Home •শিক্ষা ও প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মূল সমস্যাটি কোথায়?

Article comments

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মূল সমস্যাটি কোথায়? PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 01 January 2011 18:08

দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সফলতা ও বিফলতার মূল্যায়নে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি ছাত্র, শিক্ষক বা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানর সংখ্যা নয়। কত বছর বা বছরে কত ঘন্টা ছাত্রকে শিক্ষা দেওয়া হয় সেটিও নয়। পিএইচডি বা সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে কতজন বের হলো সেটিও শিক্ষার মাপকাঠি নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাতির নৈতীক মেরুদন্ড কতটা মজবুত হলো, মানবিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক দিক দিয়ে জাতি কতটা সামনে এগুলো সেটি। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা বাড়লে নিছক ছাত্র, শিক্ষক ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি পাওয়াতে দেশের কল্যান বাড়ে না। একজন বদ-আখলাক দুর্বৃত্তকে দেখে নিশ্চিত বলা যায়,সে সুশিক্ষা পায়নি। ভাল বিদ্যালয়,ভাল শিক্ষক ও ভাল বইয়ের সাহচর্য সে পায়নি। তেমনি কোন দেশ যখন দুর্বৃত্তিতে বার বার বিশ্বরেকর্ড গড়ে তখন কি বুঝতে বাঁকি থাকে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় গলদ কত গভীর? দুর্বৃত্তিতে এরূপ বিশ্ব রেকর্ড বাংলাদেশ একবার নয়,৫ বার গড়েছে। শিক্ষালয়েই নির্মিত হয় জাতির নৈতীক মেরুদন্ড। ছাত্ররা পায় উচ্চতর আখলাক। পায় আজীবন জ্ঞানার্জনের প্রেরণা। এখানে থেকেই জাতি পায় বেঁচে থাকার শক্তি। নির্মিত হয় জাতির মন, মনন ও সংস্কৃতি। তাই নিছক ক্ষেতে-খামারে ও কল-কারখানায় উৎপাদন বাড়ালে জাতি বাঁচে না, এজন্য বিদ্যাচর্চাও বাড়াতে হয়। বিবেক বা আত্মার পুষ্টির জন্য এটি অপরিহার্য। নইলে দেহ নিয়ে বেঁচে থাকাটি সম্ভব হলেও অসম্ভব হয় মানুষ রূপে বাঁচাটি।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বহু বেড়েছে। গ্রামে গ্রামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধু থানা পর্যায়েই নয়, ইউনিয়নেও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বহু জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যায়। শিক্ষাই সরকারি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত। অথচ আজ থেকে শত বছর আগে সমগ্র দেশে একখানি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। অধিকাংশ জেলায় ছিল না কলেজ। আজ বিপুল হারে বেড়েছে ছাত্র-শিক্ষকের সংখ্যা। কিন্তু বেড়েছে কি সেগুলিও যা শিক্ষা-বিস্তারের সাথে সাথে বেড়ে উঠা উচিত? মজবুত হয়েছে কি জাতির মেরুদন্ড? বেড়েছে কি সততা, স্বনির্ভরতা, নৈতিকতা ও আবিস্কারের সামর্থ? বেড়েছে কি আত্মমর্যাদা? দূর্নীতির বিস্তারে বনজঙ্গলে বসবাসকারি বহু আদিবাসি থেকেও যে নীচে নেমেছি সেটি কি গোপন বিষয়? এসব দুর্বৃত্তদের অধিকাংশই যে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারি তা নিয়েও কি সন্দেহ আছে?

