Home •আন্তর্জাতিক মিশরে সামরিক অভ্যুত্থান ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি
মিশরে সামরিক অভ্যুত্থান ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Tuesday, 09 July 2013 00:27

স্বৈরশাসকদের নেশাগ্রস্ততা

মদ-গাঁজা-হিরোইনে আসক্ত মাতালদের ন্যায় স্বৈরাচারি শাসকদেরও প্রচন্ড নেশাগ্রস্ততা থাকে। নেশা পুরণে তারা মাতালদের ন্যায় চরমপন্থাও অনুসরণ করে। লক্ষ্য,যে কোন ভাবে দেশের ক্ষমতায় থাকা। ক্ষমতায় থাকার জন্য ক্যু,হত্যা,গুম,জেল,নির্যাতন ও স্বাধীন মতামত প্রকাশের নাগরিক অধিকার হননের ন্যায় সবকিছুকেই তারা জায়েজ করে নেয়। জনগণকে ধোকা দিতে তারা নিজেদের নগ্ন ক্ষমতালিপ্সাকে আড়াল করে কখনো বা গণতন্ত্র,কখনো অর্থনৈতীক উন্নয়ন এবং কখনো বা আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দোহাই দিয়ে। ফ্যাসিস্ট হিটলার, বাকশালী মুজিব এবং স্বৈরাচারি ইরশাদও তাই গণতন্ত্রি,প্রগতিবাদি ও দেশপ্রেমিক সেজেছিল। তেমনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দোহাই দিয়ে মাত্র এক বছর আগে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে হটিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল করে নিল মিশরের সেনাবাহিনী। জেনারেলগণ এখন বিপ্লবী সেজেছে। নিজেদের এ সামরিক অভ্যুত্থানকে বলেছে দ্বিতীয় বিপ্লব। তাদের দাবী তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নেমেছে। কিন্তু গণতন্ত্রের মূল কথা তো গণরায়ের প্রতি শ্রদ্ধা। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে বন্দুকের জোরে অপসারণ ও তাঁকে কারারুদ্ধ করার মধ্য দিয়ে যা ঘটে তা তো গণতন্ত্রের কবর, প্রতিষ্ঠা নয়।

 

মিশরে সামরিক শাসনের ইতিহাস দীর্ঘ। এবং সেটির শুরু কর্নেল জামাল আব্দুন নাসেরের আমলে,এবং সেটি ১৯৫২ সালে। মৃত্যর পূর্বদিন পর্যন্ত তিনি এক ফ্যাসিস্ট শাসক হিসাবে অতি কঠোর হস্তে মিশর শাসন করেন। রাজাদের মৃত্যু না হলে তারা যেমন গদি ছাড়ে না, তেমনি আমৃত্যু গদি ছাড়েননি প্রেসিডেন্ট নাসেরও। যে কোন স্বৈরাচারি শাসকদের মূল প্রায়োরিটি নিজের গদির প্রতিরক্ষা,দেশের প্রতিরক্ষা নয়। নাসেরই তাই মিশরের প্রতিরক্ষা নিয়ে ভাবেননি। ফলে নিজ দেশকে নিজের হাতে দীর্ঘকাল অধিকৃত রাখতে সমর্থ হলেও পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছেন ইসরাইলী হামলার মুখে মিশরকে সামান্যতম প্রতিরক্ষা দিনে। তার আমলেই প্রায় বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশের চেয়ে বেশী ভূমি (২০ হাজার বর্গ মাইল) নিয়ে সাইনাই উপত্যাকা অধিকৃত হয়ে যায় ক্ষুদ্র ইসরাইলের হাতে। স্বাধীন মতামত দমনে তিনি ছিলেন হিটলার বা স্টালীনের ন্যায় নিষ্ঠুর। তার আমলে গোটা চারেক সরকারি পত্রিকা ছাড়া কোন নিরেপক্ষ বা স্বাধীন পত্রিকা ছিল না। কোন বিরোধী রাজনৈতীক দলও তিনি গড়তে দেননি।

 

