Home •শিক্ষা ও প্রচার মাধ্যম অশিক্ষাl ও কুশিক্ষার নাশকতা (দ্বিতীয় পর্ব)

Article comments

অশিক্ষাl ও কুশিক্ষার নাশকতা (দ্বিতীয় পর্ব) PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Tuesday, 06 March 2018 19:37

মানব যে কারণে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়

হৃৎপিন্ডের ক্রিয়া বন্ধ হলে দেহের মৃত্যু ঘটে। সুশিক্ষা না পেলে তেমনি মৃত্যু ঘটে মানবতা ও ঈমানের। অশিক্ষিত ও কুশিক্ষিত সে ব্যক্তিটি তখন শুধু দেহ নিয়ে বাঁচে। এবং দেহকে মোটাতাজা করে ও দিবারাত্র কাজে লাগায় পশুর ন্যায় জৈবীক তাড়না মেটাতে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা এদেরকে শুধু পশু নয়, পশুর চেয়েও নিকৃষ্টতর বলেছেন। আরো বলেছেন, এরা চোখ থাকলেও দেখে না, কান থাকলেও শুনে না এবং মগজ থাকলেও ভাবে না। বলা হয়েছে, এরাই হলো সর্বনিকৃষ্ট জীব। এসব মনুষ্য জীবেরা বন্য পশুর চেয়েও যে কতটা বর্বর ও হিংস্রতর হতে পারে -ইতিহাসে সে প্রমাণ প্রচুর। দুটি বিশ্বযুদ্ধে এরাই সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করেছে। ধ্বংস করেছ হাজার হাজার নগর-বন্দর, লক্ষ লক্ষ ঘরাড়ি এবং অসংখ্য কলকারখানা, রাস্তাঘাট ও দোকানপাট। দু’টি শহরের উপর নিক্ষেপ করেছে পারমানবিক বোমা। মানবরূপী এমন জীবদের হাতে কোন দেশ অধিকৃত হলে সেদেশ রেকর্ড গড়ে দুর্বৃ্‌ত্তি, সন্ত্রাস, ডাকাতি, হত্যা, গণহত্যা, অশ্লীলতা, ধর্ষণ ও বর্বর স্বৈরাচারে। পৃথিবীর নানা দেশে এরূপ জীবদের হাতেই পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ, ফ্যাসিবাদ, স্বৈরতন্ত্র, জাতিয়তাবাদ ও কম্যুনিজমের ন্যায় নানারূপ হিংস্র মতবাদের প্রতিষ্ঠা ও বীভৎস নাশকতা ঘটেছে। আজও আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, কাশ্মির ও আরাকানে যেরূপ ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা চলছে, সেটি কোন বন্যপশু, সুনামী, ভূমিকম্প ও রোগ-জীবাণুর কারণে নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প, পুটিন, বাশার আল আসাদ, জেনারেল সিসি, নরেন্দ্র মোদী, ও অঙ সাঙ সুকির ন্যায় মানবরূপী যে অসংখ্য দানবগণ দেশে দেশে অধিকৃতি জমিয়েছে –এরূপ বীভৎস নাশকতার নায়ক তো তারাই। তাদের কারণে সন্ত্রাস আজ আর স্রেফ খুনি ও ডাকাতদের পেশা নয়; সেটি বরং এসব দানব-অধিকৃত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় নীতি। ফলে সন্ত্রাস এখন ভয়ানক আন্তর্জাতিক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। তাদের সন্ত্রাসটি তাদের বিরুদ্ধেও যারা ইসলামের  প্রতিষ্ঠা নিয়ে ময়দানে নামে; এবং সেটি বিশ্বের যে কোন প্রান্তে।

 

মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআন নাযিল করেছেন মানব জাতির জন্য ইহলোকে শান্তি এবং পরলোকে জান্নাত নিশ্চিত করতে। কিন্তু বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানব বেছে নিয়েছে অশান্তি ও জাহান্নামের পথ। ফলে মানব জাতির বিপর্যয়টিও এখন বিশ্বময়। কোরআনের শিক্ষা থেকে দূরে থাকার কারণে এমন কি মুসলিম দেশগুলিতেও মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার কাজটিই প্রচণ্ড ভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এমন কি মানব রূপে বেড়ে উঠার কাজটিও। উন্নত রাস্তাঘাট, কলকারখানা, যুদ্ধাস্ত্র, ভোগ্যপণ্য ও আকাশচুম্বি টাওয়ার নির্মাণ শ্রেষ্ঠ কর্ম নয়। শ্রেষ্ঠ কর্ম তো শ্রেষ্ঠ মানব নির্মাণ। এমন মানবগণই মহান আল্লাহতায়ালার বিচারে জান্নাতের যোগ্য বিবেচিত হয়। ইসলামের শ্রেষ্ঠ নবী (সাঃ)র সূন্নত তো এমন উন্নত মানব সৃষ্টি। তাঁর হাতে প্রাসাদের বদলে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব সৃষ্টি হয়েছে। ফেরশতাগণও তাদের নিয়ে গর্ব করেন। অথচ মুসলিম দেশগুলিতে আজ বিপুল হারে রাস্তাঘাট, কলকারখানা, প্রাসাদতুল্য ঘর ও আকাশচুম্বি টাওয়ার নির্মিত হলেও ব্যাপক ভাবে বেড়ে উঠছে জাহান্নামের উপযোগী মানুষ। কারণ, শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফা, জিহাদ ও মুসলিম বিশ্বের একতার বিরুদ্ধে দাঁড়ালে কি জান্নাতের যোগ্য হওয়া যায়? ইসলামের মৌল বিধানগুলির বিরুদ্ধে এরূপ বিদ্রোহ তো জাহান্নামে টানে। অথচ জান্নাতমুখি মানুষের সৃষ্টিশীলতা ও অর্জন তো বিশাল। তাদের হাতে স্রেফ শুরা, শরিয়ত, হুদুদ, জিহাদ ও খেলাফাই প্রতিষ্ঠা পায় না, নির্মূল হয় ইসলামবিরোধী সকল দুর্বৃত্ত ও স্বৈরাচারি অপশক্তি। তখন জনগণের জানমাল, ইজ্জত-আবরু পায় নিরাপত্তা। কোন রাষ্ট্রে সেরূপ না হলে প্রমাণিত হয়, ইসলাম থেকে সে দেশের জনগণের বিচ্যুতিটি কতটি গভীর ও ভয়ানক।

