Home •সংস্কৃতি ও সমাজ পাশ্চাত্য দেশে মুসলমান
পাশ্চাত্য দেশে মুসলমান PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 01 January 2011 18:55

অনৈসলামিক দেশে বসবাসের বিপদ যে কতটা ভয়াবহ তা ইতিমধ্যে ফলতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে বানের জলে ভাসার চেয়ে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্লাবনে ভাসা যে কম ভয়ানক নয় তা এখন পাশ্চাত্যে বসবাসকারি বহু মুসলমানই বোঝে। বানের জলে ক্ষেতের ফসল ভেসে যায়, কিন্তু এখানে ভেসে যাচ্ছে তাদের নিজের ও নিজ সন্তানদের ঈমান-আখলাক, রুচীবোধ ও সংস্কৃতি। ফলে ভেসে যাচ্ছে পরকালের সকল চাওয়া-পাওয়া। অথচ মুসলমান তার ঈমান-আখলাক, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও পরকালের সুখশান্তি বাঁচাতে আলাদা রাষ্ট্র গড়বে, ভিন্ন কম্যুনিটি ও প্রতিষ্ঠান গড়বে এবং এ কাজে অর্থদান ও শ্রমদানের পাশাপাশি এমনকি প্রাণ দিবে সেটিই ছিল কাঙ্খিত। যুগে যুগে মুসলমানেরা তো তাই করেছে। অথচ ঈমান-আখলাক ও সংস্কৃতি বঁচাতে নয়, নিছক বাঁচার প্রয়োজন মিটাতে মুসলমানেরা আজ লাখে লাখে ঈমান দিচ্ছে। ভুলে যাচ্ছে নিজেদের ধর্ম, রুচীবোধ ও সংস্কৃতি। এটি কি কম আতংকের?

 

আরো ভয়ের কারণ, অধিকাংশ মুসলমানের এ নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা নেই। তাদের দুশ্চিন্তা বরং পাউন্ত-ডলারের কামাই কি করে আরো বাড়ানো যায় তা নিয়ে। উপার্জন বাড়াতে অনেকে মদবিক্রয়, রেস্তোঁরায় মদ সরবরাহের ন্যায় হারাম পথও ধরেছেন। মুসলমানদের পচন যে কত গভীরে পৌঁঁছেছে এসব হলো তারই প্রমাণ। উদ্ভিদও বেড়ে উঠার জন্য অনুকূল পরিবেশ চায়। বীজ যত উত্তম হোক তা মরুভূমিতে গজায় না। ঝোপঝাড়েও বেড়ে উঠে না। তাই অনুক’ল পরিবেশ চায় প্রতিটি মুসলমান সন্তান। এজন্যই ইসলামের নবী মক্কা ছেড়ে মদিনায় গিয়ে ইসলামি রাষ্ট্র গড়েছিলেন। অথচ ধর্ম, সংস্কৃতি ও আদর্শের দিক দিয়ে তীব্র প্রতিকুল পরিবেশের জঞ্জালে বীজ ছিটিয়ে আমরা ভাবছি আমাদের নতুন প্রজন্ম পাশ্চাত্যে সুন্দর ভবিষ্যৎ পাবে! আমাদের মুখ তারা উজ্বল করবে! বুদ্ধিহীনতারও একটি সীমা আছে, আমরা সেটিও অতিক্রম করেছি।

 

