Home সাহিত্য ও বুক রিভিউ ভালো বই না লেখা ও না পড়ার বিপদ
ভালো বই না লেখা ও না পড়ার বিপদ PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 23 September 2012 15:37

মানব যেভাবে পশু হয়

মানব জীবনের মূল সাফল্যটি দেহ নিয়ে বাঁচায় নয়,বরং মানুষ রূপে বেড়ে উঠায়। কিন্তু মানুষ রূপে বেড়ে উঠার সে কাজটি স্রেফ পানাহারে চলে না। বহু পশু মানুষের চেয়ে বেশী পানাহার করে,কিন্তু তাতে তাদের পরিচয় পাল্টায় না।আজীবন তারা ইতর পশুই থেকে যায়। মানবিক পরিচয় লাভের জন্য অতি অপরিহার্য হলো জ্ঞান। যার মধ্যে সে জ্ঞান নাই সে ব্যক্তি দেখতে মানবের মত হলেও আসলে পশু। তখন বিপন্ন হয় তার মানব রূপে বেড়ে উঠা। তখন পুরাপুরি ব্যর্থ হয়ে যায় মহান আল্লাহর মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যটি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা এমন মানুষকে শুধু পশুই বলেন নাই,বরং পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। কোরআনের ভাষায় “উলায়েকা কা’আল আনয়াম বালহুম আদাল” অর্থঃ তারাই হলো পশুবৎ বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। মহান আল্লাহতায়ালার এ উক্তিটি যে কতটা নিখূঁত ও নির্ভূল সে প্রমাণ কি কম? সাম্রাজ্যবাদ,উপনিবেশবাদ ও ইথনিক ক্লিনজিং –এরূপ ইতর কর্মগুলো পশুদের সৃষ্ট নয়,সেগুলি তো মানবসৃষ্ট। যুদ্ধ বাধিয়ে স্বজাতির কোটি কোটি প্রাণীকে হত্যা করা পশু সংস্কৃতি নয়,সেটিও মানব সংস্কৃতি। পশু দুর্বৃত্তিতে ব্শ্বি রেকর্ড গড়ে না,কিন্ত এমন মানুষরা বার বার গড়ে। পশুরা ক্ষুধা না লাগলে শিকারও ধরে না। কিন্তু এ পশুরা ভরাপেট নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লুট করে।

 

 

যে সমাজে জ্ঞানচর্চা নেই সে সমাজে মানুষ রূপে বেড়ে উঠার চেয়ে পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট হওয়ার আয়োজনটাই বেশী। তখন সে রাষ্ট্র জঙ্গলের চেয়েও নিরাপত্তাশূণ্য এবং সন্ত্রাসপূর্ণ হয়। বাংলাদেশের মত দেশে এজন্যই যত মানুষ বনজঙ্গলে মারা যায় তারা চেয়ে বহু হাজার গুণ বেশী মারা যায় রাজপথে ও লোকালয়ে। বনজঙ্গলের চেয়েও জনগণ বেশী লুন্ঠনের শিকার হয় সরকারি অফিস-আদালতে। আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ এ মানব সৃষ্ঠি এভাবে পশুর ন্যায় ইতর জীবে পরিণত হোক সেটি মহান আল্লাহর কাম্য নয়। তিনি তো তাদের দিয়ে জান্নাত পূর্ণ করতে চান। তাই তাদেরকে মানুষ রূপে বেড়ে উঠাটি নিশ্চিত করতে মহান আল্লাহতায়ালা শুধু নানা রূপ খাদ্য ও পানীয়র ব্যবস্থাই করেননি,বরং জ্ঞানলাভেরও ব্যবস্থা করেছেন। নামায-রোযা,হজ-যাকাত ফরয করার আগে জ্ঞানার্জনকে ফরয করেছেন। এবং মানুষের কাছে জ্ঞান বিতরণের মাধ্যম রূপে তিনি বেছে নিয়েছেন বই। এবং সে বইকে মানুষের কাছে পৌছানোর কাজে নিয়োজিত করেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠ ফিরেশতা জিবরাইল (আঃ) এবং শ্রেষ্ঠ রাসূলদের। পবিত্র কোরআন হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তেমনি এক বই। সমগ্র মানব জগতে এটাই শ্রেষ্ঠ বই। তবে পবিত্র কোরআনই মহান আল্লাহতায়ালার একমাত্র বই নয়,কোরআন প্রেরণের আগে তিনি তাওরাত,জব্বুর,ইঞ্জিল পাঠিয়েছেন। এই বইগুলির মাধ্যমেই মানব জাতি মহান আল্লাহতায়ালার পথনির্দেশনা পেয়েছে এবং বেড়ে উঠেছে মহামানব রূপে। খাদ্য তো পশুপাখি,গাছপালা ও কীটপতঙ্গের ন্যায় ইতর জীবেরাও পায়। কিন্তু মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত হলো এই বই। এ নেয়ামত ছাড়া সত্যপথ পাওয়া যেমন অসম্ভব,তেমনি অসম্ভব প্রকৃত মানুষ রূপে বেড়ে উঠা। এ জীবনে তখন বাঁচাটাই পুরাপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়। বরং ডেকে আনে জাহান্নামের আযাব।

