Home •আন্তর্জাতিক পাকিস্তান পরিণত হচ্ছে আরেক আফগানিস্তানে
পাকিস্তান পরিণত হচ্ছে আরেক আফগানিস্তানে PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Tuesday, 14 October 2008 11:30
পাকিস্তান অতি দ্রুত একটি সংঘাতের দিকে এগিয়ে চলেছে। শুধু তাই নয়,রক্তক্ষয়ী সংঘাত ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গিয়েছে।এতদিন সে সংঘাত সীমাবদ্ধ ছিল ফেডারেল শাসিত উপজাতীয় এলাকায়, এখন সেটি রাজধানী ইসলামাবাদেও প্রবেশ কদিন আগে ইসলামাবাদের ৫তারা ম্যারিয়ট হোটেলটি যেভাবে বিধ্বস্ত হল, সেটি এ সংঘাত যে কতটা তীব্র আকার ধারণ করেছে তা বুঝাবার জন্য যথেষ্ট। প্রচন্ড সংঘাত চলছে সোয়াত ও বাজোওরের উপজাতীয় এলাকায়। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সাথে হামলায় যোগ দিয়েছে মার্কিন বাহিনী। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী দাবী করেছে,গত এক মাসের যুদ্ধে এক হাজারেরও বেশী পাকিস্তানী তালেবানকে তারা হত্যা করেছে। অপরদিকে মার্কিন বিমান খুঁজে খুঁজে পাকিস্তানী তালেবান নেতাদের গৃহে মিজাইল মারছে। এতে তালেবান নেতাদের হত্যা করতে ব্যর্থ হলেও হত্যা করছে বেসামরিক নাগরিক,যার মধ্যে আছে নারী-শিশু ও বৃদ্ধ।গত ০৪/১০/০৮ তারিখের হামলায় হত্যা করেছে ১৯জন বেসামরিক নাগরিককে। এতে সমগ্র পাকিস্তান জুড়ে তীব্র আকার ধারণ করছে মার্কিন বিরোধী ক্ষোভ। এটিকে তারা বলছে পাকিস্তানের স্বার্বভৌমত্বের উপর হামলা। বিক্ষুব্ধ জনমতকে শান্ত করতে দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী বিবৃতি দিচ্ছেন তারা পাকিস্তানের উপর কোন বিদেশী হামলা বরদাশত করবে না। কিন্তু সেটি শুধু বুলিই থেকে যাচ্ছে। মার্কিন হামলার প্রতিরোধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কিছু না করে বরং তীব্রতর করেছে নিজেদের হামলাকে। বিবাদের কারণ, পাকিস্তানী তালেবানরা চায়, তাদের এলাকায় শরিয়াহ আইনের প্রতিষ্ঠা। কোন কোন এলাকায় পাকিস্তানী আইন-আদালতের বদলে তারা প্রতিষ্ঠা করেছে শরিয়াহ কোর্ট। শরিয়াহর অনুসরণকে তারা নামায-রোযার ন্যায় ফরয মনে করে। তাদের পক্ষে দলীল, কোরআনের আয়াতঃ..মান লাম ইয়াহকুম বিমা আন যালাল্লাহু ফা উলায়িকা হুমুল কাফিরুন অর্থঃ যারা আল্লাহর দেওয়া আইন (শরিয়াহ) অনুযায়ী বিচার করে না তারা কাফের।(সুরা মায়েদা) কিন্তু পাকিস্তানের স্যেকুলার আর্মি, রাজনৈতিক দল, স্যেকুলার জুডিশিয়ারি ও মিডিয়া সেটি হতে দিতে রাজী নয়। ফলে শুরু হয়েছে লড়াই। আফগানিস্তানেও ন্যাটোর মূল ইস্যু মূলতঃ এটিই। ইসলামি শরিয়াহকে তারা নিজেদের স্যেকুলার মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক মনে করে। তাই তারা বলছে, এ লড়াই দুটি আদর্শের। একদিকে পাশ্চাত্যের স্যেকুলার আদর্শ, আরেকদিকে ইসলাম।


