Home •বাংলাদেশ লুণ্ঠিত স্বাধীনতা ও ভারতের প্রতি দায়বদ্ধতার রাজনীতি
লুণ্ঠিত স্বাধীনতা ও ভারতের প্রতি দায়বদ্ধতার রাজনীতি PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Wednesday, 01 August 2018 18:47

গণতন্ত্রহীন নির্বাচন ও লুণ্ঠিত স্বাধীনতা

স্বাধীনতার অর্থ নিজের অধীনতা; সে স্বাধীন অঙ্গণে অন্যের কর্তৃত্ব থাকে না। এবং অন্যের অধীনতাকে বলা হয় পরাধীনতা। তবে স্বাধীনতার অঙ্গনটি স্রেফ চলাফেরা, পানাহার, ঘরবাধা ও সন্তান পালনের ক্ষেত্রে সীমিত নয়। স্বাধীনতা থাকতে হয় রাজনীতি, ধর্মপালন, মতপ্রকাশ এবং শিক্ষাসংস্কৃতির অঙ্গণেও। স্বাধীনতার অর্থ তাই স্রেফ মানচিত্র বা পতাকা থাকা নয়। সেটি যাকে ইচ্ছা তাকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসানো এবং ভোট না দিয়ে ক্ষমতা থেকে নামানোর অধীকারও। সেরূপ অধীকার না থাকার অর্থই পরাধীনতা। নির্বাচন হলো জনগণের সে অধীকার নিজের ইচ্ছামত প্রয়োগের সভ্য প্রক্রিয়া। সে সভ্য প্রক্রিয়ায় অসভ্য হস্তক্ষেপ হলে গণতন্ত্র বাঁচে না। ভোট ছিনতাইয়ের অর্থ তাই জনগণের স্বাধীনতা ছিনতাই। এবং যে দেশে স্বাধীনতা ছিনতাই হয় সে দেশে বার বার নির্বাচন হলেও সেটিকে গণতন্ত্র বলা যায় না। বরং তাতে দেশজুড়ে প্রতিষ্ঠা পায় চুরি-ডাকাতি ও ভোট ডাকাতির অসভ্যতা। এমন ভোট-ডাকাতদের হাতে অধিকৃত হওয়ায় বাংলাদেশে মারা পড়েছে স্বাধীন ভাবে কথা বলা, মিটিং-মিছিল করা ও পত্রিকা প্রকাশের স্বাধীনতা। এমন মৃত গণতন্ত্রের দেশে নির্বাচন পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রের সহায়-সম্পদের উপর ডাকাতির হাতিয়ারে। জনগণ কাদেরকে ক্ষমতায় বসাতে চায় সেটি জানতে তাই নির্বাচন হয় না, বরং নির্বাচনের নামে প্রহসন  হয় ভোট-ডাকাতদের মাথায় বিজয়ের মুকুট পরাতে।

 

ডাকাতগণ অর্থ ছিনিয়ে নিতে কারো অনুমতি নেয় না। বরং গায়ের জোরে ছিনিয়ে নেয়া অর্থের উপর তারা নিজেদের বৈধ অধীকার প্রতিষ্ঠা করে। একই কৌশল স্বৈরশাসকদের। রাষ্ট্রের উপর নিজেদের মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের প্রয়োজন হয় ভোটের। সেটি শাসক রূপে জনগণ থেকে বৈধতা পাওয়ার প্রয়োজনে। সে বৈধতা পেতে তারা ভোট-ডাকাতি করে। ফলে স্বৈরশাসক মাত্রই অপরাধী। তাদের অপরাধ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে তাদের হাতে ভোট-ডাকাতির নির্বাচন হয়েছিল ২০১৪ সালে। এবং সম্প্রতি হচ্ছে বিভিন্ন শহরের পৌর নির্বাচনে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩ সিটে কোন ভোটকেন্দ্র খোলা হয়নি। ঐ সিটগুলিতে কোন একজন নাগরিক থেকেও রায় নেয়া হয়নি। সমগ্র দেশের শতকরা ৫ জন ভোটারও ভোট দেয়নি। তেমন একটি নির্বাচনকে বৈধ নির্বাচন আখ্যা দিয়ে ভোট-ডাকাতগণ দখল জমিয়েছে দেশে ব্যাংক, বীমা, ট্রেজারীর উপর। ফলে ডাকাতি শুধু ভোটের উপর সীমিত থাকেনি। বরং ডাকাতদের হাত সম্প্রসারিত হয়েছে দেশের রাজস্ব  ভাণ্ডারের উপরও।

 

স্বাধীনতার শত্রুদের অবস্থান শুধু সীমান্তের বাইরে নয়, ভিতরেও। গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে যারা প্রতিদিন বাংলাদেশের মানুষের বাঁচার স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে তারা বিদেশী নয়, তারা বেড়ে উঠেছে নিজ দেশেই। স্বাধীনতার এসব শত্রুদের কারণেই নিজের জমির মালিকানা নিজের নামে রেকর্ড করতে, নিজের জমির উপর নিজের বাড়ী নির্মাণে বা নিজের গাড়ী রাস্তায় নামনোর স্বাধীনতা কিনতে হয় হাজার হাজার টাকা চাঁদা বা ঘুষ দিয়ে। স্বাধীনতার সুরক্ষায় তাই শুধু সীমান্ত পাহারা দিলে চলে না, পাহারা বসাতে হয় প্রতি মহল্লা ও প্রতি অফিসের প্রতি অঙ্গণে। স্বাধীনতার সুরক্ষা দিতে হয় প্রতিটি নরনারী জীবনে। যে কোন দেশের সরকারের  উপর এটিই সবচেয়ে গুরু দায়িত্ব। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারের এ নিয়ে গরজ নেই। বাকশালী সরকারের কাছে স্বাধীনতার সুরক্ষার অর্থ রাজনৈতিক শত্রুদের বিশেষ করে ইসলামপন্থিদের ফাঁসিতে ঝুলানো।

