Home •শিক্ষা ও প্রচার মাধ্যম ইসলামি শিক্ষার বিশ্বজনীনতা ও আজকের মুসলমান

Article comments

ইসলামি শিক্ষার বিশ্বজনীনতা ও আজকের মুসলমান PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 01 January 2011 21:34

কূয়ার ব্যাঙ বদ্ধকূপে আজীবন কাটিয়ে দিতে পারে। কিন্তু যার বাঁচাটাই সমাজ, রাষ্ট্র, উম্মাহ ও সমগ্র মানবজাতির কল্যাণচিন্তা নিয়ে, কূয়ার বদ্ধজীবন তাঁর বাঁচাটাই অর্থহীন করে। শিক্ষা ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ব্যক্তিকে এমনই এক বদ্ধ, পঙ্গু ও অকার্যকর জীবন উপহার দিতে পারে। ইসলামের আগমন সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে। ইসলামের নবী হযরত মহম্মদ (সাঃ)সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত। আল্লাহতায়ালা চান তার দ্বীনকে সকল ধর্মের উপর বিজয়ী হোক। সত্যদ্বীনসহ নবী প্রেরণের লক্ষ্য যে কারণটি তিনি পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করেছেন তা হলো, “লি ইউযহিরারাহু আলাদ্দীনে কুল্লিহি” যেন সে দ্বীন সকল  ধর্মের উপর প্রবল ভাবে ছেয়ে যায় বা বিজয়ী হয়। ফলে শুরু থেকেই ইসলাম বিশ্বজনীন।

 

মহান আল্লাহর লক্ষ্য নিছক একটি দেশের মানুষকে পথ দেখানো নয়, তিনি চান সমগ্র মানব জাতি সত্যপথ পাক। তাই মুসলমানের ভাবনাও নিছক একটি দেশের মানুষকে নিয়ে নয়, বরং সমগ্র বিশ্ববাসীকে নিয়ে। তাই মুসলমানের রাজনীতি ও ধর্মনীতির সাথে শিক্ষানীতিতেও বিশ্বজনীনতা এসে যায়। “চীন ও আরব হামারা, হিন্দুস্তান হামারা, মুসলিম হ্যায় হাম, সারা জাহান হামারা”- ঈমানের এ প্রতিধ্বণি শুধু আল্লামা ইকবালের একার নয়, প্রতিটি ঈমানদারের। এ বিশ্ব মহান আল্লাহর, আল্লাহর খলিফা রূপে মুসলমানের দায়ভারও তাই বিশ্বব্যাপী। ফলে আনসারুল্লাহ তথা আল্লাহর সাহায্যকারী রূপে মুসলমানের কাজই হলো, মহান আল্লাহর মিশনের সাথে পুরাপুরি একাত্ম হওয়া। বিভিন্ন ভাষা, ভূগোল বা বর্ণের নামে গড়া বিভক্তির প্রাচীর দিয়ে দায়িত্বপালনের সে সীমানা সীমিত করা যায় না। খন্ডিতও করা যায়না। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ তাই তাদের কর্মসীমা আরবের মাঝে সীমিত রাখেননি। তাঁরা দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছেন দেশে দেশে। তারা শুধু নিজেদের ঘরকেই আলোকিত করেননি, আলোকিত করেছেন বিশাল এলাকার মানুষের। যে ভূমিতে জন্ম নিয়েছেন এবং সেখানেই মৃত্যু বরণ করেছেন -এমন সাহাবার সংখ্যা এজন্যই অতি নগন্য। যে মুসলমানের ভাবনা ও বাঁচবার মিশনই বিশ্ববাসীকে ঘিরে, সে তার শিক্ষাকে নিজ দেশ, নিজ মজহাব বা নিজ ভাষার মাঝে সীমিত রাখে কি করে? তাই বিশ্বজনীনতা নিছক মুসলমানের ঈমান-আক্বীদার বিষয় নয়। এটি যেমন তার রাজনীতি ও ধর্মনীতির বিষয়, তেমনি শিক্ষার বিষয়ও। মানুষের মনের গভীরে বিভক্তির দেয়ালগুলো গড়ে উঠার মূল কারণ তো দল, ফেরকা ও মজহাব-ভিত্তিক সংকীর্ণ শিক্ষা। মুসলমানগণ তাদের গৌরবকালে মাদ্রাসায় বসে কাফেরদের লেখা বইও পড়েছেন। কিন্তু শিক্ষায় সংকীর্ণতার কারণে মুসলমানের মনের সে সামর্থ অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। অমুসলমানদের বই পড়া দূরে থাক,ভিন্ন মজহাবের বিখ্যাত আলেমদের বইও তারা পড়তে চাননা। নিজ মাদ্রাসার লাইব্রেরীতেও রাখেন না।

 