চেতনা বা দর্শনের ভৌগলিক সীমানা থাকে না, ফলে এ লড়াইয়ে দুই পক্ষেই যোগ দেয় নানা দেশের নানা ভাষার সৈনিক। সেখানে ন্যাটো-ভূক্ত ৪০টি দেশের ৭০হাজার সৈন্য লড়াই করছে। মার্কিনীদের সাথে যোগ দিয়েছে স্যেকুলার চেতনাধারী আফগানরা। যোগ দিয়েছে ভারতীয়রা। একাত্ম হয়েছে স্যেকুলার চেতনার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক দল। পাকিস্তানে সে স্যেকুলার রাজনৈতিক দলগুলো হলঃ পাকিস্তান পিপলস পার্টি, খান আব্দুল ওয়ালী খানের পুত্রের আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টি, ভারত থেকে আশ্রয়-নেওয়া মোহাজিরদের দল মোহাজির কাওমী মাহাজ। পিপলস পার্টির নেত্রী বেনজির ভূট্টো তার মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে তালেবানদের দমনে তিনি মার্কিন বাহিনীর হামলাকেও সমর্থণ করবেন। আর এখন মনে হচ্ছে,তার স্বামী আসিফ আলী জারদারী দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া মাত্রই মার্কিনীদের সে অধিকার দিয়েই দিয়েছেন। ফলে মোশাররফের আমলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে যে বিমান হামলা হামলা হয়নি, এখন সেটি বার বার হচ্ছে। সম্ভবতঃ এ প্রতিশ্রুতি দিয়েই বেনজির ভূ্ট্টো মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সার্বিক সমর্থণ আদায় করেছিলেন। জর্জ বুশই মোশাররফকে বাধ্য করেছিলেন, বেনজির ভূট্টোকে দেশে ফিরতে দিতে এবং জারদারীর উপর থেকে দূর্নীতির মামলা প্রত্যাহার করতে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও দেশের স্যেকুলার রাজনৈতিক দলগুলো এখন আর কাশ্মিরের মজলুম মুসলমান নিয়ে ভাবে না। ভাবে না, এমনকি নিজ দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়া নিয়েও। তাদের মূল প্রায়োরিটি হল, ইসলামী মৌলবাদ ও তার পতাকাধারী তালেবান নির্মূল। আর প্রতিদানে পাচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মার্কিনী সাহায্য।এতে নিরীহ মানুষ মরলে কি হবে,জৌলুস বাড়ছে সেনা-অফিসারদের। পাকিস্তান সামরিক বাহিনী এখন ভাড়ায় খাটছে বিদেশী স্বার্থে। ফলে মার্কিন বিমান যখন পাক-সীমান্ত ভেদ করে জনগনের মাথার উপর বোমা বা মিজাইল ফেলে তখন পাকিস্তানী সৈন্যরা সে দৃশ্য নীরবে দেখে। যেমনটি দেখে ইরাকী ও আফগান সেনাবাহিনী। এদুটি দেশেও সেনাবাহিনী বলে কিছু আছে।কিন্তু তাদের দায়িত্ব নিজদেশের স্বার্থ বা জনগণকে পাহারা দেওয়া নয়। বরং মার্কিনী ঘাঁটি ও তাদের স্বার্থের নিরাপত্তা দেওয়া। পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনীর এরূপ ভূমিকার জন্য দেশটির ইসলামি চেতনাসম্পন্ন সাধারণ মানুষ এখন প্রচন্ডভাবে বিক্ষুব্ধ। ক্ষোভ শুধু মার্কিনীদের উপরই বাড়ছে না, বাড়ছে পিপলস পার্টির সরকার ও সামরিক বাহিনীর উপরও। ইতিমধ্যে হামলা হয়েছে দেশের প্রধানমন্ত্রীর গাড়ীর উপর। এ যাত্রায় তিনি বেঁচে গেছেন। হামলা হচ্ছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সামরিক স্থাপনা, সামরিক যান ও সৈনিকদের উপর। সেনাবহিনীর প্রতিটি সেপাহি ও প্রতিটি অফিসার এখন তাদের টার্গেট। কিছুদিন আগে