Home •সংস্কৃতি ও সমাজ সংস্কৃতি নিয়ে ভাবনা
সংস্কৃতি নিয়ে ভাবনা PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 01 January 2011 11:36

জাতি কতটা সভ্য বা উন্নত সেটির পরিমাপে সংস্কৃতি একটি নির্ভূল মাপকাঠি। একটি জনগোষ্টির চিন্তা-চেতনা, রূচীবোধ, চালচলন বা জীবনবোধের সামগ্রিক পরিচয় মেলে সংস্কৃতিতে। পশু বা উদ্ভিদের জীবনে সময়ের তালে বাঁচার প্রক্রিয়ায় উন্নতি আসে না। কিন্তু মানুষ তার সমাজকে নিয়ে সামনে এগোয়, পূর্বের চেয়ে উন্নততর ও সভ্যতর হয়। হাজার বছর পূর্বে পশুরা যা খেত আজকের জন্তু-জানোয়ারের খাদ্য, পানীয় বা বাসস্থানে অবিকল একই। কিন্তু মানুষ সামনে এগিয়েছে। আর সামনে এগুনোর এই যে প্রক্রিয়া সেটিই হলো সংস্কৃতি। এটি হলো সংস্কারের প্রচেষ্টা। যে কোন জীবন্ত ও সুস্থ্য জাতির জীবনে এ প্রচেষ্টা ক্রীয়াশীল থাকা শুধু কাক্সিক্ষতই নয়, অপরিহার্য। সমাজে সে প্রক্রিয়া কতটা সফল এবং কতটা কার্যকর সংস্কৃতি সেটারই পরিমাপ দেয়।

 

খনির স্বর্ণ আর অলংকারের স্বর্ণ এক নয়, উভয়ের মাঝে যে পার্থক্য তার পশ্চাতে থাকে দীর্ঘ পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া। তেমনি সভ্য মানুষ আর অসভ্য মানুষও এক নয়। এক নয় উভয়ের মাঝে আচার-আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ এবং বাঁচবার রূচিবোধও। এ পার্থক্যের মূলে থাকে একটি বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। সংস্কারের এ ক্রীয়াশীল প্রক্রিয়াই হলো সংস্কৃতি। সভ্য জাতির সভ্যতর হওয়ার পিছনে এটিই হলো মূল। তবে প্রশ্ন হলো কি সেই সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া? কি সে উপাদান যার ভিত্তিতে একটি জাতি অন্য একটি জাতি থেকে ভিন্নতর সংস্কৃতির জন্ম দেয় বা জীবনবোধে ভিন্নতর হয়? সচারচরই বলা হয় মুসলমানেরা সংস্কৃতিতে অমুসলমানদের থেকে ভিন্নতর। কিন্তু কি সে ভিন্নতা? কেন সে ভিন্নতা? জীবনমাত্রই গতিময়, এ গতি যেমন উর্ধ্বমুখী হতে পারে, তেমনি অধোমুখীও হতে পারে। ব্যক্তি বা জাতীয় জীবনেও স্থিতিবস্থা বলে কিছু নেই। এগুতে না পারলে পিছিয়ে যেতে হয়। মানবজাতির ইতিহাস এ উত্থান-পতনের ইতিহাসেই ভরপুর। এককালের বহু সভ্য জাতি কালের গতিতে পিছিয়ে গেছে। মসলমানেরা নিজেরাই এর প্রকৃষ্ট উদাহরন। আজকের তুলনায় চৌদ্দশত বছর পূর্বেও তারা বহুগগুণ উন্নত ছিল। এরূপ এগিয়ে ও পিছিয়ে যাওয়ার পিছনে কাজ করে সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া সক্রীয় থাকা না থাকার বিষয়টি।

 

ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে সংস্কারের প্রেরণা আসে ধর্মীয় বিশ্বাস বা দর্শন থেকে। মুসলমানের জীবনে সে ধর্ম বিশ্বাস বা দর্শন হলো ইসলাম। ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় নির্ণয়ে ইসলামই হলো মানদন্ড। সে মানদন্ডের ভিত্তিতে বাঁচবার মধ্যে পায় রূচীবোধ। আসে তার কর্মে আর বাঁচবার প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধি। ভূমি,ভাষা, জলবায়ু বা গাত্রবর্ণ এমন একটি রূচীবোধ বা মানদন্ড দিতে পারে না। ফলে ভাষা, জলবায়ু, ভুগোল ও বর্ণ অভিন্ন হওয়া সত্বেও বিভিন্নœ ধর্ম ও আদর্শের ভিত্তিতে বিভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম হয়। মানুষ উদ্ভিদ নয় যে ভূমি বা জলবায়ু থেকে তার বাঁচবার উপকরণ সংগ্রহ করবে। ব্যক্তির জৈবিক সত্ত্বার চেয়ে নৈতিক সত্ত্বাই মূল। এর জন্যই মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ্র সৃষ্টি। এবং তার নৈতিক শিকড় পুষ্টি পায় আদর্শ থেকে, ভূমি থেকে নয়। অভিন্ন আরব ভূমিতে একারণেই বিভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। বহুবিধ অনৈসলামিক সংস্কৃতির পাশে জন্ম হয়েছে ইসলামি সংস্কৃতির। ইসলামের কারণেই বিপ্লব আসে মুসলমানদের বিশ্বাসে, কর্মে, আচরণে ও রূচীবোধে। সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্টিত হয় আল্লাহ তায়ালার নির্দেশিত পথে ব্যক্তি ও সমাজ সংস্কারের প্রক্রিয়া। ফলে আরবের স্বভাসুলভ হানাহানীর পরিবর্তে স্থান পায় ই¯্পাতদৃঢ় ভাতৃত্ব। যুদ্ব-বিগ্রহ ও অশান্তির স্থলে প্রতিষ্টা পায় পারস্পরীক সৌহার্দ্য ও সম্পৃতি। ইর্ষা, ঘৃণা ও হানাহানী নয়, উৎচারিত হয় একে-অপরের প্রতি সালাম তথা শাš্তরি দোয়া। এভাবেই জন্ম নেয় মানব ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম মানব বা শান্তিময় বিশ্ব সৃষ্টির প্রক্রিয়া বা সংস্কৃতি।

 