মহান আল্লাহতায়ালা চান,মানুষ ইনসানে কামেল তথা পরিপূর্ণ মানুষ রূপে বেড়ে উঠুক। ইনসানে কামেল হওয়ার অর্থ এ নয়, রাজনীতি, সমাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পেশাদারি কাজকর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে ব্যক্তি তার নিজস্ব খানকায়ে বন্দী থাকবে এবং নিছক জমিনের দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে মসজিদ এবং মসজিদ থেকে ঘরে ফিরবে। আল্লাহর নবী (সাঃ) সমাজ-সংসার, রাষ্ট্রীয় ও আর্ন্তজাতিক জগত থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন আল্লাহতায়ালার মহান রাসূল, তেমনি ছিলেন ব্যস্ত রাষ্ট্রপ্রধান, ছিলেন আদর্শ জেনারেল, ছিলেন বিচারক, ইমাম, রাজনীতিবিদ, সমাজবিদ, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ধর্ম-প্রচারক, আদর্শ স্বামী, আদর্শ পিতা ও আদর্শ প্রতিবেশী। ধর্মপ্রচার ও ধর্মশিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি লাগাতর ব্যস্ত থেকেছেন যুদ্ধবিগ্রহ ও রাজনীতি নিয়ে। শত্রুর কর্মকান্ডের উপর নজরদারীর পাশাপাশি তাদের বিরদ্ধে তিনি যুদ্ধও সংগঠিত করেছেন। সর্বার্থেই তিনি ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষ তথা ইনসানে কামেল। আর এমন মানুষ হওয়ার জন্য অপরিহার্য হলো জ্ঞানের তথা শিক্ষার বহুমুখীতা। একমুখী জ্ঞান বা অপূর্ণাঙ্গ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কামেল ইনসান হওয়া অসম্ভব। এমন একমুখী জ্ঞানের ব্যক্তিরাই পরিণত হয় ইনসানে নাকেছ তথা অপুর্ণাঙ্গ মানুষে। মুসলমানদের পতন ও পরাজয়ের মূল কারণ, তাদের সম্পদের বা জনসংখ্যার কমতি নয়। বরং সেটি হলো, নবীজী (সাঃ)র আদর্শে তারা পূর্ণাঙ্গ মানুষ রূপে বেড়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি যারা আলেম-উলামা ও মাশায়েখ রূপে পরিচিত তাদের ব্যর্থতাও এক্ষেত্রে কম নয়। তারাও বেড়ে উঠেছে, ইনসানে নাকেস বা অপূর্ণাঙ্গ মানুষ রূপে। ধর্মীয় শাস্ত্র চর্চায় কিছু ভূমিকা রাখলেও, রাজনীতিবিদ, যোদ্ধা, জেনারেল সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, গবেষক ও ধর্মপ্রচারক  হিসাবে তাদের ভূমিকা চোখে পড়ার মত নয়। ফলে মুসলিম বিশ্বে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা বিপুল ভাবে বাড়লেও বাড়েনি কামেল মানুষের সংখ্যা। বরং বেড়েছে অশিক্ষিত, কুশিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত ও শিক্ষিত নামের একমুখী অপূর্ণাঙ্গ বা বিকলাঙ্গ মানুষের সংখ্যা।  আর এমন অপূর্ণাঙ্গ বা বিকলাঙ্গ মানুষ দিয়ে কি সুস্থ্য ও শক্তিশালী উম্মাহ গড়ে তোলা যায়? যায় কি পরাজয় ও পতন এড়ানো? মটরগাড়ীর ইঞ্জিন অপূর্ণাঙ্গ হলে সেটি এক কদমও সামনে এগুয় না। তেমনি অপূর্ণাঙ্গ মানুষ দিয়েও রাষ্ট্র বা সমাজের অগ্রগতি আসে না। দূর্নীতিতে বার বার বিশ্বে প্রথম হওয়াই প্রমাণ করে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশের ব্যর্থতা কতটা গভীর ও ভয়ানক।   

     

শত শত বছর ব্যাপী মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবনেই তারা ব্যর্থ হয়েছে। নইলে শত শত বছর ধরে বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশের শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশী মানুষ নিরক্ষর থাকে কি করে? অশিক্ষাই যে বড় পাপ এবং এ পাপ যে মানুষকে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাকে অসম্ভব করে তোলে সেটুকুও তাদের জানা হয়নি। রাষ্ট্রের ও সমাজের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব যে এ পাপ থেকে মানুষকে মূক্তিদান সেটিও যথাযথ পালিত হয়নি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ একা নয়। গুটিকয়েক ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ মুসলিম দেশের একই অবস্থা। কাফেরদের তুলনায় অধিকাংশ দেশের মুসলমানেরা আজও পিছিয়ে আছে শিক্ষা-দীক্ষায়। ফলে কোটি কোটি মানুষ মুসলমান রূপে জন্ম নেওয়ার পরও প্রতিবছর মৃত্যু বরণ করছে ইসলামের মূল শিক্ষাটি না জেনেই। আর শিক্ষা না থাকায় মুসলমান রূপে দায়িত্বপালনের  আগ্রহও তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়নি। ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্টায় তাদের নিজস্ব অর্থ, সময় ও সামর্থের বিণিয়োগ হয়েছে সামান্যই। ফলে ব্যাপক অপচয় হয়েছে মুসলিম জনশক্তির। ইতিহাসের ছবক হলো, যে সমাজে সুশিক্ষা নেই, সে সমাজে উন্নয়ন বা অগ্রগতিও নেই। বিশ্বে বহুশত জাতির বাস। কিন্তু সবার জীবনে সে অগ্রগতি আসেনি, তাদের দ্বারা সভ্যতাও নির্মিত হয়নি। সভ্যতার নির্মাণে অপরিহার্য হলো মানুষের সভ্যতর মন ও মানস। আর সেটি আসে শিক্ষার গুণে। শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি সামনে এগিয়েছে বা কোন উন্নত সভ্যতার জন্ম দিয়েছে –মানব-ইতিহাসে সে নজির নেই। শিক্ষা না থাকার কারণে সমাজে নেমে আসে অনড় পাথরের স্থবিরতা। এমন স্থবির মানুষেরা হাজার হাজার বছর ধরে গরু-মহিষের কাঁধে জোঁয়াল চাপিয়ে একই ভাবে চাষাবাদ করে। একই ভাবে বাঁশ-কঞ্চি-লতাপাতা দিয়ে ঘর বাঁধে। একই ভাবে বন-বাদাড়ে মলমূত্র ত্যাগ করে এবং গবাদী পশুর পাশাপাশী বসবাস করে। এবং আনে না কোন পরিবর্তন।  

