Home •সংস্কৃতি ও সমাজ সংস্কৃতি ও সভ্যতার সংকট প্রসঙ্গে
সংস্কৃতি ও সভ্যতার সংকট প্রসঙ্গে PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 01 January 2011 18:31

সংস্কৃতি বলতে আমরা কি বুঝি? সংস্কৃতির সুস্থ্যতা বা কদর্যতাই বা কি? সুস্থ্য সমাজ, রাষ্ট ও ব্যক্তি গঠনে সং¯কৃৃতির গুরুত্ব কতটুকু? সুস্থ্য সংস্কৃতিই বা কিভাক্ষে নির্মিত হয়? সভ্যতার নির্মানে তার গুরুত্বই বা কি? সাংস্কৃতিক সুস্থ্যতা নিয়ে যারা বেড়ে উঠতে চায় এবং নির্মান করতে চায় সভ্যতর সমাজ ও রাষ্ট্র, এমন প্রতিটি ব্যক্তির কাছে এ প্রশ্নগুলো অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। রোগ কিসে হয়, স্বাস্থ্যই্ বা কি করে বৃদ্ধি পায় - এটুকু না জানলে নিজ-দেহের উপরও পদে পদে অবিচার হয়। স্বাস্থ্যজ্ঞান এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো সংস্কৃতির জ্ঞানও। কারণ এটিই সুস্থ্যতা আনে রুচিবোধে। রুচির প্রকাশ ঘটে তখন পোষাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, আনন্দ-উল্লাস তথা বাঁচার প্রতিটি আয়োজনে। তাই জ্ঞানার্জনের লক্ষ্য নিছক তথ্যদান হলে চলে না, সুস্থ্য-সংস্কৃতির নির্মাণ ও পরিচর্যায়ও তাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হয়। প্রতিটি জ্ঞানবান ব্যক্তি তখন সংস্কৃতিবানও হয়।

 

সংস্কৃতির সংজ্ঞা নিয়ে নানা মনিষীর নানা মত। এ ভিন্নতা এসেছে এসব মনিষীদের এ জীবনে বাঁচার লক্ষ্য নিয়ে ধারণাগত ভিন্নতা থেকে। আমাদের বসবাসের পৃথিবীটা এক হলেও বাঁচবার লক্ষ্য সবার এক নয়। ফলে ভিন্ন হয় জীবনের স্বপ্নগুলোও। এ থেকেই ভিন্নতা সৃষ্টি হয় বাঁচার পথ ও পাথেয়তেও। মুসলমান থেকে একজন অমুসলমানের এজন্যই বিপুল পার্থক্য। সে পার্থক্য নিছক খাদ্য-পানীয়তে নয়, বরং জীবনের সর্বত্র জুড়ে। জীবন ও জগতকে যেমন আমরা সবাই একভাবে দেখি না তেমনি দেখি না সংস্কৃতির ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেও। সংস্কৃতি এজন্যই সংজ্ঞায়ীত হয়েছে নানা ভাবে। বাঁচার মধ্যে উচ্চতর বিবর্তন বা জীবনকে নিরন্ত্রর রুচিশীল করার যে প্রক্রিয়া সেটিই হলো সংস্কৃতি। সংস্কৃতি থেকে ব্যক্তি পায় কিভাবে সমাজে বাঁচতে হবে তাঁর শিক্ষা। একটি দেশের জলবায়ু, আবোহাওয়া ও ভৌগলিক প্রকৃতি নির্ধারণ করে সেখানে কি ধরণের উদ্ভিদ ও প্রাণীকূল বাঁচবে। তেমনি একটি দেশের সংস্কৃতিও নির্ধারণ করে সেখানে কি ধরণের মানুষ বেড়ে উঠবে। প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন নির্ধারণ করে জীবকুলের জৈবিক ভাবে বেড়ে উঠাটি, তেমনি সংস্কৃতিও নির্ধারণ করে নৈতিক বা মানসিক ভাবে বেড়ে উঠাটি। তাই এক অভিন্ন ভৌগোলিক পরিমন্ডল একই ধরণের গাছপালা ও পশুপাশির জীবন-ধারনের নিশ্চয়তা দিলেও তা একই ধরণের মানুষ গড়ে উঠার নিশ্চয়তা দেয়না। বাংলাদেশ তার উংকৃষ্ট উদাহরণ। জলবায়ু বা আবোহাওয়ার দিক দিয়ে পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশের মধ্যে পার্থক্য নেই। কিন্তু মানুষের জীবনবোধ, রুচিবোধ ও বাঁচবার উদ্দেশ্যে এতই পার্থক্য যে এক অখন্ড ভূখন্ডে বসবাসও তাদের জন্য অসম্ভব হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক ভাবে তাদেরকে পৃথক হতে হয়েছে।

