Home •শিক্ষা ও প্রচার মাধ্যম শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমানদের ব্যর্থতা ও আধুনিক জাহিলিয়াত

Article comments

শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমানদের ব্যর্থতা ও আধুনিক জাহিলিয়াত PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 03 June 2012 22:33

সবচেয়ে বড় পাপ

জীবনে বাঁচাটি কতটা সফল বা বিফল হলো সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নির্ধারিত হয় ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা থেকে। সে ব্যক্তিটি জাহান্নামে পৌঁছবে না জান্নাতে -সেটিও নির্ভর করে তার শিক্ষালদ্ধ জ্ঞানের উপর। মানব জীবনে অশিক্ষার কুফল অতি ভয়ানক, এর চেয়ে বড় অভিশাপ আর নেই। জ্ঞান জীবনকে আলোকিত করে, আর অশিক্ষা ডেকে আনে অন্ধকার। মানুষ আল্লাহকে অস্বীকার করে, তাঁর প্রেরীত কিতাব ও নবী-রাসূলদের অবিশ্বাস করে এবং তাঁর কোরআনী আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয় নিছক অজ্ঞতার কারণে। সে অজ্ঞতা নিয়েই সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হয়ে সে বিপথে চলে। এরূপ জাহেল মানুষেরাই সজ্ঞানে কবিরা গুনাহতে লিপ্ত হয় এবং অবশেষে জাহান্নামে গিয়ে পৌছে। অজ্ঞতা এভাবে মানব জীবনে বাঁচার মূল লক্ষ্যটিকে ব্যর্থ করে দেয়। তখন প্রতিদিনের বাঁচাটি হয় নিছক পরকালীন জীবনের ব্যর্থতাকে বাড়াতে। তাই মানব-জীবনের বড় পাপ হলো অজ্ঞতা। অন্যান্য ছোট ছোট পাপগুলো জন্ম নেয় এ বড় পাপটি থেকেই।

 

 

আরবের বুক থেকে প্রাগ-ইসলামিক জাহিলিয়াত আজ থেকে ১৪ শত বছর আগে বিলুপ্তি হলেও দূর হয়নি আধুনিক মানুষের জাহিলিয়াত। বরং বিজ্ঞানের অপূর্ব অগ্রগতি ও সম্পদের বিপুল প্রাচুর্য্য সত্ত্বেও প্রচণ্ড ভাবে বেড়ে চলেছে আধুনিক এ জাহিলিয়াত। পৌত্তলিকতা, ব্যাভিচার, মদ্যপান, জুয়া, অশ্লিলতা, সমকামিতা, শিশুকণ্যা হত্যা, পর্ণগ্রাফি, নির্যাতন, আগ্রাসন, গণহত্যা, বর্ণবাদ, অর্থনৈতিক শোষন এবং বহুবিধ পাপাচার এখনও কোটি কোটি মানুষের জীবনে বেঁচে আছে আদিম অজ্ঞতা ও বর্বরতা নিয়ে। সে সাথে বহু সনাতন পাপাচারও আইনগত বৈধতা পাচ্ছে। সমকামিতার ন্যায় পাপাচার কোন পাপাচারি সমাজও অতীতে স্বীকৃতি দেয়নি। পুরুষের সাথে পুরুষের এবং নারীর সাথে নারীর বিবাহকেও কোন কালে বৈধতা দেয়া হয়নি। কিন্তু আধুনিক জাহেলিয়াত সেগুলিকেও আইনগত স্বীকৃতি দিচ্ছে।

 

আধুনিক মানুষের অজ্ঞতা বিজ্ঞানের আবিস্কার নিয়ে নয়। বরং সে অজ্ঞতা সত্য-আবিস্কার এবং সত্য-পথ অনুসরণের অসামর্থতা নিয়ে। সত্যকে জানার সামর্থ আসে একমাত্র আল্লাহর নাযিলকৃত ওহীর জ্ঞানের মাধ্যমে। সেরূপ জ্ঞানদানের সামর্থ ও অধিকার একমাত্র মহান আল্লাহর। তাই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, “সত্য পথ দেখানোর দায়িত্ব আমার।” –(সুরা লাইল, আয়াত ১২)। তিনি আরো ঘোষণা করেছেন, “আল্লাহ ঈমানদার নারী ও পুরুষের বন্ধু, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসেন। আর যারা কাফের তাদের বন্ধু হলো শয়তান, এবং সে তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়।” –(সুরা বাকারা আয়াত ২৫৭)। তাই ঈমানদার হওয়ার সবচেয়ে বড় পুরস্কার, মহান আল্লাহর বন্ধুত্বপ্রাপ্তি। সে বন্ধুত্বের বরকতে জুটে অন্ধকার থেকে আলোতে আসার নেয়ামত। একমাত্র আলোর সে পথ বেয়েই ঘটে জান্নাতপ্রাপ্তি। তাই মানব-জীবনের সবচেয়ে বড় কামনা ও বড় পাওয়াটি হলো মহান আল্লাহর বন্ধুত্ব। আর কাফের হওয়ার বড় শাস্তি অসত্যের অন্ধকারে ডুবা জীবন। অন্ধকারের সে পথ বেয়ে সে পাপের রাজ্যে ঢুকে এবং পরিশেষে জাহান্নামের আগুণে গিয়ে পৌঁছে। এবং সেটি ঘটে শয়তানের বন্ধু হওয়ার মধ্য দিয়ে।

