Home •শিক্ষা ও প্রচার মাধ্যম যে শিক্ষা জাতিকে শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে

Article comments

যে শিক্ষা জাতিকে শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 01 January 2011 18:23

শিক্ষার লক্ষ্য নিছক স্বাক্ষর-জ্ঞান বা পড়ালেখার সামর্থ বৃদ্ধি নয়। তথ্য ও তত্ত্ব জানানোও নয়। বিজ্ঞান বা কারগরি জ্ঞানে দক্ষ করাও নয়। বরং সেটি হলো ব্যক্তির ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করা। তাকে মানবিক গুণে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। তখন ব্যক্তির বিশ্বাস, দর্শন ও রুচীবোধই শুধু পাল্টে যায় না, পাল্টে যায় তার কর্মকান্ড, আচার-আচরণ ও চিরায়ত অভ্যাস। অসভ্য ও অসুন্দর মানুষ থেকে শিক্ষিত মানুষ তখন ভিন্নতর মানুষে পরিণত হয়। শিক্ষার মাধ্যমে জাতি এ ভাবেই পায় পরিশীলিত, সভ্য ও সুন্দর চরিত্রের মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশ তাই পায়নি। এ ব্যর্থতা গলাবাজি করে ঢাকা যাবে না। দেশজুড়ে সন্ত্রাস, অরাজকতা ও দূর্নীতিতে দেশটির বিশ্বে প্রথম অবস্থান যে সত্যটি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেয় সেটি হলো, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা জাতিকে শিক্ষিত করতেই ব্যর্থ হচ্ছে। তথাকথিত এ শিক্ষা শুধু দূর্নীতিই বাড়ায়নি, বাড়িয়েছে পরনির্ভরতাও। মেরুদন্ড গড়ার বদলে সেটিকে বরং পঙ্গু করছে। ব্যক্তির নিজেকে জানতেও এটি তেমন সাহায্য করছে না।

 

অথচ প্রতিটি ব্যক্তির গভীরে যে সম্পদ লুকিয়ে আছে তা সোনার খনির বা তেলের খনির চেয়ে কোন অংশে তুচ্ছ নয়। শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় এবং উন্নততর সভ্যতার নির্মাণে বস্তুতঃ এ মানবিক সম্পদই মূল। অন্যসব সম্পদের প্রাচুর্য আসে এ সম্পদের ভিত্তিতেই। তাই উন্নত জাতিসমূহ শুধু মাটি বা সাগরের তলাতেই অনুসন্ধান করে না, বরং মানুষের গভীরেও আবিস্কারে হাত দেয়। মানুষের নিজ শক্তি আবিস্কৃত না হলে প্রাকৃতিক শক্তিতে তেমন কল্যাণ আসে না। তাই আফ্রিকার সোনার খনি বা আরবদের তেলের খনি সে এলাকার মানুষকে উপহার দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শোষন ও মানবেতর স্বৈরাচার। অথচ নবী পাক (সাঃ) মানুষকে সভ্যতর কাজে ও সভ্যতার নির্মানে ব্যক্তির সুপ্ত শক্তির আবিস্কারে হাত দিয়েছিলেন। ফলে মানব-ইতিহাসের বিস্ময়কর মানুষে পরিণত হয়েছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। ফেরেশতাদের চেয়েও তারা উঁচুতে উঠতে পেরেছিলেন। তবে বীজ থেকে অঙ্কুরোদগমের জন্য চাই উপযুক্ত মাটি, পানি ও জলবায়ু। নইলে তা থেকে চারা গজায় না, বৃক্ষও বেড়ে উঠে না। তেমনি ব্যক্তির সুপ্ত শক্তি ও সামর্থের বেড়ে উঠার জন্যও চাই উপযুক্ত পরিবেশ। সেরূপ একটি