 

মাছ যেমন পানিতে বেড়ে উঠে মানুষও তেমনি বেড়ে উঠে নিজ নিজ সংস্কৃতির মাঝে। পানাহার কি হবে, কীরূপ হবে পোষাক-পরিচ্ছদ, কি ভাবে পরিচালিত হবে বিবাহ-শাদী ও ঘরসংসার, উপাস্য কে এবং কি ভাবে তাঁর ইবাদত, প্রতিবেশীর  সাথে আচরণই বা কীরূপ হবে, কি ভাবে একজনকে আপ্যায়ান বা বিদায় জানাতে হবে এরূপ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একজন শিশু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শেখে না। শেখে আবহমান সংস্কৃতি থেকে। এজন্যই শিক্ষিত-অশিক্ষিত, গ্রামীন-শহুরে সবার এজন্যই ভাল-মন্দ একটি সংস্কৃতি থাকে। সহজ ভাষায় তাই বলা যায়, মানুষ যেভাবে বাঁচে সেটাই তার সংস্কৃতি। সংস্কৃতির প্রসংঙ্গ এজন্যই এত গুরুত্বপূর্ণ। যারা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যান চায় তারা এজন্যই শুধু রাজনৈতিক বিপ্লব নিয়ে ভাবে না, সাংস্কৃতিক বিপ্লবও চায়। চায় নতুন সংস্কৃতির নির্মান। বিভ্রান্তির পথ ছেড়ে মানুষ নতুন পথে অগ্রসর হোক সেটিও চায়। দেশের ধর্ম বা আদর্শ পাল্টে গেলে এজন্য সংস্কৃতিও পাল্টে যায়। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে এজন্যই শুধু আবু লাহাব ও আবু জেহেলদের ন্যায় দুর্বৃত্ত নেতাদেরই নির্মূল করতে হয়নি, নির্মূল  করতে হয়েছিল তাদের অসুস্থ্য সংস্কৃতিকেও। শুরু করতে হয়েছিল সংস্কৃতির নতুন ধারা। তবে সংস্কৃতি নির্মিত হয় জীবন ও জগত নিয়ে ব্যক্তির নিজস্ব ধারণা থেকে। তাই এক ভাষা ও একই ভূগোলে বাস করলেও মানুষ বিভিন্ন বিপরীতমুখী সংস্কৃতির অনুসারি হতে পারে। মুসলমানগণ সে ধারণাটি পেয়েছে ইসলাম থেকে। ব্যক্তির জীবনে পরকালের কল্যান-চিন্তা এখানে প্রবল। অপর দিকে পাশ্চাত্যে যেটি কাজ করেছে সেটি হল নিছক ইহজাগতিকতা যা সংজ্ঞায়ীত হয়েছে সেকুলারিজম রূপে। পরাকালের ভাবনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। বরং আছে প্রবল বস্তুবাদী চেতনা। ফলে তাদের জীবনে প্রবল স্বেচ্ছাচার ভর করেছে উপভোগের পথ ও পাথেয় নিয়ে। ফলে সংস্কৃতি পূণ্য হয়েছে ব্যাপক পাপাচারে। তারা বাঁচে বেশী বেশী আনন্দ ও উল্লাসের খোঁজে। আনন্দের খোঁজে নিজ ঘর বা দেশ ছেড়ে দেশে দেশে ঘুরে। এদের প্রয়োজন মেটাতেই বিশ্বব্যাপী গড়ে উঠেছে সেক্স-টুরিজম। ব্যাপকতর হয়েছে মদ, ড্রাগ, জুয়া, অবাধ সেক্স, উলঙ্গতার ন্যায় সকল আদীম পাপ-কর্ম। এসব ভোগবাদীরা পানাহারের ন্যায় এগুলিকেও অপরিহার্য ভাবে। বলে নাগরিক অধিকার। এদের আনন্দের খোরাক জোগাতে এমন কি মুসলিম বিশ্বের কোণে কোণে গড়ে উঠেছে মদের দোকান, ক্লাব-ক্যাসিনো ও পতিতা-পল্লী। যা কিছু আনন্দ দেয় তাদের কাছে তাই সিদ্ধ বা জায়েজ। শিষ্ট-অশিষ্ট, শ্লিল-অশ্লিল, জায়েজ-নাজায়েজ এসবের ধার তারা ধারে না। পর্ণোগ্রাফি, চাইল্ড সেক্স ও হোমসেক্সুয়ালিটির জন্ম দিয়েছে এরাই। জগত জুড়ে এভাবেই বেড়েছে নৈতিক অসুস্থ্যতা। অথচ এদের কাছে এগুলিও সংস্কৃতি।