 

অজ্ঞতা জীবনের বড় সত্যটি জানায়

মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কোরআন নাযিল হয়েছিল মানুষকে সত্যপথ দেখাতে। কোরআনের ভাষায় একমাত্র সে পথটিই হলো সিরাতুল মোস্তাকীম। তাই কোরআনের জ্ঞান ছাড়া মানব জীবনের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সত্যটি অজানা থেকে যায়। সে জ্ঞানছাড়া অপূর্ণ থেকে যায় জ্ঞানার্জনের মূল লক্ষ্যটি। তখন ব্যর্থ হয়ে যায় জীবনে বেঁচে থাকার মূল উদ্দেশ্যটি। এজন্যই ইসলামে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব নিছক কর্মক্ষেত্রে বা পেশায় সফল হওয়াতে নয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভের খাতিরেও নয়। বরং ইসলামে এটি অতি মৌলিক প্রয়োজন। সেটি যেমন জীবনের মূল সত্যটি জানার তাগিদে, তেমনি সুস্থ্য সভ্যতার নির্মানের খাতিরে। অন্যথায় সত্য-সন্ধানী মানুষ রূপে বাঁচার চেষ্টাটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যায়। ব্যর্থ হয়ে যায় সুস্থ্য-সভ্যতা নির্মাণের প্রয়াসও। এজন্যই ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।

 

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা সফল, সেটির সঠিক বিচার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কতজন ডিগ্রিধারি বের হলো তা থেকে হয় না। বিচারের প্রকৃত মাপকাঠি হলো, সে শিক্ষার মাধ্যমে কতজন জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচলো সেটি। ব্যক্তির জীবনে সত্যকে জানা এবং সে সত্যের পথে চলার সামর্থ কতটা বাড়লো সেটিই এ বিচারে মূল মানদণ্ড। মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে। তবে তারা ব্যতীত যারা ঈমান এনেছে, নেক আমল করেছে এবং অন্যদের হাক্ব এবং ছবরের ছবক দিয়েছে।” –(সুরা আছর।। এ সুরাটিতে মানব জীবনের সফলতা সংজ্ঞায়ীত করেছেন মহান আল্লাহতায়ালা স্বয়ং নিজে। আল্লাহর উপর ঈমান আনা, নেক আমল করা এবং কোরআন নির্দেশিত সত্যকে চেনা এবং সে সত্যের পথে মানুষকে ডাকা এবং তাদেরকে ছবরের শিক্ষা দেয়াকে সে সফলতা অর্জনের শর্ত্ব রূপে ঘোষনা দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, যে ব্যক্তিটি আল্লাহর নির্দেশিত সত্যকে জানলোই না সে তার উপর ঈমান আনবে কি করে? অন্যদের সে বিষয়ে ছবকই বা দিবে কেমনে? ছবরেরই ছবকই বা শেখাবে কি করে? ইসলামি রাষ্ট্রের এবং সে সাথে রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল দায়িত্ব হলো, শিক্ষার মাধ্যমে জনগণের সে সামর্থ বাড়ানো।

 