ইসলামকে বাদ দিয়ে যে সংস্কৃতি গড়ে উঠে সেটি আর যাই হোক মুসলমানের সংস্কৃতি নয়। মুসলমান থেকে যেমন ইসলামকে   পৃথক করা যায় না, তেমনি তাকে পৃথক করা যায় না ইসলামি সংস্কৃতি থেকেও। সংস্কৃতি হলো ব্যক্তির বিশ্বাস ও চেতনার প্রতীক। বিশ্বাস বা চেতনা দৃশ্যময় নয়, সেটি দৃশ্যময় হয় সংস্কৃতির মাধ্যমে। রোগের যেমন সি¤টম বা লক্ষণ থাকে, স্বাস্থ্যেরও তেমনি বৈশিষ্ঠ্য থাকে। তেমনি আল্লাহতে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী উভয়েরই সনাক্তকরণের কিছু লক্ষণ থাকে। আল্লাহতে অবিশ্বাসীর জীবনে শ্লিলতা নয়, অশ্লিলতা প্রকাশ পাওয়াই স্বাভাবিক, কারণ তার জীবনের লাগাম খেয়ালখুশী বা প্রবৃত্তির হাতে। তার পোষাক পরিচ্ছদে, আমোদ-আহ্লাদে তথা বাঁচার মধ্যে অশ্লিলতা এজন্যই। কিন্তু মুসলমানের প্রতিটি কর্মে আল্লাহর ভয় বিমূর্ত। আল্লাহর উপর বিশ্বাস তার চাওয়াপাওয়ার উপর লাগাম পড়িয়ে দেয়। ফলে তার জীবন হয় নিয়ন্ত্রিত। কি আনন্দ-উল্লাস, কি দুঃখ-বিষাদ সব কিছুতেই আল্লাহর উপর তার নির্ভরতা। মুসলমানের শোকপ্রকাশ ও উৎসবের প্রক্রিয়া এজন্যই অমুসলমানদের থেকে ভিন্নতর। শোকে-দঃুখে সে বলে ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হি রা’জীয়ুন অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য্ এবং আল্লাহতেই আমরা ফিরে যাবো। এটিই তার বাঁচবার মূল দর্শন। কিন্তু অমুসলমানের মধ্যে সেটি থাকে না। ফলে তার রূচীবোধ ও সংস্কার মুসলমান থেকে ভিন্নতর। বাংলাদেশে মুসলিম এবং অমুসলিম হাজার বছর পাশাপাশী বসবাস করলেও এজন্যই তাদের উভয়ের আনন্দ-উল্লাস বা  উৎসব কখনই একই মোহনাতে মিলিত হয়নি। পানি ও তেলের ন্যয় আলাদাই রয়ে গেছে। বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে কারো স্মরণে দাড়িয়ে নীরবতা, বেদীমূলে বা ফটোতে মাল্যদানের যে সংস্কৃতি সেটি অমুসলমানের, মুসলমানের হতে পারিনি। মুসলমানেরা বরং বিদেহী আত্মার মাগফেরাতে দোওয়া-দরুদের মজলিস বসিয়েছে, কবর জেয়ারত করেছে, গরীব মিসকিনকে দান খয়রাত করেছে। এটিই হলো ইসলামি সংস্কৃতি। শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠা, মাল্যদান, এবং দাড়িয়ে নীরবতা পালনের যে সংস্কৃতিকে আপামর বাঙ্গালী সংস্কৃতি বলা হয়েছে সেটি সত্য নয়। ইসলামে অঙ্গিকারহীন সেকুলারেরা এর প্রবক্তা, কোন নিষ্ঠাবান মুসলিম নন। এটি কখনই ধর্মপ্রাণ মুসলমানের সংস্কৃতি হতে পারে না। তাছাড়া সাংস্কৃতিক কর্ম মুসলমানের কাছে নিজেই কোন লক্ষ্য নয়, লক্ষ্যে পৌছবার মাধ্যম মাত্র। মানুষের গুণের উংকর্ষ ঘটিয়ে ইসলাম তাকে ফেরেশতার পর্যায়ে পৌঁছাতে চায়, এবং ইসলামি সংস্কৃুতি হলো সে প্রক্রিয়া। তাই মুসলমানের কাছে এটি কোন বিনোদন নয়, আনন্দ-উল্লাসও নয়, এটি এবাদত। এ কাজে  তার প্রচ্ষ্টো জ্বেহাদের সমতূল্য। এমন কাজে ব্যবহৃত কলমের কালি শহিদের রক্তের ন্যায় পবিত্র।

 

আল্লাহতে বিশ্বাসী ও অনুগত হলে জীবন শ্লিল ও রূচীশীল হয়, আসে পবিত্রতা। ইসলাম পবিত্রতার প্রতিষ্টা চায় শুধু মসজিদে নয়, সমগ্র সমাজে ও রাষ্ট্রে। এমনকি আনন্দ-উৎসব ও শোক-দুঃখের আসর গুলোতেও। সমাজের কোন ক্ষুদ্রতর অংশ আনন্দ-উংসব বা সাংস্কৃতিক ক্রীয়াকর্মের নামে অশ্লিলতা ও নোংরামীতে আক্রান্ত হোক ইসলাম তা চায় না। কারণ এগুলো রোগ, আর রোগমাত্রই সংক্রামক। এগুলীর শুরু ক্ষুদ্রতর স্থান থেকে হলেও আস্তে আস্তে সমগ্র রাষ্ট্রকে গ্রাস করে। এ অশ্লিলতা নাটকের মঞ্চ, সিনেমা হল, যাত্রা দল বা নিষিদ্ধ পল্লীতে শুরু হলেও সেখানে সীমাবদ্ধ থকে না। আগুনের ন্যায় ঘর থেকে ঘর, গ্রাম থেকে গ্রামকে গ্রাস করে। এজন্যই ব্যক্তি ও জাতির পরিশুদ্ধির প্রয়োজনে ইসলাম সমাজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অঙ্গণ থেকেও অশ্লিলতার নির্মূল চায়। কোন স্থানকেই ইসলাম একাজে লাইসেন্স দিতে রাজী নয়।