মিশরে সবচেয়ে সেক্যুলার ও সবচেয়ে ইসলাম বিরোধী সংগঠন হলো সামরিক বাহিনী। নাসেরের আমলে প্রধান বিরোধী দল ছিল ইখওয়ানূল মুসলিমীন। তখন সে দলটিকে কাজ করতে দেয়া দূরে থাক দলটির নেতাদের ফাঁসী দেয়া হয়। এবং দলটির হাজার হাজার কর্মীদের কারাবন্দী করে বছরের পর বছর নির্মম নির্যাতন করা হয়। বিশাল বিশাল কারাগর গড়া হয় নির্যাতনের ফ্যাক্টরি রূপে। নাসেরের হাতেই ফাঁসীতে ঝুলানো হয় শহীদ কুতুবের ন্যায় বিশ্ববিখ্যাত মোফাছ্ছেরে কোরআনকে। আর মিশরে যা কিছু ঘটে তা শুধু মিশরে সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আরব বিশ্বের অন্যান্য দেশে। তাই নাসেরের পথ বেয়ে সামরিক স্বৈরাচারিরা একের পর কুক্ষিগত করে নেয় সিরিয়া, ইরাক, আলজিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন, সূদানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ দেশ। এদেশগুলিতে অতি দুর্বৃত্ত এ স্বৈরাচারি শাসকেরা কোন রাজবংশ থেকে আসেনি, কোন রাজনৈতীক দল থেকেও আসেনি। বরং জন্ম নিয়েছে সামরিক বাহিনী থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের এ সবদেশে বড় বড় সমরিক বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে,বিপুল অস্ত্রও কেনা হয়েছে। তবে সেগুলি দেশের প্রতিরক্ষা বৃদ্ধির জন্য নয়,বরং নিজ দেশ দখলে। ফলে জনগণের রাজস্বের অর্থে সামরিক বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধি করা হলেও তাতে জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা যেমন বাড়েনি,দেশের স্বাধীনতাও বাঁচেনি। ইসরাইলের ন্যায় ৫০ লাখ মানুষের এক ক্ষুদ্র দেশের হামলার মুখে আরব দেশগুলোর সম্মিলিত সেনাবাহিনী এক সপ্তাহও দাঁড়াতে পারিনি। তারা বরং বন্দুকের নলকে তাক করেছে জনগণের দিকে। সিরিয়ার সামরিক বাহনী আজ সে কাজটি করছে লক্ষাধিক মানুষ হত্যা,নগরে পর নগর ধ্বংসের মধ্য দিয়ে। এখন সে অভিন্ন কাজেই নিয়োজিত হলো মিশরের সেনা বাহিনীও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুসলমানের রক্ত ঝরোনোর যে ধারা আফগানিস্তান ও ইরাকে শুরু করেছিল সেটিই এখন মিশরে শুরু হলো। ৮ই জুলাইয়ের একটি মাত্র দিনেই কায়রোর রাজপথে সেনাবাহিনী ৫১ জন নিরস্ত্র মুসল্লীদের হত্যা করেছে যারা ফরজ নামায সমাপ্ত করে রাস্তায় শান্তিপূর্ণ ধর্ণা দিয়েছিল। এভাবে শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যা অনুষ্ঠিত হলো কায়রোতে।প্রতি বছর সেনা বাহিনীকে দেয়া মার্কিনীদের ব্পিুল অর্থ এভাবেই তার কাঙ্খিত ফল দিতে শুরু করেছে। ষড়যন্ত্রের রাজনীতি আর কাকে বলে?

 

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছে নিজেদের কায়েমী স্বার্থের এক বিশাল সাম্রাজ্য। মিশরের সামরিক বাহিনী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতি বছর পেয়ে থাকে ১২০ কোটি ডলারের ঘুষ।এ ঘুষটি দেয়া হয় আনোয়ার সা’দাতের আমলে ইসরাইলের সাথে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি করার পুরস্কার স্বরূপ। এ অর্থের সবটুকুই যায় সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পকেটে। ইসরাইলের সাথে চুক্তি করার ফলে মিশরে যে গণ-অসন্তোষ দেখা দেয় সেনাবাহিনীর মূল দায়িত্বটা হয় সে অসন্তোষকে দমন করা। সেনা বাহিনী সে কাজ অতিসূচারু ভাবে পালনও করছে। কিন্তু ইখওয়ানূল মুসলিমের নেতা ড.মুরসীর ক্ষমতায় আশার পর থেকে তাদের পক্ষে সে দায়িত্বপালন অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসরাইলী লবির পক্ষ থেকে দাবী উঠে মিশরীয় সেনাবাহিনীকে দেয়া অর্থসাহায্য বন্ধ করে দেয়ার। হোসনী মোবারকের সময় গাজা ছিল একটি উম্মুক্ত জেল। আর গাজার দক্ষিণ সীমান্তে সে জেলের পাহারাদারির কাজ করতো মিশরের সেনা বাহিনী। কিন্তু জনাব মুরসী ক্ষমতায় এসেই মিশরের গাজা সীমান্ত খুলে দেয়। ফলে গাজার অবরুদ্ধ মানুষ তখন মুক্ত জীবনের স্বাদ পায়। এতে ইসরাইল যেমন অখুশি হয় তেমনি অখুশি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও।ফলে মুরসীকে অপসারণ করা শুধু মিশরীয় নাস্তিক, সোসালিস্ট ও সেক্যুলারিষ্টদের এজেন্ডা নয়, বরং ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলোরও। ইসরাইলের পাশে হামাসের মত একটি জিহাদী সংগঠন বেঁচে থাকুক সেটি এসব ইসরাইল-বান্ধব দেশগুলোর কারোই কাম্য নয়। মিশরের অর্ধেকের বেশী লোক দারিদ্র্য সীমার নীচে অবস্থান করলে কি হবে,অতি রমরমা আর্থিক অবস্থা হলো সামরিক বাহিনীর অফিসারদের।দরিদ্র জনগণের রাজস্বের অর্থে গড়ে তোলা হয়েছে সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন বিশাল বিশাল ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান। এভাবে সেনাপরিবারের সদস্যদের ভবিষ্যতে অস্বচ্ছল হওয়াকে অসম্ভব করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো,প্রতিষ্ঠিত এ বিশাল স্বার্থ ত্যাগ করা কি এতই সহজ? সহজ নয় বলেই তারা আবার রাজনীতির ময়দানে পুণরায় আবির্ভূত হয়েছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে স্বৈরাচারি শাসনের বিরুদ্ধে যে গণজাগরণ শুরু হয় সেটি সামরিক স্বৈরাচারিদের শুরু থেকেই পছন্দ হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে তারা সাময়ীক ভাবে সেটি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এবং অধিক আগ্রহে সুযোগ খুঁজছিল আবার সে ক্ষমতা নিজ হাতে নেয়ার। মিশর থেকে আবার সেটিরই শুরু হল।