 

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা অনেক। তবে বড় সমস্যা অর্থাভাব নয়। বিদ্যালয় বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কমতিও নয়। বরং মূল সমস্যা এর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, দর্শন ও শিক্ষা-পদ্ধতিতে। যা শেখানো হয় ও যারা শেখায়, সমস্যা সেখানে। ১৪ শত বছর আগে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সভ্যতাটি যখন নির্মিত হয়েছিল তখন বাংলাদেশে আজ একটি জেলায় যত স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা আছে তার সিকি ভাগও ছিল না। যত বই-পুস্তক ও শিক্ষাসামগ্রী নিয়ে আজ বিদ্যাবিতরণের আয়োজন, সেটিও ছিল না।  অথচ সেদিন দারিদ্র্য ও অপ্রতুল অবকাঠামো নিয়ে মানবতায়-সমৃদ্ধ অতি বিস্ময়কর সভ্যতার নির্মান সম্ভব হলেও বাংলাদেশে আজ কেন তা হচ্ছে না সেটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। চিন্তাশীল মানুষের উচিত তা নিয়ে ভাবা এবং সঠিক উত্তর খুঁজে বের করা। আমাদের জাতীয় জীবনের এটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এবং এর সাথে জড়িত আমাদের বাঁচামরা। ট্রেনের গতি বা সেবার মান বড় কথা নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি কোন দিকে যাচ্ছে সেটি। বাংলাদেশর শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি অসৎ উদ্দেশ্যে চালু করেছিল ঔপনিবেশিক বৃটিশ। প্রণীত হয়েছিল, ঔপনিবেশিক শাসনের একনিষ্ঠ সেবাদাস তৈরীর কাজে। এবং সেটি তারা গোপনও রাখেনি। এ শিক্ষায় শিক্ষিতরা রক্তমাংশে ভারতীয় হলেও বৃটিশের বিশ্বস্ত দাস হওয়াকে যে সন্মানজনক ভাববে সেটিই এর মূল লক্ষ্য ছিল। বৃটিশ শিক্ষামন্ত্রী লর্ড মেকলে বৃটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে সেটিই সগর্বে ঘোষণা করেছিলেন। এ লক্ষ্যে তারা সফলও হয়েছিল। এমন গোলাম সৃষ্ঠির কাজে তারা যে শুধু সেকুলার স্কুল-কলেজ খুলেছিল তাই নয়, মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাই কলিকাতায় প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের প্রথম আলিয়া মাদ্রাসাটি আলেমদের প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং তাদের। ফলে পচনের শিকার হয়েছে উভয় পদ্ধতি। শিক্ষিতরা নিজ দেশের স্বাধীনতায় শ্রম দিবে, অর্থদিবে, এমনকি প্রাণও দিবে। এমন আত্মত্যাগে শিক্ষাব্যবস্থা দেশবাসীর সামর্থ জোগাবে এবং সততা ও আত্ম-ত্যাগকে দেশের আচারে পরিণত হবে -  সেটিই কাঙ্খিত। কিন্তু বৃটিশের গড়া শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিতদের দ্বারা সেটি হয়নি। বরং নিজেদেরকে বৃটিশের ‘মোস্ট-অবিডিয়েন্ট সার্ভেন্ট’ রূপে পরিচিতি দিতে তারা লজ্জাবোধ করেনি। সাম্রাজ্যবাদী শাসনের পক্ষে তারা যে শুধু কলম ধরেছে বা অফিস আদালতে কাজ করেছে তাই নয়, দেশে-বিদেশে গুপ্তচরবৃত্তি করেছে এবং অস্ত্রও ধরেছে। বহু স্বদেশীকে হত্যাও করেছে। এমনকি নিরপরাধ মানবহত্যায় ইরাক, ফিলিস্তিন, আফ্রিকা, ইন্দোচীনসহ নানা দেশে গেছে। সাম্রাজ্যবাদীদের দেওয়া মজুরি, পদবী ও উপঢৌকনকে এরা জীবনের  বড় অর্জন ভেবেছে।  ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনমূক্ত হলেও পাকিস্তান বা পরবর্তীতে বাংলাদেশের মানুষ নিজ দেশে ও নিজ ধর্মে অঙ্গিকারহীন এসব বৃটিশ-সেবাদাসদের শাসন থেকে মুক্তি লাভ করেনি। ফলে কিছু রাস্তাঘাট, স্বুল-কলেজ ও শিল্প-করখানা নির্মিত হলেও শিক্ষার মূল লক্ষ্যে পরিবর্তন বা সংস্কার আসেনি। বার বার ভূগোল বা সরকার পরিবর্তন হলেও তাই পরিবর্তন আসেনি বাঁচবার লক্ষ্যে ও রূচীবোধে। বিদেশী স্বার্থের সেবক তৈরীর যে লক্ষ্যে এটি প্রণীত হয়েছিল এখনও সে কাজ অব্যাহত ভাবে চলছে। বিদেশী কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অঙ্গিকারে নিজ-দেশ ও নিজ-ঐতিহ্য ছেড়ে এরা বিশ্বের যেকোন দেশে যেতে রাজি। বাংলাদেশে এজন্যই দেশপ্রেমিক নাগরিকের প্রচন্ড অভাব। অথচ অভাব হয় না বিদেশী এনজিও বা সংস্থার চর পেতে।

