Home •শিক্ষা ও প্রচার মাধ্যম অশিক্ষা ও কুশিক্ষার নাশকতা (ষষ্ঠ পর্ব)

Article comments

অশিক্ষা ও কুশিক্ষার নাশকতা (ষষ্ঠ পর্ব) PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Monday, 30 April 2018 00:32

অজ্ঞতা ইসলামের এজেন্ডা ও অবদান নিয়ে

শিক্ষাঙ্গণে মুসলিমদের ব্যর্থতা স্রেফ বিজ্ঞানের জ্ঞানে নয়, প্রচণ্ড ব্যর্থতা ইসলামের মূল এজেন্ডা ও মানব কল্যাণে মুসলিমদের শ্রেষ্ঠ অবদানগুলি জানাতেও। এ অজ্ঞতার জন্ম মুর্খদের বস্তিতে নয়, বরং মুসলিম দেশগুলির স্কুল, কলেজ, ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে। বিস্ময়ের বিষয়, মুসলিম বিশ্ব জুড়ে কয়েক লক্ষ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় সত্ত্বেও সে অজ্ঞতা দূর না হয়ে বরং দিন দিন গভীরতর হচ্ছে। এরই ফলে নবীজী (সাঃ)র যুগের ইসলাম অপরিচিত শুধু অমুসলিমদের কাছে নয়, অপরিচিত রয়ে গেছে খোদ মুসলিমদের কাছেও। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি ব্যবহৃত হচ্ছে ইসলাম ও মুসলিম প্রসঙ্গে অকথ্য মিথ্যার প্রচার ও পরিচর্যা দেয়ার কাজে। মিথ্যার জোয়ারে ইসলামের মূল শিক্ষাগুলো এতটাই বিলুপ্ত হয়েছে যে, নবীজী (সাঃ)র আমলের পূর্ণাঙ্গ ইসলাম ৫৭টি মুসলিম দেশের কোথাও বেঁচে নাই। মুসলিমগণ বেঁচে আছে এক বিকৃত ও অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম নিয়ে যাতে শরিয়ত, হুদুদ, কেসাস, খেলাফত, মুসলমি ঐক্য ও শুরার ন্যায় মহান আল্লাহতায়ালা কর্তৃক  ফরজকৃত বিধানের কোন স্থান নেই। মিথ্যার স্রোতে ভাসার কারণে এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও  ডিগ্রিধারীগণও ভূল করে ইসলামের মূল এজেন্ডা ও মানব জাতির কল্যাণে মুসলিমদের শ্রেষ্ঠ অবদানগুলো বুঝতে। তাদের কাছে ইসলামের শ্রেষ্ঠ অবদান গণ্য হয় মুসলিম স্থাপত্য, অংক শাস্ত্র, ভূগোল শাস্ত্র, এ্যালজ্যাবরা, জ্যামিতিক শাস্ত্র, রসায়ন বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান, সিভিল ইঞ্জিনীয়ারিং, ও জ্যোতিষ শাস্ত্রের ন্যায় নানা শাখায় অবদান। শ্রেষ্ঠ কর্ম গণ্য হয়, তাজমহল, আলহামরার ন্যায় অসংখ্য প্রাসাদ, দুর্গ ও মসজিদগুলি। অথচ মুসলিমদের মূল অবদানের কাছে এ অবদানগুলি অতি তুচ্ছ মাত্র।

 

 

তারা বুঝতে ভূল করে, ইসলামের আগমন বিজ্ঞান শেখাতে নয়। বড় বড় প্রাসাদ, দুর্গ বা নগর গড়তেও নয়। ইসলামের মূল মিশনটি মূলতঃ একমাত্র উপাস্য মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর নাযিলকৃত সত্যদ্বীন ইসলামকে চেনানো। লক্ষ্য, মানুষকে তার স্রষ্টার পক্ষ থেকে নির্দ্দিষ্ট দায়িত্ব নিয়ে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। লক্ষ্য, জাহান্নামের পথ থেকে মুক্তি দিয়ে মানব সন্তানদের জান্নাতে পৌঁছানো। প্রশ্ন হলো, মানব-কল্যাণে অন্য কোন বিশাল কর্ম, অর্থদান বা আবিস্কার কি এর চেয়ে কল্যাণকর হতে পারে? বস্তুতঃ সে কল্যাণ-কর্মটিই ছিল নবী-রাসূলদের মিশন। মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর নবী-রাসূলদের উপর বিশ্বাস রাখার অর্থঃ এ মিশনকে আমৃত্যু ধারণ করে বাঁচা। যারা প্রকৃত মুসলিম তারা এক্ষেত্রে অনন্য। অন্যরা যেখানে ধর্ম, দর্শন, মতবাদ, রাজনীতি, যুদ্ধবিগ্রহ, খেলাধুলা, বিনোদন ও সংস্কৃতির নামে নরনারীদের জাহান্নামের দিকে টানে, মুসলিমগণ সেখানে পথ দেখায় জান্নাতের।