 

সেনাবাহিনীর অপরাধ

মিশরের সমগ্র ইতিহাসে এই প্রথম একজন প্রেসিডেন্ট জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়েছিল। অথচ তাঁকে সরিয়ে দিল সেনাবাহিনীর এমন একজন বেতনভোগী অফিসার যার সে কাজে কোন বৈধ ক্ষমতাই ছিল না। যে দেশে আইনের শাসন থাকে সে দেশে এমন অপরাধে তার কঠোর শাস্তি পাওয়াটাই ন্যায় বিচার। এ সামরিক অভ্যুত্থান নিছক মুরসীর বিরুদ্ধে নয়। তাঁর দল ইখওয়ানূল মুসলিমীনের বিরুদ্ধেও নয়। বরং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিরুদ্ধে যারা তাঁকে মাত্র এক বছর আগে ৪ বছরের জন্য নির্বাচিত করেছিল। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আব্দুল ফাতাহ আল-সিসির অপরাধ শুধু এ নয় যে,সে শুধু দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করেছে। বরং সে ভেঙ্গে দিয়েছে পার্লামেন্ট এবং মুলতবী করেছে দেশের শাসনতন্ত্র। অথচ মিশরের সমগ্র ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম শাসনতন্ত্র যা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ নিজেরা প্রণোয়ন করেছিল এবং রিফারেন্ডামে সে শাসনতন্ত্র বিপুল ভোটে জনগণ দ্বারা অনুমোদিতও হয়েছিল।এ শাসনতন্ত্র তৈরীতে শত শত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির অসংখ্যবার মিটিং হয়েছে,এবং তাতে হাজার হাজার ঘন্টা ব্যয়ও হয়েছে।বিগদ এক বছরের বেশী কাল ধরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন,পার্লামেন্টারি নির্বাচন ও রিফারেন্ডাম অনুষ্ঠান করতে দেশের শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু সেনা বাহিনীর প্রধান জেনারেল আব্দুল ফাতাহ আল-সিসি সবকিছুকে আস্তাকুঁরে ফেলে দিল।

 

মিশরের এ অভ্যুত্থানকে সমর্থন দিয়েছে দেশের সেক্যুলারিস্টগণ এবং তাদের নেতা মহম্মদ আল বারাদাই। সামরিক বাহিনী আল বারাদাইকে প্রধানমন্ত্রী করার মনস্থ্য করেছিল। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা বিশাল। তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক পারমানবিক কমিশনের চেয়্যারম্যান,সে সময় কাজ করেছেন পশ্চিমা শাসকচক্র বিশেষ করে মার্কিনীদের স্বার্থে। ইরাকের উপর হামলার পক্ষে দলীল তৈরীতে প্রেসিডেন্ট বুশের প্রশাসনকে তিনি প্রচুর সহায়তা দিয়েছেন। সে খেদমতের পুরস্কার স্বরূপ তাকে নবেল প্রাইজ দেয়া হয়। ফলে পাশ্চাত্যকে খুশি করতেই সামরিক বাহিনী তাকে সামনে আনতে চেয়েছিল। কিন্তু তার অতীত ভূমিকার জন্য মিশরবাসীর কাছে তাকে গ্রহণযোগ্য করা কঠিন। অপর দিকে তাঁর গণতন্ত্রপ্রীতি যে কতটা প্রতারণাময় তাও অতি নগ্নভাবে বেরিয়ে এসেছে। গণতন্ত্রের প্রতি সামান্যতম বিশ্বাস থাকলে কি কেউ সামরিক অভ্যুত্থানকে সমর্থণ করতে পারে? প্রেসিডেন্ট মুহম্মদ মুরসীর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নিতে ভূল হতে পারে,প্রশাসনের কাজে তার অদক্ষতাও থাকতে পারে। কিন্তু সে ভূলগুলিকে বাহানা করে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো যে ফৌজদারি অপরাধ সেটি কি মুহাম্মদ বারাদাই বুঝতে পারেননি? অথচ তিনি গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে তিনি দেশের সকল সেক্যুলারিস্ট ও লিবারেলদের নিয়ে ন্যাশনাল সালভেশন ফ্রন্ট নামে একটি জোটও গড়েছেন। সে জোটেরই তিনিই প্রধান। তিনি ও তার সহচরগণগণতন্ত্রের কথা বলেন। অথচ সে গণতন্ত্রকেই সামরিক বাহিনীর হাত দিয়ে তিনি সেটিকে কবরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন।বলা যায়,সামরিক বাহিনীর ক্ষমতাদখলের অনুকূলে তিনি ও তার জোট দিবারাত্র খেটে ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন।সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলকে তারা বলছেন দ্বিতীয় বিপ্লব। সামরিক অভ্যুর্থাণকে সমর্থণ করেছেন আহম্মদ শফিক যিনি ছিলেন হোসনী মোবারকের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনে তিনি জনাব মুরসীর কাছে হেরে যান। দূর্নীতির মামলা থেকে বাঁচার স্বার্থে তিনি বর্তমানে আরব আমিরাতে গিয়ে অবস্থান করছেন।