 

কথা হলো, শিক্ষার উদ্দেশ্য কি? এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অথচ এর কোন সর্বজন-সম্মত উত্তর নেই। এ জগতে সবাই যেমন একই উদ্দেশ্যে বাঁচে না তেমনি একই উদ্দেশ্যে শিক্ষিতও হয় না। অনেকেই শিক্ষাকে বেশী বেশী জানার মাধ্যম মনে করেন। কেউ ভাবেন, শিক্ষার কাজ যুগোপযোগী নাগরিক গড়া। কেউ বলেন, এর লক্ষ্য ব্যক্তিত্বের বিকাশ। কারো মতে, এটি উপার্জন বৃদ্ধির মাধ্যম। শিক্ষা নিয়ে মানুষের এরূপ ভিন্ন ভিন্ন ভাবনার কারণ ভিন্ন ভিন্ন জীবনদর্শন। তাই শিক্ষা নিয়ে মুসলমানের ভাবনা অমুসলমানদের থেকে ভিন্নতর। কারণ, অমুসলমান যে উদ্দেশ্যে বাঁচে মুসলমান সে উদ্দেশ্যে বাঁচে না। পথ ভিন্ন হলে পাথেয়ও ভিন্ন হয়। ফলে মুসলমানের হালাল-হারামের বাছবিচার শুধু পানাহারের ক্ষেত্রে নয়। একই রূপ বাছবিচার শিক্ষার ক্ষেত্রেও। দেহের প্রয়োজনের ন্যায় মুসলমানের মনের প্রয়োজনও অমুসলমান থেকে ভিন্ন। মুসলমানের শিক্ষার মূল লক্ষ্য, বাঁচার মূল লক্ষ্যে সফলতা দেওয়া। বাঁচার লক্ষ্য ও শিক্ষার লক্ষ্য হবে পরস্পরের পরিপূরক। প্রশ্ন হলো, বাঁচার লক্ষ্য কি? এ প্রশ্নের উত্তর অমুসলমানের কাছে যাই হোক, মুসলমানের কাছে সেটিই যা পবিত্র কোরআনে বর্ণীত হয়েছে। এবং সেটি হলোঃ “আল্লাযী খালাকাল মাউতা ও হায়াতা লি ইয়াবলুয়াকুম আইয়োকুম আহসানা আমালা” অর্থঃ  তিনি (সেই মহান আল্লাহ) যিনি মৃত্যু ও জীবনকে সৃষ্ঠি করেছেন এজন্য যে তিনি পরীক্ষা করবেন তোমাদের মধ্যে আমলের দিক দিয়ে কে উত্তম”(সুরা মূলক আয়াত-১)। অর্থাৎ দুনিয়ার এ জীবন হলো পরীক্ষাকেন্দ্র। এবং পরীক্ষার শেষ ঘন্টাটি যখন তখন বেজে উঠতে পারে। যেহেতু এ পরীক্ষায় পাশের উপর নির্ভর করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাতপ্রাপ্তী, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মানবজীবনে নেই। একই কারণে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ পরীক্ষায় পাশের প্রস্তুতি। এবং এ প্রস্তুতির জন্য চাই উপযুক্ত শিক্ষা। ইসলামে জ্ঞানচর্চা এজন্যই ফরয। এবং সেটি হয়েছে নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত ফরয করার বহু পূর্বে। বস্তুতঃ জীবনের মূল পরীক্ষায় পাশের সামর্থ বাড়ানো ছাড়া মুসলমানের জ্ঞানার্জনে মহত্তর লক্ষ্য নেই। তবে মাথা টানলে কান-নাক যেমন এমনিতেই আসে, তেমনি আখেরাতের পাশের সামর্থ বাড়লে, সামর্থ বাড়ে বিশ্ব মাঝে বিজয়েরও। সাহাবায়ে কেরাম সেটিই প্রমাণ করে গেছেন। তাই যে জ্ঞানচর্চায় জান্নাতপ্রাপ্তি ঘটে তাতে প্রতিষ্ঠা বাড়ে দুনিয়াতেও। এমন শিক্ষায় সামর্থ বাড়ে নেক আমলের। নেক আমলের বর্ণনা দিতে গিয়ে নবীপাক (সাঃ) বলেছেন, পথ থেকে একটি কাঁটা ফেলে দেওয়াও নেক আমল। অর্র্থাৎ ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ববাসীর জন্য যা কিছু কল্যানকর, এমন প্রতিটি কর্মই হলো নেক আমল। তাই শুধু পথের কাঁটাই নয়, সাহাবায়ে কেরাম অর্থ, শ্রম ও রক্তব্যয় করেছেন সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঁটা সরাতে। ফলে অন্যসব কাজকর্ম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে শুধু নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ও নানারূপ নফল ইবাদতে মগ্ন হওয়া নবীজীর সূন্নত নয়।

