Home •বাংলাদেশ সরকারের জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসঃ জনগণ কী করবে?
সরকারের জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসঃ জনগণ কী করবে? PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Friday, 27 February 2015 01:41

কেন এতো সন্ত্রাস?

রাজনীতিতে লড়াই থাকবে এবং যুদ্ধ হবে -সেটি শুধু স্বাভাবিকই নয়,অনিবার্যও। লড়াই এখানে ক্ষমতা দখলের।মানুষ শুধু পেটের ক্ষুধা নিয়ে জন্মায় না, জন্মায় ক্ষমতার ক্ষুধা নিয়েও।তাই মানব ইতিহাস জুড়ে লড়াই শুধু খাদ্যপানীয় ও সম্পদের সংগ্রহে নয়,বিপুল আয়োজন যুদ্ধ-বিগ্রহ নিয়েও। এটি এক আদিম বাস্তবতা। কোন দলের নেতা বা নেত্রীকে তাই ফেরেশতা ভাবার সুযোগ নেই। গ্রীক দার্শনিক এ্যারিস্টোটল মানুষকে সংজ্ঞায়ীত করেছেন রাজনৈতিক জীব (পলিটিক্যাল এ্যানিমাল)রূপে।যাদের জীবনে রাজনীতি নাই -এ্যারিস্টোটলের দৃষ্টিতে তারা নিছক পশু,পূর্ণাঙ্গ মানব নয়।এটিই হলো মনুষ্যপ্রাণীর সেক্যুলার পরিচয়। ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব এ্যারিস্টোটলের ধারণাকে আরো শক্তিশালী করেছে। কারণ ডারউইনের বিশ্বাস,মানব সৃষ্টির শুরুটি মানব রূপে হয়নি,তার বর্তমান দৈহিক রূপটি এসেছে লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ধারায়। ডারউইনের ধারণা,অন্যান্য জীবজন্তুর ন্যায় মানুষও এক প্রজাতির পশু। এভাবে স্রষ্টা রূপে অস্বীকার করা হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালাকে। দেয়া হয়েছে “struggle for existence and survival of the fittest” এর তত্ত্ব,এবং এভাবে জায়েজ করা হয়েছে অবিরাম যুদ্ধ,যুদ্ধে প্রাণনাশ, এবং দুর্বলের নির্মূলের মধ্য দিয়ে সবলের বেঁচে থাকাকে। জন্ম লাভ করেছে সাম্রাজ্যবাদ,উপনিবেশবাদ ও বর্ণগত নির্মূলের ন্যায় নানারূরিপ ভয়ংকর মতবাদ। এভাবে বিজ্ঞানের নামে মানবের পশুসুলভ হিংস্র আচরণকে বৈধতা দেয়া হয়েছে।

 

পশুরা বনেজঙ্গলে লড়াই করে পশুসুলভ হিংস্রতা নিয়ে।পশুর হিংস্রতার লক্ষ্য প্রতিপক্ষ পশুর হত্যা। অনুরূপ সহিংস ত্রাস থাকে সেক্যুলার মানব-পশুদের মাঝেও। আর যাতে ত্রাস তাই তো সন্ত্রাস।তবে পার্থক্য হলো পশুর সন্ত্রাসে রাজনীতি থাকে না,কিন্তু থাকে মানুষের সন্ত্রাসে। সন্ত্রাস তখন ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এদিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী দেশ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিনী সন্ত্রাসের ভয়ে দেশটি এ্যাটোম বোমা,রাসায়নিক বোমা,ক্লাস্টার বোমা,মিজাইল ও ড্রোন দিয়ে অন্যদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করলেও বহুদেশই সে নৃশংস বর্বরতার নিন্দা করে না। জাতিসংঘে মার্কিনীদের বিরুদ্ধে ভোটও দেয় না। ফলে ভয়ানক খুনিরাও তখন নির্দোষ থেকে যায়। পশু সমাজে হিংস্র ত্রাসের এরূপ রাজনৈতিক প্রয়োগ নাই। পশুরা হিংস্রতা দেখায় স্রেফ বাঁচার স্বার্থে, রাজনৈতিক স্বার্থে নয়। মানুষকে রাজনৈতিক পশু বলার সম্ভবত সেটিই কারণ। রাজনীতির সাথে সন্ত্রাসের সংমিশ্রণ ঘটলে সন্ত্রাস তখন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক রূপ পায়। যুদ্ধ তখন বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়। বিশ্বব্যাপী ত্রাস সৃষ্টির সে লক্ষ্য নিয়েই মার্কিনীগণ ভিয়েতনাম,আফগানিস্তান ও ইরাকে আগ্রাসন করে। আজও  মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ড্রোন হাজার হাজার মাইল দূরে থেকে মুসলিম ভূমিতে হামলা করছে।মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে যত রক্তপাত ও প্রাণনাশ হয়েছে তা হিংস্র পশুর নখরে ঘটেনি।ঝড়,প্লাবন বা ভূমিকম্পেও হয়নি।ঝরেছে সহিংস মানুষের হাতে। সে সন্ত্রাসের রাজনীতিতে হিন্দু রাজা শংকরাচর্যের বাহিনীর হাতে ভারতের বৌদ্ধগণ,ইউরোপিয়ানদের হাতে আমেরিকার রেড-ইন্ডিয়ানগণ,খৃষ্টানদের হাতে স্পেনের মুসলমানগণ নির্মূল হয়ে গেছে।

 