পরিবেশ দিয়ে সাহায্য করাই বিদ্যালয়ের মূল কাজ। তখন জেগে উঠে ব্যক্তির ঘুমন্ত বিবেক। বেড়ে উঠে তার ব্যক্তিত্ব। বিদ্যালয়ে এ কাজ না হলে তখন দেহ হত্যা না হলেও নিহত হয় শিশুর সুপ্ত সৃষ্টিশীল সামর্থ। তখন বিদ্যালয় পরিণত হয় বিবেকের বধ্যশালায়। তখন মানুষ পরিণত হয় নিজেই নিজের বিবেক ও প্রতিভার কবরস্থানে। বাংলাদেশের বিদ্যালয়ে এভাবেই খুণ হচেছ বহু খালেদ, তারেক, ইবনে সিনা, ফারাবী, তারাবীর ন্যায় প্রতিভা। তবে বিপদ শুধু প্রতিভার হত্যাকান্ডতেই নয়। জমিতে ফসল না ফলালে যেমন বিপদ বাড়ে আগাছার তান্ডবে, তেমনি সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের আবাদ না বাড়ালে সেখানে বেড়ে উঠে দুর্বৃত্তরা। বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে অতি ব্যাপক ভাবে। দেশেটির আজকের বিপদের মূল হেতু এখানেই। এÍা যে শুধু পতিলাপল্লি, জোয়ার আসর ও ড্রাগের বাবসা দখলে নিয়েছে তাই নয়, রাজনীতি, অফিস আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির উপরও আধিপত্য জমিয়েছে। বাংলাদেশ দূর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম এটি নিছক চোর-ডাকাত বা রাস্তার সন্ত্রাসীদের কারণে নয়, বরং দুর্বৃত্তদের দখলদারি দেশের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে।
পশু থেকে মানুষ পৃথক তার চেতনার কারণে। এ চেতনা দেয় চিন্তা-ভাবনার সামর্থ। এবং এ চিন্তা-ভাবনা থেকেই ব্যক্তি পায় সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় এবং ধর্ম-অধর্ম বেছে চলার যোগ্যতা। মহৎ মানুষ রূপে বেড়ে উঠার জন্য এটি এতই গুরুত্বপুর্ণ যে পবিত্র কোরআনে বার বার বলা হয়েছে, ‘আফালাতা’কীলুন’, ‘আফালাতাদাব্বারূন’ ‘আফালাতাফাক্কারুন’ বলে। অর্থঃ ‘তোমরা কেন চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগাও না?’ ‘তোমরা কেন ধ্যানমগ্ন হও না?’, ‘তোমরা কেন ভাবনা?’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণ তাই দৈহিক বল নয় বরং তার চিন্তাভাবনার সামর্থ। চিন্তার সামর্থ অর্জিত হলে নিজেকে শিক্ষিত করার কাজে সে শুধু সুশীল ছাত্র রূপেই বেড়ে উঠে না, নিজেই নিজের শিক্ষকে পরিণত হয়। এমন ব্যক্তির জীবনে শেখা এবং শেখানো এ দুটোই তখন সমানে এগুয়। ঈমানদার তাই সর্বাবস্থাতেই যেমন ছাত্র, তেমনি শিক্ষকও। ফুলে ফুলে ঘুরে মধুসংগ্রহ যেমন মৌমাছির ফিতরাত, তেমনি সর্বমুহুর্তে ও সর্বস্থলে জ্ঞানার্জন ও জ্ঞান-দানের ফিতরাত হলো প্রকৃত জ্ঞানীর। তখন জ্ঞানের সন্ধানে সাগর, মরুভুমি, পাহাড়-পর্বত অতিক্রমেও সে পিছপা হয়না। বিদ্যালয়ের কাজ সে ফিতরাতকে জাগ্রত করা। শিক্ষকের দায়িত্ব এটিকে শুধু বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি কোনে পৌঁছে দেয়া। তখন সমগ্র দেশ পরিণত হয় পাঠশালায়। নবীজীর আমলে সেটিই হয়েছিল। ফলে সে সময় কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলেও যে হারে ও যে মাপে জ্ঞানী ব্যক্তি সৃষ্টি হয়েছিলেন মুসলিম বিশ্বের শত শত বিশ্ববিদ্যালয় আজ তা পারছে না। সে আমলে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব একজন গৃহবধু যতটুকু বুঝতেন এ আমলের প্রফেসরও তা বুঝেন না। এবং সে প্রমাণ ইতিহাসে প্রচুর। শিশু আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)এর মাতা জীবনের সকল সঞ্চয় শিশুপুত্রের জামার আস্তিনে বেঁধে ইরানের গিলান প্রদেশ ছেড়ে হাজার মাইল দূরের বাগদাদে পাঠিছিলেন। অথচ সে সময় আধুনিক যানবাহন ছিল না। পথে ছিল ডাকাতের ভয়, যার কবলে তিনি পড়েছিলেনও। মুসলমানগণ তাদের গৌরব কালে জ্ঞানার্জনকে কতটা গুরুত্ব দিতেন এটি হলো তারই নমুনা। অথচ আজ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জ্ঞানদানের কাজে ফাঁকি দিয়ে বিদেশী সংস্থায় কাজ করেন। মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ভবিষ্যৎ ডাক্তার তৈরীর কাজে ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে বসে অর্থ কামাই  করেন। তারা নিজ সন্তানের ধর্মজ্ঞান দানে এতই উদাসীন যে, সে লক্ষ্যে হাজার মাইল দূরে দূরে থাক, পাশের অবৈতনিক মাদ্রাসাতেও পাঠাতে রাজি নন।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আরেক ব্যর্থতা, শিক্ষককে যেমন প্রকৃত শিক্ষক রূপে গড়ে তুলতে পারেনি, তেমনি ছাত্রকে গড়ে তুলতে পারিনি প্রকৃত ছাত্র রূপে। নিছক পড়ন, লিখন বা হিসাব-নিকাশ শিখিয়ে সে আগ্রহ সৃষ্টি করা যায় না। এজন্য ব্যক্তির বিশ্বাস ও দর্শনে হাত দিতে হয়। নবীজীর (সাঃ) আগমনে আরবের আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন আসেনি তাদের দৈহিক বল বা খনিজ সম্পদে। বরং বিপ্লব এসেছিল তাদের জীবন-দর্শনে। সে দর্শন পাল্টে দিয়েছিল বাঁচবার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও রূচীবোধ। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় লিখন, পড়ন বা হিসাব-নিকাশ গুরুত্ব পেলেও গুরুত্ব পায়নি দর্শন। ফলে জীবন পাচেছ না সঠিক দিক-নির্দেশনা। পুষ্টি পাচ্ছে না শিক্ষার্থীর বিবেক ও চেতনা। পাচ্ছে না সুষ্ঠ চিন্তার সামর্থ। অথচ জাতি আদর্শ নেতা, বুদ্ধিজীবী, সংস্কারকের সরবরাহ পায় দর্শনসমৃদ্ধ সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের থেকে; পেশাজীবী, কর্মজীবী বা টেকনোক্রাটদের থেকে নয়। দর্শনের প্রতি অবহেলায় মানুষ নিছক নকল-নবীশে পরণিত হয়। বাংলাদেশে উন্নত বিবেকবোধ, মূল্যবোধ ও  সংস্কৃতি বেড়ে না উঠার অন্যতম কারণ হলো এটি। তাছাড়া জ্ঞান শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে আছে বিশ্বব্রম্মান্ডের প্রতি পরতে। চন্দ্র-সূর্য, গ্রহনক্ষত্রই শুধু