 

আল্লাহর সূন্নত

বই লেখা,বইয়ের প্রকাশ ও প্রচার কোন মামূলী কাজ নয়। জ্ঞানের প্রচারে বইয়ের সাহায্য নেয়া মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সূন্নত। আরবী ভাষায় সূন্নত বলতে যা বুঝায় তা হলো norm, custom,tradition,practice,convention,rule ইত্যাদী।(সূত্র:আরবী অভিধান:আল -মাওয়ারীদ)। আল্লাহতায়ালার এ মহান সূন্নত পালন করেছেন নবী-রাসূল ও তাঁদের সাহাবাগণ। সে সূন্নত পালনে প্রাথমিক যুগের মুসলমানগণ এতটাই নিষ্ঠাবান ছিলেন যে অতি স্বল্প সময়ে তারা আরবী ভাষায় গড়ে তুলেছেন তৎকালীন বিশ্বে সবচেয়ে বেশী বই। ফলে গড়ে উঠেছে জ্ঞানের বিশাল সমূদ্র। জ্ঞানের ভূবনে এত দ্রুত বিপ্লব আনার নজির সমগ্র মানব ইতিহাসে নাই। নবীজী (সাঃ)র আগে আরবী ভাষায় একখানি বইও ছিল না। পবিত্র কোরআনই হলো আরবী ভাষায় প্রথম বই। কোরআনের আগে যা ছিল তা হলো কবিতা। আরবের মানুষ তা মুখস্থ করতো,এবং সেগুলো তাদের মুখে মুখে ফিরতো। কিছু কবিতাকে কাপড়ের বা চামড়ার উপর লিখে তারা কা’বার গায়ে তা লটকিয়ে দিত। আরবী ভাষায় এগুলোকে বলা হত মোয়াল্লাকা তথা ঝুলন্ত কবিতা। আরবের লোকরা মক্কা জিয়ারতে এসে সেগুলো পাঠ করতো এবং নিজ নিজ এলাকায় ছড়িয়ে দিত।

 

মুসলমানদের আজকের পরাজয়ের মূল কারণ এই নয় যে,তাদের জনসংখ্যা বা সম্পদ কম। এও নয় যে তারা চাল-ডাল-মাছ-বস্ত্র উৎপাদনে পিছিয়ে আছে। বরং পরাজয়ের মূল কারণটি হলো,তারা পরিহার করেছে মহান রাব্বুল আ’’লামীনের সূন্নত্। মুসলমান হওয়ার দায়ভার হলো,সে শুধু রাসূল (সাঃ)র সুন্নতই পালন করবে না,মহান আল্লাহর সূন্নতও পালন করবে। মহান আল্লাহর সে সূন্নতটি হলো মানুষের কাছে তাঁর কিতাব পৌছে দেয়া। এবং সে কিতাবের সাহায্যে মানুষকে জান্নাতের পথে ডাকা। সে ডাকার প্রয়োজনে তিনি যেমন লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন,তেমনি সে লক্ষ্যে কিতাবকেও কাজে লাগিয়েছেন। কিতাব নাযিলের সাথে পবিত্র কোরআনের সর্বপ্রথম আয়াতটিতে যে নির্দেশটি দিয়েছেন সেটি “ইকরা” অর্থাৎ পড়ার। বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। আজকের মুসলমান থেকে নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণের পার্থক্য অনেক। তবে হযরত ইমাম হাসান বিন আলী (রাঃ)এর মতে মূল পার্থক্যটি হলো,সাহাবাগণ পবিত্র কোরআনকে তাদের প্রতি মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত চিঠি বলে মনে করতেন। ফলে কোরআনের প্রতিটি নির্দেশকে তারা শুধু গভীর মনযোগে তেলাওয়াতই করতেন না,সেগুলো নিজ জীবনে পালন পূর্ণাঙ্গ ভাবে পালন করাকে নিজ জীবনের মূল এজেণ্ডা মনে করতেন। ফলে সেগুলো পালনে তারা সামান্যত গাফলতি দেখাননি। কি জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে,কি নামায-রোযার ক্ষেত্রে,কি জিহাদের ক্ষেত্রে -সর্বক্ষেত্রে তাঁরা দ্রুত এগিয়ে গেছেন। কিন্তু আজকের মুসলমানদের মধ্যে সে চেতনাটা নাই। পবিত্র কোরআনের প্রতি সেরূপ আচরণও নাই। দেশের স্বৈরাচারি শাসক,আদালত বা পুলিশের পক্ষ থেকে লেখা চিঠির প্রতিটি লাইনের পাঠ উদ্ধারে ও তার নির্দেশ পালনে কোন মুসলিম নাগরিক কি কখনো অনাগ্রহ বা তাচ্ছিল্য দেখায়? বরং সে চিঠির প্রতিটি শব্দ বুঝার জন্য এমন কি মুর্খ ব্যক্তিটিও দ্বারে দ্বারে ফেরে। এবং সে চিঠির প্রতিটি নির্দেশ অতি গুরুত্ব দিয়ে পালন করে। কিন্তু সে আগ্রহ কি তার প্রতি লেখা মহান আল্লাহর ব্যক্তিগত চিঠির অর্থ উদ্ধার ও তার নির্দেশ পালনে আছে? বাংলাদেশের মত একটি দেশে শতকরা ক’জন মুসলমান এমন আছে যারা পবিত্র কোরআনের প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত জীবনে অন্ততঃ একবার অর্থসহ পাঠ করেছে? আল্লাহর কাছে তারা ফিরে যাচ্ছে তাঁর প্রেরীত যে চিঠি অর্থসহ একবার না পড়েই! নবীজী (সাঃ)র যুগে কি এটি ভাবা যেত? এ প্রশ্ন তো উঠবেই, “তোমাদের কাছে কি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত পয়গাম পৌছেনি? তখন জবাবটি কি হবে? অর্থ উদ্ধারেই যেখানে এত ব্যর্থতা,সে নির্দেশ পালনে সফলতা আসবে কীরূপে? অথচ মানব জীবনের সকল সফলতা এবং পরকালে জান্নাতপ্রাপ্তি নির্ভর করে মহান আল্লাহর এ কিতাবের অর্থউদ্ধার ও সেটি পালনের উপর।