কুকুর বা বানরকেও যদি লাগাতর প্রশিক্ষণ দেয়া যায় তবে সে জন্তুটিও বিস্ময়কর কুশলতা দেখায়। তেমনি মানুষও পারে। এক্ষেত্রে আধুনিক বিশ্বাবিদ্যালয় গুলোর সাফল্য অস্বীকারের উপায় নাই। কিন্তু মানুষকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচানোর লক্ষ্যে কারিগরি বা পেশাগত কুশলতাগুলিই যথেষ্ঠ নয়। আর বহু কিছু তাকে জানতে হয় এবং মেনে চলতে হয়। কিন্তু সে সামর্থ বাড়াতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সফলতা কতটুকু? আল্লাহর প্রদর্শিত সত্যকে জানা ও শিক্ষার্থীদের জানানো কি এগুলির আদৌও কোন প্রায়োরিটি? প্রায়োরিটি কি মানুষকে আখেরাতে কামিয়াব করা? শিক্ষার নামে কিছু শেখালেই তাকে শিক্ষা বলা যায় না। শিক্ষার নামে যুগে যুগে বহু কুশিক্ষাও প্রচার পেয়েছে। প্রতিষ্ঠাও পেয়েছে। দেশে দেশে মুর্তিপুঁজা, অগ্নিপুঁজা, পশুপুঁজা, জাতিপুঁজা, শ্রেণীচেতনা, বর্ণবাদ বা নাস্তিকতা তো বেঁচে আছে এমন কুশিক্ষার কারণেই। শিক্ষা সঠিক না হলে মানুষ জীবনে ব্যর্থতা তাই অতি ভয়ানকও হতে পারে। বাস্তবতা হলো, শুধু অমুসলিম দেশে নয়, মুসলিম দেশগুলোতে সে ব্যর্থতা আজ ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। নাস্তিকতাবাদ, বস্তুবাদ, মার্কসবাদ, সংশয়বাদ, ডারউনিজম, সেক্যুলারিজম -এরূপ নানা মতবাদের শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠা বাড়িয়ে এসব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের জীবনে শুধু পথভ্রষ্টতাই বাড়ায়নি, বরং জাহান্নামের পথে বিশাল বিশাল হাইওয়ে গড়েছে। ফলে যে ক্ষতির মহা হুশিয়ারি মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আছরে শুনিয়েছেন সেটিই তাদের জীবনে ষোলকলায় পূর্ণ হচ্ছে।

 

করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে ভাল বাসেন। তাদের জীবনে তিনি চুড়ান্ত সফলতা দেখতে চান। চান তাদের হাতে সুস্থ্য সভ্যতার নির্মাণ হোক। তবে সে সফলতা নিছক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে যেমন আসে না, তেমনি শুধু বৈজ্ঞানিক আবিস্কারেও ঘটে না। সে সফলতাটি আসে জান্নাতের যোগ্য মানুষ রূপে বেড়ে হওয়ার মধ্য দিয়ে। সেটি ঘটে কোরআনে প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকীমের সঠিক অনুসরণে। একমাত্র সে পথই মানুষকে জান্নাতে পৌঁছাতে পারে। মানব-সৃষ্টির জন্য এটিই মহান আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর মানব-সৃষ্টিকে সে পথ দেখাতে পৃথিবীর বুকে লক্ষাধিক নবী-রাসূলকে নিয়োগ দিয়েছেন। মহাকাশগামী নভোযান বা পারমানবিক অস্ত্র নির্মাণে অযোগ্যতা দিয়ে মানব জীবনের বড় অযোগ্যতাটির যাচাই হয় না, বরং সেটি হয় মহান আল্লাহর প্রদর্শিত পথে চলার অসামর্থতা থেকে। মানবের সকল অযোগ্যতার মাঝে এটিই হলো সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা। চাষাবাদে, প্রকৌশলে বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পিছিয়ে থাকাতে কেউ জাহান্নামে পৌঁছায় না। কিন্তু সে মহা বিপদটি ঘটে সত্যপথ না চেনায় এবং সে পথে না চলায়।

 