 

মানব জীবনের সর্বোচ্চ মর্যাদাটি হলো স্বাধীন ভাবে বাঁচা। এটি কারো দান নয়, অর্জনের বিষয়। অক্ষম ও অযোগ্য লোকদের এ মর্যাদা জুটে না। বরং তারা গোলামে পরিণত হয় অন্যদের। সভ্য ও মর্যাদাবান জাতি মাত্রই তাই স্বাধীনতা বাঁচাতে নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব দেয়। রাজস্বের অর্থ দিয়ে গড়ে তোলে বিশাল সেনা বাহিনী ও পুলিশ বাহিনী। স্বাধীনতা বাঁচাতে বহু অর্থ ও বিপুল রক্ত ব্যয়ে বছরের পর বছর যুদ্ধও করে। রাষ্ট্রের প্রতি অঙ্গণে স্বাধীনতার শত্রু ও মহান আল্লাহতায়ালার শত্রু রুখার জিহাদটি ইসলামে ফরজ। এ ফরজ পালনে কাজা চলে না। সে প্রস্তুতি না থাকাটি বরং কবিরা গুনাহ। কারণ তাতে অমান্য হয় মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের। পবিত্র কোরআনে ঈমানদারদের উদ্দেশ্য সে অলংঘনীয় হুকুমটি এসেছে এভাবেঃ “তাদের (শত্রুদের) বিরুদ্ধে প্রস্তুত হও এবং দাঁড় করাও নিজেদের সাধ্যমত সকল সামর্থ্য ও অশ্ববাহিনী এবং সে প্রস্তুতি দিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করো তাদের মনে যারা আল্লাহর শত্রু এবং তোমাদের শত্রু।”-(সুরা আনফাল, আয়াত ৬০)।

 

ঈমানদারকে তাই শুধু নামায-রোযার প্রস্তুতি থাকলে চলে না, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতিও থাকতে হয়। এবং সে প্রস্তুতিটির ক্ষেত্র শুধু দেশের সীমান্তে নয়; বরং রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গণে। কারণ শত্রুগণ শুধু সীমান্তে হামলা করে না, তাদের হামলার ক্ষেত্র তো রাষ্ট্রের প্রতি অঙ্গ জুড়ে। প্রস্তুতি না থাকলে সে অরক্ষিত  রাষ্ট্রে যা অনিবার্য হয় তা হলো শত্রুর হাতে পরাধীনতা। কিন্তু বাংলাদেশে অরক্ষিত এবং সে সাথে পরাধীন হলো প্রতিটি সাধারণ মানুষ। এমন কি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীগণও বাঁচার স্বাধীনতা হারিয়েছে; তারা লাশ হচ্ছে রাস্তাঘাটে। জনগণের হাজার হাজার কোটি  টাকার রাজস্বের অর্থ ব্যয় হচ্ছে স্রেফ সরকারের মন্ত্রী ও তাদের পরিবারের লোকদের সুরক্ষা দিতে। সাধারণ মানুষদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে নেকড়ের চেয়েও নৃশংস সন্ত্রাসী দুর্বৃত্তদের করুণার উপর। একটি দেশে মজলুম মানুষের উত্তম আশ্রয়স্থল হলো সে দেশের আদালত। কিন্তু সেখানেও কোন নিরাপত্তা নেই। সেখানেও অধিকৃতি সন্ত্রাসীদের। দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহসী মানুষ জনাব মাহমুদুর রহমান কুষ্টিয়ার আদালত প্রাঙ্গণে গুণ্ডাদের হাতে গুরুতর আহত হয়ে প্রমাণ করলেন, দেশের আদালত কতটা অক্ষম জানমালের সুরক্ষা দিতে। জনগণকে কি সুরক্ষা দিবে, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা হারিয়েছে খোদ আদালতও। তাই নিজের ইজ্জত বাঁচাতে চাকুরি ছাড়তে এবং সে সাথে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন দেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।

 

প্রকল্প চেতনা ও ইতিহাস বিনাশে

গণতন্ত্রে শক্তি বাড়ে জনগণের। কে হবে শাসক এবং কে যাবে আস্তাকুঁড়ে -সে সিদ্ধান্ত নেয় জনগণ। তাতে বিপদ বাড়ে স্বৈরাশাসনের। ফলে স্বৈরশাসক মাত্রই গণতন্ত্রের শত্রু। নিজেদের গদি বাঁচানো স্বার্থেই জনগণকে দুর্বল রাখাই প্রতিটি স্বৈরশাসকদের নীতি। সে লক্ষ্যটি সামনের রেখেই বাংলাদেশের স্বৈরশাসক চক্র ভূলিয়ে দিচ্ছে বাঙালী মুসলিমদের মুসলিম পরিচিতি। কারণ, মুসলিম পরিচয়টি বিলুপ্ত হলে বাঙালী মুসলিমদের গৌরবয় ইতিহাস রূপে আর কিছুই অবশিষ্ঠ থাকবে না। তাতে বিলুপ্ত হবে জনগণের আত্মবিশ্বাস। তখন মারা পড়বে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা বা দূত রূপে উন্নত রাষ্ট্র, সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণের ঈমানী দায়বদ্ধতার বিষয়টিও। তখন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রূপে  যা বেঁচে থাকবে তা হলো রবীন্দ্র বার্ষিকী, বর্ষবরণ, বসন্তবরণ এবং বর্ষবরণের দিনগুলিতে শাপ, পেঁচা, বানর, হনুমান ইত্যাদির প্রতীক নিয়ে শোভাযাত্রা। ইসলাম থেকে দূরে সরানোর এ হলো অতি পরিকল্পিত সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং। লক্ষ্য, সাংস্কৃতিক উৎসবের নামে বাঙালী মুসলিমের চেতনা থেকে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ ও তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতার কথা ভূলিয়ে দেয়া। কারণ, আল্লাহতায়ালার প্রতি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণে থাকলে তখন সে রাজনীতি সেক্যুলার হয় না, জিহাদে পরিণত হয়। সে রাজনীতিতে অন্য ব্যক্তি বা শক্তির  প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে না। তাছাড়া মহান আল্লাহতায়ালার নীতি হলো যখনই কোন ব্যক্তি তাঁর স্মরণ ও তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনা থেকে দূরে সরে, সে ব্যক্তির ঘাড়ে তিনি শয়তান বসিয়ে দেন। সে তখন তার সঙ্গি হয়ে যায় -(সুরা যুখরুফ, আয়াত ৩৬ )। তখন তার রাজনীতির মূল লক্ষ্যটি হয় শয়তানের ইচ্ছাপূরণ। তখন সে রাজনীতিতে গুরুত্ব পায় শরিয়ত, হুদুদ, জিহাদ, খেলাফতের প্রতিপক্ষ রূপে খাড়া হওয়া এবং জনগণকে জাহান্নামে টানা। বাংলাদেশে রাজনীতির নামে মূলতঃ সেটিই হচ্ছে।

