Home •বাংলাদেশ বাংলাদেশ কীরূপে পৌঁছলো এ যুদ্ধাবস্থায়?
বাংলাদেশ কীরূপে পৌঁছলো এ যুদ্ধাবস্থায়? PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 21 March 2015 14:09

নির্মূলের হুংকার রাজনীতিতে

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংঘাত যে শুধু দিন দিন বেড়ে চলেছে তা নয়,এ সংঘাত রীতিমত যু্দ্ধে রূপ নিয়েছে। নির্মূলের হুংকার এখন সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মুখে। মশামাছি নির্মূলের ন্যায় সরকারের পুলিশ,র‌্যাব ও সরকারি দলের ক্যাডার বাহিনী এখন প্রতিপক্ষ নির্মূলে নেমেছে। সভ্য রাজনীতির নিজস্ব কিছু ভদ্র রীতি-নীতি ও সংস্কৃতি থাকে। কিন্তু সে ভদ্রতা ও সভ্যতা থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি বহু দূরে। তবে নির্মূলের ধারাটি হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি,বরং পরিকল্পিত ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে।সেটি বাংলাদেশের জন্মের প্রথম দিন থেকেই। এমন আত্মঘাতি নীতি কোন দেশেই শান্তি আনে না,বরং আনে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ। বাংলাদেশ এখন তেমনি একটি যুদ্ধের মধ্য ময়দানে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী বাকশালীদের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিতে রাজপথে বিপুল সেনাসদস্য নেমেছে। চারি দিকে গোলাগোলি হচ্ছে,বোমা পড়ছে,গাড়ি-বাড়ি জ্বলছে এবং শত শত মানুষ লাশ হচ্ছে। বহু মানুষ গুমও হচ্ছে। যুদ্ধাবস্থায় মানুষ খুন হয়,কিন্তু কারো বিচার হয় না। নির্মূলমুখি এ রাজনীতির জনক শেখ মুজিব ও তার নেতৃত্বে গড়ে উঠা আওয়ামী-বাকশালী ফ্যাসিস্ট শক্তি।এরূপ ঘাতক রাজনীতির পিছনে যেমন বিপুল বিদেশী বিনিয়োগ আছে,তেমনি দেশধ্বংসের পরিকল্পনাও আছে। লক্ষ্য,বাংলাদেশকে দ্রুত ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত করা।

 

বিশ্বের দুই শতাধিক রাষ্ট্রের মাঝে সবচেয়ে বেশী দরিদ্র মানুষের বাস ভারতে। অথচ ভারত হলো সমগ্র বিশ্বে সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা।গড়ে তুলেছে আনবিক বোমা,বোমারু বিমান ও মিজাইলের বিশাল ভান্ডার। এ বিশাল অস্ত্র ভান্ডার দিয়ে কি ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,চীন বা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে? সে সামর্থ কি ভারতের আছে? বরং উক্ত দেশগুলোর সাথে ভারত বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা বাড়াতে ব্যস্ত। প্রেসিডেন্ট ওবামার উষ্ণ ভারত সফর,নরেন্দ্র মোদীর চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফরের মধ্য দিয়ে তো সেটিই ধরা পড়ে। ভারত তারা সীমাবদ্ধতা বুঝে। বিশ্বজয়ের বদলে দেশটি দক্ষিণ এশিয়া জয়ে দৃষ্টি দিয়েছে। লক্ষ্য,বাংলাদেশ,পাকিস্তান,শ্রীলংকা,নেপালের ন্যায় প্রতিবেশী দেশগুলোকে নতজানু রাখা এবং দক্ষিণ এশিয়ার বুকে একমাত্র শক্তি রূপে নিজের আধিপত্য বহাল রাখা। বাংলাদেশের রাজনীতি বুঝতে ভারতের বিদেশ নীতিকে তাই অবশ্যই বুঝতে হবে।

 

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির বিরুদ্ধে ভারতের কার্যকর অস্ত্রটি ঘাতক যুদ্ধাস্ত্র নয়। বরং সেটি হলো রাজনৈতিক,বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অস্ত্র। সামরিক অস্ত্রে ভারত পাকিস্তানকে ১৯৪৮ সাল এবং ১৯৬৫ সালে পরাজিত করতে পারিনি। কিন্তু রাজনৈতিক,বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অস্ত্রে পাকিস্তানকে একাত্তরে নতজানু করে ফেলে।পাকিস্তানের ১৯৬৫য়ের যুদ্ধে বিজয় না পাওয়ার পর ভারত শেখ মুজিব ও লেন্দুপ দর্জি (সিকিমের ভারতপন্থি নেতা)র ন্যায় তাঁবেদার নেতা ও শত শত পদসেবী বুদ্ধিজীবী প্রতিপালনে মনযোগী হয়। শুরু করে আগরতলা ষড়যন্ত্রের ন্যায় নানারূপ ষড়যন্ত্র।এমন চানক্য নীতির সফলতাটি বিশাল।ভারতের অর্থক্ষয় এবং রক্তক্ষয়ও এতে কমেছে। এ নীতিতে ভারত যেমন সিকিমকে বিনা রক্তব্যয়ে ভারতভূক্ত করতে পেরেছে,তেমনি বাংলাদেশকে একটি নতজানু আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত করতে পেরেছে। তাজুদ্দীনকে দিয়ে ৭ দফা এবং মুজিবকে দিয়ে ২৫ সালা দাসচুক্তিও স্বাক্ষর করিয়ে নিতে পেরেছে। কিন্তু ভারতের বিপদ অন্যত্র। কারণ, বাংলাদেশের ১৬ কোটি নাগরিকের সবাই মুজিব বা তাজুদ্দীন নয়,লেন্দুপ দর্জিও নয়। যে চেতনা নিয়ে ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙ্গে স্বাধীন পাকিস্তান বানিয়েছিল সে চেতনা নিয়ে তারা স্বাধীন বাংলাদেশেও স্বাধীন ভাবে বাঁচতে চায়। ভারতের কাছে এমন চেতনা অসহ্য। তারা তো চায় বাংলাদেশীরা মুজিব,তাজুদ্দীন ও লেন্দুপ দর্জির ন্যায় ভারতরে পদসেবী চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠুক। এবং দূরে সরে আসুক প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্বের চেতনা থেকে। ইসলামশূণ্য এরূপ ভারতমুখি চেতনাকেই তারা বলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এ চেতনার যারা বিরোধী তারা যে শুধু মুজিব বা হাসিনা বিরোধী তা নয়,ভারতের কাছে তারা ভারতবিরোধীও। তারা চিত্রিত হচ্ছে ইসলামি সন্ত্রাসী রূপেও। ভারত তাই তাদের নির্মূল করতে চায়। নির্মূলের এ কাজে ভারত শুধু আওয়ামী লীগকেই নয়,বাংলাদেশের সেনাবাহিনী,পুলিশি বাহিনী,র‌্যাব,বিজিবিকেও পার্টনার রূপে পেতে যায়। সেনাবাহিনীকে সে কাজের উপযোগী করতেই ৫৭ জন সেনা অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ ও বিজিবি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে হিন্দুদের। ভারত বিরোধীদের নির্মূলে ভারতে অর্থে প্রতিপালিত সেবাদাসেরা তো ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি বানিয়ে সত্তরের দশক থেকেই তৎপর। এরাই গণআদালত বসিয়েছে,জনতার মঞ্চ গড়েছে এবং আজ গণআদালতের মডেলে ঢাকার হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে ফাঁসিদানের প্রকল্প চালিয়ে যাচ্ছে। মুজিব ও তাজুদ্দীন তো এরূপ নির্মূল কাজে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের অভ্যন্তুরে অনুপ্রবেশের অধিকার দিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। ভারতপন্থি নেতাকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মুখে আজও  যেরূপ দিবারাত্র নির্মূলের হুংকার –সেটি তো ভারতের অর্থ,প্রশ্রয় ও উসকানিতে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে অধিকৃত হওয়ার পূর্বে এমন নির্মূলের রাজনীতি কি দেশটিতে কোন কালেও ছিল? অথচ তখনও নানা দল ছিল, নানা মত ছিল। এবং রাজনীতিতে ক্ষমতাদখলের তীব্র প্রতিযোগিতাও ছিল। বাংলাদেশে আজ যে যুদ্ধাবস্থা তার মূলে যে ভারত -তা নিয়ে কি সন্দেহ চলে?