 

মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মিত হয়েছে প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের হাতে। মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে এটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লব। এ বিপ্লবের প্রায় ৫ শত বছর পর ইউরোপীয়রা যখন ক্রসেড লড়তে মধ্যপ্রাচ্যে আসে তখন তারা অবাক হয়েছিল মুসলমানদের ঘরবাড়ী, হাম্মাম, টয়লেট, পয়োপ্রণালী, রাস্তাঘাট ও জীবন যাত্রা দেখে। ইউরোপে তখনও গভীর অন্ধকার। তবে ইসলামী সভ্যতার মূল অবদান ঘরবাড়ী, রাস্তাঘাট বা প্রাসাদ-নির্মাণ নয়। বরং সবচেয়ে বড় অবদান, শ্রেষ্ঠতর মানুষের নির্মাণে। বিশাল রাষ্ট্রের শক্তিশালী খলিফা তার চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে উঠের রশি ধরে টানবে সে নজির কি সমগ্র মানব ইতিহাসে আছে? খলিফা নিজের কাঁধে আটার বস্তা চাপিয়ে প্রজার ঘরে পৌঁছে দিবে বা খলিফা ও ভৃত্য পাশাপাশি একই জায়নামাজে দাঁড়িয়ে নামায পড়বে সেটি কি কেউ কোন কালে দেখেছে বা শুনেছে? সে ইতিহাসের নির্মাতা একমাত্র মুসলমানেরা। যারা এককালে নিজের কণ্যা-সন্তানকে জীবন্ত দাফন দিত তারা পরিণত হয়েছিল নানা বর্ণের ও নানা ভাষার মজলুম মানুষের রক্ষাকর্তায়। সমগ্র ইতিহাসে নারীরা এই প্রথম বার পুরুষের মোকাবেলায় সমান অধিকার পেল। অধিকার পেল সম্পদে। বিলুপ্ত হলো কণ্যাহত্যা, বন্ধ হলো মানুষের বেচাকেনা ও দাসপ্রথা। ইউরোপীয়রা মূলতঃ সভ্যতর জীবনের সন্ধান পেয়েছে স্পেনের মুসলমানদের থেকে। ইউরোপে জ্ঞানচর্চায় বিপ্লব শুরু হয়েছিল স্পেনে মুসলিম শাসনামালে গড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে। মানুষের হাতে বিস্ময়কর আবিস্কার বহু হয়েছে। কিন্তু সমগ্র ইতিহাসে মানব-উন্নয়নে এমন বিস্ময়কর রেকর্ডটি নির্মিত হয়েছিল একমাত্র মুসলমানদের হাতে।

 

উচ্চতর সভ্যতার নির্মানে মুসলমানদের সাফল্যের মূল কারণ কোরআনী দর্শন -যা তাদের চিন্তার মডেলই  পাল্টিয়ে দেয়। সে দর্শনের বলেই তারা জানতে পারে, এ জগতে কেন সে বাঁচবে এবং কীভাবে সে বাঁচবে। জীবনের প্রতিটি সামর্থই তখন ঈমানদাদরের কাছে অমূল্য নেয়ামত মনে হয়। পরীক্ষার ক্ষেত্র মনে হয় প্রতিটি কর্ম ও প্রতিটি মুহুর্ত। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “(তিনিই সেই্ মহান আল্লাহ) যিনি সৃষ্টি করেছেন জীবন ও মৃত্যুকে যেন পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে আমলে কে উত্তম।” -সুরা মুলক। অর্থাৎ এ জীবন পরীক্ষা কেন্দ্র। পার্থিব জীবনের প্রতিটি দিন-ক্ষণ জুড়ে চলে এ পরীক্ষা। পরীক্ষা-কেন্দ্রে কোন জ্ঞানবান ব্যক্তিই হাঁসি-তামাসা, নাচগান ও খেলা-ধুলায় সময় কাটায় না। বরং পরীক্ষায় পাশের ভাবনায় সে পেরেশান। এমন এক ভাবনা থেকেই ইসলামের মহান খলিফা হযরত উমর (রাঃ) চাকরকে উটের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। রাতে না ঘুমিয়ে আটার বস্তা কাঁধে নিয়ে দরিদ্র মানুষের ঘরে ছুটেছেন। এমন এক ভাবনা থেকেই সাহাবাগণ ব্যস্ত থেকেছেন অবিরাম জ্ঞানলাভ ও জ্ঞানদানে। তাদের কাছে এ দুটোই ইবাদত গণ্য হয়েছে। জীবনের প্রতিটি মুহুর্তকে এভাবে তারা কল্যানকর্মে লাগিয়েছেন। এবং সঞ্চয় করেছেন নেকী। এ ভয়ে যে, পরীক্ষার শেষ ঘন্টটি না জানি কখন বেজে উঠে এবং শেষ হয়ে যায় নেকী বৃদ্ধির সর্বশেষ ফুরসত। ঈমানদারদের মাঝে তখন প্রতিযোগীতা শুরু হয়, কে কত ভাল কাজ করতে পারে। এমন প্রতিযোগিতার কথা বলা হয়েছে পবিত্র কোরআনেও। তখন দেশ জুড়ে  শুরু হয় সুনীতি ও সুকর্মের জোয়ার। নেক কর্মে এমন জোয়ারের ফলেই প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের হাতে দ্রুত নির্মিত হয়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।