 

ব্যর্থতা যেখানে ভয়ানক

“ইকরা” তথা “পড়ো” হলো পবিত্র কোরআনের প্রথম শব্দ। পব্ত্রি কোরআন শুধু নবীর উদ্দেশ্যে নয়,বরং এ কিতাব তো সমগ্র মানব জাতির উদ্দেশ্যে। ফলে সমগ্র মানব জাতির উদ্দেশ্যে “পাঠ করো” -এটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার প্রথম নির্দেশ। অথচ পড়ার সে নির্দেশটিও মুসলমানদের দ্বারা যথার্থ ভাবে পালিত হয়নি। বই না পড়া এবং বই না লেখার কারণে জ্ঞানের রাজ্যে বেড়েছে ভয়ানক অপুষ্টি।বেড়েছে ভ্রষ্টতা। আর এতবড় অপুষ্টি ও পথভ্রষ্টতা নিয়ে কি কোন জাতি সুস্থ্যতা পায়? পায় কি নিজ পায়ে দাঁড়ানোর বল? বই না পড়ার ভয়ানক বিপদ তো এখানেই। এ বিপদ থেকে মুসলমানদের বাঁচানোর জন্যই মহান আল্লাহতায়ালা জ্ঞানার্জনকে ফরয করেছেন। কারণ জ্ঞানী না হলে তো আল্লাহর ভয় আসে না। আল্লাহভীতি সৃষ্টির জন্য জ্ঞান যে কতটা অপরিহার্য সে বর্ননা এসেছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে,“আল্লাহর বান্দাহদের মাঝে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে ভয় করে” –(সুরা ফাতির, আয়াত ২৮)। আর জ্ঞান তো খাবারের প্লেটে আসে না। আসে বইয়ের পাতায়।কিন্তু মুসলমানদের বড় গুনাহ এবং সে সাথে আল্লাহর বিরুদ্ধে বড় অবাধ্যতা হলো,তাদের দ্বারা সে ফরজটিই যথার্থ ভাবে আদায় হয়নি। আর আল্লাহর আযাবের জন্য কি এ অবাধ্যতাটিই যথেষ্ঠ নয়?

 

