Home •শিক্ষা ও প্রচার মাধ্যম যে শিক্ষা বিপর্যয় আনে

Article comments

যে শিক্ষা বিপর্যয় আনে PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 29 August 2009 23:55

শিক্ষাই সমৃদ্ধির চাবি। নিঃস্বের এটিই একমাত্র পূঁজি। ব্যক্তি ও জাতির ভাগ্য-পরিবর্তনে এটিই শ্রেষ্ঠ ও সহজতর পথ। শিক্ষা এজন্যই জাতির মেরুদন্ড। কিন্তু কি বিজ্ঞান ও ব্যবসা-বাণিজ্য, কি অর্থনীতি ও রাজনীতি, কি সাহিত্য ও সংস্কৃতি, কি নীতি ও নৈতিকতা -সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে দুর্গতি –তাতে বিষয়টি কি আর অস্পষ্ট থাকে যে ব্যক্তি ও জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ শিক্ষা ব্যবস্থা তেমন অবদানই রাখেনি? পুষ্টিহীন আহারেও মানুষ কিছুকাল বাঁচে! তবে বাঁচাটা তাতে সুখের হয় না। নানা রোগে জর্জরিত হয় তখন সে বাঁচা। এমন বাঁচার মধ্যে সম্মান নেই, সুখবোধ নেই, গৌরবও নেই। অশিক্ষা নিয়ে বাঁচাটিও তেমনি অগৌরব, অসম্মান ও দুর্গতির। পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রের কল্যাণে কিছু করাতো দূরে থাক এমন অশিক্ষিত ব্যক্তির জীবনও হয়ে পরে পরনির্ভর। এ কারণেই সুখ, সম্মান আর গৌরবের হয়ে উঠেনি আমাদের জাতি হিসাবে বাঁচাটাও। মহান আল্লাহর পনেরো কোটি শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তথা আশরাফুল মাখলুকাতের বাস এদেশটিতে।

স্রষ্টার অন্যান্য মূল্যবান সৃষ্টি তা সোনা হোক, হীরা হোক, তেল হোক বা গ্যাস হোক বা অন্য যা কিছুই হোক, এ মানব সৃষ্টির তুলনায় অতি তুচ্ছ। মহান আল্লাহতায়ালা এ বিশ্বজগতের সব কিছুর স্রষ্টা, আর তিনিই মানুষকে আখ্যায়ীত করেছেন সকল সৃষ্টির সেরা রূপে। ফলে যে কোন সুস্থ্য মানুষের মনে এমন উচ্চতর মর্যাদাবোধের চেতনা ক্রিয়াশিল থাকাই স্বাভাবিক। আর এরূপ চেতনায় যে কোন বিবেকমান ব্যক্তির মধ্যেই জন্ম নেয় নিজ দেশ, নিজ সমাজ, নিজ পরিবারের পাশাপাশি সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের প্রতি প্রবল অঙ্গিকার। সর্বোপরি জন্ম নেয় মহান আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের বিজয়ের প্রতি এক গভীরতর দায়িত্ববোধ। এমন এক দায়িত্ববোধের কারণে এমন ব্যক্তি অর্থদান, রত্তদান এমনকি প্রাণদানেও কুন্ঠিত হয় না। অথচ অন্য প্রাণীকূলে এমনটি নেই। মানুষ তো এজন্যই শ্রেষ্ঠতর। অথচ সমাজের বুকে যারা নিত্যদিনের ভিক্ষুক তাদের অধিকাংশের চোখ, কান ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যে অন্যদের থেকে কম বা অপূর্ণাঙ্গ তা নয়। বরং তাদের মধ্যে যেটির অভাব সেটি হল আল্লাহর শ্রেষ্ঠ-সৃষ্টির চেতনাবোধ। একারণেই তারা সহজে ভিক্ষার থলি নিয়ে রাস্তায় নামতে পারে। অথচ বনের পশুপাখিও নিজের শিকার নিজেরা ধরে খায়। ভিক্ষাবৃতি তাই পশুকূলে নাই। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা হল মূলতঃ আল্লাহর সেরা সৃষ্টির কল্যাণের লক্ষ্যে বিণিয়োগ। এজন্যই সোনার খনি বা তেলের খনির উপর বিণিয়োগ থেকে শিক্ষার উপর বিণিয়োগ হাজার গুণ শ্রেষ্ঠ। আর শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল ব্যক্তিকে তার মূল পরিচয়টি জানতে সাহায্য করা। একমাত্র এপথেই ব্যক্তির নিজের মাঝে জাগে সঠিক পরিচয়বোধ, জাগে আত্মসম্মান বোধ। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এখানেই। ফলে মানুষ যে আল্লাহর সেরা সৃষ্টি সে পরিচয়টি যথার্থ ভাবে গড়ে উঠেনি। আর তার চেয়ে মুর্খ আর কে হতে পারে যার নিজের সঠিক পরিচয়টিই অজানা? নবীজী (সাঃ)র আমলে স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, কিন্তু নিজেদের পরিচয় নিয়ে কোন মুর্খতা ছিল না। ফলে নিজেদেরকে তারা সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মানে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। এবং জন্ম দিতে পেরেছিলেন মানব জাতির সর্বকালের  সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার। দেশের শাসক তার তার ভৃত্যকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। এবং নিজে আটার বস্তা বহন করে দুস্থ্য মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন।   