 

শিক্ষার মূল লক্ষ্য, ছাত্রদের চিন্তার মডেলে এরূপ আমূল বিপ্লব আনা। শিক্ষার এটাই মূল কাজ। চিন্তার মডেল বা দর্শনই জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কারণ চিন্তার মডেল থেকেই ব্যক্তি পায় জীবনের দিক-নির্দেশনা। পায় সিরাতুল মোস্তাকীম। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে, বাঁকী কোন ক্ষেত্রেই সফলতা সম্ভব নয়। তখন পথভ্রষ্টতা আসে জীবনের প্রতিক্ষেত্রে। অথচ এখানেই প্রচন্ড ব্যর্থতা আজকের মুসলমানদের। মুসলিম দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় নানা কিছু শেখাচ্ছে, কিন্তু প্রচন্ড ব্যর্থ হচ্ছে ছাত্রদের চিন্তা-জগতে সঠিক দর্শনটি দিতে। এর ফলে বিদ্যা-বুদ্ধি ও জ্ঞান ব্যবহৃত হচ্ছে দুর্বৃত্তিতে। যেমন অস্ত্র হাতে পেলে ডাকাতরা যা করে। ফলে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে যতই বাড়ছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার সংখ্যা ততই বাড়ছে দুর্বৃত্তি। ইসলামের প্রথম যুগে এত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। কিন্তু প্রতিটি মসজিদ ও ঘর পরিণত হয়েছিল মাদ্রাসায়। সে মাদ্রাসাগুলো ইসলামের জীবন দর্শন শেখাতে কোনরূপ ভূল করেনি। ফলে প্লাবন এসেছে সুনীতি ও সুকর্মের। বেড়েছে সামাজিক শান্তি। নির্মিত হয়েছে সভ্যতা। 

 

কোন জাতির সমগ্র জনগণ যদি নেক-আমলের প্রতিযোগীতায় অনুপ্রেরীত হয় এবং নিজ নিজ দায়িত্বে কর্মক্ষেত্রে নেমে আসে, তবে সে জাতির বিজয়-গৌরব কি কেউ রুখতে পারে? আর এটিই হলো দর্শনের বল। দেহ ও মনে লাগাতর শক্তি জোগায় এ বল। বিজ্ঞান ও কারিগরি জ্ঞানের চেয়ে দর্শনের এ জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কোরআন বিজ্ঞান বা কারিগরী জ্ঞান শেখায়নি, কিন্তু মুসলমানদের জীবনে জুগিয়েছে দর্শনের বল। ফলে তারা পথহারা হয়নি। পেয়েছে আত্মবল ও আত্মবিশ্বাস। এ বলের কারণে প্রকৃত মুসলমান প্রবল শত্রুর সামনেও হীনবল বল হয়না, হতাশও হয়না। কিন্তু মুসলিম বিশ্বে কোরআনের তেলাওয়াত বাড়লে দর্শনের সে জ্ঞান বাড়েনি। ফলে মুসলমান যুবকেরা জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে সে দিক-নির্দেশনাও পায়নি। বাড়েনি আত্মবিশ্বাস ও আত্মশক্তি। বরং বেড়েছে তেল-গ্যাস,কৃষিসম্পদ, অর্থ-সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা।

 