 

জ্ঞানার্জন শুধু পথের কাঁটা ফেলাতে শেখায় না, গলার বা নাড়ীর কাঁটা সরানেরা সামর্থও দেয়। জ্ঞানের বদৌলে ব্যক্তি পায় বিস্ময়কর সৃষ্টিশীলতা। ইসলামের জ্ঞানচর্চা তাই নিছক কিতাব নির্ভর নয়, বরং আমল-নির্ভর। কর্মজগতের সাথে প্রত্যক্ষ সংযোগ ঘটায় জ্ঞানচর্চার। তাছাড়া যথার্থ জ্ঞানলাভ না হলে ধর্মকর্মও সঠিক হয় না। সম্ভব হয় না সিরাতুল মোস্তাকিমে চলাটিও। জ্ঞানের মাধ্যমেই বাড়ে কোটি কোটি মানুষকে ¯ল্প সময়ে আলোকিত করার সামর্থ। সামর্থ দেয় বিস্ময়কর বিশ্বলোককে দেখার, ফলে মানুষ দেখতে পায় মহান আল্লাহর কুদরতকে। মহাশূণ্যে, সাগরের গভীরে, পত্র-পল্লবে সর্বত্র দেখতে পায় আল্লাহর আয়াতকে, ফলে বৃদ্ধি পায় মোমেনের ঈমান। কৃষি ফলন বাড়িয়ে লাঘব করে ক্ষুদার্ত মানুষের যাতনা। যুদ্ধাস্ত্র বানিয়ে সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা দেয় ইসলামি রাষ্ট্রের এবং বিনাশ ঘটায় দূর্বৃত্তের। এভাবেই জ্ঞানলাভ নানাভাবে সমৃদ্ধি আনে নেক আমলে এবং সামর্থ দেয় পরীক্ষাপাশে। এ সামর্থ বাড়াতেই নবীজী (সাঃ) এমনকি সুদূর চীনে যেতে বলেছেন। নবীজী (সাঃ)র সে নির্দেশ অতি নিষ্ঠার সাথে পালন করেছিলেন সেকালের মুসলমানেরা। এজন্যই বিজ্ঞানচর্চাকে তারা দুনিয়াদার ভাবেননি, বরং উঁচু পর্যায়ের নেক-আমল ভেবে বিপুল অর্থ, শ্রম ও মেধা বিণিয়োগ করেছিলেন। ফলে কয়েক শত বছরের মধ্যে বিশ্বের নানা ভাষা থেকে বিজ্ঞানের অসংখ্য পুস্তক আরবীতে তর্জমা করেছিলেন এবং গড়ে তুলেছিলেন বিশাল জ্ঞান-ভান্ডার। ফলে স্বল্প সময়ে সম্ভব হয়েছিল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মান এবং বিশ্বশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠালাভ। তাই বিজ্ঞানচর্চাকে দুনিয়াদারি বলা শুধু মুর্খতাই নয়, আত্মঘাতিও। এমন মুর্খতায় যে শুধু নেক আমলের কমতি দেখা দেয় তাই নয়, মুসলিম উম্মাহ পরাজিত এবং অপমানিত হয়। আর এরূপ আত্মঘাতি কর্ম সমাজে ব্যাপ্তি পেলে বহিঃশক্তির প্রয়োজন পড়ে কি? মুসলমানদের আজকের পরাজয়ের মূল কারণ, শিক্ষার গুরুত্ব ও নেক-আমল নিয়ে এরূপ বিভ্রান্তি। এ বিভ্রান্তির কারণে ক্ষিজ্ঞান চর্চাকে দুনিয়াদারি বলে সেটিকে মাদ্রাসার অভ্যন্তরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। দেশে হাজার হাজার মাদ্রাসা ও তার শিক্ষকগণ আজও বেঁচে আছে এ বিশ্বাস নিয়ে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এটি অতিশয় আত্মঘাতি দিক। আধুনিক জ্ঞানের সন্ধানে আলেমগণ সুদূর চীনে যাওয়া দূরে থাক নিজ দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও খোঁজ নেয়নি। তারা উদ্যোগী হয়নি সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঁটা সরাতে। আবর্জনা সরানো হয়নি দেশের রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসন থেকে। এমনকি নানারূপ দূর্নীতির আবর্জনা জমেছে খোদ মাদ্রাসাগুলির অভ্যন্তরে। ফলে দেশ যে আজ দূর্নীতির শিকার সে জন্য আলেমগণও কি কম দায়ী?