 

বাংলাদেশের বুকে ইসলামী চেতনা বিনাশের রাজনীতিতে ইসলাম বিরোধী সেক্যুলারিস্টগণ একাকী নয়। তাদের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করেছে ভারত। বরং প্রকৃত সত্য হলো, ভারতের এজেন্ডা, অর্থ ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ। আরো বাস্তবতা হলো, তাদের হাতেই অধিকৃত আজকের বাংলাদেশ। তাদের নাশকতার গণ্ডি স্রেফ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে সীমিত নয়, বিস্তৃত শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অঙ্গণেও। তাদের সফলতাটিও বিশাল। ফলে ঢাকার রাস্তায় বসন্তবরণের উৎসব দেখে আত্মহারা হয় কলকাতার বর্ণহিন্দুদের পত্রপত্রিকা ও বুদ্ধিজীবী মহল। কারণ, কলকাতার পূজামণ্ডপে তারা যা দেখে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী দেখে ঢাকার রাজপথে। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার রিপোর্টার ২০১৮ সালের ১৫ই এপ্রিল তারিখে তো সেটিই লিখেছে। ভারতের সুবিধা হলো, ইসলামী চেতনা বিনাশের যুদ্ধে একাত্তরের ন্যায় বিশ্বস্ত পার্টনার রূপে কাজ করছে আওয়ামী বাকশালীগণ। ফলে ভারত সুযোগ পেয়েছে কই’য়ের তেলে কই ভাজার। ভারতের ভয়, বাঙালী মুসলিম চেতনায় আবার ইসলাম জেগে উঠলে তা আবার ১৯৪৭’য়ের মত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে। তাতে বিলুপ্ত হতে পারে বাংলার বুকে একাত্তরে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় আধিপত্য। ভারত-আশ্রীত আওয়ামী বাকশালীদেরও ভয়, সেরূপ রাজনৈতিক ভূমিকম্পে বিলুপ্ত হবে তাদের নিজেদের অধিকৃতি ও কায়েমী স্বার্থ। তাদের আরো ভয়, একবার যারা জাগতে পারে, তারা বার বার জাগতে পারে। এজন্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী বাকশালীদের এতটো উগ্রমুর্তি। কারণ এ লড়াইটা নিতান্তই তাদের বাঁচার।

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত ও ভারতপন্থিদের দাবীটি বিশাল। একাত্তরের যুদ্ধটি যে ভারত লড়েছে -সে কথাটি তারা নানা ভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। আওয়ামী বাকশালী মহলে তা নিয়ে বিতর্কও নেই্। সেজন্যই তাদের রাজনীতিতে ভারতের  প্রতি দায়বদ্ধতার সুর। তবে ভারতের প্রতি দায়বদ্ধতার গণ্ডিটিও বিশাল। সেটি শুধু রাজনীতিতে নয়; সেটি শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ইতিহাস পাঠের ক্ষেত্রেও। দায়বদ্ধতাটি পরিণত হয়েছে নিঃশর্ত  আত্মসমপর্ণে। বাংলাদেশীদের সে আত্মসমপর্ণ বাড়াতেই বিপুল আয়োজন ইসলামী চেতনা বিনাশের। কারণ, ইসলামী চেতনা বাঁচলে তো আত্মসমপর্ণ থাকে স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালাতে। তখন বিদ্রোহ শুরু হয় কাফের শক্তি ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে। এজন্যই ইসলামী চেতনা বিনাশের এজেন্ডাটি শুধু ভারতীয় পৌত্তলিক কাফেরদের নয়, সে অভিন্ন এজেন্ডা ভারতসেবী আওয়ামী বাকশালীদের। ভারতে এজন্যই শুরু হয়েছে নতুন করে ইতিহাস লেখার কাজ। লক্ষ্য, ইতিহাস থেকে মুসলিম অবদান বিলুপ্ত করা, হিন্দুদের অবদানকে বড় করে দেখনো। সে ইতিহাসে বাবরী মসজিদের ন্যায় বহু প্রসিদ্ধ মসজিদকে যেমন হিন্দুদের প্রাচীন মন্দির রূপে দেখানো হয়, তেমনি মুসলিমদের চিত্রিত করা আক্রমণকারী বিদেশী শত্রু রূপে।

 