জঙ্গিবাদী সরকার

মানব ইতিহাসের বড় সন্ত্রাসী চোর-ডাকাতেরা নয়,মহল্লার পেশাদার খুনিরাও নয়। বরং সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হলো স্বৈরাচারি শাসকগণ। সন্ত্রাস তখন আর মুষ্টিমেয় দুর্বৃত্তদের হাতে সীমিত থাকে না। সে সন্ত্রাস স্রেফ চুরিডাকাতি ও মানব খুনের মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি তখন জনগণের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হয়।লুন্ঠিত হয় দেশের রাজস্ব ভান্ডার। সে সন্ত্রাসে ব্যবহৃত হয় দেশের পুলিশ,সেনাবাহিনী,গোয়েন্দা বাহিনী এবং সমগ্র প্রশাসন। নির্যাতন ও হত্যার কাজে তখন সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ঘটে। বিদেশী শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য যে অস্ত্র-ভান্ডার গড়ে তোলা হয় সে ভান্ডারের অস্ত্র তখন দেশবাসীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। ২০১৩ সালের ৫ই মে সেনাবাহিনীর কামান ও গোলাবারুদ ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে আনা হয়েছিল।হত্যাকান্ড তখন ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল স্কেলে হয়। তাই সে রাতে কয়েক ঘন্টার সরকারি সন্ত্রাসে হাজার হাজার মানুষ হতাহত হয়েছিল। লাশ গায়েব করা হয়েছিল সিটি কর্পোরশনের ময়লার গাড়িতে তুলে। আওয়ামী বাকশালীদের শাসনামলে বাংলাদেশে সেটিই বারবার ঘটেছে। সরকার প্রতিবারই জঙ্গিবাদী সন্ত্রাস নিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে হামলা করেছে। ৩০ হাজার মানুষ খুনে মুজিবকে তাই বেগ পেতে হয়নি।

 

আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানও মুজিবকে জেলে নিয়েছিল। কিন্তু তাকে রিম্যান্ডে নিয়ে দৈহীক নির্যাতন করেনি,হত্যাও করেনি। আইয়ুব খানের আমলে জেলখানায় মুজিবের প্রথম শ্রেণী মিলেছিল।ইয়াহিয়া খান মুজিবকে কোন জেলের প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ না রেখে পুরা একটি গৃহকে তার বাসগৃহে পরিনত করেছিল। মুজিব পরিবারের ভরনপোষণের জন্য উচ্চহারের ভাতার ব্যবস্থা করেছিল। শেখ মুজিবের স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের জন্য ঢাকাস্থ সামরিক হাসপাতালে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা করেছিল। অথচ মুজিবের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের গুরুতর অভিযোগ। সেটি ছিল রাষ্ট্রদ্রোহের এবং সে সাথে শত্রুদেশের চর হওয়ার। অপর দিকে মুজিব ও হাসিনার আচরণ? বিরোধী নেতার পায়ে ডান্ডা বেরি পড়ানো হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেত্রীর গৃহে শেখ হাসিনার সরকার খাবারও পৌঁছতে দিচ্ছে না। খালেদা জিয়ার গৃহে মন্ত্রী ও দলীয় ক্যাডারগণ আগুন দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। হুমকি দিচ্ছে তাঁকে কারারুদ্ধ করার। মুজিবের জেলে সিরাজ সিকদার প্রাণে বাঁচেনি,প্রাণে বাঁচেনি মুসলিম লীগের প্রবীন নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীও। স্রেফ রাজনৈতীক কারণে বাঁচতে দেয়া হয়নি প্রায় ৩০ হাজার বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীকে;মুজিবের রক্ষিবাহিনী তাদেরকে নির্মম ভাবে হত্যা করেছে। শেখ হাসিনার সরকার হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করে রিম্যান্ডে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করছে। গ্রেফতারের পর হত্যা করে বন্দুকযুদ্ধের কিসসা শুনাচ্ছে। কখনো বা বলা হচ্ছে নিহত ব্যক্তিগণ গণপিটুনিতে মারা গেছে। একাত্তরের খুনের অপরাধ এনে ইসলামপন্থিদেরকে ফাঁসিতে ঝুলানো হচ্ছে।অথচ হত্যা কি শুধু একাত্তরে হয়েছিল? ৩০ হাজারের বেশী মানুষকে হত্যা করা হয়েছে মুজিবামলে। হত্যা ও গুম করা হচ্ছে হাসিনা সরকারের আমলে। কিন্ত একাত্তর-পরবর্তী এরূপ অগণিত খুনের অপরাধে ক’জনকে আদালতে তোলা হয়েছে? ক’জনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে?

 