 

ক্ষুধা মেটাতে সবাই সব কিছু খায় না। খাদ্যের বেলায় কোনটি সিদ্ধ আর কোনটি অসিদ্ধ তা নির্ধারীত হয় ধর্মীয় অনুশাসন থেকে। তেমনি নৈতিক দিক দিয়েও সব কিছু সিদ্ধ নয়। তবে কোনটি নৈতিক আর কোনটি অনৈতিক সেটির নির্ধারনেও নির্ভূল মানদন্ড চাই। বিপুল ভোগ-সামগ্রীতেও জীবন যে সুখের হয় না তার বড় প্রমাণ আজকের পাশ্চাত্য। এজন্যই মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হল সঠিক হেদায়েত বা দিকনির্দেশনা। খাদ্য পানীয় তো পশুও পায়। তবে পশু যেটি পায় না সেটি হল হেদায়াত। তাই পশুর দ্বারা সভ্যতর সমাজও নির্মিত হয়না। তবে মানুষও যে পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট হতে পারে ইতিহাসে সে প্রমানও প্রচুর। এবং সেটি হেদায়াত না পাওয়ার কারণে। যার জীবনে হেদায়াত নাই সে ব্যক্তি সম্পদশালীই হলেও অতি দূর্ভাগা। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে কিতাব অবতীর্ন হয়েছে এবং নবী-রাসূলগণ এসেছেন তো সে প্রয়োজনটি মেটাতেই। ইসলাম তাই শুধু নিছক ধর্ম নয়, এটিই হল মহান আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত। ইসলামের কারণেই প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের হাতে নির্মিত হয়েছিল সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। মানুষ তখন ফেরেশতাদের চেয়েও উপরে উঠেছিল। পরিণত হয়েছিল মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিতে। মুসলমানগণ আজ যে কারণে নিচে নামছে তার কারণ তাদের সংখ্যা বা সম্পদের কমতি নয়, বরং সেটি হয়েছে ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ না করার কারণে। তারা পরিণত হয়েছে পথহারা পথিকে। অপর দিকে পাশ্চাত্যবাসী আল্লাহর সে নিয়ামতকেই অস্বীকার করেছে। ফলে অঢেল সম্পদও তাদেরকে বিভ্রান্তি থেকে বাঁচাতে পারিনি। বাড়াতে পারিনি তাদের মনের শান্তি। বরং শান্তির খোঁজে আসক্তি বেড়েছে মদ, হিরোইন, কোকেন বা গাজার ন্যায় মাদকদ্রব্যে। লাখে লাখে ভূগছে মানসিক রোগে। আননদ্ খুঁজতে সমকামীয়তা, মদ্যপান এবং ব্যাভিচারের ন্যায় আদিম পাপাচারগুলিকেও বৈধতা দিয়েছে। গাধার পিঠে অন্ধ-আরোহীর ন্যায় গাধা যেদিকে যায় তারাও যেন সেদিকে ধাবিত হচ্ছে। গাধা রূপে এখানে কাজ করছে তাদের রীপুর তাড়না।