নয়, গাছপালা, জীবজন্তু, নদীনালা, অনুপরমানু তথা দৃশ্য-অদৃশ্য প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে আছে জ্ঞানের উপকরণ। কোরআনেরর ভাষায় এগুলি হলো আল্লাহর আয়াত। যা পড়তে হয় শুধু চোখের আলাতে নয়, মনের আলোতেও। ইসলাম তাই আলোকিত মনের মানুষ গড়তে চায়। তখন সমগ্র বিশ্বটাই পাঠশালা মনে হয়। এ পাঠশালারই শিক্ষক ছিলেন নবীপাক (সাঃ)। জ্ঞান বিতরণে ও মানুষকে চিন্তাশীল করার কাজে আল্লাহর এ আয়াতগুলিকে তিনি কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছেন। সেখান থেকেই গড়ে উঠেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানসাধকগণ। জীবনের মূল পরীক্ষায় তথা মহান আল্লাহকে খুশী করার কাজে তাঁরাই মানব-ইতিহাসে সর্বাধিক সফল হয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে তাঁদের নিয়ে তিনি গর্বও করেছেন। এমন কি সক্রেটিস যে পাঠশালার শিক্ষক ছিলেন সেটিও আজকের মত কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। সেটিও ছিল এথেন্সের উম্মূক্ত অলিগলি ও মাঠঘাট। অথচ জ্ঞানচর্চায় তিনিও অবিস্মরণীয় ইতিহাস গড়েছেন। জ্ঞানবিতরণে জ্ঞানকেন্দ্রের চেয়ে শিক্ষকই যে মূল সেটি তিনিও প্রমাণ করে গেছেন। অথচ আমরা বিদ্যালয় গড়ে চলেছি যোগ্য শিক্ষক না গড়েই। যা ডাক্তার না গড়ে হাসপাতাল চালানোর মত। সমাজের অযোগ্য মানুষগুলোর ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করতে গিয়ে এরিস্টটল বলতেন, “এটি ঐখানে তথা বিদ্যালয়ে, যেখানে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।” অথচ বাংলাদেশে সকল ব্যর্থতার কারণ খোঁজা হচ্ছে অন্যত্র। শিক্ষার বিস্তারে শিক্ষককে প্রথমে শিক্ষিত করতে হয়। শুধু জ্ঞানদাতা হলেই চলে না, প্রতিটি শিক্ষককে ছাত্রদের সামনে অনুকরণীয় মডেলও হতে হয়। এটি নিছক বাড়তি দায়িত্ব নয়, এটিই শিক্ষকের মৌলিক দায়িত্ব। ফলে যে চরিত্র নিয়ে প্রশাসনের কর্মচারি, বিচারক বা ব্যবসায়ী হওয়া যায়, শিক্ষককে তার চেয়েও উত্তম চরিত্রের অধিকারি হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি যথার্থ ভাবে হয়নি। দেশে নিদারুন কমতি হলো উপযুক্ত শিক্ষকের। শিক্ষকের যে স্থানটিতে বসেছিলেন নবীপাক (সাঃ) স্বয়ং নিজে, সেখানে প্রবেশ করেছে বহু নাস্তিক, পাপাচারি ও চরিত্রহীনেরা। ফলে ছাত্ররা শুধু জ্ঞানের স্বল্পতা নিয়েই বেরুচ্ছে না, বেরুচ্ছে দুর্বল চরিত্র নিয়েও।