অন্যদের বাঁচা আর মুসলামানের বাঁচা এক নয়। মুসলমান উদ্ভিদ নয়, অন্য জীবজন্তু বা পশুপাখিও নয় যে শুধু জন্মালো, কিছু খেলো, কিছুকাল বাঁচলো এবং মরে গেল। নিছক বাঁচার জন্য মুসলমানরা বাঁচে না। তাই নিছক ভালো খেয়ে বাঁচার স্বার্থে সাইবেরিয়ার শীতের পাখির ন্যায় হাজার হাজার মাইল উড়ে অন্য দেশে বসতি গড়বে সেটিও কাঙ্খিত নয়। সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি রূপে তারা প্রেরিত হয়েছে এজন্য নয়। মুসলমানের বাঁচার মধ্যে একটি লক্ষ্য থাকে। আর সেটি হলো আল্লাহর প্রদর্শিত পথে উচ্চতর সভ্যতার নির্মান। এ লক্ষেই তাদের বাঁচা এবং এলক্ষ্যেই তাদের মরা। এবং এ কাজের জন্য তারা মহান আল্লাহর কারিগর মাত্র, আর্কিটেক্ট বা ডিজাইনারও নয়। কিভাবে সে সভ্যতা নির্মিত হবে সেটির দিকনির্দেশনা দিয়েছেন মহান আল্লাহতায়ালা স্বয়ং নিজে। কোরআন পাকে তো সে নির্দেশনাই বিমুর্ত। আর রাসূলেপাক (সা) দেখিয়ে গেছেন তার কার্যকর করার পদ্ধতি। মুসলমানের আমৃত্যু মিশনতো এটিই। সে বাঁচে, এবং বাঁচার জন্য কিছু খায় শুধু এ মিশন চালিয়ে যাওয়ার জন্য। মুসলমান জ্ঞানার্জন করে, ঘর গড়ে, কখনওবা বা ঘর ছেড়ে অন্যত্র হিজরত করে নিছক আল্লাহতায়ালা সে নির্দেশিত পথে মানুষকে সভ্যতর করার কাজ চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে। তাই অনৈসলামিক সমাজে মুসলমানরা হারিয়ে যায় না, বরং অন্যরা হারিয়ে যায় তাদের সৃষ্ট সমাজে। মুসলমানেরা যেখানেই গেছে সেখানেই তারা আল্লাহর নির্দেশিত পথে ভিন্ন ধারার জন্ম দিয়েছে। তাই একজন হিন্দু, চৈনীক বা খৃষ্টান যত সহজে ভিন্ দেশে খাপ খাইয়ে নেয়, মুসলমান তা পারে না। শক, হুন, বৈদ্ধ, জৈন প্রভৃতি স¤ž্রদায় ভারতের হিন্দু সমাজে হারিয়ে গেলেও মুসলমানেরা যে হারিয়ে যায়নি তার কারন তো এটিই।

ঊনানের পাশে রাখলে পাথরের ন্যায় শক্ত বরফও গলে যায়। এমনটি হয় উত্তপ্ত পরিবেশের কারণে। তেমনি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার পরিবেশও ব্যক্তিকে পাল্টে দেয়। হাদিসপাকে বলা হয়েছে, সকল শিশুর জন্ম হয় মুসলমান হিসাবে, কিন্তু পরিবেশের প্রভাবে তারা বেড়ে উঠে ইহুদী, নাসারা, মুর্তিপুজারী বা অন্যধর্মের অনুসারী রুপে। তাই অনৈসলামিক দেশের কুফরি পরিবেশে মুসলমানের সন্তানেরা মুসলমান হিসাবে বেড়ে উঠবে সেটি কি ভাবা যায়? ফলে মুসলমান মাত্রই যিনি নিজের ও নিজ সন্তানের ঈমান নিয়ে চিন্তিত তিনি পরিবেশ নিয়েও চিন্তিত। বিশ্বের বহুদেশ ঘুরলেও মুসলমান এজন্যই সবদেশে বসতি গড়েনি। এমন কি পশু-পাখি, জীবজন্তুও উপযোগী পরিবেশ ছাড়া বাসা বাঁধে না। তবে অন্যজীবের কাছে বিচার্য হলো দৈহিক জীবনধারণের উপযোগীতা। কিন্তু মুসলমানের কাছে শুধু দৈহিকভাবে বেঁচে থাকাটাই বিচার্য নয়, তার চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপুর্ণ হলো ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকাটা। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার পরিবেশ যাতে ঈমানের পরিপুষ্টি জোগায় সে জন্য রাষ্ট গড়া এজন্যই ইসলামে ফরজ। এ লক্ষ্যে যে কোন প্রচেষ্টাই জ্বিহাদ। ইসলামি রাষ্ট্রগড়া অসম্ভব মনে হলে মুসলমান সেখানে বসতি না গড়ে বরং সে দেশ থেকে হিজরত করে। এজন্য নামাজ রোজা, হজ্ব-যাকাতের ন্যায় হিজরতও পবিত্রতম ইবাদত। তবে সেটি রুটি-রুজী বাড়ানোর তাগিদে নয়। তাই বিদেশ-গমন মুসলমানের জীবনে বিচিত্র নয়, বরং স্বাভাবিক। হযরত ইব্রাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) পৈত্রিক ভিটা ছেড়েছেন। প্রিয় জন্মভুমি ছেড়েছেন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর সাহাবীগণও। তারা যেখানেই গেছেন সেখানে রুটিরুজী বাড়ানোর চেষ্টা না করে সেখানে তারা ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের পত্তন করেছেন। ইসলামের প্রথম যুগে নব-দীক্ষিত সকল মুসলমানদের উপর মদিনার সে রাষ্ট্রে হিজরত করা ফরজ করেছেন। কারণ অনৈসলামিক পরিবেশ থেকে তাদেরকে বাঁচানো এবং শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সেটি অপরিহার্য ছিল। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সে নিরাপদ ভূখন্ডের আয়তন বাড়াতে মুসলমানেরা অসংখ্য যুদ্ধও করেছেন। এ জন্য নানা দেশের নানা মাঠে-ময়দানে তাঁরা প্রাণ দিয়েছেন। জন্মভূমি থেকে বহুদুরে ঘরও বেঁধেছেন। তবে পরাধীনরূপে নয়, বিজয়ীর বেশে।এভাবেই গড়ে উঠেছে মুসলমানদের গৌরবের ইতিহাস।