 

কলেরা, যক্ষা বা এইডস এর ন্যায় সংস্কৃতিও প্রচন্ড ভাবে আগ্রাসী বা সংক্রামক হতে পারে। রাজনৈতিক শক্তির ন্যায় সংস্কৃতিও গ্রাস করতে পারে অপর দেশের সংস্কৃতি। রাজনৈতিক আগ্রাসনে লুন্ঠিত হয় পরাজিত জাতির সম্পদ। কিন্তু সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে লুন্ঠিত হয় তার নৈতিক ও মানবিক সম্পদ। নষ্ট হয় চরিত্র। বিনষ্ট হয় আদর্শিক পরিমন্ডল বা আবোহাওয়া। তখন পরাজিত মানুষের পক্ষে নিজের মত করে বেড়ে উঠাটিও অসম্ভব হয়। অথচ নৈতিক সম্পদ একটি জাতির অমূল্য সম্পদ। এ সম্পদ কলকারখানা বা ক্ষেতখামারে গড়ে উঠে না। বরং গড়ে উঠে জাতির চেতনালোকে। যার নির্মানে কাজ করে একটি ধর্ম বা আদর্শ এবং সে ধর্ম বা আদর্শের পতাকাবাহি অসংখ্য বুদ্ধিজীবী। যে কোন জীবন্ত ও সুস্থ্য জাতির জীবনে এ প্রচেষ্টা ক্রীয়াশীল থাকা শুধু কাঙ্খিতই নয়, অপরিহার্য। এবং সে প্রক্রিয়া কতটা সফল এবং কতটা কার্যকর সংস্কৃতি সেটারই পরিমাপ দেয়। খনির স্বর্ণ আর অলংকারের স্বর্ণ এক নয়, উভয়ের মাঝে যে পার্থক্য তার পশ্চাতে থাকে দীর্ঘ পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া। তেমনি সভ্য মানুষ আর অসভ্য মানুষও এক নয়। এক নয় উভয়ের মাঝে আচার-আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ এবং বাঁচবার রুচিবোধও। এ পার্থকের মূলে থাকে একটি বিশুদ্ধ করণ প্রক্রিয়া। সংস্কারের এ ক্রীয়াশীল প্রক্রিয়াই হলো সংস্কৃতি। একটি জাতির সভ্যতর হওয়ার পিছনে এটিই হলো মূল।

 