 

সামরিক বাহিনী ক্ষমতা হাতে নিয়ে এক রোড ম্যাপের ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিদেশে স্বৈরাচারিগণের এটাই সাধারণ রীতি। সেটি করে জনগণের নাকের ডগায় মূলা ঝুলানোর লক্ষ্যে।সামরিক বাহিনীর  পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে,তারা নির্বাচন দিবে,আবার শাসনতন্ত্রও রচনা করবে। কিন্তু কথা হলো,স্রেফ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা এবং শাসনতন্ত্র রচনা করাই কি গণতন্ত্র? কে দিবে সে নতুন পার্লামেন্ট ও নতুন শাসনতন্ত্রের বেঁচে থাকার গ্যারান্টি।শাসনতন্ত্র একবার প্রণীত করার পর প্রয়োজনে সেটি সংশোধন করাটাই সভ্য নীতি।কিন্তু সদ্যপ্রণীত একটি শাসনতন্ত্রকে ডাস্টবিনে ফেলা হলে নতুন শাসনতন্ত্রও যে বহাল থাকবে সে নিশ্চয়তা কোথায়? মুরসী ১ বছর আগে যখন ক্ষমতাসীন হন তখন মিশরের অর্থনৈতীক,রাজনৈতীক ও সামাজিক অবস্থা সুস্থ্য ছিল না।দেশটিতে চলছিল বিশাল আকারে বেকারত্ব।চলছিল গভীর দূর্নীতি। রাষ্ট্রের বুকে বিশাল আবর্জনা জমেছে ৬০ বছরের অধীক কাল ধরে চেপে বসে থাকা সামরিক স্বৈরাচারি শাসকদের লাগামহীন দুর্বৃত্তির কারণে। মুরসীর হাতে আলাদ্দীনের চেরাগ ছিল না। কোন বিদেশী দাতাসংস্থাও ছিল না। বরং বাঁধা-বিঘ্নতা ছিল পদে পদে। তার ব্যর্থ হওয়ার অপেক্ষায় ছিল মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারি শাসকদের সাথে মুসলীম বিদ্বেষী বিদেশী শক্তিবর্গ। তাছাড়া দেশের প্রশাসন,বিচারব্যবস্থা,পুলিশ,বড় বড় ব্যবসায়ীরা হলো হোসনী মুবারকের দলের। তাদের গায়ে হাত দেয়ার সামর্থ মুরসীর ছিল না। সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনী মোবারক ও তার যেসব ঘনিষ্ঠ জনেরা শত শত মানুষ হত্যার সাথে জড়িত,তাদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে পারেননি। কারণ প্রতিষ্ঠিত বিচার ব্যবস্থা ও বিচারগণই ছিল সে পথে সবচেয়ে বড় বাধা। যিনি অপরাধীদের বিরুদ্ধে আদালতে বিচার তুলবেন সে প্রসিকিউটর জেনারেল হলো মোবারকের নিজস্ব ব্যক্তি। সে কি চাইবে তার প্রভুর বিরুদ্ধে তদন্ত হোক? এবং তদন্ত শেষে বিচার বসুক। প্রেসিডেন্ট মুরসী তাকে অপসারনের চেষ্ঠা করেন। কিন্তু মুরসীর বিরুদ্ধে তার সে পদক্ষেপের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের বিচারকগণ ময়দানে নেমে আসে। ফলে ব্যর্থ হয় মুরসীর ন্যায়-বিচারের উদ্যোগ।জনগণের নির্বাচিত প্রেসেডিন্টে যে কতটা ক্ষমতাহীন রাখা হয়েছে এ হলো তার নজির। একজন অযোগ্য রাজকর্মচারি হটানোর সামর্থও প্রেসিডেন্টের ছিল না।

 