সন্ত্রাসের বিস্ফোরণ

নেকড়ে যে দেশে বা যে বনেই বাস করুক,তার হিংস্রতা সর্বত্রই সমান। তেমনি অবস্থা স্বৈরাচারি শাসকদেরও। পশুর ন্যায় স্বৈরাচারি শাককদের সামনেও পরকালের ভয় থাকে না। পরকালের ভয় যেরূপ ব্যক্তির সহিংসতায় ব্রেকের কাজ করে,সেক্যুলার রাজনীতিতে সেটি থাকে না। ফলে বর্বরতা সে রাজনীতিতে অতিশয় নৃশংস ও সীমাহীন হয়। তখন সন্ত্রাসের বিস্ফোরণ ঘটে। হালাকু-চেঙ্গিজ-হিটলার-স্টালিনদের বর্বরতা তাই সেক্যুলার রাজনীতিতে বার বার ফিরে আসে। মানব জাতির ইতিহাসে সন্ত্রাসী রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ ঘটেছে ইউরোপে।ইউরোপীয়দের সে সন্ত্রাসী চেতনা থেকেই জন্ম নেয় উপনিবেশবাদ,সাম্রাজ্যবাদ,বর্ণবাদ,বর্ণীয় নির্মূলবাদ (এথনিক ক্লিন্জিং),ফ্যাসীবাদ ও মার্কসবাদের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে হিংস্রাত্মক ও ধ্বংসাত্মক মতবাদ।সে সন্ত্রাসের সবচেযে ভয়ানক বিস্ফোরণ ঘটে দু’টি বিশ্বযুদ্ধে -যাতে মৃত্যু ঘটে প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষের এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় শত শত নগর-বন্দর,রাস্তাঘাট,ক্ষেত-খামার ও কালকারখানা।মাত্র এ দুটি বিশ্বযুদ্ধে যে পরিমাণ সম্পদ ধ্বংস হয় বা সাগরগর্ভে ডুবিয়ে দেয়া হয় তা দিয়ে সমগ্র বিশ্বের মানুষ বহুবছর বিনাশ্রমে খেয়েপড়ে আরাম-আয়াশে বাঁচতে পারতো। আকার-আকৃতিতে মানুষ কীটপত্ঙ্গ,শাপশকুন বা গরুছাগল না হলেও সে অন্য প্রজাতির পশু মাত্র -সে তত্ত্বটি প্রবলতর হয় চেতনা রাজ্যে মার্কসবাদ প্রবলতর হওয়ার ফলে। কারণ,মার্কসবাদের মধ্যে স্থান পায় মানব-সৃষ্টির বিষয়ে ডারউনের দেয়া বিবর্তনবাদের তত্ত্ব ও সেসাথে নিরেট বস্তুবাদ। এমন একটি চেতনার কারণে মার্কসবাদীদের কাছে মানুষ হত্যাটি মশামারি ও কুকুর-শৃগাল হত্যার ন্যায় অতি তুচ্ছ ঘটনা গণ্য হয়। এভাবে মানব জীবনের সবচেয়ে বড় অবমূল্যায়ন হয় বস্তুত মার্কসবাদী নাস্তিকদের হাতে। বিপ্লবের নামে বিপুল সংখ্যক মানবহত্যা তখন মামূলী বিষযে পরিণত হয়। সোভিয়েত রাশিয়ার বুকে প্রায় কোটি মানুষ নিহত হয় সেদেশের স্বৈরাচারি শাসক জোসেফ স্টালিনের হাতে। বিশ লাখেরও বেশী মানুষকে হত্যা করেছিল ক্যাম্বোডিয়ার মার্কসবাদী পলপর্ট সরকার। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে চীনে বহুলক্ষ মানুষকে হত্যা করে চেয়ারম্যান মাও সে তুং। একই রূপ হত্যাযজ্ঞে নেমেছিল ভারতীয় নকশালীরা। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও অতি ঘাতক জীব হলো মার্কসবাদীরা। সমাজতন্ত্র, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, কম্যুনিজমের নামে বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে বিশেষ করে যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা এলাকায় কম্যুনিষ্টদের নানা দল,উপদল ও জাসদের গণবাহিনী বিগত কয়েক দশক ধরে শ্রেণীশত্রু নির্মূলের নামে হত্যা করেছে মামূলী আয়ের শত শত কৃষক ও ব্যাবসায়ীদের। এখনও সেটি অবিরাম চলেছে। সেসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের আজ  অবধি বিচার হয়নি,দমনও হয়নি। দেশের প্রশাসন,মিডিয়া ও রাজনৈতীক দলগুলোর কাছে সে হত্যাকান্ডগুলো এমনকি সন্ত্রাস রূপেও চিহ্নিত হয়নি। বরং সে মার্কসবাদী সে ঘাতক চেতনা নিয়েই অনেক বামপন্থি আজ  আওয়ামী বাকশালীদের সাথে একাত্ম হয়ে ইসলাম ও ইসলামপন্থিদের নির্মূলে নেমেছে। ফলে নির্যাতন,জেল-জুলুম ও মানবহত্যা এখন আর মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসীর হত্যাকান্ড নয়,সেটিই এখন স্বৈরাচারি সরকারের রাষ্ট্রীয় নীতি। সে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে যোগ দিয়েছে শুধু ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র ক্যাডারগণই নয়,বরং দেশের পুলিশ বাহিনী, র‌্যাব বাহিনী,বিজিবি ও সেনাবাহিনী।এদের বন্দুকের নল এখন জনগণের দিকে। তাদের গুলিতে অগণিত লাশ পড়ছে পথেঘাটে। রাজনৈতিক শক্তির মূল উৎস এখন আর ভোট নয়,বরং সেটি আজ  বন্দুকের নল।

 

