সভ্যতার সংঘাত এবার পাকিস্তানে Print
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 23 May 2009 15:43
সভ্যতার সংঘাতের তত্ত্ব পেশ করেছিলেন মার্কিন প্রোফেসর হান্টিংটন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্রের বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে এটি এক আলোড়ন সৃষ্টিকারি মতবাদ। যা প্রবলভাবে প্রভাবিত করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও পররাষ্ট্র-নীতিকে। প্রোফেসর হান্টিংটন লিখেছেন, সভ্যতার চুড়ান্ত সংঘাতটি হবে পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে মুসলিম সভ্যতার। তার মতে এ দুই সভ্যতার শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান অসম্ভব। সভ্যতা দুটি ধারণ করে দুটি ভিন্ন বিশ্বাস ও দুটি ভিন্ন মূল্যবোধ। জীবন ও জগত নিয়ে দুটি সভ্যতার মানুষের চিন্তা-চেতনাই সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাশ্চাত্য সভ্যতার ধারকদের কাছে ইসলাম ও তার শরিয়ত হলো মধ্যযুগীয় বর্বরতা। তাই সে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা পৃথিবীর কোন দেশেই তারা মেনে নিতে রাজী নয়। আফগানিস্তানের উপর মার্কিন হামলার মূল লক্ষ্য ছিল, সে সম্ভাবনাকে শুরুতেই মিটিয়ে দেওয়া। অপরদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতার অপরিহার্য উপাদান হলো ব্যভিচার, উলঙ্গতা, পর্ণগ্রাফী ও দেহব্যবসার ন্যায় আদিম পাপাচার। গ্রহনযোগ্য হলো সূদ, সমকামিতা এমন কি পুরুষের সাথে পুরুষের ও নারীর সাথে নারীর বিবাহ। এভাবে যে বিশ্বাস ও আচরণগুলো পাশ্চাত্য সভ্যতার অপরিহার্য উপাদান রূপে গণ্য হচ্ছে, সেগুলোই ঈমানদার মুসলমানদের কাছে গণ্য হচ্ছে আদিম বর্বরতা ও পাপাচার রূপে। ইসলামের আগমন এমন পাপাচারের নির্মূলে, শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান দিতে নয়। এভাবে দুটি ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের জীবন-লক্ষ্য, যুদ্ধ-বিগ্রহ বা বাঁচা-মরাই হলো সম্পূর্ণ বিপরীত-মুখি দুটি ভিন্ন উদ্দেশ্যে।

প্রবল প্রচারের যুগে কোন দর্শন বা মূল্যবোধই এখন আর কোন বিশেষ দেশে সীমাবদ্ধ থাকছে না, ছড়িয়ে পড়েছে তা বিশ্বব্যাপী। ফলে এরূপ দুটি ভিন্ন চেতনায় বিভক্ত শুধু পৃথিবী নয়, বরং প্রতিটি দেশ ও প্রতিটি সমাজ। সে বিভক্তি কোথাও বা প্রবল, কোথাও বা কম। এ বিভক্তি থেকেই জন্ম নিচ্ছে রক্তাত্ব সংঘাত। আর এমন এক রক্তাত্ব সংঘাতই আজ প্রবল ও অবিরাম ভাবে শুরু হয়েছে পাকিস্তানে। এ লড়াইয়ে ভাষা, বর্ণ, ভূগোল ও অর্থনীতি কোন বিষয়ই নয়, বরং মূল বিষয় হলো দর্শন, মূল্যবোধ ও জীবনবোধ। দুই শিবিরেই নানা ভাষা-ভাষী মানুষ এখানে একাকার। তাই হিন্দু ও মুসলিম দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান আজ নিজেই বিভক্ত দ্বি-জাতিতে। এবং সেটি চুড়ান্ত ভাবে। একটি ইসলামের পক্ষের, অপরটি বিপক্ষের। সে লড়াই দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে এ দুই পক্ষের মাঝে। এতদিন সেটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। এ যাবত বাজাউর, ওয়াযিরিস্তান ও সোয়াত উপত্যাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে পাকিস্তানের অন্যান্য এলাকায়ও। এখানে এক পক্ষ হলো পাকিস্তান আর্মি, অপর পক্ষটি তালেবান। তবে পাকিস্তান আর্মি এ যুদ্ধে একা নয়, তাদের সাথে যোগ দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ ইসলামের উত্থানবিরোধী সকল সাম্রাজ্যবাদী পক্ষ। এমনকি ভারতও সাহায্য দিতে প্রস্তুত। অথচ গাজা’য় ফিলিস্তিনীদের মাথার উপর যখন হাজার হাজার টন ইসরাইলী বোমা পড়ছিল, এবং সে বোমা হামলায় যখন হাজারে হাজার নিরীহ মানুষ নিহত ও আহত হচ্ছিল, একটি ডলার দিয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সাহায্য করেনি। এমনকি সে বর্বরতাকে নিন্দা করতে যে নুন্যতম মানবতাটুকু প্রয়োজন সেটুকুও মার্কিন প্রশাসন দেখাতে পারেনি। অথচ তারাই এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিচ্ছে পাকিস্তান সরকার ও তার সেনাবাহিনীকে। এখানে মার্কিনীদের লক্ষ্য মানবতা নয়, শান্তিও নয়, বরং পবিত্র শরিয়তের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন চায় এমন প্রতিটি ঈমানদারের নিধনে পাকিস্তান সরকারকে আপোষহীন করা। এভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের ঘোষিত যুদ্ধে পাকিস্তানকে একটি দাস রাষ্ট্র রূপে পাওয়া। তবে মার্কিনীদের এ নীতির লক্ষ্য নিছক পাকিস্তানই নয়, বরং প্রতিটি মুসলিম দেশ।


ন্যাটোভূক্ত ৪০টি দেশ যে কাজটি আফগানিস্তানে করছে সেকাজেই বাধ্য করছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে। অথচ কিছুদিন আগেও পাকিস্তান সরকার তালেবানদের সাথে “আর যুদ্ধ নয়” এমন একটি শান্তি-চুক্তি করেছিল। সে চুক্তি মোতাবেক তালেবানদের সোয়াত এলাকায় ইসলামি শরিয়ত প্রতিষ্ঠার অধিকার দেওয়া হয়েছিল। এ চুক্তির ফলে শান্তি নেমে এসেছিল সমগ্র সোয়াতে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ফিরে গিয়েছিল সেনানিবাসে। বন্ধ হয়েছিল নিরীহ মানুষের রক্তক্ষরণ। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সাধারণ জীবন-যাত্রা তখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছিল। কিন্তু সে চুক্তি শুরু থেকেই মার্কিন প্রশাসন পছন্দ করেনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টন এটিকে বলেছেন, তালেবানদের কাছে পাকিস্তান সরকার ও আর্মির আত্মসমর্পণ। তখন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বপ্রকার চাপ সৃষ্টি করে যাতে পাকিস্তান সরকার তালেবানদের সাথে কৃত চুক্তি বাতিল করে এবং সর্বশক্তি নিয়োগ করে তাদের নির্মূলে। আর এভাবে আবারও প্রকাশ পেল, ইসলামের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল কাফের শক্তিবর্গের মূল শত্রুতা কতটা গভীর সেটি । তারা নিজ দেশে মসজিদ গড়তে বাধা দেয় না, বাধা দেয় না নামায-রোযা পালন ও দাড়ি-টুপিতেও। কিন্তু বরদাশত করতে রাজি নয় কোন মুসলিম দেশেই আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠা। সোভিয়েত রাশিয়ার বিলুপ্তির পর পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদীরা ইসলামের এরূপ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আইনী ও রাষ্ট্রীয় রূপকে নিজেদের প্রতিদ্বন্ধি জীবনাদর্শ রূপে মনে করে। একারণেই মুসলিম দেশে মুসলিম নামধারি সেকুলারদের শাসন এতটা প্রিয় হলেও অসহ্য হলো তালেবানদের বিজয়। তালেবান নির্মূল তাই মার্কিনীদের প্রধানতম এজেন্ডা।