 

সমাজ পরিশুদ্ধির প্রয়োজনে ইসলাম শুধু ব্যক্তির মৌখিক কালেমা পাঠের মধ্যেই দায়িত্ব সাড়ে না, বরং তাকে একটি বিশেষ মডেলে গড়ে তুলতে চায়। আর সে মডেল হলো, রাসূলে পাকের (সা) মডেল। কালেমা উচ্চারণের মধ্য দিয়ে সেটি শুরু হয় বটে তবে শেষ হয় না। এর জন্য তাকে চিন্তা-চেতনা, আমল-আখলাক বিশুদ্ধকরণের বিশেষ এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। ইসলামি সংস্কৃতি হলো সে বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। আরবীতে এটিকে বলা হয় তাহযীব। তাহযীব হলো আরবী ব্যকারণের বাবে তাফয়ীলে হাযযাবা শব্দের ক্রিয়া বিশেষ্য। এ বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া কাজ না করলে পূর্ণাঙ্গ মুসলিম করার প্রক্রিয়াই বন্ধ হয়ে যায়। কারণ মানুষ বইপত্র বা স্কুল-কলেজ থেকে যা শেখে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী শেখে সংস্কৃতি থেকে। মাছ যেমন পানিতে বেড়ে উঠে, মানুষও তেমনি বেড়ে উঠে তার সংস্কৃতির মধ্যে। জীবনের মূলপাঠ সে সেখান থেকেই লাভ করে। তাকে কেন সৎ হতে হবে, কিভাবে সৎ হতে হবে, কেন ধর্মে একনিষ্ট হতে হবে, কেন অপরের দুঃখে দুখী এবং সুখে সুখী হতে হবে, কিভাবে বড়দের সন্মান ও ছোটদের স্নেহ করতে হবে, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন বা মেহমানকেই বা কিভাবে আপ্যায়ীত করবে, জীবনের মূল ফিলোসফি কি সে গুলো সে শেখে সংস্কৃতি থেকে। ইসলাম শুধু কালেমা বা নামাজ পাঠ শেখায় না। শুধু কালেমা বা নামাজ পাঠে সেটি সম্ভব হলে আমরাও আজ সে প্রাথমিক যুগের ন্যায় মানব সৃষ্টিতে সমর্থ হতাম। নবীজীর (সা) আমলে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হাজারে হাজারে তৈরী হয়েছিল এ প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল থাকার কারণে। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে তারাই আমাদের একমাত্র গর্বের ধন। আমরা শত কোটিরও বেশী মুসলমান তাদের হাজার ভাগের এক ভাগও সৃষ্টি করতে পারিনি। অথচ তারা কোন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হননি। সেদিনের মত আজ আর উন্নত মানব সৃষ্টি হচ্ছে না, কারণ ইসলামের সে বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়াই বিনষ্ট বা বিলুপ্ত হয়েছে। এজিদের হাতে যে খোদায়ী প্রক্রিয়াটা একবার বিনষ্ট হলো সেটি আর সঠিকভাবে মুসলমানেরা প্রতিষ্টাই করতে পারলো না। ফলে চরিত্রহীনতায় আমরা বিশ্বের বহু অমুসলমানকেও ছাড়িয়ে গেছি।