ব্যর্থতা যেখানে মূল মিশনে

জীবনের মুল লক্ষ্য ও মূল কাজটি না জেনে জীবন-যাপন করার চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কি হতে পারে? অথচ সেটি না জেনে কত মানুষই তো এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। বিষয়টি পথ না চিনে আজীবন ড্রাইভিং করার ন্যায়। মানব জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো তার মুসলমান হওয়াটি। জীবনের চুড়ান্ত সফলতাটি নির্ভর করে সে কতটা মুসলমান রূপে জীবন কাটালো ও বিদায় নিল তার উপর। মহান আল্লাহতায়ালার তাই হুশিয়ারি, “ হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যেভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত; এবং পরিপূর্ণ মুসলমান না হওয়ার আগে তোমরা যেন মৃত্যুবরণ না করো।”–(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০২)। আল্লাহতায়ালা এভাবে মুসলমানের জীবনে নিজে থেকেই প্রায়োরিটি বেঁধে দিয়েছেন। সেটি চাকুরি, ব্যবসাবাণিজ্য, রাজনীতি বা অর্থনীতিতে সাফল্য অর্জন নয়। গর্বিত আরব, বাঙালী, আফগানি, তুর্কি বা ইরানী হওয়া্ও নয়। বরং সেটি নিষ্ঠাবান মুসলমান হওয়া। এবং সেটি হওয়ার জন্য কোন মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়াও জরুরী নয়। বরং সে জন্য অপরিহার্য হলো, বিশ্বাস ও কর্মে পরিপূর্ণ ইসলামী বিপ্লব। সে বিপ্লব একমাত্র আল্লাহর ভয়ই আনতে পারে। আল্লাহর সে ভয়টি আসে কোরআনে বর্ণিত কোরআনী জ্ঞান থাকে। মহান আল্লাহতায়ালা তাই বলেন, “তাঁর সকল মানব সৃষ্টির মাঝে একমাত্র জ্ঞানবানরাই আল্লাহকে ভয় করে। –(সুরা ফাতির, আয়াত ২৮)। আল্লাহর এ ভয় তথা তাকওয়াই হলো সফল মানুষ হবার মূল হাতিয়ার। শিক্ষার মূল লক্ষ্য তাই মানুষের মাঝে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করা। সে সাথে সত্য পথে চলা এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হওয়ার সামর্থ সৃষ্টি করা। এবং সেটি ইসলামি জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে। কিন্তু শিক্ষার লক্ষ্য যখন নাস্তিকতা, সেক্যুলারিজম, বস্তুবাদ, জাতিয়তাবাদ, বর্ণবাদের প্রচার হয়, তখন সে শিক্ষা ছাত্রদের জীবনে বিভ্র্রান্তি ও পথভ্রষ্টতা বাড়ায়। এবং তাতে মানুষ ধাবিত হয় জাহান্নামের দিকে। এমন শিক্ষার কারণে শিক্ষিত ব্যক্তিটিও তখন সমাজের অতি অপরাধী দুর্বৃত্ত রূপে বেড়ে উঠে। আরো বাস্তবতা হলো, ধর্মের নামে সমাজে যেরূপ নানারূপ অধর্ম হয়, তেমনি শিক্ষার নামে বহু কুকর্মও হয়। একই ভাবে মানব জীবনে মিথ্যাচর্চা ও ভ্রষ্টতা বাড়ানোর উদ্যোগও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে আধুনিক শিক্ষা রূপে।

 

জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম কাজটি প্রথমে না হলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোও অসমাপ্ত থেকে যায়। ইসলামি শিক্ষা অর্জনের কাজটি তেমনি এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ যা প্রতিটি মানুষের জীবনে সর্বপ্রথম হওয়া উচিত। নইলে অসম্ভব থেকে যায় পরিপূর্ণ মুসলমান হওয়াটি। পবিত্র কোরআনের নাযিলকৃত প্রথম আয়াতগুলি তাই নামায-রোযা-হজ-যাকাত ফরজ করতে নাযিল হয়নি। বরং হয়েছে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করতে। তাই কোরআনের শুরুটি হয়েছে ইকরা অর্থাৎ “পড়ো” দিয়ে। কোরআন পাঠ এবং কোরআনী জ্ঞান ব্যক্তিকে ওহীর জ্ঞান দেয়। দেয় সিরাতুল মোস্তাকীমে চলার সামর্থ। ইসলামে জ্ঞানার্জন তাই অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। অন্যান্য ইবাদতের মূল্য এবং সে সাথে মহান আল্লাহর কাছে সে ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে গভীর জ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটায়। নইলে ইবাদত নিছক প্রাণহীন আনুষ্ঠিকতায় পরিণত হয়। এমন জ্ঞানহীন ও প্রাণহীন ইবাদত ব্যক্তির জীবনে কোন বিপ্লব আনে না, তাতে তার কর্ম, চরিত্র ও আচরণে কোন পরিবর্তনও আসে না। এমন ইবাদত ব্যক্তিকে মিথ্যাচারী, পাপাচারী ও দূবৃত্ত হওয়া থেকেও বাঁচায় না। বরং মুসলিম নামধারি এমন ইবাদতকারিরা দুর্বৃত্তিতে কাফেরদেরও অনেক সময় হারিয়ে দেয়। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে এক উজ্বল উদাহরণ।

 

 

বিশ্বের খুব কম দেশেই বাংলাদেশের ন্যায় এত মসজিদ এবং মসজিদে গমনকারি এত মুসলমান আছে। দেশটির ১৬ কোটি জনসংখ্যার শতকরা ৯০ জনই মুসলমান। মুসলমানের ঈমান তাঁর কর্ম ও আচরণের মধ্য দিয়ে কথা বলে। তাই প্রাথমিক যুগের মুসলমানেরা বাংলাদেশের একটি থানার সমান জনসংখ্যা নিয়ে সৎ কর্ম ও সৎ আচরণে বিশাল এলাকা জুড়ে প্লাবন এনেছিলেন। গড়ে তুলে ছিলেন মানব ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। কিন্তু বাংলাদেশ সে ক্ষেত্রে ইতিহাস গড়েছে দুর্নীতিতে পৃথিবীতে পর পর ৫ বার প্রথম হয়ে। এ ব্যর্থতার কারণ অর্থনৈতিক নয়। দেশের ভূগোল বা জলবায়ুরও নয়; বরং দেশের শিক্ষা-ব্যবস্থা। বলা হয়ে থাকে, ফ্রান্সকে অতীতে সেদেশের মুর্খরা রক্ষা করেছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি আরো বেশী প্রযোজ্য। বাংলাদেশও আজও টিকে আছে দেশের নিরক্ষর কৃষক, শ্রমিক, জেলে, তাঁতীদের নিরলস পরিশ্রমের কারণে। দুর্বৃত্ত ও পরগাছা অফিসারদের কারণে নয়।