হামলা হয়েছিল ওয়াহ অস্ত্র-কারখানার উপর,তাতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। গত ঈদুল ফিতরের সময় হামলা হয়েছিল ওয়ালী খানের ছেলের গৃহে। তিনি অল্পে প্রাণে বেঁচে গেছেন। হামলার কারণ, তার দলটি স্যেকুলার এবং সমর্থণ জানাচ্ছে মার্কিনী হামলায়। যতই বাড়ছে পাক ও মার্কিন বাহিনীর হামলা ততই বাড়ছে তালেবানদের নতুন রিক্রুট। সম্প্রতি পশ্চিমা সূত্র থেকে খবর দেওয়া হয়েছে, বিশ্বের নানা দেশ থেকে মোজাহিদরা এখন আফগানিস্তানে এসে হাজির হচ্ছে। পাঠানদের পাশাপাশি এখন সে যুদ্ধে যোগ দিচ্ছে পাঞ্জাবী, চেচেন, আরব এবং ইউরোপে বসবাসকারি মুসলমানেরা। তাদের লড়াইয়ের জজবা ও কৌশল উভয়ই উন্নত। এতে হতাশা বেড়েছে পশ্চিমা মহলে।


৫/১০/০৮ তারিখে লন্ডনের সানডে টাইমসের সাথে এক সাক্ষাতকারে হেলমন্দ প্রদেশে ব্রিটিশ বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার কারটন-স্মিথ বলেছেন, তালেবান পরাজিত করা অস্ভব। এ যুদ্ধে বিলুপ্ত হয়েছে পাক-আফগান সীমান্ত। পাক ও আফগান রণাঙ্গণ এখন একাকার। মোজাহিদদের কাছে এখন আর এ দুটি কোন ভিন্ন দেশ নয়। তেমনি অবস্থা জনগণেরও। হামলা থেকে প্রাণ বাঁচাতে হাজার হাজার মানুষ এখন পাকিস্তান ছেড়ে আফগানিস্তানে আশ্রয় নিচেছ। খবরে প্রকাশ,আফগানিস্তানে পাকিস্তানী উদ্বাস্তুর সংখ্যা এখন ২০ হাজারেরও বেশী। আরেক খবর, আফগানিস্তান থেকে দলে দলে তালেবান যোদ্ধারা এখন পাকিস্তানে এসে পাকি-বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। অর্থাৎ স্রোত উল্টা বইতে শুরু করেছে। সে সাথে বাড়ছে গণতন্ত্রের প্রতি পাকিস্তানীদের বীতশ্রদ্ধা, বিশেষ করে সৎ নাগরিকদের। কারণ, গণতন্ত্র দারুন ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে সৎ ও যোগ্য মানুষের নির্বাচনে। নির্বাচিত হচ্ছে চিহ্নিত ধোকাবাজ ও দূর্নীতিবাজেরা। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন আসিফ জারদারী। তিনি পরিচিত মিষ্টার টেন পার্সেন্ট রূপে। বলা হয়,তার স্ত্রী বেনজির ভূ্ট্টো যখন প্রধানমন্ত্রী, তিনি সরকারি প্রকল্প থেকে ১০% কমিশন নিতেন। কোন চাকুরী বা ব্যবসা-বাণিজ্য না করে নিছক কমিশনের অর্থে তিনি বহু মিলিয়ন ডলার জমা করেছিলেন সু্ইজারল্যান্ডের ব্যাংকে। পাকিস্তান সরকারের দাবীর প্রেক্ষিতে সে অর্থ তোলার উপর এতদিন নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু মার্কিনী চাপে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোশাররফ তার বিরুদ্ধে দূর্নীতির মামলা যেমন প্রত্যাহার করেছেন,তেমনি প্রত্যাহার করেছেন ব্যাংক থেকে অর্থ তোলার উপর নিষেধাজ্ঞা। তার বিরুদ্ধে ছিল খুনের অভিযোগ। বেনজির ভূট্টোর ভাই মারা যায় সন্দেহজনক ভাবে। অনেকের বিশ্বাস,এ হত্যাকান্ডের সাথে আসিফ জারদারী জড়িত ছিল। হত্যাকান্ডটি ঘটেছিল বেনজির ভূট্টো প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে। কিন্তু কোন কার্যকর তদন্তই হয়নি,ফলে আজও