 

ভারতীয় নাশকতা

১৬ কোটি মানুষই একটি দেশের এক বিশাল শক্তি। প্রতিবেশী ভারতের ভয় এখানেই। ভারত চায় না এ বিশাল জনশক্তি রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হোক। আল্লাহতায়ালা সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তেল,গ্যাস বা সোনা-রূপা নয়। তা হলো মানুষ। বাঙালী মুসলিমের এ বিশাল জনশক্তিই হিন্দু ও ব্রিটিশ –এ দুই শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে অখন্ড ভারত ভূমিকে ভেঙ্গেছিল এবং পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিল। ভারতের যত অস্ত্রবল বা অর্থবলই থাকুক,১৬ কোটি মানুষকে হত্যা করার সামর্থ রাখে না।কিন্তু সামর্থ রাখে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক,সামরিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে ধ্বংসকে করার। তাই ১৯৭১য়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অধিকৃত করার পর ভারতের মূল কাজ হয় বাংলাদেশের অবকাঠামো ধ্বংস করা। এ কাজে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পদসেবী দালাল শ্রেণীও পেয়েছিল। তাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত লুন্ঠন শুধু পাকিস্তানের ফেলা যাওয়া অস্ত্র লুন্ঠনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্যাংক,সরকারি ভবন,সরকারি বাসভবন,সামরিক ও বেসামরিক যানবাহন এবং কলকারখানাও সে লুন্ঠন থেকে রেহাই পায়নি।লুন্ঠনে লুন্ঠনে দেশটিকে ভারত ও তার নওকর বাহিনী দ্রুত ভিক্ষার তলাহীন পাত্রে পরিনত করে এবং ডেকে আনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।একমাত্র ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমল ছাড়া সুজলা-সুফলা এ উর্বর দেশে এমন দুর্ভিক্ষ আর কোন কালেই আসেনি। মুজিবামলে এরা এক দল,এক দেশ ও এক নেতার শ্লোগান দিয়ে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের নির্মূলের মহাযজ্ঞে নামে। অন্য দল ও অন্য মতের লোকদের রাজনীতি দূরে থাক,তাদের বাঁচার অধিকার দিতেও তারা রাজী হয়নি। প্রতিপক্ষ নির্মূলের প্রয়োজনে তখন গড়ে উঠে বিশাল রক্ষি বাহিনী। মুজিবের গড়া এ ঘাতক বাহিনীটি ৩০ হাজারের বেশী মানুষকে মৃত্যুর ওপারে পৌঁছে দেয়। আর প্রতিটি হত্যাই তো গভীর ঘৃণার জন্ম দেয়। জন্ম দেয় প্রচন্ড প্রতিশোধপরায়নাতার। তখন কি বাঁচে সৌহার্দ সম্পৃতির রাজনীতি।অর্থনীতির ভাষায় সমাজের এরূপ সৌহার্দসম্পৃতির পরিবেশ হলো অতি গুরুত্বপূণূ সামাজিক পুঁজি বা সোসাল ক্যাপিটাল। এ সোসাল ক্যাপিটাল যেমন গণতান্ত্রের চর্চায় জরুরী তেমনি জরুরী হলো অর্থনৈতিক উন্নয়নে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে নগদ পুঁজির চেয়ে এরূপ সোসাল ক্যাপিটালের গুরুত্ব অধীক। হত্যার রাজনীতিতে সে পুঁজি সৃষ্টি হয় না। নগদ অর্থের পুঁজি এমন নিরাপত্তাহীন পরিবেশে হয় বেকার পড়ে থাকে,অথবা দেশ ত্যাগ করে। মুজিবের নির্মূলের রাজনীতি তাই শুধু বহুদলীয় রাজনীতিতেই শুধু নয়,অর্থনীতিতেও দ্রুত মড়ক আনে।

 

বাংলাদেশের রাজনীতি বিগত ৪৪ বছরে একটুও সামনে এগুয়নি। বরং পিছিয়েছে দীর্ঘ পথ। রাজনীতি পরিণত হয়েছে দেশধ্বংস,সংস্কৃতি ধ্বংস,হত্যা ও গুমের হাতিয়ারে।এ অভিন্ন দেশেই ৬০ বছর আগে ১৯৫৪ সালে একটি দলীয় সরকারের অধীনে যেরূপ নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হয়েছিল,সেরূপ নির্বাচনের কথা এখন ভাবাই যায় না। দেশ পিছিনে ফিরে গেছে ৪০ বছর পুরনো বাকশালী স্বৈর শাসনের দিকে। মুজিবের রক্ষি বাহিনীর স্থানটি নিয়েছে সেনা সদস্যদের নিয়ে গড়া র‌্যাব। তবে প্রতিপক্ষ নির্মূলে রক্ষি বাহিনীর ন্যায় র‌্যাব একাকী নয়।র‌্যাবের পাশাপাশি ব্যবহৃত হচ্ছে পুলিশ,বিজিবি,সেনাবাহিনী এবং সরকার দলের ঘাতকগণ।বিশ্বের প্রতিটি দেশেই রাজনীতিতে নানা মত,নানা পথ ও নানা বিশ্বাসের বিচিত্র লোক থাকে।তাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক দলও থাকে। সবার জন্য স্থান করে দেয়া দেয়াটিই সভ্য রাজনীতির নীতি। রাজনীতি এভাবেই জনগণের মাঝে সংহতি ও সম্পৃতি আনে। ফলে গোত্র,ভাষা,বর্ণের পরিচয়ে অতীতে যেরূপ রক্তাত্ব হানাহানি হতো,সে রূপ হানাহানি এখন কোন সভ্য দেশে হয় না।বরং নানা গোত্র,নানা ভাষা,নানা বর্ণ ও নানা ভূগোলের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিশাল বিশাল রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিতে  গবেষণা হয় বিভক্তির সুত্র গুলো খুঁজে খুঁজে বের করায়।

 

