Home •সংস্কৃতি ও সমাজ একতা এত অরিহার্য কেন?
একতা এত অরিহার্য কেন? PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 01 January 2011 09:50

মুসলমানদের বিরুদ্ধে বুশ ও তার মিত্রদের ঘোষিত ক্রুসেড এখন আর কোন একক মুসলিম দেশে সীমাবদ্ধ নয়। এখন এটি বিশ্বময়। কোথাও হচ্ছে সেটি সামরিক আগ্রাসন রূপে; যেমন ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, লেবানন ও চেননিয়ায়। আবার কোথাও হচ্ছে সাংস্কৃৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের বেশে। সামরিক ক্রসেডে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষ মারা পড়ছে ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন ও চেননিয়ায়। অপর দিকে অসামরিক ক্রসেডে সামান্য পর্দা নিয়ে রাস্তাঘাটে বিপদে পড়ছে ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসকারি মুসলিম মহিলারা। এবং জানমাল ও ইজ্জত আবরু নিয়ে বেঁচে থাকায় দায় হচ্ছে ভারত, থাইলান্ড, বার্মা, চীন, ফিলিপাইনসহ বহু অমুসলিম দেশে বসবাসকারি বহু কোটি মুসলমানের। ইসলামি শিক্ষা ও আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার ইসলামের অতিশয় ফরয বিষয়গুলোও অসম্ভব হচ্ছে এমনকি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশে। অথচ যারা আল্লাহতায়ার খাতায় নিজেদের নাম মুসলমানরূপে লেখাতে চায় তাদের উপর আল্লাহর আইন বা শরিয়ত প্রতিষ্ঠা কাজটি হল ণূন্যতম ঈমানী দায়বদ্ধতা। এমন কি মোঘল ও সুলতানী আমলের শাসকগণও সে দায়বদ্ধতা পালন করেছিল নিষ্ঠার সাথেই। আইনআদালত থেকে আল্লাহর আইন সরানোর ন্যায় কুফরি কাজ সেসব স্বৈরাচারি শাসকগণও করেননি। অথচ আজ মুসলিম বিশ্বে শুধু স্বৈরাচারই নয়, বরং তার চেয়েও জঘন্য ও ভয়ংকর শত্র“গণ শাসক রূপ জেঁকে বসেছে। তাদের বড় অপরাধ, তারা আল্লাহ ও তাঁর আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী। তারা অসম্ভব করছে শুধু আল্লাহর আইনের বাস্তবায়নই শুধু নয়, বরং অভাবনীয় করে তুলেছে বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যকেও।

 