 

পরীক্ষাকেন্দ্রে বসে কোন পরীক্ষার্থী আমোদফুর্তিতে মত্ত হয় না। জানালায় দাঁড়িযে প্রৃকৃতির দৃশ্য দেখে না। বরং নেক কাজে যা কিছু অমনযোগী করে তা থেকে নিজেকে দূরে রাখে। স্কোর বাড়াতে কাজে লাগায় প্রতিটি মুহুর্তকে। আনন্দ-উল্লাস বা শিল্প-সংস্কৃতির নামে মুসলমান তাই নাচগান, উলঙ্গতা, অশ্লিলতাকে প্রশ্রয় দেয় না। এগুলি জীবনের মূল মিশন থেকে বিচ্যুত ও বিভ্রান্ত করে। মহাবিপদ ডেকে আনে ব্যক্তির জীবনে। এগুলি এজন্যই ইসলামে হারাম। বরং মোমেন সদাসর্বদা ব্যস্ত থাকে নেক আমলে। খলিফা হয়েও ভৃত্তকে উটের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টানা বা রাতে না ঘুমিয়ে আটার বস্তা নিজে কাঁধে গরীবের ঘরে পৌছে দেওয়ার মত ইতিহাস নির্মিত হয়েছে এমন এক বলিষ্ঠ চেতনার কারণেই। নিজে সূদখোর, ঘুষখোর বা দুর্বৃত্ত হওয়া দূরে থাক, রাষ্ট্র ও সমাজকে দুর্বৃত্তমূক্ত করার নিয়তে সে শুধু শ্রম ও অর্থই দেয় না, জীবনও দেয়। এমন সৃষ্টিশীল চেতনা শূন্যে নির্মিত হয় না। এজন্য জ্ঞান চাই এবং জ্ঞানচর্চার উপযুক্ত কেন্দ্রও চাই। নবীজী (সাঃ) এবং সাহাবায়ে কেরাম কলেজ-বিশ্ববিদ্ব্যালয় না গড়লেও মসজিদের মেঝেতে জ্ঞানচর্চার এমন কেন্দ্র গড়েছিলেন। মুসলিম সমাজে সৃষ্টিশীল মানুষ ও আত্মত্যাগী মুজাহিদ সৃষ্টি হয় এমন প্রতিষ্ঠানের কল্যাণেই। সাম্রাজ্যবাদের দাস হওয়া দূরে থাক, তাদের আধিপত্য বিলুপ্তির কাজে তারা প্রাণপণে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। ফলে কিছু মীরজাফরের বিশ্বাসাতকতায় বিপদগ্রস্ত হয় না স্বাধীনতা।
স্বাধীনতার সুরক্ষায় তখন যুদ্ধ হয় প্রতি মহল্লায়। আলো যেমন অন্ধকার দূর করে, শিক্ষাও তেমনি সমাজ থেকে অনাচার ও দূর্নীতি সরায়। বিদ্যালয় এভাবে সমাজ বিপ্লবে ইঞ্জিনের কাজ করে। শিক্ষাব্যবস্থার সফলতা যাচায়ের বড় মাপকাঠি হলো, কতজন শিক্ষার্থী এরূপ আত্মত্যাগী চেতনা নিয়ে বের হচ্ছে সেটি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার বড় প্রমাণ, সে ধরণের আত্মত্যাগী মানুষের স্বল্পতা। ব্যাপক ভাবে বেড়েছে স্বার্থপরতা। শিক্ষা নিয়ে যারা বের হচ্ছে তাদের বিপুল ভাগই দু’পায়ে খাড়া বিদেশে বা বিদেশীদের সংস্থায় মেধা বিণিয়োগে। স্বার্থপরতা নিয়ে নামছে সন্ত্রাসে এবং লুণ্ঠনে হাত দিচ্ছে