বই লেখা এবং বই পড়ার ক্ষেত্রে এমনকি কাফেরদের থেকেও মুসলমানগণ পিছিয়ে পড়েছে। একটি দেশে কি পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন হয় তা থেকেই বুঝা যায় সে দেশের মানুষ কি পরিমাণ খায়। তেমনি বই লেখা বা বইয়ের প্রকাশ থেকেই ধারণা করা যায় সে দেশের মানুষ কতটা বই পড়ে। সাড়ে পাঁচ কোটি ব্রিটিশ জনগণ প্রতি বছর যে পরিমান বই লেখে বা প্রকাশ করে বিশ্বের প্রায় ১৫০ কোটি মুসলমান তার সিকি ভাগও লেখে না বা প্রকাশ করে না। প্রায় এক দশক আগে ইউএনডিপি’র এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল,গ্রীসের মত একটি মাত্র দেশে প্রতি বছর যে পরিমান বই প্রকাশিত হয় সমগ্র আরব বিশ্বেও সে পরিমান বই লেখা হয় না। তাছাড়া যা লেখা হয় বা পড়া হয় তার কত ভাগ ইসলামি বই? বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে যা পড়া হয় সেগুলোর অধিকাংশই কোন ইসলামি বই নয়,বরং সেগুলো কাফের,ফাসেক ও পথভ্রষ্টদের লেখা বই। এসব বই মানুষের মাঝে শুধু ভ্রষ্টতাই বাড়াতে পারে,ঈমানদারি নয়। খাদ্যের নামে বিষপানে স্বাস্থ্য বাঁচে না। তেমনি জ্ঞানার্জনের নামে পথভ্রষ্ট কাফেরদের বই পাঠে ঈমান বাঁচে না। তাই মুসলমানদের খাদ্যপানীয় যেমন কাফেরদের থেকে ভিন্ন,তেমনি ভিন্ন হলো তাদের জ্ঞানের সামগ্রী। হারাম খাদ্য গ্রহণে আল্লাহর বিরুদ্ধে যেমন বিদ্রোহ হয়,তেমনি বিদ্রোহ হয় কাফেরের লেখা বই থেকে নির্দেশনা গ্রহণেও। কাফের বা ইসলামে বিশ্বাসহীন লোকদের থেকে চাল-ডাল কেনা যায়,তাদের নির্মিত গাড়ীতে বা বিমানেও চড়া যায়। অংক,বিজ্ঞান,কৃষি বা চিকিৎসা শাস্ত্রও শেখা যায়। কিন্তু তাদের থেকে হেদায়েত বা জীবনে চলার পথে পথনির্দেশনা নেয়া যায় না।হেদায়েত দানের দায়িত্ব একমাত্র আল্লাহর। এতবড় গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আল্লাহপাক অন্যের উপর ছেড়ে দেননি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা সেটি সুস্পষ্ট করেছেন এভাবে,“ইন্না আলায়নাল হুদা” অর্থঃ পথ দেখানোর দায়িত্ব আমার। -(সুরা লাইল, আয়াত ১২)। এজন্যই নাযিল হয়েছে পবিত্র কোরআন,এবং সে কোরআনী পথকে মানুষের কাছে তুলে ধরাই নবীজী(সাঃ)র মিশন। মুসলমানের দায়িত্ব হলো সে হেদায়েতের পূর্ণ অনুসরণ। অথচ মুসলমানদের জীবনে এখানেই ঘটেছে সবচেয়ে ভয়ানক ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার বিপদ দুর্ভিক্ষে মারা যাওয়ার চেয়েও ভয়ানক। কারণ খাদ্যাভাবে মারা গেলে জাহান্নাম জুটে না। কিন্তু জ্ঞানের অভাবে ভ্রষ্টতা নিয়ে মারা গেলে সেটিই অনিবার্য হয়। অথচ মুসলিম বিশ্বে সে ভ্রষ্টতাই ব্যাপক ভাবে বেড়েছে। পবিত্র কোরআন পরিণত হয়েছে নিছক তেলাওয়াতের কিতাবে,আর হেদায়েত নেয়া শুরু হয়েছে কাফেরদের থেকে।ফলে মুসলিম দেশে বেড়েছে সেক্যুলারিস্ট,ন্যাশনালিস্ট বা সোসালিস্টদের সংখ্যা। ভক্ত বেড়েছে মার্কস, মাও,লেনিন,রবীন্দ্রনাথ,এমনকি প্রতিবেশী শত্রু রাষ্ট্রের।

 

কোনটি খাদ্য আর কোনটি অখাদ্য সেটি বুঝার জন্যও ন্যূনতম জ্ঞান লাগে। শিশুর সেটি থাকে না বলে সে বিষ্ঠা বা বর্জ্যও মুখে তুলে। সব খাদ্যই যেমন সুখাদ্য নয়,তেমনি সকল বই-ই ভাল বই নয়। আল্লাহতায়ালা যেমন বইকে হিদায়েত দানের মাধ্যম রূপে বেছে নিয়েছেন,তেমনি শয়তান এবং তারা অনুসারিরা এটিকে বেছে নিয়েছে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার হাতিয়ার রূপে। বইপাঠের নামে শয়তানের সৃষ্ঠ আবর্জনা পাঠ হলে বিবেকের মৃত্যু বা ভ্রষ্টতা অনিবার্য। বিবেকের এমন মৃত্যু ও ভ্রষ্টতা নিয়ে পবিত্র কোরআনের গুরুত্ব অনুধাবনও তখন অসম্ভব হয়ে পড়ে।কথা হলো,বাংলাদেশে লেখক,বুদ্ধিজীবী ও কবি-সাহিত্যিকের নামে বিষ-ব্যবসায়ীর সংখ্যা কি কম? মুসলমানের দায়িত্ব শুধু বিষাক্ত শাপগুলো চেনা নয়,বরং গুরুতর দায়িত্ব হলো এসব বিষ-ব্যবসায়ীদেরও চেনা। এরাই শয়তানের একনিষ্ঠ সৈনিক। এরূপ অসংখ্য বিষ-ব্যবসায়ীদের মাঝে বিবেক বাঁচাতে হলে কোনটি ভাল বই সেটি চেনার মত কাণ্ডজ্ঞানও থাকতে হবে।