বাংলাদেশেও ছাত্রদের কি শেখানো হবে এবং কি শেখানো হবে না -সেটিও নির্ধারণ করে দিচ্ছে ভারত এবং ভারতপন্থি আওয়ামী বাকশালীগণ। জনগণকে ঐতিহ্যহীন, চেতনাহীন ও আত্মবিশ্বাসহীন করার লক্ষ্যেই বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টিতে বাঙালী মুসলিমদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আজ আর গুরুত্ব পায় না। ইতিহাসের বইয়ে নবাব সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা ফজলুল হক, হাসান শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাযিমুদ্দীনের বদলে স্থান দেয়া হয়েছে ভারত-বান্ধব ও ভারতের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের। ভাবটা এমন, বাঙালী মুসলিমের ইতিহাসের শুরু স্রেফ শেখ মুজিবের হাতে এবং সেটি ১৯৭১ সাল থেকে। বাঙালী মুসলিমের গৌরবের ইতিহাস রূপে দেখানো হয় ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ গড়ার ইতিহাসকে। অথচ মুসলিমের গৌরব তো গড়ায়, ভাঙ্গায় নয়। ভাঙ্গা বা বিভক্তির কাজ ইসলামে হারাম; এটি   সুনিশ্চিত আযাব ডেকে আনে।–(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৫)। মহান আল্লাহতায়ালার সে ঘোষাণাটিই ইতিহাস বার প্রমাণিত করেছে। মুসলিমগণ তখনই বিজয়ের পর বিজয় পর এনেছে এবং বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে যখন ভাঙ্গার বদলে দেশ গড়ায় জান, মাল ও মেধার বিনিয়োগ করেছে।  অপরদিকে ভাষা, বর্ণ ও ভূগোলের নামে যখনই ভাঙ্গার কাজে মনযোগী হয়েছে তখন বিপর্যয় ও বেইজ্জতিতে ইতিহাস গড়েছে। একাত্তর পরবর্তী বাঙালীর বড় অর্জনটি অলিম্পিকে সোনা পাওয়া নয়, বরং সেটি বিশ্বমাঝে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি হওয়া এবং পর পর ৫ বার দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হওয়া। এ অবধিক মানব ইতিহাসে আর কেউই এ দুটি খেতাব একত্রে অর্জন করেনি। আরবগণ আরব ভূখণ্ডকে ভেঙ্গে ২২ টুকরো করেছে, তাতে কি তাদের গৌরব বেড়েছে। সে ভাঙ্গার মধ্য দিয়ে আরবদের অর্জনটি হলো শত্রুর অধিকৃতি, অপমান, ধ্বংস এবং দেশে দেশে রিফিউজী হওয়া।

 

শত্রুর বিনিয়োগ ও দালাল প্রতিপালন

মুসলিম দেশ ভাঙ্গার কাজটি প্রতিযুগে এবং প্রতিদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষ নিজ অর্থ, নিজ অস্ত্র ও নিজ রক্ত ব্যয়ে করেছে। আরব বিশ্বকে ২২ টুকরোয় বিভক্ত করতে তাই আরবদের কোন যুদ্ধ করতে হয়নি। সে কাজটি করে দিয়েছে ব্রিটিশ ও ফরাসী সেনাবাহিনী। তাদের হাতেই ওসমানিয়া খেলাফত পরাজিত ও খণ্ডিত হয়েছিল, কোন আরব সেনাবাহিনীর হাতে নয়। সে বিভক্তিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বটিও আজও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ পালন করে যাচ্ছে। তেমনি একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজটিও ভারত তার নিজ স্বার্থে নিজ অস্ত্র, নিজ অর্থ ও নিজ রক্ত ব্যয়ে করে দেয়া জন্য ১৯৪৭ সাল থেকেই প্রস্তুত ছিল। তারা শুধু একজন আজ্ঞাবাহী মুজিবের অপেক্ষায় ছিল। লক্ষণীয় হলো, মুসলিম দেশে শত্রুর বিনিয়োগ শুধু ভাঙ্গার কাজে হয়নি, বরং লাগাতর বিনিয়োগ হয়েছে সে বিভক্তিকে বাঁচিয়ে রাখার কাজেও। সেজন্য প্রয়োজন পড়েছে লাগাতর দালাল প্রতিপালনের। দালালদের ঘাড়ে চাপিয়েছে দায়বদ্ধতাও।

 

আফগান মুজাহিদগণ যেমন দীর্ঘ ১০ বছর যুদ্ধ লড়ে এবং বহুলক্ষ মানুষের প্রাণদানে আফগানিস্তানের প্রতিটি প্রদেশ, প্রতিটি জেলা ও প্রতিটি থানাকে সোভিয়েত রাশিয়ার অধিকৃতি থেকে স্বাধীন করতে হয়েছে, সেরূপ যুদ্ধ বাঙালীদের করতে হয়নি। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, প্রতিটি মহকুমা এবং প্রতিটি থানাকে স্বাধীন করে দিয়েছে ভারতীয় সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী। একাত্তরের সে যুদ্ধে বহুহাজার ভারতীয় সৈন্য প্রাণও দিয়েছে। এভাবেই ভারত পরিকল্পিত ভাবে বাঙালীর ঘাড়ে বিশাল দায়বদ্ধতার বোঝা চাপিয়েছে। এবং সে বোঝা ঘাড় থেকে নামানোর উপায় নাই। এটি শুধু দায়বদ্ধতার বোঝা নয়, গোলামীর বোঝাও। ভারতের চাপিয়ে দেয়া সে দাসত্বের বোঝা নিয়ে রাজনীতি করেছেন যেমন শেখ মুজিব, আজ করছেন সেটি মুজিব-কণ্যা শেখ হাসিনা। এজন্য তাদের রাজনীতিতে ভারত যা চায় তা দেয়াটি এতো গুরুত্ব পায়। ভারতের প্রতি দায়বদ্ধতার চাপ এতই অধীক যে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা তখন আর স্মরণে থাকে না। নিজ সামর্থ্যে স্বাধীনতা অর্জন করলে কি রাজনীতিতে এরূপ দায়বদ্ধতা থাকতো? লক্ষ্যণীয় হলো, বাংলাদেশের ইতিহাসের এ অধ্যায়টি পরিকল্পিত ভাবেই লুকানো হয়েছে।