দেশের উচ্চ আদালতের সিনিয়র বিচারকগণ শুধু মুরসীর বিরুদ্ধে নয়,তাদের শক্ত অবস্থান গণরায়ের বিরুদ্ধেও। জনগণের ভোটে নির্বাচিত পার্লামেন্টকেও আদালতের বিচারকগণ ভেঙ্গে দেয়। জুলাইয়ের পহেলা তারিখে কায়রোতে অবস্থিত ইখওয়ানূল মুসলিমীনের প্রধান দফতরে হামলা হয়, বিধস্ত করে দেয়া দলটির সমগ্র অফিস।কিন্তু পুলিশ সে হামলা রোধে কোন পদক্ষেপই নেয়নি।একই অবস্থা ছিল সারা মিশরে। জুলাইয়ের ২ তারিখে আর্মির পক্ষ থেকে মুরসীকে গদি ছাড়ার জন্য ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেয়া হয়। এবং তিন তারিখেই তারা মুরসীকে হটিয়ে তাকে কারারুদ্ধ করা হয়। ৪ই জুলাই সামরিক বাহিনীর লোকেরা ইখওয়ানূল মুসলিমীনের প্রায় তিন শত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে।মুরসীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে আদালত অবমাননার। তাদের ধারণা,জনাব মুরসীকে রিপাবলিক গার্ডের অধীনে গ্রেফতার করে রাখা হয়েছে। অথচ সভ্য দেশে সেনাবাহিনীর কাজ হলো,দেশের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ও তার প্রধানদেরকে দিবারাত্র পাহারা দেয়া। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটি।

 

ছবক ইসলামপন্থিদের জন্য

মিশরের সাম্প্রতিক অভ্যর্থানের মধ্য দিয়ে আবার প্রমাণিত হলো হলোঃ নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামপন্থিগণ যতই বিজয়ী হোক না কেন দেশী ও বিদেশী সেক্যুলারিস্টগণ সে বিজয় মেনে নিতে রাজী নয়।নানা দেশে সেটি বার বার প্রমাণিত হয়েছে। এবার তারা আবারও জানিয়ে দিল গণতন্ত্রে ইসলামপন্থিদের কোন স্থান নাই। ১৯৯২ সালে আলজিরিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে ইসলামিক সালভেশন বিপুল ভোটে বিজয়ী হচ্ছিল।সে দেশের সেক্যুলারিস্টগণ সেটি টের পেয়ে নির্বাচনকে আর দ্বিতীয় পর্যায়ে এগুতে দেয়নি। নির্বাচন ত্বরিৎ স্থগিত করে সেনাবাহিনী সে পশু ক্ষমতা নিজ হাতে নিয়ে নেয়। দেশের সেক্যুলারিস্টদের সে ক্ষমতাদখলকে সমর্থন দেয় সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শক্তি।এরপর সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে শুরু হয় ইসলামপন্থিদের নির্মূল অভিযান। এক লাখের বেশী আলজিরিয়ান সে নির্মূল অভিযানে নিহত হয়। ১৯৯৭ সালে তুরস্কের নির্বাচনে বিজয়ী হয় জনাব নাযিমুদ্দীন আরকানের ইসলামপন্থি দল। কিন্তু সেদেশের জেনারেলগণ তাঁর সে বিজয়কে মেনে নেয়নি,তাঁকে তারা পদত্যাগে বাধ্য করে। একই ঘটনা ঘটে ফিলিস্তিনে। সে অবরুদ্ধ দেশটির ইতিহাসে প্রথম নির্বাচনে ইসলামপন্থি হামাস বিপুল বিজয় লাভ করে, কিন্তু সে বিজয়কে ফিলিস্তিনের সেক্যুলারগণ যেমন মেনে নেয়নি,তেমনি মেনে নেয়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তিবর্গ।নির্বাচনের পর হামাসকে শুধু দেশ-শাসনের বৈধ অধিকার থেকেই বঞ্চিত করা হয়নি,হামাস নেতাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এক নির্মূল অভিযান।সেটি যেমন ইসরাইলী হামলার মধ্যদিয়ে তেমনি মাহমুদ আব্বাসের নেতৃতাধীন সেক্যুলারিস্ট ফাতাহ ক্যাডারদের মাধ্যমে।

 

