Home •শিক্ষা ও প্রচার মাধ্যম অশিক্ষা ও কুশিক্ষার নাশকতা (পঞ্চম পর্ব)

Article comments

অশিক্ষা ও কুশিক্ষার নাশকতা (পঞ্চম পর্ব) PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 15 April 2018 09:48

শুরুটি শিক্ষাঙ্গণে

মানুষ কেন পানাহার করে –তা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। এর গুরুত্ব বুঝার জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেয়ার প্রয়োজন নেই; নিরক্ষরগণও সেটি বুঝে। এমন কি পশুও বুঝে। কারণ পানাহারের সাথে বাঁচা-মরার সম্পর্ক। কিন্তু কেন পড়বো, কেন শিখবো, কি শিখবো এবং কতটা শিখবো -তা নিয়ে বিভেদ প্রচুর। কারণ, জ্ঞানার্জনের এ বিষয়টি সম্পৃক্ত বাঁচার সাথে নয়, বরং ‘কেন বাঁচবো’ এবং ‘কীরূপে বাঁচবো’ সে বিষয়টির সাথে। ‘কেন বাঁচবো’ এবং ‘কীরূপে বাঁচবো’ -সে বিষয়ে সবার ধারণা যেহেতু এক নয়, ফলে ভিন্নতা আসে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও বিষয় নিয়ে। আমরা সবাই একই উদ্দেশ্যে পানাহার করি বটে; কিন্তু সবাই একই উদ্দেশ্যে ও একই ভাবে বাঁচি না। বাঁচার উদ্দেশ্য ও ধরণ জনে জনে ভিন্ন হওয়ার কারণে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যটিও ভিন্নতর হয়। ঈমানদার ও সেক্যুলারিস্টদের মাঝে শিক্ষা নিয়ে বিরোধটি এজন্যই অতি বিশাল। সেক্যুলারিস্টদের শিক্ষানীতিতে যেমন ঈমান বাঁচেনা, তেমনি ঈমানদারদের শিক্ষানীতিতে পুষ্টি পায় না সেক্যুলারিস্টদের চেতনা। তাই উভয়ের বাঁচা-মরার লড়াইটি স্রেফ রাজনীতির অঙ্গণে সীমিত নয়, তার চেয়েও গুরুতর ও চুড়ান্ত লড়াইটি হয় শিক্ষাঙ্গণে। শিক্ষাঙ্গণের লড়াইয়ে পরাজিত হলে অনিবার্য হয় রাজনৈতীক পরাজয়। এজন্যই বাংলাদেশসহ সকল মুসলিম দেশের সেক্যুলিরস্টগণ শিক্ষাঙ্গণের উপর থেকে তাদের দখলদারি ছাড়তে রাজি নয়। তারা নানা দলে বিভক্ত হলেও শিক্ষাঙ্গণে কোরআন-হাদীসের পাঠদান বন্ধে তাদের অটুট কোয়ালিশনটি আন্তর্জাতিক কাফের শক্তির সাথে।

 

আভিধানিক অর্থে সেক্যুলারিজমের অর্থ ইহজাগতিকতা। আখেরাতের কল্যাণের ভাবনা এ জন্যই দুনিয়ামুখী সেক্যুলারিস্টদের থাকেনা। এ মতবাদের মূল কথাঃ নৈতিকতা, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে কখনোই ধর্মের প্রভাব থাকতে দেয়া যাবে না। সেক্যুলারিস্টদের দাবীঃ ধর্মের প্রভাব তথা পরকালীন জীবনের ভাবনাকে সীমিত রাখতে হবে ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডিতে, বড় জোর মসজিদের চার দেয়ালের মাঝে। সে ভাবনাকে শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে আনতে দেয়া যাবে না। তাদের কথা, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে থাকবে স্রেফ পার্থিব জীবনকে আনন্দময় করার তাড়না। তাদের লক্ষ্য, পরকালের ভয়-ভাবনাশূণ্য এক অবাধ জীবন। ভোগ-লালসা পূরণের স্বার্থে সে জীবনের উপর কোন লাগাম মানতে রাজী নয়। ফলে তাদের কাছে মদ্যপান, অশ্লিলতা, নাচগান, ব্যাভিচারি ও সমকামিতার ন্যায় জঘন্য পাপাচারও বৈধ ও গ্রহনযোগ্য গণ্য হয়। ইসলামের মিশন যেহেতু নেক আমলের প্রতিষ্ঠা ও সর্বপ্রকার পাপাচারের নির্মূল, উভয়ের মাঝে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান এজন্যই অসম্ভব। ইসলামের বিরুদ্ধে সেক্যুলারিস্টদের আক্রোশ ও যুদ্ধ এজন্যই অতি তীব্র ও লাগাতর। আখেরাতের ভয়-ভাবনা বিনাশে ও ছাত্রছাত্রীদের পার্থিবমুখী করতে শিক্ষাঙ্গণ ও শিক্ষানীতি পরিনত হয় মূল হাতিয়ারে। সেক্যুলারিস্ট শিক্ষাব্যবস্থায় এজন্যই কোরআন হাদীসের কোন স্থান থাকে না। স্থান থাকে না নবীজী (সাঃ) এবং ইসলামের বীরদের ইতিহাস। আখেরাতের ভাবনা এবং সে ভাবনা নিয়ে কিছু করাকে চিত্রিত করা হয় পশ্চাদপদতা বা সাম্প্রদায়িকতা রূপে।