আজকের মুসলিমদের বড় ব্যর্থতাটি স্রেফ স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের অধিকৃতি নয়। বর্ণ, ভাষা ও ভূগোল-ভিত্তক বিভক্তিও নয়। বরং সে ব্যর্থতাটি ধরা পড়ে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, স্বার্থপরতা, দুর্বৃত্তি, আত্মঘাতি যুদ্ধ, সন্ত্রাস, হত্যা, অশ্লীলতা ও ব্যাভিচারের সয়লাবে। ব্যর্থতাটি এখানে শুধু ব্যর্থতা থেকে বাঁচাতে নয়, ব্যর্থতার কারণগুলি বুঝতেও। এরূপ বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতার কারণে কোরআন না বুঝে ও তা থেকে শিক্ষা না নিয়েও তারা মুসলিম রূপে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। সেটি যে সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অসম্ভব -সেটি বুঝার সামর্থ্যও তাদের নাই। ঈমানবিনাশী এরূপ অজ্ঞতার নির্মূল এজন্যই ইসলামের মূল মিশন। এ কাজটি অসম্পূর্ণ রেখে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে কি কোন বিপ্লব আনা যায়? ফরজ ইবাদত তাই শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত বা দান-খয়রাত নয়, বরং প্রথম ফরজটি হলো শিক্ষালাভ। সেটি কোরআনের জ্ঞানের। অন্য ফরজগুলো সুষ্ঠ ভাবে পালিত হওয়ার জন্যও এ ফরজটি বরং প্রথমে পালিত হওয়াটি অপরিহার্য। মহান আল্লাহর দরবারেও সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি তাই শিক্ষালাভ ও শিক্ষাদান। পানাহার পশুর জীবনেও আছে। পশু থেকে মানুষ শ্রেষ্ঠতর হয় তো শিক্ষার গুণে। মানুষে মানুষে ও নানা রাষ্ট্রের মাঝে গুণগত যে বিশাল তারতম্য সেটিও তো শিক্ষা ভেদে।

যে শিক্ষানীতিটি মহান আল্লাহতায়ালার

মানব সৃষ্টিকে মানব রূপে এবং সে সাথে ঈমানদার রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিক্ষাদানে উদ্যোগ নিয়েছেন স্বয়ং মহান আল্লাহতায়ালা নিজে। নইলে যে লক্ষ্যে মানব সৃষ্টি সেটি যে ব্য়র্থ হতে ব্যর্থ -সেটি সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালার চেয়ে অধিক কে জানে? সে কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণে তিনি যেমন লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন, তেমনি কিতাব পাঠিয়েছেন। সে লক্ষ্যে পবিত্র কোরআন হলো সমগ্র মানব জাতির জন্য সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব। তাই পবিত্র কোরআনের জ্ঞানকে আত্মস্থ না করে শিক্ষালাভের লক্ষ্যপূরণ কি সম্ভব? ওহীর এ পবিত্র জ্ঞান ছাড়া পশু হওয়া থেকে যেমন পরিত্রাণ মেলে না, তেমনি মুক্তি মেলে না জাহান্নামের পথে যাত্রী হওয়া থেকেও।