 

বাংলাদেশে কলেজ বিশ্ববিদ্যালযের সংখ্যা বেড়েছে। বিপুল ভাবে বেড়েছে ডিগ্রিধারি মানুষের সংখ্যাও। কিন্তু দেশের জন্য কি তারা কোন গৌরব বাড়াতে পেরেছে? বরং দেশ যে দূর্নীতিতে পৃথিবীতে ৫ বার প্রথম হয়েছে সেটি তো এসব ডিগ্রিধারি পেশাজীবী, চাকুরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের কারণে। নিজেদের অপরাধ কর্মে প্রশাসন ও পেশাকে তারা হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। এরা বিপুল সংখ্যায় নিয়োগ নিয়েছে বিদেশী এনজিও ও গুপ্তচর সংস্থার এজেন্ট রূপে। দেশের সাধারণ জনগণ আজ তাদের হাতে জিম্মি। প্রশ্ন হলো, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা লাভে এ শিক্ষাব্যবস্থা কি আদৌ কোন ভূমিকা রেখেছে? বরং নিদারুন ব্যর্থতা বাড়িয়েছে সিরাতুল মোস্তাকীমে চলার। সে সাথে বিদ্রোহী করেছে মহান আল্লাহর শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে। তারা অসম্ভব করেছে দেশে ইসলামের বিজয়। এরূপ শিক্ষাব্যবস্থায় দেশের প্রতিটি মানুষও যদি উচ্চ ডিগ্রিধারি হয় তবে তাতেও কি সিরাতুল মোস্তাকীম বেয়ে পথ চলার সামর্থ বাড়বে? বাড়বে কি উচ্চতর সভ্যতর নির্মাণের সামর্থ?

 

ইসলামে জ্ঞানার্জন এতই গুরুত্বপূর্ণ যে রাতে সামান্য ক্ষণের জ্ঞানার্জনকেও নবীজী (সাঃ) সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। জ্ঞান-বিতরণের বিণিময়ে মুসলমানগণ অতীতে এমনকি যুদ্ধাপরাধীদেরও মুক্তি দিয়েছে। যেমনটি বদর যুদ্ধের কাফের বন্দিদের ক্ষেত্রে ঘটেছে। প্রাথমিক যুগে মুসলমানদের সফলতার বড় কারণ হলো, জ্ঞানার্জনের ফরয কাজটি আদায়ে তারা কোনরূপ আলস্য দেখাননি। কোরআনের তাফসির, ফিকাহ, দর্শন, প্রশাসন, সমরকৌশল, ইতিহাস, ভূগোল, রসায়ন, গণিত শাস্ত্র তথা জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় তারা বিশাল সমৃদ্ধি এনেছেন। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে গর্বের সন্তান তো তারাই। আরবী ভাষায় পবিত্র কোরআনের আগে কোন গ্রন্থ ছিল না। জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে তাদের সফলতা এতটাই বিশাল ছিল যে, অতি স্বল্প সময়ে নিরক্ষরতা থেকে তারা ইতিহাসের সবচেয়ে সুশিক্ষিত মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার। তৎকালীন বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তি রোমান ও পারসিক সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে তাঁরা সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তির জন্ম দিয়েছিলেন। তাদের অভূতপূর্ব এ সাফল্যে খুশি হয়েছিলেন মহান আল্লাহতায়ালাও। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সে ঘোষনাটি পবিত্র কোরআনে এসেছে এভাবে, “রাযীল্লাহু আনহুম ও রাযুউ আনহু”। অর্থঃ আল্লাহ তাদের উপর খুশি এবং তাঁরাও খুশি তাঁর উপর।

 