সমর্থণ পশ্চিমা শক্তির

সামরিক বাহিনীর ক্ষমতাদখলকে সমর্থন দিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। সমর্থন করে বক্তব্য রেখেছেন ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রি টনি ব্লেয়ার। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুতে টনি ব্লেয়ারের আগ্রহ প্রচুর। তার হাত দু’টি লক্ষ লক্ষ ইরাকী মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত। মিশরের সামরিক অভ্যুত্থানকে তিনি সমর্থন দেন এ যুক্তিতে যে তার বিরুদ্ধে রাস্তায় বিশাল মিছিল হয়েছে। অথচ তিনি ভূলে যান তার আমলে লন্ডনের হাইড পার্কে বিশ/তিরিশ লাখের বেশী মানুষ জমা হয়েছিল ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থামাতে। ইউরোপের ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় গণ-জমায়েত। কিন্তু ব্লেয়া কি জনগণের সে মতামতকে সামান্য গুরুত্ব দিয়েছেন? অথচ রাজপথের মিছিলের দোহাই দিযে তিনি সামরিক অভ্যুত্থানকে সমর্থন দিচ্ছেন। অথচ মিশরের মত একটি জনবহুল দেশে ও কায়রোর মত একটি বিশাল শহরে ১০লাখ বা ২০ লাখ মানুষ জমা করা কি এতটি কঠিন? বিশেষ করে যে রাজনীতিতে বিদেশীদের বিনিয়োগ হাজার হাজার কোটি টাকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একার বিনিয়োগই শত শত কোটি ডলারের। সেটি যেমন সামরিক বাহিনীর কারণে,তেমনি বেসামরিক প্রশাসন,মিডিয়া,এনজিও,সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতীক সংগঠনগুলির পিছনে।

অপরদিকে প্রেসিডেন্ট ওবামা এটিকে সামরিক অভ্যুত্থান বলতে রাজী নন।সামরিক অভ্যুত্থানের সংজ্ঞাই তার কাছে ভিন্ন। মিশরের সেক্যুলারিস্টগণ ও তাদের নেতা আল বারাদাইও এটিকে সামরিক অভ্যুত্থান বলতে রাজী নয়।প্রশ্ন হলো,সামরিক অভ্যুত্থানের সংজ্ঞা কি? সরকার পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ও সুনির্ধারিত সাংবিধানিক নীতিমালা রয়েছে। রাজতন্ত্রে সেটি ঘটে রাজার মৃত্যুতে। আর গণতন্ত্রে সেটি ঘটে জনগণের ভোটে।আর কোন বিপ্লব ঘটলে বিপ্লবের নেতারাও ইচ্ছামত শাসনক্ষমতা নিজেরা নিয়ে নেয়। কিন্তু ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় এবং ১৯৭৯ সালে ইরানে এমনি একটি বিপ্লব এসেছিল। কিন্তু মুরসী জনগণের ভোটে জিতেছেন, আজও পরাজিত হননি। ফলে তিনি অপরাসিত হোন কি করে? এবং সেটি রাষ্ট্রের এক ভৃত্যের হাতে? আজ কায়রোতে বিশাল বিশাল মিছিল হলেও তাতে এ অবধি কোন বিপ্লব জন্ম দেয়নি। সেক্যুলারিস্টদের জমায়েতে যেমন বিপুল জনসমাগম হয়েছে তেমনি ব্শিাল জমায়েত হয়েছে ইখওয়ানূল মুসলিমেরও। যদি একটি মিছিলের কারণেই মাত্র এক বছর পূর্বের নির্বাচিত একটি সরকারকে হটে যেতে হয় তবে দেশ জুড়ে নির্বাচনে এত শ্রম,এত মেধা ও এত অর্থবিনিয়োগের প্রয়োজন কি? মিছিলে লোক সমাগম বাড়াতে অর্থ ব্যয় করাই কি উত্তম কৌশল নয়? এতে গুরুত্ব হারায় পার্লামেন্ট,নির্বাচন ও নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান সমূহ। সামরিক বাহিনী মিশরকে কি সে ধারার রাজনীতিই চালু করলো না?

তাছাড়া কোন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে যখন সরিয়ে দেয়া হয় এক জেনারেলের ফরমান বলে তখন তাকে সামরিক অভ্যুত্থান না বলে কি উপায় আছে? সরকার পরিবর্তনের এরূপ সামরিক রীতিকে  অভ্যুত্থান না বলাটাই তো মিথ্যাচার। সত্যের সাথে এটি প্রচন্ড গাদ্দারি।এখানে অপরাধটি কোদালকে কোদাল ও হাতে রক্ত মাখা এক খুনিকে খুনি না বলার অপরাধ। প্রেসিডেন্ট ওবামা ও পাশ্চাত্য বিশ্বের নেতাগণ এখানে সে অপরাধটিই করেছেন।এ অপরাধী নেতাদের থেকেই বা তাই কি আশা করা যায়? অবশ্য আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোর নেতারা প্রেসিডেন্ট ওবামার চেয়ে অধিক ন্যায় নীতির পরিচয় দিয়েছেন।সামরিক অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট মুরসীকে অপসারণের অপরাধে তারা আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্য পদ থেকে মিশরকে সাসপেন্ড করেছেন।তবে ওবামা যে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছেন তার একটি রাজনৈতীক কারণও রয়েছে। সামরিক অভ্যুত্থান বললে মিশরের সামরিক সাহায্য বন্ধ করা তাঁর উপর শাসতান্ত্রিক ভাবে বাধ্যতামূলক হয়ে পড়তো। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় না যে সে সাহায্য বন্ধ হোক। কারণ,চাকরবাকর পালতে হলে বেতন না দেয়াটা বোকামী। মার্কিনীদের নির্ভরযোগ্য বন্ধু মিশরের জনগণ নয়,বরং তারা হলো এই সামরিক বাহিনীর লোকেরা। মধ্যপ্রাচ্যের বুকে মার্কিনীদের নীতি বাস্তবায়নের মূল খেলোয়াড় হলো এই মিশরীয় জেনারেলগণ। গাজায় যখন দিবারাত্র বৃষ্টির মত ইসরাইলী বোমা পড়ছিল তখন এ মিশরীয় জেনারেলগণ গাজার সীমান্ত কড়া ভাবে বন্ধ রেখেছিল যেন সে বোমা থেকে গাজাবাসী পলায়নের রাস্তা না পায়।