জ্ঞানার্জন ইসলামে যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটি বুঝা যায় পবিত্র কোরআনের সর্বপ্রথম নাযিলকৃত ৫টি আয়াতের দিকে নজর দিলে। পবিত্র কোরআনের প্রথম সে ৫টি আয়াত হলো, “পাঠ কর তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। -(আয়াত ১)। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাটবাধা রক্ত থেকে। -(আয়াত ২)। পাঠকরুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু।-(আয়াত ৩)। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিযেছেন। -(আয়াত ৪)। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতো না। -(আয়াত ৫)। কোরআনের এ ৫টি আয়াতে ‘পাঠ করো’, ‘কলম’ ও ‘শিক্ষাদান’ - এ তিনটি শব্দ এসেছে ৫ বার। পরিবর্তনের পথে শিক্ষাই যে চাবি –সেটিই এখানে বুঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা চান, তাঁর নাযিলকৃত কোরআনের আলোকে বিশ্বজুড়ে পরিবর্তন। তিনি সেটির প্রয়োগ শুরু করেছেন কোরআন নাযিলের শুরু থেকেই। শিক্ষাদান তাই আল্লাহতায়ালার মহান সূন্নত। এবং জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানকে ফরজ করা হয়েছে প্রতিটি মুসলমানের উপর। তাই জ্ঞানার্জন শুধু মাদ্রাসা শিক্ষক বা মসজিদের ইমামদের উপর ফরয নয়, ফরয প্রতিটি মানুষের উপর। এবং সে জ্ঞান যে শুধু কোরআন-হাদীসের জ্ঞান সেটিও নয়, বরং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে তথা সভ্যতার নির্মানে যা প্রয়োজনীয় সব কিছুই। কোরআন-হাদীসের বাইরের জ্ঞানও যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটি নবীজী (সাঃ) স্বয়ং দেখিয়ে গেছেন। সেটিরই উদাহরণ দেয়া যাক। বদরের যুদ্ধে কিছু সংখ্যক কাফের সৈন্য বন্দী হয় মুসলমানদের হাতে। শরিয়ত মোতাবেক তাদের শাস্তি ছিল মৃত্যুদন্ড। অথবা মূক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে মূক্তি। বন্দী কাফেরদের মাঝে এমন কিছু ব্যক্তি ছিল যারা লেখাপড়া জানতো। নবীজী (সাঃ)নির্দেশ দেন, তারা যদি মুসলমানদেরকে শিক্ষাদান করে তবে তাদের মূক্তি দেওয়া হবে। হত্যাযোগ্য কাফের শত্রুদের থেকেও বিদ্যালাভ যে জায়েজ এবং গুরুত্বপূর্ণ নবীজী (সাঃ) এখানে সেটিই বুঝিয়েছেন। অথচ কে না জানে, কাফেরদের থেকে ইসলাম বিষয়ে শিক্ষণীয় কিছু থাকতে পারে না। কিন্তু নবীজী (সাঃ)জানতেন, ধর্মীয় বিধি-বিধানের বাইরেও শিখবার বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে এবং মুসলমানদের সেগুলোও শিখতে হবে। নবীজী (সাঃ) সেটিরই সূন্নত রেখে গেছেন। নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতের পাশাপাশি মুসলমানদের আরেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো উচ্চতর সভ্যতার নির্মান। সভ্যতার নির্মানে অপরিহার্য শধু কোরআন-হাদীসের জ্ঞান নয়, বহুবিধ অন্য জ্ঞানও। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করতে বহু কিছু গড়তে হয়। এবং অসংখ্য নতুন জিনিষ আবিস্কার করতে হয়। যে কোন সভ্য সমাজের এমন প্রচেষ্টা লাগাতর। কোন রাষ্ট্রে আবিস্কারের এ কাজ থেমে গেলে অসম্ভব হয় সামনে এগুনো। তখন অসম্ভব হয়ে উঠে শত্রুর হাতে পরাজয় এড়ানোও। প্রাথমিক যুগের মুসলমানগণ এজন্যই কাফেরদের লেখা বই মসজিদ-মাদ্রাসায় বসে পাঠ করেছেন। পবিত্র কোরআনের আগে আরবী ভাষায় কোন গ্রন্থ ছিল না। জ্ঞানার্জন সে আমলে এতটাই গুরুত্ব পেয়েছিল যে, মাত্র কয়েক শতকের মধ্যে তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশাল ভান্ডার গড়ে তুলেছিলেন। অথচ বহু জাতি সেটি হাজার হাজার বছরেও পারিনি। ইসলামে জ্ঞানার্জন যে কতটা বিশ্বজনীন সে প্রমাণই তারা রেখে গেছেন।

 

সৃষ্টিকে না চিনলে স্রষ্টাকেও চেনা যায় না। মহান আল্লাহর কুদরতকে চিনতে হলে তাঁর মহান সৃষ্টিজগতকে চেনাটাও তাই জরুরী। বিশাল সৌরজগত, কোটি কোটি মাইল দূরের অসংখ্য নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধুমকেতু, নিহারিকা, সাগর-মহাসাগরের নীচের অসংখ্য জীবের বিচিত্র জীবন, মানব দেহ ও ও উদ্ভিদ জীবনের জটিল রহস্য, অণু-পরামাণুর গোপন বিষয় – এসব নিয়ে যার সামান্য জ্ঞানও নাই তার পক্ষে আল্লাহর অসীম কুদরতের ধারনা লাভ কি সম্ভব? জাহেল ব্যক্তির কাছে এজন্যই প্রকান্ড বিভ্রান্তি দেখা দেয় মহান আল্লাহর আকৃতি ও কুদরত নিয়ে। এমন অজ্ঞ-জাহেল ব্যক্তির কাছে অসীম কুদরতের অধিকারি সর্বসম আল্লাহও তখন মানুষের চেহরাধারি ক্ষুদ্র মানুষ মনে হয়। (নাউযুবিল্লাহ মিন যালিক)। সন্তানের পিতাও মনে হয়। ইহুদীরা হযরত উযায়ের (আঃ)কে এবং খৃষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)কে আল্লাহর পুত্র বলে এমন এক বিশাল অজ্ঞতার কারণে। পৌত্তলিকদের বিভ্রান্তি তো এক্ষেত্রে সীমাহীন। অজ্ঞতা যে কতটা ভযংকর হতে পারে এ হলো তার নমুনা। তাই ঈমানদার হওয়ার দায়বদ্ধতা তাই শুধু কোরআনের জ্ঞানার্জন নয়, বরং আল্লাহর আয়াত এবং তার সৃষ্টি ও নিদর্শনগুলিকে জানাও। এমন সর্বমুখী জ্ঞান-সাধনার কারণে প্রাথমিক যুগের মুসলমানের হাতে শুধু ফেকাহ ও হাদীস শাস্ত্রের উৎকর্ষই ঘটেনি। ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে দর্শন, ভুগোল, রসায়নশাস্ত্র, অংকশাস্ত্র, বীজগণিত, জ্যামিতি, ভূপরিমিতি, জ্যোতিষশাস্ত্র, সমাজবিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞানসহ জ্ঞানের নানা শাখায়। মুসলমানেরা তাদের সে জ্ঞানকে পৌঁছে দিয়েছে ইউরোপেও।