 

ইসলামের শত্রপক্ষ ইসলামের উপর সরাসরি হামলাতে ভয় পায়। তারা ইসলামের বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া বা সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করতে চায়। বীজকে গজাতে দেওযার পর তাকে  বেড়ে উঠার সুযোগ না দিলে সেটি নিস্ফল আয়ু পায় মাত্র, ফল দেয় না। মুসলমানের জন্ম বন্ধ করতে না পারলেও মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাকে তারা বন্ধ করেছে। ফলে আমরা শতকোটির অধিক মুসলমান ইসলামের বিজয়ে কোন অবদানই রাখতে পারছি না। এহেন নিস্ফল জীবনের সবচেয়ে জাজ্বল্যমান ও নিকৃষ্টতর উদাহরণ হলো বাংলাদেশের ১২ কোটি মুসলমান। ফলে বাংলাদেশে ইসলামের পবিত্র কোরআন অক্ষত থাকলেও পশ্চাদপদতায় আমরা রেকর্ড গড়েছি। পরিশুদ্ধিও বদলে বাড়িয়েছি কদর্যতা, দূর্নীতি বিশ্বে প্রথম হয়েছি। দূর্নীতি, মিথ্যাচার, সন্ত্রাস ও ভিক্ষাবৃত্তিকে আমরা একটি শিল্পে পরিণত করেছি। পতিতাবৃত্তি ও উলঙ্গতার ন্যায় পাপাচারকে না রুখে আরো ব্যাপকতর করছি। বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার বদলে যে দূষিতকরণ প্রক্রিয়া উপনিবেশিক শত্র“রা চালু করেছিল তাকে উৎখাত না করে বরং যুগের তালে আরো আধুনিকীকরণ করেছি। ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও অন্য মুসলমানদের কল্যানে কিছু করা দুরে থাক নিজেদের কল্যানেও কিছূ করতে পারছি না। আর শত্র“পক্ষের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের ইসলামের বিরোধী পক্ষও সেটিই চায়। মুসলমানদের ইসলামে অঙ্গিকারহীন করার কাজে দেশের চলমান অপসংস্কৃতিকে তারা হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করছে। ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নয়, ভ্ষাাভিত্তিক পরিচয় নিয়ে মুল কারণ এখানেই।

 