মুসলিমগণ যখন গৌরবের শীর্ষে ছিলেন এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণ করেছিলেন –তাদের সে সাফল্যের মূলে ছিল কোরআনী জ্ঞান। মানব মন যখন সে জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়, মানব জীবনে তখনই সবচেয়ে বড় সংযোজন ঘটে। তখন আসে চেতনা, দর্শন, কর্ম, আচরণ ও সংস্কৃতিতে বিপ্লব। মুসলিম বিশ্বে আজ হাজার হাজার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীর সংখ্যাও বহু লক্ষ। কিন্তু পবিত্র কোরআনের জ্ঞানকে সিলেবাসের বাইরে রাখায় তাদের দর্শন ও চরিত্রে কোন বিপ্লব আসছে না। কোরআনী জ্ঞানের ভান্ডার থেকে জ্ঞান-লাভ ও সে জ্ঞানের অনুসরণ ছাড়া এ জগতে বিজয়-লাভ ও শান্তি-লাভ সম্ভব -সেটি বিশ্বাস করলে কি কাফের হওয়ার জন্য মুর্তি পুজার প্রয়োজন পড়ে? অথচ এমন একটি ভ্রষ্ট বিশ্বাসের কারণেই কোরআন থেকে শিক্ষালাভ বাংলাদেশে ন্যায় মুসলিম দেশগুলির পাঠ্যক্রমে আদৌ গুরুত্ব পায়নি। ফলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্য়ালয়ের ছাত্র-ছাত্রীগণ তাদের ছাত্র জীবন শেষ করে কোরআন বুঝার সামর্থ্য অর্জন না করেই। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোর শিক্ষানীতির এটিই হলো সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। অথচ কোরআন বুঝার সামর্থ্যটি কোন মামূলী বিষয় নয়। এ সামর্থ্য ছাড়া ন্যায়-অন্যায় চেনা, সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা এবং জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচার সামর্থ্য সৃষ্টি হয় না।

রাস্তার দু্’পাশে যে অসংখ্য সাইন বোর্ড -সেগুলি দেখা ও বুঝার সামর্থ্য না থাকলে পৃথিবীর কোন দেশই এমন ব্যক্তিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয় না। কারণ, সে সাইন বোর্ডগুলি দেয় বিপদ-আপদ ও পথের নির্দেশনা। সেগুলি না বুঝে সঠিক পথে ও সঠিক ভাবে গাড়ি চালনা অসম্ভব। সে সামর্থ্য দৃষ্টিহীন ও অবুঝ ব্যক্তিদের থাকে না। রাস্তায় গাড়ি নামালে তারা দুর্ঘটনা ঘটায়। সেরূপ বিপদ ঘটে জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও। এ পার্থিব জীবনে বস্তুতঃ প্রতিটি ব্যক্তিই একজন ড্রাইভার। তার নিজ জীবন-গাড়ির স্টিয়ারিংটি হাতে। এখানে দায়ভারটি আরো গুরুতর; পথ হারালে তাকে অনন্ত অসীম কালের জন্য জাহান্নামের আগুনে পৌঁছতে হবে। তাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্কিল বা দক্ষতাটি ডাক্তারী, ইঞ্জিনীয়ারিং, প্রশাসনিক বা বৈজ্ঞানিক পেশার নয়, বরং সেটি সঠিক পথে ও সঠিক ভাবে জীবন গাড়ি চালনার দক্ষতা। এবং সে লক্ষ্যে কোরআন হলো রোড ম্যাপ। তাই সঠিক পথে জীবন পরিচালনা করতে হলে কোরআন বুঝতেই হবে। এছাড়া বিকল্প পথ নেই। কোরআনী জ্ঞানের অপরিসীম গুরুত্ব তো একারণেই।

কোরআন দেয়, হারাম ও হালাল, ন্যায় ও অন্য়ায়ের সিগনাল। সে সিগনালগুলি দেখা, বুঝা ও অনুসরণের যোগ্যতা না থাকলে পথভ্রষ্টতা অনিবার্য। সে পথভ্রষ্টতায় জুটে জাহান্নাম। আজ মুসলিম দেশগুলির রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদলত ও প্রশাসনে যে প্রচণ্ড পথভ্রষ্টতা তার কারণ তো কোরআনী বিধি-নিষেধগুলির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। বিদ্রোহের কারণে বিপুল ভাবে বেড়েছে পথভ্রষ্ট মানুষের সংখ্যা। এদের কারণেই এমন কি মুসলিম দেশেও পরাজয় বেড়েছে ইসলামের। যে ব্যক্তির সমগ্র ছাত্রজীবন কেটেছে কোরআন অর্থসহ না বুঝে পড়ে, সে সামর্থ্য তার মধ্যে সৃষ্টি হবে কি করে? সে যে পথভ্রষ্ট ও জাহান্নামমুখি -সেটিই বা বুঝবে কীরূপে? সেটি বুঝতে হলেও তো সিরাতুল মুস্তাকীমের রোডম্যাপটি চিনতে হয়। একমাত্র তখনই জানা সম্ভব, সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে সে কতটা দূরে।