 

মুসলমানদের পরাজয়ের শুরু তখনই যখন তারা জ্ঞানার্জনকে শুধু কোরআন চর্চায় সীমিত করে ফেলে। আর এমন সীমাবদ্ধতায় তাদের কাছে অসম্ভব হয়েছে মহান আল্লাহর অসীম কুদরত বুঝাও। ফলে মুসলিম বিশ্ব শুধু পদার্থ ও রসায়ন বিজ্ঞান, সামরিক জ্ঞান, অস্ত্র-শস্ত্র, চিকিৎসা শাস্ত্র এবং কারিগরি বিদ্যার ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়েনি, পিছিয়ে পড়েছে দ্বীনী-জ্ঞান, ধর্ম-পালন ও দ্বীন-প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও। শত্রুর হাতে লাগাতর পরাজয় শুরু হয় তখন সর্বক্ষেত্রে। প্রচন্ড ভাবে পিছিয়ে পড়েছে এমনকি কোরআন বুঝার ক্ষেত্রেও। ফল দাঁড়িয়েছে, প্রাথমিক কালের তাফসির গ্রন্থগুলো যতটা সমৃদ্ধ, ততটা সমৃদ্ধ নয় আজকের তাফসিরগুলো। বরং আধুনিক কালের তাফসিরগুলো মূলতঃ সে প্রাচীন তাফসির গ্রন্থগুলিরই নকল। সে আমলের আলেমগণ কোরআন বুঝার চেষ্ঠা করেছেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখা-প্রশাখার বিচিত্র জ্ঞানের সাহায্য নিয়ে। আল রাযী, জামাখশারী, তাবারী, সূয়ুতী, ইবনে কাসীরের ন্যায় প্রখ্যাত মোফাচ্ছিরগণ শুধু কোরআন-হাদীসের পন্ডিতই ছিলেন না। পন্ডিত ছিলেন সমকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার। ব্যক্তির মনের সামর্থই তার দেখার সামর্থ ও চিন্তার সামর্থ বাড়ায়। এবং মনের সে সামর্থ বাড়ে বহুমুখী জ্ঞানে। সে আমলের আলেমদের সে সামর্থ ছিল বিস্ময়কর। তারা সেটিরই স্বাক্ষর রেখে গেছেন তাদের তাফসির গ্রন্থগুলিতে।

 

শিক্ষা-বিপ্লব প্রতিদেশেই সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লবকে অনিবার্য করে তোলে। অপর দিকে অশিক্ষার অনিবার্য পরিণতি হলো অবনতি, পরাজয় ও পথভ্রষ্টতা। ইতিহাসে সে প্রমাণ প্রচুর। বিশ্বশক্তি রূপে প্রাথমিক কালের মুসলমানদের দ্রুত উত্থানের পিছনে হঠাৎ গুপ্তধণ প্রাপ্তি ছিল না। জলবায়ুর পরিবর্তনও ছিল না। বরং ছিল জ্ঞানের ভূবনে বিশাল বিপ্লব। এবং সেটি ছিল মূলতঃ কোরআনী জ্ঞানে। শিক্ষক ছিলেন খোদ নবীজী (সাঃ)। শুধু জ্ঞানদান নয়, জ্ঞানার্জনের পথও তিনি দেখিয়ে দেন। তখন শুধু পড়া বা দেখার সামর্থই বাড়েনি, বেড়েছে চিন্তার সামর্থও। শিক্ষকের মূল কাজ তো চিন্তার এ সামর্থ বাড়ানো। কোরআনের সে জ্ঞান তাদেরকে জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটিকে চিনতে সাহায্য করেছিল। ফলে বহু শত বছরের পথভ্রষ্টতা থেকে তারা মূক্তি পেয়েছিলেন। তখন কোন বিশ্ববিদ্যাল না থাকলেও তাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় মনে হয়েছে সমগ্র বিশ্বজগত। জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর এ বিপ্লবের ফলেই যারা মেষ চড়াতো বা ক্ষুদ্র ব্যবসা করতো বা চাষাবাদ করতো তাঁরা পরিণত হন বিশ্বের সেরা জ্ঞানী ব্যক্তিতে। তাঁদের মধ্য থেকে যে মানের বিচারক, প্রশাসক, ফকিহ, মুফতি ও দার্শনিক সেদিন গড়ে উঠেছিলেন, সমগ্র মুসলিম ইতিহাসের আজও তারাই গর্বের।

