হামাসের অমর কীর্তি Print
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 17 January 2009 23:10
প্রায় ২০ কোটি আরব যে কতটা বিভক্ত ও আত্মসমর্পিত সেটি আবারও নতুন ভাবে প্রমাণিত হল। গত ২২ দিন ধরে গাজার নিরস্ত্র মানুষের উপর চলছে ইসরাইলের বিরামহীন হামলা। হামলা হচ্ছে স্থল, বিমান ও সমুদ্রপথে। কিন্তু ২২টি আরব রাষ্ট্র এখনও কার্যকর কোন বৈঠকে মিলিত হতে পারলো না। গাজার মানুষের প্রতিরক্ষায় এক বস্তা আটা বা এক কৌটা দুধও তারা পৌঁছাতে পারেনি। গাজার প্রতিটি গৃহ ও প্রতিটি ইমারত আজ ইসরাইলীদের টার্গেট। যুদ্ধাক্রান্ত প্রতি দেশে কিছু চিহ্নিত নিরাপদ স্থান থাকে। তেমন স্থানের নিশ্চয়তা দেয় জাতিসংঘ ও হেলালে আহমার বা রেডক্রস। তেমন একটি স্থানও গাজায় নেই। নারী ও শিশুরা প্রাণে বাঁচছে না এমনকি জাতিসংঘের আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েও। আহত মানুষ বোমার আঘাতে পুনরায় আহত হচ্ছে হাসপাতালে গিয়ে। তোপের মুখে নিরাপত্তাহীন মানুষ প্রতিবেশী দেশে গিয়ে আশ্রয় নিবে সে সুযোগও নেই। হামলাকারি ইসরাইলের পাশে অপর দেশটি হলো সে হামলাকারি দেশেরই বন্ধু মিশর।

এমন এক শত্রুদেশ কর্তৃক অবরুদ্ধ একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির পক্ষে যুদ্ধ করা দূরে থাক, সে রকম একটি যুদ্ধের স্বপ্ন দেখাই বিস্ময়কর। তাছাড়া ইসরাইল কোন স্বাভাবিক দেশ নয়, ধ্বংস ও গণহত্যার নির্মমতায় এ দেশটির তুলনা একমাত্র হিটলারের জার্মানী ও জর্জ বুশের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই হতে পারে। বোমাবর্ষণে ব্যাপক ধ্বংস ও গণহত্যা -এ দুটি দেশের কাছে যেমন উৎসবযোগ্য, তেমনি উৎসবযোগ্য ইসরাইলের কাছেও। এমন একটি দেশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অর্থ, নিরস্ত্র হাতে হিংস্র বাঘের সামনে দাঁড়ানোর মত ব্যাপার। এমন অবস্থায় হামাস যে অসীম বীরত্বের প্রমাণ দিল সেটি বিস্ময়কর। একই সাথে উম্মোচিত হলো, আরব শাসকবর্গের কাপুরষতা ও কোন্দোল। গত সপ্তাহে কাতারের রাজধানী দোহাতে অনুষ্ঠিত হল গাজায় ইসরাইলের হামলার প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর শীর্ষ সম্মেলন। দোহার এ শীর্ষ সম্মেলনটি ডাকা হয়েছিল গাজার উপর ইসরাইলের হামলা বন্ধের লক্ষ্যে। এবং সম্মেলন ডেকেছিল কাতারের আমির। এ সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট আহমদী নেযাদ, তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া যোগ দিলেও যোগ দেয়নি সৌদি আরবের বাদশাহ আব্দুল্লাহ, মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনী মোবারক ও জর্দানের বাদশাহ আব্দুল্লাহ। যোগ দেয়নি এমন কি ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। আরব দেশগুলোর জন্য এটি এক লজ্জাজনক অবস্থা। এটি শুধু দৃষ্টিকটূই নয়, অতিশয় অমানবিক ইতরকর্মও। কোন মুসলমান এমন কর্ম যে করতে পারে সেটি অভাবনীয়। মিশর, জর্দান ও সৌদি শাসকদের