দূর হয়নি তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সন্দেহ। উল্লেখ্য যে, রাজনৈতিক কারণে হত্যাকান্ড ঘটানো ভূট্টো পরিবারেরই একটি ঐতিহ্য। বেনজির ভূট্টোর পিতা জনাব জুলফিকার আলী ভূট্টো প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে সত্তরের দশকে দুইজন ব্যক্তির সন্দেহজন মৃত্যূ ঘটে। এ দুইজনের একজন ছিলেন ৭০-এর নির্বাচনে নির্বাচিত জামায়াত ইসলামী সদস্য ডাঃ নজির আহম্মদ। আরেক জন ছিলেন ভূট্টোর নিজ দলের সাবেক সদস্য জনাব রাজা কাসুরীর পিতা জনাব আহমদ আলী কাসুরী। ডাঃ নাজির এবং জনাব রাজা কাসুরী ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে ভূট্টোর কঠোর সমালোচক। তাঁরা সংসদে প্রায়ই তাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতেন। তার শাসানামলে এ দুটি হত্যাকান্ডের তদন্ত হয়নি। জিয়াউল হকের আমলে জনাব আহমদ আলী কাসুরী হত্যার বিচার হয়। রাজা কাসুরীকে মারতে গিয়ে আততায়ী হত্যা করে ফেলে তার পিতা আহমদ আলী কাসুরীকে। রাজসাক্ষী হন দেশের গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান। কার হুকুমে, কিভাবে এবং কার দ্বারা সে হত্যাকান্ড হয়েছিল সে বিবরণ তিনি আদালতে তুলে ধরেন। আদালতের রায়ে ভূট্টোর ফাঁসী হয়।


পাকিস্তানের দেশপ্রেমিক নাগরিকদের কাছে সমস্যা দেখা দিয়েছে গণতন্ত্র নিয়ে। দেশ জিম্মি হয়েছে দুর্বৃত্ত নেতাদের কাছে। গণতন্ত্রের নামে জারদারীর ন্যায় চিহ্নিত দুর্বৃত্ত ও মার্কিন হানাদারদের সহযোগীকেও মেনে নিতে বলা হচ্ছে। তার মত অপরাধীকে নির্বাচিত করেছে অজ্ঞ-মুর্খ ভোটাররা নয়, নির্বাচিত করেছে দেশের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা। যে পদ্ধতিতে অপরাধীও নির্বাচিত হয় সেটি কি বিবেকবান মানুষের সহানুভূতি পায়? পায় কি ন্যায়পরায়ন ব্যক্তির গ্রহনযোগ্যতা? কারণ দুর্বৃত্তের পক্ষ নেওয়া তো বিবেকের সুস্থ্যতা নয়। এটি তো অপরাধ। তাছাড়া পিপলস পার্টির মধ্যে কোথায় সে গণতন্ত্র? নিজ দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যে দলটি ব্যর্থ, সে দল কি করে দেশবাসীকে গণতন্ত্র উপহার দিবে? গণতন্ত্রের অর্থ কি এই,মা মারা গেল কলেজ-পড়ুয়া ছেলে দলের প্রধান হবে,যেমনটি বেনজির ভুট্টোর ছেলে বেলাওয়াল হয়েছে? বা তার স্বামী নেতা হব? এমনটি হলে রাজতন্ত্র থেকে তার পার্থক্য কোথায়? যারা গণতন্ত্র বলতে বুঝে যোগ্যতমের নির্বাচন-পদ্ধতি তারা কেন এমন গণতন্ত্র মেনে নিবে? এটি নিছক পরিবারতন্ত্র, বেঁচে আছে রাজতন্ত্রের স্পিরিটি নিয়ে। পাকিস্তানে বার বার গণতন্ত্র হত্যা হচ্ছে এদের কারণেই। এ সমস্যা শুধু পিপলস পার্টিতে তা নয়, একই রূপ সমস্যা ওয়ালী খানের পারিবারীক দল আওয়ামী ন্যাশন্যাল পার্টি, মুফতি মাহমুদের দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ আরো কিছু প্রধান দলে। আজ থেকে ৬০বছর আগে দেশটিতে যতটা গণতন্ত্র ছিল,এখন সেটুকুও নেই। সে আমলে প্রধান দলগুলিতে অন্ততঃ পরিবারতন্ত্র ছিল না।