 

ঈমানদারদের কাছে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের চেতনায় শুধু পার্থিব জীবনের কল্যাণ-চিন্তাই থাকে না, অধীক গুরুত্ব পায় অনন্ত-অসীম আখেরাতে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচার ভাবনা। তখন বাঁচার মূল লক্ষ্যটি হয়ে দাঁড়ায় জান্নাতে পৌঁছার ভাবনা। কারণ, দুনিয়ার জীবন ক্ষণিকের, কিন্তু আখেরাতের জীবন বিলিয়ন বা ট্রিলয়ন বছরে শেষ হবার নয়। সে জীবন অনন্ত-অসীম কালের। ঈমানদারির অর্থ শুধু মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলে (সাঃ) পাকের উপর ঈমান নয়, অটল ঈমান রাখতে হয় আখেরাতের উপরও। তাঁকে প্রতি মুহুর্তে বাঁচতে হয় ইসলামের প্রতিটি বিধানের উপর ঈমান নিয়ে। সামান্য মুহুর্তের জন্যও সে ঈমানশূণ্য তথা কাফের হতে পারে না। ঈমানশূণ্য অবস্থায় মৃত্যু হলে জাহান্নাম অনিবার্য –এ বিশ্বাসটি তাঁর মজ্জাগত। ইসলামের প্রতিটি বিধানের প্রতি পূর্ণ ও সার্বক্ষণিক আনুগত্য নিয়ে মু’মিনের অবস্থানটি তখন স্রেফ মসজিদে বা নিজ গৃহে সীমিত থাকে না, বরং প্রবেশ করে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গণে। ঈমানকে জায়নামাযে ফেলে শিক্ষা-সংস্কৃতি, কাজকর্ম, রাজনীতি, প্রশাসন, আদালত বা সংসদে প্রবেশ করা তাই ইসলামের রীতি নয়। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবনে এমন ঘটনা এক মুহুর্তের জন্যও ঘটেনি। এখানেই সেক্যুলারিস্টদের থেকে ঈমানদারের মূল পার্থক্য। মুসলিম দেশগুলিতে সেক্যুলারিস্টগণ নিজেদেরকে মুসলিম রূপে পরিচয় দেয় বটে, কিন্তু শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, আদালত বা সংসদে তাদের অবস্থানটি হয় ইসলামের বিধানের প্রতি কোন রূপ আনুগত্য ছাড়াই। অথচ মু’মিনের প্রতি মুহুর্তের ভাবনা, কাজ-কর্ম, হিসাব-নিকাশ ও পরিকল্পনায় গুরুত্ব পায় আখেরাত। ফলে তাদের আদর্শ ও চলার পথটি সেক্যুলারিস্টদের থেকে ভিন্ন। সে ভিন্নতা যেমন ইবাদত-বন্দেগীতে, তেমনি শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি ও আইন-আদালতে। কোরআনী জ্ঞানার্জনের বিষয়টি তখন স্রেফ গতানুগতিক লেখাপড়ার বিষয় রূপে গণ্য হয় না, গণ্য হয় শ্রেষ্ঠতম ইবাদত রূপে।

 