ইসরাইলের খুনি নেতাদের সাথে প্রকাশ্যে বা গোপনে বসতে আপত্তি নেই, কিন্তু নানা আপত্তি অপর মুসলিম দেশের নেতাদের সাথে বসতে? আপত্তি হামাসের নেতাদের সাথে বসতেও। যে মুহুর্তে আরব নেতাদের মাঝে ঐক্য অতি গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক সে মুহুর্তে এরূপ অনৈক্য তাদের কদর্যতাকেই বিশ্বময় প্রচার পেল। পথের মানুষ অপরিচিত মানুষের ঘরে আগুণ দেখলেও ছুটে যায়। এটিই সাধারণ মানবতা। তাই একটি রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগী হতে বেশী মানবতা লাগে না। সে মানবতাটুকুতেও তাদের যে প্রচন্ড ঘাটতি সে বিষয়টিও তাদের আচরণে প্রকাশ পেল। এ ঘটনাটি সমগ্র বিশ্বের সামনে এসব নেতাদের উলঙ্গ করে ছেড়েছে। কিন্তু যাদের লজ্জা-শরম ও আত্মমর্যাদাবোধ বহু আগেই মৃত্যু-বরণ করেছে তাদের এরূপ উলঙ্গ হওয়াতেই বা কি ক্ষতি? শুধু তাই নয়, ইসরাইলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাম্প্রতিক প্রস্তাবে উক্ত পরিষদের অমুসলিম সভাপতির পক্ষ থেকে যে নিন্দা প্রস্তাব আনা হয়েছিল সেটির ভাষা নরম করতে অনুরোধ করেছিল ফিলিস্তিনের প্রতিনিধি। এর অর্থ, ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই দূরে থাক সে বর্বরতম হামলার বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় নিন্দা করার সামর্থও এসব আত্মসমর্পিত নেতাদের নেই। এরই আরেক প্রমাণ, ফাতাহ শাসিত জর্দান নদীর পশ্চিম তীর। একদিকে গাজায় হামাস কর্মীরা যেখানে জ্বিহাদে শহীদ হচ্ছে সেখানে তাদের কর্মীদের দিয়ে জেলখানা পূর্ণ করা হয়েছে মাহমুদ আব্বাসের সরকার রাজধানী রামাল্লাহ’য়। এবং এটি নিছক ইসরাইলকে খুশি করতে।


আরো উল্লেখ্য, গাজার উপর ইসরাইলী হামলার জন্য হামাসকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছিল মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনী মোবারক ও ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। হামলা যেদিন শুরু হয় সেদিন কায়রো সফরে অবস্থান করছিল ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিপ্পি লিভনী। কায়রোতে প্রেস কনফারেন্স করে সে বলেছিল, হামাসকে ইসরাইল আর সহ্য করবে না। বলেছিল ‘এনাফ ইজ এনাফ’। তখনই বোঝা যাচ্ছিল, গাজায় উপর হামলা অত্যাসন্ন। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিপ্পি লিভনী কায়রোতে গিয়েছিল মিশরের সরকারকে সে কথাটি জানাতে। এটি হতেই পারে না, ইসরাইল হামাসের বিরুদ্ধে বিশাল যুদ্ধ শুরু করবে আর সেটি কায়রোকে জানানো হবে না। হামাসের উপর শুধু ইসরাইলই ক্ষিপ্ত নয়, অতিশয় ক্ষিপ্ত হলো মিশর, সৌদি আরব, জর্দান এবং ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। এরা হামাস নেতাদের বিরুদ্ধে বলছে, তারা ইরানের প্রভাবাধীন। এখানে ইরানের দোষ, তারা ইসরাইলী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হামাসের প্রতিরোধ যুদ্ধকে সমর্থন করে। যেমনটি করেছিল লেবাননের