বাংলাদেশ নামের আজকের যে ভূখন্ডটি সেখানে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির বাস  হাজার বছরের। এখন সে সংখ্যা পনেরো কোটি। প্রশ্ন হলো, ১৫ কোটি মানুষ আজ কি করছে? কোথায় সে দায়িত্ববোধ? অথচ এ ধরিত্রির সপ্তম বৃহত্তম দেশ হিসাবে আমাদেরও কিছু করণীয় ছিলো। তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ রূপেও আমাদের কিছু দায়িত্ব ছিল। কাশ্মীর, বাড়ীর পাশের আরাকান, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিনসহ নানা দেশে মুসলমানগণ আজ নির্যা্তিত। তাদের কল্যাণে আমরা কিছু করেছি কি?  দেশের মানুষ মাথা পিছু একটি করে টাকা দান করলেও পনেরো কোটি টাকা হয়। কোন বিদেশী মজলুম মুসলমানের কল্যাণে আমরা সে পরিমাণ অর্থও কি কোন সময় দান করেছি? বরং সে দায়িদ্ববোধের চেতনাই যেন অনুপস্থিত। আমরা দেওয়াতে নয়, হাত পেতে নেওয়াতেই পারদর্শি। আমরা শুধু নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলি, দায়িত্বপালন নিয়ে নয়। পরনির্ভরতায় আমরা ইতিহাস গড়েছি। আমরা হাত পেতেছি, এবং এখনও লাগাতর হাত পেতে চলেছি আমাদের চেয়ে অনেক ক্ষুদ্রতর ও নবিনতর জাতির দোয়ারে। বিশ্বব্যাপী এটাই আমাদের বড় পরিচিতি। ভিক্ষার ঝুলির খেতাব পেয়ে আমরা রেকর্ড গড়েছি। উপমহাদেশের মুসলমানদের বড় স্বপ্নের দেশ রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। এ রাষ্ট্রটির সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ ছিল বাঙ্গালী। অথচ সে দেশটির উন্নয়নে বা শক্তিবাড়াতে আমাদের অবদানটি কি ছিল? কোন কিছুর অবিস্কার বা কোন শিল্প-কলকারখানা গড়া দূরে থাক, সে দেশের কোন খেলার টিমেও কি আমরা কোন অবদান রাখতে পেরেছি? বরং বেশী  বেশী চাওয়ার দাবী নিয়ে অবশেষে সে দেশটিও আমরা ভেঙ্গে ফেললাম।এবং সেটি পরিক্ষীত কাফের দুষমনদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। আরো লক্ষণীয়, আমাদের জাতীয় ইতিহাসের  সবচেয়ে বড় উৎসব এবং সে সাথে বড় গৌরবের বিষয়টি হলো ইতিহাসের অতি চিহ্নিত কাফের দুষমনদের সাথে একাত্তরের সহযোগিতার সে ঘটনাটি। 