শুরু জ্ঞানার্জন থেকে

অজু না হলে যেমন নামায হয় না, তেমনি মন ও মগজ কোরআন-হাদীসের জ্ঞানে সমৃদ্ধ না হলে অসম্ভব প্রকৃত মুসলিম হওয়া। বিষয়টির গুরুত্ব সঠিক ভাবে বুঝা যায় মহান নবীজী (সাঃ)র জীবন থেকে। তাঁর জীবনের শুরুটি নামায-রোযা, হজ-যাকাত বা জিহাদ দিয়ে হয়নি, বরং শুরু হয়েছিল ওহীর জ্ঞানার্জন দিয়ে। নবীজী (সাঃ)র উপর মহান আল্লাহতায়ালার প্রথম নির্দেশটি ছিল ‘ইকরা’ তথা পড়ার। পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ না হওয়া অবধি তাঁর প্রতিদিনের ইবাদত ছিল রাতের অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশ বা তার চেয়ে কিছু বেশী বা কম সময় একাকী দাঁড়িয়ে পবিত্র কোরআন পাঠ। নবীজী (সাঃ)র উপর সে হুকুমটি এসেছে সুরা মুজাম্মিলে। রেসালত প্রাপ্তির প্রায় ১১ বছর পর যখন ৫ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয় তখনও নামাযের গুরুত্বপূর্ণ অংশ রূপে প্রাধান্য দেয়া হয় জায়নামাযে দাঁড়িয়ে কোরআন পাঠ।একে বলা হয়েছে মু’মিনের মিরাজ –যা রূহের সংযোগ ঘটায় মহান রাব্বুল আলামিনের সাথে। বস্তুতঃ ব্যক্তি বা কোন জনগোষ্ঠির জীবনে ঈমানদারি কতটা বেঁচে আছে বা মৃত -সেটি বুঝা যায় পবিত্র কোরআনের সাথে মানুষের সংযোগ দেখে। শতকরা ৯৯ ভাগ মুসলিম যে দেশে পবিত্র কোরআনের বাণী বুঝতে অসমর্থ্য সেদেশে মুসলিমদের প্রকৃত ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠায় যে গভীর সংকট -তা বুঝতে কি গবেষণার প্রয়োজন পড়ে? পবিত্র কোরআনের বাণী বুঝার গুরুত্বটি প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ এতটাই গভীর ভাবে বুঝেছিল যে, মিশর, সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, মরক্কো, সূদান, আলজিরিয়া, তিউনিসিয়া, মালির ন্যায় তৎকালীন অনারব দেশগুলোর মানুষ তাদের মাতৃভাষাকে বর্জন করে কোরআনের ভাষাকে গ্রহণ করেছিল। অথচ আজ ঘটছে উল্টোটি। যাদের মাতৃভাষা আরবী তাদেরও আগ্রহ নাই কোরআন বুঝায়। সে আগ্রহের মৃত্যু ঘটেছে চেতনার ভূবন সেক্যুলার দর্শনে অধিকৃত হওয়া। ফলে শিক্ষাঙ্গণে সেটিই গুরুত্ব পায় যা পার্থিব জীবনে ভোগের আয়োজন বৃদ্ধিতে সহায়তা দেয়। ফলে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাজীবন শেষ হয় স্রেফ জাগতিক জীবনে সফল হওয়ার কামনায়।

 

খাদ্য-ত্যাগে দেহের মৃত্যু অনিবার্য। এবং ঈমানের মৃত্য ঘটে কোরআনী জ্ঞানের শূণ্যতায়। ঈমানদারকে তাই স্রেফ পানাহারের তাড়না নিয়ে বাঁচলে চলে না, প্রতি মুহুর্তে বাঁচতে হয় পবিত্র কোরআন থেকে জ্ঞানার্জনের তাড়না নিয়ে। এটিই হলো বিদ্যাশিক্ষা ও শিক্ষাদান নিয়ে ইসলামের মূল দর্শন তথা ফিলোসফি। সে দর্শন মানুষের জীবনে কতটা গভীর বিপ্লব আনতে পারে তারই প্রমাণ হলো প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ। অশিক্ষিত এক বর্বর জাতি যারা কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করতো, তারা সে জ্ঞানের বরকতে সমগ্র মানব-ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষিত জাতিতে পরিণত হয়। যারা এক সময় ভেড়া চড়ানোতো, চাষাবাদ করতো বা ক্ষুদ্র ব্যবসা করতো তাদের মধ্য থেকে সৃষ্ঠি হয় সর্বকালের শ্রেষ্ঠ আলেম, জেনারেল, কাজী ও ফকিহ। পিতা-মাতার দায়িত্ব তাই স্রেফ সন্তানের দেহের খাদ্য জোগানো নয়, বরং গুরুতর দায়ভারটি হলো ঈমান বাঁচানো। এবং ঈমান স্রেফ না বুঝে তেলাওয়াতের সামর্থ্যে বাঁচে না; জরুরী হলো ওহীর জ্ঞানের পুষ্টি। সেজন্য অপরিহার্য হলো, কোরআন বুঝার সামর্থ্য। মুসলিম মহল্লাতে তাই শুধু চালডাল, মাছ-গোশত ও তরিতরকারীর ভাল দোকান থাকলে চলে না, পবিত্র কোরআন বুঝার সামর্থ্য বাড়াতে উন্নতমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও থাকতে হয়। ঈমানদারদের তাই শুধু হাটে-বাজারে ছুটলে চলে না, নিয়মিত ছুটতে হয় কোরআন বুঝার আসরেও। বস্তুতঃ একটি মুসলিম জন-বসতিতে ঈমান কতটা বেঁচে আছে সেটি বুঝা যায় এরূপ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও সেখানে জনগণের ভিড় দেখে। যে দেশে নরনারীর ভীড় স্রেফ হাটে বাজারে ও সেক্যুলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং জনশূণ্যতা পবিত্র কোরআন শিক্ষার আসরগুলিতে –কোরআনী জ্ঞানের শূণ্যতা সেদেশে অনিবার্য। এমন দেশে দ্রুত বিলু্প্ত হয় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং ইসলামী অনুশাসন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলিতে এজন্যই নবীজী (সাঃ)র যুগের ইসলাম বেঁচে নেই। বেঁচে নেই শরিয়ত, হুদুদ, কেসাস, মুসলিম উম্মাহর একতা, খেলাফত ও জিহাদের ন্যায় ইসলামের মৌল বিধান। সেরূপ ইসলাম-শূণ্যতার মাঝে বাংলাদেশে প্রবলতর হয়েছে লুটপাট, সন্ত্রাস, স্বৈরাচার, অশ্লিলতা, ব্যভিচার, ফটো পূজা, মিনার পূজা, কবর পূজা, বর্ষবরণ ও বসন্তবরণের সংস্কৃতি। প্রশ্ন হলো, পাপাচার-পূর্ণ মুসলিম সমাজের এ ইসলামকে ইসলাম বললে নবীজী (সাঃ)র যুগের ইসলামকে কি বলা যাবে?