তবে এখানে বিষয়টি শুধু অজ্ঞতার নয়, বরং ইসলামের বিরুদ্ধে দুষমনীর। সে দুষমনীর কারণেই আগ্রহও নেই সিরাতুল মুস্তাকীম চেনায়। ফলে আগ্রহ নাই কোরআনের জ্ঞানার্জনে। যে ব্যক্তি জাপানের শহর টোকিও যেতে চায়, সে কি লন্ডনের পথের খোঁজ নিবে? একই রূপ অবস্থা ইসলামের দুষমনদের। জান্নাতের পথে চলায় তাদের আগ্রহ নেই। পরকালের উপর তাদের বিশ্বাসও নাই। ফলে কেন তারা জান্নাতের পথেকর খোঁজ নিবে? নইলে জাহান্নামে পথ এবং জান্নাতের পথ –এ দুটি ভিন্ন পথ যে একত্রে চলতে পারে না সেটি বুঝে উঠা কি এতই কঠিন? এরা মুসলিম সমাজে নিজেদের ইসলামের অনুসারি রূপে পরিচয় দেয় নিছক অন্যদের ধোকা দেয়ার লক্ষ্যে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সেটি জরুরীও। নিজেদের মুসলিম নাম ও মুসলিম পরিচিতিকে একাজে তারা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে। মহান আল্লাহতায়ালা তাদের সে কপট চরিত্রটি তুলে ধরেছেন সুরা মুনাফিকুনে। সে মুনাফেকিটি আরো সুস্পষ্ট রূপে ধরা পড়ে যখন সেক্যুলারিজম, ন্যাশনালিজম, সোসালিজম ও স্বৈরাচারের পুজারী এবং শরিয়তের প্রচন্ড বিরোধী হয়েও তারা মাঝে মাঝে মাথায় টুপি দেয়, তসবিহ হাতে জনসম্মুখে হাজির হয়, দাড়ি রাখে, হজে যায়, ইফতারের আয়োজন করে, এবং জনসভায় দাঁড়িয়ে “আমিও মুসলিম” রূপে দাবী করে।

যে স্ট্রাটেজী ও সূন্নত মহান আল্লাহতায়ালার

কোরআনের জ্ঞানার্জন যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটি বুঝতে হলে মানব জীবনের মূল লক্ষ্যটি বুঝতে হয়। মানব জীবনে মৃত্যু বা অন্ত নাই; আছে ইহকালীন জীবন থেকে পরকালীন জীবনে ইন্তেকাল তথা স্থানান্তর। এরপর শুরু হয় অনন্ত-অসীম কালের পরকালীন জীবন। সে পরকালীন জীবনে যেমন জান্নাত প্রাপ্তির ন্যায় বিশাল প্রমোশন আছে, তেমনি জাহান্নামের আগুণে দগ্ধ হওয়ার ভয়ানক আযাবও আছে। প্রমোশন বা পুরস্কার লাভের জন্য লাগাতর পরীক্ষাও আছে। কারণ, পরীক্ষা ছাড়া এ জীবনে কোথাও কি কোন প্রমোশন জুটে? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাই এ পার্থিব জীবনকে পরীক্ষাকালীন জীবন রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। সে পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার জন্য হুশিয়ারও করে দিয়েছেন। স্কুল-কলেজের কোন পরীক্ষায় পাশ করতে হলে তাকে সিলেবাস মানতে হয়, নির্দেশিত টেক্সট বই বার বার পড়তে হয়। এবং সে টেক্সট বইয়ের বাইরে হাজারো বই পাঠ করলেও পাশ জুটে না। তেমনি পার্থিব জীবনের পদে পদে পরকালের পুরস্কার লাভের যে পরীক্ষা, সে পরীক্ষায় পাশ করতে হলে টেক্সট বইয়ের পাঠ অপরিহার্য। পবিত্র কোরআন হলো সেই টেক্সট বই। তাই কোরআনের জ্ঞান থেকে দূরে থাকলে ব্যর্থতাটি অনিবার্য। এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদতটি হলো কোরআনের জ্ঞানার্জন। এবং শ্রেষ্ঠ দান তথা আমেলুস সালেহ হলো পবিত্র কোরআনের জ্ঞান দান।