বাংলাদেশের নগর-বন্দরগুলো যে শুধু মুর্খ ভিক্ষুকে পরিপূর্ণ তাই নয়, ভিক্ষাকে ভিত্তি করে বহু শিক্ষিতরাও গড়ে তুলেছে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান। ভিক্ষালদ্ধ অর্থ দিয়ে পূর্ণ হয় দেশের বাজেট। বিশ্বের দেশগুলির মাঝে দান খয়রাত কে কত কম দিল -সেটির হিসাব নিকাশ নেওয়াই আমদের রাজনীতি এবং সে সাথে পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্ত্বপূর্ণ বিষয়। এটি যে শুধু সরকারি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ আছে তা নয়, ছড়িয়ে পড়েছে ব্যক্তি, সংগঠন ও সংস্থার মাঝেও। যে কোন ব্যক্তি বা দেশই দুর্যোগে পড়তে পারে, অন্যের সাহায্যও নিতে পারে। কিন্তু কোন সুস্থ্য ব্যক্তি বা জাতি যদি ফি’বছর্ এবং বছরের প্রতিটি দিন অন্যের সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয় তবে কি সেটি মেনে নেওয়া যায়? তাতে কি ইজ্জত থাকে? অথচ বাংলাদেশে সেটি শুধু প্রতি বছরের নয়, প্রতিদিনের ঘটনা। ভিক্ষাবৃত্তির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার এনজিও। এমন ভিক্ষাবৃত্তি যে শুধু ধর্মীয় চেতনাশূণ্য সেকুলারদের মাঝে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তা নয়, ছড়িয়ে পড়েছে দেশের অধিকাংশ ইসলামী সংগঠনের মাঝেও। ইসলামী দলগুলোর নেতার ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের দুর্বৃত্ত রাজা-বাদশাহ ও শেখদের দরবারেও হাত পাতছে। অথচ ইসলাম গুরুত্ব দেয় দেয়াতে, নেয়াতে নয়। এজন্যই যাকাত ফরয, ভিক্ষাবৃত্তি নয়। ভিক্ষাবৃত্তি বরং অতি ঘৃণ্য, এবং সেসাথে সর্বভাবে পরিতাজ্য। এসব তথাকথিত নেতারা ভূলে যায়, আল্লহপাক দান করতে বলেছেন বা ভাল কাজ করতে বলেছেন নিজের জিম্মায় যে সম্পদ আছে তা থেকে, অন্যদের থেকে ভিক্ষা করে নয়। ভিক্ষার অর্থ একাকী আসে না, ভিক্ষার সাথে ভিক্ষাদাতার প্রতি আনুগত্য এবং শ্রদ্ধাবোধও আসে। এজন্যই ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিনী গণহত্যা ও বর্বরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মত ভিক্ষখোর সরকারগুলো থেকে কোনরূপ নিন্দা বা প্রতিবাদ নেই। যেমন দুর্বৃ্ত্তদের বিরুদ্ধে সে মহল্লার ভিক্ষুকদের কোন ঘৃণাবোধ থাকে না। বরং ভিক্ষাপ্রাপ্তীর লোভে দুর্বৃত্তদেরও তারা ভক্তিভরে সালাম করে চলে। মধ্যপ্রাচ্যের দুর্বত্ত স্বৈরাচারিদের নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে একই কারণে দেশের তথাকথিত ইসলামী দলগুলির ভিক্ষাখোর নেতাদের কোন প্রতিবাদ নেই, নিন্দাবাদও নেই। এমন কি শত শত নিরস্ত্র হাজীদের গুলী করে হত্যা করা হলেও, যেমনটি আশির দশকে মক্কায় ইরানী হাজীদের সাথে হয়েছিল।    

জ্ঞান শুধু মনের ঐশ্বর্যই বাড়ায় না, সে জ্ঞানের বিনিয়োগে বৈষয়ীক সম্পদেও বৃদ্ধি ঘটে। শিক্ষা এভাবে ব্যক্তিকে স্বনির্ভর করে। জাতিও এভাবে স্বাবলম্বি হয়। ব্যক্তি ও জাতীয়   জীবনে ইজ্জত তো এভাবেই আসে। জ্ঞানবান ব্যক্তি একারনেই আর যাই হোক ভিক্ষুক হয় না। বেদের বস্তিও গড়ে তোলে না। বরং উন্নত সভ্যতার জন্ম দেয়। জ্ঞানই ব্যক্তির আত্মাকে জীবন্ত রাখে, কারন এতেই আত্মার পুষ্টি। মানুষ যে স্রষ্টার শ্রেষ্ট সৃষ্টি - ভিক্ষাবৃত্তিতে সে চেতনাবোধেরই মৃত্যু ঘটে। ইসলামে ভিক্ষাবৃত্তি এজন্যই অতিশয় ঘৃণ্য ও বর্জনীয়। অথচ আমাদের বেড়ে উঠা নয়, বরং নেহাত বেঁচে থাকাটাও অন্যের দানখয়রাতের উপর নির্ভরশীল। কান্ডহীন লতানো গাছ যেমন অপর গাছকে আঁকড়ে ধরে বেড়ে উঠে তেমনি আমাদের বেঁচে বা টিকে থাকাটাও। এদেশে যখন একটিও বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, ছিল না কোন মেডিকেল বা প্রকৌশল কলেজ তখনও অন্ততঃ বেঁচে থাকার অবলম্বনটা এতটা অসম্মান ও অগৌরবের ছিলনা। শিক্ষার কাজ জাতিকে স্বনির্ভর করা, এবং ব্যক্তি ও জাতির মেরুদন্ডরকে পুষ্ট করা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশীদের ব্যর্থতার সাক্ষর সর্বব্যাপী। পুষ্ট না হয়ে বরং দিনে দিনে পঙ্গুত্বই বাড়ছে। বাংলাদেশে শিক্ষার নামে শিক্ষা প্রতিষ্টান কম হয়নি। এসব প্রতিষ্টান থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত গ্রাজুয়েটদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। আজ থেকে প্রায় দেড় শত বছর আগে জাপান যখন শিল্প-বিপ্লবের পথে যাত্রা শুরু করেছিল তখন সে দেশে বাংলাদেশে আজ যে সংখ্যক স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ও পিএইচডিধারী আছে তা ছিল না। অথচ এ বিপুল সংখ্যক গ্রাজুয়েট ও পিএইচডিধারীদের দ্বারা জাপানের ন্যায় বিপ্লব দূরে থাক, আমাদের সসম্মানে বেঁচে থাকার সামর্থও গড়ে উঠছে না। শিক্ষার নামে ডিগ্রি বিতরণ যতটা গুরুত্ব পেয়েছে জ্ঞান বিতরণ ততটা হয়নি। ফলে কাজের কাজ তেমন হয়নি। সংবাদ সৃষ্টিতে মাঝে মধ্যে আমরা যে অলোড়ন তুলি না তা নয়। তবে তা আবিষ্কারে নয়। সাহিত্য বা শিল্পেও নয়। আমরা খবরের শিরোনাম পাই হরতাল, হত্যা, সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক গোলযোগে পারঙ্গঁমতার কারণে। অথবা জলচ্ছ্বাস, ঘুর্নিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাজারে হাজার চোখের নিমিষে নিঃশেষ হয়ে।