 

নাশকতা সেক্যুলারিজমের

মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি পৌত্তলিক বা অন্যকোন কাফের সেনাবাহিনীর হাতে হয়নি। সেটি হয়েছে রাজনীতি ও চেতনার অঙ্গণ সেক্যুলারিস্টদের হাতে অধিকৃত হওয়ার কারণে। এবং সেটি ঔপনিবেশিক কাফেরদের হাতে  অধিকৃত হওয়ার বহু আগেই। সে ভয়ানক বিপদের শুরু মুসলিম নামধারি স্বদেশী সেক্যুলারিস্ট স্বৈরাচারিদের শাসনে। তাদের দখলদারির কারণে মুসলিমগণ হারিয়েছে ওহীর জ্ঞানের পুষ্টি; এবং বিলুপ্ত হয়েছে কাফেরদের হামলার বিরুদ্ধে জিহাদের জজবা। “(কাফেরদের হামলার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য) প্রস্তুত হও সমগ্র সামর্থ্য দিয়ে এবং শক্ত করে লাগাও ঘোড়ার লাগামকে এবং সন্তস্ত্র করো আল্লাহর ও তোমাদের শত্রুদের –(সুরা আনফাল, আয়াত ৬০)” -মহান আল্লাহতায়ালার এ চুড়ান্ত নির্দেশটি স্রেফ পবিত্র কোরআনেই রয়ে গেছে। এ নির্দেশটি  মুসলিমদের অন্তরে স্থান পায়নি, ফলে আমলেও তার প্রতিফলন ঘটেনি। নিজেদের দখলদারি বাঁচাতে মুসলিম দেশের স্বৈরাচারি শাসকগণ সবসময়ই মুসলিমদের নিরস্ত্র ও প্রস্তুতহীন রেখেছে। ফলে ঔপনিবেশিক কাফের শক্তির হাতে  মুসলিম দেশগুলি যখন একের পর অধিকৃত হতে থাকে, তখন সে আগ্রাসন রুখতে সাধারণ মুসলিম দূরে থাক, আলেমদেরও রণাঙ্গণে দেখা যায়নি। ফলে সহজ হয়েছে ইউরোপীয় কাফেরদের বিজয়। তাদের দীর্ঘ শাসন সেক্যুলারিজমের সে জোয়ারকে আরো তীব্রতর করেছে মাত্র। এবং সে জোয়ার সৃষ্টিতে শিক্ষাঙ্গণ ব্যবহৃত হয়েছে মূল ক্ষেত্র রূপে।

 