কলকারখানা পণ্যসামগ্রীর জীবনে মূল্য সংযোজন ঘটায়। ফলে বাজারে তার কদর বাড়ে, মূল্যও বাড়ে। কিন্ত এ কলকারখানায় ব্যক্তির মূল্য বাড়ে না। বরং ব্যাক্তির জীবনে মূল্য সংযোজন ঘটায় একটি নির্ভূল ধর্ম বা আদর্শ এবং সে ধর্ম ও আদর্শের বুদ্ধিজীবীগণ। কলকারখানার চেয়ে তাই একটি বিশুদ্ধ আদর্শ ও সে আদর্শের বুদ্ধিজীবীদের গুরুত্ব অনেক বেশী। আল্লাহতায়ালাও তাই বিজ্ঞান শেখাতে নবীরাসূল পাঠাননি। পাঠিয়েছেন মানুষের জীবন মূল্যমান বাড়ানোর একটি প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে। যাতে মানুষ তাঁর সকল সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি রূপে বেড়ে উঠতে পারে। আরবীতে তাই সংস্কৃতিকে বলা হয় তাহযীব। এ শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি গভীর দর্শন। কারণ, সংস্কৃতির এটি এক দর্শনগত সংজ্ঞা দেয়। তাহয়ীবের অর্থ পরিশুদ্ধি। অর্থাৎ সংস্কৃতি হল চির-চলমান এক পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া। পরিশুদ্ধির মাধ্যমে মানুষের জীবনে নিত্য মূল্যসংযোজনই এর মূল কাজ। বিভিন্ন সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাসকারি মানুষের মাঝে যে গুণগত বিশাল তারতম্য সৃষ্টি হয় সেটি এ প্রক্রিয়ার গুণের কারনে। মুসলমানের দায়িত্ব হল, এমন প্রক্রিয়ার নির্মানে আত্মনিয়োগ করা। নইলে অসম্ভব হয় তার নিজের এবং সে সাথে আগামী প্রজন্মের পক্ষে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাটি। প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের থেকে আজকের মুসলমানদের যে বিপুল পার্থক্য তা থেকেই বুঝা যায় সে প্রক্রিয়া মুসলিম দেশগুলিতে আজ আর সঠিক ভাবে কাজ করছে না। 

 

