তনের অর্থ, এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় গমন,বিবর্তন বা উত্তরণ। সেটি নানা দিকে এবং নানা ভাবে হতে পারে। কল্যানের পথে যেমন হতে পারে, তেমনি হতে পারে অকল্যানের পথেও। অবিকল রাস্তায় পথ চলার মত, যেমন প্রতি কদম পথ চলার সাথে পথিকের অবস্থার পরিববর্তন হয়। তবে সেটি সঠিক পথে না হয়ে ভ্রান্ত পথেও হতে পারে। জীবন পরিচালনাটি সঠিক পথে হওয়ার জন্য অনিবার্য শর্ত হলো আল্লাহর সাহায্য লাভ। নইলে সারা জীবনের জ্ঞানসাধনার পরও অনিবার্য প্রাপ্তি হতে পারে নিদারুণ বিভ্রান্তি। সেটি যেমন কার্ল মার্কস বা মাও সে তুঙ্গ’য়ের ক্ষেত্রে হতে পারে, তেমনি রুশো,ভল্টয়ার, বার্টান্ড রাসেলের ক্ষেত্রেও হতে পারে। পথ দেখানো কাজ একমাত্র মহান আল্লাহর। তিনি যাকে পথ দেখান তিনিই সৎ পান। এবং কেউ তাকে তখন বিভ্রান্ত করতে পারে না। তাই তিনি বলেছেন, “ইন্না আলায়নাল হুদা” অর্থঃ নিশ্চয় সঠিক পথ দেখানোর দায়িত্ব আমার” - সুরা লাইল। তবে সঠিক পথ প্রাপ্তির লক্ষ্যে মানুষেরও কিছু দায়ভার আছে। মহান আল্লাহতায়ালা ঘোষনা দিয়েছেন, “ওয়াল্লাযীনা জাহাদু ফিনা লা নাহদিআন্নাহুম সুবুলানা”- সুরা আনকাবুত, আয়াত ৬৯। অর্থঃ এবং যারা আমার রাস্তায় জিহাদ করবে আমি অবশ্যই তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করবো। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা এখানে ‘অবশ্যই’ শব্দটি যোগ করেছেন। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনে যেটি অপরিহার্য তা হলো এই সঠিক পথ। নইলে জীবনে চলার গতি বাড়িয়ে কোন লাভ নেই। তবে সঠিক পথের সে প্রাপ্তিটি ঘটে মহান আল্লাহর পথে জিহাদের মধ্য দিয়ে। এ আয়াতে জিহাদকে সত্য-পথ প্রাপ্তির চাবী বলা হয়েছে। জিহাদ হলো প্রচেষ্টা। মানুষ মাত্রই চেষ্টা করে। কিন্তু ক’জনের জীবনে জুটে সে সঠিক পথটি? চেষ্টা করাই এখানে যথেষ্ট নয়,বরং সে প্রচেষ্টা হতে হতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহর পথে। আল্লাহর সে পথটি হলো আল্লাহর দ্বীনের পূর্ণ আনুগত্যের।আর আনুগত্য শুরু হলে আল্লাহর বিধানের প্রতিষ্ঠাও শুরু হয়। সেটি যেমন ব্যক্তির জীবনে তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে। এমন এক সমাজে বিজয়ী হয় মহান আল্লাহর বিধান তথা শরিয়ত, এবং বিলুপ্ত বা পরাজিত হয় আল্লাহর অবাধ্যদের শাসন।

তাই যে সমাজে আল্লাহর পথে জিহাদ নেই, সে সমাজে সত্যপথ প্রাপ্তিও নাই। এমন সমাজে যেটি বাড়ে তা হলো পথভ্রষ্টতা। বাড়ে বিভক্তি, বাড়ে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুতি। অথচ আজকের মুসলিম সমাজে জিহাদ পরিণত হয়েছে মৌলবাদী তৎপরতা রূপে। ফলে মুসলিম সমাজে নামায-রোযা বাড়লেও জিহাদ বাড়েনি। ফলে বাড়েনি জনগণের সত্যপথ-প্রাপ্তি। বরং এসব নামাযীদের দ্বারা বেড়েছে মুসলমানদের কলহবিবাদ ও বিভক্তি। এমন সমাজে মানুষ যে কতটা দিশেহারা ও পথহারা হয় সেটি দেখা যায় তাদের রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও বিচার আচার দেখে। তখন সাধারণ মানুষ এতটাই দিশেহারা হয় যে তারা সমাজের অতি দুর্বত্তদেরও ভোট দেয়। তাদের বিজয়ে উৎসবও করে। এমন নামাযীরাও তখন ঘুষ খায়, সূদ খায় এবং নানারূপ দুর্বৃত্তি করে। দিশেহারা বা পথহারা শুধু সাধারণ মানুষই নয়, এমন কি আদালতের বিচারকেরাও। তাদের বিচারে ব্যাভিচারিও অপরাধী গণ্য হয়না। আল্লাহর অবাধ্যতাও দোষণীয় হয় না। এমন পথহারা লোকদের আধিক্যে কল্যাণের পথে কোন বিবর্তন বা পরিবর্তন আসে না। বরং সে সমাজে যেটি প্রবল আকার আসে সেটি শুধু বিচ্যুতিই নয়, বরং আসে পরাজয়, গ্লানি এবং দাসত্ব।