অনৈসলামিক দেশে আবাদী গড়ার যে ধারণা সেটি সা¤ž্রতিক। অমুসলিমের রাইফেল কাঁধে নিয়ে যুদ্ধে নামা বা তাদের কামানে গোলা ভরা বা কারখানায় শ্রমিক হওয়া বা জাহাজে কয়লা ঢালার যে ঐতিহ্য সেটিও এযুগের। এতে শক্তি বেড়েছে ইসলামের বিপক্ষের, মুসলমানদের নয়। এখনও অমুসলিম শক্তিবর্গ সে লক্ষ্যেই মুসলমানদের ব্যবহার করতে চায়। অন্য দেশের স্বর্ণখনি বা তেলের খনির লুন্ঠনের ন্যায় এরা এখন মুসলিম দেশের মেধাশক্তিকেও কাজে লাগাতে চায়। দ্বীনের কাজে মুসলমানদের দেশত্যাগ অহরহ হলেও অতীতে সেটি অমুসলিম দেশে রুজীরোজগারের জন্য হয়নি। অথচ রুটি রুজীর জন্য আজকের মুসলমানরা এমন ভাবে দেশ ছাড়ছে যা শুধু আগুন লেগেছে এমন ঘর বা জাহাজ থেকে ঝাপিয়ে পড়া মানুষের সাথেই তুলনা চলে। মুুসলমানদের আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যোগাযোগহীন সে যুগে জন্মভূমি ইরাক ছেড়ে সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর ও হেজাজ গেছেন। হাজার হাজার মাইল তিনি এভাবে ভ্রমন করেছেন। সে দেশত্যাগে রুজী-রোজগার গুরুত্ব পেলে স্ত্রী ও শিশু পুত্রকে নিয়ে তিনি কখনই মক্কার বিজন মরুভূমিতে হাজির হতেন না। অর্থের লোভে কুফুরি পরিবেশে নিজেকে সঁপে দেয়া নবীরাসুলের সুন্নত নয়। রেজেকের জন্য মুসলমানের তাওয়াক্কুল সবসময়ই আল্লাহতায়ালার উপর। মুসলমানের বাঁচবার লক্ষ্য হলো আল্লাহর খলিফা রুপে দায়িত্বপালন। এলক্ষ্যে বেঁচে থাকার জন্য তাকে রোজগার করতে হয়। তবে রোজগারের জন্যই বাঁচতে হবে এবং সকল সামর্থ নিয়োগ করতে হবে সেটি ঈমানদারি নয়, নিছক দুনিয়াদারি। আর কোনটি ঈমানদারি আর কোনটি দুনিয়াদারি অন্ততঃ এদুটি বিষয়ে মুসলমানদের সম্যক উপলদ্ধি প্রয়োজন।