সভ্য রাজনীতির কবর

রাজনীতিতে সভ্য ও ভদ্র নীতিটি না থাকলে মনের ক্ষুদ্র মানচিত্রের সাথে দেশের মানচিত্রও তখন দিন দিন ছোট হতে থাকে। সে ক্ষুদ্র মানচিত্রে অন্যদের কোন স্থান থাকে না। বিশাল মুসলিম উম্মাহ আজ যেরূপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত ও শক্তিহীন -তা তো অসভ্য আত্মঘাতি নীতির কারণে। অথচ যে রাজনীতিতে সুসভ্য নীতি থাকে,সে রাজনীতি শক্তিও আসে। সে সভ্য নীতির কারণেই পৃথিবীর বুকে সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র গড়তে কায়েদে আযম মহম্মদ আলী জিন্নাহকে লগি,বৈঠার রাজনীতিতে নামতে হয়নি।শত্রুশক্তির অস্ত্র কাঁধে নিয়ে একাত্তরের ন্যায় যুদ্ধও করতে হয়। তাঁকে রক্ষিবাহিনী বা র‌্যাব গড়ে প্রতিপক্ষ নির্মূলেও নামতে হয়নি। সভ্য রাজনীতির নীতি হলো,“নিজে বাঁচো এবং অন্যকে বাঁচতে দাও”। জিন্নাহর সে সভ্য ও ভদ্র রাজনীতিতে বাংলার ফজলুল হক,নাজিমুদ্দীন,সহরোয়ার্দি যেমন স্থান পেয়েছিলেন,তেমনি ভারতের অন্যান্য প্রদেশের শত শত মুসলিম নেতাকর্মীও স্থান পেয়েছিলেন।সেখানে কারো ভাষা বা গায়ের রঙ দেখা হয়নি। রাজনীতি এরূপ সভ্য ও ভদ্র নীতি প্রতিষ্ঠা না পেলে কারো বাঁচাটাই নিরাপদ হয়না।জিন্নাহর রাজনীতিতে শুধু যে জিন্নাহ বেঁচে ছিলেন তা নয়,বাংলার ফজলুল হক,নাজিমুদ্দীন,সহরোয়ার্দিও বেঁচেছিলেন। তাদের কাউকে কারারুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারাতে হয়নি বা গুমও হতে হয়নি। কিন্তু মুজিবের রাজনীতিতে মুসলিম লীগের বন্দী নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরি যেমন বাঁচেননি,তেমনি সিরাজ সিকদারও বাঁচেননি।এমন কি মুজিব নিজেও বাঁচেনি।মুজিবের মৃত্যুতে বরং খুশির বন্যা বয়েছিল আওয়ামী লীগের বহু প্রথম সারির নেতাদের মনেও। প্রচন্ড খুশি নিয়েই তারা খোন্দকার মুশতাকের মন্ত্রীসভাতে যোগ দিয়েছেন।সে খুশিটি ধরা পড়ে আওয়ামী লীগের মুজিবপরবর্তী সভাপতি আব্দুল মালেক উকিলের ঘোষণাতে। তিনি বলেছিলেন “ফিরাউনের মৃত্যু হয়েছে”।

 

সভ্য ও ভদ্র রাজনীতি বাংলাদেশে বহু পূর্ব থেকেই কবরস্থ্য।দেশের উপর পুরা দখলদারিটা এখন অসভ্য,নৃশংস ও স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের।এমন অসভ্য রাজনীতিতে শান্তিপূর্ণ মিছিল ও জনসভার সুযোগ থাকে না।স্বাধীন মতপ্রকাশ ও নিরেপক্ষ পত্র-পত্রিকা বলেও কিছু থাকে না।রুচি থাকে না আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার নিষ্পত্তির।এমন রাজনীতিতে যা প্রবলতর হয় তা হলো প্রতিপক্ষ নির্মূলের সহিংসতা।তখন লাশ পড়ে রাজপথে,গৃহে ও অফিস-আদালতে। মানুষ তখন গুম হয়,অত্যাচারিত হয় এবং বস্তাবন্দী লাশ হয়ে নদিতে বা ডোবার পানিতে পচা দুর্গন্ধ নিয়ে ভেসে উঠে। হারিয়ে যাওয়াদের খুঁজে বের করার বদলে পুলিশের ব্যস্ততা বাড়ে গুম,খুন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদে মিছিলে নামে তাদের জেলে তোলায়। সরকার প্রধানও তখন মৃতদের নিয়ে মস্করা করে।সেটি যেমন মুজিব করেছিল,এখন হাসিনাও করছে।এমন অসভ্য রাজনীতিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের রাজনীতির অধিকার দূরে থাক,বাঁচার অধিকারটুকুও দেয়া হয় না।তাদের বিরুদ্ধে তখন শুরু হয় নির্মম নির্মূল অভিযান। বাংলাদেশের জন্ম থেকেই সংঘাতের সে রাজনীতিকে তীব্রতর করা হয়েছে;এবং সেটি স্বৈরাচারি শাসক দলের পক্ষ থেকে। রাজনীতির ময়দান থেকে সকল প্রতিদ্বন্দিদের বের করে দিয়ে সমগ্র মাঠ জুড়ে মুজিব একা খেলেছে। সারা মাঠে অন্য কোন দলের খেলোয়ার ছিল না,গোলকিপার ছিল না,কোন রিফারিও ছিল না।হঠাৎ বল হাতে পেলে অবুঝ শিশু যেমন ঠাউর করতে পারে না হাত দিয়ে খেলবে পা দিয়ে না খেলবে -তেমনি উদভ্রান্ত অবস্থা ছিল শেখ মুজিবের।কখনো খেলেছে প্রধানমন্ত্রী রূপে,কখনো বা প্রেসিডেন্ট রূপে।খেলার রুলটিও ছিল নিজের তৈরী, রিফারির দায়িত্বটাও ছিল তার নিজ হাতে।ফলে মনের খুশিতে মুজিব যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে গোল দিয়েছে। বিশাল বিজয় সবসময়ই ছিল তার।বার বার পেনাল্টি করলেও তাকে শাস্তি দেয়ার লোক ছিল না। সিরাজ সিকদারকে হত্যার পর সংসদে দাঁড়িয়ে কোথায় আজ সিরাজ সিকদার বললেও তাকে লাল কার্ড দেখানোর লোক ছিল না। রাজনীতির এমন প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের অবদানটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতির অঙ্গণে সবার জন্যই তিনি স্থান করে দেন।শুধু মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামি নয়,এমন কি আওয়ামী লীগও তখন কবর থেকে বেরিয়ে রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ পায়। এবং কবরে যায় মুজিবের গড়া একদলীয় বাকশালী শাসন।

 