 

ক্ষুদার্ত মানুষ ক্ষুধা মেটাতে আবর্জনাও মুখে তুলে। তেমনি জ্ঞানের রাজ্যে ক্ষুধা মিটাতে বহু বুভুক্ষ মুসলমান বই পড়ার নামে প্রচুর আবর্জনা গিলছে। ফলে বাড়ছে নৈতিক মহামারি। ফলে অসম্ভব হয়ে পড়েছে তাদের মুসলমান রূপে বেড়ে উঠা। অজ্ঞতা নিয়ে যেখানে মানুষ রূপে বেড়ে উঠাই অসম্ভব,সেখানে মুসলমান হওয়া যায় কি করে? তখন তো বাড়ে দুর্বৃত্তি,বাড়ে সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে ভ্রষ্টতা। বাংলাদেশের মত শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ দুর্বৃত্তিতে বার বার বিশ্বে প্রথম স্থানটি অধিকার করছে তো সেকারণেই।অথচ এটি কি কোন মুসলমানের কাজ হতে পারে? মুসলমান রূপে বেড়ে উঠায় বাঙালী মুসলমানের যে কতটা অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে?

 

সাহিত্যিকের দুর্বৃত্তি

মারনাস্ত্র যদি চোর-ডাকাত-সন্ত্রাসীদের হাতে পড়ে তবে সেদেশে শান্তি বিপন্ন হয়। তেমনি বই যখন শয়তানের হাতিয়ারে পরিণত হয় তখন সত্যপথ প্রান্তি সে দেশে অতি কঠিন হয়ে পড়ে। শয়তান মুসলমানদের সরাসরি আল্লাহকে অস্বীকার করতে বলে না,বরং কৌশল নেয় তাদের মন থেকে আল্লাহর স্মরণকে ভূলিয়ে দিতে। সনাতন যুগে আল্লাহকে ভূলিয়ে দেয়ার কাজে শয়তান মানুষের সামনে অসংখ্য দেব­-দেবীর হাজির করতো। আধুনিক যুগে সে লক্ষ্যে প্রধান হাতিয়ার হলো বই,নাচ-গান,অশ্লিল সিনেমা,খেলাধুলা ইত্যাদি। চোর-ডাকাতেরা মানুষের অর্থ লুট করে। আর দুর্বৃত্ত সাহিত্যিকেরা শুধু পাঠকের অর্থই লুট করে না,তাদের জীবন থেকে মহামূল্যবান সময়ও চুরি করে। এখানেই কবি-সাহিত্যিকের দুর্বৃত্তি। চোরডাকাতদের চেয়েও এটি ক্ষতিকর। কারণ চোরডাকাত শুধু অর্থ চুরি করে,আর এরা চুরি করে মহামূল্যান সময়। চোর ডাকাত সত্যচ্যুৎ করে না,অথচ এরা করে। জাহিলী যুগে আরবে ইমরুল কায়েসের মত প্রতিভাবান অনেক কবি ছিল। তাদের কবিতাগুলি আরবের মানুষের মুখে মুখে ফিরতো। গৃহে,জনপদে,হাটেবাজারে সেসব কবিতা পাঠের বড় বড় জলসা বসতো। কিন্তু তাতে লাভ হয়েছে কতটুকু? মানুষ তাদের কবিতা থেকে যৌনতা,অশ্লিলতা,পাশবিকতা,যুদ্ধ-বিগ্রহ ও গোত্রীয় অহংকার প্রকাশে প্রচুর উৎসাহ পেত। কিন্তু তাতে কি কোন উন্নত বিবেকবোধ,রচীবোধ,মূল্যবোধ ও সভ্যতা গড়ে উঠেছে? মুক্তি মিলেছে কি মুর্তিপুজার ন্যায় আদিম অজ্ঞতা থেকে? বরং সমগ্র আরব ডুবেছিল অবিচার,মিথ্যাচার,বিভ্যাচার,জুয়া,মদ্যপান,রাহজানি,শিশুহত্যা,দাসপ্রথা,গোত্রীয় বিবাদ ও যুদ্ধবিগ্রহে। যৌনতা,ভোগলিপ্সা ও গোত্রীয় অহংকারে সুরসুরি দেয়ার সামর্থ এসব কবিতার ছিল। কিন্তু উন্নত চিন্তা ও চরিত্র গড়ার সামর্থও কি ছিল? এরূপ ইমরুল কায়েস যদি কয়েক শতও জন্ম নিত তবুও কি লাভ হত?