পাকিস্তানের স্যেকুলার দলগুলি পরিণত হয়েছে দুর্বৃত্তদের ট্রেড ইউনিয়নে। সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া এরা রাজনীতি করে ক্ষমতা কুক্ষিকরণ ও সরকারি তহবিল তছরুপের লক্ষ্যে। এরা যেমন জমা হয়েছে পিপলস পার্টির ব্যানারে, তেমনি আছে মুসলিম লীগেও। ইসলামী মৌলবাদ দমনে মাকিনীদের সাথে পূর্ণ সহয়তা করতে উভয়েই রাজী। কারণ, এতে ক্ষমতায় যাওয়াটি সহজতর হয়।দেশটিতে দূর্নীতির অনেকে পথ। তবে দূনীর্তি করতে যারা রাজনীতিকে বেছে নেয় তাদের বাড়তি সুবিধা হল,এ পথে সহজে বিচার এড়ানো যায়। অন্য জগতের অপরাধীদের সে সুবিধাটি নেই। তাছাড়া কাদের বিচার হবে বা হবে না -সেটি নির্ধারণ করে রাজনীতিবিদেরা। ফলে তারা নিজেদেরকে রাখে ধরা-ছোঁওয়ার বাইরে। ফলে দেশের ছিঁচকে দুর্বৃত্তরা যেরূপ বিচারের মুখে পড়ে, সে ভয় রাজনৈতিক নেতাদের নেই। আরো সুবিধা, বিজয়ী হলে প্রতিপক্ষকে তারা আসামীর কাঠগড়ায় খাড়া করতে পারে, জেলেও ভরতে পারে। সে জন্যই অপরাধ জগতের নেতাদের রাজনীতিতে এত আগ্রহ। অর্থ, সন্ত্রাস, মিথ্যা ও ধোকাবাজীর মাধ্যমে নিরীহ ও ন্যায়পরায়ন মানুষকে এরা রাজনীতির ময়দান থেকে প্রায় বেরই করে দিয়েছে। দুনিয়াতে এরা জান্নাতের সুখ নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়। যেমন শেখ মুজিব ১৯৭০-এর নির্বাচনে দিয়েছিল। পয়গম্বর নেমে আসলেও তাঁর পক্ষে এ মিথ্যাচারীদেরকে কি ভোটযুদ্ধে পরাজিত করা সম্ভব? মৎস্য শিকারের ন্যায় এরা ভোট শিকার করে নানারূপ আকর্ষণীয় টোপ দিয়ে। ক্ষুধার্ত মাছের ন্যায় জনগণ সে টোপে সহজে ধরা দেয়। এভাবে গণতন্ত্র পরিণত হয়েছে দুনীর্তিবাজদের যথেচ্ছারে। গণতন্ত্রচর্চায় এ ব্যর্থতার কারণে প্রচন্ড হতাশা বেড়েছে তাদের, যারা দেশকে দূর্নীতিমূক্ত করতে চায়। এরাই যোগ দিচ্ছে পাকিস্তানের তালেবান আন্দোলনে। ফলে নিছক ফ্যানাটিক বা ধর্মান্ধ বলে তাদেরকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এমন গালিগালাজ করে তাদেরকে খাটো করা যাচ্ছে না। এ বিষয়টি পাশ্চাত্যের কলামিস্টরাও এখন স্বীকার করেন। আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতায় এসেছিল তেমনি এক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে। রুশ বাহিনীর প্রস্থানের পর, তৎকালীন আফগান নেতারা লিপ্ত হয়েছিল লুটপাট ও নানারূপ অসামাজিক কাজকর্মে। মানুষ খুন হচ্ছিল, সম্পদ লুন্ঠিত হচ্ছিল,মহিলারা ধর্ষিতা হচ্ছিল অথচ সরকার লিপ্ত ছিল ক্ষমতার লড়াইয়ে। মাদ্রাসার ছাত্ররা (তালেবানরা) তখন মাদ্রাসা ছেড়ে ক্ষমতা হাতে নেয়। তাদের আমলটিই ছিল আফগানিস্তোনের সবচেয়ে শান্তির দিন। একথা এখন পাশ্চাত্যের বহু সাংবাদিকও স্বীকার করেন। তালেবান সরকার সক্ষম হয়েছিল এমনকি আফিম চাষ বন্ধ করতে।