পাশ্চাত্য দেশসমুহে মুসলমানের বিপদের সবচেয়ে বড় কারণ হলো এসব দেশের শিক্ষা-দীক্ষা ও সংস্কৃতি। এদুটি যেমন আগ্রাসী, তেমনি ঈমান বিনাশী। এমনভাবে এ দুটি পরিকল্পিত যে সমাজের সংখ্যালঘুরা নিজেদের^ পরিচয় হারিয়ে এ সমাজে বিলীন হতে বাধ্য। উপনিবেশিক শাসনামলে ভারতবর্ষে এমন শিক্ষাব্যবস্থা শুরু করতে গিয়ে লর্ড মেকলে বলেছিলেন, এ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা শিক্ষিত হয়ে বেরুবে তারা শুধু রক্ত-মাংসেই ভারতীয় হবে, মন-মানসিকতায় হবে বৃটিশ। মানুষ তার জীবনের সামর্থ বিনিয়োগে কোন দেশে বা কোন ফ্রন্টিয়ারে যাবে সে নির্দেশ পায় তার মন-মানসিকতা থেকে। মন-মানসিকতায় বৃটিশ হওয়ার অর্থ হলো, বৃটিশের পক্ষে যুদ্ধ লড়া বা বৃটিশ সমাজে বিলুপ্ত হওয়ায়কেই তারা যথার্থ ভাববে। নিজ ধর্ম ও নিজ দেশের চেয়ে বৃটিশ স্বার্থের প্রতি তাদের অঙ্গিকার হবে অধিক। যে সব মুসলমান ১৯১৭ সালে বৃটিশ বাহিনীতে শামিল হয়ে উসমানিয়া খেলাফতের বিরুদ্ধে ক্রসেড লড়েছিল তারা ছিল এ শিক্ষা ব্যবস্থারই ফসল। বায়তুল আকসা দখল করে বৃটিশের হাতে তুলেদেয়াকে এরা গর্বের কাজ মনে করেছিল। হান্টিংটন তার ঈষধংয ড়ভ ঈরারষরংধঃরড়হ এ মুসলমানদের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য সভ্যতার যে যুদ্ধের পূর্বাভাস দিয়েছেন সে যুদ্ধে বৃটিশ শিক্ষাব্যবস্থারই আজকের এ নব্য ফসলেরা যে কোনদিকে লড়বেন সেটিও কি নির্ভুল ভাবে অনুমান করা যায় না? তবে ব্যতিক্রম যে হবে না তা নয় তবে তা শুধু ব্যতিক্রমই থাকবে।

শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজ রূপান্তরের যে শক্তিশালী প্রক্রিয়া পশ্চিমা সমাজে ক্রিয়াশীল সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় মেল্টিং পট। উনুনের উচ্চতাপে কড়াইয়ের আলু, পটল, মরিচ, বেগুন যেমন একাকার হয়ে যায়, পাশ্চাত্য সমাজের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ায় একাকার হয়ে যাচেছ বিভিন্ন মাইনরিটিরা। তাছাড়া, শিক্ষাই জীবনে পথ দেখায়, পাপ-পুণ্য ও শিষ্ঠ-অশিষ্ঠের সংজ্ঞা দেয় এবং সেসাথে ব্যক্তিকে দেয় বিশিষ্ঠ পরিচয়। হাওয়ায় যেমন প্রাসাদ গড়া যায় না, শিক্ষাছাড়া তেমনি ঈমানও গড়ে উঠে না। পবিত্র কোরআনের প্রথম ওহী হলো, ইক্রা অর্থাৎ পড় তথা জ্ঞানবান হও। আল্লাহপাক নিজে শপথবাণী উচ্চারণ করেছেন কলম ও কলম দিয়ে যা লেখা হয় তার নামে (সুরা কলম)। বিদ্যালাভ ও শিক্ষার গুরুত্ব যে কত অধিক মহান আল্লাহতায়ালার এ ঘোষনা থেকেই সেটি পরিস্কার। অপরদিকে সংস্কৃতি হলো ব্যক্তির কর্মে, চৈতন্যে, ও রুচিবোধে সংস্কারের প্রক্রিয়া। কিন্তু পাশ্চাত্যের দেশসমুহে এদুটির কোনটিই ইসলামের পক্ষে নয়, বরং শিকড় কাটছে ঈমানের। ফলে মুসলিম সন্তানদের পক্ষ্যে ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠাই এ সমাজে দুরুহ। সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকর্ম অভ্যস্থ করছে জঘন্য পাপাচারে। ফলে এসব দেশে মুসলমানের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ সৃষ্টি হচ্ছে তাদের দর্শন ও জীবনবোধে। তাওহীদ, রেসালাত, আখেরাত ও খেলাফতের যে ধারণা সেগুলি এ শিক্ষা ব্যবস্থায় শুধু অজানাই থাকছে না বরং বিলুপ্ত হচ্ছে। নিছক কোরআনের তেলাওয়াত শিখিয়ে বা কিছু বক্তৃতা শুনিয়ে কি চেতনার এ বিচ্যুতি দুর করা যায়? যাচ্ছেনা। ফলে বরফ যেমন হাওয়ায় হারিয়ে যায় তেমনি লক্ষ লক্ষ মুসলিম যুবক হারিয়ে যাচ্ছে এ সমাজে। মাঝে মধ্যে দুয়েকজন অমুসলিমের মুসলমান হওয়ার যে আনন্দ তা কি লাখো মুসলিম সন্তানের হারিয়ে যাওয়ার বেদনাকে লাঘব করতে পারে?