পাশ্চত্যেও পরিচালিত ক্রুসেডে প্রায় ১০ লাখ বেশী মানুষকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে একমাত্র ইরাকে। এবং দিন দিন সেটি আরো তীব্রতর হচ্ছে। নতুন ফ্রন্ট খোলা হয়েছে পাকিস্তান ও আফ্রিকার সোমালিয়া ও দারফোরে। এসব দেশের জনগণ যেন মশামাছি। মার্কিনীগণ তাদের হাতে নিহত মৃত আফগান, ইরাকী বা পাকিস্তানীদের দেহ গণনা করে না। তবে বুশের ঘোষিত এ ক্রুসেডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাকী নয়। তার সহচর শুধু ইসরাইল এবং ইংল্যান্ডই নয়। বরং পাশে ফ্রান্স, জার্মানী, ইটালী, ডেনমার্ক, হলান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজল্যান্ড, পোলান্ড, বুলগেরিয়া, চেক রিপাবলিকসহ নানা দেশ এখন আসল রূপ নিয়ে হাজির। মুসলমান বিরোধী এ কোয়ালিশনে মার্কিনীদেরকে সাথে তারা একাকার। পাশ্চাত্যের পূঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ এখন এক বহুজাতিক প্রজেক্ট। অথচ মুসলমানেরা আজ বিভক্ত ও বিভ্রান্ত। একটি বিভক্ত জাতিকে ধ্বংসের জন্য বড় রকমের শক্তি লাগে না, ক্ষুদ্র শক্তিও তাদের রক্ত নিয়ে তখন হোলি খেলে। মুসলমানগণ যখনই বিভক্ত হয়েছে মহাবিপদ তখনই তাদের উপর এসে হাজির হয়েছে। এমনই এক প্রেক্ষাপটে হালাকু খাঁ তার সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে মুসলিম রক্তে দজলা-ফুরাতের পানিকে লাল করেছে। অথচ মঙ্গলদের সমুদয় জনসংখ্যা বাগদাদ বা দামেস্কের ন্যায় একটি শহরের সমান ছিল না। কিন্তু ছিল ঐক্য। এবং মুসলমানেরা ছিল বিভক্ত। একটি জাতিকে শক্তিহীন করার জন্য অনৈক্যই যথেষ্ঠ। দেয়ালের মাঝে সিমেন্ট সরে গেলে সে দেওয়ালের ইট শিশুও খুলে নিতে পারে। দেওয়াল তখন সামান্য ধাক্কাতেই বিধ্বস্ত হয়। মার্কিন কোয়ালিশন এখন সে সামান্য ধাক্কা দেওয়ার কাজটিই করছে।  ফলে মুসলিম নিধনে বা মুসলিম-ভূমি দখলে কোথাও শত্রুর শক্তিহানি হয়নি। তেমন রক্তক্ষয়ও হয়নি। সামান্য সংখ্যক ইংরেজের কাছে এ কারণেই ভারতের মুসলমানগণ স্বাধীনতা হারিয়েছিল। একই কারণে পাঞ্জাব, সীমান্ত প্রদেশ ও কাশ্মীরের মুসলমানেরা তখন পরাজিত, ধর্ষিত ও নিহত হয়েছিল মুষ্টিমেয় শিখদের কাছে। মুসলমানেরা আজও একই রূপ পরাধীনতা ও গণহত্যার শিকার হচ্ছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। ফলে ফিলিস্তিনে নিরস্ত্র মুসলিম হত্যা ইসরারলের কাছে প্রাত্যাহিক রুটিনে পরিণত হয়েছে। তেমনি ভারতীয় সাম্প্রদায়িকদের কাছে প্রিয় স্পোর্টসে পরিণত হয়েছে সেদেশের মুসলিম হত্যা ও তাদের সম্পদ লুন্ঠন।

 