মূল হাতিয়ারটি শিক্ষানীতি

মানবের কল্যাণে ইসলামের মূল হাতিয়ারটি হলো তার শিক্ষা নীতি। এবং সে শিক্ষানীতিতে ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষাগুলি অতি সুস্পষ্ট। পবিত্র কোরআনের পাতায় বা মহান নবীজী (সাঃ)র জীবনের দিকে সামান্য নজর দিলেই সেটি সহজেই চোখে পড়ে। নবীজী (সাঃ)র জীবন হলো পবিত্র কোরআনের জীবন্ত তফসির। তাই যারা কোরআনকে বুঝতে চায়, সে বুঝার কাজে শিক্ষা নিতে হয় নবীজী (সাঃ)র জীবন থেকে। নবীজী (সাঃ)র জীবনে শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও যিকর ছিল না, ছিল শরিয়ত, হুদুদ, কেসাস, জিহাদ, শুরা ও মুসলিমদের মাঝে একতার প্রতিষ্ঠা। ছিল মুসলিমদের একটি শক্তিশালী রাজনৈতীক ও সামরিক শক্তি রূপে বিশ্বের অঙ্গণে প্রতিষ্ঠা দেয়ার আমৃত্যু জিহাদ। একারণেই তিনি শুধু রাসূল ছিলেন না, ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান। ছিলেন সেনাকমান্ডার। তিনি যেমন যুদ্ধের পরিকল্পনা করতেন, তেমনি সেনা-প্রধানদের নিয়োগ দিতেন। তিনি যেমন অন্য রাষ্ট্রে দূত পাঠাতেন, তেমনি অন্যদের সাথে চুক্তিও করতেন। মুসলিম হওয়ার অর্থ তো নবীজী (সাঃ)র এ সূন্নত নিয়ে বাঁচা। যাদের জীবনে নবী-জীবনের সে সূন্নত নাই, বুঝতে হবে তারা যেমন নবীজী (সাঃ)কে বুঝেনি, তেমনি বুঝেনি পবিত্র কোরআনকেও। অথচ হতে পারে জীবনে তারা বহুবার সমগ্র কোরআন তেলাওয়াত করেছেন, হয়তো পবিত্র কোরআনে হাফেজও হতে পারেন। হয়তো আলেম, মোহাদ্দেস, মোফাচ্ছের, মসজিদের ইমাম, সুফি, পীর-মাশায়েখ রূপে সমাজে তাদের প্রতিষ্ঠাও থাকতে পারে। বাংলাদেশের ন্যায় দেশগুলিতে এমন ব্যক্তিদের সংখ্যা লক্ষ লক্ষ। কিন্তু এ মুসলিম দেশগুলিতে  শরিয়ত, হুদুদ, কেসাস, খেলাফত, মুসলিম ঐক্য ও জিহাদের ন্যায় অবশ্য পালনীয় বিধানগুলি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার বিষয়টি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, পবিত্র কোরআন ও নবীজী (সাঃ)র সূন্নত বুঝার ক্ষেত্রে কতটা শূণ্যতা রয়ে গেছে। যা বেঁচে আছে তা হলো ধর্মের নামে বিশাল বিশাল ব্যবসা। ইসালামের সেক্যুলারিস্ট শত্রুগণ যেমন ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, গোত্র,অঞ্চলের নামে বিভক্তির দেয়াল গড়েছে, এরাও তেমনি নিজেদের ধর্ম-ব্যবসা বাঁচাতে দেয়াল গড়েছে নানা প্রকার দল, মাজহাব, ফেরকা ও সুফি তরিকার নামে। মুসলিমদের মাঝে ঐক্য গড়া যে ফরজ এবং সে একতা গড়তে হলে যে বিভক্তির দেয়াল ভাঙ্গতে হয় -সে সামান্য বোধটুকুও তাদের মধ্যে নাই। বরং তাদের অনেকে ইসলামের পরিচিত শত্রুদের সাথে সুর মিলিয়ে নবীজী (সাঃ)র যুগের শরিয়ত, হুদুদ, কেসাস, খেলাফত ও একতা প্রতিষ্ঠার জিহাদকে সন্ত্রাস বা মৌলবাদ বলছে। ইসলামের প্রতিষ্ঠা রুখতে তাদের অনেকে হাত মিলিয়েছে স্বৈরাচারি শাসকদের সাথে। এসবই হচ্ছে পবিত্র কোরআনের জ্ঞানদান ও জ্ঞানার্জনে ভয়ানক ব্যর্থতার কারণে। সে ব্যর্থতা শুধু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, ধর্মীয় মাদ্রসাগুলোতেও। মুসলিম দেশগুলি যখন দেশী বা বিদেশী সেক্যুলারিস্ট শক্তির হাতে অধিকৃত হয়, শিক্ষানীতিতে সেক্যুলার এজেন্ডা তখন শুধু স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত থাকে না, প্রতিষ্ঠা পায় মসজিদ-মাদ্রসাতেও। তখন ধর্মের নামে বাড়ে ধর্ম ব্যবসা। শিক্ষার নামে তখন ভয়ানক অপরাধ ঘটে পবিত্র কোরআন ও নবীজী(সাঃ)র আদর্শের বিরুদ্ধে। ছাত্রদের দৃষ্টি থেকে তখন লুকানো হয় পবিত্র কোরআনের শিক্ষা ও নবীজী(সাঃ)র আদর্শ। উদ্দেশ্য, ইসলামকে শুধু রাষ্ট্রে নয়, ব্যক্তির জীবনেও পরাজিত রাখা। ইসলামবৈরী শিক্ষানীতির কারণে মুসলিম দেশগুলিতে যতই বাড়ছে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রসার সংখ্যা, ততই বাড়ছে নবীজী (সাঃ)র যুগের ইসলামের সাথে শত্রুতা। ইসলামের পরাজয়টি তাই শুধু প্রশাসন, রাজনীতি, সংস্কৃতি, আইন-আদালত ও সংসদের অঙ্গণে সীমিত নয়, ছেয়ে গেছে মসজিদ-মাদ্রাসা, পীরের হালকা ও ইসলামী দলগুলোর দফতরেও।