হিজবুল্লাহকে। সে সময় ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত হিজবুল্লাহকে সৌদি আরব সমর্থন না করে হটকারিকতা বলে অভিহিত করেছিল। আর আজও হামাসের বিরুদ্ধে তাদের আচরণটি ভিন্নতর নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত তারাও আত্মরক্ষার অধিকারটি শুধু ইসরাইলকে দিতে চায়, ফিলিস্তিনীদের নয়। ফলে আত্মরক্ষার সে অধিকার সুনিশ্চিত করতে ব্যাপক অস্ত্র জোগানো হচ্ছে ইসরাইলকে। আর এতে ইসরাইল পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তিতে। অথচ প্রতিরক্ষার নূন্যতম সামর্থ অর্জনের কোন সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না। ফলে হামাসকে অস্ত্র নিতে হচ্ছে পাতাল টানেলের গোপন পথে। আর এটিকে ইসরাইল যেমন বে-আইনী বলছে তেমনি বলছে মিশর, সৌদি আরব, জর্দান। অথচ প্রতিরক্ষার সামর্থ ছাড়া কি স্বাধীনতার অর্থ থাকে? ইসরাইল মুখে বলছে, তারা ফিলিস্তিনকে স্বাধীনতা দিতে ইচ্ছুক। কিন্তু রাজী নয়, তাদের প্রতিরক্ষার সামর্থ গড়ে তোলার। এমন একটি প্রতিরক্ষাহীন অবস্থা নিশ্চিত করার জন্য্ই স্থল, সমুদ্র ও আকাশ পথে অবরোধ সৃষ্টি করে রেখেছে গাজার বিরুদ্ধে।


হামাস সরকার গঠন করেছিল বিগত নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর। কিন্তু ইসরাইল, মাকিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন হামাসের সে নির্বাচিত সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। অথচ সমগ্র আরব বিশ্বে হামাসের সরকারই ছিল জনগণের ভোটে নির্বাচিত একমাত্র সরকার। সৌদিআরব, মিশর, জর্দানসহ কোন দেশের সরকারেরই সে বৈধতা নেই। সে বৈধতাই হামাসের জন্য বিপদ ডেকে আনে। মুছিবত ডেকে আনে ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য, জনগণের অপরাধ তারা কেন হামাসকে নির্বাচিত করলো। এই হলো পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের নমুনা। শুরু থেকেই শুরু হয়, হামাসকে ক্ষমতা থেকে হটানোর নানারূপ ষড়যন্ত্র। হামাসের প্রতিদ্বন্ধী দল হলো ফাতাহ। দুর্বৃত্তকবলিত এ দলটিকে ফিলিস্তিনের মানুষ নির্বাচনে প্রত্যাখান করে। জনগণ প্রত্যাখ্যান করলে কি হবে, তারাই ছিল ইসরাইল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে অতি পছন্দের। ইসরাইল সমর্থক এ পক্ষটি শুরু থেকেই মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার পরীক্ষায় শুরু থেকে শূণ্য নম্বর পেয়েছে। ১৯৪৮ সালে ইউরোপীয় দেশসমুহ থেকে বিতাড়িত ইহুদীরা ফিলিস্তিনের আদিবাসীদের সামরিক বলে উচ্ছেদ করে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা করে। তখন সে অন্যায় ও অবৈধ দেশটিকে স্বীকৃতি দিতে তারা কোনরূপ গড়িমসি করেনি। তাদের সে নৈতিকতা শূণ্য বিবেচনায় সেটি বরং বৈধ ও মানবিক মনে হয়েছে। আর সে একই রূপ নৈতিকতাহীনতার কারণে ইসরাইলের বর্তমান হামলা যেমন তাদের কাছে বৈধ মনে হয়েছে তেমনি অগ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়েছে