পাশ্চাত্য সভ্যতার ব্যর্থতা

কৃষি, খনিজ ও কারিগরি সম্পদের আবিস্কারে ও উন্নয়নে পাশ্চাত্যের সভ্যতা যথেষ্ঠ সামর্থ দেখিয়েছে। সামর্থ দেখিছে মানুষের বৈজ্ঞানিক ও পেশাগত সামর্থ বাড়াতেও। কিন্তু সামান্যই উৎকর্ষ বাড়িয়েছে মানুষের আধ্যাত্মীক, নৈতীক ও সাংস্কৃতিক জীবনে। পাশ্চাত্য সভ্যতার অগ্রগতি মূলতঃ একমুখি, তার সমস্ত সামর্থ নিয়োজিত হয়েছে একমাত্র বৈষয়ীক উন্নয়নে। বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের ফলে তাদের সমাজের অতি লোভী ও নিষ্ঠুর দুর্বৃত্তগুলোও মানব সভ্যতার অতি ধ্বংসাত্মক হাতিয়ারগুলো হাতে পেয়েছে। ফলে ভয়ানক ভাবে বেড়েছে যুদ্ধ, নির্যাতন, শোষন ও গণহত্যা। নিষ্ঠুর বর্বরতায় তাদের ইতিহাস হালাকু চেঙ্গিজের চেয়েও রক্তাত্ব। যুদ্ধবিমান, ভারি পাল্লার কামান, ট্যাংক, রাসায়নিক অস্ত্র ও পারমাণবিক বোমার কারণে গণহত্যা ও নিষ্ঠুর ধ্বংসযজ্ঞে তাদের সামর্থ হালাকু চেঙ্গিজের চেয়েও লক্ষ গুণ বেড়েছে। ফলে মার্কিন, জার্মান, ব্রিটিশ, ফরাসী, ইটালীয়, স্পানীশ, ডাচ, বেলজিয়ান -পাশ্চাত্য সভ্যতার এ শ্রেষ্ঠ তারকাদের হাতে বিগত মাত্র একশত বছরে যত মানুষের প্রাণনাশ ঘটেছে মানব ইতিহাসের বাদবাঁকি সমগ্র ইতিহাসে সম্ভবতঃ তার সিকি ভাগও হয়নি। মাত্র দুটি বিশ্বযুদ্ধেই ৭ কোটির বেশী মানুষকে তারা হত্যা করেছে। সর্বকালের সকল হিংস্র জানোয়ার মিলেও এত মানুষের প্রাণনাশ ঘটাতে পারেনি। পশুর পেট পূর্ণ হলে সে আর শিকার ধরে না। কিন্তু পাশ্চাত্যের গণহত্যার ক্ষুধাটি পূর্ণ হওয়ার নয়। তাদের যুদ্ধাস্ত্র এখনও তাই লাগাতর গণহত্যায় ব্যস্ত আফগানিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, পাকিস্তানসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে। তারা এক পর্যায়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতি টেনেছিল। কিন্তু এ চলমান তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোন বিরতি নেই। শুধু বিশ্বযুদ্ধ নয়, উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ, জাতিগত নির্মূল, পুঁজিবাদী শোষণের ন্যায় ভয়ানক কুকীর্তিগুলোও পাশ্চাত্যের নিজস্ব আবিস্কার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রেড ইন্ডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ায় এ্যাব অরিজিন, নিউজিল্যান্ডে মাউরী আদিবাসীগণ প্রায় নির্মূল হয়েছে তো তাদের হাতে। তারা নাগাসাকি ও হিরোশিমার নিরস্ত্র নারীপুরুষের মাথার উপর পারমানবিক বোমা ফেলতেও ইতস্ততঃ করেনি। এই হলো পাশ্চাত্য সভ্যতার নৈতীক মান! প্রখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা একেই বলেছেন মানব সভ্যতার শেষপ্রান্ত। কার্ল মার্কসের কাছে যেমন ছিল কম্যুনিজম, ফুকুইয়ামার কাছে সে শেষপ্রান্তটি হলো লিবারেল ডিমোক্রাসি। তাঁর কথায় সভ্যতার ইঞ্জিন যাত্রাপথের শেষ মাথায় এসে গেছে, সামনে আর কোন নতুন স্টেশন নেই। ফলে সভ্যতার উৎকর্ষের আর কোন নতুন টার্গেটও নেই। -(সূত্রঃ The End of History and the Last Man).