সংস্কৃতির মাধ্যম বহু। বহু মাধ্যম অপসংস্কৃতির তথা দূষিতকরণ প্রক্রিয়ারও। ইসলামী সংস্কৃতির মূলকেন্দ্র হলো মসজিদ। এটিই হলো মর্তের বুকে আল্লাহর প্রতিষ্ঠান। এখান থেকেই দ্বীনের আলো মহল্লার অন্ধকার সরায়। কিন্তু ইসলাম বিরোধী শক্তি ইসলামী সংস্কৃতির এ প্রাণকেন্দ্রকে বহুলাংশেই প্রাণহীন ও অকার্যকর করেছে। আল্লাহর এ পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্টানটি ব্যবহৃত হয়েছে নিছক নামাজ আদায়ের স্থানরূপে। নামাজের সময় ব্যতীত লক্ষ লক্ষ মসজিদের মহামুল্যবান অঙ্গন অধিাকংশ জনশূণ্য থাকে। দ্বীনশিক্ষা, মানুষের মাঝে ভাতৃত্ব গড়া, সমাজসেবা, জুলুমের বিরুদ্ধে জ্বিহাদ সংগঠিত করা এবং জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার যে কাজ মসজিদের মিম্বর থেকে হত তা আজ বিস্মৃতপ্রায়। এসব কাজের জন্য সেসময় মসজিদ ভিন্ন মুসলমানের অন্যকোন প্রতিষ্ঠানই ছিল না। ক্লাব, যাত্রাদল, সিনেমা ও নাট্যমঞ্চ এগুলি জন্ম ও পরিচর্যা পেয়েছে অমুসলমানের হাতে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে যে সংস্কৃতি চর্চা হয় সেটিও মুসলমানের নয়। ইসলামের আলোকে এগুলি সংস্কৃতি নয়, অপসংস্কৃতি। মুসলমানের পবিত্রতা থাকেতে হবে শুধু নামাজে নয়, প্রতিটি কর্মেও। কারণ, নামাজের পাশাপাশি প্রতিটি কর্মের জন্যও সে আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ। মসজিদের জায়নামাজের যে পবিত্রতা সেটি অন্যত্র সম্ভব নয়। তাই সমাজীকরণ প্রক্রিয়ার প্রয়োজনে অন্যরা ক্লাব গড়লেও পবিত্রতার স্বার্থে মুসলমানেরা শুধু মসজিদই গড়েছে। নিছক কয়েক মিনিটের জন্য জায়নামাজে আসাতে ব্যাক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি আসে না। নবীজী (সা) তাঁর সাহাবাদের নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আল্লাহ এ পবিত্র ঘরে কাটিয়েছেন, দ্বীনের আলোকে তাদেরকে আলোকিত করেছেন। জ্ঞানই সংস্কারের মূল উপাদান, চেতনায় পরিবর্তন সাধনে এর বিকল্প নেই। জ্ঞানই মানুষকে মুসলমান বানায়। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআন পাকে বলেছেন, একমাত্র জ্ঞানীরাই আমাকে ভয় করে। কোরআনের প্রথম আয়াতে ইকরা বা পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নামাজ ফরজের আগে ইসলাম এভাবে ইলম চর্চাকে ফরজ করেছে। অথচ মুসলিম সমাজের অজ্ঞতা আজ অমুসলিম সমাজের চেয়েও গভীরতর। সমাজের এ গাঢ় অন্ধকার দেখেই বলা যায়, দ্বীনের আলো এখানেও পূর্ণভাবে জ্বলেনি। সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে অন্ধকার সরাতে আল্লাহর এ প্রতিষ্টান মসজিদ সফলতা আনতে পারেনি। ফলে নির্মিত হয়নি সুস্থ্য সংস্কৃতি। দ্বীনের বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়াকে রুখতে শত্র“শক্তি মসজিদকে যেমন নিষ্ক্রিয় করেছে, তেমনি প্রতিষ্ঠা করেছে নাচগান, যাত্রা, নাটক, সিনেমা, মদ্যপান, বেশ্যাবৃত্তি ও নানান অশ্লিলতা। এগুলোর ফলে মুসলমানদের চেতনা যেমন অসুস্থ্য হয়েছে, তেমনি কদর্যতা পাচ্ছে তাদের রুচীবোধ ও আচার-আচরন। সাহিত্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাহিত্য জ্ঞানের বিস্তারে পাইপলাইনের কাজ করে। কিন্তু অশ্লিল সাহিত্য এ পাইপলাইনের মাধ্যমে ঘরে ঘরে রোগের বিস্তার ঘটায়। দূষিত পানিতে দেহ রোগাগ্রস্থ হয়, দুষিত সাহিত্যে রোগাগ্রস্থ হয় সমগ্র চেতনা। চেতনার এ রোগাগ্রস্থ্যতার কারণেই মানুষ চুরি-ডাকাতি, খুন-ধর্ষন ও রাহাজানিতে লিপ্ত হয়।  বাংলাদেশে আজ সেটিই হয়েছে। সংস্কৃতি হলো মানুষকে সভ্যতর করার শিল্প। মানুষ সভ্যতর হয়, সমাজ সামনে এগোয়, এবং রাষ্ট্র সমৃদ্ধতর হয় এ শিল্পের গুণেই। বাংলাদেশে আজ যে অবাধ ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, হত্যার সয়লাব, সেটিই প্রমাণ করে এ সৃষ্টিশীল শিল্প এদেশে গড়ে উঠেনি। বরং বেড়েছে মানুষকে অসভ্যতর করার শিল্প অর্থাৎ অপসংস্কৃতি। এটির টানে যেন উর্ধ্বশ্বাসে আমরা আঁধারের দিকে ছুটেছি। আর এরূপ আঁধারের দিকে নেওয়াই শয়তানের কাজ, বেঈমানদের সেই সুহৃদ। কোরআন পাকে সেটিই বলা হয়েছে। সংস্কৃতির লেবাসে যুগে যুগে মানুষকে সে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে ধাবিত করছে। এটিই শয়তানের সনাতন ধর্ম। শয়তানের এ ধর্ম কোন কিতাব নির্ভর নয়, সংস্কৃতি নির্ভর। সংস্কৃতির ছদ্দবেশে সে ব্যক্তির পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়াকে চিরতরে রুখতে চায়।