তাছাড়া নায়-অন্যায় বিচারে মাকিনীদের বিচারবোধ ও বিচারের মানদন্ডই ভিন্ন। কোনটি ন্যায় আর কোনটি অন্যায় তারা সেটি নির্ধারণ করে নিজেদের স্বার্থ কতটা উদ্ধার হবে তা দেখে। অতীতে মার্কিন প্রশাসন চিলির জেনারেল আগাস্টা পিনোশের ন্যায় অতি বর্বর ডিক্টেটরকেও নিন্দা করতে রাজী হয়নি। বরং তাকে সর্বপ্রকার সাহায্য দিয়েছে। কারণ সে ছিল মার্কিনী স্বার্থের পাহারাদার। হাজার হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী তার হাতে নিখোঁজ ও নিহত হয়েছে।মার্কিনী স্বার্থের তেমন অসংখ্য পাহারাদার রয়েছে মিশরীয় সেনাবাহিনীতেও। মার্কিন সরকারের সকল দরদ তো এ পাহারাদের প্রতিই,মিশরের জনগণ বা সেদেশের প্রেসিডেন্টের প্রতি নয়। তাই রিপাবলিক পার্টির সেনেটর মিস্টার টেড ক্রুজ সম্প্রতি “ফরেন পলেসি জার্নালে এক উপসম্পাদকীয় লিখে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে দোষারোপ করেছেন,তিনি কেন প্রেসিডেন্ট মুরসীকে উৎখাতের দাবী পূর্বে জানাননি। অপরদিকে “দি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল” ওয়াইট হাউজ কতৃপক্ষের কাছে দাবী জানিয়েছে,নতুন জেনারেলগণ যদি পিনোশের নীতিকে অনুসরণ করে তবে তাদের প্রতি যেন সর্বপ্রকার সাহায্য অব্যাহত রাখা হয়। পিনোশের অপর অর্পিত এজেন্ডা ছিল বামপন্থিদের নির্মূল করা। আর এখন মার্কিনীদের এজেন্ডা হলো ইসলামপন্থিদের নির্মূল –যেটি তারা ৪০টি দেশের সেনাবাহিনীকে সাথে নিয়ে এখনো অবিরাম চালিযে যাচ্ছে আফগানিস্তানে। ইসলামপন্থিদের নির্মূলে যারাই মার্কিনীদের সহায়তা দিবে তাদের সহায়তাই দেয়াই মার্কিনীদের নীতি। তেমনি একটি নীতি অনুসরণ করার কারণেই শেখ হাসিনার সরকার পশ্চিমা বিশ্বের কাছে এত প্রিয়। বরং তাদের ক্ষমতায় বসানোও হয়েছিল তেমন একটি নীতিকে বাস্তবায়ীত করার স্বার্থে। গত ৫ ও ৬ই মে’র দিবাভাগে ও রাতে ঢাকায় হিফাজতে ইসলামের হাজার নেতাকর্মীদের আহত ও নিহত করা হলেও মার্কিন প্রশাসন থেকে তাই হাসিনা সরকারকে কোন নিন্দাবাদ জানানো হয়নি। একই কারণে বারাক ওবামাও এ অবধি মিশরের সামরিক অভ্যুত্থানের নেতাদের কোনরূপ নিন্দাবাদ জানাননি।

 

রক্তাত্ব পথে মিশর

প্রেসিডেন্ট মুরসীকে হটিয়ে সামরিক বাহিনী মিশরকে আরো অস্থিতিশীল করে ফেললো। মিশর এমনিতেই একটি বিভক্ত দেশ। এমন বিভক্ত দেশে ব্রিজ গড়ার মাধ্যম হলো সংসদ,সংলাপ, মিডিয়া ও মূক্ত রাজনীতি। কিন্তু সামরিক বাহিনী সে ব্রিজগুলোকেই বিনাশ করে দিল। পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেয়ায় এখন আর কোন খোলামেলা আলোচনার ফোরামই রইলো না। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ইখওয়ানের টিভি চ্যানেল।রাজপথের সমাবেশেও গুলি চালানো হচ্ছে। নির্বিচারে মানুষ খুন করা হচ্ছে।সরকারি ফোরামে এখন মুরসী বিরোধীদের দাওয়াত দিয়ে প্রেসিডেন্ট মুরসীর বিরুদ্ধে কথা বলতে দেয়া হচ্ছে। অপর দিকে সেনা বাহিনীর পক্ষ থেকে মুরসীকে নিখোঁজ করা হয়েছে। ফলে সামরিক বাহিনী এখন আর কোন নিরপেক্ষ ও সর্বদলীয় প্রতিষ্ঠান নয়,বরং এখন এটি এক প্রবল রাজনৈতীক পক্ষ। একই অবস্থা পুলিশের। তারা জড়িয়ে পড়েছে ও কোয়ালিশন গড়েছে দেশের চরম ইসলাম বিরোধী সেক্যুলারিস্টদের সাথে।