 

পাশ্চাত্য সভ্যতার এখানেই বড় ব্যর্থতা। সে সাথে বড় ক্রাইসিস। আর এ ব্যর্থতা ও ক্রাইসিসের মূল কারণ তাদের শিক্ষাগত ব্যর্থতা। পাশ্চাত্যের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিজ্ঞানের পাঠ দিলেও মানবতা ও আধ্যাত্মীকতার পাঠ দেয়নি। ফলে পাশ্চাত্যের সেক্যুলার মানুষটি পায়নি আখেরাতের সন্ধান। এতে অনন্ত অসীম পরকালীন জীবন তাদের কাছে অজানাই রয়ে গেছে। কোটি কোটি আধুনিক মানুষের জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা। ফলে পাশ্চাত্যের মানুষ পায়নি পরকালে জবাবদেহীতার চেতনা। পাশ্চাত্যের মানুষ এভাবে হারিয়েছে তাদের জীবনে নৈতীক কম্পাস। হারিয়েছে মানবতা। এজন্যই ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তানের ন্যায় যে দেশেই তারা যুদ্ধে নেমেছে সেদেশের নিরীহ নারী-পুরুষ-শিশুর মাথার উপর হাজার হাজার টন বোমা ফেলতে তাদের বিবেকে দংশন হয়নি। দংশন হয়নি পারমানবিক বোমা নিক্ষেপেও।

 

ইসলামের অতীত সফলতা

ইসলামের মূল লক্ষ্য মানবের সার্বিক কল্যাণ। সেটি যেমন এ দুনিয়ায়, তেমনি আখেরাতে। আর সে কল্যাণ সাধনে ইসলামের একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপও রয়েছে। সে রোডম্যাপটি মুসলমানদের নিজেদের আবিস্কার নয়, বরং মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া। সেটি হলো কোরআন বর্নীত সিরাতুল মোস্তাকীম। মানব কল্যাণ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে ঘটে না। সে জন্য চাই মানুষের আধ্যাত্মীক উন্নয়ন। আধ্যাত্মীক উন্নয়নের বলেই মানুষ তার জীবনে নীতি-নৈতিকতার সঠিক কম্পাস খুঁজে পায়। সুস্থ্য সভ্যতার নির্মানে এ হলো ন্যূনতম প্রয়োজন। তখন যুদ্ধে নেমে নিরীহ নরনারী-শিশু হত্যা দূরে থাক আল্লাহভীরু মানুষটি গাছপালারও ক্ষতি করে না। কারণ সে অপরাধ কর্মটিও তাঁকে আল্লাহর দরবারে যুদ্ধাপরাধী করে। মানব সৃষ্টি এভাবেই সত্যিকার মানবিক পরিচয় পায়। মিশরের পিরামিড, চীনের গ্রেটওয়াল ও পাশ্চাত্যের যাত্রিক সভ্যতা থেকে ইসলামের সভ্যতার এখানেই বড় পার্থক্য।

 

সভ্যতার নির্মানে ইসলাম শুধু ইটপাথর ও কারিগরির প্রকৌশলের মিশ্রণ ঘটায় না, আধ্যাত্মীক উৎকর্ষেরও মিশ্রণ ঘটায়। সভ্যতা এখানে মানবিক পরিচয়টি পায়। আর সে আধ্যাত্মীক উৎকর্ষ সাধনে কে কতটা সফল হলো তার মধ্য দিয়েই মানব জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা্টি হয়। সে পরীক্ষায় যারা কীতকার্য হয় তাদের সহায়তায় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতারা নেমে আসে। যেমন বদর ও হুনায়ুনের রণাঙ্গণসহ বহু রণাঙ্গনে ঘটেছিল। আাল্লাহর সাহায্য লাভের ক্ষেত্রে এ নৈতীক ও আধ্যাত্মীক সামর্থ অর্জনটি হলো পূর্বশর্ত্ব। নইলে মহান আল্লাহর সাহায্য আসে না। তাই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তাদের সাহায্য করেন না যারা নিজেরা নিজেদের সাহায্য করে না।” –(সুরা রা’দ, আয়াত ১১)। বাংলাদেশীদের ন্যায় যারা দুর্নীতিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে তারা যে সেরূপ আধ্যাত্মীক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এবং সে সামর্থ অর্জনে নিজেরা নিজেদের যে কোনরূপ সাহায্যই করেনি তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ থাকে? ফলে এমন ব্যর্থদের কি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য জুটে? বরং তাদের পিছনে তখন আযাব ধাওয়া করে। সন্ত্রাস, গুম, হত্যা, দুর্ভিক্ষ, দূর্নীতি, বিশ্বজুড়া অপমান ও শত্রুশক্তির আগ্রাসন তখন সে আযাবের হাতিয়ার রূপে হাজির হয়।

 