হামাসের নির্বাচনী বিজয়। হামাসকে শক্তি বলে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করতে ইসরাইলী কর্তৃপক্ষ অস্ত্র তুলে দেয়ে প্রচন্ড হামাস-বিরোধী ফাতাহ নেতা জনাব দাহলানের সমর্থকদের হাতে। কিন্তৃ সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। কারণ হামাসের জনসমর্থনের মুখে এসব ষড়যন্ত্র টিকতে পারেনি। তবে গাজায় যেটি করতে তারা ব্যর্থ হয়, সেটি সমাধা করে জর্দান নদীর পশ্চিম তীরে। কারণ, সেখানে শুধু দাহলানের মত বহু মিরজাফরই ছিল না, ছিল ইসরাইলীদের সামরিক উপস্থিতিও। ইসরাইলী সেনাবাহিনী এখনও সেখানে ট্যাংক নিয়ে ঘুরে। ইসরাইল সেখানে হামাস দলীয় সংসদ সদস্যদের ব্যাপকভাবে গ্রেফতার করে, এমন কি গ্রেফতার করে হামাস দলীয় পার্লামেন্টের স্পীকারকে। গ্রেফতার করে বহু মন্ত্রীকে। এভাবে হামাসের ক্ষমতা খর্ব করার পর নিজ দলের সরকার গঠন করতে দেয় ফাতাহ দলীয় নেতা জনাব মাহমুদ আব্বাসকে। সেখানে সে সালাম ফায়াজকে প্রধানমন্ত্রী করে বিকল্প সরকার গঠন করে। অপর দিকে নির্বাচনে যারা সমগ্র ফিলিস্তিনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল তাদের নেতৃবর্গ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে ১৫ লাখ মানুষ অধ্যুষিত গাজায়। সালাম ফায়াজের সরকার যদিও নির্বাচিত সরকার নয়, সে সরকারকে তৎক্ষানাৎ স্বীকৃতি দেয় ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ। স্বীকৃতি দেয় মিশর, জর্দান ও সৌদিআরবসহ স্বৈরাচারি রাষ্ট্রগুলোও। অপর দিকে সর্বপ্রকার অবরোধ আরোপ করে গাজার উপর। গাজা পরণত হয় এক জেল খানায়। সে জেলখানার কঠোর পাহারাদারিতে ইসরাইলের সাথে যোগ দেয় মিশর। আর সেটিকে পুরাপুরি সমর্থণ করে সৌদি আরব ও জর্দান। জেলখানার কয়েদীদের নিছক বাঁচিয়ে রাখার খাতিরে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু খাদ্য-পানীয় ও ঔষধ সরবরাহ করা হয়, তবে হরন করা হয় স্বাধীনতা। জেলখানাকে সেজন্যই বলা হয় জেলখানা। মাসের পর মাস গাজার ১৫ লাখ মানুষকে আজ সেরূপ এক জেলখানাতেই বাস করতে হচ্ছে। আর সেখানে খাদ্যপানীয় সরবরাহের ন্যায় খয়রাতি কাজের ঠিকাদারি পেয়েছে জাতিসংঘ। আর এখন সেটুকুও করতে দিচ্ছে না ইসরাইল। ইসরাইলী বিমান বাহিনী কয়েক টন ওজনের বোমা ফেলেছে জাতিসংঘের গুদামে। বহু মিলিয়ন ডলারের রিলিফ সামগ্রী সেখানে পুড়ে ভস্মে পরিণত হয়েছে। বোমা ফেলেছে জাতিসংঘ পরিচালিত স্কুলে এবং হত্যা করেছে সেখানে আশ্রয় নেওয়া বহু শিশু ও নারীদের। গাজার অবস্থা এখন জেলখানার চেয়েও শোচনীয়। জেলখানায় কেউ হাজার হাজার টন বোমা ফেলে না, যা পড়ছে গাজার মানুষের মাথার উপর।