পাকিস্তান এখন সুস্পষ্ট দ্বিজাতিতে বিভক্ত। একটি হল ইসলামে অঙ্গিকারহীন স্যেকুলার পক্ষ, আরেকটি হল ইসলামী পক্ষ। স্যেকুলার পক্ষটির হাতে দেশের রাজনীতি, মিডিয়া, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী ও বিচার বিভাগ। পাকিস্তানের সবচেয়ে শক্তিশালী স্যেকুলার প্রতিষ্ঠানটি হল সেনাবাহিনী। এ সেনাবাহিনীটি হল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সেনাবাহিনীরই উরুত্তরসুরী। গড়ে তোলা হয়েছিল সম্পূর্ণ স্যেকুলার চেতনায়। ব্রিটিশ, হিন্দু,শিখ,গোর্খার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সে আমলের স্যেকুলারাইজড মুসলমান সেপাই ও অফিসাররা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যর খেদমত করত, প্রাণও দিত। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সদস্যরূপে এরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মুসলমান হত্যায় ও মুসলিম ভূমি দখলে ইরাকে গিয়েছিল।এখন একই কাজ করছে পাকিস্তানের নিজভূমিতে। ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার যেমন পূর্বেও ছিল না, এখনও নাই। প্যান-ইসলামের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের সাথে এ আর্মির আদর্শিক দ্বন্দ বা মিস-ম্যাচ শুরু হয় শুরু থেকেই। অধিকৃত মুসলিম দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাটেজিক লক্ষ্য ছিল,এরূপ স্যেকুলারাইজড মুসলিম শ্রেণী গড়ে তোলা। এ বিষয়ে সে আমলে মিশরে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি লর্ড ক্রোমার বলেছিলেন,একটি স্যেকুলারাইজড (ডি-ইসলামাইজড) শ্রেনী গড়ে না উঠা পর্যন্ত মুসলিম দেশগুলোর স্বাধীনতা দেওয়ার প্রশ্নই উঠে না।এরাই হল মুসলিম দেশে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি,মূল্যবোধ ও স্বার্থের মূল রক্ষাকর্তা। তাই পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয়েছে দেশটির স্যেকুলারাইজড আর্মীর দ্বারা। এরা ক্ষতি করছে, মিশর, আলজেরিয়া, তুরস্ক, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়াসহ প্রায় প্রতি মুসলিম দেশে। পাকিস্তান ইসলামের নামে অর্জিত হলে কি হবে, দেশটির আর্মিতে সরকারি খরচে প্রকাশ্যে মদ্যপান হত। নানারূপ অশ্লিলতাও হত। জেনারেল জিয়াউল হকই প্রথম সেনা প্রধান যিনি সেনাবাহিনীর মেসে মদ্যপানকে নিষিদ্ধ করেছিলেন, সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য কিছু ইসলামী তালীমের ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে সে সময় গড়ে উঠেছিল কিছু শশ্রুমন্ডিত জেনারেল ও উচ্চপদস্থ অফিসার।পাকিস্তান আর্মিতে এমনটি ছিল অতি বিরল। জেনারেল মোশাররফ আবার স্যেকুলার ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যান। তিনি ইসলামের প্রতি অঙ্গিকারসম্পন্ন জেনারেল ও অফিসারদের ঝেঁটিয়ে বিদায় দেন। আর তাতে প্রচন্ড খুশি হয়েছিল মার্কিনীরা। তিনি নিজেও ছিলেন একজন মদ্যপায়ী। লন্ডনের ডেইলী গার্ডিয়ানের সাথে এক সাক্ষাতকারে সেটি তিনি স্বীকারও করেছেন। পত্রিকাটি কুকুর কোলে-নেওয়া মোশাররফের ছবিও সরকারি খরচে ছেপেছিল।