 

শত শত বছরের স্থবিরতার পর আধুনিক ইউরোপ যে ভাবে গাঝাড়া দিয়ে উঠে, এবং সেখানে যেরূপ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জাগরণ দেখা দেয় সেটিরও মূল কারণ শিক্ষা। কারিগরি বা টেকনিকাল জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাশাপাশি তারা বিপ্লব আনে দর্শন, সমাজ-বিজ্ঞান, ইতিহাস, খাভাসভাষা ও সাহিত্যসহ জ্ঞানের অনেক ভূবনে। পাশ্চাত্য দেশগুলো শিক্ষার হারকে যে শুধু শতকরা ৯৫ ভাগেরও অধিক করেছে তা নয়, অন্ধ, বধির, বোবা ও নানা ধরণের পঙ্গুদের কাছেও তারা জ্ঞান পৌঁছে দিয়েছে। মানব ইতিহাসের শুরু থেকে এ যাবতকাল যত বিজ্ঞানীর জন্ম হয়েছে, পাশ্চাত্য দেশগুলী তার চেয়ে বহু গুন বেশী বিজ্ঞানীর দিয়েছে বিগত মাত্র ৫০ বছরে। তবে জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের এ অগ্রগতি সর্বক্ষেত্রে হয়নি। ধর্মীয় জ্ঞানের ক্ষেত্রে তারা আদিম জাহিলিয়াতেই রয়ে গেছে। পাশ্চাত্যে কারিগরি গবেষণাগারের কদর বাড়লেও গুরুত্ব পায়নি মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত জ্ঞান। ফলে পাশ্চাত্যে জ্ঞানচর্চা বিশ্বজনীন বা সর্বমুখী হতে পারেনি। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত জ্ঞান ছাড়া সেটি সম্ভবই বা কেমনে? ফলে এত অগ্রগতির পরও পাশ্চাত্যবাসীরা প্রচন্ড পথভ্রষ্টতার শিকার। তারা পশ্চাদপদ রয়ে গেছে জীবনদর্শনের ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে। চলার গতি বাড়লেও সেটি বেড়েছে ভ্রান্ত পথে। ধর্ম-বিচারে তারা রয়ে গেছে অতি সনাতন অজ্ঞতায়। ফলে বাড়েনি ন্যায়-অন্যায় ও সত্য-মিথ্যা চেনার সামর্থ। বাড়েনি নৈতিক বল। এমন নৈতিক স্খলনের কারণেই গণ-হত্যা, দেশ-দখল এবং মানবাধিকারের পদদলনও তাদের কাছে উৎসবজনক মনে হয়। ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের হাতে ৭ কোটির বেশী মানুষের প্রাণহানী হয়। এবং বিধ্বস্ত হয় অসংখ্য নগরীর বিপুল সম্পদ। মানব জাতির এতবড় ক্ষতি আর কোন কালেই ঘটেনি।

 

মুসলমানগণ পরস্পরের ভাই –এ ঘোষণা মহান আল্লাহতায়ালার। আর আল্লাহতায়ালার যাদেরকে ভাই রূপে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাকে কি কোন ঈমানদার ভূলে থাকতে পারে? মুসলমান হওয়ার শর্ত্বই হলো, মহান আল্লাহতায়ালা যাকে ভাই রূপে পরিচয় করিয়ে দিলেন তার সাথে ভাতৃসুলভ সম্পর্ককে আরো মজবুত করা। সে সম্পর্ক দুর্বল হয় ঈমানের দুর্বলতায়। ভাতৃসূলভ সম্পর্ক ও সীমঢালা প্রাচীর-সুলভ সে একতা কি কখনো অজ্ঞতায় সম্ভব? যে মুসলমান তার অপর ভাই সম্পর্কে জানতেই রাজী নয় সে তার ভাই হয় কি করে? ভাইয়ের প্রতি সে দ্বায়িত্বই বা পালন করে কি করে? তাই মুসলমানের অলংঘনীয় দায়িত্ব, বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসকারি তার মুসলমান ভাইদের পরিচয়টি জানা। তাদের দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অভিযোগগুলীও জানা। সম্ভব হলে তাদের দুঃখ লাঘবে সেগুলীর প্রাতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া। জ্ঞানচর্চা নিছক নিজ দেশ, নিজ জাতি, নিজ ফিরকা, নিজ মজহাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে অসম্ভব হয় সে জানাজানিটা। তাই জ্ঞানের পরিধিকে বিশ্বজনীন করা মুসলমানদের নিছক শিক্ষাগত প্রয়োজন নয়, বরং সেটি অপরিহার্য মুসলমান রূপে বেড়ে উঠার স্বার্থে। মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো দায়িত্ববান এবং সে সাথে জ্ঞানবান মানুষ রূপে বেড়ে উঠা। অশিক্ষার কুফল বহু। তবে বড় কুফল হলো, তাতে অসম্ভব হয় মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ববান সদস্য রূপে বেড়ে উঠা। বরং অনিবার্য করে বিভক্তি। মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ দায়ভার হলো, আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াতকে অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সে একজন দায়ী বা মোবাল্লেগ। এবং একাজের কোন সীমা-সরহাদ নেই। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ সে দায়িত্বপালনে নিজ জন্মস্থান ছেড়ে শত শত মাইল দূরে গিয়ে দ্বীনের প্রচার করেছেন এবং সেখানে প্রাণও দিয়েছেন। দ্বীনের তাবলিগ অজ্ঞতা নিয়ে সম্ভব নয়। শুধু কোরআনের জ্ঞান থাকলেই সে কাজ চলে না। তাকে জানতে হয়, যাদের কাছে সে দাওয়াত নিয়ে যাচ্ছে তাদের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি। জানতে হয় ধর্ম নিয়ে তাদের অজ্ঞতা ও কুসংস্কার, -যেমন রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎস্যককে জানতে হয় রোগীকে এবং রোগের নানাবিধ লক্ষণাদিকে। শিক্ষায় সর্বমুখীতা ও বিশ্বজনীনতার গুরুত্ব তাই এখানেও।  