যে রূপে অনিবার্য হয় নৈতীক বিপ্লব

পবিত্র কোরআনে যে বিষয়টির উপর বার বার গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা হলো, জাহান্নামের আগুণ থেকে মু’মিনের নিজের বাঁচাটি নির্ভর করে ইসলামের বিজয়ে তার নিজের জানমালের বিনিয়োগের উপর। আগুণের শিখা বা উত্তাপের মাঝেই যেমন আগুণের প্রমাণ, তেমনি ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে অংশ নেয়ার মধ্যেই ঈমানের প্রকাশ। ঈমানদার ব্যক্তি তো এভাবেই মহান আল্লাহতায়ালার সত্য-বাণীর পক্ষে সাক্ষী হয়ে খাড়া হয়। তাছাড়া স্বৈরাচারি জালেমের নির্মূলের কাজটি কি দোয়া-দরুদে সম্ভব? সে সম্ভব হলে নবীজী (সাঃ)র ৭০% ভাগ সাহাবা কেন শহীদ হলেন? ইবাদতের নামে হাত-পা গুটিয়ে মসজিদে বা নিজ ঘরে স্রেফ জায়নামাজে বসে থাকাটি এজন্যই ঈমানদারী নয়। নবীজী (সাঃ)র  যুগে সে নীতি ছিল কপট নামাযীদের –যারা চিত্রিত হয়েছে মুনাফিক রূপে।

প্রশ্ন হলো, ইসলামের এ মৌল বিষয়টুকু জানার জন্য কি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসার ডিগ্রি নেয়ার প্রয়োজন পড়ে? মুসলিম উম্মাহর মাঝে যখন কোন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসা ছিল না তখনও মুসলিমগণ সেটি বুঝতো। সে মৌলিক জ্ঞান ভেড়ার নিরক্ষর রাখালের মাঝেও ছিল। কারণ, ইসলামের গৌরব কালে এ মৌলিক জ্ঞানের বিতরন হতো যেমন মসজিদের মেঝেতে, তেমনি গাছের তলায়, রাস্তাঘাটে, হাটেবাজারে, বিয়ের মজলিসে ও খাওয়ার টেবিলে। জ্ঞানের সে মজলিসে খোলা চোখ, খোলা কান ও খোলা মন নিয়ে হাজির হতো সর্বস্তরের ও সর্বপেশার মানুষ। শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং নবীজী (সাঃ)। এবং তাতে কোন টিউশন ফি ছিল না। অথচ সে জ্ঞানের জলসাগুলিই ছিল মানব ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্লাসরুম। সে ক্লাস রুম থেকে সৃষ্টি হয়েছে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ। কিন্তু আজ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ক্লাসরুম ব্যবহৃত হচ্ছে ওহীর জ্ঞানের সত্যকে আড়াল করার কাজে। ফলে ঈমানী দায়বদ্ধতার কথা বুঝতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ যেমন ব্যর্থ হচ্ছে, তেমনি ব্যর্থ হচ্ছে মাদ্রাসার ছাত্রগণ। ফলে জনবল পাচ্ছে না জিহাদের ময়দান। ফলে শরিয়ত, হুদুদ, কেসাস, শুরা ও জিহাদের আয়াতগুলো স্রেফ কোরআনেই রয়ে গেছে। জিহাদের ময়দানে পা না রেখে জান্নাতের দরজায় পৌছা যে অসম্ভব –পবিত্র কোরআনের সে হুশিয়ারিগুলি নিয়েও কোন ভ্রুক্ষেপ নাই।

