Home •সংস্কৃতি ও সমাজ বিলেতে বাংলাদেশী কমিউনিটি
বিলেতে বাংলাদেশী কমিউনিটি PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 01 January 2011 08:59

বিলেতে বাংলাদেশীদের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। এদের মধ্যে সম্ভবতঃ শতকরা আশি ভাগেরও অধিক বৃহত্তর সিলেট জেলার। অধিকাংশেরই আগমন ঘটেছে ষাটের দশকে এবং সেটি বিলেতের বস্ত্রশিল্পে শ্রমিক ঘাটতি পূরণে। অধিকাংশই এসেছেন সিলেটের গ্রাম থেকে। বহু লক্ষ বাংলাদেশীর বসবাস মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা, এমনকি পাকিস্তানেও। তবে সেখানে কোন একক জেলার প্রাধান্য নেই। কিন্তু লক্ষণীয় হলো একমাত্র ইংল্যান্ড ছাড়া আর কোন দেশেই বাংলাদেশীরা কোন কমিউনিটি গড়ে তুলতে পারিনি। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানকারীদের অধিকাংশই অস্থায়ী শ্রমিক। যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের বাংলাদেশীদের বিরাট অংশ এখনও সেখানে স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তুলতে পারিনি। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এক বিশাল এলাকা জুড়ে। আর এমন ভাসমান ও বিক্ষিপ্ত জনগোষ্ঠি কখনই কোন দেশে কম্যুনিটি গড়ে তুলতে পারে না। কারণ, কম্যুনিটি গড়ার জন্য অপরিহার্য হলো মজবুত নেট ওয়ার্ক। একই জেলা থেকে আগত হওয়ার কারণে সেটি বিলেতের বাংলাদেশীদের মাঝে বিদ্যমান।

 