হামাসের অপরাধ, জেলখানার খাদ্যপানীয় নিয়ে তারা খুশি নয়। তারা চায় পূর্ণ স্বাধীনতা। সেজন্য তারা লড়াইয়ের পথ বেছে নিয়েছে। আর হামাসের সে প্রতিরোধের লড়াইকে বলা হচ্ছে সন্ত্রাস। অপর দিকে মিশর, সৌদি আরব, জর্দান বেছে নিয়েছে আত্মসমর্পনের পথ।এজন্যই হামাসের লড়াকু ভূমিকা তাদের কাছে এত অপছন্দের। ইসরাইল ও মার্কিনীদের সাথে সুর মিলিয়ে এসব দেশের নেতারাও তাদেরকে সন্ত্রাসী বলছে। আরব নেতাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত ভেনিজুয়েলা ও বলিভিয়া থেকে। দেশ দুটির অবস্থান হাজার হাজার মাইল দূরের দক্ষিন আমেরিকায়।গাজার উপর হামলায় দেশটির সরকার এতটাই বিক্ষুদ্ধ হয়েছে যে তারা ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। কিন্তু সেটি করিনি মিশর ও জর্দান, তারা ইসরাইলের সাথে সখ্যতা রেখেছে এখনও। বরং গাজায় গণহত্যায় ইসরাইল ও মার্কিন সরকারের সাথে আর কোন সরকার যদি খুশি হয়ে থাকে তবে সেটি মিশর, সৌদিআরব ও জর্দানের ন্যায় দেশের স্বৈরাচারি সরকার। হামাসের মত ইসলামি চেতনার লোকদের তো তারা নিজেরাও নিজ দেশে বরদাশত করতে রাজী নয়। যে উৎসব ভরে ইসরাইল হামাস কর্মীদের হত্যা করছে সেটি তো তারা নিজ দেশেও করতে প্রস্তুত। সে কারণই তাদের আগ্রহ নেই গাজায় ইসরাইলের হামলা রোধে। তারা বরং হামাসের নির্মূল কাজে ইসরাইলের সময় ও সুযোগ দিতে চায়। সে জন্যই এসব দেশের সরকার দোহা’র শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়নি।


ইসরাইলের ন্যায় আরব বিশ্বের স্বৈরাচারি শাসকরাও ভেবেছিল, এবারের হামলায় ইসরাইল হামাসকে নিশ্চিহ্ন করে ছাড়বে। আর এতে তারা ভেবেছিল, তাদের পথের কাঁটা এবার সরে যাবে। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। আর এতেই এসব শাসকদের হতাশা। তাছাড়া এ হামলার ফলে সমগ্র বিশ্বজুড়ে যেমন গৌরব বেড়েছে হামাসের, তেমনি কদর্যতা বেড়েছে মুসলিম বিশ্বের স্বৈরাচারি রাজা-বাদশাহ ও প্রেসিডেন্টদের। হামাসের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হলেও এ যুদ্ধে হামাসের বিনাশ হচ্ছে না। এতেই হামাসের বিজয়। বরং এ হামলার ফলে প্রচন্ড ভাবে বাড়বে তাদের শক্তি। কারণ রক্তের বিণিয়োগ কখনোই ব্যর্থ হয় না। ঈমানদারের সে বিণিয়োগ নামিয়ে আনে আল্লাহর রহমত। শহীদের রক্ত হারিয়ে গেছে এমন নজির নেই। ব্লাড-ট্রান্সফিউশনের ন্যায় শহীদের রক্ত ঈমানের ট্রান্সফিউশন ঘটায় মুসলিম উম্মাহর জীবনে। তাই যে দেশে শহিদের সংখ্যা যত বেশী সেদেশে ঈমানাদারের সংখ্যাও বেশী। তাই তো মাওলানা মহম্মদ আলী জাওহার বলেছিলেন, “ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হর কারবালা কি বাদ।” অর্থঃ “প্রতি কারবালার পরই ইসলাম জিন্দা হয়”। তাই যেখানে কারবালা নেই সেখানে বিজয়ী ইসলামও নেই। প্রকৃত ঈমানদার গড়ে উঠার উর্বর ক্ষেত্রও নাই।