মুসলিমগণ আজ এ পরাজিত অবস্থায় একদিনে পৌঁছেনি। পৌঁছেছে এক সুদূর প্রসারি শয়তানী পরিকল্পনার অংশ রূপে। ইসলামের বিপক্ষ শক্তির অধিকৃতিকে স্থায়ী করতে বহু পূর্ব থেকেই ইসলামের মৌল জ্ঞানকে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোর সিলেবাস থেকে পরিকল্পিত ভাবে দূরে সরানো হয়েছে। প্রহসনের চুড়ান্ত রূপটি হলো, ইসলামের বিরুদ্ধে এরূপ যুদ্ধাংদেহী নীতিকে চিত্রিত করা হয় সেক্যুলারিজম বলে। ধর্মবিরোধী এ নীতিকে বাংলাদেশে বাজারজাত করা হয়ে থাকে ধর্মনিরপেক্ষতা বলে। ফলে অশিক্ষা ও অজ্ঞতা গভীরতর হয়েছে এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের মাঝে। কোরআন-মুক্ত এ শিক্ষা ব্যবস্থা যেমন মুসলিম দেশগুলিতে দুর্নীতির জোয়ার এনেছে, তেমনি আনন্দ বাড়িয়েছে শয়তানের। ফলে আজ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলির কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের মধ্য থেকে শয়তানী শক্তিবর্গ যেরূপ লক্ষ লক্ষ সেপাহী পাচ্ছে নবীজী (সাঃ)র যুগে পৌত্তলিকদের মধ্য থেকেও তা পায়নি। ফলে ইসলামের প্রতিষ্ঠা রুখতে ময়দানে পৌত্তলিক কাফেরদের নামাতে হচ্ছে না। কোরআন-মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার এ হলো ভয়াবহ নাশকতা। অথচ বাংলাদেশে সে আত্মঘাতি শিক্ষানীতি বেঁচে আছে কোটি কোটি নামাযী, রোযাদার ও হাজীদের রাজস্বের অর্থে! জনগণ এভাবে নিজ খরচে শয়তানের সেপাহি হিসাবে বেড়ে উঠছে।

জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচার প্রবল আগ্রহই ব্যক্তিকে অন্যায়, অসত্য ও জুলুমের নির্মূলে আপোষহীন করে। তখন ব্যক্তির মাঝে নৈতীক বিপ্লব শুরু হয়। জান্নাত পাওয়ার সে তীব্র স্বার্থচেতনা ব্যক্তিকে স্বার্থহীন করে এ পার্থিব জীবনে। কারণ, জান্নাতের যোগ্য হতে হলে অপরিহার্য হলো অন্যায়, অসত্য, মিথ্যাচার, দুর্বৃত্তি, সন্ত্রাস, স্বৈরাচার ও জুলুমবাজি থেকে মুক্ত হওয়াটি। মাথা টানলে মাথার সাথে নাক, কান এবং চোখও আসে, তেমনি জান্নাতমুখী চেতনা নিয়ে বাঁচলে অনাবিল শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও উন্নতি আসে দুনিয়াবী জীবনে। জান্নাতের জন্য প্রস্তুত করার প্রচণ্ড তাড়নাতেই প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ জন্ম দিয়েছিলেন সমগ্র মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার। এটি ছিল জান্নাতের পথে চলার বিশাল বোনাস।

মু’মিনের জীবনে ঘটায় ক্ষমতায়ন

ব্যক্তির জীবনে নেক কর্ম ও নেক নীতির জোয়ার আনতে হলে কোরআনী জ্ঞানে জ্ঞানবান হওয়ার বিকল্প নেই। মানব জীবনে ক্ষমতায়নের এটিই হলো একমাত্র পথ। জ্ঞানহীনতা মানুষকে শুধু দাসই বানায় না, পশুর স্তরেও পৌঁছে দেয়। সাহস কেড়ে নেয় প্রতিবাদের। পশু যেমন স্রেফ পানাহার ও যৌন জীবন নিয়ে বাঁচে, তেমনি অবস্থা হয় ওহীর জ্ঞানে জ্ঞানশূণ্য মানুষদের। তাই শত্রুদের এজেন্ডা শুধু অর্থনৈতীক শোষন নয়, জ্ঞানশূণ্য রাখাও। ঔপনিবেশিক ব্রিটশগণ তাই অধিকৃত বাংলাদেশে ৪০ হাজারের বেশী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করেছিল। সেটি করেছিল মুসলিম শাসকদের পক্ষ থেকে বরাদ্দকৃত খাজনামুক্ত জমি কেড়ে নিয়ে। ব্রিটিশের শিক্ষাবিরোধী নীতির  কারণেই তাদের ১৯০ বছেরর ঔপনিবেশিক শাসনে শিক্ষার হার ১০% ভাগেও উঠেনি।