প্রশ্ন হলো কি সে সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া? কি সে উপাদান যার ভিত্তিতে একটি জাতি অন্য একটি জাতি থেকে ভিন্নতর সংস্কৃতির জন্ম দেয় বা জীবনবোধে ভিন্নতর হয়? বলা হয়, মুসলমানেরা সংস্কৃতিতে অমুসলমানদের থেকে ভিন্নতর। কিন্তু কি সে ভিন্নতা? কেন সে ভিন্নতা? ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে সংস্কারের প্রেরণা আসে ধর্ম বা আদর্শ থেকে। মুসলমানের জীবনে সে ধর্ম বা আদর্শ হলো ইসলাম। ভাল-মন্দ, ন্যয়-অন্যায় নির্ণয়ে ইসলামই হল মানদন্ড। সে মানদন্ডের ভিত্তিতে বাঁচবার মধ্যে পায় রুচীবোধ। আসে তার কর্মে আর বাঁচবার প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধি। ভূমি,ভাষা, জলবায়ু বা গাত্রবর্ণ এমন একটি রুচীবোধ বা মানদন্ড দিতে পারে না। ফলে ভাষা, জলবায়ু, ভুগোল ও বর্ণ অভিন্ন হওয়া সত্বেও বিভিন্নœ ধর্ম ও আদর্শের ভিত্তিতে বিভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম হয়। মানুষ উদ্ভিদ নয় যে ভূমি বা জলবায়ু থেকে তার বাঁচবার উপকরণ সংগ্রহ করবে। ব্যক্তির জৈবিক সত্ত্বার চেয়ে নৈতিক সত্ত্বাই মূল। এর জন্যই মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ্র সৃষ্টি। এবং তার নৈতিক শিকড় পুষ্টিপায় আদর্শ থেকে, ভূমি থেকে নয়। অভিন্ন আরব ভূমিতে একারণেই বিভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। বহুবিধ অনৈসলামিক সংস্কৃতির পাশে জন্ম হয়েছে ইসলামি সংস্কৃতির। ইসলামের কারণেই বিপ্লব আসে মুসলমানদের বিশ্বাসে, কর্মে, আচরণে ও রুচীবোধে। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিষ্টিত হয় আল্লাহ তায়ালার নির্দেশিত পথে ব্যক্তি ও সমাজ সংস্কারের প্রক্রিয়া। এ কারণেই হানাহানীর পরিবর্তে সেকালে আরবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সৌহার্দ-সম্পৃতি ও ইষ্পাত-দৃঢ় ভাতৃত্ব। ইর্ষা, ঘুণা ও হানাহানীর স্থলে উচ্চারিত হয়েছিল একে-অপরের প্রতি সালাম তথা শান্তির দোওয়া। এভাবেই জন্ম নিয়েছিল শ্রেষ্ঠতম মানব সৃষ্টির প্রক্রিয়া বা সংস্কৃতি। ইসলামকে বাদ দিয়ে যে সংস্কুতি গড়ে উঠে সেটি আর যাই হোক মুসলমানের সংস্কৃতি নয়। মুসলমান থেকে যেমন ইসলামকে পুথক করা যায় না, তেমনি তাকে পৃথক করা যায় না ইসলামি সংস্কৃতিকেও। সংস্কৃতি হলো ব্যক্তির বিশ্বাস ও চেতনার প্রতীক। বিশ্বাস বা চেতনা দৃশ্যময় নয়, সেটি দৃশ্যময় হয় সংস্কৃতির মাধ্যমে। রোগের যেমন লক্ষণ থাকে, স্বাস্থ্যেরও তেমনি বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকে। আল্লাহতে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী উভয়েরই তেমনি সনাক্তকরণের কিছু লক্ষণ থাকে। আল্লাহতে অবিশ্বাসীর জীবনের লাগাম তার প্রবৃত্তির হাতে। ফলে তার পোষাক-পরিচ্ছদ ও আমোদ-ফুুতির্র মাঝে অশ্লিলতার প্রকাশ এজন্যই স্বাভাবিক। কিন্তু মুসলমানের প্রতিটি কর্মে আল্লাহর ভয় বিমূর্র্ত। তার চাওয়াপাওয়ার উপর ইসলাম লাগাম পড়িয়ে দেয়। তখন জীবন হয় নিয়ন্ত্রিত। কি আনন্দ-উল্লাস, কি দুঃখ-বিষাদ সব কিছুতেই আল্লাহর উপর তার সমগ্র নির্ভরতা। মুসলমানের শোকপ্রকাশ ও উৎসবের প্রক্রিয়া এজন্যই অমুসলমানদের থেকে ভিন্নতর। শোকে-দঃুখে সে বলে ‘‘ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হি রা’জীযুন’’ অর্থাং নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য্ এবং আল্লাহতেই আমরা ফিরে যাবো। এটিই তার বাঁচবার মূল দর্শন। কিন্তু অমুসলমানের মধ্যে সেটি থাকে না। ফলে তার রুচীবোধ ও সংস্কার মুসলমান থেকে ভিন্নতর। বাংলাদেশে মুসলিম এবং অমুসলিম হাজার বছর পাশাপাশী বসবাস করলেও এজন্যই তাদের উভয়ের আনন্দ-উল্লাস বা  উৎসব কখনই একই মোহনাতে মিলিত হয়নি। পানি ও তেলের ন্যয় আলাদাই রয়ে গেছে। বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে কারো স্মরণে দাড়িয়ে নীরবতা, বেদীমূলে বা ফটোতে মাল্যদানের যে সংস্কৃতি সেটি অমুসলমানের, মুসলমানের হতে পারিনি। মুসলমানেরা বরং বেদেহী আÍার মাগফেরাতে দোওয়া-দরুদের মজলিস বসিয়েছে, কবর জেয়ারত করেছে, গরীব মিসকিন দান খয়রাত করেছে। এটিই হলো ইসলামি সংস্কৃতি। শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠা, মাল্যদান, এবং দাড়িয়ে নীরবতা পালনের যে সংস্কৃতিকে আপামর বাঙ্গালী সংস্কৃতি বলা হচ্ছে সেটি মিথ্যা। ইসলামে অঙ্গিকারহীন সেকুলারগণ এর প্রবক্তা, কোন নিষ্ঠাবান মুসলিম নন। এটি কখনই ধর্মপ্রাণ মুসলমানের সংস্কৃতি হতে পারে না। সংস্কৃুতি মুসলমানের কাছে কোন বিনোদন নয়, আনন্দ-উল্লাসও নয়, এটি তার আদর্শ চর্চা। তাই এটি এবাদত।

 