ঈমানদারদের তাই শুধু সীমান্তে কাফের শক্তির সামরিক হামলাকে প্রতিহত করলে চলে না, প্রতিহত করতে হয় চেতনার ভূমিতে স্বদেশী ও বিদেশী শত্রুশক্তির আদর্শিক দখলদারিকেও।  এবং সে চুড়ান্ত লড়াইটি হয় শিক্ষাঙ্গণে। এটিই মু’মিনের বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। সেক্যুলারিস্টদের হাতে শিক্ষাঙ্গন অধিকৃত হওয়ার বিপদটি তাই ভয়ানক। তখন কাফেরদের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধে মুসলিমদের পক্ষে লড়াকু সৈনিক মেলে না। পরাজয় তখন অনিবার্য হয়। মুসলিম দেশের শিক্ষাঙ্গণগুলিতে সেরূপ আত্মঘাতি দখলদারিটি ঘটেছে মুসলিম নামধারি সেকুলারিস্টদের হাতে। তাই স্পেনে মুসলিমদের নির্মূল হওয়া থেকে বাঁচাতে যেমন লোকবল মেলেনি, তেমনি যোদ্ধা জুটেনি বাংলা ও ভারতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও। একেই কারণে বাঁচেনি ওসমানিয়া খেলাফত। বাঁচেনি অখন্ড পাকিস্তানও। এবং দিন দিন কঠিনতর হচ্ছে আগ্রসী ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাঁচানো। মুসলিম দেশে ধ্বংসের শুরুটি তাই বিদেশী শত্রুর ক্যান্টনমেন্টে হয়নি, সেটি হয়েছে নিজদেশের শিক্ষাঙ্গণ সেক্যুলারিস্টদের হাতে অধিকৃত হওয়াতে।

 

মহান আল্লাহতায়ালার উপর বলিষ্ঠ ঈমানে জ্ঞানচর্চায় এবং সে সাথে সামরিক শক্তিতে যে কীরূপ দ্রুত বিপ্লব সৃষ্টি হয় -তারই প্রমাণ হলো প্রাথমিক যুগে মুসলিমগণ। সে যুগান্তকারী বিপ্লব সৃষ্টিতে ঈমান মূলতঃ ইঞ্জিনের কাজ করে। সেক্যুলারিস্টদের মূল অপরাধটি হলো, ইসলামের সে ইঞ্জিনকেই তারা নির্জীব করে। তারা সেটি করে মুসলিম জীবন থেকে ইসলামকে সরিয়ে। পবিত্র কোরআনের পূর্বে আরবী ভাষায় কোন কিতাব ছিল না। জ্ঞানদান ও জ্ঞানার্জনে ক্ষেত্রে তাদের জীবনে বিশাল বিপ্লবটি এসেছিল ইসলাম কবুলের পর। আরবী ভাষায় অতি দ্রুত সৃষ্টি হয় জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার। বিশ্বের আর কোন ভাষায় জ্ঞানের জগতে এত দ্রুত এতবড় বিশাল ভাণ্ডার আর কোন কালেই গড়ে উঠেনি। শয্যাশায়ী মরণাপন্ন ব্যক্তির পানাহারে রুচি থাকে না, তেমনি রুগ্ন ঈমানের মানুষেরও আগ্রহ থাকে না জ্ঞানার্জনে। জাহিলিয়াতের যুগে আরবদের জ্ঞানশূণ্যতার মূল কারণটি হলো তাদের ঈমানশূণ্যতা। জ্ঞানের জগতে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জুড়ে আজ যেরূপ অজ্ঞতার জোয়ার, সেটির কারণও ভিন্ন নয়। সেটি মুসলিম মানসে গোত্রবাদ, আঞ্চলিকতাবাদ, জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ, পুঁজিবাদ, স্বৈরাচার ও সেক্যুলারিজমে ন্যায় নানারূপ নব্য জাহিলিয়াত। এ জাহিলিয়াত  বিলুপ্ত করেছে আধুনিক মুসলিমদের মাঝে পবিত্র কোরআন থেকে জ্ঞানচর্চায় আগ্রহ। মুসলিমগণ কীরূপে উপনিত হলো আজকের এ ভয়ানক অবস্থানে –সেটি বুঝতে হলে তাই জরুরী হলো নব্য জাহিলিয়াতের নাশকতাগুলি বুঝা। শয়তান আজ আর পুতুল পূজার ন্যায় পুরাতন জাহিলিয়াতের দিকে ডাকে না। স্ট্রাটিজীতে সে আধুনিকীকরণ এনেছে। ফলে ডাকে নানারূপ নব্য জাহিলিয়াতে দীক্ষা নিতে। এক্ষেত্রে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে শয়তানের বিজয়টি অতি বিশাল। বস্তুতঃ ইসলামের পরাজয়ই সে বিজয়কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

 