ইতিহাস ঘেঁটে ছাত্রের সামনে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব বা ‘ফিগার অব হাইনেস’ তুলে ধরা শিক্ষানীতি ও শিক্ষকের অন্যতম দায়িত্ব। মডেলকে সামনে রেখে শিল্পি যেমন ছবি আঁকে, ছাত্রও তেমনি তার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বকে সামনে রেখে স্বচেষ্ট হয় নিজেকে গড়ার। এরূপ মডেল নির্বাচনে প্রতি দেশেই নিজ নিজ ধর্মীয় চেতনা ও জাতীয় ধ্যানধারণা গুরুত্ব পায়। গরুকে দেখে যেমন ভেড়ার ছবি আঁকা যায় না, তেমনি অমুসলমান রাজনীতি বা কবি সাহত্যিক বা বুদ্ধিজীবীকে সামনে রেখে ছাত্রও নিজেকে মুসলিম রূপে গড়ে তুলতে পারে না। পাশ্চাত্য দেশে এজন্যই নিজ নিজ ইতিহাস থেকে খ্যাতিনামা বীর, ধর্মীয় নেতা, সমাজসংস্কারক, বৈজ্ঞানিক, রাজনীতিবিদ, কবিসাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের তুলে ধরে, মুসলিম ইতিহাস থেকে নয়। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা ও অপরাধ এদিক দিয়ে কম না। দেশটির ভাষাভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদের ব্যর্থতা শুধু এ নয় যে, জাতীয় জীবনে উন্নয়ন উপহার দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং জাতিকে প্রচন্ড ভাবে অহংকারিও করেছে। আহত ও দুর্বল করেছে প্যানইসলামি চেতনাকে। ফলে জাতীয় জীবনে গুরুত্ব হারিয়েছেন ইসলামের মহান ব্যক্তি ও বীরপুরুষগণ। ফলে ছাত্ররা হারিয়েছে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব বা ‘ফিগার অব হাইনেস’ এর মডেল। নিছক বাঙ্গালী হওয়ার কারণে অতিশয় দুর্বল ও সামান্য চরিত্রগুলোকে বড় করে দেখানো হয়েছে। নিছক রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে কোন কোন ব্যক্তিকে হাজার বছরের সেরা বাঙ্গালী রূপেও চিত্রিত করা হয়েছে। অথচ তাদের অনেকে যেমন ছিলেন মিথ্যাচারি ও খুনি, তেমনি ছিলেন নিষ্ঠুর স্বৈরাচারিও। ফলে চরিত্র গঠনের টার্গেট রূপে জাতি কোন উন্নত মডেলই পায়নি। ফলে ছাত্ররা কাদের অনুসরণ করবে? শূণ্যস্থান কখনই শূণ্য থাকে না, ফলে সে শূণ্যতা পূরণ করেছে কিছু দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদ, সন্ত্রাসী ও ব্যাভিচারি ব্যাক্তি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে সন্ত্রাস, ছিনতাই ও ব্যাভিচারির অভয় অরন্যে। এ ব্যর্থতারই বড় প্রমাণ, সেখানে ধর্ষনে সেঞ্চুরি-উৎসবও হয়েছে।

শিক্ষা-সংস্কারের লক্ষ্যে বাংলাদেশে অতীতে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। বহু শিক্ষা-কমিশন রিপোর্টও রচিত হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজে কিছুই হয়নি। ব্যর্থতার জন্য দায়ী নিছক সরকারি বা বেসরকারি দল নয়, সবাই। কারণ, কারো পক্ষ থেকেই দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালিত হয়নি। এ ব্যর্থতার কারণ, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ও দর্শন শিখাতেই আমরা ব্যর্থ হয়েছি। মূসলমান নামধারিরাও এটিকে ইবাদত ভাবেনি। তারাও জ্ঞানার্জনকে ফরজ জ্ঞান করেনি। শিক্ষকরা এটিকে যেমন উপার্জনের মাধ্যমে ভেবেছেন, তেমনি ছাত্রদের কাছে এটি পরিণত হয়েছে কোনরূপে সার্টিফিকেট লাভের উপায় রূপে। ফলে ফাঁকিবাজি