বিজয়ী নির্মূলের রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে চেতনাটি আজ  বিজয়ী তা হলো সেক্যুলার চেতনা। সে অভিন্ন চেতনা নিয়েই রাজনীতি ছিল শেখ মুজিবের ও তার দলবলের। সেক্যুলারিজমের অভিধানিক অর্থ হলো ইহজাগতিকতা। অর্থাৎ ইহলৌকিক কল্যাণের ভাবনা তথা দুনিয়াবি স্বার্থসিদ্ধি। এমন চেতনায় বিলূপ্ত হয় পরকালের ভয়,থাকে না মহান আল্লাহতায়ালার কাছে জবাবদেহীতার ভয়ও। পরকাল-ভীতি,ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জান্নাত লাভের ভাবনা সেক্যুলার চেতনায় পশ্চাৎপদতা ও সাম্প্রদায়িকতা গণ্য হয়। তাতে বিলুপ্ত হয় বক্তির কর্ম ও আচরণের উপর আল্লাহভীতি,উচ্চতর মূল্যবোধ ও ধর্মীয় চেতনার নিয়ন্ত্রণ। সেরূপ নিয়ন্ত্রন জন্তু-জানোয়ারের মাঝে না থাকার কারণে সহিংস হওয়াটাই তাদের রীতি। তেমনি স্বার্থ শিকারে সহিংস হওয়াটি পরকালের চেতনাহীন সেক্যুলারিস্টদের রীতি। ফলে রাজনীতির ময়দানে তখন প্লাবন আসে বন্য সহিংসতার। ভদ্র ভাবে কথা বলা,সংলাপ করা বা আপোষে তখন রুচি থাকে না। সেটি পশুদের জঙ্গলে যেমন থাকে না, তেমনি বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের মাঝেও নাই।তাই মারামরি শুধু রাজপথেই নয়,সেটি যেমন সংসদে, তেমনি টিভির টকশোতেও। আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খান যেমন সকল দলের নেতাদের নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক করেছিলেন সেটি হাসিনা রাজনীতিতে ভাবাও যায় না। সে মুজিবের রাজনীতিতেও ছিল না। তাদের রাজনীতিতে শুধু একটিই সুর –সেটি নির্মূলের।এবং সে নির্মূলের লক্ষ্য হলো দেশের বিরোধী দল বিশেষ করে ইসলামপন্থিরা।

 

সেক্যুলারিস্টদের সহিংস রাজনীতিতে বাংলাদেশে আজ যেমন রক্ত ঝরছে,তেমনি অতীতেও ঝরেছে। সেটি যেমন রাজপথে,তেমনি সংসদের অভ্যন্তরেও। পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের অভ্যন্তরে আহত হয়েছেন এবং পরে প্রাণ হারিয়েছেন সে পরিষদের ডিপুটি স্পীকার জনাব শাহেদ আলী।১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী ক্যাডারগণ বিরোধীদের নির্বাচনি জনসভাও করতে দেয়নি। ১৯৭০ সালের ১৮ই জানুয়ারির পল্টন ময়দানের জামায়াতে ইসলামীরে জনসভাতে নির্মম ভাবে হত্যা করে তিনজন জামায়াত কর্মীকে। আহত করে শতাধিক ব্যক্তিকে। সন্ত্রাসী হামলায় পন্ড করে দেয় ২৫ই জানুয়ারির মুসলিম লীগের পল্টনের জনসভা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এভাবেই বিজয় ঘটেছে সন্ত্রাসের।সন্ত্রাসের সে রাজনীতি তীব্রতর করতেই বাকশালী আওয়ামী ক্যাডারগণ বিরোধী দলে থাকা কালে লাঠি,লগি-বৈঠা,পিস্তল-বন্দুক ও গানপাউডার নিয়ে রাজপথে নেমেছে।আগুণ দিয়ে নিরীহ যাত্রীদের পুড়িয়ে মেরেছে। তখন শেখ হাসিনার নির্দেশ দিয়েছিল এক লাশের বদলে দশলাশ ফেলার।ক্ষমতায় গিয়ে শেখ মুজিব যেমন হত্যাকান্ড চালিয়েছে,তেমনি চালাচ্ছে শেখ হাসিনাও।

শেখ হাসিনার দ্বিতীয়বার গদীতে বসার পর তার দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে এখন আর শুধু দা-কুড়াল,কিরিচ,বন্দুক নয়,তাদের হাতে এখন সমগ্র পুলিশবাহিনী,র‌্যাববাহিনী,বিজিবি,সেনাবাহিনী,প্রশাসন ও আইন-আদালত এবং রাষ্ট্রীয় অস্ত্র ভান্ডারের সমগ্র অস্ত্র। ফলে চরম আকার ধারণ করেছে মানব হত্যা। লাশ পড়ছে প্রতিদিন। ধ্বংস হচ্ছে নিরস্ত্র ও নিরীহ মানুষের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্য।যে কোন দেশে সরকারের মূল দায়িত্ব হলো জনগণের জানমালের হেফাজত। কিন্তু সে দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশ সরকারের আগ্রহ নাই। সরকারের সেটি প্রায়রিটিও নয়। জনগণের জানমাল তাই সবচেয়ে অরক্ষিত। ফলে ব্যাপক ভাবে বেড়েছে হত্যা,ধর্ষণ,চুরি-ডাকাতি  ও লুটতরাজ। পুলিশ,র‌্যাব বিজিবি ও সেনাবাহিনীর কাজ হয়েছে স্রেফ স্বৈরাচারি সরকারের গদীর পাহারাদারি।শাসকদের কাছে সমগ্র দেশ গণ্য হচ্ছে গণিমতের মাল রূপে। সে কায়েমী স্বার্থের প্রতিরক্ষায় রাষ্ট্রের কর্মচারিগণ গণ্য হচ্ছে নিছক ভৃত্য রূপে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমুহের উপর প্রতিষ্ঠিত এরূপ অধিকৃতিকে কোন স্বৈরাচারি শাসক কি সহজে ত্যাগ করে? গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারি শাসকের শত্রুতা এজন্যই এতো প্রকট। শেখ হাসিনা এজন্যই ভোটের রাজনীতিতে আর ফিরতে রাজী নয়। রাজপথের মিটিং-মিছিল ও স্বাধীন পত্র-পত্রিকা প্রকাশের স্বাধীনতাও দিতে রাজি নয়। মানব ইতিহাসে বর্বর স্বৈরাচারিগণ শত শত বছর যাবত ক্ষমতায় থেকেছে স্রেফ অস্ত্রের জোরে,জনগণের দোয়ারে দোয়ারে ভোট ভিক্ষায় যাওয়ার রুচি কোন কালেই তাদের ছিল না। বরং তারা তো চায় জনগণকে ভিক্ষুক করতে। এসব মুখোশধারিরা গণতন্ত্রের বুলি মুখে আনে স্রেফ জনগণকে বোকা বানানোর জন্য। শাসনক্ষমতায় জনগণকে ভাগীদার করার ইচ্ছা এসব স্বৈরাচারিদের কোন কালেই ছিল না। বাংলাদেশে সেটি যেমন মুজিবের ছিল না,হাসিনারও নাই।সেটি থাকলে পুলিশ,র‌্যাব,বিজিবি ও সেনাবাহিনীর বন্দুকের নল কেন জনগণের দিকে থাকবে? লাশ কেন রাজপথে পড়বে? মুজিব একদলীয় বাকশালই বা কেন প্রতিষ্ঠা করবে?