রাস্তায় দৌড়ালেই পথের দুরত্ব কমে না। ভ্রান্ত পথে দৌড়ালে এ দুরত্ব শুধু বাড়েই না, গন্তব্যস্থলে পৌছাটাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ জন্যই পথের দৌড়টা সঠিক লক্ষে হওয়া জরুরী। ইসলামে আল্লাহ-প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকিমের গুরুত্ব এজন্যই অপরিসীম। জীবনকে ভয়ানক বিপর্যয় ও ব্যর্থতা থেকে বাঁচার এ ছাড়া কোন উপায় নেই। এ ব্যর্থতা থেকে বাঁচাতে এবং সফলতার পথ দেখাতে প্রতি নামাজের প্রতি রাকাতে আল্লাহপাক যে দোয়া-পাঠটি তাই বাধ্যতামলূলক করেছেন সেটি হল,ইহদিনাস সিরাতুল মোস্তাকিম” অর্থঃ “(হে আল্লাহ আমাকে) সরল পথ দেখান।” যার জীবনে বিপুল ধন-সম্পদ আছে, বহু সন্তান-সন্ততি আছে এবং প্রচুর নাম-যশও আছে অথচ সত্যপথ প্রাপ্তি নেই তার জীবনে প্রকৃত সফলতা নাই। সমগ্র জীবনটাই তখন বৃথা। সে ব্যর্থতার পরিণাম হল, ব্যক্তি তখন জাহান্নামে গিয়ে পৌঁছবে। অন্য ধর্মে বা সেকুলারিজমে শিক্ষার গুরুত্ব যাই হোক ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব এজন্যই সম্পূর্ণ ভিন্নতর। শিক্ষা এখানে শুধু উপার্জনের সামর্থ দেয় না, সত্যপথ চেনার সামর্থও দেয়। জীবনের পথ চলায় সত্যপথ তথা সিরাতুল মোস্তাকিমের সন্ধান দেওয়াই মূলতঃ শিক্ষার মূল কাজ। শিক্ষা এ জন্যই ফরয। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষা সে সামর্থ বাড়ায়নি। বরং বাড়িয়েছে ভ্রষ্টতা। সে পথভ্রষ্টতা থেকে বেড়েছে দুর্বৃত্তি। বাংলাদেশ দূর্নীতিতে যে ভাবে বার বার বিশ্ব-শিরোপা পেল সেটি তো্ দেশের ডিগ্রিধারী শিক্ষিতদেরই অর্জন, মুর্খদের নয়। বাংলাদেশে শিক্ষা যে কতটা কুশিক্ষার বাহন ও দুর্গতির জনক -এ হল তার নজির।  