অনৈক্য মুসলমানদের জন্য যে কতটা ভয়ানক সেটি মহান আল্লাহতায়ালার চেয়ে আর কে বেশী জানে? এবং তিনিই তো মুসলমানদের প্রকৃত বন্ধু। কারণ, তারাই তাঁর সেরা সৃষ্টি। তাদের জন্য পরকালে যেমন তিনি জান্নাত তৈরী করে রেখেছেন, তেমনি দুনিয়াতেও তাদেরকে বিজয়ী দেখতে চান। এ বিজয়ের লক্ষ্যে বিজয়ের পথও তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলেছেনঃ ’ওয়া’তাছিমু বি হাবলিল্লাহে জামিয়াও ওয়া লা তার্ফারাকু..’ এবং তোমরা আল্লাহার রশি (কোরআন)কে শক্ত ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আল্লাহপাক মুসলিম জাতির জীবনে বিচ্ছিন্নতকে এভাবে হারাম করেছেন। যেমনটি হারাম করেছেন মদ্যপান, জ্বিনা বা মানব হত্যাকে। বিছিন্নতা বা বিভক্তি যে জাতির জীবনে আযাব ডেকে আনে সেটিও মহান আল্লাহ সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, ’ওয়া লা তাকুনু কাল্লাযীনা তাফাররাকু ওয়াখতালাফু মিম বা’দে মা যা’আ হুমুল বা’ইয়েনা, ওয়া উলায়েকা লাহুমু আযাবুন আজিম। (সুরা আল ইমরান – ১০৫) অর্থঃ ’তোমরা তাদের মত হয়োনা যারা নিজেদের কাছে সুস্পষ্ট ঘোষনা আসার পরও নিজেরা বিভক্তি হয় এবং পরস্পরে মতবিরোধ গড়ে। এরাই হলো তারা যাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে কঠিন আযাব।’  তাই বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা হল মহাপাপ। আর এ পাপ আল্লাহর আযাবকে যে অনিবার্য করে তোলে তা নিয়ে মহান আল্লাহপাকের এ সুস্পষ্ট ঘোষণার পরও কি কোন অস্পষ্টতা থাকে? বিষ পানে মৃত্যু অনিবার্য। বিষপানকারীকে বাঁচানো তাই আল্লাহপাকের সূন্নত নয়। এমন ব্যক্তির মৃত্যু না হওয়াটাই বরং অস্বাভাবিক ও অচিন্তনীয়। অনৈক্যও তেমনি জাতির পতন ডেকে আনে। এবং সেটি পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দেওয়ার পরও যারা সে পথকে বেছে নেয় তাদের উদ্ধার করাও মহান আল্লাহতায়ালার নীতি হয়। বরং সে অবাধ্যতার শাস্তি রূপে আল্লাহর আযাবকেই সেটি অনিবার্য করে তোলে। সে শাস্তি না আসাটিই বরং অস্বাভাবিক। তাই মুসলিম দেশে শুত্রুর হামলা এবং সে হামলায় গণনিধন, ধর্ষণ, শোষন ও নানাবিধ অত্যাচার - এগুলী মুসলমানদেরই নিজস্ব অর্জন। তারা হল সেই জাতি যারা ভাষা, বর্ণ, ভূগোল, মজহাব, এমনকি জেলাওয়ারী পরিচয় নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি গড়াকে নিজেদের কালচারে পরিণত করেছে। ভিন্নভাষী মুসলমানদের অর্থলুটই শুধু নয় তাদের হত্যাকেও আমরা রাজনৈতিক আচারে পরিণত করেছি। এমনকি বাংলাদেশেও লক্ষ লক্ষ অবাঙ্গালী মুসলমান নিঃস্ব হয়েছে এবং বহু হাজার নিহতও হয়েছে বাঙ্গালী মুসলমানের হাতে। এ ট্রাইবাল চেতনা থেকে মুক্ত নয় এমনকি পবিত্র মক্কা মদিনার পূর্ণ ভূমিও। ইসলামপূর্ব যুগের বর্বর জাহেলরাও নিজেদের গোত্রের নামে হেজাজের পবিত্র ভূমির নাম রাখেনি। এমন কাজ তাদের কাছেও রুচীহীন লেগেছে। কিন্তু আজকের সৌদিরা সেটিকেও হার মানিয়েছে। ইসলামের পবিত্র ভূমির নাম সৌদি আরব রেখে তারা এটিই প্রমানিত করেছে, তাদের প্রধাণতম অঙ্গিকার নিজ ট্রাইব বা গোত্রের প্রতি। নিজেদের গোত্রীয় শাসনকে বাঁচাতে অমুসলিম মার্কিন বাহিনীকে পবিত্র ভূমিতে ডেকে আনতেও তাদের বিবেকে বাধেনি। এমন কাজ তাদের কাছে অপরাধযোগ্যও মনে হয়নি। মুসলিম দেশে দুর্বৃত্তদের রাজতন্ত্র এই প্রথম নয়। উমাইয়রা এসেছে, আব্বাসীয়রা এসেছে, উসমানিয়ারাও এসেছে। তবে রাজতন্ত্র বাঁচাতে ইসলামের পবিত্র ভূমিতে হাজার হাজার কাফের সৈন্যের ঘাঁটি নির্মানের কাজ এই প্রথম। অথচ মুসলিম বিশ্বে তা নিয়ে প্রতিবাদ উঠেনি।  