জাতীয় সম্পদে। ফলে যতই বাড়ছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ততই বাড়ছে দূর্বৃত্তের সংখ্যা। যেমন আবর্জনা বাড়লে বাড়ে মশা-মাছির সংখ্যা। ফলে দেশ পরাজিত হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতির উপর আধিপত্য বিস্তাÍে শত্র“কে তাই সীমান্ত-যুদ্ধ করতে হচ্ছে না। আমরা পরাজিত হচ্ছি ঘরের শত্র“র হাতে। বাংলাদেশ আজ দূর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম সেটি কি মহামারি, জলবায়,ু বা জলোচ্ছ্বাসের কারণে? অশিক্ষা, রোগব্যাধী বা দারিদ্র্যের কারণে হলে সেটি আজ থেকে ১০০ বছর আগেই হওয়া উচিত। কারণ আজকের তুলনায় এগুলি তখনই অধিক ছিল।

 

মানুষ বিশ্বাস, কর্ম ও আচারণে ভিন্ন হয় ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষার কারণে। বস্তুর ব্যক্তির শিক্ষা দৃশ্যমান হয় তার কর্ম ও আচরণের মধ্য দিয়ে। কোরআনে এজন্য বলা হয়েছে, ‘যে জানে ও জানে না তারা উভয়ে এক নয়।’ বলা হয়েছে, ‘ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহি উলামাহ’ অর্থঃ একমাত্র জ্ঞানীরাই আমাকে ভয় করে। আল্লাহভীরু হওয়ার জন্য জ্ঞানার্জন তাই ফরয। এটি ফরয শুধু মসজিদের ইমাম বা মাদ্রাসার শিক্ষকের উপর নয়, প্রতিটি মুসলমানের উপর। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানে হয়েছেন অথচ জ্ঞানার্জন করেননি এমন কোন সাহাবী খুঁজে পাওয়া যাবে না। শুধু অংক, বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, অর্থনীতি, চিকিৎসাবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানার্জনে তাই মুসলমানের ্চলে না, ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার জন্য তাকে অহির জ্ঞান (কোরআন) এবং হাদীসের জ্ঞানও অবশ্যই শিখতে হয়। এ ফরয আদায় না হলে যেমন তার ঈমান-আমল বিশুদ্ধ হয় না তেমনি আখেরাতে নাযাত প্রাপ্তির কাজ সহজ হয় না। এ ফরযের ক্বাযা নেই। মুসলিম দেশের সরকারের দায়িত্ব, দেশের মুসলিম নাগরিকদের এ ফরয আদায়ের ব্যবস্থা করা। সরকারের এটি মৌলিক দায়িত্ব। কাফের দেশের সরকার থেকে একটি মুসলিম দেশের মৌলিক পার্থক্য এখানেই। এ দায়িত্ব পালনে অতীতে মুসলিম সরকারগুলি বড় বড় মাদ্রাসা গড়েছে। মাদ্রাসা খরচ নির্বাহের জন্য বিশাল বিশাল ওয়াক্ফ স্টেটের ব্যবস্থা করেছে।