শিক্ষার নামে দেশে অর্থব্যয়, শ্রম বয়ে, সময় ব্যয় কোনটাই কম হয়নি। অথচ যেটি সর্ব প্রথম হওয়া উচিত ছিল সেটি বহু যুগ পর আজও হয়ে উঠেনি।  ব্যক্তির প্রতিটি কর্মের পিছনেই একটি ভাবনা বা দর্শন থাকে। সে ভাবনা বা দর্শন থেকেই ব্যক্তির কর্ম, চরিত্র ও আচরণ নির্ধারিত হয়। একজন সন্ত্রাসী্ ও আবেদের ভাবনা যেমন এক নয়, তেমনি তাদের চরিত্রও এক নয়। প্রশ্ন হল, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সে ভাবনা বা দর্শনটি কি? শিক্ষার লক্ষ্য কি শুধু বিদ্যালাভ? চোর বা দুর্বৃত্তকেও তো অনেক কিছু শিখতে হয়, নইলে সে কাজে তার পারদর্শিতা আসে কি করে? তাই শেখাটাই বড় কথা নয়, গুরুত্বপূর্ণ হল শিক্ষার উদ্দেশ্যটি। এবং যা কিছু শেখা হল সেটি। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কোন উত্তর নেই। একজন ছাত্র কেন পড়বে, কেন শিখবে, শিক্ষার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি –তা নিয়েই রয়েছে গভীর অজ্ঞতা ও ভ্রষ্টতা। একজন কাফের বা সেকুলার যে লক্ষ্যে বাঁচে একজন মুসলমান সে লক্ষ্যে বাঁচে না। আর বাঁচার লক্ষ্য ও প্রয়োজন থেকেই নির্ধারিত হয় শিক্ষার প্রয়োজন্ ও সে সাথে তার গুণাগুণ। মুসলমানের বাঁচার ক্ষেত্রটি শুধু স্বল্পকালীন দুনিয়ার জীবনকে ঘিরে  নয়, আখেরাতের অনন্তকালের জীবনকে ঘিরেও। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহপাক বলেছেন, "হে নবী আপনি বলে দিন, আমি কি তোমাদের বলে দিব, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো কারা? তারা হল সেসব মানুষ যাদের সকল প্রয়াস ও প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনকে ঘিরে নিঃশেষ হয়ে যায়। এবং তারা হিসাব করে তাদের সাধিত কর্মগুলো কতই না সুন্দর!" -(সুরা কাহফ, আয়াত ১০৪)।তাই একটি মুসলিম দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু পার্থিব জীবনের সফলতার ভাবনাকে সামনে রাখলে চলেনা, আখেরাতের সফলতা বা কল্যাণের বিষয়টিকেও যথাযথ গুরুত্ব দিতে হয়। শিক্ষা তখন ইবাদতে পরিণত হয। কাফেরের শিক্ষাব্যবস্থায় তাই ঈমানদারের প্রয়োজন মেটে না।  মুসলমান তাই যেখানেই ঘর বাঁধুক না কেন, হালাল খাদ্যের পাশাপাশি হালাল শিক্ষারও ব্যবস্থা করতে হয়। নাগরিকের রাজস্বের অর্থে  তাই শুধু রাস্তাঘাট বা হাসপাতাল গড়লে চলে না। জান্নাত প্রাপ্তির সামর্থও বাড়াতে হয। এজন্যই একটি কাফের শাসিত দেশে মুসলমানের বাঁচাটি নিরাপদ নয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান গড়ার মূল প্রয়োজনটি ছিল তেমন একটি স্বতন্ত্র প্রয়োজনকে সামনে রেখেই। সেটি যথার্থ ভাবে না হলে মুসলমানের যথার্থ ভাবে বেড়ে উঠাটিও নিশ্চিত হয়না। কিন্তু সেকুলারের জীবনে সে ভাবনা থাকে না। কারণ সেকুলারিজমের আভিধানিক অর্থই হল ইহলৌকিকতা। আখেরাতে ভাবনা সেখানে অপ্রাসঙ্গিক। সেকুলারগণ মুসলমানদের সে মৌলিক প্রয়োজনকে সাম্প্রদায়িকতা বলে। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য ভয়ানক বিপদের কারণ, দেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও শিক্ষাব্যবস্থা ইসলামের এরূপ চিহ্নিত শত্রুদের কবজায়। ফলে শিক্ষা ব্যর্থ হচ্ছে তাদের মূল প্রয়োজনটি মিটাতে। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও দেশের শিক্ষার পরিবেশে ও পাঠ্যসূচী এজন্যই একটি কাফের দেশ থেকে সামান্যই ভিন্নতর। আর এর ফল দাড়িয়েছে, এ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আইনবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী বা প্রশাসনিক কর্মকতা তাদের কর্ম, মূল্যবোধ বা রূচীবোধে প্রতিবেশী কাফের দেশ থেকে কেোন পার্থক্যই রাখে না। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বড় ব্যর্থতা মূলতঃ এখানেই।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশের সৃষ্টি যা প্রতিষ্ঠা পেযেছিল উপনিবেশিক শাসনামলের ভারতে। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের নিষ্টাবান সেবাদাস সৃষ্টিই ছিল এর মূল লক্ষ্য। আরো লক্ষ্য ছিল, শিক্ষা বিতরণের নামে ব্যক্তির মন ও মননে ইসলামী চেতনার প্রবেশ ঠেকাতে ভ্যাকসিন দেওয়া। গুটি বসন্ত বা কলেরার ভ্যাকসিন দিলে শরীরে সে রোগের জীবাণূ ঢুকতে পারে না। বাংলাদেশ থেকে কলেরা ও গুটি বসন্তু নির্মূল হয়েছে তো এভাবেই। একই ভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনের কাজ করেছে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা। ফলে শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার ন্যায় ইসলামের ফরজ পালন এতটা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমন শিক্ষায় বেড়ে উঠা ব্যক্তির মগজে বা চেতনায় সহজে ইসলামী দায়-দায়ীত্বের কথা ঢুকে না, বরং প্রচন্ড ভাবে বেড়ে উঠে ইসলামের প্রতি অঙ্গিকারহীনতা। এমন ব্যক্তিরাই ইসলামের প্রতিষ্ঠা রুখতে যুদ্ধ শুরু করে। বাংলাদেশের তথাকথিত শিক্ষিতদের মাঝে এজন্যই ইসলামের বিপক্ষশক্তির এত আধিক্য। মার্কসবাদ, জাতিয়তাবাদের ন্যায় হারাম মতবাদগুলো লক্ষ লক্ষ নিবেদিত শাগরেদ পায় সে ব্যর্থতার কারণে। এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার কারণেই সুদী ব্যংক গুলো লক্ষ লক্ষ কাস্টমার পায়, পতিতারা রমরাম বাণিজ্য পায় এবং ভারতের ন্যায় একটি কাফের দেশও অগণিত অনুগত দাস পায়। এবং স্কুল-কলেজে নবীজী (সাঃ)র জন্ম দিবসের চেয়ে বেশী ধুমধামে পালিত হয় রবীন্দ্রনাথের জন্ম দিবস। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল সফলতা মূলতঃ এখানেই। এবং বাংলাদেশসহ সকল মুসলিম দেশকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশী ভারতসহ সকল ইসলাম বিরোধী শক্তির সম্মিলিত স্ট্রাটেজী হল, এরূপ সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো বেশী সেকুলার করা এবং ছাত্রদের মগজে ইসলামের বিরদ্ধে ভ্যাকসিন দেওয়ার কাজে অবিরাম ব্যবহার করা। জাতিসংঘকেও তারা সে কাজে ব্যবহার করছে। এটিকেই তারা বলছে সোশাল ইঞ্জিনীয়ারিং। এবং সেটি কাজও দিচ্ছে। ফলে ফল দাঁড়িয়েছে, যে চেতনা নিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বহুহাজার মুসলমান সৈনিক উসমানিয়া খেলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে ব্রিটিশের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে শাতিল আরব তথা ইরাকে গিয়েছিল এবং সেদেশে মুসলিম হত্যায় অংশ নিয়েছিল সেই একই প্রেরণা নিয়ে বাংলাদেশের সেকুলারিস্টরা ইসলামী চেতনাধারীদের নির্মূলে সর্বপ্রকার উদ্যোগ নিচ্ছে।  

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে অবিরাম পরিক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ইসলামি চেতনা বিনাশের কাজে এ শিক্ষ্যাববস্থার কার্যক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে অতি নিপুনভাবেই। একারণেই এ শিক্ষাব্যবস্থার সফলতার পাল্লা এত ভারী। বৃটিশ ভারতে বিপুল সংখ্যায় আত্মবিক্রিত তাঁবেদার গড়ে উঠে এরই বদৌলতে। শুধু স্বদেশেই নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের প্রহরা দিতে এসব সেবাদাসরা যে পরিমান শ্রম, মেধা ও রক্ত ব্যয় করেছে, তা নিজ দেশের স্বাধিনতার হেফাজত বা অর্জনে ব্যয় করেনি। ১৯১৭ সনে বৃটিশ জেনারেল এ্যালেন বাই যখন ওসমানিয়া খেলাফতের বাহিনীকে হটিয়ে পবিত্রভুমি ফিলিস্তিন দখল করে তখন তার সেনাদলের বেশীর ভাগ ছিল অ-ইংরেজ। বিপুল সংখ্যায় ছিল মুসলমানেরা। অথচ সেদিন মুসলমানদের নিজ ভূমিগুলি ছিল পরাধীন। কিন্তু সেসব পরাধীন ভূমি স্বাধীন করতে বিগত শত বছরে তারা উল্লেখযোগ্য কোন যুদ্ধ করতে ব্যর্থ হলে কি হবে, তাদেরই অনেকে শাতিল আরব, ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যের নানা জনপদে ব্রিটিশ বাহিনীর সৈন্যরূপে মুসলিম নিধনে পারঙ্গঁমতা দেখিয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামও ছিল তাদের একজন। পরবর্তীতে একই লক্ষ্যে যোগ দিয়েছিলেন জেনারেল ওসমানীর মত আরো অনেকে। ব্রিটিশের সেকুলার শিক্ষা-কার্যক্রম এভাবেই ব্যক্তির বিবেককে বানিজ্যিক পণ্যে পরিনত করে। দূর্ভাগা যে, বাংলাদেশে আজও এ দুষ্ট প্রক্রিয়া পুরাদমে কার্যকর। আরো ভয়ংকর বিষয় হল, এ বিপদ থেকে মূক্তি নিয়ে চিন্তা ভাবনা দূরে থাক, এ নিয়ে কারো তেমন মনবেদনাও নেই। চেতনা শূণ্য মূমর্ষরোগীর যেমন নিজের চিকিৎসা নিয়ে আগ্রহ থাকে না, তেমনি এক চেতনাহীন অবস্থা ভর করেছে এ জাতির জীবনে।