নিন্দাবাদও হয়নি। বরং এ স্বৈরাচারি শাসকদের কাছে বিশ্বাসভাজন হওয়ার নেশাই বরং প্রচন্ড। এমনকি সেটি সংক্রামিত হয়েছে মুসলিশ বিশ্বের আলেম, নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে। আল্লাহর সন্তোষ অর্জনের চেয়ে এ স্বৈরাচারি রাজাদের উপঢৌকন লাভকেই জীবনের বড় উপার্জন মনে করছেন। শুধু আরবদের জন্যই নয়, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্যও কি এটি অপমানকর যে মক্কামদীনার ন্যায় ইসলামের পূণ্যভূমি আজ মার্কিন যুক্তরাষ্টের কাছে আত্মসমর্পিত একটি রাজশক্তির কাছে জিম্মি। নিজেদের হেফাজতে যারা অপরাগ এবং নিজেরা যেখানে আত্মসমর্পিত অমুসলিমদের কাছে, পবিত্র ভূমির আবরু রক্ষা কি তাদের দ্বারা সম্ভব? উপজাতীয় এ অপচেতনার আধিপত্য শুধু হেজাজেই নয়, বরং এটি জেঁকে বসেছে আজ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে। এরূপ উপজাতীয় চেতনার প্রভাবেই মুসলিম বিশ্ব আজ পঞ্চাশের বেশী টুকরায় বিভক্ত। হৃদপিন্ডে জীবাণূ ঢুকলে তা যেমন  রক্তের সাথে মিশে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র অঙ্গে তেমনি ইসলামের পবিত্র ভূমি ট্রাইবালিজমে আক্্রান্ত হওয়াও সেটিও ছড়িয়ে পড়েছে আজ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে। হিন্দুদের জন্য ঐক্য কোন ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়। কিন্তু তারপরও তা সেটিকে আঁকড়ে ধরেছে। ভারতের আশি কোটি হিন্দু নানা ভাষা ও নানা বর্ণে বিভক্ত হওয়া সত্বেও একশত কোটি মানুষের বিশাল দেশ গড়ছে। ফলে ভারত আজ এক বিশাল সামরিক শক্তি। আমেরিকাও তাদের সমীহ করে চলে। কারণ, শক্তির কাছে কে না নরম? এবং এ শক্তির কারণ ভারতের সম্পদ নয়। বরং ভারতেই বাস করে বিশ্বেও সবচেয়ে বৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠি। তাদের এ শক্তির কারণ তাদের একতা। হাজার খানি কঞ্চি একত্রিত হলে হাতিও তা ভাংগতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে সেটিই হয়েছে। অথচ আমরা ১৫০ কোটি হয়েও ভারতের সিকি ভাগ জনসংখ্যার দেশও গড়তে পারিনি। মুসলমানদের ব্যর্থতা যাচায়ের এর চেয়ে বড় মানদন্ড কি থাকতে পারে? মনের ভূগোলই একটি জাতির রাজনৈতিক ভূগোল নির্ধারণ করে। যে জাতির মনের ভূগোল জুড়ে উপজাতীয় তান্ডব, তারা কি কখনো বৃহৎ ভূগোল নির্মানের গৌরব পায়? পায় কি একটি বৃহৎ শক্তির মর্যাদা? পায় যে না সেটিরই বড় সাক্ষর আজকের মুসলমানেরা। মুসলমান হওয়ার অর্থ শুধু এ নয় যে সে মসজিদে যাবে বা হজ্জ করবে। বরং অন্য ভাষা ও অন্য বর্ণের মুসলমানের সাথে একত্রে বসবাস, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সামান্যতম মানবিক গুণটিও থাকতে হবে। নানাভাষা ও নানা বর্ণে বিভক্ত ভারতীয় হিন্দুদের সেটি আছে। মার্কিনীদেরও আছে। মুসলমানদের মাঝে সেটি নাই বলেই তারা আজ পদে পদে পরাজিত ও অপমানিত। এ ব্যর্থতা নিছক মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে দূর হবার নয়। বিদ্যা-বুদ্ধি বা জনসংখ্যা বাড়িয়েও দূর হবার নয়।  সম্ভব নয় কোটি কোটি কপি কোরআন শরিফ ছেপে বা লক্ষ লক্ষ হাফিজে পয়দা করে। সারা রাত নফল নামাজে কাটিয়ে লাভ হবে নেই যদি না প্রতিদিনের ফরয কাজ গুলো সঠিক ভাবে পালিত না হয়। আর সে গুরুত্বপূর্ণ ফরয হল মুসলমানদের মাঝে একতা গড়া।