 

সাধারণ নাগরিক নিজ উদ্যেগে খাদ্যবস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে পারে, কিন্ত জ্ঞানার্জনের এ ফরয আদায়ে ঘরে ঘরে মাদ্রাসা খুলবে,  সিলেবাস প্রণয়ন বা বই রচনা করবে সেটি কি সম্ভব? আর নাগরিকগণ সে দায়িত্ব নিলে সরকারের কাজটি কি? তাহলে সরকারকে কেনই বা তারা রাজস্ব দিবে? অথচ বাংলাদেশ ১৩ কোটি মুসলমানের দেশ হওয়ার সত্ত্বেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মুসলমানের সে ফরয আদায়ে কোন ব্যবস্থাই নেয়নি। সেকুলার শিক্ষার পাশাপাশি দ্বীনিয়াতের কিছু পৃষ্ঠা বাড়িয়ে ইসলামি জ্ঞানার্জনের ফরয আদায় হয় না। যেমন বিষের সাথে কয়েক চামচ সরবত পানে স্বাস্থ্য বাঁচে না। এমন দুষিত শিক্ষায় পুষ্টি পায় না ঈমান। অথচ বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটিই চালু রয়েছে। ফলে এ শিক্ষায় পূর্ণ-মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাটি নিশ্চিত হচ্ছে না। বরং সেকুলার শিক্ষার মাধ্যমে ইসলামের প্রতি অনীহা ও বহু ক্ষেত্রে ঘৃণাও সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে মুসলমানের রাজস্ব ব্যয় হয়েছে তার নিজ সন্তানকে জাহান্নামের দিকে ধাবিত করার কাজে। সরকারের এ ব্যর্থতার বিরুদ্ধে কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি চুপ থাকতে পারে? চিকিৎসার নামে বিষ পান হলে প্রতিবাদ হয়। অথচ বিদ্যাশিক্ষার নামে ব্যাপক হারে ঈমান নাশ হচ্ছে বিদ্যালয়ে। কিন্তু তা নিয়ে প্রতিবাদ নেই। প্রতিরোধও নেই। অথচ শিক্ষা যথার্থ হলে সেটি ছাত্রকে অনৈসলামিক চিন্তা ও ধ্যানধারণা থেকে বাঁচতে পারতো, দিতে পারতো দূর্নীতির বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ ক্ষমতা। পাপাচারের স্রোতে না ভেসে ও দূর্নীতিতে রেকর্ড না গড়ে প্রবল ঈমান নিয়ে তখন শক্ত ভাবে সে দাঁড়াতে পারতো। ভ্যাকসিন যেমন শিশুকে বাঁচায় মৃত্যুর হাত থেকে, এবং দেয় রোগভোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার এটি এক ভয়ানক দিক। এ ব্যর্থ শিক্ষাব্যবস্থা বিপন্ন করছে সন্তানদের মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাকে। এটি পরিণত হয়েছে তাগুতের বা শয়তানের একটি মোক্ষম হাতিয়ারে। (লন্ডনস্থ্য ‘ফাউন্ডেশন ফর কোয়ালিটি এডুকেশন’ এর সেমিনারে যে লেখাটি মূল প্রবন্ধ রূপে পেশ করা হয় এটি তার প্রথম ভাগ)

 

 

 



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Sunday, 13 October 2013 13:32
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.