অতীতে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের নামে যা কিছু হয়েছে সেটি নিছক প্রলেপ দেওয়ার কাজ, মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পরিবর্তন সাধনে নয়। বহু অর্থ ও বহু শ্রম ব্যয়ে অতীতে শিক্ষানীতির চলমান এ গাড়ীর রঙচঙ, আকার আকৃতি বা আয়তনে কিছু পারিবর্তন সাধিত হলেও পূর্বের লক্ষ্য থেকে এটি একটুও বিচ্যুত হয়ানি। ফলে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত অসংখ্য ব্যক্তি দেশে নয়, বরং বিদেশেই তাদের শ্রম, মেধা ও শক্তির বিনিয়োগে বেশী আগ্রহী। নিজ দেশে বসবাস করলেও বিদেশী চিন্তা-চেতনার সাথেই তাদের সম্পৃক্ততা বেশী। যেন পণ্যের ন্যায় তারাও তৈরী হয়েছে বিদেশের বাজারে বিপণনের জন্য। প্রতিকুল এমনকি শত্রুভাবাপন্ন ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃভিক পরিমন্ডলে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সামর্থ সৃষ্টিতে এ শিক্ষার সাফল্য বিস্ময়কর। এজন্যেই শত্রুর অনেক অপকর্মেও এরা সহযোগীর ভূমিকা স্বচ্ছন্দে নিতে পারছে। এমনকি নিজ দেশ, ধর্ম বা ঐতিহ্যের বিরুদ্ধেও।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে উপেক্ষিত বিষয়টি হল আখেরাতের ভাবনা। অথচ মুসলমানের মূল ভাবনা হওয়া উচিত ছিল আখেরাতকে নিয়ে। কর্মে ও আচরণে, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে, অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আখেরাতের ভাবনা গুরুত্ব পেলে শান্তি ও সমৃদ্ধি নেমে আসতো পার্থিব জীবনেও। ব্যক্তিকে উন্নত চরিত্র ও সৃষ্টিশীল কর্মের দিকে টানতে আখেরাতের ভাবনা তো ইঞ্জিনের কাজ করে। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষার চৌহদ্দি বহুলাংশে পার্থিব প্রসঙ্গ নিয়েই সীমাবদ্ধ। এ শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ তার জীবনের সমস্ত সামর্থ শুধু পার্থিব সাফল্য লাভে ব্যয় করতে আগ্রহী। তার কাছে পারলৌকিক সাফল্যের প্রসঙ্গ গুরুত্বহীন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হারিয়ে যায় বিস্মৃতির গভীরে। অনেকে সেটি ধর্মান্ধতাও ভাবে। অথচ মানব জীবনে পারকালীন জীবনটাই হল আদি-অন্তহীন একমাত্র টিকসই জীবন। জীবনের ওপার নিয়ে অজ্ঞতাই এই অনাগ্রহের মূল কারণ। আর সে অজ্ঞতারই পরিচর্যা দিয়েছে বাংলাদেশের সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থা।

কর্মে ধর্মের মিশ্রণ না হলে পার্খিব জীবনও আনন্দময় হয়না। বরং এতে অসত্য, অনাচার ও পাপাচারে অতিষ্ট হয় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র। বর্তমান শিক্ষানীতির সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হল, ছাত্রকে পার্থিব-জগতের ওপারে দৃষ্টি নিক্ষেপে আদৌও আগ্রহী করে না। ফলে তার জীবনের হিসাব- নিকাশ ও পরিল্পনায় অন্তহীন ওপারটা বাদ পড়ে যায়। এভাবে জীবনে সুনীতি বেড়ে উঠার প্রেরণার মূল উংসই বিনষ্ট হয়। কোন সুস্থ ব্যক্তিই নিঃস্বার্থ নয়! তবে পরকালের অন্তহীন আনন্দের আশ্বাসে পার্থিব জীবনের স্বার্থ পরিতাগের সামর্থ তার রয়েছে। ইসলামের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মানব সৃষ্ঠির যে প্রক্রিয়া প্রতিষ্টা করেছিল তার মূল উপদান ছিল এই পারলৌকিক চেতনা। সেদিন সরকারী ও বেসরকারি পূঁজির বিশাল বিনয়োগ হয়েছিল এ চেতনার প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যায়। ফলে গড়ে উঠেছিল উন্নত চরিত্র ও চেতনা-সমৃদ্ধ সামাজিক পূঁজি বা সোসাল ক্যাপিটাল। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রয়োজনে এমন সামাজিক পুঁজি তো অপরিহার্য। সমাজে তখন পুলিশের প্রয়োজন কমে যায়। অথচ সেটি গড়ে না উঠলে হাজার হাজার পুলিশ নিয়োগ করা সত্ত্বেও জাতি তখন দূর্নীতি ও দুর্বুত্তিতে বিশ্ব-শিরোপা অর্জন করে। বাংলাদেশ আজ সে পথেই ধেয়ে চলেছে। আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এ নয় যে আমরা আনবিক বোমা বা রকেট্ আবিস্কারে ব্যর্থ হয়েছি। বরং সেটি হল, ইসলামের পরীক্ষিত পদ্ধতি -যা আমাদের একান্ত নিজেরও বটে, তা থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হচ্ছি। অথচ সেকুলারিজম, সোসালিজম, জাতিয়তাবাদ, পুঁজিবাদের ন্যায় চেতনা রাজ্যের অনেক পরিক্ষীত আবর্জনা নিয়ে যুগ যুগ ধরে নিজেদেরকে ব্যস্ত রেখেছি।