 

প্রসঙ্গ ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃশ্যমান পক্ষ মাত্র দু’টি। একটি হলো, বাংলাদেশের জনগণ এবং অপরটি ভারত। বাংলাদেশের সৃষ্টি থেকে রাজনীতির ময়দানে লড়াই মূলতঃ এ দুটি বিপরীত পক্ষের। একাত্তরের ন্যায় আজও একই রূপ বিভাজন। ভারতের পক্ষে এ যুদ্ধে লড়ছে এক বিশাল স্তাবক বাহিনী। এ স্তাবক বাহিনীতে বাংলাদেশের সরকারি, বেসরকারি ও মিডিয়া অঙ্গণেও সেপাহীর সংখ্যা বিশাল। ভারতপ্রেম তাদেরকে দেশপ্রেমহীন ও আত্মসম্মানহীন চাকর-বাকরে পরিণত করেছে। ভারত আসাম থেকে ৪০ লাখ মুসলিমকে বহিস্কার করার ফন্দি করছে, কিন্তু তা নিয়েও এসব চাকর-বাকরদের মুখে কোন প্রতিবাদ নেই। শেখ হাসিনার মুখেও প্রতিবাদ নেই। অথচ নাগরিকের তালিকা থেকে বাঙালী মুসলিমদের বাদ দেয়ার খবর প্রকাশের সাথে সাথে “ভারতের বাসিন্দা হয়েও রিফিউজী ৪০ লাখ” বলে প্রতিবাদ ফেটে পড়েছেন পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। -(আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩০.৭.১৮)। গোলাম মানুষ ও স্বাধীন মানুষের রাজনীতির মাঝে এখানেই পার্থক্য। যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয় তাদের রাজনীতিতে যেমন জবাবদেহীতা থাকে, তেমনি দায়বদ্ধতাও থাকে। অথচ ভোট-ডাকাত স্বৈরশাসকদের সেটি থাকে না। যার ঘাড়ে বিদেশী প্রভুর প্রতি দায়বদ্ধতার বোঝা, তাঁর রাজনীতিতে যেমন মানবতা থাকে না, তেমনি সাহসও থাকে না। বরং থাকে নিরীহ মানুষদের গুম, খুন ও ফাঁসিতে ঝুলানোর কাপুরুষতা। থাকে ভোটকেন্দ্র দখল করে জাল ভোটে নির্বাচন জয়ের সামর্থ্য।

 

স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত নন; ২০১৪ সালের নির্বাচনে তাঁর দল শতকরা ৫ ভাগ ভোটারের ভোটও নেয়নি। ফলে জনগণের প্রতিনিধিত্ব যেমন নেই, তেমনি নেই জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনাও। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শেখ হাসিনা নির্ভরশীল স্রেফ ভারতের উপর; জনগণের ভোটের উপর। ফলে তাঁর দায়বদ্ধতা এবং জবাবদেহীতাও কেবল ভারতের প্রতি। ফলে পদ্মা ও তিস্তায় পানি শূন্যতা নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মাথাব্যথাই যত তীব্রই হোক, তা নিয়ে ভারতের ন্যায় শেখ হাসিনারও কোন মাথাব্যথা নাই। বরং তাঁর মাথাব্যথা তো বাংলাদেশের মধ্যভাগ দিয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে ভারতীয় বাস, ট্রাক, সাঁজোয়া গাড়ি পৌঁছানোর নিশ্চয়তা দেয়া নিয়ে। শেখ হাসিনার মাথাব্যথা তো বাংলাদেশের বন্দরে ও পণ্যের বাজারে ভারতের দখলদারি দেয়াতে। তাঁর আরো মাথাব্যথা, ভারতের উত্তর-ভাগের ৭টি রাজ্যে স্বাধীনতাকামীদের দমনে ভারত সরকারকে কি করে আরো সহায়তা দেয়া যায় -তা নিয়ে। এভাবে তিনি শুধু দেয়া নিয়েই ব্যস্ত। সম্প্রতি ভারত সফর শেষে ঢাকাতে ফিরে তিনি সাংবাদিকদের সামনে বলেছেন, ভারতকে আমি যা দিয়েছি তা কখনোই ভারত ভূলতে পারবে না। কিন্তু একথা বলেননি, ভারত বাংলাদেশকে কি দিয়েছে যা কোন দিনই বাংলাদেশীরা ভূলতে পারবে না?

 

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের কাছে ভারতের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টি গুরুতর। তাদের কাছে সেটি গণ্য হয় একাত্তরে ভারতীয় ভূমিকার মূল্য পরিশোধের দায়বদ্ধতা রূপে। সে দায়বদ্ধতায় অবহেলা দেখলে সেটিকে তারা ভারতের প্রতি গাদ্দারি বলেন। অথচ ভারতীয় স্বার্থের প্রতি গোলামী করাতে বাংলাদেশের জনগণের সাথে যে গাদ্দারি হয় -সে হুশ তাদের নেই। আর দায়বদ্ধতার রাজনীতি তো ক্ষণিকে শেষ হওয়ার না, সেটি আজীবনের। ফলে ভারতের প্রতি দায়বদ্ধতার রাজনীতি রূপ নিয়েছে আজীবন গোলমীর দায়বদ্ধতায়। ভারতের গোলামীকে জায়েজ করতে ইতিহাসের আরেক নিরেট সত্যকে তারা ইচ্ছা করেই আঁস্তাকুড়ে ফেলেছে। সেটি হলো, ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানে শামিল না হলে অসম্ভব ছিল ১৯৭১’য়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। তখন পশ্চিম বাংলার অংশ রূপে আজকের বাংলাদেশকেও ভারতভূক্ত হতে হতো। পাকিস্তানের হাত ধরেই ১৯৪৭’য়ে পূর্ব বাংলা ভারত থেকে পৃথক হয়েছে এবং ১৯৭১’য়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ফলে পাকিস্তানের প্রতি দায়বদ্ধতা অস্বীকার করলে গাদ্দারি হয় নিজের অতীত ইতিহাসের সাথে।