ইসলাম ও কোরআনের জ্ঞানকে পরিহার করে মুসলিমগণ কোথাও শক্তি ও ইজ্জত পেয়েছে তার প্রমাণ নেই। সেটি তো পরাজয় ও অপমানের পথ। তাদের দোয়া কবুল করা দূরে থাক, খোদ মহান আল্লাহতায়ালাই এমন বিদ্রোহীদের উপর লানত তথা অভিসম্পাত পাঠান। পবিত্র কোরআনে সে হুশিয়ারি বার বার এসেছে। শরিয়ত, হুদুদ, কিসাস, খেলাফত, একতা ও জিহাদের পথ পরিহার করে মুসলিমগণ আজ প্রমাণ করেছে তারা কতটা বিদ্রোহী মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে। ফলে আজ যে দুরাবস্থাটি মুসলিমদের ঘিরে ধরেছে সেটি তাদের নিজেদের কামাই। দিন দিন সেটি আরো তীব্রতর ও বেদনাদায়ক হচ্ছে। গণহত্যা, নগর ধ্বংস, দেশ থেকে বিতাড়নের যে ভয়ানক নাশকতা ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানে ঘটেছে এবং এখনো ঘটছে তা ঔপনিবেশিক শাসনামলের দুই শত বছরেও হয়নি। একমাত্র মোসল শহরে যত ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, হালাকু-চেঙ্গিজের হামলায় তার সিকি ভাগও ধ্বংস হয়নি। সমগ্র মুসলিম ভূমি পরিণত হয়েছে শত্রুশক্তির যথেচ্ছা জবর-দখল, হত্যা, ধর্ষণ ও ধ্বংসের অবাধ চারণভূমিতে। মুসলিমগণ হারিয়েছে জান-মাল ও ইজ্জত-আবরু নিয়ে বাঁচার নিরাপত্তা। বিদেশী কাফের শত্রুদের নাশকতার পাশাপাশি নাশকতায় নেমেছে স্বৈরাচারি দেশী শত্রুগণ। তাই মুসলিমগণ লাশ হচ্ছে শুধু কাফের অধিকৃত মায়ানমার, কাশ্মীর ও ফিলিস্তিনে নয়, বরং সিরিয়া, মিশর, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশেও।  বনজঙ্গলে কেউ নিহত বা ধর্ষিতা হলে বিচার বসে না। তেমনি এক ভয়ংকর অবস্থা এখন মুসলিম বিশ্বের বহু দেশে। ভারত, অধিকৃত কাশ্মীর ও আরাকান পরিণত হয়েছে হত্যা ও ধর্ষণের অভয় অরণ্যে। কোথাও কোন বিচার নাই, কারো কোন শাস্তিও নাই। গরু-ছাগলের সামনে কেউ খুন হলে বা ধর্ষিতা হলে প্রতিবাদ উঠে না। পশুর সামর্থ্য শুধু পানাহারে। পানাহারে ভাগ নিয়ে তাদের মাঝে গুতাগুতি থাকলেও নিছক জৈবিক স্তর থেকে উপরে উঠার ভাবনা পশুর থাকে না। অনুরূপ নিরবতা, প্রতিরোধহীনতা ও ভাবনাহীনতা এখন বিশ্বের ১৬০ কোটি মুসলিমের মাঝে।

 

মানব পশুতে পরিণত হয় যেরূপে

মানবের মাঝে পশুবৎ ইতর অবস্থাটি সৃষ্টি হয় জ্ঞান ও দর্শনের অভাবে। ভারত মহাসাগরের নিকোবর দ্বীপ বা প্রশান্ত মহাসাগরের পাপুয়া নিউিগিনিতে যে মানব সন্তানেরা বন্যপশুদের সাথে বনে-জঙ্গলে, ঝুপড়িতে, গুহায় বা গাছের ডালে উলঙ্গ ভাবে বসবাস করে এবং পশুদের ন্যায় পানাহার ও যৌনজীবন যাপন করে -তাদের কেউই পশু রূপে জন্মায়নি। জন্ম হয়েছিল মানব শিশু রূপেই। তাদের মস্তিস্ক, হৃৎপিন্ড, হাত-পা, ফুসফুস বা দেহের অন্য কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই আধুনিক মানুষ থেকে ভিন্নতর নয়। কিন্তু মানব রূপে তাদের বেড়ে উঠাটি প্রাচীন প্রস্তর যুগের স্তরেই থেমে আছে, বিগত বহু শত বছরেও তা সামনে এগুয়নি। এ বিশাল ব্যর্থতাটির কারণ শারীরিক পঙ্গুত্ব বা অসুস্থ্যতা নয়, বরং সেটি হলো অশিক্ষা তথা জ্ঞানের অপুষ্টি। অশিক্ষাজনীত সে অপুষ্টির কারণে এ জীবনে কেন বাঁচবো এবং কীরূপে বাঁচবো সে দর্শন তারা পায়নি। অথচ হযরত আদম (সাঃ)কে সৃষ্টি করা হয়েছিল শুধু একখানি সুন্দর দেহ দিয়ে নয়, বরং জ্ঞানের অতুলনীয় বিশাল ভান্ডার দিয়েও। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া জ্ঞানের বরকতেই তিনি তাঁর সে সব প্রশ্নের জবাব দিতে সমর্থ হয়েছিলেন যা ফেরশাতগণও দিতে পারেননি। জ্ঞানের সে শ্রেষ্ঠতার কারণেই ফেরশতাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল হযরত আদম (আঃ)এর সেজদায়।