 

আগাছার বৃদ্ধিতে ফসল বাড়ে না। তেমনি বইয়ের নামে আবর্জনা রচিত হলে তাতে দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধি আসে না। বই যেমন হেদায়েতের বাহন,তেমনি পথভ্রষ্টতারও কারণ। যে দেশ দুর্বৃত্তিতে বার বার বিশ্বরেকর্ড গড়ে,হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লুট হয়,ঘুষ ছাড়া যেদেশে কোন কাজ হয় না –সে দেশে হেদায়েতের কাজে বইপত্র যে কাজ দেয়নি সেটি কি বুঝতে বাঁকি থাকে? বই রচনার লক্ষ্য যখন বিনোদন বাড়ানো তথা সাহিত্যের খাতিরে সাহিত্য, তখন সে সাহিত্য থেকে পথনির্দেশনা বা হেদায়াত লাভ কি সম্ভব? এমন সাহিত্যে যে বিপুল কাগজ-কালি খরচ হয় তা নয়,সেগুলি লিখতে ও পড়তে অসংখ্যমানুষের কোটি কোটি ঘন্টাও বিনষ্ট হয়।

 

বাংলায় রবীন্দ্রনাথের ন্যায় নোবেল বিজয়ী কবির জন্ম হয়েছে। শরৎচন্দ্র, বঙ্গিমচন্দ্র,সুনীল গাঙ্গোপাধ্যায়,হুমায়ুন আহমেদের ন্যায় বহু উপন্যাসিকও জন্ম নিয়েছে। তাদের সাহিত্য চর্চা যেমন প্রচুর,সে সাহিত্যের পাঠকও প্রচুর। এদের নিয়ে বাঙালীর অহংকারও অনেক। আধুনিক এ যুগকে তারা চিত্রিত করে বাঙালীর রেনেসাঁ যুগ বলে।এসব সাহিত্যে প্রচুর সাহিত্যরস আছে। বিনোদনের উপকরণও আছে। কিন্তু তাতে কি কোন দিক নির্দেশনা আছে? এ সাহিত্য উন্নত মানুষ রূপে বেড়ে উঠার জন্য জোগায় কি নৈতীক পুষ্টি? কেউ চলার খাতিরে পথ চলে না,বলার খাতিরে কথা বলে না বা কিছু খাওয়ার খাতিরেও খায় না। সব কিছুর মাঝেই সুনির্দ্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে।যে পথ সুনির্দ্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে পৌছায় না সে পথে চলা কি অনর্থক নয়? খাদ্যকে শুধু মুখরোচক হলে চলে না,পুষ্টিও জোগাতে হয়। তেমনি সাহিত্যের কাজ শুধু বিনোদন বাড়ানো নয়, পাঠকের মনে পুষ্টিও বাড়াতে হয়। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের এসব দিকপালদের কারণে বাঙালীর মানবিক গুণ কতটা বেড়েছে? বেড়েছে কি নৈতীক মান? অথচ যতই বেড়েছে এরূপ সাহিত্যিকের সংখ্যা,ততই বেড়ে চলেছে বাঙালীর বেইজ্জতি। বাংলা সাহিত্যের এ রমরমার যুগেই অর্জিত হয়েছে বাঙালীর হাজারো বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে লজ্জাজনক অপমান। সেটি যেমন ভিক্ষুকের তলাহীন ঝুড়ির,তেমনি বিশ্বের সবচেয়ে দূর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের।

 

পরীক্ষায় বসে বিনোদন?

মানুষের আয়ু সামান্য। কিন্তু তার পরীক্ষা বিশাল। সে পরীক্ষায় পাশের উপর এ পার্থিব জীবনে চাকুরিলাভ বা রুটি রুজী নির্ভর করে তা নয়। বরং নির্ভর করে অনন্ত-অসীম জীবনের সুখ শান্তির বিষয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“তিনি (আল্লাহতায়ালা)মৃত্যু ও জীবনকে সৃষ্টি করেছেন এজন্য যে তিনি পরীক্ষা করবেন তোমাদের মধ্যে আমলে কে শ্রেষ্ঠতম।” –(সুরা মূলক, আয়াত ২)। অর্থাৎ দুনিয়ার এ জীবনটি পরীক্ষাগার। কোন শিশুও তার স্কুলের পরীক্ষার হলে বসে অন্য মনস্ক হয় না,নষ্ট করে না পরীক্ষার সামান্যতম সময়। তাই প্রশ্ন হলো,এ পার্থিব জীবনে মহান আল্লাহর যে অতি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সেখানে বসে কি অর্থহীন বিনোদন বা আলোচনা চলে? সাহিত্যের খাতিরে যারা সাহিত্য চর্চা করে,পরকালীন কল্যাণ চিন্তুা যাদের সাহিত্যে অনুপস্থিত -তাদের নাশকতা এখানেই। হিরোইন যেমন মানুষকে ভাবনাশুণ্য করে এবং অবসন্ন করে মন ও চেতনা,এসব সাহিত্যিকেরাও তেমনি মানুষকে আখেরাতকে ভুলিয়ে দেয়। তাদের সাহিত্য এখানে আফিম বা হিরোহিনের কাজ দেয়। এভাবে কেড়ে নেয় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ। মানুষকে এভাবে ভূলিয়ে রাখা শয়তানের সনাতন কৌশল। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনের ঘোষণা,“শয়তান তাদের কার্যবলী তাদের নিকট শোভন করেছে এবং তাদেরকে সৎপথ চলা থেকে ফিরিয়ে দিয়েছে, ফলে তারা সৎপথ পায় না। -(সুরা নামল, আয়াত ২৪)।