ধাবিত করা হচেছ যুদ্ধের পথে

মুজিব মারা গেলেও প্রতিপক্ষ নির্মূলের অসভ্য রাজনীতি আজও  বেঁচে আছে। নির্মূলের সে রাজনীতিকে শেখ হাসিনা বরং আরো সহিংস ও রক্তাত্ব করেছে। তাই গুম ও হত্যা এখন মামূলী ব্যাপার। প্রতিপক্ষ নির্মূলের কাজকে তীব্রতর করতে শেখ হাসিনা শুধু যে নিজ দলের গুন্ডাদের ব্যবহার করছে তা নয়,ব্যবহার করছে দেশবাসীর রাজস্বে পালিত পুলিশ,র‌্যাব,বিজিবি এবং সেনাবাহিনীকেও।রাজনৈতিক শত্রুদের হত্যাকে জায়েজ করতে ব্যবহৃত হচ্ছে শৃঙ্খলিত আদালত।ভদ্র্র,সভ্য ও শান্তিপূর্ণ রাজনীতির অপরিহার্য উপকরণ হলো দল গড়া,সভাসমিতি করা,মিছিল করা,পত্র-পত্রিকা ও টিভিতে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা। সভ্য রাজনীতির আরো রীতি হলো নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের স্বাধীনতা। রাজনীতির শান্তিপূর্ণ পট পরিবর্তনের এটিই তো একমাত্র পথ। কিন্তু স্বৈরাচারি শাসকদের কাছে ক্ষমতার পট পরিবর্তনটাই অসহ্য। তার তো চায় আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকতে। তাদের কাছে অসহ্য তাই নির্বাচন।তাই পট পরিবর্তন যেমন মুজিব চায়নি,তেমনি হাসিনাও চায় না। ফলে হামলা হয় তখন জনগণের দল গড়া,সভাসমিতি করা,মিছিল করা,পত্র-পত্রিকা ও টিভিতে মতামত প্রকাশের ন্যায় মৌলিক স্বাধীনতার উপর। তখন বন্ধ করা হয় নিরপেক্ষ নির্বাচনের রীতি। অথচ এরূপ স্বাধীনতা না থাকাটাই পরাধীনতা। এবং এরূপ পরাধীনতাই বড় অসভ্যতা। বাংলাদেশের জনগণ আজ  সে পরাধীনতা ও অসভ্যতার শিকার। সভাসমিতি ও মিছিলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে সরকার বিরোধী দলগুলোকে বাধ্য করা হয়েছে অবরোধ ও হরতালের রাজনীতি বেছে নিতে। তবে অবরোধ ও হরতালের রাজনীতিকেও সরকার এখন মেনে নিতে রাজী নয়। অথচ শান্তিপূর্ণ রাজনীতির এটিই সর্বশেষ ধাপ। এরপর যা বাঁকি থাকে সেটি শান্তিপূর্ণ রাজনীতির পথ নয়,সেটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পথ। বাংলাদেশের জনগণকে আজ  সেদিকেই ধাবিত হতে বাধ্য করা হচ্ছে।

 

লিগ্যাসি একাত্তরের

বাংলাদেশের বুকে সহিংস সংঘাতের শুরু হঠাৎ হয়নি।এরও দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এর কারণ বুঝতে হলে অবশ্যই মুজিব ও তার অনুসারিদের ভারতসেবী রাজনীতিকে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে ভারতের লক্ষ্য ও তার ভূ-রাজনীতিকে। বাংলাদেশে সহিংস রাজনীতির মূলে ভারত। এ যুদ্ধের শুরু স্রেফ একাত্তর থেকে নয়,বরং ১৯৪৭ থেকেই। ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা চায়নি।১৯৪৭য়ে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা রুখতে ব্যর্থ হয়ে ভারতের স্ট্রাটেজী হয় অখন্ড পাকিস্তানের বেঁচে থাকাকে অসম্ভব করা।ভারতের পরিচালিত এ যুদ্ধে মুজিব ছিল ভারতের সেবাদাস সৈনিক মাত্র। তবে যুদ্ধটি স্রেফ পাকিস্তান ধ্বংসের লক্ষ্যে ছিল না,ছিল বাংলাদেশের বুকে ইসলামপন্থিদের নির্মূলের লক্ষ্যেও। লক্ষ্য স্রেফ পাকিস্তানকে খন্ডিত করা হলে ১৯৭১য়ের পর বাংলাদেশে ভারতসেবীদের মুখে নির্মূলের রাজনীতি বহাল থাকার কথা নয়।

 

তাছাড়া যুদ্ধ একবার শুরু হলে সেটি কি সহজে শেষ হয়? আফগানিস্তের যুদ্ধ বিগত ৩৫ বছরেও শেষ হয়নি।ইরাকের যুদ্ধ না থেমে বরং সে যুদ্ধ সিরিয়াকেও গ্রাস করেছে।মার্কিনীদের শুরু করা কোন যুদ্ধই এখন থামার নাম নিচ্ছে। বাংলাদেশের বুকে একাত্তরের যুদ্ধও শেষ হয়নি। বরং রাজনীতির নামে আজ  যে যুদ্ধাবস্থা সেটি মূলতঃ একাত্তরেরই লিগ্যাসি। একাত্তরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরাপুরি দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের।আজকের যুদ্ধটির মূল লক্ষ্য তো সে ভারতীয় দখলদারিকে বাঁচিয়ে রাখার। এবং যুদ্ধজয়ের জন্য আওয়ামী বাকশালীদের ক্ষমতায় রাখা ভারতের কাছে এজন্যই এত জরুরী। আর নিয়েত যুদ্ধের হলে সমস্যার শান্তিপূণ সমাধান কি তখন সম্ভব? তাই আবার ফিরে আসছে একাত্তর। ১৯৭১য়ে পাকিস্তান ভেঙ্গে যারা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের চেতনায় অন্যদের বাঁচাটি গুরুত্ব পায়নি।এজন্যই তাদের রাজনীতিতে আজও নির্মূলের সুর। তাদের কাছে যা গুরুত্ব পায় তা হলো একমাত্র নিজেদের বাঁচাটি। সেরূপ বাঁচার স্বার্থে তারা ভারতের লাগাতর সাহায্য চায়। ভারতের সাহায্য ছাড়া তারা যে বাঁচতে পারে না -সেটি তারা বুঝে। আওয়ামী বাকশালীদের ন্যায় ভারতও চায় না বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থিরা বেঁচে থাকুক। ইসলামপন্থিদেরকে তারা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে। ভারতের খায়েশ পূরণে মুজিব তাই শাসনক্ষমতা হাতে পাওয়া মাত্রই সকল ইসলামি দলকে নিষিদ্ধ করে। অথচ ১৯৭০য়ের নির্বাচনি ইশতেহারে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা ছিল না। ভারতীয় সেনাবাহিনীর দখলারি প্রতিষ্ঠার সাথে সাথেই মুজিবের রাজনীতিই পাল্টে যায়। হাজার হাজার ইসলামপন্থি নেতাকর্মীদের হত্যা করা হয়,এবং জীবিতদের জেলে তোলা হয়।একাত্তরের পূর্বে গণতন্ত্র,স্বায়ত্বশাসন ও বাক স্বাধীনতার নামে শেখ মুজিব যা কিছু জনসম্মুখে বলেছিল তা ছিল অভিনয় মাত্র। তার স্বৈরাচারি আসল  রূপটি প্রকাশ পায় নির্বাচনি বিজয়ের পর। সে রূপটি ছিল এক নৃশংস স্বৈর শাসকের। সে অভিন্ন স্বৈরাচার নিয়ে শেখ হাসিনা আজ ক্ষমতাসীন তার পিতার অপূর্ণ ধারাকে পূর্ণতা দিতে।ভারত মুজিবকে বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু এবার বদ্ধপরিকর হাসিনাকে বাঁচিয়ে রাখায়।

 