 

প্রশ্ন হলো, ভারতের প্রতি এরূপ দায়বদ্ধতা কি স্বাধীনতা? এ তো পরাধীনতার শৃঙ্খল? একাত্তরে ঋণ শোধের নামে বাংলাদেশীগণ কি তবে এরূপ পরাধীনতা যুগ যুগ বইবে? পরাধীনতার এ শৃঙ্খল গলায় নিয়ে আমৃত্যু রাজনীতি করে গেছেন শেখ মুজিব। এবং এ পরাধীনতাকেই তিনি স্বাধীনতা বলেছেন। স্বাধীনতা বলেছেন ২৫ সালা দাসচুক্তি স্বাক্ষর করাকেও। স্বাধীনতা বলেছেন ফারাক্কার পানি ভারতকে দেয়াকে। ভারতের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণেই তাঁর রাজনীতিতে ইসলামী চেতনাধারীদের কোন স্থান ছিল না। কারণ ভারত সেটি চায়নি। অথচ একাত্তরের পূর্বে সেটি কোন সমস্যাই ছিল না। বাংলার যে শহরে আওয়ামী লীগ ছিল, সেখানে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামী ইসলামী এবং অন্যান্য ইসলামী দলও ছিল। রাজনীতিতে বিরোধীতা থাকলেও কেউ কাউকে সেদনি শত্রু গণ্য করেনি। স্বাধীনতার দুষমনও বলেনি। বরং এক সাথে মিটিং-মিছিল এবং জোটবদ্ধ আন্দোলনও করেছেন। কারো নাগরিক অধিকার হননের কথা তখন কেউ কল্পনাও করেনি । অথচ শেখ মুজিব কেড়ে নেন এদেশে জন্ম নেয়া ইসলামপ্রেমি মানুষের দল গড়ার মৌলিক অধিকার। সেটি ভারতের ইশারায়। তাঁর আমলে রক্ষি বাহিনীর হাতে প্রাণ যায় ভারত-বিরোধী ৩০ হাজারেরও বেশী রাজনৈতিক কর্মীর। সেটিও ভারতের ইশারায়। এভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি পরিণত হয়েছে ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারির রাজনীতিতে। ভারতের স্বার্থ পূরণ করতে গিয়ে শেখ মুজিব বিলুপ্ত করেন দেশের বাণিজ্যিক সীমান্ত। তাতে ভারতে পাচার হয়ে যায় বাংলাদেশের খাদ্যশস্য এবং ধেয়ে আসে দুর্ভিক্ষ। সে দুর্ভিক্ষে মৃত্যু হয় বহু লক্ষ বাংলাদেশীর।

 

ভারতের প্রতি একই রূপ দায়বদ্ধতার রাজনীতিতে বিভোর শেখ হাসিনা। ফলে তার ব্যস্ততা ভারতকে কিছু না কিছু দেয়া নিয়ে। তিনি এখন বলতে শুরু করেছেন, আমি দিতেই ভালবাসি, চাইতে নয় –ভারত থেকে ফিরে সে কথাটি তিনি ঢাকায় বলেছেন। ফলে বাংলাদেশে নদীতে পানি না থাকলে কি হবে, কলকাতার  হুগলী নদীতে জাহাজ চললেই তিনি খুশি। অথচ একসাথে তো দুই নৌকায় পা দেয়া যায় না। ভারতীয় নৌকায় উঠাতে শেখ মুজিব হারিয়েছিলেন বাংলাদেশের জনগণের ভালবাসা। ফলে বিক্ষুব্ধ জনগণ দমনে তাঁকে রক্ষিবাহিনী হাঁকাতে হয়েছে। তিনি জনগণের নাগরিক অধীকার হনন করেছেন। সে সাথে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছেন। এবং একাত্তরে ভারতীয় ভূমিকার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন ভারতের প্রতি দায়বদ্ধতার রাজনীতি। শেখ মুজিবের ন্যায় শেখ হাসিনার রাজনীতিতেও ভারতের প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনাটি প্রকট। সে দায়বদ্ধতার চেতনা নিয়েই তিনি ভারতকে করিডোর দিয়েছেন, এবং ভারতীয় পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজার মূক্ত করেছেন। সে সাথে ভারতের জন্য খুলে দিয়েছেন বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দর। বাংলাদেশে স্বৈরাচারের নিপাত ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে এখানেই মূল চ্যালেঞ্জ। কারণ, যে যুদ্ধ হাসিনার বিরুদ্ধে, ভারত সে যুদ্ধকে নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলে গণ্য করে। এবং জনগণের বিজয় গণ্য হয় ভারতের পরাজয় রূপে। হাসিনার পতনে ভারতের যে বিশাল স্বার্থহানি হবে সেটি মেনে নেয়া ভারতের জন্য দুরুহ হবে। ফলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মূল শত্রু তাই ভারত।

 