 

একতার বিকল্প একমাত্র একতাই। যারা সারা রাত নফল নামায পড়ে দিনের বিরাট অংশ যারা ঘুমিয়ে কাটায় তাদের দ্বারা কি এ ফরয পালিত হয়? হয়নি বলেই মুসলমানদের আজ এ বিপন্ন দশা। একতার বিষয়টি আল্লাহপাকের নির্দেশিত ফরজ। সারা বছর রোযা রাখলেও নামাযের ফরজ যেমন আদায় হয় না তেমনি সারা রাত ইবাদত করলেও একতা প্রতিষ্ঠার ফরয আদায় হয় না। তাই নানা দলে বিভক্ত হয়ে সারা জীবন তসবিহ-তাহলিল করেও বিভক্তি গড়ার ন্যায় হারাম কাজের পাপ মোচন হবে না। বিজয়ও আসবে না। বরং ভুগতে হবে পরাজয়ের কুফল। এবং পরকালে জুটবে মহান আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কঠিণ আযাব। মুসলমান বিশ্বে নামাযীর সংখ্যা কি কম? তাসবিহ-তাহলিল করা লোকের সংখাই কি কম? কিন্তু তাতে মুসলিম বিশ্বের কোথাও কি গৌরব বেড়েছে? এসেছে কি বিজয়? অন্য ধর্মের মানুষ যেখানে নানা ভিন্নতা সত্বেও একত্রে বসবাস, রাজনীতি, ব্যবসাবাণিজ্য ও যুদ্ধবিগ্রহ চালানোর মত উন্নত রুচীর পরিচয় দিচেছ্ মুসলমানেরা কি সেটি পারছে? বরং ইতিহাস গড়ছে কলহ-বিবাদে। অন্যরা যেখানে একতাবদ্ধ হচ্ছে মুসলমানেরা সেখানে ভাঙ্গার কাজকে উৎসবে পরিণত করছে। এটি কি কম পাপ? ফলে তাদের যেটি অর্জন সেটি বিজয় নয়, গৌরবও নয়। বরং স্বৈরাচার-কবলিত ও মানবিক-অধিকার বর্জিত দেশ হওয়ার কলংক। ৫৭টি মুসলিম রাষ্টের প্রায় প্রতিটিতে গণতন্ত্রের যে বিপন্ন দশা সেটি কি সে বর্বরতারাই প্রমাণ নয়?

 

মুসলমানেরা আজ দেশে দেশে যে বিপন্নদশার মুখোমুখি সেটি থেকে বাঁচাতে অন্য কেউই এগিয়ে আসবে না। সাম্প্রতিক ইতিহাস তার বড় প্রমাণ। বসনিয়ার মুসলমানেরা যখন লাখে লাখে নিহত হলো তখন কেউ এগিয়ে যায়নি। জাতিসংঘ এগিয়ে গিয়ে বরং সার্বীয় ঘাতকদের হাতে তাদের তুলে দিয়েছে। কাশ্মীরের ভাগ্য নির্ধারনে সেখানে গণভোট অনুষ্ঠানের প্রস্তাব পাশ করেও জাতিসংঘ সেখানে কিছুই করেনি বরং ভারতের গণহত্যাকে নিরবে সমর্থন দিচ্ছে। আজও যেটি আফগানিস্তান, ইরাক, চেচনিয়া ও কাশ্মিওে হচেছ এবং কিছুদিন আগে যা বসনিয়ায় হল সেটি যে আগামী কাল বাংলাদেশসহ অন্য কোন মুসলিম ভূমিতেও হতে পারে। এমন আযাব কোন দেশেই নোটিশ দিয়ে হাজির হয়নি। তাদের উপর আল্লাহর সাহায্যও নেমে আসে্িন। একটি বিভক্ত, বিভ্রান্ত ও ইসলামে অঙ্গিকারহীন জাতির জন্য আল্লাহতায়ালাতো আযাবই  পাঠান, সাহায্য নয়। সেটিই বার বার ঘোষিত হয়েছে পবিত্র কোরআনে। তবে এ আযাবের এখানেই শেষ নয়। শেষটি এর চেয়ে ভয়ানকও হতে পারে। তখন অমুসলিদের মতা বেশ ভূষা এবং তাদের সাথে সহযোগিতার হতা বাড়িয়েও রক্ষা হবে না। বাংলাদেশের মুসলমানেরা ভারতের সাথে বন্ধুত্ব করেও তাদের শোষণ থেকে মুক্তি পায়নি। বরং তাদের শোষণের কারণেই বাংলাদেশ পেয়েছিল আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলির খেতাব। বাংলাদেশে যখন কোন বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, এবং ছিল না কোন কল-কারখানা তখনও এ খেতাব জুটেনি।

 