মানব ক্রোড়ে জন্ম লাভেই মনুষ্যত্ব লাভ ঘটে না। পশুতে পশুসুলভ বৈশিষ্ঠ্য বেড়ে উঠে আপনাতেই। এজন্য পৃথক প্রচেষ্টা নিষ্প্রয়োজন। দৈহিক অবয়ব ও উপাধি জন্মসূত্রে জুটলেও এ পথে মনুষ্যত্ব প্রাপ্তি ঘটে না। ঈমানও নয়। মানবিক ণ্ডণাবলীর জন্ম ও বিকাশে যথাযথ শিক্ষা অপরিহার্য। নইলে পূর্নাঙ্গ মানুষ হওয়া শুধু দুঃসাধ্যই নয়, অসাধ্যও। সিরাতুল মোস্তাকিম চিনতে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি যে প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি জ্ঞান-আহরনের পথে খুঁজে পায়, এবং যা তার গুনাবলীর আবিষ্কারে ও বিকাশে সহায়ক -সেটাই হল প্রকৃত শিক্ষা। মানুষের মানুষরুপে বেড়ে উঠার এটাই পূর্বশর্ত। এজন্য ইসলামে জ্ঞানদান ও জ্ঞানলাভ দুটোই ইবাদত। আল কোরআনে বলা হয়েছে একমাএ জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে। তাই ঈমানদারীর জন্যও জ্ঞানার্জন অপরিহার্য। হাদিসঃ সেই দূর্ভাগা যার একটি দিন অতিবাহিত হল অথচ তার জ্ঞানের ভান্ডারে কিছুই জমা হল না। যথার্থ শিক্ষা এভাবে মানুষের সবচেয়ে বড় কল্যাণটি করে, পার্থিব ও পরকালীন উভয় জগতে। তাই এমন শিক্ষা যথাযথ হওয়াটা জরুরী।

ইসলামে পার্থিব-অপার্থিবের বিভাজন নেই। ফলে বিভাজন নেই শিক্ষার পরিসীমাতেও। জ্ঞানের ভূবনে পারলৌকিক চেতনার মিশ্রন হলে জান্নাতের পথে পথচলাটা সহজতর হয়। অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরাও তখন জীবনের পথচলায় সঠিক রাস্তা সহজে খূঁজে পায়। অন্যথায় বুদ্ধিমান ব্যক্তিরও ভ্রান্ত পথে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অধিক। জীনের চৌরাস্তায় পথের সংখ্যা অসংখ্য হলেও সিরাতুল মোস্তাকিম মাত্র একটিই। ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ না হলে অসংখ্য পথের ভীড়ে সঠিক পথটি চেনা অসম্ভব। ইসলামের প্রথম যুগে আরবের নিরক্ষর বেদুইনও জান্নাতের পথটি সঠিক ভাবে চেনা এবং  সে পথে চলার প্রচন্ড সামর্থ পেয়েছিলেন এ চেতনা বলেই। অথচ এযুগে বহু নোবেল বিজয়ী প্রফেসরও বিভ্রান্তির ঘূর্নাবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে। অনেকে তো প্রফেসর হয়েও শাপ-শকুন-গরু-বাছুড়কে দেবতা ভেবে উপসানা দিচ্ছে। কারণ দ্বীন ও দুনিয়া নিয়ে তাদের জ্ঞানের সঞ্চয় নবী (সাঃ)র আমলের নিরক্ষর বেদুঈনদের তুলনায় তুচ্ছ। তাঁরা সে জ্ঞান পেয়েছিলেন জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস মহান আল্লাহর নাযিলকৃত কোরআন থেকে। এবং তাঁর মহান রাসূল (সাঃ)থেকে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান হলে কি হবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সে কোরআনী জ্ঞানের সাথে সংযোগের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। অথচ শিক্ষার্জনের ক্ষেত্রে নবীজির (সঃ) মূল সুন্নত হল এটি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এটিই বেশী উপেক্ষিত বিষয়। আর আল্লাহ-প্রদত্ত জ্ঞানের প্রতি এমন উপেক্ষা নিয়ে যে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পায় বা বেড়ে উঠে সেটি কোন সম্নান নয়, বরং ভয়ানক বিপর্যয়ই ডেকে আনে। আর আজকের বাংলাদেশ তারই নমুনা। প্রশ্ন হল, নিছক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক বিপ্লব এনে কি এ বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব? দেশের জন্য আরো বিপদ হল, এ ভয়ানক এ বিপর্যয় নিয়ে ভাবনাই বা ক’জনের?



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Saturday, 01 January 2011 13:49
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.