তার ও তার অনুগত জেনারেলদের প্রচন্ড স্যেকুলার চেতনার ফলেই,ইসলামাবাদের লালমসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসাটি কামান দেগে ধ্বংস এবং ছাত্রীদের হত্যায় সেনাবাহিনী একটুও পিছুপা হয়নি। বিবেকে দংশনও হয়নি। বরং সেটিকে তারা উৎসযোগ্যই মনে করেছে। এখন সে স্যেকুলার জেনারেলরাই মার্কিনীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইসলামি মৌলশিক্ষা নির্মূলে লিপ্ত। দমন করতে চায় জ্বিহাদ। রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে নিপীড়নের যন্ত্রে। ফলে জনগণ চিনতে ব্যর্থ হচ্ছে, কে মার্কিনী অমুসলিম সৈনিক আর কে পাকিস্তানী মুসলিম সৈনিক, কোনটি পাকিস্তানী বুলেট আর কোনটি মার্কিনীদের বুলেট। মৌলবাদী মুসলমান ও তালেবান হত্যায় উভয়ই এখন একই রূপ আপোষহীন ও নির্দয়। রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে ইসলামের মৌল-বিশ্বাস নির্মূলের যন্ত্রে। তবে পাকিস্তানে লড়াকু মুসলমানদের সংখ্যও প্রচুর। কারণ সেখানে জ্বিহাদী চেতনা তুলে ধরার জন্য কাজ করছে শত শত মাদ্রাসা, আলেম ও লেখক। মিথ্যাপ্রচারণা ও ধোকাবাজীর ভোটে পরাজিত হলে কি হবে, তারা হারতে রাজী নয় লড়াইয়ের ময়দানে। লড়াইকে তীব্রতর করেছে শুধু মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধেই নয়, তাদের পাকিস্তানী মিত্রদের বিরুদ্ধেও। বার বার মার্কিনী মিজাইল ও বোমা হামলায় বহু নিরীহ নারী ও শিশু হত্যা তাদের লড়াইকে আরো জনপ্রিয়তা দিচ্ছে। এতে এ লড়াই পাচ্ছে নির্ভেজাল জ্বিহাদের মর্যাদা। আর কোন মুসলিম ভূমিতে নিরেট ও নির্ভেজাল জ্বিহাদ শুরু হলে সেটির পরাজয় কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, মুসলমান তখন এমন জ্বিহাদকে জান্নাত লাভের মোক্ষম মাধ্যম ভাবে। দেশীয় মোজাহিদদের সাথে সেখানে তখন বিশ্বের নানা দেশ থেকে মোজাহিদ এসে জমা হয়। অন্যরা এমন বিশ্বাসকে যতই ধর্মান্ধতা বলুক না কেন, এটিই মোজাহিদদের ঈমানী বিশ্বাস। তখন নানা দেশ থেকে আসে জনবল ও অর্থবল। কারণ যারা জ্বিহাদ করে, সেটি করে নিছক আল্লাহকে খুশি করা জন্য। তাই জ্বিহাদের কোন ভাষাগত বা ভূগোলিক সীমানা থাকে না, যেমন সীমানা নেই আল্লাহর সার্বভৌমত্বের। রুশদখল কালে আফগানিস্তানে সেটাই ঘটেছিল। মার্কিনী দখলদারি প্রতিষ্ঠার পর আবারও সেখানে তাই হচ্ছে।তাই দূরহ হয়ে পড়েছে পাক-আর্মির বিজয়। অপর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর পক্ষ থেকে দাবী উঠছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হামলাকে আরো কঠোর ও তীব্রতর করতে। তাদের চাপে ব্যাপকতর ও তীব্রতর হচ্ছে এ সংঘাত। আর এতে পাকিস্তান পরিণত হচ্ছে আরেক আফগানিস্তানে। লন্ডন,০৫/১০/০৮

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Monday, 06 April 2009 09:04
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2018 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.