ভারতীয় আগ্রাসন ও আত্মসমর্পণের রাজনীতি

বিগত শতবছরে ভারতের উচ্চবর্ণের হিন্দুগণ তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য থেকে এক বিন্দুও বিচ্যুৎ হয়নি। তাদের সে বহুঘোষিত লক্ষ্যটি হলো, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে হিন্দু ভারতের আধিপত্য। সে ভারতীয় আধিপত্য বার বার সামরিক আগ্রাসনে রূপ নিয়েছে। সে আগ্রাসনের শিকার যেমন পাকিস্তান, নেপাল, সিকিম, শ্রীলংকা ও ভূটান, তেমনি বাংলাদেশ। ভারতীয় আগ্রাসন থেকে বাঁচতেই পাকিস্তান, নেপাল ও  শ্রীলংকা চীনের সাথে সম্পর্ক মজবুত করেছে। অপর দিকে বাংলাদেশ বেছে নিয়েছে আত্মসমর্পণের নীতি। লক্ষণীয় হলো, ভারতীয় আগ্রাসনে ভারতের পেটে গায়েব হয়ে গেছে নিজামের হায়দারাবাদ, মুসলিম শাসিত গোয়া ও মানভাদার। এবং বিলুপ্ত করেছে স্বাধীন সিকিম। একই কারণে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের জনগণও আজ ভারতীয় বাহিনীর হাতে গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা নিয়ে ভারতের কোন কালেই কোন আগ্রহ ছিলনা। বরং নিজের আধিপত্যকে নিষ্কন্টক করার খাতিরেই ভারতের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানকে দুই টুকরো করা। সে কাজটি নিজ খরচে করে দেয়ার জন্য ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই প্রস্তুত ছিল। এবং একাত্তরে সেটিই ভারত করে দেখিয়েছে।

 

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠা পাক –সেটি ভারত ১৯৭১’য়ে যেমন চায়নি। এখনও চায় না। ভারত শক্তিশালী পাকিস্তান যেমন চায় না, তেমনি শক্তিশালী বাংলাদেশও চায় না। সেটি চাইলে ভারত কেন তাজুদ্দীনের ঘাড়ে ৭ দফা এবং শেখ মুজিবের ঘাড়ে ২৫ দফা চুক্তি চাপিয়ে দিল? কেনই বা পাকিস্তান আর্মীর অব্যবহৃত বহুহাজার কোটার অস্ত্র ভারত নিজ দেশে নিয়ে গেল। অথচ সে অস্ত্র কেনায় পূর্ব পাকিস্তানীদের রাজস্বের অর্থ ছিল। তারা জানে, পাকিস্তানের সাথে আর কোন দিনই বাংলাদেশের যুদ্ধ হবে নাা। তাদের ভয়, বাংলাদেশের হাতে অস্ত্র থাকার অর্থই হলো ভারতের বিরুদ্ধে কোন এক সময় ব্যবহৃত হওয়ার আশংকা। ভারত পাকিস্তানকে যেমন তার জন্ম থেকেই বিশ্বাস করেনি, তেমনি বাংলাদেশকেও বিশ্বাস করেনা। বিশ্বাস না করার কারণ, উভয় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম।

 

একাত্তরে ভারতের মূল লক্ষ্যটি ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গা। বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তান ভাঙ্গার আনুষঙ্গিক ফল রূপে। পৃথিবীর বুকে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সৃষ্টি নিয়ে আগ্রহ থাকলে ভারত কাশ্মীরের স্বাধীনতা দিত। পাকিস্তান ভাঙ্গলেও ভারতের দুশ্চিন্তা কাটেনি। ভারতের দুশ্চিন্তাটি হলো, পূর্ব সীমান্তে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্রটির শক্তিশালী আরেক পাকিস্তান রূপে গড়ে না উঠার। সে দুশ্চিন্তার কারণে বাংলাদেশকে তার জন্মের শুরু থেকেই গোলামীর বাধনে বাঁধার আয়োজন। সে জন্যই তাজুদ্দীনের ঘাড়ে ৭ দফা ও মুজিবের ঘাড়ে চাপানো হয় ২৫ শালা দাসচুক্তি। ভারতের ভয়, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি কালে বাঙালী মুসলিমদের মনে যেরূপ প্যান-ইসলামী চেতনা কাজ করেছিল সেরূপ চেতনা আবার জেগে উঠতে পারে। ভারতের পূর্ব সীমান্তে সে চেতনা আরেক শক্তিশালী পাকিস্তান গড়ার ক্ষেত্রেও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। আরো ভয়, ইসলামের জাগরণ বাংলাদেশে শুরু হলে তাতে অশান্ত হয়ে উঠতে পারে পশ্চিম বাংলা ও আসামের মুসলিম অধ্যুষিত বিশাল এলাকা। আসাম থেকে মুসলিম নির্মূলে এ জন্যই ভারতের এতো ষড়যন্ত্র। একই কারণে বাংলাদেশ থেকে তারা ইসলামি চেতনার নির্মূল চায়। এজন্য ভারতের প্রয়োজন ছিল, নিজ স্বার্থের একজন বিশ্বস্ত পাহারাদারের। সেটি জুটে ১৯৭১ সালে এবং সেটি শেখ মুজিবের মাধ্যমে।

 

ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারিতে শেখ মুজিবের ভূমিকাটি ছিল বিশাল। বাংলাদেশ সৃষ্টির শুরুতেই তিনি মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও অন্যান্য ইসলামী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করেন। কারণ, এ দলগুলির অস্তিত্ব ভারত চায়নি।  অথচ পাকিস্তানে কখনোই কংগ্রেসের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়নি –যদিও দলটি পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধীতা করেছিল। সংকুচিত করেন ইসলাম চর্চা। পিতার পদাংক অনুসরণ করে শেখ হাসিনাও নিজেকে পরিণত করেছেন ভারতীয় স্বার্থের নিষ্ঠাবান পাহারাদারে। ভারতের ইশারাতেই তিনি ইসলামপন্থিদের ফাঁসিতে ঝুলাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, শেখ মুজিব যা ভারতকে দেননি তা দিচ্ছেন শেখ হাসিনা। ফলে ভারত পেয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে ভারতের করিডোর, বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরগুলিতে ভারতের প্রবেশাধীকার এবং বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্যের অবাধ বাজার।

 