সমাজ পরিবর্তনে জরুরী হলো, জনগণ এ কাজে ময়দানে নামবে। সমাজে সমাজত্যাগী সাধু সন্যাসী বাড়লে সে সমাজে পরিবর্তন বা বিপ্লব আসে না। মহান আল্লাহতায়ালা চান, সকল সামর্থ নিয়ে মানুষ রাস্তায় নেমে আসুক। কোরআনে তাই বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কি হয়েছে যে যখন তোমাদেরকে বলা হয় যে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড় তখন তোমরা জমিন আঁকড়ে থাক? তোমরা কি আখিরাতের পরিবর্তে পার্থিব জীবনে পরিতুষ্ট? আখিরাতের তুলনায় পার্থিব জীবনের ভোগের উপকরণ তো অতি সামান্য। যদি তোমরা (আল্লাহর রাস্তায়) বের না হও তবে তিনি তোমাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দিবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করে দিবেন। তোমরা তাঁহার কোন ক্ষতিই করিতে পারিবে না। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” -সুরা তাওবা, আয়াত ৩৮-৩৯। মুসলমান হওয়ার অর্থ তাই শুধু কালেমা পাঠ বা নিছক নামায-রোযা আদায় নয়। নিছক কোরআন-হাদীস বা কেতাব পাঠও নয়। এগুলীর সাথে আল্লাহর রাস্তায় প্রাণপণে বেরিয়ে পড়াও। অর্থাৎ ঈমানদারের কাজ, সমাজ পরিবর্তনের সক্রিয় হাতিয়ারে পরিণত হওয়া। সমাজ বিপ্লবের কাজে প্রতিটি মুসলমান হলো মহান আল্লাহর খফিফা। তাই একাজে বের না হওয়ার অর্থ শুধু স্থবিরতা নয়, বরং এটি আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। পবিত্র কোরআনে সে বিদ্রোহকে তাই ভয়ানক আযাব প্রাপ্তির কারণ রূপে আখ্যায়ীত করা হয়েছে।

সত্যিকারের গণবিপ্লব

পবিত্র কোরআন যে বিষয়টির উপর বার বার জোর দিয়েছে তা হলো, সমাজ ও রাষ্ট্র-বিপ্লবের কাজে মূল হাতিয়ার হলো মানুষ। মানুষের জীবনে মূল মিশনটি হলো আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাওয়া। তাই বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাও।” -সুরা সাফ। আল্লাহতায়ালা চান, প্রতিটি মানুষ ময়দানে নেমে আসুক। রাজনীতি বা জিহাদের ময়দান ছেড়ে ঘরে গিয়ে উঠা নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাদের শিক্ষা নয়। কারণ সেটি হলে সে ময়দান দখলে যায় শয়তানী শক্তির হাতে। ঈমানদারদের ময়দানে নেমে আসার ফলেই মাঠ-ময়দান জুড়ে শুরু হয় গণবিপ্লবের জোয়ার। ইসলামি বিপ্লব এজন্যই প্রকৃত গণমানুষের বিপ্লব। ময়দানে নেমে আসা এবং সে ময়দানে আল্লাহর পথে নিজ মেধা, নিজ অর্থ, নিজ শক্তি এমনকি নিজ রক্তের বিণিয়োগের সে কাজটিই ইসলামে জিহাদ। এটি এক উচ্চতর ইবাদত। ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহর পথে এরূপ নেমে আসার মধ্য দিয়েই পায় ইহকালের কল্যান তেমনি পায় জান্নাত। এমন একটি বিশ্বাসই ঈমানদারের চেতনা রাজ্যে আনে আমূল বিপ্লব। আধুনিক সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায় মনজগতের এমন একটি বিপ্লব হলো ‘প্যারাডাইম শিফ্ট’। মনজগতের সে বিপ্লব তখন উপচে পড়ে সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে। যে সমাজে তেমন একটি বিপ্লব নেই,বুঝতে হবে সে সমাজের মানুষের মনজগতে সে বিপ্লবও নেই। মনজগতের সে বিপ্লবের মূল উপকরণটি হলো শিক্ষা। পবিত্র কোরআনের যে পাঁচটি আয়াত সর্বপ্রথম নাযিল হয়েছিল তাতে পড়, কলম ও এ শব্দগুলি একবার নয়, সব মিলিয়ে ৫বার উল্লেখিত হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা চান মানুষের জীবনে এবং সে সাথে সমাজে পরিবর্তনের কাজ শুরু হোক জ্ঞানার্জনের মধ্য দিয়ে। সোসাল ইঞ্জিনীয়ারীংয়ের লক্ষে মহান আল্লাহতায়ালার এটিই হলো নির্দেশিত মডেল। অজ্ঞতার পথে সেটি সম্ভব নয়। মহান নবীজী (সাঃ)তার মক্কী জীবনের ১৩টি বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে সে কাজটিই মূলতঃ করেছেন। ফলে বিপ্লব এসেছিল যেমন সাহাবাদের মনজগতে, তেমনি তাদের চরিত্র ও কর্মে। সে বিপ্লবের মজবুত ভিত্তির উপরই পরবর্তীতে গড়ে উঠেছিল ইসলামী রাষ্ট্র বিপ্লবের বিশাল ইমারত। আজও এটিই সমাজ বা রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের সূন্নতী মডেল। আজকের মুসলমানদের ব্যর্থতার মূল কারণ, মনজগতে ইসলামী চেতনার সে ভিত্তিই ধ্বসে গেছে। ফলে বিলুপ্ত হয়েছে আল্লাহর রাস্তায় বের হওযার প্রেরণা। অনেকে ইসলামি রাষ্ট্রবিপ্লবের স্বপ্ন দেখে চেতনা জগতে তেমন বিপ্লব না এনেই।

সমাজ বিপ্লবের একমাত্র সফল ইতিহাস

তবে ধর্মের নামে মানুষ যে বের হচ্ছে না তা নয়। তবে সেটি ব্যক্তি বা দলীয় বা ফেরকাগত স্বার্থে। কখনও ক্ষমতার লোভে। বিশ্বে মুসলিম দেশের সংখ্যা ও জনসংখ্যা উভ্য়ই বাড়ছে। সেসব দেশে নানা ব্যক্তি ও নানা দল নানা ভাবে ক্ষমতায়ও যাচ্ছে। কিন্তু তাতে কোন দেশেই ইসলামি সমাজ বিপ্লব আসছে না। বরং দিন দিন তারা ইসলাম থেকেই দূরে সরে যাচ্ছে। পথভ্রষ্টতায় কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছা অসম্ভব। তেমনি সমাজ বিপ্লবের সূন্নতি তরিকা ছাড়া সমাজবিপ্লবও অসম্ভব। কোরআন নাযিলের অর্থ শুধু সত্যপথ বা সত্য দ্বীনকে জানিয়ে দেওয়া নয়। বরং সেটির আলোকে সমাজ বিপ্লব আনা। নবীজী (সাঃ) তার জীবনের সবচেয়ে বড় সূন্নত রেখে গেছেন সে বিপ্লবের কাজ কি ভাবে সমাধা করতে হবে সেটি দেখানোর মধ্য দিয়ে। সভ্যতার নির্মানে বা সমাজ বিপ্লবে সেটিই হলো সর্বকালের মানুষের জন্য একমাত্র রোডম্যাপ। বিশ্বের অন্য ধর্ম বা অন্য মতবাদ থেকে ইসলামের সবচেয়ে বড় ও মৌলিক পার্থক্য তো এ ক্ষেত্রটিতেই্। অন্যধর্মের মানুষের হাতে কোরআনের মত আল্লাহ-প্রদত্ত কোন নির্ভূল রোডম্যাপ নেই। নেই সেটি অনুসরণ করে কীভাবে সমাজ বিপ্লব আনতে হবে সেটির উদাহরণ। তাই তাদের দ্বারা অতীতেও যেমন কোন সমাজ বিপ্লব সম্ভব হয়নি, তেমনি ভবিষ্যতেও অসম্ভব। বরং তাদের দ্বারা মানব ইতিহাসে যা যোগ হয়েছে তা হলো বিচিত্র রকমের বিভ্রান্তি। মানব ইতিহাসে সত্যিকার সমাজ বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল একমাত্র মুসলমানদের দ্বারাই। মানুষ তখন ফেরেশতাদের চেয়েও উচু পর্যায়ে উঠতে পেরেছিল। ইসলাম এজন্যই মানব ইতিহাসে অনন্য। আজও মুসলমানগণ সমাজ বিপ্লবের সফল ইতিহাস গড়তে পারে একমাত্র সে প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করেই। এ পৃথিবীতে আর কোন নবী আসবেন না। কিন্তু বিশ্বনবীর অনুসারি রূপে এমন একটি বিপ্লব আনা ও অন্যদের সে বিপ্লবের পথ দেখানো আজও সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা। মুসলমানের উপর এ দায়বদ্ধতা মহান আল্লাহর খলিফা রূপেও। তাই প্রকৃত মুসলমান বাঁচে এমন এক সমাজ বিপ্লবের আজীবন লড়াকু সৈনিক রূপে। তাই সমাজ বিপ্লব মুসলমানের কাছে নিছক কোন রাজনীতি নয়। সমাজসেবা বা খরয়রাতি কাজও নয়। বরং সেটি তার বাঁচবার আমৃত্যু মিশন।



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Tuesday, 26 October 2010 00:41
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.