হয়েছে উভয় দিক থেকেই। চিকিৎসায় ফাঁকিবাজি হলে যেমন রোগী বাঁচে না, তেমনি শিক্ষায় ফাঁকিবাজি হলে জাতি বাঁচে না। শিক্ষাক্ষেত্রের এ ব্যর্থতা থানা-পুলিশ বা আইন-আদালত দিয়ে দূর করা যায় না। তাই বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা এখন শিক্ষা সমস্যা। ভূল চিকিৎসায় কোন রোগী মারা গেলে তা নিয়ে আন্দোলন হয়। অথচ বিস্ময়ের বিষয়, ভূল শিক্ষায় সমগ্র জাতি যেখানে বিপদগ্রস্ত তা নিয়ে আন্দোলন দূরে থাক উচ্চবাচ্যও নেই। মূমূর্ষ ব্যক্তির যেমন সে সামর্থ থাকে না তেমনি অবস্থা যেন জাতিরও। আর এটি হলো নৈতিক মুমূর্ষুতা।

বাংলাদেশের এ নাজুক অবস্থায় যারা শিক্ষার সংস্কারে আগ্রহী তাদের শুধু প্রতিষ্ঠান গড়লে চলবে না। হাত দিতে হবে আরো গভীরে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মানের লক্ষ্যে এটিকে হতে একটি পরিপূর্ণ আন্দোলন। শিক্ষা নিজেই কোন উদ্দেশ্য নয়। বরং এটি একটি উদ্দেশ্যকে সফল করার মাধ্যম মাত্র। তার তা হলো ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। মুসলমানের শিক্ষা এজন্য নিছক শিক্ষার খাতিরে শিক্ষা নয়, উপার্জন বাড়ানোর লক্ষ্যেও নয়। বরং এটি হলো, জীবনের মূল পরীক্ষায় পাশের মাধ্যম। তাই মুসলমানের জীবনে ইবাদত হলো শিক্ষাদান ও শিক্ষালাভ। অমুসলমানদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে মুসলমানদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধানতম পার্থক্য বস্তুতঃ এক্ষেত্রটিতে। অথচ শিক্ষার এ মূল দর্শনটিই বাংলাদেশে তেমন আলোচিত হয়নি। বরং প্রভাব বিস্তার করে আছে সেকুলার দর্শন ও চেতনা। তাই শিক্ষা সংস্কারে কাজ  শুরু করতে হবে শিক্ষার এ মূল দর্শন থেকে। কেন শিখবো, কেন শেখাবো এবং কেন এটিকে আমৃত্যু সাধনা রূপে বেছে নেব - এসব  প্রশ্নের উত্তর অতি সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠ ভাবে দিতে হবে। এটি যে পেশা নয়, নেশাও নয় বরং ফরজ ইবাদত সেটিও ছাত্র ও শিক্ষকের মনে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হতে হবে। এবং সেটি বুঝাতে হবে মানব সৃষ্টির মূল-রহস্য ও দর্শনকে বোঝানোর মধ্যে দিয়ে। আলোকিত করতে হবে ব্যক্তির বিবেককে। জ্ঞানচর্চার এ অঙ্গণে ব্যর্থ হলে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের কোন অঙ্গণেই যে বিজয় সম্ভব নয় সেটি ধারনাটিও স্পষ্টতর করতে হবে।

 