 

বোধগম্য কারণেই মিশরের জনগণের মাঝে এখন পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচন্ড ক্ষোভ। তাদের বিরুদ্ধে দেশের নানা স্থানে এখন প্রতিবাদ মিছিলও বের হচ্ছে। সিনা উপত্যাকাতে হামলার হয়েছে পুলিশের উপর,সেখানে নিহত হয়েছে ৪ জন পুলিশ। নিহত হয়েছে একজন্ কপটিক খৃষ্টান পাদ্রী। জনগণ হাতের কাছে যা পাচ্ছে তা নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাছাড়া মিশরে রাজনৈতীক বিভক্তি ও সহিংসতা কোন নতুন ঘটনা নয়। নির্বাচনের পথটি ব্যর্থ করে দেয়ার ফলে এখন গুরুত্ব পেয়েছে রাজপথের মিছিল। মিশরের রাজনীতি এখন তাই আর প্রেসিডেন্ট ভবন, পার্লামেন্ট বা রাজনৈতীক দলের দফতরে নাই,তা এখন রাজপথে নেমে এসেছে।সেটি যেমন মুরসীর সমর্থকগণ বুঝেন,তেমনি মুরসীর বিরোধীরাও বুঝেন।তাই লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন রাজপথে। রাজনীতির চুড়ান্ত লড়াইটি রাজপথেই হবে। এসব মিছিলে যোগ দেয়ার মাঝেই সেক্যুলারিস্টদের যেমন রাজনীতিতে বেঁচে থাকার বিষয়। তেমনি ইসলামপন্থিদের কাছে এটি পবিত্র জিহাদ। তারা জানে এ জিহাদে হেরে গেলে শুধু পরাজয় নয়,রাজনৈতীক ভাবে নির্মূল হতে হবে। ফলে লড়াই ছাড়া তাদের সামনে কোন বিকল্প পথও নাই।

 

তাছাড়া মিশর একটি বিশাল দেশ। এতবড় দেশের অলি-গলি সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর পক্ষে পাহারা দেয়া অসম্ভব। মিশরের চেয়ে ছোট দেশ হলো আফগানিস্তান ও ইরাক। অথচ সে দেশ দুটির পাহারা দেয়ার সামর্থ নাই মার্কিনীদের। কারণ এমন কাজ যেমন বিপুল জনশক্তি চায়,তেমনি বিশাল অর্থও চা্য়। মার্কিনীদের এ ব্যয়ভার তাই দেউলিয়া বানিয়ে ফেলেছে। প্রশ্ন হলো,এমন একটি যুদ্ধ লড়ার সামর্থ মিশরের সেনাবাহিনীর আছে? তাছাড়া মিশরের চারদিকে চলছে অবিরাম যু্দ্ধ। সেটি যেমন ফিলিস্তিনের গাজায়,তেমনি সূদান,লিবিয়া ও আলজিরিয়ায়। সেখানে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে রয়েছে প্রচুর অস্ত্র। সে অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিরুদ্ধে। তাছাড়া লড়াই একবার শুরু হলে নির্বাচন বা ভোটযুদ্ধ তখন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। তথন ফয়সালা হয় রণাঙ্গণে। অফগানিস্তানে ও ইরাকে বার বার নির্বাচন দিয়েও তাই কোন শান্তি আসছে না। শান্তি আসছে না কাশ্মিরেও। তাই প্রশ্ন, আগামীতে মিশরে যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিতও হয় তাতেও কি শান্তি আসবে? কারণ সে নির্বাচনে একটি পক্ষ যেমন জিতবে, তেমনি আরেকটি পক্ষ হারবে। এবারের এ সামরিক অভ্যুত্থান জানিয়ে দিল,ইখওয়ানুল মুসলিমের ন্যায় একটি শক্তিশালী বিজয়ী পক্ষকে ভোটযুদ্ধে পরাজিত করা সম্ভব না হলেও তাদেরকে রাজপথে পরাজিত করা যায়। তাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে এক বছরের মধ্যে অপসারণও করা যায়।এবং তাতে দেশীয় ও বিদেশীদের সমর্থনই পাওয়া যায়। ফলে আগামীতে নির্বাচন হলেও নির্বাচনের পর শুরু হবে রাজপথের আরেক যুদ্ধ। সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বস্তুত মিশরকে এমন এক অবিরাম যুদ্ধের মধ্যেই ঠেলে দেয়া হলো। (লন্ডন, ৯/৭/২০১৩)



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Wednesday, 10 July 2013 23:59
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.