মানব সৃষ্টি নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার স্ট্রাটেজি ও সূন্নতটি বুঝা যায়, মহান নবীজী (সাঃ)র উপর নাযিলকৃত পবিত্র কোরআনের প্রথম ৫টি আয়াতের দিকে নজর দিলে। প্রথম নাযিলকৃত সুরা আলাকের ৫টি আয়াত নামায-রোযা বা হজ-যাকাত ফরজ করতে নাযিল হয়নি। নবীজী (সাঃ)র সাথে প্রথম সংযোগেই মহান আল্লাহতায়ালা তাঁকে “ইকরা” তথা পড়ার হুকুম দিয়েছেন। নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের হুকুম এসেছে প্রায় এক যুগ পর। লক্ষ্য এখানে নবীজী (সাঃ) ও তাঁর অনুসারিদের মাঝে পবিত্র কোরআন পড়া তথা তা থেকে জ্ঞান লাভের সামর্থ্য সৃষ্টি। নবীজী (সাঃ) নিরক্ষর ছিলেন। কাগজের পৃষ্ঠা থেকে কোরআন পাঠের সামর্থ্য তাঁর ছিল না। তিনি পাঠ করতেন তার স্মৃতির পাতায় ক্ষোধিত কোরআন থেকে। কোরআন পাঠের সামর্থ্য বাড়াতেই মিশর, ইরাক, সিরিয়া, সূদান, মরক্কো, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজিরিয়া, মালি, মৌরতানিয়ার ন্যায় বহুদেশের জনগণ নিজেদের মাতৃভাষাকে দাফন করে আরবী ভাষাকে নিজ ভাষা রূপে গ্রহণ করেছিলেন। মাতৃভাষা পরিত্যাগ করা মানব ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। মানুষ ভাষার জন্য বাঁচে না। বরং ভাষাকে বাঁচতে হয় মানুষের প্রয়োজন মেটাতে।  সে সামর্থ্য না থাকলে মানব জীবন থেকে সে ভাষাকে বিদায় নিতে  হয়। ইউরোপ-আমেরিকায় এসে বহু লক্ষ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও নানা ভাষার লোক নিজেদের মাতৃভাষা পরিত্যাগ করে ইরাজী, ফরাসী ও নানা বিদেশী ভাষা শিখছে। সেটি নিছক উপার্জন বাড়াতে। এবং সেটি অন্যভাষীদের দর্শন, শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন ও ব্যবসার সাথে সংযোগ বাড়াতে। কিন্তু মানবের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তো অনন্ত-অসীম কালের পরকালীন জীবনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো। সে জন্য অপরিহার্য হলো মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত কোরআনের সাথে গভীর সংযোগ স্থাপন। সে জন্য জরুরী হলো কোরআনের ভাষা শিক্ষা। সে কারণেই প্রথম যুগের মুসলিমগণ নিজেদের মাতৃভাষা পরিত্যাগ করে কোরআনের ভাষা শিখেছেন। এতে তাদের যেমন সিরাতুল মুস্তাকীম চেনার সামর্থ্য বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে সে পথে চলার সামর্থ্য। সে কালে তাদের গৌরব ও বিজয় এসেছে তো সে পথেই। আর আজকের মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে পথভ্রষ্টতায়। আর পথভ্রষ্টতায় কি বিজয় বা ইজ্জত জুটে? সেটি তো অপমান ও জাহান্নামের পথ। তাই পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচাই তো মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। কোন ব্যক্তির জীবনে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু থাকতে পারেনা।  সে এজেন্ডাকে মানব মনে স্থায়ী করতেই নামাযের প্রতি রাকাতে সুরা ফাতেহা পাঠের বিধান। সুরা ফাতেহাতে যে দোয়াটি নামাযের প্রতি রাকাতে পাঠ করতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে সেটি সম্পদ লাভ, সন্তান লাভ, ক্ষমতালাভ বা সুস্বাস্থ্য লাভের দোয়া নয়, সেটি হলো সিরাতুল মুস্তাকীম পাওয়া এবং পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচার দোয়া। কোনটি সিরাতুল মুস্তাকীম এবং কোনটি পথভ্রষ্টতা – সে জ্ঞানের সন্ধান মেলে তো পবিত্র কোরআনে। পবিত্র কোরআনের জ্ঞানার্জন এজন্যই ফরজ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আজকের মুসলিম জীবনে সিরাতুল মুস্তাকীম খুঁজে পাওয়া এবং পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পেয়েছে? সে বিষয়ে ভয়ানক গুরুত্বহীনতা ধরে পড়ে তাদের শিক্ষাব্যবস্থায়। বরং পথভ্রষ্টতা বাড়াতেই বাংলাদেশর ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-কার্যক্রমটি পরিচালিত হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত টেক্সট বুক পবিত্র কোরআনকে পাশ কাটিয়ে। শিক্ষাব্যবস্থা পরিণত হয়েছে কোরআনের নির্দশনা থেকে দূরে সরানোর হাতিয়ারে। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম ও তাঁর শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে এর বড় বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা আর কি হতে পারে?

সুরা আলাকের প্রথম ৫টি আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা নিজেকে শুধু স্রষ্টা (খালেক), ও দয়াময় (আকরাম) রূপেই পরিচয় দেননি, পরিচয় দিয়েছেন অসংখ্য অজানা জ্ঞানের মহান শিক্ষাদাতা রূপেও। (আল্লামা ইনসানা মা লাম ইয়ালাম।) সুরা রাহমানের শুরুতে মহান আল্লাহতায়ালা নিজেকে রাহমান তথা পরম করুণাময় হিসাবে পরিচয় দিয়েছেন। দ্বিতীয় আয়াতে সে করুণার নির্দশন রূপে নিজেকে উল্লেখ করেছেন কোরআনী জ্ঞানের শিক্ষক রূপে (আল্লামাল কোরআন)। তাই শিক্ষাদান মহান করুণাময়ের পবিত্র সূন্নত। অতএব যে ব্যক্তি কাউকে পবিত্র কোরআন শিক্ষা দেয়, সে অনুসরণ করে তাঁর সে সূন্নত। ব্যক্তির জীবনে এ সূন্নত পালনের চেয়ে বড় ইবাদত আর কি হতে পারে? মহান নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাদের মাঝে সে পবিত্র সূন্নত পালনের আগ্রহটি ছিল অতি গভীর। নবীজী (সাঃ) সে সূন্নত পালন করতে গিয়ে নানা জনপদে ঘুরেছেন। এজন্য কারো থেকে তিনি কোন মজুরী চাননি। বরং প্রচণ্ডভাবে আহত ও অপমানিত হয়েছেন। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের কোরবানীও কি একাজে কম? পবিত্র কোরআনের শিক্ষক রূপে তাঁরা হাজারো মাইল দূরের নানা অজানা দেশের গ্রামগঞ্জে পৌঁছেছেন। ইসলামের আলো জ্বালাতে জিহাদ করেছেন, অনেকে শহীদও হয়েছেন। তাদের সে কোরবানীর কারণেই ইসলাম বিশ্বময় বিস্তার পেয়েছে। এবং বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেয়েছে মুসলিম উম্মাহ।