চেতনার আরেক বিচ্যুতি হলো শিক্ষার গুরুত্ব ও তার উদ্দেশ্য নিয়েও অজ্ঞতা। শিক্ষার উদ্দেশ্য নিছক উপার্জনের কৌশল জানা নয়। সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, শিষ্ঠ-অশিষ্ঠ চিনতে যে শিক্ষা সাহায্য করে না তা শিক্ষা নয়। এমন শিক্ষায় ঈমান গড়ে উঠে না। শিক্ষা হবে হেদায়াতের হাতিয়ার, নিছক উপার্জনের নয়। উপার্জনের কৌশলাদী আবু লাহাব বা আবু জেহেলের কম জানা ছিল না। কিন্তু তাদেরকে শিক্ষিত বলা হয় নি। আবু জেহেলকে বরং মুর্খের পিতা বলা হয়েছে। কারণ তার বিদ্যা সত্যাপোদ্ধির সামর্থ বাড়ায়নি। পাশ্চাত্যের শিক্ষায় শিক্ষিতদের উপার্জন বাড়ছে বটে তবে এতে ঈমানও কি বাড়ছে?  বাড়ছে না, বরং উল্টোটি হচ্ছে। পাশ্চাত্যে আমাদের শিশুরা ধর্মান্তরিত হচ্ছে না বটে, তবে লাখে লাখে যে নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে সেটির প্রমান তো অসংখ্য। এটিকে বলা যায় কালচারাল কনভার্শন। এর ফলে মুসলিম সন্তানের মাঝে চাল চলনে আর ইসলামের নামগন্ধ থাকছে না। মূল কারণ একটিই আর তা হলো পাশ্চাত্য দেশে শিক্ষার মত ফরজ কাজটিই মুসলমান সন্তানদের যথার্থ ভাবে হচ্ছে না। অথচ শিশুদের শিক্ষাকে সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রতিটি মুসলমানের। মুসলমানদের ঘরবাড়ী, রাস্তাঘাট বা কলকারখানা অমুসলমানদের দ্বারা তৈরী করে নেয়া যায়। কিন্তু সন্তান গড়ার কাজ তার নিজের। ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ এজন্যই তার নিজস্ব, অমুসলমানদের দিয়ে এটি করাতে গেলে বিপদ অবশ্যম্ভাবী। এতে বিদ্যা হাসিলের ফরজ আদায় হবে নয়। মুসলিম দেশের অফিসারদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব যেদিন থেকে পশ্চিমারা পেল, তাদের পতনের গতিও তখন বেড়ে গেল। ফলে বিদ্ধস্ত হলো উসমানিয়া খেলাফত, বিপর্যস্ত হলো সমগ্র মুসলিম বিশ্ব। কারণ চেতনায় জীবাণুর প্রবেশ ঘটাতে শিক্ষাব্যবস্থা পাইপ লাইনের কাজ করে। অন্যকে প্রভাবিত করার এটিই শক্তিশালী মাধ্যম। আজকের ছাত্ররাই আগামী দিনের পিতামাতা। তারা সুশিক্ষা না পেলে তাদের সন্তানেরাও পাবে না। পিতামাতার দায়িত্ব শুধু সন্তানের দেহের খাদ্য জোগানো নয়, বরং মনের পুষ্টিকেও সুনিশ্চিত করা। এটির উপরই নির্ভর করে তার ঈমান পুষ্টি পাবে কি পাবে না, সে মুসলমান হিসাবে বেড়ে উঠবে কি উঠবে না - এসব গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। কিন্তু পশ্চিমা দেশে সে সুযোগ সামান্যই। ফ্রান্সে মেয়েদের মাথায় স্কার্ফ পড়াকে যেভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাতে মুসলমানরূপে বেড়ে উঠার বিষয়টি তাদের কাছে কতটা অপছন্দের এটি কি আর অ¯žষ্ট থাকে? তবে মুসলমানরূপে টিকে থাকার স্বার্থে বিক্ষিপ্ত ভাবে চেষ্টা যে হচ্ছে না তা নয়। কিন্তু এর সুফল কতটুকু? বিষাক্ত পানির প্লাবনে যে ব্যক্তি ডুবতে বসেছে তাকে দুয়েক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করিয়ে কি বাঁচানো যায়? ঔষধ সারা জীবন খাওয়ার বস্তু নয়, এতে স্বাস্থ্য বাঁচে না। বরং এর জন্য বিশুদ্ধ খাদ্যপানীয় নিয়মিত চাই। তেমনি মুসলামানের ঈমানী স্বাস্থ্যের জন্য সুশিক্ষার ও সুসংস্কৃতির পবিত্র পরিবেশ চাই। এজন্যই ইসলামী রাষ্ট্র চাই। কিন্তু সেটি কি পাশ্চাত্যে সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই এখানে আমাদের জীবনও নিরাপদ নয়। এ বাস্তবতা আমাদের বুঝতে হবে। অমুসলিম দেশে বসবাসের যাতনাও যে অনিবার্য সেটিতো একারণেই।