শিক্ষাই মানব জীবনে বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাবি। শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষ তার নিজ জীবনে মূল্য সংযোজন ঘটায়। কর্ম ও চরিত্রে আনে বিপ্লব। এজন্যই ইসলাম তার মিশনের প্রথম দিনটি থেকেই জ্ঞানার্জনকে গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে যে দেশের মানুষ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও নিরক্ষর ও জ্ঞানহীন থেকে যায়, বুঝতে হবে ইসলামের মূল শিক্ষা তাদের জীবনে প্রবেশ করেনি। ইসলাম-কবুল তাদের জীবনে অপূর্ণাঙ্গই রয়ে গেছে। যারা শিক্ষাকে অবহেলা করে, বুঝতে হবে তারা আল্লাহ এবং তারা কোরআনী নির্দেশনাকেও অবহেলা করে। এমন অবহেলা নিয়ে কেউ কি নৈতীক ও আধ্যাত্মীক বল নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে? এমন মানুষদের দেশ দুর্বৃত্তিতে রেকর্ড গড়বে এবং সন্ত্রাসে ভরে উঠবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? শিক্ষার মাধ্যমেই প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের জীবনে আধ্যাত্মীক বিপ্লব এসেছিল। পাল্টে গিয়েছিল তাদের জীবনদর্শন, ধর্মকর্ম, আচরণ ও চরিত্র। তারা পরিণত হয়েছিলেন মহামানবে। সেকালে মুসলমানদের কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। কিন্তু প্রতিটি ঘর এবং প্রতিটি মসজিদ পরিণত হয়েছিল বিদ্যালয়ে। প্রতিটি মুসলমান পরিণত হয়েছিলেন আমৃত্যু ছাত্র এবং সে সাথে শিক্ষকে। নবীজী (সাঃ) স্বয়ং ছিলেন মহান শিক্ষক। শিক্ষক হওয়া তাই শ্রেষ্ঠ সূন্নত। নবীজী (সাঃ)র মাদ্রাসা শুধু মসজিদে নববী ছিল না, বরং মক্কা ও মদিনার প্রায় প্রতিটি অলিগলি। এবং সে সাথে নিজের এবং প্রতিবেশীর গৃহ। বলা যায়, সমগ্র মদিনা পরিণত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। নবীজী (সাঃ) বলেছেন, “প্রত্যেকের মুসলমানের জীবনে দুটি অবস্থা। হয় সে ছাত্র, নইলে সে শিক্ষক।” ঈমানদারের জীবনে এছাড়া তৃতীয় অবস্থা নেই। তাই ইসলাম কবুলের পর কোন ব্যক্তি আমৃত্যু ছাত্রে পরিণত হলো না এবং শিক্ষকও হলো না -সেটি কি হতে পারে? অথচ আজকের মুসলমানদের মাঝে এমন মানুষের সংখ্যা কি কম যারা বেঁচে আছে ছাত্র ও শিক্ষক হওয়ার কোন অভিজ্ঞতা না নিয়েই? এবং সে অবস্থায় তারা দুনিয়া থেকে বিদায়ও নিচ্ছে! এটি কি কম ব্যর্থতা?

 

একমাত্র পথ

মুসলমানদের জীবনে ইসলাম যে কীরূপ আধ্যাত্মীক বিপ্লব এনেছিল তার উদাহরণ দেয়া যাক। কোন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান দূরে থাক কোন মন্ত্রীও কি কখনো একাকী রাস্তায় বেরুয়? বাংলাদেশে রাষ্ট্রপ্রধান বা মন্ত্রী দূরে থাক, ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বরও একাকী রাস্তায় নামে না। সেটিকে তারা অমর্যাদাকর ও শক্তিহীনতা ভাবে। ফলে তারা এক পাল সাঙ্গপাঙ্গ সাথে নিয়ে চলাফেরা করে। অথচ খলিফা হযরত উমর রাতের আঁধারে একাকী আটার বস্তা কাঁধে নিয়ে দুস্থ্য মানুষের ঘরে পৌছে দিয়েছেন। মদিনী থেকে জেরুজালেম অবধি ৫ শত মাইলের অধিক পথ একজন মাত্র চাকরকে নিয়ে তিনি সফর করেছেন। কখনো নিজে বা কখনো চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে পালাক্রমে তিনি উঠের রশি টেনেছেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে এমন নজির কি কোথাও একটি বারের জন্যও নির্মিত হয়েছে? তবে এমন উন্নত নৈতীকতায় হযরত উমর একাকী ছিলেন না। নবীজীর বহু সাহাবী ছিলেন একই রূপ চরিত্রের অধিকারি। মুসলমানগন সে আমলে উড়াজাহাজ বানাতে না পারলেও এরূপ অসংখ্য মানুষ তৈরী করতে পেরেছিলেন। সমগ্র মানব ইতিহাসের তারাই তো শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা তো নির্মিত হয়েছিল তাদের কারণেই। আজও কি সভ্যতর রাষ্ট্র ও সভ্যতা নির্মাণের ভিন্ন পথ আছে? ইসলাম ছাড়াও ভিন্ন পথ আছে সেটি বিশ্বাস করলে কি মুসলমানের ঈমান থাকে? ৩/৬/১২



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Monday, 04 June 2012 07:38
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.