কোরআনী জ্ঞান মানব জীবনে যে কতটা বিশাল ক্ষমতায়ন ঘটায় তারই উদাহরণ হলো নবীজী (সাঃ)র যুগের মুসলিমগণ। যারা ভেড়া চড়াতো তারা পরিণত হয়েছিল দ্বিগবিজয়ী জেনারেল, গভর্নর ও বিচারকে।  বাংলাদেশের চেয়ে ১০০গুণ বৃহৎ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে একজন সাধারণ প্রজাও প্রশ্ন করার সাহস রাখতো, আপনার গায়ে ডবল সাইজের পিরহান কিভাবে এলো? হযরত ওমর (রাঃ)এর ন্যায় খলিফাকে সে প্রশ্নের জবাব দিয়ে তাকে জুম্মার খুতবা শুরু করতে হয়েছিল। বলিষ্ঠ সে আত্মবিশ্বাসের কারণে প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ বহু অজানা দেশে ছুটেছেন এবং কোটি কোটি মানুষকে মুক্তি দিয়েছেন জাহান্নামে পথ থেকে। সেরূপ আত্মবিশ্বাসী ১৭জন তুর্কী সৈনিকের ভয়ে বাংলার শাসক লক্ষণ সেন পিছন দরজা দিয়ে পালিয়েছিল। অথচ আজ ওহীর জ্ঞানের শূণ্যতা কেড়ে নিয়েছে মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস। শত্রুর ভয়ে তার মুখে শরিয়ত, হুদুদ, কেসাস, জিহাদের কথা মুখে আনতেও ভয় পায়। ভয় পায় মিছিলে আল্লাহু আকবর ধ্বনি তুলতেও।

প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ নিজেরা যেমন জাহান্নামের আগুণ থেকে বেঁচেছেন, তেমনি বাঁচিয়েছেন বহুদেশের কোটি কোটি মানুষকে। মানব কল্যাণে এটিই হলো মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান। এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তারা মর্যাদা পেয়েছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের। সমগ্র ইতিহাসে মানবের জন্য এত বড় কল্যাণের কাজ আর কোন জাতিই করেনি। কল্যাণের সে সামর্থ্যটি তারা পেয়েছিলেন কোরআনী জ্ঞান থেকে। সে জ্ঞানই তাদেরকে দিয়েছিল মহা কল্যাণের সামর্থ্য। এরূপ শ্রেষ্ঠ মানবদের নিয়ে মহান রাব্বুল আ’লামিন ফেরশতা কুলেও গর্ব করেন।

ঈমানদারের মিশনটি হলো, সৃষ্টিকুলে মহান আল্লাহতায়ালার গর্বকে বিশ্বময় করা। পবিত্র কোরআনে সে নির্দেশটি এসেছে এভাবে, “ওয়া রাব্বাকা ফা’কাব্বির”–(সুরা মুদাছ্ছির, আয়াত ৩)। অর্থঃ এবং তোমার রবের নামকে প্রবল ভাবে সোচ্চার করো। ঈমানদার ব্যক্তি তাই শুধু জায়নামাজে বসে “আল্লাহু আকবর”য়ের তাসবিহ পাঠ করে না, আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ধ্বনি তোলে রাজনীতি, প্রশাসন, সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহেও। তখন বাঁচা-মরার মূল উদ্দেশ্য হয়, আল্লাহতায়ালা যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তাঁর নির্দেশিত বিধানই যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিধান -সে বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা দেয়ায়। তাই যে রাজনীতিতে “আল্লাহু আকবর” নাই, সে রাজনীতি প্রকৃত ঈমানদারের কাছে হারাম। ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য সেক্যুলার রাজনীতির মূল প্রায়োরিটি “আল্লাহু আকবর”য়ের রাজনীতি নয়, বরং গোত্রীয়, দলীয় বা জাতীয় নেতাদের নাম ও তাদের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা দেয়া।