কমিউনিটি গড়ে উঠে একটি জনগোষ্টির ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে। এটি আত্মীক ও আদর্শিক সচেতনতার প্রতীক। যাদের মধ্যে এ কমিনিটি নাই তারা দৈহীক ভাবে বাঁচলেও উন্নত সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মজবুত মূল্যবোধ নিয়ে বাঁচে না।  ফলে রেখে যাতে পারে না নতুন প্রজন্মেÍ জন্য সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা। অথচ সন্তানের জীবন সুখময় করার ক্ষেত্রে সম্পদ ও ঘরবাড়ী  রেখে যাওয়ার চেয়ে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও উন্নত ঐতিহ্য বেশী গুরুত্বপূর্ণ। হযরত আলী (রাঃ)র ভাষায় সম্পদ মানুষকে নিছক পাহারাদারে পরিণত করে, অথচ শিক্ষা তার উপর সদা পাহারাদারি করে। আর শিক্ষালাভ শুধূ বিদ্যালয়ে হয় না, বেশী শিক্ষালাভ ঘটে পরিবারে বা কমিউনিটিতে। একাজে সমাজের প্রবীনরা শুধু শিক্ষক রূপেই নয়, অনুকরণীয় আদর্শ রূপেও কাজ করেন। বস্তুতঃ মানব শিশুরা বেশীর ভাব শেখে সমাজের এসব বিজ্ঞজনদের থেকে। তাই বিজ্ঞজন সৃষ্টি সমাজের সবচেয়ে বড় শিল্প। একাজের দায়িত্ব প্রতিটি কমিউনিটির। এটি স্বল্পকালীন কাজ নয়, বরং সর্বকালীন। নতুন জনপদে পা রেখেই সভ্য মানুষ তাই কর্মক্ষেত্র ও হাটবাজার যেমন খোঁজে তেমনি খোঁেজ নিজস্ব কমিউনিটি। এজন্যই মুসলিম ভূমিতে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অতি ফরজ। কারণ এ ছাড়া যথার্থ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাটিই নিশ্চিত হয়না। কিন্তু যে অমুসলিম ভুমিতে  ইসলামি রাষ্ট্র নির্মান অসম্ভব সেখানে মুসলিম কমিউনিটি নির্মান ছাড়া মুসলমানের ঈমান বাঁচানোই অসম্ভব। মানুষ শুধু ঘরবাড়ী ও পানাহারেই বাঁচে না। সামজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচর্যাও চায়। এটির গুরুত্ব যে অত্যাধিক সেটি চিকিৎস্যা বিজ্ঞানও আজ প্রমান করছে। স্বাস্থ্যসেবায় রোগী দৈহীক সুস্থ্যতা জুটলেও বহুরোগীর তাতে মানসিক সুস্থ্যতা নিশ্চিত হচ্ছে না। আর এ মানসিক পীড়ন লক্ষ লক্ষ রোগীর বাঁচাটিই নিরানন্দ করে ছাড়ছে। সেটি সারাতে এদেশে মাঠে নেমেছে হাজার হাজার সমাজকর্মী। রোগীদের বাড়ী বাড়ী গিয়ে তারা কাজ করছে। তারা দিচ্ছে ইমোশোনাল কেয়ার। বছরে কোটি কোটি ঘন্টা এরা শুধু এসব রোগীদের সাথে শুধু কথা বলে কাটায়। হাসপাতালের ডাক্তারগণ বা মহল্লার জিপি খুঁজে খুঁজে তাদের হাতে রোগী ধরিয়ে দেয়। এখন বৃটিশ সরকার বলছে, প্রতিটি বৃটিশ নাগরিকের জন্য শুধু একজন চিকিৎস্যক থাকলেই চলবে না, সমাজকর্মীও থাকতে হবে। ফলে বিলেতের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশী সমাজকর্মবিদ্যাও এখন জনপ্রিয় সাবজেক্ট। সরকার এদেরকে উচ্চ বেতনও দিচ্ছে। অথচ প্রতিটি মুসলিম সমাজে একাজটি অধিকতর সুচারুভাবে শত শত বছর ধরে করে আসছে মসজিদের ইমাম, প্রবীন প্রতিবেশী, পাড়ার মুরব্বী, পরিবারের সদস্য ও নিকট আত্মীয়গণ। প্রতিটি মুসলিম পল্লীতে মসজিদের জায়নামাজে, গাছের ছায়ায়, পুকুর পাড়ে, নদীর তীরে বা বৈঠকখানায় প্রবীন-নবীনের যে জলসা বসে সেটি কি কম গুরুত্বপূর্ণ? কিন্তু বিলেতের মত অমুসলিম দেশে সে ঘাটতি কে পূরণ করবে? কমিউনিটি যেখানে দূর্বল বা অনুপস্থিত সেখানে এসব নেই। ফলে হচ্ছে না সংস্কৃতিয়ান। প্রয়োজনীয় সামাজিক পরিচর্যার অভাবে যথার্থ ভাবে বেড়ে ঊঠছে না এখানকার বাংলাদেশী নতুন প্রজন্ম। ফলে সহজেই চোখে পড়ে কোন মুসলিম দেশে বেড়ে ঊঠা যুবকের সাথে তাদের পার্থক্য। এ পার্থক্যগুলো এতটাই স্পষ্ট যে সহজেই বোঝা যায় কাদের উপর কতটা ঘষামাজা হয়েছে আর কারা অপরিমার্জিতই রয়ে গেছে। ইসলামে এমন সামাজিক পরিচর্যা ও পরিশুদ্ধির  গুরুত্বপূণ অপরিসীম। মুসলিম সমাজে এ কাজটি করে মহল্লার মসজিদ। প্রায় প্রথম দেড় শত বছর মুসলমানদের কোন স্কুল, কলেজ বা মাদ্রাসা ছিল না, অথচ সে সময়ই বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল। সেটি সম্ভব হয়েছিল এ জন্য যে মসজিদ সেকালে আল্লহর দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউশন রুপে কাজ করেছিল। নবী পাক (সাঃ) মসজিদেও জায়নামাজে বসে কি পরিমাণ কাজ করেছেন এবং কত সময় ব্যয় করেছেন তা হাজার হাজার পৃষ্ঠার হাদিস সংকলন থেকেই বোঝা যায়। মসজিদ পরিণত হয়েছে নিছক নামাজ-ঘরে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন দূরে থাক সেখানে তা নিয়ে আলোচনা করাও বহু মসজিদে নিষিদ্ধ। এটি হলো বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। তবে এ ব্যর্থতা যে শুধু বিলেতে তা নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বেই। কিন্তু মুসলিম দেশে মসজিদের পাশাপাশি আরো বহু প্রতিষ্ঠান কাজ  করে, ফলে সুযোগ থাকে সে সব প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচর্যা লাভের। কিন্তু বিলেতের মত দেশে মসজিদই মূল। ফলে এটি যথার্থ ভাবে কাজ না করলে ক্ষিপর্যয় অনিবার্য।