 

মহান আল্লাহতায়ালার ভিশন এবং যে মিশন ঈমানদারের

নাস্তিকদের কাছে মানুষের পরিচয় যাই হোক,সমগ্র বিশ্বজগতের স্রষ্ঠা মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সে পরিচয়টি ভিন্নতর। সেটি সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির। শ্রেষ্ঠতম দৈহীক রূপ ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণাবলি দিয়ে হযরত আদম (আঃ)কে সৃষ্টির পর তিনি ফেরশতাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁকে সেজদা করতে। একমাত্র ইবলিস ছাড়া সকল ফেরেশতাই সেজদাও করেছে। সে বর্ণনাটি এসেছে খোদ মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। অন্য কোন জীবকে মহান আল্লাহতায়ালা সে মর্যদা দেননি। মানব ভিন্ন অন্য কোন জীবকে ফেরশতাগণ সিজদা করেছে বা সম্মান করেছে সে নজির নেই। তবে মানব সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মর্যাদাটি পেয়েছে ফেরেশতাদের সেজদা করার কারণে নয়। সুন্দরতম দেহাকৃতি,কথা বলার শক্তি বা বিদ্যাবুদ্ধির কারণে নয়।সেটি অন্যত্র।সেটি মহান আল্লাহতায়ালার একান্ত প্রতিনিধি তথা খলিফা রূপে নিয়োগপ্রাপ্তির কারণে। মানুষ এ জীবনে পরম গৌরব খোঁজে রাজা,প্রেসিডেন্ট,প্রধানমন্ত্রী,নে তা বা পীরের খলিফা হওয়ার মাঝে। কিন্তু বিশ্বজগতের সর্বশক্তিময় মহান আল্লাহর খলিফা হওয়ার মাঝে যে মহান মর্যাদা তার সাথে কি তার তুলনা হয়? মানব জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এবং বেওকুফি হলো মহান আল্লাহতায়ালার খলিফার মহান মর্যাদাটি ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়া।পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালার রয়েছে নিজস্ব ভিশন। সেটি হলো, তাঁর দ্বীন ইসলামকে সকল ধর্ম ও সকল মতাদর্শের উপর বিজয়ী করা। সে বিজয়ের কাজে মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব খলিফা বা প্রতিনিধি চাই।আর সে কাজে তিনি মানবকে বেছে নিয়েছেন।

 

খলিফার দায়িত্বপালনের কাজটি অজ্ঞতায় বা মুর্খতায় সম্ভব নয়। তবে মানব জীবনের সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা ও ব্যর্থতা নিরক্ষর হওয়া নয়। জ্ঞানবিজ্ঞানের জটিল বিষয়ে অজ্ঞ হওয়াও নয়। বরং সেটি মহান আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত খেলাফতের দায়ভারটির কথা না জানা। আসমান-জমিন,গ্রহ-নক্ষত্র বা বিজ্ঞানের জ্ঞানে অজ্ঞ হওয়াতে মানব জীবনের মূল মিশনটি ব্যর্থ হয় না। কিন্তু ব্যর্থ হয় খেলাফতের দায়ভারটি কি এবং কীরূপে সেটি পালিত হবে -সেটি না জানায়। অফিস-আদালতে চাকুরির প্রথম দিনেই নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে তার নিজ দায়-দায়িত্বটি জেনে নিতে হয়।নইলে সে ব্যক্তি চাকুরিচ্যুত হয়। চাকুরি জীবনে নিজ দায়-দায়িত্বের সে জ্ঞানটুকুই পদে পদে কম্পাসের কাজ করে। মু’মিনের জীবনে তাই নামায-রোযা, হজ-যাকাত ফরজ করার আগে জ্ঞানার্জনকে প্রথমে ফরজ করেছেন।তাই যার জীবনে নামায-রোযা আছে অথচ জ্ঞানার্জনে আত্মনিয়োগ নাই –বুঝতে হবে তার ঈমানদারিতে প্রচন্ড রোগ আছে। সে রোগ নিয়ে তার কোন ইবাদতই সঠিক হওয়ার কথা নয়।খেলাফতের মূল দায়ভারটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা।তাতে প্রতিষ্ঠা ঘটে শরিয়তি আইনের। মানুষের পথচলাটি তখন হয় সিরাতুল মোস্তাকীমের পথে। সে রাষ্ট্রে গড়ে উঠে পবিত্র কোরআনে নির্দেশনা অনুযায়ী উচ্চতর সভ্যতা। দায়িত্বপালনের সে কাজে প্রতি পদে অনুসরণ করতে হয় পবিত্র কোরআনের নির্দেশাবলি ও নবীজী (সাঃ)র সূন্নতকে। যার মধ্যে কোরআন-সূন্নাহর জ্ঞান নাই তার দ্বারা খেলাফতের দায়িত্বপালন কীরূপে সম্ভব? মানব জাতির ব্যর্থতা এক্ষেত্রে বিশাল। খেলাফতের দায়িত্বপালনে নিজ জানমাল ও নিজ সামর্থের বিনিয়োগ দূরে থাক,অধিকাংশ মানুষ পরকালে পাড়ি জমাচ্ছে সে দায়ভারটির কথা না জেনেই। নিয়ামত ভরা মানব জীবনের এর চেয়ে বড় খেয়ানত বা অপচয় আর কি হতে পারে?