পাশ্চাত্যদেশে মুসলামানেদের উদ্ধারের পথ খুব একটা বেশী নেই। যেটি উদ্ধারের নয় বরং নিমজ্জনের সেটিই বহু মুসলমান বরং বেছে নিয়েছে। এ পথের পথিকেরা এ সমাজে একাত্ব হতে চলেছে। মুক্তির পথ মাত্র দুইটি। প্রথমটি, কবি আল্লামা ইশবাল(পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা), মুহাম্মদ আসাদ (জার্মান নওমুসলিম, প্রখ্যাত সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবি যিনি পাকিস্তানে হিজরত করেছিলেন এবং জাতিসংঘে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদুত ছিলেন) ও পারমাণবিক বিজ্ঞানী ড. আব্দুল কাদের খানের (যিনি পাকিস্তানকে পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত করেছেন) পথ। তাদের পথ হলো পশ্চিমা দেশ থেকে যা কিছু শেখার তা শিখে একটি মুসলিম দেশে তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে সে দেশের উন্নয়নে লেগে যাওয়া। দ্বিতীয় পথটি হলো মিশনারীর পথ। যুগে যুগে মুসলমানেরা এ পথেই বাংলা, ভারত, বার্মা, মালয়, ও আফ্রিকার নানা দেশে অনৈসলামিক সমাজে না হারিয়ে ঈমান-আমল নিয়ে বেঁচে থাকতে পেরেছিলেন। মিশনারি কাজ চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে তাদের প্রয়োজন হবে উপার্জনের। উপার্জনের প্রয়োজনে হালাল ব্যবসা বা চাকুরি মাধ্যম হতে পারে। তবে  নিছক উপার্জনের স্বার্থে এদেশে থাকা শুধু অর্থহীনই নয়, বিপদজনকও। সাংস্কৃতিক বা আদর্শিক স্রোতে হয় উজাতে হয়, নইলে ভেসে যেতে হয়। একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব। মিশনারি স্পিরিটই আমাদেরকে পাশ্চাত্যের এ প্রচন্ড স্রোতে উজানে ছুটার শক্তি দিতে পারে। কারণ এমন মিশনারীরাই ভিশনারী হয়। তাদের দৃষ্টিতে সদা জাগ্রত থাকে আল্লাহর সান্যিধ্যে সফলকাম হয়ে পৌছার প্রচন্ড বাসনা। আল্লাহতায়ালাকে খুশিকরাই তখন তাদের একমাত্র সাধনা হয়। এ বাসনা ও সাধনাতেই তাদের জীবন এক অবিশ্বাস্য দুরন্ত গতি পায়। যেমনটি রাসুলে পাকের (সা) সাহাবীদের মাঝে ছিল। সে দুরন্ত গতিতে তারা নানা দেশে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ছুটেছেন। পাহাড়-পর্ব্বত, বনজঙ্গল, মরুভুমি কোন কিছুই তাদের অগ্রযাত্রাকে রুখতে পারেনি। সমাজের প্রতিকূল স্রোত বা অন্য সংস্কৃতি এমন ব্যাক্তিদের ভাসিয়ে নিতে পারেনি। বরং তারাই অন্যদের ভাসিয়ে নিয়েছেন নিজেদের স্রোতে। পাশ্চাত্য স্রোত থেকে বাঁচবার তাগিদে ইউরোপের অর্থডক্স ইহুদীরা মধ্যযুগে যেভাবে শহরের অভ্যন্তরে নিজেদের জন্য এক ঘেটো জীবনের (মযবঃঃড় ষরভব) জন্ম দিয়েছিল আজকের আধুনিক যুগে সেটি অচল। এমনকি ইহুদীরাও তা থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। কারণ টিভি, পত্র-পত্রিকা, রাষ্ট্র পরিচালিত শিক্ষা ব্যবস্থার বদৌলতে সংস্কৃতির জোয়ার এখন বেডরুমেও ঢুকছে। ফলে ঘেটো জীবন মুসলমানদের জন্যও মুক্তির পথ নয়।