মনে রাখতে হবে, জাতীয় জীবনে আমাদের বাঁচবার মূল যুদ্ধটি হবে শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানেই, সীমান্তে নয়। বরং সত্যতো এটাই, সে লড়াইটি ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে। আরো বিপদের কারণ, এ লড়াইয়ে আমরা লাগাতর হেরেই চলেছি। ফলে বিধ্বস্ত হতে চলেছে জাতির মনবল। এমনকি দেশের ভিতরে ও বাইরে গুঞ্জন উঠেছে স্বাধীন দেশরূপে বাংলাদেশের টিকে থাকার সামর্থ নিয়ে। তাই এখন এটি টিকে থাকার লড়াই। এ লড়ায়ে হেরে গেলে হারিয়ে যেতে হবে ইতিহাস থেকে। বাঁচতে হলে বা জিতলে হলে হাত দিতে হবে শিক্ষার আশু সংস্কারে। নির্মান করতে হবে জাতির মেরুদন্ড। শুধু সরকারি ভাবে নয়, বেসরকারি ভাবেও। শিক্ষার সংস্কারে প্রথমে যেটি সুস্পষ্ট করতে হবে তা হলো, জাতি হিসাবে আমরা কোন পরিচয়ে বেড়ে উঠতে চাই। ধর্মনিরপেক্ষ বাঙ্গালী না মুসলিম রূপে। এটি আমাদের জাতীয় জীবনের মূল প্রশ্ন। কারণ, শিক্ষার মূল দর্শন ও দিক-নির্দেশনা আসবে সে বিবেচনা থেকেই। এ যাবত যে চেষ্টা হয়েছে সেটি হলো, সেকুলার বাঙ্গালী রূপে বেড়ে উঠার চেষ্টা। আমরা আজ যেখানে পৌঁছেছি সেটি সেই সেকুলার বাঙ্গালী হওয়ার নিরসল চেষ্টাতেই। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাঙ্গালীর সাহিত্য-সংস্কৃতি, পত্র-পত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশন বস্তুতঃ এ যাবত সে লক্ষেই কাজ করেছে। কিন্তু সেটি কোন মহৎ লক্ষে আমাদের পৌঁছায়নি। তাছাড়া বাঙ্গলী রূপে বিরাট কিছু হতে পারলেও আমাদের জীবনের মূল পরীক্ষায় তাতে পাশ জুটতো না। এভাবে অর্জিত হতো না, মহান আল্লাহ পাক আমাদের যে জন্য সৃষ্টি করেছেন সেটিও। বিচার দিনে যে হিসাব আমাদের দিতে হবে সেটি হলো মুসলমান রূপে আমাদের সফলতা কতটুকু সেটি। বাঙ্গালী-অবাঙ্গালীর পরিচয় সেখানে অর্থহীন। মুসলমানের শিক্ষার মূল লক্ষ্য, পরকালের সে সফলতাকেই নিশ্চিত করা। এটুকু নিশ্চিত না হলে নিছক ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, আইনজ্ঞ, বিজ্ঞানী, শিক্ষক বা অন্য কোন পেশায় সফল ভাবে বেড়ে ঊঠায় কল্যান নেই। নিছক পেশাদারি সাফল্যে হয়তো সচ্ছল ভাবে বাঁচা যায়, কিন্তু তাতে মূল পরীক্ষায় সফলতা জুটে না। আমাদের হারাম-হালাল ও আচার-আচরণ যে অন্যদের থেকে ভিন্ন সেটি তো এই ইসলামি চেতনার কারণেই। সেকুলার বাঙ্গালী রূপে বেড়ে উঠার মধ্যে যে কোন কল্যাণ নেই সেটি বলিষ্ঠ প্রত্যয়ে পরিণত করতে হবে। এ লক্ষ্যে অর্থব্যয় যে হারাম ও অতি বিপদজনক সেটি জনমলে বদ্ধমূল করতে হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আমাদের জন্য কল্যানকর করতে হলে সেটি হতে হবে পরিপূণ ইসলামের আলোকে। হালাল-হারামের ক্ষেত্রে যেমন আপোষ চলে না তেমনি আপোষ চলে না ইসলামি শিক্ষা লাভের ফরজ আদায়ে। নইলে অনর্থক হবে শিক্ষার নামে হাজার হাজার কোটি টাকার সমুদয় অর্থব্যয় ও শ্রমব্যয়। এর সাথে সংশ্লিষ্টতা শুধু দুনিয়াবি অকল্যাণই বাড়াবে না, জাহান্নামের মহা আযাবে নিয়েও হাজির করবে। লন্ডন ১০/১২/০৪
লন্ডনস্থ্য ‘ফাউন্ডেশন ফর কোয়ালিটি এডুকেশন’ এর সেমিনারে এটি মূল প্রবন্ধ রূপে পেশ করা হয়, (প্রবন্ধের ২য় ভাগ)

 



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.