অথচ আজকের মুসলিমদের এক্ষেত্রে ব্যর্থতাটি বিশাল। মহান আল্লাহতায়ালার সে সূন্নত-পালন  ও শ্রেষ্ঠ ইবাদতকে তারা চাকুরিতে পরিণত করেছে। পচনটি এতটা গভীরে পৌঁছেছে যে, যারা কোরআন কিছুটা বুঝে তারাও অর্থলাভের প্রতিশ্রুতি না পেলে মুখ খুলে না। ফলে নবীজী (সাঃ)র যুগের ইসলাম খোদ মুসলিম ভূমিতেই অপরিচিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে মুসলিম সন্তানেরা ধর্ম পালন করছে কোরআনী  জ্ঞানের গভীর অজ্ঞতা নিয়ে। এবং তাদের জীবনে গুরুত্ব পায়নি শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফা, উম্মাহর একতা ও আল্লাহর তায়ালার পথে জিহাদ। তারব ভেবে নিয়েছে, ইসলামের এ বিধানগুলি না মেনেও ইসলাম পালন সম্ভব। এ জন্যই নবীজী (সাঃ)র ইসলাম তাদের কাছে মৌলবাদ বা সন্ত্রাস মনে হয়। এবং সে ইসলামের যারা প্রতিষ্ঠা করতেচায় তাদেরকে হত্যা করাটাকে সওয়াবের কাজ মনে করে। তাদের হত্যার কাজে এমন কি কাফরদের সাথে কোয়ালিশনও গড়ে! ইসলাম থেকে দূরে সরাটি তাদের জীবনে এতই গভীর যে, ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে ৫৭ রাষ্ট্রে বিভক্ত যে মানচিত্র গড়া হয়েছে তা নিয়ে কোন বেদনা নেই। বরং বিভক্ত মানচিত্র বাঁচিয়ে রাখাটি তাদের রাজনীতি, প্রতিরক্ষাযঃনীতি ও বিদেশ নীতিতে পরিণত হয়েছে। ভৌগলিক বিভক্তির প্রতীক যে পতাকা -সেটির পূজা নিত্যদিনের আরাধনায় পরিণত হয়েছে। এমন কি যারা নামাযী ও আলেম তাদের মাঝেও কোনরূপ আন্দোলন নেই এরূপ নিষিদ্ধ বিভক্তির দেয়াল ভাঙ্গার। এভাবেই লাগাতর অবাধ্যতা হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার সে নির্দেশটির যাতে বলা হয়েছেঃ “ওয়া তা’সিমু বি হাবলিল্লাহি জামিয়াঁও ওলা তাফাররাকু” (অর্থঃ মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধরো আল্লাহতায়ালার রশি তথা কোরআনকে এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না।) -(সুরা আল-ইমরান আয়াত ১০৩।) প্রশ্ন হলো, কোরআনী হুকুমের এমন অবাধ্যতা নিয়ে কি প্রকৃত মুসলিম হওয়া যায়? এরূপ বিদ্রোহে জুটে কি মহান আল্লাহতায়ালার রহমত? এ বিভক্তি তো আযাবের পথ -যার হুশিয়ারি এসেছে সুরা আল-ইমরান ১০৫ নম্বর আয়াতে।

গৌরব-কালের মুসলিমদের থেকে আজকের মুসলিমদের পার্থক্য অনেক। তবে মূল পার্থক্যটি, কোরআন থেকে বিচ্ছিন্নতা। এজন্যই তাদের চলার পথটি প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের থেকে ভিন্ন। পবিত্র কোরআন থেকে বিচ্ছিন্ন হলে এরূপ বিচ্যুতি তো অনিবার্য। তখন অসম্ভব হয় সত্যিকার মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। আজকের মুসলিমদের চলার পথটি এজন্যই গুমরাহীর তথা বিচ্যুতির। তাঁদের পথটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সভ্যতা রূপে উত্থানের। আজ সেটি কাফেরদের হাতে পরাজয়, অধিকৃতি, নির্যাতিত, নিহত ও অপমানিত হওয়ার পথ। সে সাথে শরিয়ত বর্জন, অশ্লীলতা, পতিতাপল্লি, সূদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, স্বৈরাচার ও  মিথ্যাচারকে বৈধতা দিয়ে বাঁচার পথ। ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে এরূপ পরাজয় নিয়ে এমনকি আলেমদের মাঝেও ক্ষোভ নেই, প্রতিরোধও নাই। আগুণের শিখা থাকলে উত্তাপও থাকে। তেমনি কোরআনী জ্ঞানে আলোকিত মন থাকলে অনাচার, মিথ্যাচার ও পাপাচারের বিরুদ্ধে জিহাদও শুরু হয়। সে জিহাদ না থাকায় প্রমাণিত হয় অশিক্ষা ও কুশিক্ষার হাতে তাদের মন কতটা অধিকৃত।