নবী পাকের (সাঃ) যুগে মুসলমানদের যে সংখ্যা ছিল, একমাত্র লন্ডন শহরে নিয়মিত নামাজীদের সংখ্যাই তার চেয়ে কয়েকগুণ। দাওয়াতী কাজে এ বিশাল সংখ্যাকে শক্তিতে পরিণত করতে পারলে অলৌকিক কিছু আশা করাও অসম্ভব নয়। এদেশের ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌছানোর দায়িত্ব এখন মুসলমানদের। সমগ্র ইউরোপের যে আয়তন তার চেয়ে বৃহত্তর ভুখন্ডে প্রাথমিক যুগের মুষ্টিমেয় মুসলমানগণ ইসলামের দাওয়াত পৌছে দিয়েছেন। এজন্য তারা বহু পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা ও বিজন মরুভূমি অতিক্রম করেছেন পায়ে হেঁটে। অথচ এখানে পাশ্চাত্য সভ্যতার অভ্যন্তরে বসে সে কষ্ট- স্বীকারের প্রয়োজন নেই। আল্লাহতায়ালা তো সত্যিকার মুসলমানদের সাহায্য করতে সদাপ্রস্তুত। কোরআন পাকে সে কথা উচ্চারিতও হয়েছে বার বার। তবে শর্ত হলো সে সাহায্য গ্রহণের সামর্থ থাকা দরকার। সাহায্য না আসার কারণ, সাহায্যপ্রাপ্তির জন্য নিজেদেরকে আমরা তৈরীই করিনি। পাশ্চত্যদেশসমুহে মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বস্তুতঃ তাদের প্রস্তুতির উপর। নইলে এ মহাপ্লাবনের মধ্যখানে নিজেদের ঈমান-আমল নিয়ে বেঁচে থাকার আর কোন উপায় নেই। নিজেদের ছেলেমেয়ে ও আপনজনদের অনেকেই যে অনৈসলামের প্লাবনে ভেসে যাবে সেটি সুনিশ্চিত। কারণ কুফরির প্লাবন এভাবেই তো মানুষকে গ্রাস করে। লন্ডন,( ২৩/০৭/২০০৩)

 



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.