হস্তক্ষেপের রাজনীতি এবং ভারতের আত্মঘাতি সংকট

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের ভারতসেবী লোকেরা একাকী নয়। তাদের পাহারা ও পরিচর্যা দিতে সদাপ্রস্তুত হলো ভারত। বস্তুতঃ শেখ হাসিনা যেখানেই হুমকির মুখে, সেখানেই ভারত তাঁর পাশে। শেখ হাসিনার প্রতি ভারতের দাদাগিরি যে কতটা গভীর ও নিরবিচ্ছিন্ন -সেটি বুঝা যায় সাম্প্রতিক একটি ঘটনা থেকে। ব্রিটিশ লর্ড সভার সদস্য এবং বিশিষ্ট আইনজীবী লর্ড এলেক্স কার্লাইল বাংলাদেশে যেতে চেয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় আইনগত সহায়তা দেয়া –যেমনটি ১৯৬৮ সালে খোদ আওয়ামী লীগ ব্রিটিশ আইনজীবীকে এনেছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে সহায়তা দিতে। কিন্তু শেখ হাসিনা বিএনপিক সে সুযোগ দেননি। কারণ, রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে লেভেল ফিল্ড দেয়াটি আওয়ামী লীগের কাছে রীতি-বিরুদ্ধ বিষয়। তাদের কথা, মাঠের সবগুলি সুবিধা তাদের প্রাপ্য, অন্যদের নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথার বিলুপ্তির পিছনে মূল কারণ তো লেভেল ফিল্ড বিলুপ্তির নেশা। সেটি আইন-আদালতের ক্ষেত্রেও। একারণেই বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে লর্ড কার্লাইলকে ভিসা দেয়া হয়নি।

 

বিষয়টি নিয়ে কিছু সত্য বিষয় উম্মোচন করা কার্লাইলের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই পরিকল্পনা করেন, তিনি দিল্লি যাবেন এবং সেখানে সাংবাদিক সম্মেলন করে বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সে সুযোগও তাঁকে দেয়নি। সেটিও বানচাল করে দেয় ভারত সরকারের সহায়তায়। হাসিনাকে খুশি করতে ভারত সরকার কার্লাইল দিল্লি বিমান বন্দরে পৌঁছা মাত্রই মোবাইল টেক্স বার্তা মারফত তাঁর ভিসা বাতিল করে দেয়। ফলে কার্লাইল ফিরতে বাধ্য হন কোনরূপ সাংবাদিক সম্মেলন না করেই। এখানে যে বিষয়টি পরিস্কার তা হলো, শেখ হাসিনার অপসারণ দূরে থাক, তাঁর সরকারের অবিচার ও স্বৈরনীতির কেউ সমালোচনা করুক সেটিও ভারত সরকার মেনে নিতে রাজী নয়। বরং এরূপ ক্ষেত্রে ভারত দাঁড়ায় হাসিনার পক্ষে। ফলে বাংলাদেশে স্বৈরাচার বিরোধী লড়াই শুরু হলে ভারত যে তাতে নিজে থেকেই জড়িয়ে পড়বে -সেটি নিয়ে কি সন্দেহ  থাকে?

 

প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরে ভারত সব সময়ই একমাত্র নিজের স্ট্রাটেজিক স্বার্থটি দেখে। সে স্বার্থের সুরক্ষায় ভারত অন্য দেশের অভ্যন্তরে সামরিক ও বেসামরিক হস্তক্ষেপও করে। সেটি যেমন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে করেছে, তেমনি বার বার করেছে নেপাল এবং শ্রীলংকার অভ্যন্তরেও। ভারত দীর্ঘ বহুমাসের জন্য তার সীমান্ত দিয়ে নেপালে জ্বালানী তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের প্রবেশ নিষেধ করেছিল। সেটি স্রেফ নেপালের রাজনীতিকে নিজের বশে আনার জন্য। এতে ফল দাঁড়িয়েছে, নেপাল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও সে দেশের রাজনীতিতে কেউ ভারতের পক্ষে কথা বললে রাজনীতির ময়দানে তার মৃত্যু অনিবার্য করে তোলে। একই অবস্থা প্রতিবেশী পাকিস্তান ও শ্রীলংকায়। এভাবে প্রতিবেশে দেশগুলিতে ভারতের জন্য ক্ষতির অংকটিই শুধু বাড়ছে।

 

জনগণকে বাদ দিয়ে নিজস্বার্থের এজেন্টদের পাহারাদারিতে নামাটি কোন দেশের জন্যই কল্যাণ দেয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বহু দেশের কাছে এজন্যই অতি ঘৃণীত শক্তি। ভারতও একই কারণে দক্ষিণ এশিয়ার বুকে বন্ধুহীন। প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে ভারতের একমাত্র বন্ধু শেখ হাসিনা ও তার বাকশালী চক্র। বনের বাঘ-ভালুকের শিকার হলেই চলে, বন্ধু লাগে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সেটি চলে না। সরকার আসে ও যায়, কিন্তু জনগণ থেকে যায়। এবং জনগণের স্মৃতিতে থাকে যায় শত্রুর শত্রুসুলভ আচরণ। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও তখন পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলংকার ন্যায় ভারতের পক্ষে কথা বলাটিও ধিক্কার জনক অপরাধ গণ্য হবে। তখন বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে ভারতের করিডোর থাকবে, কিন্তু পাহারা দেয়ার কেউ থাকবে না। সাম্রাজ্যবাদি শত্রুশক্তি তো এভাবেই নিজের কবর নিজে খুঁড়ে। বাংলাদেশে যারা স্বাধীনতা চায় তাদের জন্য এটি এক বিশাল আশাবাদ। ০১/৮/২০১৮  Tweet:@drfmkamal; facebook.com/firozkamal



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Thursday, 02 August 2018 18:53
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2018 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.