তবে তালেবানদের নির্মূলে কোমড় বেঁধেছে শুধু কাফের দেশগুলিই নয়, তাদের সাথে একাত্ম হয়েছে মুসলিম বিশ্বের মার্কিন-প্রেমী শাসকবর্গও। তারই প্রমাণ, মিশরের হোসনী মোবারক নিজের সীমান্ত ঘেঁষা গাজা’র গৃহহীন, খাদ্যহীন ও আহত ফিলিস্তিনীদের সাহায্যে খাদ্য, ঔষুধ ও এ্যামবুলেন্স পাঠাতে রাজি নয়, অথচ সাহায্য পাঠাচ্ছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে। তালেবানগণ যা চাচ্ছে বা যে জন্য প্রাণ দিচ্ছে সেটি তো প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরয। আর সেটি হলো আল্লাহর আইনের পরিপূর্ণ প্রয়োগ। একাজে উদ্যোগী না হলে নামে যতই মুসলমান রূপে জাহির করা হোক না কেন পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক তাদেরকে জালিম, কাফির ও ফাসিক রূপে চিত্রিত করেছেন (দ্রষ্টব্য সুরা মায়েদার ৪৪, ৪৫ এবং ৪৭ নম্বর আয়াত)। লক্ষণীয় হলো কোন খুনি, মদ্যপায়ী ও ব্যাভিচারীর ক্ষেত্রে এমন তিনটি বিশেষণের প্রয়োগ একত্রে হয়নি। আল্লাহর কাছে তারাই হলো বিদ্রোহী। একারেণ শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ করলেই মুসলমান থাকা যায় না, ইসলামি রাষ্ট্রও নির্মাণ করতে হয়। নবীজী (সাঃ) এ লক্ষ্যেই সাহাবাদের নিয়ে নিজের ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেছিলেন এবং প্রথম দিন থেকেই মদীনায় ইসলামি রাষ্ট্র নির্মাণের কাজে হাত দেন। ভারতের মুসলিম শাসন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ কাফেরদের হাতে পরাজিত হওয়ায়, বিলুপ্ত হয় মুসলিম ভূমিতে আল্লাহর আইনও। ভারতের মুসলিম শাসকগণ তাদের বহু ব্যর্থতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের আইনের উৎস্য রূপে শরিয়তকেই গ্রহণ করেছিলেন। সে আমলেই রচিত হয়েছিলেন প্রখ্যাত আইনের সংকলন ফতোয়ায়ে আলমগিরি। ব্রিটিশ কাফেরদের ইসলামের বিরুদ্ধে বড় শত্রুতা হলো, তারা শুধু মুসলিম ভূমিকেই দখলে নেয়নি, নিষিদ্ধ করেছে আল্লাহর আইনের প্রোয়াগকেও। এমন অবস্থাটি মেনে নেওয়া কোন ঈমানদার ও সচেতন মুসলমানের পক্ষে কি মেনে নেওয়া সম্ভব? আর মেনে নিলে সে কি মুসলমান থাকে? পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সূত্র হয় তো এমন এক অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে। অবিভক্ত ভারতে সেটি সম্ভব ছিল না। তাই ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠা পায় পাকিস্তান। মুসলমানের রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য কিছু নগর-বন্দর, কিছু রাস্তা-ঘাট, কিছু কলকারখানা, কিছু স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা নয়। সেটি হলে অবিভক্ত ভারতে কি সেগুলি অসম্ভব ছিল? কিন্তু তাতে আল্লাহর আইন পালনের সুযোগ জুটে না। আজও ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় বিশ কোটি, কিন্তু তার পরও কি সম্ভাবনা আছে? অথচ মানুষের জন্য আল্লাহতায়ালার বড় নেয়ামত হলো কোরআন ও কোরআনে নির্দেশিত আইন। অন্ধকার মরুভূমিতে বা গহীন জঙ্গলে এটি কম্পাস বা রোড-ম্যাপের মত।


কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হলেও যে লক্ষ্যে দেশটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেটিই আঁস্তাকুড়ে গিয়ে পড়েছে। রাজনীতি পরিণত হয়েছে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ারে। শরিয়ত প্রতিষ্ঠা অধিকাংশ দলের কোন এজেন্ডাই নয়। বিজয়ীর বেশে বসে আছে সেকুলারিজম। ফলে দেশটিতে মদ্যপান, সূদ-ঘুষ, পতিতাবৃত্তি, নাচ-গান ও সেকুলারিজমের চাষাবাদ অন্য কোন অমুসলিম দেশের চেয়ে কম নয়। ভারত বা যে কোন কাফের-অধ্যুষিত রাষ্ট্রের ন্যায় সেখানেও আজ অসম্ভব হয়ে পড়েছে আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা। সে কাজে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সেকুলার সেনাবাহিনী, সেকুলার আদালত, সেকুলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলির কোয়ালিশন। সেনাবাহিনী হলো দেশটিতে পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতি ও জীবন বোধের প্রকৃত পতাকাবাহী। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে সেনানীবাসগুলো হয়ে দাড়িয়েছে পাশ্চাত্য আদর্শ ও সংস্কৃতির দ্বীপ। ফলে জনগণ যখনই শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কাজে উদ্যোগী হয়, তখনই সেকুলার সেনাবাহিনী জনগণের রাজস্বের অর্থে কেনা অস্ত্র নিয়ে জনগণের উপরই ঝাঁপিয়ে পড়ে। অতীতে তুরস্কে ও মিশরে যেমন হয়েছে এবং সম্প্রতি আলজেরিয়াতে যেমন হলো, সেটিই এখন হচ্ছে পাকিস্তানের সোয়াতে। এভাবে আর্মি পরিণত হয়েছে মুসলিম দেশগুলির সবচেয়ে বৃহৎ সন্ত্রাসী সংগঠনে। তবে পার্থক্য হলো, রাস্তার সন্ত্রাসী দখলে নেয় নিরীহ ব্যক্তির জানমাল-ইজ্জত, আর এরা দখলে নেয় পুরো দেশ এবং ছিনতাই করে দেশের রাজনীতি, বিচার-ব্যবস্থা ও অর্থনীতি।


প্রকৃত মুসলমানের কাছে তার প্রতিটি যুদ্ধই জ্বিহাদ। ইসলামের অভিধানে নিছক যুদ্ধ বলে কিছু নেই। যুদ্ধ একটি সেকুলার শব্দ, এর সাথে ইসলামের প্রতি কোন অঙ্গিকারবদ্ধতা নেই। অথচ মুসলমানের প্রতিকর্মে ইসলামে অঙ্গিকারবদ্ধতা অপরিহার্য। একারণেই সেকুলার যুদ্ধে প্রাণ গেলে জাহান্নাম অবধারিত। একজন ব্যক্তির জন্য এটিই হলো তার জীবনের সবচেয়ে বড় অপচয়। অপর দিকে জিহাদে প্রাণ গেলে সে ব্যক্তিটি আল্লাহর দরবারে গণ্য হয় শহীদ রূপে। ঈমানদারের জীবনে এটিই সর্বোচ্চ কর্ম। এমন মৃত্যু তাঁকে অমরত্ব দেয়। একজন ব্যক্তির জীবনে এমন মৃত্যুই হলো সবচেয়ে বড় বিণিয়োগ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক এটিকে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা বলেছেন। তিনি বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসার কথা বলে দিব যা জাহান্নামের বেদনাদায়ক আযাব থেকে বাঁচাবে? সেটি হলো, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর উপর ঈমান আনো এবং আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সম্পদ ও প্রাণ দিয়ে জ্বিহাদ করো। এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা বুঝতে।” -সুরা সাফ। অতএব জ্বিহাদ সেটিই যা করা হয় একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য। আর তালেবানগণ তো সেটিই করছে। তারা প্রাণ দিচ্ছে একমাত্র আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী ও তাঁর আইনকে দেশ জুড়ে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে। অথচ পাকিস্তানের সেনা বাহিনী লড়ছে সে জ্বিহাদকে পরাজিত করতে। তারা উদ্যোগ নিয়েছে পাকিস্তানের ভূমিতে আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করতে। আর এজন্যই তারা বিপুল অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ পাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য কাফের দেশ থেকে।