 

অনিবার্যতা যেখানে জিহাদের

মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত খেলাফতের দায়ভারের কারণে বেঈমানের রাজনীতি থেকে ঈমানদারের রাজনীতি সব সময়ই ভিন্নতর হয়। ঈমানদারের রাজনীতিতে জনগণের,রাজার বা পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের ধারণা নেই। সার্বভৌমত্ব একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার। সার্বভৌমত্বের দাবিদার হওয়াই অর্থই হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তাই সেটি কুফরি। মুসলমানের রাজনীতি তাই গদীলাভ,অর্থলাভ বা ক্ষমতা লাভের জন্য নয়,বরং তার সবটুকুই মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। এ রাজনীতিতে জিহাদ তাই অনিবার্য হয়ে পড়ে। এমন রাজনীতির সবটুকুই তাই ইবাদত। ফলে এখানে সন্ত্রাস থাকে না,থাকে পরম পবিত্রতা। থাকে মহান আল্লাহতায়ালার পথে ধনসম্পদ ও প্রাণ বিলিয়ে দেয়ার জজবা। থাকে জান্নাত লাভের প্রেরণা।খেলাফতের রাজনীতিতে এজন্যই গণহত্যা থাকে না। কারণ গণহত্যার পথ তো জাহান্নামের পথ। নবীজী (সাঃ)র আমলে মক্কা বিজয়ে তাই রক্তপাত হয়নি। রক্তপাত হয়নি জেরুজালেম বিজয়েও।

 

অপর দিকে সেক্যুলার রাজনীতিতে খেলাফতের বা আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের ধারণা থাকে না। বরং থাকে ইহকালীন স্বার্থ-উদ্ধারের লোভ। ফলে সে রাজনীতিতে থাকে না আল্লাহর পথে জিহাদের ধারণা।থাকে না আত্মত্যাগ বা শাহাদতের ধারণা। যা থাকে তা হলো ক্ষমতাদখল এবং ক্ষমতাদখলের পর সার্বভৌম ও স্বৈরাচারি শাসক হওয়ার লিপ্সা। সেক্যুলার রাজনীতিতে এ জন্যই অনিবার্য হয় পশুসুলভ হিংস্রতা। থাকে গদী দখল ও গদী বাঁচানোর লাগাতর লড়াই। রাজনীতিতে রক্তপাত তখন অনিবার্য হয়। সেক্যুলার রাজনীতি এভাবেই অশান্তি ও আযাব ডেকে আনে। বাংলাদেশের রাজনীতি হলো এর বাস্তব উদাহরণ। এজন্যই এতো রক্তপাত। শেখ মুজিবের গদী রক্ষার রাজনীতিতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের রক্ত ঝরেছে, এবং অবিরাম ঝরছে হাসিনার রাজনীতিতেও। রাজনীতি ও ডাকাতির মধ্যে তখন কোন পার্থক্যই থাকে না।

 

মুসলমানের দেশ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হবে,শরিয়তি বিধান আস্তাকুঁরে স্থান পাবে,প্রতিষ্ঠা পাবে কাফেরদের আইন, দেশ প্লাবিত হবে জুলুমের জোয়ারে এবং ইসলামের পক্ষের শক্তি নিহত,নির্যাতিত ও কারারুদ্ধ হবে -সে দেশে জিহাদ থাকবে না তা কি ভাবা যায়? এমন দেশে মুসলমানগণ কি স্রেফ নামায-রোযা,হজ-যাকাত,দোয়া-দরুদের মধ্য ধর্মপালন সীমাবদ্ধ রাখবে? নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম কি এভাবে ইসলাম পালন করেছেন? তা হলে আবু জেহেল ও আবুল লাহাবদের ন্যায় ইসলামের শত্রুদের নির্মূল করলো কারা? কিভাবে প্রতিষ্ঠা পেল শরিয়তের বিধান? কারাই বা রোমান ও পারসিক -এ দুই বিশাল সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে মুসলমানদের বিশ্বশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা করলো? ইসলাম কি করে বাংলাদেশে এলো? “আমিরু বিল মা’রুফ ওয়া নেহী আনিল মুনকার” অর্থঃ “ন্যায়ের হুকুম এবং অন্যায়ের নির্মূল” –এ হলো মু’মিনের জন্য মহান আল্লাহতায়ালার নির্ধারিত মিশন। এ মিশন নিয়ে ঈমানদারকে প্রতি মুহুর্ত বাঁচতে হয়।নইলে ঈমানের দায়ভার পালিত হয় না। নামায-রোযায় কাজা আছে,কিন্তু এ মিশনে কাজা নেই। এ মিশনে নিষ্ক্রীয় থাকাটি মুনাফেকি। ফলে প্রতিটি মু’মিনের জীবনে এ মিশনে আত্মনিয়োগ অনিবার্য কারণেই এসে যায়। ঈমানদারের জীবনে সেটিই তো জিহাদ।