 

বাংলাদেশে ইসলামের উপর জঘন্যতম হামলা আসছে এই সাংস্কৃতিক কর্মীদের পক্ষ থেকেই। মৌলবাদ নির্মূল করার নামে এরাই ইসলামকে নির্মূল করতে চায়। এদের কারণে জাতিকে সভ্যতর করার মাধ্যমগুলো আজ বিপর্যস্ত। কবিতার নামে, যাত্রা-নাটক ও সিনেমার নামে এরা মানুষের চিন্তা-চেতনাকে দিন দিন আরো অসুস্থ্যতর করছে। বাড়ছে উলঙ্গতা, বাড়ছে অশ্লিললতা, বাড়ছে নেশাগ্রস্থতা। ফলে পাড়ার বখাটে ছেলেটি ধর্ষণে উৎসাহ পাচ্ছে। ফলে পাড়ায় পাড়ায় যতই বাড়ছে নাট্যদল, ক্লাব, ভিডিও, সিনেমা হল ততই বেড়ে চলেছে সমাজে অসুস্থ্যমানুষের ভিড়। এদের কারণে ৩০ বছর পূর্বে জাতি নীতিনৈতিকতা ও মুল্যবোধের মানদন্ডে যে পর্যায়ে ছিল তার চেয়ে অনেক নীচে নেমেছে। সংস্কৃতি চর্চার নামে এ পতন-প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে ইসলামের নির্মূলে শত্রুর একটি তীরও ছোড়ার প্রয়োজন পড়বে না। সাংস্কৃতিক ভিন্নতাই রাজনৈতিক ভিন্নতার জন্ম দেয়। সেটি বিলুপ্ত হলে আমাদের পৃথক থাকার যুক্তি বা ভিত্তিই বিলুপ্ত হবে, ফলে বিপর্যস্ত হবে আমাদের স্বাধীনতা ও জাতীয় অস্তিত্ব। বাংলাদেশের ভারতপন্থী সাংস্কৃতিক কর্মীরা ব¯ু‘তঃ সে কাজেই  দ্র্রুত অগ্রসর হচ্ছে। এদের প্রতিপালনে একারণেই ভারতের বিপুল বিনিয়োগ। বাংলাদেশে এ অবধি কোন শিল্পে এরা একটি পয়সা বিনিয়োগ না করলেও কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকর্মে ও মিডিয়াতে। দলে দলে আসছে নাট্যকর্মী, গায়ক-গায়িকা ও সিনেমাকর্মী। একাজে তাদের একনিষ্ট সেবকদের তারা পুরস্কৃতও করছে। জাতিকে বাঁচাতে হলে চেতনার দূষিতকরণ প্রক্রিয়া থেকে জাতিকে বাঁচাতে হবে। যে পাইপ লাইনে ঘরে ঘরে সংস্কৃতির নামে জাতি ধ্বংসের জীবাণু পৌছে তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। আমাদের বাঁচবার তাগিদে অতিশয় প্রয়োজন হলো সংস্কৃতির সংস্কারের। জাতির সুস্থ্যতা আসতে পারে একমাত্র এর পরেই। (03/08/2003)



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.