 

দেহের ন্যায় মানবের রুহও লাগাতর পুষ্টি চায়। সকল সৃষ্টির মাঝে মানুষের শ্রেষ্ঠতর মর্যাদাটি দেহের কারণে নয়, সেটি জ্ঞান-সমৃদ্ধ রূহের কারণে। জ্ঞান বিলুপ্ত হলে সে ইজ্জত থাকে না, মানবও তখন নিরেট পশুর স্তরে পৌঁছায়। নিজেদের ব্যর্থতা দিয়ে সে শিক্ষাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় নিকোবর ও পাপুয়া নিউগিনির মানুষ। তাদের সে করুণ ব্যর্থতাটি তুলে ধরে শিক্ষার গুরুত্বও। তাই মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব সৃষ্টির জন্য শুধু দেহের খাদ্যের ব্যবস্থাই করেননি, রুহের খাদ্যও জুগিয়েছেন। জীবনের লক্ষ্য পূরণে মানব শিশুকে তাই উভয় খাদ্যকেই গ্রহণ করতে হয়। ওহীর জ্ঞান হলো সেই রুহের খাদ্য। এবং পবিত্র কোরআন হলো সে খাদ্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার -যা সকল মানবের রুহের ক্ষুধা মেটাবে ক্বিয়ামত অবধি। সে জ্ঞানের অনাপুষ্টিতে মানুষ যে কতটা পশু হতে পারে আজ তারই জীবন্ত নজির হলো নিকোবর ও পাপুয়া নিউগিনির বন্য মানুষ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের সে ব্যর্থতা ক’জনকে ভাবতে শেখায়? এবং ক’জনকে তাদের কল্যাণে কিছু করতে শেখায়? ভারত সরকারের নীতি এক্ষেত্রে অতি অমানবিক। পর্যটকদের সামনে তাদেরকে পেশ করা হচ্ছে এক দর্শনীয় পশুরূপে। এবং ট্যুরিজম বাড়াতে ভারত সরকার তাদের বন্য জীবনের সংরক্ষণে নেমেছে। ফলে তাদেরকে মানবিক স্তরে ফিরিয়ে আনা সরকারের এজেন্ডা নয়, বরং সেটি হলো তাদের দেখিয়ে রাজস্ব ভাণ্ডারে অর্থবৃদ্ধি।

 

ওহীর জ্ঞান থেকে সংযোগহীন জীবন যাপনে কীরূপ পশু-সুলভ বর্বরতা নেমে আসে, নিকোবর ও পাপুয়া নিউগিনির বন্য মানুষগণ মূলতঃ তারই প্রমাণ। তবে এরূপ জ্ঞানশূণ্যতার শিকার একমাত্র তারা নয়। সে বিপদ ঘিরে ধরেছে শত শত কোটি আধুনিক মানুষকেও। এমন কি খোদ মুসলিম দেশের কোটি কোটি মানুষকেও। ওহীর জ্ঞানের সাথে  সংযোগহীনতার কারণে তারাও প্রচণ্ড ভাবে মানবতাহীন ও ঈমানহীন হয়েছে। এদের কারণেই দেশে দেশে আজ জাহান্নামের পথে বিশাল বিশাল মিছিল। সে মিছিলে মূল সুরটি মহান আল্লাহতায়ার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের। যে দেশে প্রাচুর্য্য স্রেফ দেহের খাদ্যে এবং প্রকট দুর্ভিক্ষ বিরাজ করে রূহের খাদ্যে, সে দেশে ঈমান বাঁচানো যে কতটা অসম্ভব -এ হলো তারই নজির। ওহীর জ্ঞানশূণ্য দেশে হিজরত এ জন্যই ইসলামে হারাম। সে নিষিদ্ধ পথে  গিয়ে নিকোবর ও পাপুয়া নিউগিনির মানুষদের পূর্ব-পুরুষগণ শুধু নিজেদের উপরই বিপদ ডেকে আনেনি, পশুর স্তরে পৌঁছে দিয়েছে তাদের সন্তানদের।

 