 

ঈমানদারের দু অবস্থা

ঈমানদারের জীবনে দুই অবস্থা। হয় সে জিহাদের ময়দানে যুদ্ধাবস্থায় থাকবে,নতুবা জিহাদের প্রস্তুতি নিবে। এছাড়া তৃতীয় অবস্থা নেই। একমাত্র জিহাদের মাধ্যমেই সে ইসলামের শত্রুপক্ষকে পরাজিত করে। তখন বিলুপ্ত করে জুলুম এবং প্রতিষ্ঠা দেয় শান্তির। জিহাদ মু’মিনকে জান্নাতের দরজার সামনে এনে খাড়া করে। জিহাদে জানমালের বিনিয়োগের মাধ্যমে সে পায় শহীদ বা গাজী হওয়ার মর্যাদা। মু’মিনের জীবনে শহীদ ও গাজী – এ দুটি পরিচয় ছাড়া ভিন্ন পরিচয় নাই। তৃতীয় কোন পরিচয় সাহাবীদের জীবনে ছিল না। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী তাই শহীদের মর্যাদা পেয়েছেন। নবী-রাসূলের মর্যাদার পর মানবজীবনে এটিই শ্রেষ্ঠ মর্যাদা। শহীদগণ মূলত মহান আল্লাহতায়ালার মেহমান। জান্নাতের অপেক্ষায় এ মহান মেহমানদের হাজার হাজার বছর অপেক্ষায় থাকার রেওয়াজ নাই। তাদের জীবনে কবরের জীবন,আলমে বারযাখ,পুল সিরাত পাড়ীর বিপদও নাই্। নেই রোয হাশরের বিচার দিনে “ইয়া নফসি”,“ইয়া নফসি” বলার যাতনা। শহীদ হওয়ার সাথে সাথে তাদের প্রবেশ ঘটে সরাসরি জান্নাতে। জিহাদ যে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে কত প্রিয় সে বর্ণনাটি পবিত্র কোরআনে এসেছে এভাবে,” নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন যারা তাঁর পথে যুদ্ধ করে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সারিবদ্ধ ভাবে।”–(সুরা সাফ আয়াত ৪)। নবীজী (সাঃ)র কাছে একবার কিছু সাহাবী প্রশ্ন করেছিলেন,“হে আল্লাহর রাসূল! মহান আল্লাহতায়ালার কাছে কোন কাজটি সবচেয়ে প্রিয়?” তারা চাচ্ছিলেন,সবচেয়ে প্রশংসনীয় সে কাজটি জানা গেলে তারা সে কাজে অংশ নিবেন।” তাদের সে প্রশ্নের জবাবে উপরুক্ত আয়াতে ব্যক্ত হয় মহান আল্লাহতায়ার কাছে মু’মিনের জীবনের সবচেয়ে পছন্দের আমলটি।

 

তাড়না শাহাদতের

মানব জীবনে শাহাদত লাভের চেয়ে বড় বিজয় নেই। বড় অর্জনও নেই। সাহাবীদের জীবনে এ মর্যাদা লাভে যেমন প্রচন্ড আকুতি ছিল,তেমনি তাড়াহুড়াও ছিল। সে সাথে জানমালের বিপুল বিনিয়োগ বা কোরবানিও ছিল। মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সে মর্যাদাটি লাভে তারা নিজেরা যেমন বার বার দোয়া করতেন,তেমনি অন্যকেও দোয়া করতে অনুরোধ করতেন। সে মর্যাদা লাভে তারা নিত্য-নতুন জিহাদের ময়দান খুলতেন। যেখানেই জিহাদ, সেখানেই তাদের ভিড় শুরু হতো। নিজ অর্থ,নিজ উঠ,নিজ ঘরের খাবার নিয়ে তারা সে জিহাদে হাজির হতেন।মুসলমানের জিহাদ স্রেফ প্রতিরক্ষামূলক নয়,আক্রমণাত্মকও।এ পৃথিবীর প্রতিইঞ্চি ভূমিই মহান আল্লাহতায়ালার।সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকার কথা একমাত্র তারই। কিন্তু সে ভূমি আজ  কাফেরদের হাতে অধিকৃত,ফলে ঈমানী দায়ভার হলো সে দখলদারি থেকে অধিকৃত ভূমির মুক্তিদান। এ লক্ষ্যেই শুরু হয় লাগাতর জিহাদ। ইসলামি রাষ্ট্র তাই স্রেফ আরব ভূমিতে সীমিত থাকেনি। লাগাতর বৃদ্ধি পেয়েছে। মুসলিম ইতিহাসে খোলাফায়ে রাশেদার পর উমাইয়া, আব্বাসীয় ও ওসমানিয়া খলিফাদের শাসন এসেছে। খলিফাদের পক্ষ থেকে প্রায প্রতিবছর সংঘটিত হতো জিহাদ। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জিহাদ সংঘটিত না হলে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে গজব আসবে সে ভয়ও তাদের ছিল। ফলে প্রতি বছরই মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোলে বৃদ্ধি ঘটতো।