মুসলমানের একমাত্র সহায় মহান আল্লাহ। অতএব এ বিপন্নদশা থেকে বাঁচতে হলে একমাত্র আল্লাহর সাহায্যলাভে মনযোগী হতে হবে। এবং সে সাহায্যলাভের পথ কোনটি সেটিও পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা অতি সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। আল্লাহপাক তাঁর প্রিয় বান্দাদের সাহায্যে অতিশীয় উদগ্রীব। তাঁর বিশাল ফেরেশতা বাহিনী তো এজন্য সদাপ্রস্তুত। মুসা (আঃ) এর ক্ষুদ্র বাহিনাকে তিনিই ফিরাউনের বিশাল বাহিনীর কবল থেকে রক্ষা  রেছিলেন। হযরত ইউনুসকে (আঃ) তিনিই তিমি মাছের পেট থেকে উদ্ধার করেছিলেন। তিনিই বাদশাহ আবরাহার বিশাল বাহিনীকে ধ্বংস করে অরক্ষিত ক্বাবাকে বাঁচিয়েছিলেন। গাছের একটি শুকনো পাতাকে মাটিতে ফেলা যতটা তুচ্ছ, মহান আল্লাহর কাছে ততটাই তুচ্ছ হলো কোন ফেরাউনকে ধ্বংস করা। এ যুগের নব্য ফেরাউনরাও এর ব্যতিক্রম নয়। আল্লাহপাক সে সাহায্যদানে সদা প্রস্তত। কিন্তু কথা হলো, আল্লাহর সে সাহায্যলাভে আগ্রহী বান্দাহ কৈ? নিশ্চয়ই তিনি এমন বাহিনীকে সাহায্য করেন না যারা শত্র“বাহিনীকে ইসলামের পবিত্র ভূমিতে ঘাঁটি নির্মানের অধিকার দেয় বা আল্লাহ প্রদত্ত আইনকে যারা নিজ দেশে নিষিদ্ধ করে। অথচ প্রায় সকল মুসলিম জনপদই এ পাপে পাপী। ফলে তারা কি আল্লাহর সাহায্য প্রত্যাশা করতে পারে? আল্লাহপাক তাদেরকেও সাহায্য করেন না যারা আল্লাহর অন্য বান্দাহকে ঘৃনার যোগ্য মনে করে শুধু এ জন্যই যে তার ভাষা বা জন্মস্থান ভিন্ন। আল্লাহপাকের বিচারে এগুলী জঘন্য অপরাধ। অতএব এ অপরাধীরা কি তাঁর সাহায্য পেতে পারে? আল্লাহপাকের ঘোষণাঃ ’ইন্নাল্লাহা ইউ হিব্বুল্লায্যীনা ইউকাতেলুনা ফি সাবিলিহি সাফ্ফান কা আন্নাহুম বুনিইয়ানুন মারসুস’ অর্থঃ ’ আল্লাহতায়ালা নিশ্চয়্ই তাদেরকে ভালবাসেন যারা তার রাস্তায় এমন ভাবে যুদ্ধ করে যেন তারা সিসা ঢালা প্রাচীর।’ নিছক নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলের মধ্য দিয়ে যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন এ আয়াতে রয়েছে তাদের জন্য বড়ই দুঃসংবাদ। আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ হতে হলে এজন্য নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল একমাত্র বিষয় নয়, বরং এ জন্য অতি অপরিহার্য হলো আল্লাহর পথে জিহাদ এবং এ জিহাদের জন্য সিসা ঢালা প্রাচীরসম ঐক্য।

 