চক্রান্ত নব্য মালাউনদের

কাফেরদের কাফের বলা যেমন মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত,তেমনি সূন্নত হলো মালাউনকে মালাউন বলা। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালার এ সূন্নত পালনে আজকের মুসলমানদের মাঝে আগ্রহ নাই। এমন কি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কাফেরদের কাফের বলতে যেমন তারা রাজি নয়,তেমনি রাজি নয় ষড়যন্ত্রকারি জঘন্য মালাউনদেরও মালাউন বলতে। তারা ভাবে,এ বিচারের কাজ একমাত্র আল্লাহতায়ালার। প্রশ্ন হলো,কে কাফের আর কে মুসলমান,কে শত্রু আর কে মিত্র –সে বিচারে সামর্থ না থাকলে ইসলাম ও মুসলমানের পক্ষে সে জিহাদ লড়বে কীরূপে? কীরূপেই বা পরিহার করবে কাফের দলের পক্ষ নেয়া থেকে? সে কি তবে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ওহীর অপেক্ষায় বসে থাকবে? প্রতিটি ঈমানদারের দায়িত্ব এটিই,কোরআন ও হাদীসের জ্ঞানের আলোকে সে সামর্থটি সে অর্জন করবে।নইলে অসম্ভব হয় সিরাতুল মোস্তাকীমে চলা।  সে সামর্থটি না থাকার কারণেই কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও জেনারেল ওসমানীর ন্যায় হাজার হাজার মুসলমান যোগ দিয়েছে ব্রিটিশ কাফেরদের ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনীর সৈনিক রূপে। অথচ এদের প্রথম জন হলেন জাতীয় কবি,অপরজন হলেন জাতীয় বীর। তাদেরই ঈমানের সামর্থই যখন এরূপ,সাধারণ বাঙালী মুসলমানদের সামর্থ যে কীরূপ তা বুঝতে কি বাঁকি থাকে? অথচ মুসলমানকে তো ইসলামের পক্ষে আমৃত্যু জিহাদ নিয়ে বাঁচতে হয়। তাই তাকে শুধু বাঘ-ভালুককে চিনলে চলে না,তাকে যুদ্ধাংদেহী কাফের ও মালাউনদেরও চিনতে হয়। তবে মুসলমানদে ঈমানের দুর্বলতা কি শুধু এতে? ভারতের হিন্দুগণ তাদের গো-দেবতাকে বাঁচাতে যতটা কট্টর ও আপোষহীন,মুসলমানগণ কি আল্লাহর দ্বীন বাঁচাতে তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় এতটা আপোষহীন? এরূপ দুর্বল কান্ডজ্ঞান ও ঈমান নিয়ে জান্নাত জুটবে?

 

মাবন জাতির ইতিহাসে যত দুর্যোগ ও যত রক্তপাত তার জন্য কি শুধু স্বৈরাচারি ফিরাউন-নমরুদ দায়ী? দায়ী তো তাদের দরবারে আশ্রয় নেয়া মালাউনগণও। নমরুদ-ফিরাউনের পক্ষে মালাউনগণই তো রণাঙ্গণে নেমেছে। বাংলাদেশেও স্বৈরাচারি শাসকদের দরবার সবসময়ই পূর্ণ হয়েছে এরূপ কুচক্রি মালাউনদের দিয়ে। ফলে দেশটিতে আজ  যে রক্তাত্ব সংঘাত,তার জন্য দায়ী শুধু স্বৈরাচারি শাসকগণ নয়। দায়ী এ মালাউনগনও। কিন্তু কারা হলো সে মালাউন? কারা সে সহিংস জীব? মালাউন শব্দটি পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার বহুল ব্যবহৃত একটি প্রতিশব্দ। এ শব্দটির বিশেষ অর্থ ও ইতিহাস আছে,বিশেষ একটি দর্শন ও প্রেক্ষাপটও আছে। মানব-ইতিহাসের প্রতিপর্বেই এরা আবির্ভূত হয়েছে অতি স্বার্থপর,অতি নৃশংস ও অতি দুর্বৃত্ত চরিত্রের জীব রূপে।তাদের থাকে প্রচন্ড রাজনৈতিক অভিলাষ। কিন্তু সে অভিলাষ পূরণে তাদের থাকে না নিজ শক্তি ও নিজ সামর্থ। ফলে প্রতি যুগেই এসব মালাউনগণ নমরুদ ও ফিরাউন খোঁজে। হযরত মূসা (আঃ)র যুগে এরাই ফিরাউনের দরবারে ভিড় করেছিল;এবং ফিরাউনকে ভগবান রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এবং সে সাথে হযরত মূসা (আঃ)ও তাঁর অনুসারিদের হত্যাযোগ্য জীব রূপে চিত্রিত করেছিল। হযরত মূসা ও তার অনুসারিদের নির্মূলে তারাই ফিরাউনের বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছে। মালাউনদের একই রূপ চিত্র বাংলাদেশেও।এরাই মুজিবের ন্যায় এক স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী আখ্যায়ীত করে এক উপাস্য জীবে পরিণত করেছে।এবং নির্মূলে নেমেছে ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে। যুগে যুগে এভাবে মুর্তিপুঁজার পাশাপাশি যেমন মানব পুঁজার প্রচলন করেছে,তেমনি চক্রান্ত করেছে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের নির্মূলে। তবে বাংলাদেশের নব্য মালাউনগণ দেশবাসীকে মুর্তিপুজায় ডাকে না। ইসলামের উপর তারা প্রকাশ্যে হামলাও করে না। ইসলামের আলো থেকে মানুষকে দূরে সরানোর কাজে তাদের কৌশলটি ভিন্নতর।তারা হামলা করে শরিয়ত,খেলাফত,জিহাদ,হুদুদের ন্যায় ইসলামের বুনিয়াদি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর। রাষ্ট্রের উপর ইসলামপন্থিদের অধিকার জমানোকে তারা শাসনতান্ত্রিক ভাবে নিষিদ্ধ করে। সে লক্ষ্যে তারা নিষিদ্ধ করে তাদের রাজনীতির উপরও। ইসলামের বিধানগুলোকে তারা মধ্যযুগী বর্বরতা বলে। ষাটের দশকে এ বাম মালাউনগণ জামায়াতে ইসলামি, ইখওয়ানুল মুসলিমুনের মতো বিভিন্ন ইসলামপন্থি দলগুলোকে চিত্রিত করতো মার্কিনী প্রজেক্ট রূপে। এখনো তাদের মুখে একই সুর।সিরিয়া-ইরাকে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাষ্ট্রকেও তারা মার্কিন প্রজেক্ট বলে। এ রাষ্ট্রটির উপর মার্কিনীদের প্রায় দুই হাজার বার বিমান হামলাও তাদের ভূল ভাঙ্গাতে পারিনি। তাদের নাস্তিক মনে মহান আল্লাহতায়ালার অস্তিত্বের ধারণা যেমন নেই, তেমনি নেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে মু’মিনদের যে বিশুদ্ধ নিয়েত থাকতে পারে এবং সে নিয়তের সাথে নিজস্ব জানমালের বিনিয়োগ থাকতে পারে সেরূপ ধারণাও।এটি তাদের চেতনাগণ প্যাথোলজিকাল বিকলাঙ্গতা। মু’মিনদের তাই শুধু হিংস্র জীবজন্তু ও নমরুদ-ফিরাউনদের চিনলে চলে না,ইসলামের শত্রু এসব মালাউনদেরও চিনতে হয়। কারণ রাজনীতি,সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে মু’মিনদের আমৃত্যু যুদ্ধটি তো এ মালাউনদের বিরুদ্ধে।প্রতিদেশে ও প্রতিযুগে ফিরাউনদের মাঠ-সৈনিক তো তারাই।

 