 

এ নিয়ে আজ আর সন্দেহ নেই যে মানসিক রোগ, চারিত্রিক স্খলন ও অপরাধপ্রবনতা তাদের মধ্যেই অধিক যারা নৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে দরিদ্র। এ দারিদ্র্যতা একটি জনগোষ্ঠীকে ব্যর্থ জাতিতে পরিণত করে। চারিত্রিক স্খলন এবং জাতীয় পতন - গাড়ির দুটি চাকাব ন্যায় একই গতিতে একত্রে চলে। এর বড় প্রমান খোদ বাংলাদেশ। যত দ্রুততার সাথে এ দেশটি বিশ্বের একটি অতি অপরাধপ্রবন জাতি হওয়ার পথে পা পাড়িয়েছে ততই দ্রুততর হয়েছে তার পতন। ফলে আজ এটি শুধু বিশ্বের শীর্ষশ্রেণীর দূর্নীতিপরায়ন রাষ্ট্রই নয়, অন্যতম ব্যর্থ রাষ্টও। রাজনীতির নামে এখানে উৎসব করে প্রকাশ্য রাস্তায় মানুষ হত্যা হয়। গত ২৮শে অক্টোবর প্রায় বিশজন মানুষকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে। আহত করা হয়েছে শতাধিককে। মানব হত্যার এ রাজনীতির শুরু আজ নয়, বহু আগেই। পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের ডিপুটি স্পীকারকে সংসদ ভবনের মাঝে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এবং সেটি করেছিল রাস্তার কোন খুণী-সন্ত্রাসী নয়, বরং স্বয়ং সাংসদগণ। একজন ডাকাতও এমন জঘন্য খুনের কাজ প্রকাশ্য দীবালোকে করতে ভয় পায়, অথচ রাজনীতিবিদ সেটি রাষ্ট্রের সংসদে প্রকাশ্যে করেছেন। আর আজ তেমন খুনোখুনী রাজপথে করছেন তাদের কর্মীগণ। রাজনীতি হল জনগণের মাঝে সম্পৃতি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার শিল্প। এটি হল সভ্যতা নির্মানের বাহন। ইসলামে এজন্যই এটি ফরজ ইবাদত। নবীজী (সাঃ) এজন্যই রাজনীতির চালকের সিটে বসেছিলেন। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিবিদগণ এটিকে পরিণত করেছে দেশ ধ্বংসের হাতিয়ারে।

 

ইংল্যান্ড থেকে শিখবার বহু কিছুই রয়েছে। এখান থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উপকারে লাগতে পারে। এদেশটি একটি আন্তর্জাতিক সামাজিক ল্যাবরেটরি। বিশ্বের নানা প্রান্তর থেকে এখানে এসেছে বহু জাতির মানুষ। লন্ডনের কোন কোন স্কুলে একশতটিরও বেশী ভাষার প্রচলন। তবে কেউ কেউ কমুউনিটির জন্ম দিলেও সবাই তা পারিনি। যারা পারিনি তাদের বাঁচাটা আদৌ আনন্দময় হচ্ছে না। এরা ভুগছে নৈরাজ্য, হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায়। এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে আফ্রোকেরিবিয়ানরা। এদের মধ্যে মানসিক বিকলাঙ্গ, ড্রাগ এডিক্ট, মাতাল ও সামাজিক অপরাধির সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে অধিক। লন্ডনের রাস্তায়, বাসে বা ট্রেনে এদের অনেককে প্রলাপ বকতে দেখা যায়। এদের শিশুরা স্কুল কলেজেও ভাল করছে না। ইউরোপীয় উপনিবেশিকদের অপরাধ শুধূ এ নয় যে তারা বিশ্বের দুর্বল জাতিসমূহের সম্পদ লুট করেছে।এরচেয়েও বড় অপরাধ হলো তারা পরাজিত জাতিসমূহের সংস্কৃতিকেও বিনষ্ট করেছে। আর তাদের অপরাধের বড় শিকার যারা এই আফ্রোকেরিবিয়ানরা। ইংল্যান্ডে বসবাসকারিদের মাঝে সাংস্কৃতিক ভাবে সবচেয়ে বিপন্ন জনগোষ্ঠি হলো এরা। আঁখ ক্ষেতের শ্রমিক হিসাবে উপনিবেশিক বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা তাদেরকে আফ্রিকা থেকে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে নিয়ে যায়। আবার বিংশ্ব শতাব্দির গোড়ার দিকে রেল ও পাতাল রেলের শ্রমিক হিসাবে তাদেরকে বৃটেনে নিয়ে আসে। ফলে কোথাও তারা সাংস্কৃতিক শিকড় গভীরে ঢুকাতে পারিনি। গড়ে তুলতে পারিনি সামাজিক ইনস্টিটিউশন। আজও তারা ভাষামানই রয়ে গেছে। ফলে নির্মিত হয়নি সামাজিক, মানসিক ও সাংকৃতিক পরিচর্যার উপযোগী ক্ষেত্র। আর এরই কূফল ভোগ করছে তাদের নতুন প্রজন্ম। 