বস্তুতঃ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ঈমানদারের মনে জিহাদ এবং জিহাদের লক্ষ্যে ঐক্যের সে ফাইন্ডেশনই তৈরী করে। ব্যক্তির জীবনে ইবাদত কতটুকু সফল সেটি পরিমাপের মানদন্ডও বস্তুত এই জিহাদ এবং ঐক্যের প্রতিষ্ঠা। তাই যে সমাজে জিহাদ এবং জিহাদের লক্ষ্যে ঐক্য নেই সে সমাজে ইবাদতের প্রক্রিয়া যে সঠিক ভাবে কাজ করছে না সেটি কি আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে? সাহাবায়ে কেরাম জিহাদ ও ঐক্যের পথেই আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় হতে পেরেছিলেন। তাই কোরআনে ঘোষণা এসেছে, ’রাদিআল্লাহু আনহুম, ওয়া রাদু আনহু।’ অর্থঃ আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর (মহান আল্লাহর) উপর সন্তুষ্ট। সাহাবায়ে কেরাম মাত্র ৩০ বছরে যত গুলী জিহাদ করেছেন বাংলাদেশের ন্যায় বহু মুসলিম জনপদ বিগত হাজার বছরেও তা করেনি। আর মুসলিম উম্মাহর সিসাঢালা প্রাচীরসম ঐকের কথা? সিসাঢালা ঐকের বদলে আমরা গড়েছি বিভক্তির প্রাচীর। এ প্রাচীর হিমালয়ের চেয়েও দুর্গম। হিমালয় অতিক্রম করা যায়, কিন্তু বিভক্তির এ প্রাচীর অতিক্রম করতে গেলে প্রতিবেশী মুসলিম দেশের সীমান্ত-প্রহরির হাতে গুলীর খাদ্য হতে হয়। এ সীমাহীন বিভক্তি গড়ে উঠেছে ভাষা, গোত্র, বর্ণ ও পৃথক পৃথক ভূগোলের নামে। মুসলিম বিশ্বের এ ভৌগলিক বিভক্তি গড়ে উঠেছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের দাসদের হাতে। আরব বিশ্বে উপনিবেশিক ব্রিটিশ ও ফ্রান্সের প্রবেশের আগে আরবগণ কি বিশেরও বেশী টুকরায় বিভক্ত ছিল? চিহ্নিত এ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ মুসলিম বিশ্বের এ বিভক্ত মানচিত্রের সবচেয়ে বড় পাহাড়াদারই শুধু নয় বরং ভয়ানক ভাবে ব্যস্ত কিভাবে আরো বিভক্ত করা যায়। ইরাকের মানচিত্রে হাত দেওয়ার কারণ তো এটি। মুসলমানদের অপরাধ, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে প্রচন্ড অনাগ্রহ থাকলেও এসব দেশের ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভক্তিকে অক্ষয় রাখতে তারা শুধু অর্থদানেই রাজী নয়, প্রাণ দানেও। এ বিভক্তিকে স্থায়ী করতে প্রতি মুসলিম দেশে গড়ে উঠেছে বিশাল বিশাল সেনা বাহিনী। কিন্তু তাতে মুসলিম উম্মাহর কোথায়ও কি কোন গৌরব বেড়েছে? রক্ষা পাচ্ছে কি মুসলমানদের জানমাল ও ইজ্জত-আবরু? মুসলিম দেশের সংখ্যা শতাধিক হলেও মুসলমানদের তাতে কোন লাভ হবে কি? তিরিশ কোটি মানুষের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের কোন নিভৃত জংগলে মার্কিন নাগরিকের গায়ে পাথর ছুড়লেও তার বিচার হয়। কারণ তারা ঐক্যবদ্ধ। কিন্ত একই বিশ্বে লাখে লাখে মুসলিম নিধন হলেও তার বিচার নেই। এর কারণ, মুসলমানদের অনৈক্য এবং জিহাদে অনাগ্রহ। মার্কিনীরা যেখানে বিশ্বের সর্বপ্রান্তে যুদ্ধে লিপ্ত মুসলমানদের সেখানে অনাগ্রহী নিজভূমির প্রতিরক্ষাতেও ।

 

গরু-ছাগলের জন্মই হয় জবাই হওয়ার জন্য। তাদের মৃত্যুতে তাই বিচার নেই, মাতমও নেই। বিচার তো তারাই পায় যারা সেটি আদায় করতে পারে। দেশে দেশে মুসলিম গণহত্যার বিচার না হওয়ার কারণ তো এটিই। ভারতের গুজরাটে হাজার হাজার মুসলমানকে পুড়িয়ে মারা হলো। শত শত নারী ধর্ষিতা হল। অথচ এ অপরাধে আজও কারো শাস্তি হলো না। একই রূপ অপরাধ হচ্ছে ইরাক, ফিলিস্তিন, কাশ্মীর,  চেচনিয়া ও আফগানিস্তানে। কিন্তু কোথাও কি এ অপরাধে কেউ কাঠগড়ায় উঠেছে? মুসলিম বিশ্বে আজ এক নিদারুন বিপন্নদশা। অনৈক্য নিজেই মহাপাপ, আর এ পাপই আজ মুসলমানদের জীবনে আযাব ডেকে এনেছে। তাই আযাবমুক্তির জন্য সর্বপ্রথম পাপমোচন ঘটাতে হবে। আর সে পাপমোচনের পথ হল, আল্লাহর রশিকে (ইসলামকে) মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধরা। বাড়াতে হবে জিহাদে সংশ্লিষ্ঠতা। আর এটিই হলো কোরআনী ঘোষণা। এ নিয়ে কি সন্দেহ আছে? (24/01/2003)



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Monday, 03 January 2011 17:10
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.