সওয়াবের নামে অবাধ্যতা

এ নিয়ে কি সন্দেহ আছে, মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের যে জ্ঞানদানকে নবীজী (সাঃ)র জীবনে ওহী নাযিলের প্রথম দিন থেকে শুরু করেছিলেন সেটিই মুসলিমদের কাছে আজ সবচেয়ে গুরুত্বহীন। মুসলিমগণ আজ কোরআন পড়ে স্রেফ সাওয়াব হাসিলের জন্য, জ্ঞানার্জনের জন্য নয়। হিদায়েত বা নির্দেশনা নেয়ার জন্যও নয়। নির্দেশনা নেয় পাশ্চাত্যের কাফেরদের থেকে। একারণে মুসলিম দেশগুলিতে কাফেরদের দর্শন, আইন, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির এতো বিজয়। পবিত্র কোরআন থেকে নির্দেশনা নেয়ায় আগ্রহ থাকলে সেটি বুঝাতেও আগ্রহ থাকতো। বাংলাদেশের ন্য়ায় মুসলিম দেশগুলিতে এমন মানুষের সংখ্যা লক্ষ লক্ষ যারা জীবনে সমগ্র কোরআন বহুবার পাঠ করেছে। কিন্তু একটি বারও সেটি বুঝে পাঠ করেনি। পবিত্র কোরআনের যে আয়াতগুলি তারা নামাযে পাঠ করে, সেগুলির অর্থ জানাতেও তাদের অনাগ্রহ। অথচ নামাযে ধ্যানমগ্নতা আসে তো পঠিত আয়াতগুলির অর্থ বুঝাতে। নামায তখন মুমিনের যিকরে পরিণত হয়। এবং সেটি না হলে লাগামহীন চিন্তায় অধিকৃত হয় মন। সে ধ্যানহীনতা থেকে মু’মিনের নামাযকে বাঁচাতেই মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশঃ “ইয়া আইয়োহাল্লাযীনা আ’মানু লা তাকরাবুস সালতা ওয়া আনতুম সুকারা হাত্তা তা’লামু মা তা’কুলুন” অর্থঃ হে ঈমানদারগণ, তোমরা নামাযের নিকটবর্তী হয়োনা যদি মাদকাসক্ত হও এবং যতক্ষণ না যা বলো তা বুঝতে না পারো। -(সুরা নিসা আয়াত ৪৩)। এই আয়াতটি তখন নাযিল হয়েছে যখন মদপান হারাম ঘোষিত হয়নি। মাদকাসক্ত ব্যক্তি এমন কিছু বলে  যার অর্থ সে নিজেও বুঝে না। এবং সে অবস্থাটি তো তাদেরও যারা কোরআনের ভাষা বুঝে না। নামাযে দাঁড়িয়ে মাদকাসক্তদের ন্যায় তাদের মনেও ধ্যানমগ্নতা বা মনযোগ থাকে না। তবে পার্থক্যটি হলো, মদের আছড় কয়েক ঘন্টা পর দূর হয়, কিন্তু কোরআনের ভাষা যারা বুঝে না তাদের নামাযে সে সমস্যাটি তো আজীবনের। সেটি দূর করতেই অতীতের মুসলিমগণ নিজেদের ভাষা পাল্টিয়েছিলেন।

কোরআন বুঝা, তা থেকে জ্ঞান লাভ করা এবং অপরকে সে জ্ঞানদান করার গুরুত্ব প্রকাশ পেয়েছে নবীজী (সাঃ)র হাদীসেও। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজে কোরআন থেকে শিক্ষা নিল এবং অন্যকে কোরআন শেখালো সে ব্যক্তিই সবচেয়ে উত্তম। কোন ভাল পাঠ্য পুস্তক বহুশত বার না বুঝে পড়লেও তাতে পরীক্ষায় পাশ জুটে না। না বুঝে পুস্তক-পাঠ শুধু অর্থহীনই নয়, বেওকুফিও। কোন শিক্ষক যদি ছাত্রদের এরূপ নছিহত দেয় যে পরীক্ষায় পাশের জন্য টেক্সবইটি না বুঝে পড়লেও পাস জুটবে। এমন শিক্ষককে কেউ কি মানসিক দিক দিয়ে সুস্থ্য বলবে? এরূপ উদ্ভট কথা বলা ও বিশ্বাস করা –উভয়ই তো বুদ্ধিহীনতা। অথচ বুদ্ধিহীন সে আচরনটি হচ্ছে পবিত্র কোরআনের সাথে। এ পার্থিব জীবনে পদে পদে পরীক্ষা। ঈমানদার ব্যক্তি মহান আল্লাহতায়ালার করুণা লাভ ও জান্নাত লাভের যোগ্য বিবেচিত হয় সে পরীক্ষায় পাশের পরই। পাশের সে সামর্থ্য বাড়াতেই মহান রাব্বল আলামিন নাযিল করেছেন পবিত্র কোরআন। প্রশ্ন হলো, সে সামর্থ্য কি পবিত্র কোরআন না বুঝে পড়লে সৃষ্টি হয়? পবিত্র কোরআনের কোথাও কি না বুঝে কোরআন পাঠের ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে? নবীজী (সাঃ) বলেছেন, পবিত্র কোরআনের প্রতিটি অক্ষর পাঠে রয়েছে নেকী। কিন্তু সেটি কি না বুঝে পড়ায়? খাওয়ার অর্থ খাদ্যকে শুধু মুখে পুরা নয়। বরং সেটি চর্বন করা, গিলে ফেলা এবং হজম করা। নইলে সেটি খাওয়া হয় না। বিষয়টি যে কোন বিবেকমান মানুষই বুঝে। তাই কাউকে খেতে বললে গিলতে বলাটি অনর্থক। তেমনি কিছু পড়ার অর্থ হলো, বিষয়টি বুঝা। নইলে সেটিকে কি পড়া বলা যায়? অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে ঘরে ঘরে না বুঝে কোরআন তেলাওয়াতের ন্যায় পরম বিবেকহীনতার মহড়া হচ্ছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, সে কান্ডজ্ঞানহীন প্রাকটিসকে সওয়াবের কাজ গণ্য করা হয়!