অতীত যুগের নমরুদ-ফিরাউন ও তাদের দরবারি মালাউনদের ঘৃন্য চরিত্র নিয়ে ইতিহাসের বইতে কোন বর্ণনা নাই। তবে সে কারণে এসব দুর্বৃত্তদের চরিত্র ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাইনি। বরং সেটিকে ক্বিয়ামত অবধি তুলে ধরার দায়্ত্বি নিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা।তিনি তাদের কদর্য চরিত্রের বর্ণনা দিয়েছেন পবিত্র গ্রন্থ আল কোরআনে। তাই কোরআনের জ্ঞানে যারা জ্ঞানী,নমরুদ-ফিরাউন ও মালাউনদের চিনতে তারা কোন যুগেই ভূল করেনা। এসব নমরুদ ও ফিরাউনগণ কালের আবর্তে প্রতিযুগেই ফিরে আসে। সেটির প্রমাণ আধুনিক বাংলাদেশ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু যে ফিরাউন আছে তা নয়,বিপুল সংখ্যক মালাউনও আছে। এরা যেমন স্বৈরাচারি মুজিবের দরবারে ছিল,তেমনি হাসিনার দরবারেও আছে। তেমনি স্বৈরাচারি এরশাদের দরবারেও ছিল। বাংলাদেশের রাজনীতি,মিডিয়া,সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দান এ মালাউনদের হাতে অধিকৃত। এসব মালাউনদের মাঝে যত রামপন্থি,তার চেয়ে বহুগুণ বেশী হলো বামপন্থি। এরা নাস্তিক,এরা স্বার্থ শিকারি,এরা অর্থপুজারি,এরা পেটপুজারি ও চাটুকার।ভিন্ন ভিন্ন নামে বা বিভিন্ন বেশে হলেও তাদের চরিত্রের অভিন্ন রূপটি হলো ইসলাম বিরোধীতা। বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের বিরুদ্ধে যত ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং ইসলামপন্থিদের যত রক্ত ঝরেছে তার অধিকাংশের মূলে এই মালাউনগণ। ভারতীয় হিন্দুদের ন্যায় বাংলাদেশের এ বামপন্থি মালাউনগণও পাকিস্তানের সৃষ্টিকে ১৯৪৭ সাল থেকেই মেনে নিতে পারিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ রূপে প্রতিষ্ঠা পাক –সেটিও তারা চায় না। বাঙালী মুসলমানগণ নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠুক –রামপন্থিদের ন্যায় বামপন্থিগণও চায় না।বামপন্থি মালাউনদের একই রূপ কৌশল ছিল পাকিস্তান আমলেও। কম্যুনিজমের নামে দল গড়ে মুসলিম দেশে ক্ষমতায় যাওয়া দূরে থাক,অস্তিত্ব বাঁচানোই কঠিন। তাই তারা স্থান নেয় অন্যদের আশ্রয়ে। বামপন্থিদের সে ধারা আজও  অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের আজকের সংকটে নিহিত রয়েছে পাকিস্তান আমলে রোপন করা সে বামপন্থি রাজনীতির বীজ। আওয়ামী লীগ আজ  তাদের হাতেই অধিকৃত।পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই তারা বেশী তৎপর হয় বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। পাকিস্তান আমল তারা পরিকল্পিত ভাবে দখল করে নেয় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠিত মিডিয়াকে।মুসলিম লীগের প্রতিষ্টিত দৈনিক সংবাদ,দৈনিক আজাদ,দৈনিক পাকিস্তান (পরবর্তীতে দৈনিক বাংলা),সাপ্তাহিক বিচিত্রার ন্যায় পত্র-পত্রিকার পৃষ্ঠাগুলো তাদের দখলে চলে যায়।তারা প্রবেশ করে রেডিও-টিভিতেও। ষাটের দশকে আইয়ুব সরকারের বামপন্থি আমলাদের সহায়তায় তারা দখলে নেয় দেশের রেলস্টেশনের বুকস্টলগুলোকে। বুকস্টলগুলোকে ব্যবহার করে চীন ও রাশিয়া থেকে প্রকাশিত বামপন্থি সাহিত্য বিতরণের কাজে। সে ঘাতক মার্কসীয় জীবাণূর কারণে ছাত্র-ছাত্রিদের চেতনা রাজ্যে শুরু হয় প্রচন্ড মহামারি যা ধ্বসিয়ে দেয় প্যান-ইসলামি চেতনার ন্যায় পাকিস্তানের মূল ফাউন্ডেশনকে। ষাটের দশকে শুরু হয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চীন ও রাশিয়ার দ্বন্দ। সে দ্বন্দে বিভক্ত হয়ে যায় বাংলাদেশের বাম রাজনীতিও।ফলে তারা আর একক শক্তি রূপে বেড়ে উঠতে পারিনি।তবে জীবাণূর ন্যায় লাগাতর বেড়েছে অন্যান্য দলগুলির দেহে।

 

ষড়যন্ত্র গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে

গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় বামপন্থিদের কোন কালেই কোন আগ্রহ ছিল না। না পাকিস্তান আমলে, না বাংলাদেশ আমলে।পাকিস্তান আমলে এসব বামপন্থিদের বেশীর ভাগ আশ্রয় নেয় মাওলানা ভাষানীর প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ ও পরবর্তীতে ন্যাপে।মাওলানা ভাষানীর পীরমুরিদীর ব্যবসা থাকলেও ইসলামের শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠায় একটি বারও তিনি রাজপথে নামেননি।রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পক্ষে একটি বাক্যও তিনি উচ্চারণ করেননি। বরং আন্দোলন করেছেন সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায়; সেটি নাস্তিক কম্যুনিষ্টদের সাথে নিয়ে। ভাষানীর আগ্রহ ছিল না গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা নিয়েও। পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বড় সুযোগ আসে ১৯৬৪ সালে। তখন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সকল বিরোধীদলের সম্মিলিত প্রার্থি ছিলেন কায়েদে আযমের বোন ফাতেমা জিন্নাহ। তাঁর বিজয়ের সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু মাওলানা ভাষানী ও তার সঙ্গি বামপন্থি মালাউনগণ ফাতেমা জিন্নাহর বিজয়ের চেয়ে স্বৈরাচারি আইয়ুবের বিজয়কেই বেশী গুরুত্ব দেয়। আইয়ুব খানকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে মাওলানা ভাষানীর কৌশলটি কীরূপ ছিল সেটির বর্ণনাটি এসেছে লন্ডনস্থ পাকিস্তান বংশোদ্ভুত বামপন্থি সাবেক ছাত্রনেতা ও বুদ্ধিজীবী জনাব তারেক আলীর রচিত “Can Pakistan Survive?” বইতে। ষাটের দশকের গোড়ায় মাওলানা ভাষানী চীন সফরে যান। তার মোলাকাত হয় চেয়্যারমান মাও সে তুংয়ের সাথে। চেয়্যারমান মাও মাওলানা ভাষানীকে কি বলেছেন সেটি জানার জন্যই তারেক আলী ঢাকায় ছুটে যান মাওলানা ভাষানীর সাক্ষাতকার নিতে।মাওলানা ভাষানী তারেক আলীকে বলেন,“চেয়্যারমান মাও বলেছেন পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন নিয়ে সমস্যায় আছি। আমরা চাই না যে আইয়ুবকে অস্থিতিশীল করা হোক।” চেয়ারম্যান মাও সে তুং’য়ের নসিহতে মাওলানা ভাষানীর রাজনীতিই পাল্টে যায়। গণতন্ত্রের স্বার্থের চেয়ে চীনের জাতীয় স্বার্থই ভাষানীর কাছে বেশী গুরুত্ব পায়। তাই তিনি ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে কোন নির্বাচনি প্রচার চালাননি। পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সর্বশেষ সুযোগ আসে ১৯৬৯ সালে। আইয়ুব খান তখন রাজনীতি থেকে অবসর নিতে রাজি। রাজি হয়েছিলেনন পার্লামেন্টারি প্রথার গণতন্ত্র দিতেও। সে বিষয়টি নিয়ে একটি সমাঝোতায় পৌঁছতেই আইয়ুব খান সর্বদলীয় গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু সে বৈঠক বানচাল করতেই গোলটেবিলে না গিয়ে বামপন্থিদের নিয়ে মাওলানা ভাষানী জ্বালাও পোড়াও’য়ের আন্দোলন শুরু করেন। অপরদিকে মুজিব সে বৈঠকে রাখেন ৬ দফার দাবী। আইয়ুব খানের তখন বিদায়ের পালা। ফলে ৬ দফা পেশের স্থান গোলটেবিল ছিল না,সেটি ছিল নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়। উভয়ের ষড়যন্ত্রের ফলে গণতন্ত্র না এসে আসে রাজনৈতিক কান্ডজ্ঞানশূণ্য মাতাল ইয়াহিয়ার সামরিক শাসন। অথচ আইয়ুবের পর বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা পেলে একাত্তরের শাসনতান্ত্রিক সংকট পরিহার করা যেত।পরিহার করা যেত একটি রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধকেও। বামপন্থি মালাউনদের চাপেই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ভাষানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। দলটি শ্লোগান তোলে “ভোটের আগে ভাত চাই”।ভোটদানের মুহুর্তে কে ভাত দেবে সেটি ভাষানী ভেবে দেখেনি। মাওলানা ভাষানীর রাজনৈতিক ছাতাটি দুর্বল হলে কম্যুনিস্টগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং নানা নামে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কম্যুনিস্ট পার্টি গড়ে তোলে। তবে ভাষানীর সহচরদের অধিকাংশই যোগ দেয় বিএনপি’তে ও পরবর্তীতে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে।বামপন্থিদের মধ্যে যারা ছিল মস্কোপন্থি তারা জমা হয় মুজিবের দলে।একাত্তরে মুজিব ছিল মূলত বামপন্থিদের হাতেই জিম্মি। মুজিবের ঘাড়ে ভর করেই তারা স্বাধীন বাংলাদেশের ঝান্ডা উড়ায় এবং পরবর্তীতে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা কল্পে গণবাহিনী গড়ে তোলে। তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সন্ত্রাসের জন্মদাতা স্রেফ মুজিব নয়,নানা ব্রান্ডের এ বামপন্থি মালাউনগণও।