যেরূপে অনিবার্য হয় রাষ্ট্রীয় বিপ্লব

রাষ্ট্র বিপ্লবের শুরুটি ক্ষেতখামার, কলকারখানা বা অফিস-আদালত থেকে হয় না। সেটি শুরু হয় শিক্ষাঙ্গণ থেকে। তাই মহান আল্লাহতায়ালা বিপ্লবের সে কাজটি শুরু করেছিলেন “ইকরা”  তথা “পড় বা জ্ঞানার্জন করো” -এ হুকুমটি দিয়ে। ঈমানদারের কাছে শিক্ষাদান ও শিক্ষালাভের মূল লক্ষ্যটি নিছক উপার্জনের সামর্থ্য বৃদ্ধি নয়। বরং জান্নাতের যোগ্য রূপে বেড়ে উঠার প্রবল তাড়না সৃষ্টি। মু’মিনের জীবনে তখন শুরু হয় কথা ও কর্মের মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার তাড়াহুড়া। তখন জন্ম নেয় সভ্যতর রাষ্ট্র, উচ্চতর মূল্যবোধ, ন্যায়পরায়ন আদালত, সুশীল সংস্কৃতি ও সভ্যতা। এভাবেই আসে ইহকাল ও পরকাল –এ উভয়কালের মুক্তি। এমন রাষ্ট্র চালাতে বিশাল পুলিশ বাহিনী বা সেনাবাহিনীর প্রয়োজন পড়ে না। জনগণ নিজেরাই তখন বিশ্বস্থ্ পুলিশ ও সৈনিকে পরিণত হয়। মু’মিনের জীবনে যে প্রেরণাটি তখন প্রবল ভাবে কাজ করে তা হলো, নিজ অর্থ, নিজ শ্রম ও নিজ মেধার বিনিয়োগে জান্নাত ক্রয়ের। এমন ঈমানী চেতনার ফলে, কোন দুর্গ বা সেনানিবাস না গড়েও প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ অতি সুশৃঙ্খল সেনা বাহিনী গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। এবং এ পথেই গড়ে উঠেছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। তখন দুর্গে পরিণত হয়েছিল মুসলিমদের প্রতিটি  ঘর ও প্রতিটি জনপদ। শত্রুর মোকাবেলায় সশস্ত্র ও সদাপ্রস্তুত থাকাটি তখন স্রেফ সরকারেরর নয়, প্রতিটি ঈমানদারের এজেন্ডায় পরিণত হয়। মুসলিমদের বিজয় কালে প্রতিটি ঈমানদার এভাবে পরিণত হয়েছিল স্রষ্টার অতি বিশ্বস্থ সৈনিকে। ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও অঞ্চল ভিত্তিক ভিন্নতা তাদের মাঝে বিভক্তির দেয়াল খাড়া করতে পারিনি।

জান্নাতের যোগ্য রূপে বেড়ে উঠার তাড়নাটি না থাকলে ঘটে উল্টোটি। তখন গড়ে উঠে সভ্যতার নামে নিষ্ঠুর বর্বরতাকে বাঁচিয়ে রাখার এক রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক অবকাঠামো। মানব ইতিহাসে সে প্রমাণ প্রচুর। আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা তো তারই নমুনা। এ সভ্যতার গর্ভেই জন্ম নিয়েছে নিষ্ঠুর ঔপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, বর্ণবাদ, বর্ণবাদী নির্মূল, বিশ্বযুদ্ধ ও পারমানবিক যুদ্ধাস্ত্র। তাদের হাতেই নির্মূল হয়েছে স্পেনের মুসলিম, আমেরিকার রেড-ইন্ডিয়ানস, অস্ট্রিলিয়ার অ্যাব অরিজিনস এবং নিউজিল্যান্ডের মাউরি জনগোষ্টি। বিজ্ঞানের অগ্রগতি পাশ্চত্য সভ্যতার নৃশংস নায়কদের নৈতীকতা শেখায়নি, বরং তাদের হাতে তুলে দিয়েছে পারমানবিক অস্ত্র, রাসায়নিক বোমা, ক্লাস্টার বোমা, ব্যারেল বোমা, দূর পাল্লার মিজাইল, সাবমেরিন ও ভয়ানক যুদ্ধবিমান। তাদের নিষ্ঠুর বর্বরতা এতটাই বিশ্বময় বিস্তার পেয়েছে যে, মাত্র দু’টি বিশ্বযুদ্ধে প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষকে তারা হত্যা করেছে। তবে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও নানা দেশে তাদের সামরিক আগ্রাসন ও গণহত্যা থামেনি। বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তিবর্গই নতুন ভাবে সামরিক আগ্রাসনে নেমেছে কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়াতে। তাদের যুদ্ধে ২০ লাখের বেশী মানুষ নিহত হয়েছে আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়াতে। মাটির সাথে মিশে গেছে মোসল, রামাদি, রাক্কা, কুবানি, ফালুজার ন্যায় অসংখ্য শহর। প্রশ্ন হলো, এ নিষ্ঠুর বর্বতাকে সভ্যতা বললে অসভ্যতা কোনটি?