অথচ মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ হলো কোরআনের আয়াতের উপর তাফাক্কুর, তাদাব্বুর, ও তাফাহুমের। অর্থাৎ হুকুম এখানে চিন্তা-ভাবনা, গভীর মনোনিবেশ ও আক্বলের প্রয়োগে। কোরআন কি এ জন্য নাযিল করা হয়েছে যে, মানুষ হিদায়েতের এ মহান গ্রন্থটি স্রেফ পাঠ করবে এবং তা বুঝবে না এবং তা থেকে শিক্ষাও নিবে না? না বুঝে তেলাওয়াতে প্রচন্ড অবাধ্যতা হয় সে নির্দেশের। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “ফাযাক্কের বিল কোরআন”। অর্থাৎ কোরআন দ্বারা মানুষকে সাবধান করো। কিন্তু যে ব্যক্তি কোরআন বুঝে না এবং বুঝতেও আগ্রহী নয় তার উপর কোরআনের বানী প্রভাব ফেলবে কেমনে? কোরআন কোন যুদ্ধাস্ত্র নয়, এর মূল শক্তিটি তার জ্ঞানসমৃদ্ধ বানী। ফলে সেটি তখনই কাজ দেয় যখন সে জ্ঞানের প্রয়োগ হয়। তাছাড়া মহান আল্লাহতায়ালার যে কোন হুকুমের অবাধ্যতাই তো কবিরা গুনাহ। ফলে কোরআন না বুঝার কারণে তাঁর হুকুমের যে অবাধ্যতা হচ্ছে তাকে ছোট করে দেখার উপায় নেই। এ অবাধ্যতার ভয়ানক কুফলটি হলো, এতে অসম্ভব হচ্ছে পবিত্র কোরআন থেকে হিদায়েত লাভ। ফলে বাড়ছে গুমরাহি ও পথভ্রষ্টতা।

না বুঝে কোরআন পাঠ এভাবেই মুসলিম জীবনে ভয়ানক বিপদ ডেকে আনছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে কোরআন নাযিলের মূল উদ্দেশ্য। মুসলিমদের এরূপ ব্যর্থতায় একমাত্র শয়তানই খুশি হতে পারে। অথচ এ নিয়ে মুসলিমদের নিজেদের চেতনাশূণ্যতা কি কম? অশিক্ষায় ও কুশিক্ষায় একটি জনগোষ্ঠিকে যে কতটা চেতনাশূণ্য করতে পারে -এ হলো তার নজির। পাথরের উপর বীজ গজায় না। তেমনি চেতনাশূণ্য মানুষের উপর সত্যের বানীও কাজ দেয় না। হযরত নূহ (আঃ)র ৯৫০ বছরের চেষ্টা এরাই ব্যর্থ করে দিয়েছে। কোন দেশ ইসলামের দুষমন শক্তির হাতে অধিকৃত হলে চেতনা ধ্বংসের সে কাজটিই প্রবল ভাবে হয়। মুসলিম বিশ্বের উপর উপনিবেশিক শাসন এবং পরবর্তীতে তাদের মদদপুষ্ট স্যেকুলার খলিফাদের শাসনে তো সে নাশকতাটিই প্রবল ভাবে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এতে বিপন্ন হচ্ছে শুধু পার্থিব জীবন নয়, আখেরাতের জীবনও। ফলে তাদের শাসন থেকে মুক্তি ও তাদের সৃষ্ট অশিক্ষা ও কুশিক্ষার জঞ্জাল সরানোর চেয়ে অধীক গুরুত্বপূর্ণ কাজ এ জগতে আর কি হতে পারে? ৬/৩/২০১৮



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Saturday, 10 March 2018 23:14
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2018 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.