 

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মানুষের যে দুটি দোষ অতি অপছন্দের তা হলো মিথ্যা কথন এবং অপ্রয়োজনীয় আলোচনা। জান্নাতবাসীদের মাঝে এ দুটি খাসলতকে আল্লাহপাক অসম্ভব করে দিবেন। তাই তিনি পবিত্র কোরআনে বলেছেন,“তারা সেখানে (জান্নাতে)অপ্রয়োজনীয় আলোচনা এবং মিথ্যাকথা শুনতে পাবে না”। -(সুরা নাবা,আয়াত ৩৫)। অর্থাৎ জান্নাতে সবকিছু্ই হবে অর্থবহ। আর আল্লাহর যা জান্নাতে অপছন্দনীয় তা দুনিয়ায় পছন্দনীয় হয় কি করে? মু’মিনের দায়িত্ব তো জান্নাতের সংস্কৃতিকে দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠা করা। জান্নাত প্রাপ্তির জন্যও মু’মিনকে তাই সর্বপ্রকার অপ্রয়োজনীয় কথা পরিহার করতে হয়। মুসলিম শরিফের হাদীসঃ নবীজী (সাঃ) বলেছেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য তিনটি বিষয় খুবই পছন্দ করেন এবং তিনটি বিষয় খুবই অপছন্দ করেন। যে তিনটি বিষয় পছন্দ করেন তা হলোঃ এক).তোমরা একমাত্র আল্লাহকেই ইবাদত করবে। দুই), ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে আর কাউকে শরীক করবে না, তিন). আল্লাহর রশি তথা কোরআনকে তোমরা সবাই একসাথে আঁকড়ে ধরবে এবং পরস্পরে বিভক্ত হবে না। আর যে তিনটি বিষয় অপছন্দ করেন তা হলো, এক). অপ্রয়োজনীয় কথা বলবে না,দুই).লাগাতর প্রশ্ন করবে না, তিন).সম্পদের অপচয় করবে না।

 

মুসলমানগণ যখন মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল তখন কল্পনের জগতে লাগামহীন কেচ্ছা­-কাহিনীর জাল বুনে বিশাল বিশাল উপন্যাস লেখা হয়নি। সে সভ্যতার নির্মাণে রবীন্দ্র নাথের ন্যায় কবিতা,উপন্যাস বা ছোটগল্পের লেখকের প্রয়োজন পড়েনি। বরং গড়েছিল এমন অসংখ্য সৃষ্টিশীল মানুষ যারা নিজেরাই শুধু জান্নাতের পথ পাননি,বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকেও সে পথ দেখিয়েছিলেন। তাদের সে মেহনতের বলেই জান্নাতের পথের সন্ধান পেয়েছিল বাংলা,বিহার,আসামসহ হাজার হাজার মাইল দূরের অসংখ্য মানুষ। কিন্তু শয়তানের অনুসারিদের হাতে যখন কলম ও কালি যায় তখন তারা মিথ্যা ও অপ্রয়োজনীয় কাহিনীর বিশাল জাল বুনতে থাকে। আর সে জালে আটকা পড়ে দেশের সাধারণ মানুষ। বিনষ্ট তাদের বিপুল সময়। মানুষের শ্রেষ্ঠ যোগ্যতা কবিতা লেখা বা উপন্যাস লেখা নয়,বৈজ্ঞানিক আবিস্কারও নয়। বরং সেটি হলো সত্য খুঁজে পাওয়া এবং সে সত্য অনুসরণের সামর্থ অর্জন করা। লেখনি যখন সে সত্য খোঁজার কাজে বাহন হয় তখন সে লেখনির বদৌলতে শুধু সুন্দর মনের মানুষই গড়ে উঠে না,উন্নত সভ্যতাও গড়ে উঠে। এমন লেখকের চিন্তা-ভাবনার ািবসাথে তার কলমের কালির মর্যাদাও বিশাল। জিহাদের ময়দানে মোজাহিদের তরবারি শয়তানের বাহিনীকে দৈহীক ভাবে নির্মূল করে। সে জিহাদের পাশাপাশি আরেকটি অবিরাম জিহাদ চলে চেতনার মানচিত্রে। সে জিহাদে শয়তানি শক্তিকে পরাজিত করে জ্ঞানীর কলমের কালি। অথচ বাংলাদেশের মত বহুদেশেই সে জিহাদটি হয়নি। বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানটি এখানে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত। বাংলা সাহিত্যের ময়দানে রবীন্দ্রনাথ ও হুমায়ুন আহমদদের সংখ্যা যেমন বেড়েছে,তেমনি বাঙালীর চেতনায় আবর্জনাও বেড়েছে। তাদের সাহিত্যের বিশাল স্তুপ সত্যকে প্রকাশ না করে বরং সত্যকে গোপন করে দিয়েছে,আগাছার ভিড় যেমন গাছকে আড়াল করে দেয়। ফলে রবীন্দ্রনাথ ও হুমায়ন আহম্মদের লেখনীর মাঝে যারা ডুবেছে তাদের পক্ষে সত্য খুঁঝে পাওয়াও কঠিন হয়েছে। এমন সাহিত্যের ছড়াছড়িই দেশকে বিশ্বমাঝে দুর্নীতিতে শীর্ষস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।