পাশ্চাত্য বিপুল ভ্যালুএ্যাড বা মূল্য-সংযোজন ঘটিয়েছে বিভিন্ন ধাতু বা পণ্যসামগ্রীতে। কিন্তু মূল্য-সংযোজন ঘটায়নি ব্যক্তির জীবনে। বরং ভয়ানক অবমূল্যায়নই ঘটিয়েছে। ফলে পাশ্চাত্যের মানুষ বেড়ে উঠছে চরিত্রহীন লম্পট ও বীভৎস খুণী রূপে। ফলে নিত্য নতুন গাড়ীর মডেলের ন্যায় যোগ হচ্ছে গণহত্যার নতুন মডেল। লাম্পট্যও এখানে শিল্প রূপে উঠেছে। হালাকু চেঙ্গিজের চেয়ে এজন্যই তারা বহুগুণ বেশী বর্বর ও লম্পট। পশুর যেমন শিকার ধরার নিজস্ব কৌশল থাকে এবং সেটিকে একটি শিল্প রূপে গড়ে তুলে, পাশ্চাত্যও তেমনি শিল্প রূপে গড়ে তুলেছে পররাজ্য দখল ও শোষণ প্রক্রিয়াকে। উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং দাসব্যবসা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেয়েছে তো এ কারণেই। এবং এ কারণেই বিশ্বের কোনে কোনে ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের হাতে আনবিক বোমা, ডিপ্লেটেড ইউরেনিয়াম এবং ক্লাস্টার বোমা নিক্ষিপ্ত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে নিরীহ নারী-পুরুষের মাথায়। বিগত দুটি বিশ্ব যুদ্ধে তারা প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করেছিল অতি উৎসব ভরে। মানুষ গড়ার শিল্পে পাশ্চাত্য যে ভয়ানক ভাবে ব্যর্থ হয়েছে তা নিয়ে কি তাই বিন্দুমাত্রও সন্দেহ থাকে? কোন প্রকান্ড মহামারিতেও মানব জাতির এতটা ক্ষতি হয়নি। এতটা ক্ষতি হয়নি সমগ্র হীংস্র পশুদের হাতেও। আরো বিপদের কারণ, এ বিধ্বংসী সংস্কৃতিরই আজ মাহামারির ন্যায় প্রসার ঘটছে বিশ্বজুড়ে। তাই মানব জাতির আজকের সংকট শুধু পাশ্চাত্যের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে নয়, বরং তাদের ভয়নাক এ অসুস্থ্য সংস্কৃতির প্রসারে। কারণ এতে মারা পড়ছে বিশ্বে জুড়ে মানবতা ও মানবিক নৈতিকতা। বাড়াচেছ নগ্নতা, লাম্পট্য ও এইডস। আজকের জগত-জুড়া সাম্রাজ্যবাদী শোষন এবং লাগাতর যুদ্ধ ও গণহত্যা দেখে অন্তত এটুকু নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় বর্তমান বিশ্বের বড় সমস্যা নিছক রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক। এখানে ব্যর্থ হচ্ছে চেতনার পরিশুদ্ধ করণের প্রক্রিয়া। মানুষ প্রচন্ড ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে মানুষ রূপে বেড়ে উঠা নিয়ে। ফলে সম্পদের প্রাচুর্য তাকে কদর্য চরিত্র থেকে তাদের পরিত্রাণ দিতে পারছে না। ফলে বিশ্বের কোনে কোনে বাড়ছে ধ্বংসের আয়োজন। বাড়ছে লাম্পট্য ও শোষণ। বাড়ছে দানবীয় পশু শক্তির প্রয়োগ। এতে বিপন্ন হচ্ছে দরিদ্র মানুষের প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকাটিও। তাই সাংস্কৃতিক সমস্যা এটি শুধু কোন দেশের সমস্যা নয়, এটি আন্তর্জাতিক। এ সংকট তাই সমগ্র মানব সভ্যতার। লন্ডন, ১৩/০৯/১৯৯৯



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.