 

খপ্পরে জামায়াতে ইসলামিও

বামপন্থিদের খপ্পর থেকে আজ জামায়াতে ইসলামের ন্যায় সংগঠনও মুক্ত নয়। এদের অনেকে সুকৌশলে জামায়াতের মিডিয়াকে ব্যবহার করছে দলটির নেতাকর্মী ও জনগণকে সেক্যুলারাইজড করার কাজে।এভাবে জামায়াত কর্মীদের দূরে সরাচ্ছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মূল মিশন থেকে। এদের প্রভাবেই জামায়াত ও শিবিবকর্মীগণ একাত্তরের পরজয়কে নিজেদের বিজয় রূপে প্রচার করতে ১৬ই ডিসেম্বর ও ২৬ মার্চে অন্য যে কোন দলের তুলনায় বিশাল করে বিজয় মিছিল বের করে। ইসলামের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে এসব বামপন্থিদের ভূমিকাটি আদৌ গোপন নয়।নিজেদের মিশন থেকে তারা এক ইঞ্চি দূরে সরে নাই,বরং তাদের লক্ষ্য তো অন্যদেরকে তাদের পথে টানার। সেটির প্রমাণ বহু। সম্প্রতি দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত বামপন্থি লেখক ফরহাদ মাজহারের একটি প্রবন্ধ থেকে একটি উদাহরণ দেয়া যাক। তিনি লিখেছেনঃ “এ কালে ইসলামসহ ধর্মের কোন পর্যালোচনা বা গঠনমূলক ভূমিকা থাকতে পারে আমরা তা মনে করি না। আমি সব সময়ই এই রাজনীতির বিরোধিতা করে এসেছি।” –(সংকট পেরুবো কিভাবে? ০১/০৩/১৫)। উক্ত নিবন্ধে ফরহাদ মাজহার ইসলামের ভূমিকার ব্যাপারে একাল ও সেকালের মাঝে বিভাজন টেনেছেন;এবং একালে ইসলামের ভূমিকাকে অস্বীকার করেছেন। অথচ ইসলাম হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নির্ধারিত শ্বাশ্বত বিধান –সেটি যেমন সেকালের জন্য,তেমনি একালের জন্যও।তাই কালের প্রবাহে এ কোরআনী বিধান তামাদি হওয়ার নয়। পবিত্র কোরআন নামায-রোযা,হজ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতে যেমন পথ দেখায়,তেমনি পথ দেখায় রাজনীতি,সংস্কৃতি,শিক্ষা ও আইন-আদালতের ন্যায় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও। মহান আল্লাহতায়ালার এরূপ ইসলামি নির্দেশনাকে কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি ক্ষণিকের জন্যও অস্বীকার করতে পারে? সে কোরআনী বিধানের প্রয়োগকে কি সীমিত করা যায় কালের সীমারেখায়? সেটি করলে সে কি আর মুসলমান থাকে? অথচ ফারহাদ মাজহার শুধু বামপন্থিদের বুদ্ধিবৃত্তিক গুরু নন,বহু জামায়াত-শিবির কর্মীরও গুরু।হযরত মুসা (আঃ)এর মাত্র ৪০ দিনের অনুপস্থিতে বনি ইসরাইলের লোকদের যারা গোমু্র্তির পুজায় নিয়োজিত করেছিল তারা কেউই বাইরের মুর্তিপুজারি ব্রাহ্মণ ছিল না,তারা ছিল তাদেরই অতিপরিচিত বন্ধুবেশী গুরুজন।বাংলাদেশের তথাকথিত ইসলামপন্থিদের মাঝেও কি এদের সংখ্যা কম।এদের কারণেই বাংলাদেশের বুকে আল্লাহর পথে জিহাদ নাই।আল্লাহর শরিয়তী আইন প্রতিষ্ঠা নিয়েও কোন আন্দোলন নেই।আছে শুধু মন্ত্রী হওয়া,এমপি হওয়া বা উপজেলা বা পৌর সভার নির্বাচন জেতার ফিকির।

 