 

বাঙালী মুসলিমের ব্যর্থতা

মু’মিনের কাজ শুধু নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে মসজিদ খুঁজে বের করা নয়।জিহাদের অঙ্গণও খুঁজে বের করা। জিহাদের মিশন নিয়েই সূদুর তুর্কভূমি থেকে বাংলার মাটিতে ছুটে এসেছিলেন মহান বীর ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি। সুজলা-সুফলা এ বঙ্গভূমির উপর তার যুদ্ধজয়ের ফলে দেশের বিশাল জনগণ মুক্তি পেয়েছিল মুর্তি পুজার জঘন্য পাপ থেকে। সুযোগ পায় ইসলামের অনুসরণের মধ্য দিয়ে জান্নাত লাভের। বাংলার মুসলমানদের জন্য এ মহাকল্যাণটি কি অন্য কেউ করেছে? অথচ বাঙালী মুসলিম ইতিহাসের এ মহান ব্যক্তিটির স্মৃতি আজ অবহেলিত। তার জীবন নিয়ে কমই আলোচন হয়। বরং ষড়যন্ত্র হচ্ছে তাঁকে ভূলিয়ে দেয়ার। মুসলিম শাসনের শুরুতে বঙ্গভূমিতে আজকের ন্যায় শতকরা ৯১% মুসলমানের বাস ছিল না। কিন্তু সে জন্য কি শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করতে এক মুহুর্ত বা এক দিনও দেরী হয়েছিল? ওয়াক্ত হলে যেমন নামায আদায় করা ফরজ,তেমনি একখন্ড রাষ্ট্র পেলে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করাও ফরজ। অখন্ড ভারতের সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দুদের মাঝে সেটি সম্ভব ছিল না বলেই ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন এ দেশটি সেক্যুলারিস্টদের হাতে অধিকৃত হওয়ায় শরিয়তের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি।

 

ইসলামের বিরুদ্ধে একই রূপ ষড়যন্ত্র চলছে আজকের বাংলাদেশেও। দেশ অধিকৃত ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। বাংলার ১৬ কোটি স্বঘোষিত মুসলমানগণ ভূলে গেছে খেলাফতের দায়িত্ব পালনে নিজ নিজ দায়বদ্ধতার কখা। তাদের চেতনায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে যেমন ভাবনা নেই,তেমনি ভাবনা নেই শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়েও।কোনরূপ তাড়না নেই দুর্বৃত্তদের দখলদারির নির্মূলে। সে লক্ষ্যে জিহাদও নাই। মুসলিম জীবনের প্রায়োরিটি আজ সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। ইসলামের অপমানকর পরাজয়কে তারা নীরবে মেনে নিছে। অথচ হৃদয়ে ঈমান থাকলে এরূপ পরাজয় তাদের মনে কি আগুণ ধরিয়ে দিত না। মুসলমান হওয়ার অর্থই তো আমৃত্যু মহান আল্লাহতায়ালার লড়াকু সৈনিকে পরিণত হওয়া। বাংলাদেশে মুসলমানের সংখ্যা আজ ১৬ কোটি। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজুদ্দৌলার বিশাল সেনাদল নীরবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের পরাজয় ও ব্রিটিশের বিজয়কে সুনিশ্চিত করেছিল।তাদের গাদ্দারির ফলে বাংলার স্বাধীনতা সেদিন অস্তমিত হয়েছিল।

 

বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলমানের আজকের অবস্থাও কি ভিন্নতর? আজকের গাদ্দারিটা খোদ আল্লাহতায়ালার সাথে।গাদ্দারি এখানে খেলাফতের দায়ভার পালন না করার। সংখ্যায় বিপুল হয়েও ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয়কে নীরবে মেনে নেওয়ায় তারা ব্যস্ত। মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্বের বদলে তারা নিজেরা ভোট দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেদের সার্বভৌমত্ব।বাংলাদেশের সংবিধান তাই আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও গাদ্দারির দলিল। তাদেরই নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ আল্লাহর শরিয়তি নিজামের প্রতিষ্ঠাকে সংবিধানিক ভাবে অসম্ভব করে রেখেছে।ইসলাম প্রতিষ্ঠার যে কোন উদ্যোগকে আখ্যায়ীত করছে ধর্মীয় উগ্রবাদ রূপে। জিহাদ আখ্যায়ীত হচ্ছে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রূপে। সে অভিযোগ এনে হাজার হাজার মুসলমানকে কারাগারে তোলা হয়েছে। অথচ ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা জঙ্গিবাদ হলে খোদ নবীজী (সাঃ) ও তাঁর মহান সাহাবীগণও যে জঙ্গি ছিলেন তা নিয়ে কি সন্দেহ চলে? সেরূপ জঙ্গি হওয়ার মধ্যেই কি তবে নবী জীবনের অনুসরণ নয়? অথচ সে সহজ সত্যটুকু বুঝতেও তারা ব্যর্থ হচ্ছে। বাঙালী মুসলমানের এটিই কি সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা নয়? এ মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে তারা কি এ ব্যর্থতা নিয়ে ফিরে যাবে? তাতে তাদের পরিণাম যে কত ভয়াবহ হবে তা নিয়েও কি সামান্য ভাবনা আছে? ২৭/২/১৫



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Friday, 27 February 2015 01:54
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.