কুশিক্ষার বিষক্রিয়া ও বিলুপ্ত চেতনা

শিক্ষাই একটি জনগোষ্ঠিকে আত্মসচেতন করে। মনের ভূবনে জিন্দা রাখে তার মূল পরিচয়কে। সে যে পশু নয়, বানরের বংশধর নয় এবং স্বয়ং-সৃষ্ট কোন জীবও নয় বরং মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি –সেটি তো পবিত্র কোরআনে দেয়া ঈমানদারের মূল পরিচয়। সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থার বড় বিপদ হলো, সেটি মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া সে পরিচয়কেই ভূলিয়ে দেয়। ভূলিয়ে দেয় অর্পিত দায়িত্বকেও। তখন সে আত্মবিস্মৃত ব্যক্তির জন্য সহজ হয় নতুন পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠা। এমন কি সহজ হয় শয়তানের খলিফা হওয়াটিও। মুসলিমদের বিপদের বড় কারণ, সেক্যুলার শিক্ষার কারণে তারা আজ নিজেদের পরিচয়ই ভূলে গেছে। ফলে গ্রহণ করেছে ভাষা, বর্ণ, দল, ফেরকা, মযহাব বা গোত্রভিত্তিক পরিচয়। সেক্যুলার শিক্ষার এটিই হলো অনিবার্য ফল।

অথচ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর নিজের পক্ষ থেকে মুসলিমদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এভাবে, “তোমরাই হচ্ছো (সমগ্র মানব জাতির মাঝে) সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে সমগ্র মানব জাতির জন্য। এবং তোমরা প্রতিষ্ঠা করো ন্যায়ের এবং নির্মূল করো অন্যায়ের।” –(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১১০।) জাতি হিসাবে সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার মর্যাদাটি এমনিতে আসে না। নিজেকে স্রেফ ঈমানদার রূপে দাবী করাতেও জুটে না। এটি নিজ গুণে অর্জনের বিষয়। সে জন্য অপরিহার্য হলো  পবিত্র কোরআনের জ্ঞান নিয়ে বেড়ে উঠা এবং অর্পিত দায়িত্ব পালন। উপরুক্ত এ আয়াতে সে অর্পিত দায়িত্বের কথাই বলা হয়েছে। বুঝানো হয়েছে স্রেফ নিজের জন্য বাঁচাটি ঈমানদারি নয়, তাকে বাঁচতে হয় সমগ্র মানব জাতির জন্য। উপরুক্ত আয়াতে আরো বুঝানো হয়ে দূর্নীতি নিয়ে বাঁচাটিও ঈমানদারি নয়। তাকে বরং দূর্নীতির নির্মূলে ও সুনীতির প্রতিষ্ঠায় নামতে হয়। এটি হলো মু’মিনের ঈমানী দায়বদ্ধতা। তাই ভাষা, বর্ণ ও ভৌগলিক ভিন্নতার নামে যেখানে প্রচণ্ড স্বার্থপরতা ও বিভক্তির দেয়াল এবং যে দেশে দুর্নীতির সয়লাব –সে দেশের জনগণের ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠায় যে প্রচণ্ড ব্যর্থতা আছে, তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ থাকে?