মালাউনদের সাফল্য

বাঙালী মুসলমানদের হিন্দু বা খৃষ্টান বানাতে সক্ষম না হলেও ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে ইসলামের শত্রুদের সফলতাটি বিশাল। সেটি সরকারের ঘাড়ে বসা বামপন্থি মালাউনদের কারণে। দেশের সরকারি ও বেসরকারি মিডিয়া তো তাদেরই দখলে। তারা বার বার যেমন মনিব পাল্টিয়েছে,তেমনি বার বার উপসনার ধরণও পাল্টিয়েছে। এখন আর তারা সমাজতন্ত্র বা কম্যুনিজমের কথা বলে না। চীন বা রাশিয়ার নামও তারা মুখে আনে না। তাদের ধর্মগ্রন্থ এখন আর কার্লস মার্কসের প্রণীত দাস ক্যাপিটাল নয়। শত শত এনজিও গড়ে এসব বামপন্থিগণ এখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পদসেবায় ব্যস্ত।এরা যেমন সরকারের অভ্যন্তরে খেলছে,তেমনি বাইরেও খেলছে।এরা যেমন হাসিনার দলে আছে,তেমনি আছে খালেদার দলেও। তারা যেখানেই থাকুক শরিয়তের প্রতিষ্ঠারোধ ও ইসলামপন্থিদের নির্মূলের এজেন্ডা থেকে তারা একটু্ও দূরে সরেনি। যারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চায়, যারা জিহাদ চায় তাদের হত্যার মাঝেই এসব মালাউনদের মহা-উৎসব। এরা খালেদাকে দিয়ে যেমন বহু মোজাহিদকে হত্যা করিয়েছে, তেমনি এখনও করাচ্ছে হাসিনাকে দিয়ে। এজন্য শুধু দেশী স্বৈরাচারিদের কাছেই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইসলামবিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের কাছেও তাদের কদর প্রচন্ড। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলোতে এরাই এখন সাম্রাজ্যবাদি কোয়ালিশনের ডি-ইসলামাইজেশন প্রজেক্টের ফুট সোলজার।

 

সাম্রাজ্যবাদি মার্কিনগণ ও তাদের সহযোগি ইউরোপীয় দাতাসংস্থা এসব বামপন্থিদের যে বিপুল অর্থ দেয় তাই নয়,বহুদেশে তাদের অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণও দেয়। সিরিয়ার মার্কসবাদি-লেলিনবাদি কুর্দিগণ তো মার্কিনী অস্ত্র নিয়ে নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়ছে। হাসিনাকে ঘিরেও ইসলামের এ চিহ্নিত শত্রুদের ষড়যন্ত্রটি বিশাল। তাদের ষড়যন্ত্রের ফলেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছিল।একাত্তরের যুদ্ধ শেষ হলেও ইসলামের শত্রুশক্তির নির্মূলের রাজনীতি এখনো শেষ হয়নি।শেষ হয়নি সে নির্মূলের কাজে সরকারের সহিংস আয়োজনও।বরং রাজপথ ভরে উঠেছে পুলিশ,র‌্যাব,বিজিবি ও দলীয় ক্যাডার বাহিনীর অস্ত্রধারিদের ভিড়ে। কখনো কখনো নামানো হয় সেনাবাহিনীকেও। দেশে এখন যুদ্বাবস্থা।ত্রুসফায়ার ও সন্ত্রাসী গ্রেফতারের নামে সরকারি বাহিনী ইচ্ছামত লাশ ফেলছে। অধিকাংশ জনগণ পরিণত হচ্ছে নিরব দর্শকে।পাশে কাউকে জবাই হতে দেখেও গরুছাগল ঘাস খাওয়ায় বিরতি দেয় না,তেমনি অবস্থা অধিকাংশ  বাংলাদেশীদের। দেশের এ ভয়ংকর পরিস্থিতিতে যেন তাদের কিছুই করণীয় নেই।দুর্বৃত্ত ভোট ডাকাতের সরানোর দায়িত্ব যেন শুধু রাজনৈতিক কমীদের।

 

জনগণের দায়ভার

গ্রামে আগুণ লাগলে যদি গ্রামবাসী ঘুমায় বা নীরব দর্শকে পরিণত হয়,তবে কি সে গ্রামের মানুষ আগুণ থেকে বাঁচে? সভ্য মানুষ এমন মুহুর্তে হাতের কাছে যা পায় তা দিয়েই আগুণ নেভায়। স্বৈরাচারি জালেমদের শাসন দীর্ঘকাল যাবত চলতে দেয়ার বিপদ টের পাচ্ছে সিরিয়ার জনগণ। প্রায় আড়াই লাখ মানুষের মৃত্যু ও ৪০ লাখ মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার পরও তাদের বিপদ কাটছে না। বাংলাদেশের বুক থেকে এ ডাকাতদের সত্বর না সরালে ভবিষ্যতে আরো বেশী রক্তব্যয়ে সরাতে হবে। তখন শুধু হরতাল-অবরোধ নয়,জনগণকে একটি প্রকান্ড যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতিকে সহ্য করতে হবে। আজ  সরকার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে এবং তাদের ঘরে আগুণ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সে আগুণ যে অচিরেই অন্যদের ঘরেও ছড়িয়ে পড়বে –তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? এতে বাংলাদেশ দ্রুত পরিণত হবে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে। স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের ধ্বংসাত্মক তান্ডব থেকে দেশবাসীকে বাঁচানোর জন্য জিহাদ তাই মহান আল্লাহতায়ালার বিধান। ইসলামে এটি ফরজ। মানব জাতির কল্যাণে এ জিহাদেই ঘটে মু’মিনের জীবনে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। এবং পরকালে আনে সবচেয়ে বড় পুরস্কার –সেটি বিনা বিচারে সরাসরি জান্নাত লাভের। একটি দেশ দুর্বৃত্ত শাসন থেকে মুক্তি পায়,এবং জনগণ শান্তি ফিরে পায় তো জিহাদের বরকতেই,আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে নয়।

 

ভোটডাকাত ও স্বৈরাচারিদের ক্ষমতায় বসিয়ে বাঁচার মধ্যে কোন সম্মান নাই।না ইহকালে ও না পরকালে।মানব সমাজে সবচেয়ে ব্যয়বহুল কাজটি হলো দুর্বৃত্ত নির্মূল,এবং ইসলামে এটিই সবচেয়ে পবিত্রতম ইবাদত। দেশের মানুষ কতটা ঈমান নিয়ে বাঁচে সে বিচার কি মসজিদ-মাদ্রাসা গুণে হয়? সে বিচারটি কি তাবলীগ জামায়াতে এজতেমায় কত লাখ মানুষ জমা হলো বা কতজন নামায-রোযা আদায় করলো –তা দিয়ে হয়? নামায-রোযা আদায় করার পরও একজন ব্যক্তি যেমন মুনাফিক হতে পারে,তেমনি দুর্বৃ্ত্ত শাসকের সৈনিকও হতে পারে। ঈমানদারদের জীবনের মূল মিশনটি হলো আমিরু বিল মারুফ তথা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও নেহী আনিল মুনকার অর্থাৎ অন্যায় নির্মূলের মিশন নিয়ে বাঁচা।এ মিশনে আত্মনিয়োগের কারণে সে চিহ্নিত হয় মহান আল্লাহর দলের সৈনিক রূপে।এ মিশনের বাইরে যারা,তারা বাঁচে শয়তানের দলের সৈনিক রূপে। তাই যেদেশে ঈমানদার আছে সে দেশে শয়তাদের সৈনিকদের বিরুদ্ধে জিহাদও অনিবার্য।সে অনিবার্যতাটি দেখা যায় সাহাবায়ে কেরামদের জীবনে।হাশর দিনে বিচার হবে অন্যায়ের নির্মূল ও ইসলামের প্রতিষ্ঠায় মু’মিনের নিজ জানমালের বিনিয়োগ কীরূপ -তা নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানদের সে বিনিয়োগই বা কতটুকু? বাংলাদেশের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা তো এখানেই। দেশে ভোট ডাকাতদের শাসন ও শরিয়তের অনুপস্থিতি কি সে বিশাল ব্যর্থতাটি ছাড়া কি অন্য কিছু প্রমাণ করে? ২০/০৩/১৫



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Sunday, 22 March 2015 22:48
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.