তালেবানদের বড় কৃতিত্ব হলো, পাকিস্তানের মুসলমানদের সামনে তারা জ্বিহাদের এক বিস্তৃত ময়দান খুলে দিয়েছেন। জান্নাতের পথ একবার কেউ দেখালে অনেকেই তখন সে পথে চলা শুরু করে। সে পথটি আফগানিস্তানে প্রকাশ পেয়েছিল দেশটি যখন রাশিয়ান হানাদারদের কবলে পড়ে। তখন সমগ্র মুসলিম বিশ্ব থেকে হাজার হাজার মানুষে নিজ খরচে নিজের জীবন বিণিয়োগে হাজির হয়েছিল। তাদের সে রক্তের বিণিয়োগে পরাজিত হয়েছিল রাশিয়া। আর আজ পরাজিত হতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো মিত্রজোট। যুদ্ধ শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেদেরকে ফেলেছে মহা ক্ষতির মধ্যে। সেটি যেমন এ দুনিয়ায় তেমনি আখেরাতে। তারা তাদের আন্তর্জাতিক মিত্রদের খুশি করতে গিয়ে দেশের লক্ষ লক্ষ নিরীহ নারী-শিশু-বৃদ্ধকে নিজ ঘরবাড়ি থেকে বহিস্কার করে পথের ভিখারীতে পরিণত করেছে। অথচ কয়েক দিন আগেও তারা ঘরবাড়ি, ক্ষেত-খামার, ব্যবসা-বাণিজ্যের মালিক ছিল। এভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেদের গণ-বিরোধী চেতনা ও কদর্য চেহারাকে সাধারণ মানুষের সামনে সুস্পষ্ট করেছে। যে কোন বিচারেই এটি জুলুম। এমন জুলুমের বিরুদ্ধে প্রকৃত ঈমানদারেরা যে প্রচন্ড বিক্ষুব্ধ হবে সেটিই নিশ্চিত। আফগানিস্তানে এটিই হলো মার্কিনীদের অতি সুপরিচিত স্ট্রাটেজী। এ স্ট্রাটেজীর অংশ রূপে ক’দিন আগে প্রায় দেড়শত নিরপরাধ আফগানকে তাদের গৃহের অভ্যন্তরে হত্য করেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী একই ভাবে ইসলামাবাদের লাল মসজিদ-সংলগ্ন মাদ্রাসার বহু ছাত্রীকে হত্যা করেছিল। আর একই রূপ হত্যাকান্ড চালাচ্ছে সোয়াতে। এরূপ হত্যার মধ্য দিয়ে কোন দেশে হামলাকারির বিজয় আসে না। বরং এতে লড়াকু মোজাহিদদের সংখ্যাই বাড়বে এবং তীব্রতর হবে জ্বিহাদ। সেটিই হচ্ছে আফগানিস্তানে। হচ্ছে পাকিস্তানে।

এটি ঠিক, পাকিস্তানে সেকুলারিজমের চর্চা ব্যাপক ভাবে বেড়েছে। ফলে দেশটিতে সূদী ব্যাংক, পতিতা-পল্লী, মদের দোকান, নগ্ন নাচ-গানের আসর ও কুফরী কোর্ট-কাছারী প্রচুর খরিদ্দার পাচ্ছে। তবে দেশটিতে ইসলামের চর্চাও ব্যাপক ভাবে বেড়েছে। কোনটি জ্বিহাদ, কোনটি মার্কিনী এজেন্ডা, কোনটি কুফরি এবং মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনটি বিদ্রোহ -সেটি বোঝার মত লোকও দেশটিতে বিপুল। পাকিস্তানের মাটিতে শুধু ইকবালের মত মহান দার্শনিক কবিরই জন্ম হয়নি, বহু আলেমেরও জন্ম হয়েছে। ফলে জন্ম নিয়েছে গভীর ইসলামি চেতনাও। এমন চেতনার কারণেই দেশটির দরিদ্র মানুষ বিশ বছর ধরে প্রায় তিরিশ লাখ আফগান মোজাহিরদের আশ্রয় দিয়েছে। আজ দিচ্ছে সোয়াতের মজলুম মানুষদের। বিশ্বের অন্য কোন মুসলিম দেশে এমনটি বিরল।


মোজাহিদদের বিরুদ্ধে বিজয় যে অসম্ভব সেটি জেনেই পাকিস্তানের জারদারি সরকার আপোষে রাজী হয়েছিল। কিন্তু মার্কিনীদের লক্ষ্য পাকিস্তানের শান্তি নয়, নিরপত্তাও নয়। বরং তারা চায় ঘোলা পানিতে মাছ শিকার। একদিকে এ যু্দ্ধের মাধ্যমে যেমন দেশটিতে ইসলামের বিজয়কে রুখতে চায়, তেমনি চায় দেশটির সামরিক শক্তি-সামর্থকে দুর্বল করতে। একমাত্র পাকিস্তানই হলো সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আণবিক বোমার অধিকারি। কোন মুসলিম দেশ এমন শক্তি অর্জন করুক সেটি যেমন ভারত ও ইসরাইল