 

অতিশয় শংকার বিষয় হলো, অতিদ্রুত এ বিপন্ন আফ্রোকেরিবিয়ানদের পতন-যাত্রার সাথে যোগ দিচ্ছে বিলেতের বাংলাদেশী কম্যুনিটি। বরং বাস্তব অবস্থা হলো, এ দুটি কমুউনিটির কে কত দ্রুত নীচে নামতে পারে তা নিয়েই যেন প্রতিযোগিতা। কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশীরা অধিক নীচে নেমে গেছে। ইতিমধ্যে লন্ডনের টাউওয়ার হামলেটসয়ের বাংলাদেশী কমুউনিটি সমগ্র ইউরোপে মাদকড্রাগের ক্যাপিটাল হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলাদেশীদের সংখ্যা সমগ্র ইংল্যান্ডে এখানেই সর্বাধিক। তাদের মধ্যে বাড়ছে টিনেজ প্রেগনেন্সি, গ্যাঙ্গ ফাইট বা মাস্তানী এবং আরো বহুবিধ অপরাধ। এ এলাকায় নিরাপদ নয় রাস্তায় গাড়ি বা সাইকেল রাখাটাও। যেন মাস্তানকবলিত বাংলাদেশের একাংশ তুলে বিলেতে বসানো হয়েছে। অথচ একই দেশের একই পরিবেশে বাস করে বিলেতের চাইনিজ ও ভারতীয় কমিউনিটি শিক্ষাদীক্ষায় ইংরেজদের চেয়েও অগ্রসর। লন্ডনের বহু হাসপাতালের সিকিভাগ বা এক তৃতীয়াংশ চিকিৎসক এখন ভারতীয়। কেম্ব্রিজ, অক্সফোর্ড ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু প্রফেসর হল তারা। তারা বিপুল ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অন্যান্য পেশাতেও। অথচ বাংলাদেশীদের বিপুল ভাগ এখন সরকারি বেকারভাতার উপর নির্ভরশীল। যারা কর্মে নেমেছে তাদের অধিকাংশ ঢুকেছে হোটেল, রেস্তোরাঁ বা মুদির দোকানের কর্মচারিরূপে। এদেশে তিন দশকের বেশী বসবাস করেও তারা স্বনির্ভর হতে পারেনি। অথচ এদশে সে সুযোগ বিস্তর ছিল। বিলেতে স্কুলের লেখাপড়ায় পিতামাতার কোন অর্থব্যয় হয় না। গরীব পরিবারের ছাত্রদের জন্য স্কুলের খাবার বা সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়াও ফ্রি। এসব বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া শিখতে বিশ্বের নানা দেশের হাজার হাজার ছাত্র প্রতিবছর বহূ লক্ষ টাকা ব্যয় করে। কিন্তু বাংলাদেশীরা বিশ্ববিদ্যালয়েল পাশে থেকেও এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করেনি। সমস্যা হলো তাদের মধ্যে সে ভিশনই নেই। জীবনের যাত্রাপথে যে বহুদূর যেতে হয় এবং সেজন্য যে চাই যথার্থ প্রস্তুতি সে খেয়ালই অধিকাংশ বাংলাদেশীর নেই। আর না থাকার কারণে শিশূর লেখাপড়ার চেয়ে নগদ কামাই বেশী গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে  উপার্জনক্ষম হওয়ার সাথে সাথে অধিকাংশ পরিবারই সন্তানদের স্কুল থেকে সরিয়ে রেস্তোরাঁর কাজে ঢুকায়। ফলে সুযোগ হারায় শিক্ষিত রূপে বেড়ে ঊঠার। অথচ এ পেশায় যুবক বয়সে কিছূ পাউন্ড কামানোর সুযোগ জুটলেও বয়োবৃদ্ধির সাথে সে সুযোগ আর থাকে না। কারণ রেস্তোরাঁয়ার কাজে বয়স্কদের কদর নেই। অপরদিকে যুবক বয়সে রেস্তোরাঁয়ার কাজে থাকায় এদের অন্য স্কিল অর্জনের সুযোগও থাকে না। ফলে বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এরা চাকুরি হারায়। তখন সরকারি বেকার ভাতার উপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া তাদের আর উপায় থাকে না। যে কোন দেশের ন্যায় এদেশেও শিক্ষাই উপরে উঠার সহজতম সিঁড়ি। কিন্তু সে সিঁড়িকে বাংলাদেশী কমুনিটি কাজে লাগাতে পারিনি। অথচ এমন নির্বুদ্ধিতা ভারতীয় ও চাইনিজদের মাঝে নেই।