 

আজকের মুসলমানদের বড় ব্যর্থতা শুধু এ নয় যে তারা ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে বা শক্তিশালী মুসলিম উম্মাহ গড়তে ব্যর্থ হয়েছে। বরং বড় ব্যর্থতা হলো তারা শুরুর কাজটিই সঠিক ভাবে শুরু করতে ব্যর্থ হয়েছে। ঘোড়ার আগে যেমন গাড়ী জোড়া যায় না, তেমনি সঠিক শিক্ষা সুনিশ্চিত না করে ইসলামী রাষ্ট্রনির্মান বা শক্তিশালী মুসলিম উম্মাহ গড়ে তোলাও সম্ভব নয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ যেমন শুরুর কাজটি শুরুতে দিয়েছেন এবং নবীজী (সাঃ)ও যেমন শুরুর কাজটি শুরুতে করেছেন, আজকের মুসলমানদের সামনেও তা ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। এ কাজ রাষ্ট্রশক্তির বাইরেও সম্ভব। যতদিন ইসলামী রাষ্ট্র নির্মিত না হচ্ছে ততদিন সে কাজ বেসরকারীভাবেই করতে হবে।

 

বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোর শিক্ষানীতির মূল প্রণেতা হলো ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ। ভারত শাসন কালে তারা শিক্ষাকে ব্যবহার করেছে মুসলমানদের পথভ্রষ্ট করা হাতিয়ার রূপে। ইসলামবিরোধী সেকুলার শক্তির এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ইন্সটিটিউশন। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটেছে। কিন্তু দেশটির প্রশাসন যাদের হাতে তাদের চেতনায় কাজ করছে ইসলামী বৈরী সেকুলার নীতি। তারা এ শিক্ষা ব্যবস্থার ইসলামী করণের কোন প্রচেষ্টাকে যেমন অতীতে সফল হতে দেয়নি, ভবিষ্যতেও দিবে না। একই অবস্থা অধিকাংশ মুসলিম দেশের। ফলে ইসলামী শিক্ষা কোন মুসলিম দেশেই বিশ্বজনীনতা পায়নি। শিক্ষাব্যবস্থা বন্দী হয়ে আছে জাতীয়তাবাদ, ফেরকাপরস্তি, সেকুলারিজমের জিন্দানে। ফলে এসব দেশের মুসলমানগণ আর বিশ্বকে বা মুসলিম ভাইকে কি চিনবে? নিজেদের ধর্মই তাদের কাছে অপরিচিত রয়ে গেছে। ফলে বিগত কয়েক শত বছর ধরে সূদ, ঘুষ, মিথ্যাচার যেমন সহনীয় হয়ে গেছে, তেমনি অপরিচিত রয়ে গেছে নবীজীর (সাঃ) আমলের ইসলাম। ইসলামের যে শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠা প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরয, সেটিই আজ  অধিকাংশ মুসলমানের কাছে মৌলবাদ মনে হয়। ফলে রাষ্ট্রের আইন-আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ নেই তাদের। এর চেয়ে বড় পথভ্রষ্টতা আর কি হতে পারে? এমন এক পথভ্রষ্টতার কারণেই বাংলাদেশের মত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশগুলীতে ইসলামের বিধান আজ পরাজিত। নবীজী(সাঃ)র আমলে এটি কি কল্পনা করা যেত? কিন্তু একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাই যখন পথভ্রষ্ট করার হাতিয়ারে পরিণত হয় তখন এর চেয়ে ভিন্নতর কিছু আশা করা যায়? আর একাজে ব্যবহৃত হচ্ছে মুসলমানদেরই ট্যাক্সের অর্থ। ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষার এমন বিপন্ন দশায় কোন ঈমানদার কি বিক্ষুব্ধ না হয়ে পারে? কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা নিজেদেরকে আলেম জ্ঞান করেন তাদের মধ্যেও কি এ নিয়ে কোন মাতম আছে? আছে কি এ অবস্থা থেকে মূক্তিলাভের কোন উদ্যোগ? লন্ডন, ১৮/০৮/২০১০



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.