চায়না, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও চায় না। মার্কিনীরা জানে তালেবানদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান আর্মির বিজয় অসম্ভব। সেটি ইরাক ও আফগানিস্তানে তাদের নিজেদের পরাজয় থেকেই তারা ভাল ভাবে জেনেছে। তারা চায়, সোয়াতে পাকিস্তান আর্মির পরাজয় ঘটুক। তখন সে সময় ন্যাটো বাহানা পাবে তালবান খুঁজতে নিজ সৈন্যের পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করানোর। তখন তারা সুযোগ পাবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আণবিক স্থাপনার উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠা করার। এবং সুযোগ পাবে দেশটির বিজ্ঞানীদের হত্যা করার। ইরাকে তারা সে কাজটি করেছে। এরূপ দখলদারিত্ব ও হত্যাকান্ড তখন চিত্রিত হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে। ইরাক দখলে নেওয়ার পর একই যুক্তিতে তারা শুধু সাদ্দামকেই হত্যা করেনি, খুঁজে খুঁজে সে দেশের শত শত বিজ্ঞানীকেও হত্যা করেছে। সভ্যতার দ্বন্ধ যখন শুরু হয় তখন শুধু দেশ নয় দেশের নাগরিকগণও শত্রুতে পরিণত হয়। তখন শত শত টন বোমা পরে শুধু সামরিক ছাউনিতে নয়, নিরীহ নাগরিকদের মাথার উপরও। তখন হামলার লক্ষ্যবিন্দু পরিণত হয় দেশের আলেম-উলামা, বিজ্ঞানী, ছাত্র-শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ সবাই। ইরাক ও আফগানিস্তানে তো বিগত কয়েক বছর ধরে তাই হচ্ছে। এখন পাকিস্তানেও সেটি শুরু হয়েছে। তবে পাকিস্তান যেমন শুরু নয়, তেমনি শেষও নয়। পাকিস্তানে যেটি শুরু হয়েছে আগামীকাল সেটি তুরস্ক, মিশর, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশেও শুরু হতে পারে।


কিন্তু মুসলমানদের শক্তির উৎস্য আণবিক বোমা নয়, সেটি হলো তাদের ঈমান। সোভিয়েত রাশিয়াকে পরাজিত করতে আফগান মোজাহিদদের আণবিক বোমার প্রয়োজন পড়েনি। ইসরাইলকে পরাজিত করতে হিজবুল্লাহর প্রয়োজন পড়েনি হাজার হাজার টন বোমার। মানুষ নিজেই যখন বোমায় পরিণত হয় তখন কি কোন বোমা তাকে রুখতে পারে? আর আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের জ্বিহাদ সে বোমার চাষই বাড়াচ্ছে। দিন দিন বরং সেটি তীব্রতর হচ্ছে। তাই আজ ভিতি বাড়ছে ও সে কাঁপুনি বাড়ছে মার্কিন প্রশাসনসহ তাবত আধিপত্যবাদী প্রশাসনে। আর যুদ্ধ অন্যসব জাতির জীবনে লোকসান বাড়ালেও মুসলমান উম্মাহর জীবনে এটিই হলো শক্তির মূল উৎস্য। কারণ এ পথেই জুটে মহান আল্লাহর সাহায্য। মুসলিম উম্মাহ তখনই সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী ছিল যখন তারা সবচেয়ে বেশী জ্বিহাদ লড়েছে। নবীজী (সাঃ) তার ১০ বছরের শাসনামলে ৫০টিরও বেশী যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এবং এর কোন কোনটি ছিল রোমান সাম্রাজ্যের ন্যায় তৎকালীন বিশ্ব শক্তির বিরুদ্ধে। অতীতের ন্যায় আজও মুসলমানদের পালিয়ে থাকার সুযোগ নেয়। কার কতটুকু ঈমান আছে আল্লাহতায়ালা সেটি ফাঁস করবেনই। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম যেমন পরীক্ষা থেকে রেহাই পাননি, আজকের মুসলমানগণও পাচ্ছে না। আর পাকিস্তানীদের জন্য এখন সে পরীক্ষাই প্রকান্ডভাবে শুরু হয়ে গেছে। তবে কথা হলো, পরীক্ষা ছাড়া কোন প্রমোশনও কি আছে? বিশেষ করে জান্নাতের মত উচ্চস্থানে পৌঁছার?

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites