Home আমার স্মৃতিকথা আমার স্মৃতিতে ডাঃ মোহাম্মদ উল্লাহ ভাই
আমার স্মৃতিতে ডাঃ মোহাম্মদ উল্লাহ ভাই PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Wednesday, 04 August 2010 18:40

ডাক্তার মোহাম্মদ উল্লাহ ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয় সম্ভবত ১৯৮২ সালের দিকে যখন উনি ইরানে যান। আমিও তখন ইরানে ডাক্তার রূপে কর্মরত। তিনি পোস্টিং পান ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে। আমার পোস্টিংয়ের স্থান থেকে প্রায় হাজার মাইল দূরে। সেখানে কয়েক বছর কাজ করার পর আমি যে জেলায় কাজ করি সে জেলায় চলে আসেন। আমার কর্মস্থল শুরু থেকে শেষ অবধি ছিল গরমসার জেলায়। উল্লেখ্য যে এ জেলার সন্তান হলেন ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জনাব মাহমুদ আহমদী নেজাদ। মোহাম্মদ উল্লাহ ভাই ইরানে প্রথম কয়েক মাস চাকুরী করেন তেহরান শহরে জিহাদে সাজেন্দীগী নামক একটি প্রতিষ্ঠানে। পরে যোগ দেন স্বাস্থ্য মন্ত্রালয়ে।  গরমসার আসার পর থেকে তার সাথে ঘনিষ্ঠতা আরো বেড়ে যায়। যখন জানলাম যে তিনি জনাব এ্যাডভোকেট এ. টি. সাদী সাহেবের জামাই তখন সে ঘনিষ্টতা যেন বেগবান হয়। কারণ আমি জনাব এ্যাডভোকেট এ. টি. সাদী সাহেবকে আগে থেকেই গভীর শ্রদ্ধা করতাম। এক সময় তিনি জাতিসংঘে পাকিস্তানী প্রতিনিধি টিমের সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি "পাকিস্তান দরদী সংঘ" নামক একটি সংগঠন করেছিলেন। ঢাকার রাজপথে বহুবার আমি তার বক্তৃতা শুনেছি। উপমহাদেশের মুসলমানদের বিশেষ করে বাংলাদেশের মূসলমানদের প্রতি গভীর দরদ প্রকাশ পেত তার সেসব বক্তৃতায় -যেমন তার মুখের ভাষায় তেমনি তার বলিষ্ঠ দেহের ভাষায়।  আমার আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু গরমসারে পোষ্টিং পেয়েছিলেন। তিনি হলেন ডাক্তার আমীনূর রহমান। উনার সাথেও আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ইরানে। ডাক্তার আমিন ভাইও শুরুতে সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের এক হেল্থ সেন্টারে কাজ পান। পরে বদলী হয়ে গরমসার জেলায় বদলী হয়ে চলে আসেন। ভুগোলের দূরত্ব কমে যাওয়াতে আমাদের মনের দূরত্ব বলা যায় বিলুপ্ত হয়েছিল।


তবে তাদের এ বদলী ছিল পরিকল্পিত। আমার মত তারাও নিজ নিজ এলাকায় অনেকটা একীকত্বে ভুগছিলেন। পরস্পরে আলোচনা বা মত বিণিময়ের কোন সুযোগ ছিল না। ইরানে যখন কাজ শুরু করি তখন আমার জেলাটিতে আমিই ছিলাম একমাত্র বাংলাদেশী ডাক্তার। অধিকাংশই ছিল পাকিস্তানী ও ভারতীয় ডাক্তার। ফলে প্রচন্ড একাকীত্ব অনুভব করতাম। তখন তেহরানে আমার আরেক ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল ফরিদু্দ্দিন খান। চিন্তা-চেতনায় তিনিও ছিলেন আমার অতি কাছের। ফলে ছুটির দিনগুলিতে তেহরানে ছুটে যেতাম। পুরা ছুটি কাটিয়ে আবার কর্মস্থানে ফিরে আসতাম। মোহাম্মদ উল্লাহ ভাই ও আমিন ভাইকে কাছে পেয়ে আমার আপনজনদের সংখ্যা আরো বাড়লো। এর মধ্যে তেহরানে আরো কিছু ভাই চাকুরি নিয়ে জমা হলেন। তখন ইরান আর এতটা বিদেশ মনে হত না। মোহাম্মদ ভাই ও আমিন ভাই বাংলাদেশী ছিলেন বা ইসলামী ছিলেন সেটুকুই শুধু ছিল না। উনারা দুই জনই ছিলেন আমার আত্মার অতি আপনজন। চিন্তা-চেতনা ও মনের দিক দিয়ে তারা ছিলেন অতি কাছের লোক। যে ভাষায় এবং যে ভাবনা নিয়ে উনারা কথা বলতেন সে ভাষা ও ভাবনা ছিল আমারও। ফলে মন খুলে উনাদের সাথে আমার কথা হত। কখনও কখনও বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কও হত। তবে সেটি দ্বীনকে বুঝবার স্বার্থে। কোনদিন সে বিতর্কে আমাদের মাঝে সম্পর্কে কোন ফাটল ধরেনি।


সহপাঠি বা সহকর্মীরূপে জীবনে বহু মানুষের সাথে পরিচয় ঘটেছে। জীবনের নানা বাঁকে তারা যেমন বন্ধুরূপে এসেছেন, তেমনি চলেও গেছেন। তবে আমার স্মৃতিতে যারা স্থায়ী ভাবে বিশাল জায়গা দখল করে আছেন তাদেরই একজন ডাঃ মোহাম্মদ উল্লাহ ভাই। জীবনে এমন একজন বন্ধু পাওয়াটাও ভাগ্যের ব্যাপার। নবীজী (সাঃ)বলেছেন, যখন কোন ঈমানদার ব্যক্তি অন্য একজন ঈমানদারের সাথে মিলিত হয় তখন তার ঈমান বেড়ে যায়। সেটি আমিও অনুভব করতাম। আমরা তিন বন্ধু যতটা সম্ভব প্রায়ই একত্রিত হতাম। সেটি প্রায় প্রতি সপ্তাহতেই হত। বয়সে আমিই তাদের মধ্যে সিনিয়র ছিলাম। কিন্তু সেটি আমার কাছে কখনই মনে হয়নি। আমি তাদের থেকে প্রচুর বিষয় শিখেছি। প্রায় প্রতি সাক্ষাতে আমাদের আলোচনার বিষয় হত মুসলমান রূপে আমাদের দায়দায়িত্বের কথা। দায়িত্বপালনে আমরা যে কতটা পিছিয়ে আছি সে দুশ্চিন্তার কথা। আল্লাহর কাছে কিভাবে জবাব দিব সে দূর্ভাবনার কথা। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে আমরা পরিকল্পনা করতাম কোন একজনের বাসায় সপরিবারে একত্রিত হওয়ার। আর এতে শুধু আমাদের নিজেদের মাঝের সম্পর্কই মজবুত হয়নি, আমাদের ছেলেমেয়েরাও পরস্পরে ঘনিষ্ঠ হয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এতে গড়ে উঠেছিল আমাদের তিনটি পরিবারের মাঝে মজবুত পারিবারিক বন্ধন।


আমাদের যে ভাবনাটি সে সময় কাজ করছিল তা হল, ইরানে দুই হাজারেরও বেশী যে বাংলাদেশী ডাক্তার চাকুরি করছে তাদের মাঝে কিভাবে ইসলামী সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায় সেটি। এ ভাবনা থেকেই আমরা বিভিন্ন ছুটির দিন, ঈদের দিন -এগুলোকে সামনে রেখে বেশী বেশী ডাক্তারদের নিয়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলচনা সভা বা স্টাডি সার্কেলের আয়জন করতাম। ইরান একটি বিশাল দেশ। ইরান ভেঙ্গে অনেকগুলি বাংলাদেশ সৃষ্টি হতে পারে। হাজার হাজার মাইল দূরের ডাক্তারদের একত্রিত করা সহজ ব্যাপার নয়। এ দূরত্ব দূর করতে আমরা উদ্যেগ নিলাম পত্রিকা বের করার। কিন্তু বাংলা ছাপাখানা কোথায় পাবো? আমরা স্বিদ্ধান্ত নিলাম হাতে লিখেই বের করবো। মোহাম্মদ উল্লাহ ভাইয়ের হাতের লেখা ছিল চমৎকার। পত্রিকার নাম দিয়েছিলাম “সংহতি”। এ নামের পিছনেও একটি কারণ ছিল। বাংলাদেশীরা সচারাচরই অতি বিভক্তিপ্রবন ও কলহপ্রবন। যেখানে যায় সেখানেই সে কলহ-বিবাদ সাখেই নিয়েই হাজির হয়। ইরানে তখন নানা চেতনা, নানা মতবাদ ও নানাদলের বাংলাদেশী ডাক্তার। তাদের মধ্যে একতা বা সংহতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে এ পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়। সংহতির জন্যও আদর্শিক ভিত্তি চাই। আমাদের জন্য সেটি ছিল ইসলাম ও মুসলমানদের কল্যানচিন্তা। প্রথম সংখ্যাটি বের করলাম ৬ পৃষ্ঠার। কিন্তু পরপবর্তিতে তা ২৬ পৃষ্ঠাতে গিয়ে পৌছেছিল। প্রতি মাসে নিয়মিত বের করতাম। পুরা পত্রিকাটি মোহাম্মদ ভাই ধৈর্য্ ধরে লিখতেন। তারপর সে পৃষ্ঠাগুলোকে ফটোকপি ও স্ট্যাপল করে সমগ্র ইরানের বিভিন্ন ব্যাক্তিদের ঠিকানায় পোস্ট করতাম। বাংলাদেশেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও লাইব্রেরীতে পাঠাতাম। অনেকে বাংলাদেশ থেকে বহু টাকা খরচ করে মতামত পাঠাতেন। বাংলাদেশী ডাক্তারদের পক্ষ থেকে এটিই ছিল একমাত্র উদ্যেগ। অনেকের মধ্যেই এ পত্রিকা কিছুটা হলেও চেতনায় সাড়া তুলেছিল। আর এ পত্রিকা বের করার বড় কৃতিত্ব ছিল মোহাম্মদ উল্লাহ ভাইয়ের। এমন বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকে তিনি যে কতটা ভাল বাসতেন সেটির প্রমান তিনি এভাবে রেখেছেন।


ইরানে কর্মকাকীন জীবনে আমরা চিন্তা-ভাবনার প্রচুর অবকাশ পেতাম। দেশে থাকতে সে সুযোগ কিছূটা পেয়েছিলাম ছোট বেলায়। যখন বাড়ীর পিছনের মেটো-রাস্তার উপর বসে বিকেল বেলায় কযেকজন সহপাঠি বসে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা জমাতাম। ইরান থেকে দেশে ফেরার পর প্রতিটি দিন কেটেঠেছ ব্যস্ততায়। ঢাকায় অবস্থানকালে তেমন একটা উদ্যোগ যে নেয়নি তা নয়। কিন্তু সে উদ্যোগে বেশী লোকের সহযোগিতা পাইনি। ইরানের ছুটির দিন গুলোতে আমরা একাকী নিজ নিজ বাসায় বসে থাকতাম না। হয় কোথায় কারো বাড়ীতে বেড়াতে বেরুতাম, অথবা কেউ আমাদের বাড়ীতে বেড়াতে আসতো। যেখানে জমা হতাম সেখানে পুরাটা দিনটা কাটিয়ে দিতাম। পূর্ব থেকে প্রোগ্রাম করে আমরা বেশ কয়েকটি পরিবার একত্রিত হতাম। এতে আমাদের ছেলেমেয়েরাও দলবেঁধে খেলার সুযোগ পেত। শুরুতে আমার কর্মক্ষেত্র গরমসারে আমিই ছিলাম একমাত্র বাংলাদেশী ডাক্তার। পরে যে সংখ্যা ৫/৬ বছরের মধ্যে ৭/৮ জনে পৌঁছে। এর মধ্যে আমরা ৩/৪ জন ছিলাম ইসলামী জীবনদর্শনে বিশ্বাসী। তবে অন্যদের সাথেও আমাদের সুসম্পর্ক ছিল। তারাও আমাদের বাসায় আসতো। আমরাও তাদের বাসায় যেতাম। পাশের জেলাতে এবং মাত্র ১০৫ মাইল দুরের তেহরানেও অনেক সমমনা ভায়েরা থাকতেন। ফলে ১০/১৫ জন একত্রিত হওয়া কোন কঠিন ব্যাপার ছিলনা। দেশে থাকতে মাত্র ২/৩ ঘন্টার জন্য ১০জন লোককে একত্রিত করা যেখানে কঠিন সেখানে আমরা সারা দিন কাটিয়ে দিতাম। বেশীর ভাগ জামায়েত গুলো হত মোহাম্মদ উল্লাহ ভাই ও আমীন ভাই ও আমার বাসাতে। মোহাম্মাদ উল্লাহ ভাইয়ের বাসায় আমরা কয়েকবার ঈদের জামাত করেছি।


আমাদের নিজ-নিজ ভাবনা ও সম্মিলিত আলোচনার প্রধানতম বিষয় ছিল, মুসলমানদের আজকের অধঃপতনের কারণ কি? এ পতন থেকে উত্থানের উপায়ই বা কি? ঘন্টার পর ঘন্টা আমরা এনিয়ে মত বিণিময় করতাম। চিন্তা-ভাবনা করতাম। আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছিলাম, মুসলমানদের পতনের মূল কারণ তারা আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামত কোরআন থেকে দূরে সরে গেছে। আল্লাহর পবিত্র এ গ্রন্থটাকে তারা ঠিকমত অধ্যয়নই করেনি। সাধারণ মুসলমানগন দূরে থাক আলেমগনও ঠিকমত কোরআন চর্চা করেনি। তারা কোরআন চর্চা করেছেন নিজেদের ফেরকা বা মজহাবকে সঠিক রূপে প্রমাণ করার জন্য। আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নয়। ফলে প্রতিদেশে ইসলাম ও আল্লাহর আইন শরিয়ত পরাজিত হলেও আলেমদের পক্ষ থেকে কোন আন্দোলন নেই। তাদের খোতাব বা ওয়াজে তা নিয়ে কোন আহাজারিও নেই। মসজিদ-মাদ্রাসার বাইরে এসে তারা কোন জিহাদও সংগঠিত করেনি। বাংলাদেশে কোরআন শিক্ষার নামে শুধু কোরআনের তেলওয়াত বেড়েছে। কিন্তু কোরআন বুঝার কাজ তেমন একটা হয়নি। মুসলমানদের পতন ও পরাজয়ের দ্বিতীয় কারণটি হল, অনৈক্য। যে অনৈক্যকে আল্লাহতায়ালা সূদ-মদ-ব্যভিচার বা শুকরের মাংস খাওয়ার ন্যায় হারাম ঘোষণা করেছেন সে অনৈক্যই আজ মুসলিম বিশ্বে প্রবল ভাবে বিজয়ী।


আমাদের মাঝে তখন প্রশ্ন উঠতো, এ অবস্থায় ইরানে বসে আমরা কি করতে পারি? আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমাদের নিজেদের থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। আমরা তিনজন তখন কোরআন বুঝায় সাধ্যমত আত্মনিয়োগ করলাম। আর এ জন্য শুরু করলাম আরবী ভাষা শিক্ষা। আমার মনে হত, অনুবাদ পড়ে কোরআনের অর্থ কিছুটা বুঝা গেলেও তা থেকে অনুপ্রাণীত হওয়া যায় না। অনেক সময় মনযোগ ধরে রাখাও কঠিন হত। কোরআন বুঝার কাজে আমাদের মধ্যে ডাঃ আমীন ভাই যথেষ্ঠ অগ্রসর ছিলেন। অসংখ্যা আয়াত তার মুখস্থ ছিল। সেগুলো তিনি বিভিন্ন প্রসঙ্গে অবিরাম বলে যেতেন এবং তার অর্থও বলে যেতেন। তার সে তেলাওয়াত আমাদের মনেও দোল দিত। নানা প্রসঙ্গে তৎক্ষনাৎ কোরানের আয়াত এমন অনর্গল ভাবে বলতে পারেন এমন মানুষ আমি খুব একটা দেখিনি। উনার স্মৃতি শক্তি ছিল প্রখর। বেলুচিস্তানের গ্রামে যখন কাজ করতেন তখন প্রচুর অবসর পেতেন। আর সে অবসর সময়টি কাজে লাগিয়েছেন কোরআন বুঝা ও মুখস্থ করার কাঝে। আমিন ভাইয়ের মধ্যে সব সময়ে একটি তাড়াহুড়া দেখতাম। আর সেটি বেশী বেশী কোরআন বুঝা ও নেক আমল করায়। তার কথা মনে পড়লে কোরআনের সে আয়াতের কথা মনে পড়ে যেখানে আল্লাহপাক বলেছেন, “সারেয়ু ইলা মাগফিরাতুম মিররাব্বিকুম…” –অর্থঃ তোমরা তাড়াহুড়া কর আল্লাহর মাগফেরাত লাভে। উনাকে দেখে আমার নিজের পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি দারুন ভাবে অনুভব করতাম। অপর দিকে মোহাম্মাদ উল্লাহ ভাইয়ের তেলয়াত ছিল অতান্ত মধুর। আমি যখন উনাদের দুইজনের সাহচর্য পেতাম তখন অনুভব করতাম, তখন দারুন প্রেরণা পেতাম সামনে এগুনোর। নিজের ঈমানের স্পন্দন অনুভব করতাম।


আমীন ভাই বাংলাদেশে ফিরে এসে আরবী শেখার সহজ পদ্ধতির উপায় বই লিখেছেন। নিজে আরবী শিক্ষার ক্লাসও শুরু করেছিলেন। সেমিনারের আয়োজন করে ইসলামের নানা বিষয় জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করতেন। উল্লেখ্য আমাদের প্রিয় আমীন ভাইও আমাদের মাঝে আর নাই। মোহাম্মদ উল্লাহ মোহাম্মদ উল্লাহ ভাইয়ের ইন্তেকালের প্রায়ে তিন বছর আগে তিনিও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। তাদের এ দুইজন সম্পর্কে আমার স্ত্রী বলতো, “আমীন ভাই ও মোহাম্মদ উল্লাহ ভাই দুইজন জান্নাতের মানুষ এবং তারা দুনিয়ায় হেঁটে বেড়াচ্ছেন।” উনাদের দুই জনের মৃত্যুতে শুধু দুটি পরিবারেরই অপুরণীয় ক্ষতি হয়নি, ক্ষতি হয়েছে মুসলিম উম্মাহর। বাংলাদেশ দুইজন সৃষ্টিশীল ভাল মানুষকে হারিয়েছে। ভাল মানুষের আকালের দেশে এটি কি কম ক্ষতি?


কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি আমরা পতনের দ্বিতীয় কারণ অনৈক্যের চিকিৎসা কি করতে পারি সে চিন্তাও আমাদের মধ্যে প্রবল ভাবে বাসা বাঁধতে থাকে। আমাদের উপলদ্ধি ছিল, এ অনৈক্যের বড় কারন মুসলমানদের মাঝে নানা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দল ও নানা ফেরকা। তাই ঐক্যের নামে দল গড়লে তাতে আরেকটা দল বাড়বে মাত্র কিন্তু ঐক্য বাড়বে না। তাই আমাদের উপলদ্ধি ছিল ঐক্যের জন্য কিছু করতে হলে দলের উর্দ্ধে উঠে কাজ করতে হবে। ঈমান ও অভিন্ন চেতনার বাঁধনে একতা গড়তে হবে। একসাথে যদি এক লক্ষ পয়গম্বরও জন্ম নিতেন তবে কি তাদের একতাবদ্ধ হতে কি দলের প্রয়োজন হত? ঈমান বাড়লে একতাও বাড়বে। কারণ কোন ঈমানদার কি মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি গড়ায় আগ্রহী হতে পারে। অনৈক্য রোগের লক্ষণ মাত্র। মূল রোগ ঈমানহীনতা। আর ঈমানহীনতা দূর করতে হলে কোরআনের জ্ঞান বাড়াতে হবে। আল্লাহপাক কোরআনে বলেছেন, “ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা।” অর্থঃ একমাত্র জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে। আর সে সমাজে কোরআন না বুঝে শুধু তেলাওয়াত হয় সে সমাজে কি জ্ঞানী লোকের সৃষ্টি হয়? জ্ঞানের এমন আকালে কি ঈমানদারদের সংখ্যা বাড়ে? বাড়ে কি একতা।


সম্ভবতঃ এমন এক উপলদ্ধির কারণেই কোন রাজনৈতিক দলে শামিল হওয়ার বিষয়ে আমরা কোন আগ্রহই বোধ করিনি। দলের উর্দ্ধে উঠেও মানুষকে যে প্রচন্ড ভাবে একতা বদ্ধ করা যায় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে বিরাট বিপ্লব আনা যায় সে প্রমাণ আমরা ইরানে দেখেছি। ইমাম খোমেনী দল না গড়েও ইরানের লোকদের সংগঠিত করেছেন। মানব ইতিহাসের বিস্ময়কর বিপ্লব এনেছেন। উপমহাদেশে সে প্রমাণ রেখেছেন মাওলানা মোহম্মদ আলী জওহর। তারও কোন দল ছিল না। অথচ উপমহাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম যে গণআন্দোলনটি গড়ে উঠেছিল তার গড়ে তুলেছেন তিনিই। এবং সেটি ছিল খেলাফত আন্দোলন। যারা অর্ধশত বছরের বেশী কাল ধরে নিজ দল বা জামায়াতকে শক্তিশালি করার পিছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেছেন এবং হাজার হাজার ক্যাডার গড়ে তুলেছেন তারা কি তেমন একটি আন্দোলনের স্বপ্ন দেখার সামর্থও রাখেন?


ইরানে তখন নানা দলের ও নানা মতের বাংলাদেশী ডাক্তার। কেউ শিবিরের, কেউ তবলিগ জামাতের, কেউ ইসলামী ঐক্য আন্দলনের, কেউবা হাফেজজী হুজুরের অনুসারী। কোন একটি দলের সদস্য না হওয়ায় আমরা সবার সাথে মিশতে পারতাম। আন্তরিকও হতে পারতাম। আমদের সে আন্তরিকতা অন্যরাও বুঝতে পারতো। ফলে আমরা যখন তাদেরকে কোন মিটিংএ দাওয়াত করতাম তখন তারাও আসতো। এতে ইরানে বসেও আমরা অনেকগুলো সুন্দর সুন্দর আলোচনা সভার আয়োজন করতে পেরেছিলাম। এমন একটি চেতনারই প্রকাশ ঘটতো আমদের পত্রিকা “সংহতি”র পাতায়। সংহতি’র প্রকাশে এমন ডাক্তারও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন যারা ছাত্র জীবনে সেকুলার সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন।


মোহাম্মাদ উল্লাহ ভাইয়ের কথা মনে পরলে অতীত দিনের এরূপ হাজারো কথা মনে পড়ে। বহু বছরের স্মৃতী। এমন ভাল বন্ধু জীবনে খুব একটা পায়নি। তবে যা পেয়েছি তাই বা কয়জনের জীবনে জুটে? মোহাম্মদ উল্লাহ ভাই এবং আমীন ভাইকে বন্ধু হিসাবে পেয়ে আমি যে অনেক লাভবান হয়েছি তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। এমন মানুষদের বন্ধু হিসাবে পাওয়াটা আসাধারন ভাগ্যের ব্যাপার। লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে হয়ত এমন একজন বন্ধু আজীবনও জুটেনি। জীবনে বাঁচার লক্ষ্যে সম্পদের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু মহৎ কোন প্রেরণা নিয়ে বাঁচতে হলে এমন বন্ধুর গুরুত্ব কি কম?



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Sunday, 22 August 2010 11:14
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.