দায়িত্বহীন রূপে বেঁচে থাকার জন্য জ্ঞানবান হওয়ার প্রয়োজন পড়েনা। তখন প্রয়োজন স্রেফ পানাহারের। বিশ্বের বহুকোটি নিরক্ষর মানুষ তো বেঁচে আছে কোন রূপ শিক্ষালাভ ছাড়াই। কিন্তু দায়িত্ব যেখানে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফার -তখন ব্যক্তির উপর সুশিক্ষিত হওয়াটি অপরিহার্য হয়ে পড়ে। নইলে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তার উপর যে অর্পিত দায়ভার -সেটি সুষ্ঠ ভাবে ভূমিকা পালনে সে ব্যর্থ হয়। যে ব্যক্তি যুদ্ধ জানে না তাকে রণাঙ্গনে নামানোটি বেওকুফি। তেমনি ইসলাম ও অনৈসলামের মাঝে যে প্রতিক্ষণের যুদ্ধে তাতে অশিক্ষিত ও অযোগ্য মানুষের কি কোন মূল্য থাকে? সে ব্যক্তি পরকালেই বা কি পুরস্কার আশা করতে পারে? তাই শয়তানী শক্তির বিরুদ্ধে ঈমানদারের লাগাতর সামর্থ্য বৃদ্ধি ইসলামে একটি গুরুত্ব পূর্ণ ইস্যু। মানবের মূল সামর্থ্যটি দৈহিক নয়, বরং সেটি ঈমানের। দৈহিক শক্তির পরিচালনায় ব্যক্তির ঈমানের বল ইঞ্জিনের কাজ করে। সে ইঞ্জিনের সামর্থ্য বাড়াতেই লাগাতর প্রয়োজন হয় ওহীর জ্ঞানলাভের তথা শিক্ষালাভের। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ প্রতিটি নরনারীর উপর জ্ঞানার্জন (ওহীর জ্ঞান) ফরজ। ঈমানদারের সে জ্ঞানলাভকে অতি নিবিড় ও গভীর করার স্বার্থেই মহান আল্লাহতায়ালা সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব আল-কোরআনকে অবশ্যই-পাঠ্য টেক্সট বুক রূপে নির্ধারিত করেছেন। প্রতিটি ঈমানদারের জন্য বিষয়টি অতি গুরুতর। দায়িত্ব পালনে তথা ঈমানদার রূপে বাঁচার ক্ষেত্রে কে কতটা সফল হবে তা মূলতঃ নির্ভর করে তার কোরাআনী জ্ঞানের উপর। তাই পবিত্র কোরাআন থেকে জ্ঞানলাভ প্রতিটি নরনারীর উপর ফরজ করা হয়েছে। অন্য কোন ধর্মেই জ্ঞানলাভ এরূপ বাধ্যতামূলক নয়; কারণ তাদের এজেন্ডাটি ভিন্ন। বস্তুতঃ জ্ঞানার্জনের ফরজ পালনের উপরই নির্ভর করে জীবনের অন্যান্য ফরজগুলি কতটা সুষ্ঠ ভাবে পালিত হবে সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি।

“তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে সমগ্র মানব জাতির জন্য” –পবিত্র কোরআনের উপরুক্ত আয়াতের বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, ইবাদতে আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা চলে না। প্রকৃত ঈমানদারি হলো অন্যদের কল্যাণে যেমন জ্ঞানদান, শ্রমদান ও  অর্থদান, তেমনি রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও জিহাদে নামা। মুহাম্মদ বিন কাসিম তাই অত্যাচারি রাজা দাহিরের জুলুম থেকে সিন্ধুর হিন্দুদের বাঁচাতে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে জিহাদে নেমেছেন। তাই অন্যরা যেভাবে জাতীয়তাবাদ, গোত্রবাদ, বর্ণবাদ, ঔপনিবেশবাদ, সমাজবাদ ও ফ্যাসীবাদের ন্যায় নানারূপ স্বার্থপর মতবাদ নিয়ে লড়াই করে, ইসলামে সেরূপ স্বার্থপর রাজনীতি হারাম। ভাষা, বর্ণ ও ভূগোলের উর্দ্ধে উঠে প্যান-ইসলামিক হওয়া তাই প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায়বদ্ধতা। সেটি তার রাজনীতিতে প্রকাশ না পেলে তার ঈমানের দাবীতে মুনাফেকী আছে। কোরআনী জ্ঞানের শূন্যতায় সে ঈমানী দায়বদ্ধতার কথা বুঝা যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব তা নিয়ে বাঁচা। সে অজ্ঞতায় হারাম রাজনীতির পথগুলি চেনা ও তা বর্জনের সামর্থ্য সাধারণ ছাত্র ও জনগণের মাঝে গড়ে উঠে না। মুসলিম ভূমিতে হারাম মতবাদগুলি–এমন কি বিদেশী কাফের শক্তিবর্গও হাজার হাজার দাস-সৈনিক পায়। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে জাতিয়তাবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজবাদ, ফ্যাসিবাদ ও সেক্যুলারিজমের ন্যায় হারাম মতবাদগুলি লক্ষ লক্ষ অনুসারি পেয়েছে তো কোরআনী জ্ঞানের শূণ্যতার কারণেই। এরাই মুসলিম ভূমিতে অনিবার্য করে ইসলামের পরাজয়। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে কোরআনী জ্ঞানশূণ্য শিক্ষাব্যবস্থার এটিই হলো সবচেয়ে ভয়াবহ নাশকতা। এ শিক্ষাব্যবস্থার কারণে মুসলিমগণ নিজ অর্থ ও নিজ শ্রমে ইসলামের শত্রু রূপে বেড়ে উঠছে। বিপদের আরো কারণ, এ শিক্ষাব্যবস্থার কারণে তাদের চেতনা এতটাই মৃত, তারা যে ইসলামের শত্রু এবং মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিপক্ষ রূপে বেড়ে উঠছে সে হুশটুকুও তাদের চেতনা থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। কুশিক্ষার বিষক্রিয়া কতটা মারাত্মক হতে পারে –এ হলো তারই নজির। ২৯/০৪/২০১৮ (চলবে) tweet:@drfmkamal



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2018 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.