সংকট দর্শনে

স্রেফ বাঁচা বা ভোগের তাড়না নিয়ে বাঁচা মানুষকে শ্রেষ্ঠতর জীবে পরিণত করে না। সে মহান লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে বাঁচতে হয় উচ্চতর দর্শন নিয়ে। তাই একজন ব্যক্তি কতটা মানবিক ও ঈমানদার সেটি তার নামায-রোযা ও হজ-যাকাতে ধরা পড়ে না। এরূপ ইবাদত এমন কি বহু ঘুষখোর, সূদখোর ও মিথ্যাবাদীদের জীবনেও দেখা যায়। সেটি ধরা পড়ে জীবন ও জগত নিয়ে তার দর্শনে ও বাঁচার মিশনে। প্রশ্ন হলো, দর্শন বলতে আমরা কি বুঝি? এটি হলো ব্যক্তির চেতনা লোকের সামর্থ্যের বিষয়। কোন একটি বিষয়কে মনের আলোতে দেখা, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা এবং তা থেকে শিক্ষা নেয়ার সামর্থ্যই হলো দর্শন। যার ভাল দৃষ্টিশক্তি আছে এমনকি সে ব্যক্তিও গভীর অন্ধকারে কিছু দেখতে পারে না। তাই অন্ধকারে কিছু দেখতে আলো জ্বালাতে হয়। এরচেয়েও অধীক গুরুত্বপূর্ণ হলো মনের আলো। মনের আলোতেই মানুষ দেখতে পায় জান্নাতের পথ। এবং বাঁচে জাহান্নামের পথ থেকে। কোনটি সত্য এবং কোনটি মিথ্যা, কোনটি ন্যায় এবং কোনটি অন্যায় –দিনের আলো সে বিচারের সামর্থ্য দেয় না। সে জন্য চাই মনের আলো। যারা সুদ খায়, ঘুষ খায়, ব্যাভিচারে নামে, জালেমের পক্ষে লাঠি ধরে বা সন্ত্রাসে নামে -তারা কি অন্ধ? তাদের অন্ধত্বটি চোখের নয়; সেটি তো মনের। অভার এখানে দর্শনের। দর্শন দেয় মনের আলো। মু’মিনের মনে সে দর্শনটি আসে মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত ওহীর জ্ঞান থেকে।

 

পবিত্র কোরআনে মনের আলো দানকারী ওহীর জ্ঞান চিত্রিত হয়েছে নূর রূপে। সে নূর মু’মিনকে দেয় দেখার ও ভাববার সামর্থ্য। এজন্যই একজন ঈমানদার ও কাফের একই ভূমি, একই জলবায়ু ও একই রূপ ভাত-মাছে বেড়ে উঠলেও জীবন ও জগতকে নিয়ে তারা একই রূপ ভাবে না। একই ভাবে দেখেও না। বাইরের ভূবনকে তারা দেখে ও তা নিয়ে ভাবে নিজ নিজ দর্শনের আলোকে। সে নূরের অভাবে কাফেরের মন এজন্যই অন্ধ। ফলে এ বিশাল ভূবনের কোটি কোটি সৃষ্টির মাঝে কাফেরগণ কোথাও মহান আল্লাহতায়ালার কুদরত ও আলামত দেখতে পায় না। অথচ ঈমানদার ব্যক্তি স্রষ্টার আলামত  দেখতে পায় প্রতিটি সৃষ্টির মাঝে। কোরআনী জ্ঞানের সে নূর না থাকার কারণে এমন কি মুসলিম রূপে পরিচয়দানকারি ব্যক্তির জীবনেও কাফেরদের জীবন-দর্শন, রাজনীতি, বিচার-আচার ও সংস্কৃতির থেকে পৃথক কোন ভিন্ন ধারা সৃষ্টি হয়না। শরিয়ত, কেসাস, হুদুদ, খেলাফত ও জিহাদ নিয়ে দুর্বৃত্ত কাফেরগণ যেভাবে কথা বলে, সে অভিন্ন সুরে কথা বলে ইসলামি চেতনাশূণ্য মুসলিম নামধারি ব্যক্তিগণও। তাই কোন দেশের জনগণের রাজনৈতিক মানচিত্রে ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে পরিবর্তন আনতে হলে প্রথমে পরিচয় আনতে হয় তাদের মনের ভূবনে। তাছাড়া মানুষের মনকে আলোকিত না করে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকেই বা কীরূপে আলোকিত করা সম্ভব? মনের ভূবনকে আলোকিত করার মূল হাতিয়ার হলো শিক্ষা।  ব্যক্তি ও জাতির জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব এজন্যই অতি  চুড়ান্ত। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ইসলামের শত্রুপক্ষের অধীনে রেখে ইসলামের বিজয় এজন্যই অসম্ভব। কারণ, যাদের নিজেদের মনেই গভীর অন্ধকার, তারা আর কি আলো ছড়াবে? মুসলিম বিশ্বের অসংখ্য স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এজন্যই ব্যর্থ হচ্ছে জাহিলিয়াতের অন্ধকার সরাতে। এবং ব্যর্থ হচ্ছে পতন রুখতে। ১৫/০৪/২০১৮



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Sunday, 15 April 2018 09:56
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2018 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.