ইসলামের প্রাথমিক যুগে যত রক্তক্ষয়ী জ্বিহাদ হয়েছে তত জ্বিহাদ আর কোন সময়ই হয়নি। তাই সে সময় ঈমান সৃষ্টিতে প্রচন্ড উর্বরতা পেয়েছিল আরব ভূমি। শতকরা ৭০ ভাগ সাহাবী সেদিন শহিদ হয়েছিলেন। তাদের রক্তদানে সেদিন প্রচন্ড ভাবে বেড়েছে মুসলমানের ঈমান ও তাদের সামরিক শক্তি। তাই লাগাতর জ্বিহাদে মুসলিম উম্মাহ শক্তিহীন হয় না, বরং শক্তিশালী হয়। অথচ জাতিয়তাবাদী যুদ্ধে প্রাণহানী হলেও সেখানে ঈমান বাড়ে না। একাত্তরে বাঙ্গালীদের যুদ্ধে বিপুল প্রাণহানী হলেও তাতে সুনীতি না বেড়ে বেড়েছে দূর্নীতি। পরবর্তীতে দেশটি দূর্নীতে লাগাতর বিশ্ব-শিরোপাও পেয়েছে। আজকের মুসলিম ভূমিতে জ্বিহাদ যেমন দুর্লভ তেমনি দুর্লভ হয়েছে ঈমানদার মুসলমানের সংখ্যা। দেশে দেশে মুসলিম উম্মাহর আজ এক প্রচন্ড ঈমান শূণ্যতা। এরূপ ঈমানশূণ্যতার কারণেই প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে আজ ইসলামের বিপক্ষ-শক্তি আজ ক্ষমতাসীন। সেসব দেশে আজ পরাজিত হলো আল্লাহর বিধান -“শরিয়ত”। আফগানিস্তানের মুসলমানেরা বিপুল রক্তের বিণিয়োগ করেছে আফগানিস্তানে। ফলে বেড়েছে ঈমানের প্রচন্ডতা, সে প্রচন্ডতায় পরাজিত হয়েছে এককালের বিশ্বশক্তি সোভিয়েত রাশিয়া। আর আজ সেখানে পরাজিত হতে যাচ্ছে আরেক বিশ্বশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যেভাবে মুসলিম শক্তির আবির্ভাব ঘটেছিল সে পথই ধরেছে হামাস। আর সে পথেই বিস্ফোরণ ঘটেছে ইসলামি শক্তির। হামাস ইতিমধ্যেই সে শক্তির প্রমাণ রেখেছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে মিশর, জর্দান ও সিরিয়ার সম্মিলিত বাহিনী ৭ দিনও টিকতে পারেনি। আর হামাসের কয়েক হাজার মোজাহিদ লড়ে যাচ্ছে দীর্ঘ ২২দিন ধরে। হামাসের এ বিজয়ের সাথে একমাত্র লেবাননের হিজবুল্লাহর বিজয়েরই তুলনা চলে। দীর্ঘ ৩৩ দিন লাগাতর বোমাবর্ষন করেও ইসরাইল হিজবুল্লাহকে হারাতে পারেনি। হামাস একই ভাবে ইসরাইলের টাংকগুলোকে গাজার অভ্যন্তরে ঢুকতে দেয়নি। হামাসের রকেট নিক্ষেপ বন্ধ করতে ইসরাইল যুদ্ধ শুরু করেছিল। কিন্তু সেটিও বন্ধ করতে পারিনি। যুদ্ধ বিরতির নামে হামাসকে পরাজয়ের দলীলে দস্তখতে বাধ্য করতে চেয়েছিল, ইসরাইল তাতেও ব্যর্থ হয়েছে। এটি সত্য, ফিলিস্তিনীদের বহু ক্ষয়ক্ষতি ও রক্তক্ষয় হয়েছে। এ অবধি মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১২০০ ফিলিস্তিনীর। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই শিশু। বিধস্ত হয়েছে বিপুল সংখ্যক বাড়ীঘর, অফিস-আদালত, এমনকি হাসপাতাল। কিন্তু তাতে ইসরাইলের বিজয় জুটেনি। রক্ত আজ বিজয়ী হতে যাচ্ছে ইসরাইলের ট্যাংক-কামান, এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ও শত শত টন বোমার উপর। বিশ্বের ১৫০ কোটি মুসলমান যেখানে দেশে দেশে আত্মসমর্পনের ইতিহাস গড়ছে, গাজার ১৫ লাখ মানুষ সেখানে সৃষ্টি করলো সংগ্রামী সাহসিকতা ও বিজয়ের এক গৌরবজনক ইতিহাস। আজকের মুসলমানদের সামনে গর্ব করার বিষয় সামান্যই। হামাসের কৃতিত্ব, মুসলমানদের উপার্যপরি পরাজয় ও অপমানের মাঝে এমন এক বিস্ময়কর বীরত্ব তারা দেখালো যা নিয়ে আগামী দিনের মুসলমানেরা বহুকাল গর্ব করতে পারবে। সে সাথে শিক্ষণীয় উৎসাহও পাবে। হামাসের অমর কীর্তি এখানেই। ১৭/০১/০৯

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Monday, 06 April 2009 03:29