 

মানুষ যেখানেই যায় তার সংস্কৃতিকেও সাথে নিয়ে যায়। ফলে ষাটের দশকে ষারা বিলেতে এসেছিলেন তারা সাথে এনেছিলেন মুসলিম সংস্কৃতি। ফলে এদেশে এসে হারিয়ে যাননি। শিক্ষাদীক্ষায় অনগ্রসর হলেও তারা স্ংস্কৃতি সচেতন ছিলেন। তার জানতেন ইসলামি সাংস্কৃতির ধারা শক্ত ভাবে না ধরলে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির তীব্র স্রোতে হারিয়ে যেতে হবে। এ জন্য বিলেতের যেখানেই তারা বাস করেছেন সেখানে বাড়ী ক্্রয় করতে না পারলেও সুন্দর সুন্দর মসজিদ গড়েছেন। বলতে গেলে বিলেতের অধিকাংশ মসজিদের নির্মাতা তারাই। সে সব মসজিদে বাংলাদেশ থেকে উলামাদের এনে ওয়াজ মাহফিলের ব্যবস্থাও করেন। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে উঠা এ মানুষ গুলীই বিলেতের বড় বড় শহরে রাস্তায় টুপি মাথায় দিয়ে হাটেন। এদের কারণেই পূর্ব লন্ডনের রাস্তায় এখনও পর্দানশীন মহিলাদের সংখ্যা বাংলাদেশের যে কোন শহরের চেয়ে অধিক। তবে তাদের দ্বারা যে কাজটি হয়নি সেটি হলো নতুন প্রজন্মের জন্য সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আবহাওয়া নির্মান। যে সব মসজিদ নির্মিত হয়েছে সেগুলো দেখে মনে হয় যেন বাংলাদেশের কোন গ্রাম থেকে তুলে এনে লন্ডনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, শুধু বিল্ডিংয়েই যা পার্থক্য। ইমামের খোতবা, ওয়াজের বিষয়, ভাষা ও স্টাইল সবটাই যেন বাংলাদেশের গ্রাম থেকে আমদানীকৃত। ফলে তারা যা বলেন তাতে এদেশে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশেীদের মনের পুষ্টি জুটে না, বাস্তব জীবনে দিক নির্দেশনাও মেলে না। আরো বড় সমস্যা হলো, এদেশের যুবকদের সমস্যা নিয়ে তারা ততটা অবহিতও নন। কারণ তারা এদেশে বেড়ে উঠেননি। ইমামের দায়িত্ব যে কত বিশাল তা নিয়েও রয়েছে অজ্ঞতা। এ মিম্বরে বসেছেন নবী পাক (সাঃ) নিজে। তাই এখানে যিনি বসেন তাকে নবীজী (সাঃ)র সূন্নত পালন করতে হয়। আর সেটি হলো সমাজে নেতৃত্ব দানের সূন্নত। কিন্তু সে যোগ্যতা ক’জনের? ড্রাইভিং সিটে বসতে হলে অলি-গলির খোঁজ-খবর জানতে হয়, নইলে পথ হারানোর সম্ভাবনাই অধিক। তেমনি যিনি সমাজে নেতৃত্ব দিবেন তাকে সমাজের রোগ ও তার কারণগুলি জানতে হয়। এটি এক সমাজ বিজ্ঞানের অতিশয় বিশাল ক্ষেত্র। এ জন্যই ইসলামের প্রাথমিক যুগে সমাজের সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তিকে ইমাম বানানো হতো। কিন্তু বিলেতে তেমন মানুষের আকাল। ফলে মসজিদ থেকে যে কাজ অতিশয় কাঙ্খিত ছিল সেটিই হচ্ছে না। এতে  নতুন প্রজন্ম বেড়ে ঊঠছে ভয়ানক মানসিক অপুষ্টি নিয়ে। সে অপুষ্টি দুর করার লক্ষ্যে গড়ে উঠেনি ইসলামি স্কুল। বাংলাদেশী কমিউনিটির অনেকে এটি বুঝেই উঠতে পারেননি যে মুসলিম হিসাবে তাদের লক্ষ্য ও প্রয়োজন উভয়ই অন্যদের থেকে ভিন্ন। আর সে ভিন্ন প্রয়োজন যথার্থ ভাবে মিটাতে না পারলে মুসলিম পরিচিতি নিয়ে তাদের বেড়ে ঊঠাই অসম্ভব। 

 

মুসলমানের নিয়ত শুধু নামায-রোযায় থাকলে চলে না। প্রতি কর্মেই নিয়ত রাখতে হয়। এ নিয়তই তাকে বিশিষ্ঠ পরিচিতি দেয়। প্রতিটি কর্মকে পরিণত করে ইবাদতে। নিয়তের কারণেই হিজরত বা দেশত্যাগও পরিণত হয় ইবাদতে। সে নিয়ত হলো আল্লাহকে খুশী করা। দেশত্যাগতো পশুপাখিও করে। সাইবেরিয়ার শীতের পাখি হাজার হাজার মাইল অতিক্রম করে বাংলাদেশের বিল-বাদাড়ে গিয়ে পৌছে। সেটি জীবিকার অন্বেষণে। কিন্তু মুসলমানের দেশত্যাগের মাঝে থাকে মহত্তর প্রেরণা। জন্মভূমি ছেড়ে নানা দেশে ঘুরেছেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)। হিজরত করেছেন হযরত মূসা (আঃ) এবং হযরত মহম্মদ (সাঃ)ও। হিজরত করেছেন সাহাবায়ে কেরাম ও প্রাথমিক যুগের মুসলমানগণও। কিন্তু সে হিজরত রুটি-রোজীর জন্য ছিল না, ছিল আল্লাহর দ্বীনকে ঘরে ঘরে পৌছানোর কাজে। এ লক্ষ্যে তারা গিয়ে উঠছেন বৈরী পরিবেশে। কিন্তু সে পরিবেশে আত্মসমর্পন না করে গড়েছেন নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভূবন। গড়েছেন দ্বীনের প্রতিষ্ঠান। সেগুলোই সে পরিবেশে দূর্গের কাজ করেছে। এসব মুসলমানদের বসত ঘরগুলো কালের স্রোতে নিশ্চিহ্ন হলেও এখনও টিকে আছে তাদের গড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। সে প্রতিষ্ঠানই হলো মসজিদ। বস্তুতঃ মসজিদই হলো ইসলামের শ্রেষ্ঠ্র প্রতিষ্ঠান। জমিনের বুকে এটিই আল্লাহর নিজস্ব ও একমাত্র ইনস্টিটিউশন। প্রাথমিক যুগের মুসলমানগণ নিজের ঘর গড়ার চেয়ে আল্লাহর এ ইনস্টিটিউশন গড়াকে গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু মসজিদের অর্থ শূধু ইমারত নয়, তার কর্ম। এক্ষেত্রে বড় অনূকরণীয় আদর্শ হলো মদিনার মসজিদে নববী বা নবীর (সাঃ) মসজিদ। সেটিও নির্মিত হয়েছিল নবীজীর প্রবাস জীবনে। কিন্তু সমস্যা হলো বিলেতে মসজিদের সংখ্যা বাড়লেও নবীর (সাঃ) মসজিদের সে আদর্শ গুরুত্ব পায়নি।



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.