 

শত্রুপক্ষের হাতিয়ার

মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ঘরবাড়ি অর্থ বা সোনারূপা নয়। বরং তার সময়। মৃত্যুর ঘন্টা বেজে উঠলে হিমালয় সমান স্বর্ণ দিয়ে একঘন্টা কেন এক মিনিট সময়ও কেনা যায় না। আর পার্থিব জীবনটি হলো পরীক্ষার হল। সে সত্যটি মহান আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে বহু বার উল্লেখ করেছেন। পরীক্ষার হলে প্রতিটি মুহুর্তের হিসাব হয়। প্রতি মুহুর্তের প্রতিটি কর্মের উপর নজরদারি এখানে মহান আল্লাহর। নজরদারির সে কাজে প্রতিটি মানুষের ঘাড়ে ফিরিশতা বসে আছেন। পরীক্ষার হলে বসে কি তাই খেলা বা নাটক দেখা যায়? পড়া যায় কি বিনোদনমূলক উপন্যাস? বিনোদান দান যখন সাহিত্যিকের মূল লক্ষ্য হয় তখন সে সাহিত্যে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের কোন কল্যাণটি হয়? এমন রবীন্দ্রনাথ বা হুমায়ুন আহম্মদ শত শত জন্ম নিলেও কি বাংলার মানুষের কোন কল্যাণ হতো? বরং তাদের সাহিত্য পাঠের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষের জীবন থেকে মহামূল্যবান আরো বহু কোটি ঘন্টা লুন্ঠিত হতো। লুন্ঠিত মানুষের মাথার উপর ঘর বাঁধার পুঁজি থাকে না। তেমনি যে যুবকের হাজার হাজার ঘন্টা লুন্ঠিত হয় বিনোদন-মূলক সাহিত্য পাঠে তার জীবনে কোরআন হাদীস পাঠের জন্য কি আর কোন সময় বাঁকি থাকে? লুন্ঠিত এ যুবকের দুরাবস্থা দেখে তখন আনন্দ বাড়ে শয়তানের।বাংলাদেশে শয়তানী শক্তির এজন্যই প্রতিদিন উৎসব। আর দিন দিন দুর্দশা বাড়ছে ইসলামের পক্ষের শক্তির। সাহিত্য পরিণত হয়েছে শয়তানের শক্তিশালী হাতিয়ারে।

 

মুসলমানগণ যখন বিশ্বশক্তি রূপে আবির্ভূত হয়েছিল তখন তাঁরা খেলা দেখে বা বিনোদন মূলক সাহিত্য পড়ে সময় নষ্ট করেননি। তারা যেমন প্রচুর লিখেছেন,তেমনি প্রচুর পড়েছেনও। কিন্তু তাদের সে লেখা বা পড়ার মূল লক্ষ্যটি ছিল সিরাতুল মোস্তাকীমের পথে নিজেদের পথচলাটি নিশ্চিত করা। ফলে তাদের হাতে ব্যাপক ভাবে বেড়েছে কোরআন-হাদীসের জ্ঞান। বেড়ে উঠেছে বিশাল তাফসির ও ফিকাহ শাস্ত্র। ক্ষতিকর আগাছা শুধু ক্ষেতের জমিতেই জন্মে না,মানুষের মনেও জন্মে। বিনোদনমূলক সাহিত্য তেমনি আগাছা। গানবাজনার আসরে বসে মানুষ যেমন নামাযের কথা ভূলে যায়,তেমনি এ সাহিত্য-রসে মগ্ন হয়ে মানুষ ভূলে যায় আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত খেলাফতের দায়ভার। আর শয়তানতো সেটিই চায়। আর সে দায়ভার ভূলিয়ে দেয়ার কাজে শয়তানের খলিফা রূপে কাজ করে সাহিত্যিকগণ। সত্যের বীজ যত শক্তিশালীই হোক তা আগাছার জঙ্গলে জন্মে না,জন্মালেও তা বেড়ে উঠে না। তাই যে মনে রবীন্দ্র-সাহিত্য বা হুমায়ুনের সাহিত্যের আসক্তি সে মনে পবিত্র কোরআন থেকে জ্ঞান আহরণের আগ্রহ তেমন থাকে না। কারণ সাহিত্যের মাদকতা মদের মাদকতার চেয়ে কম নয়। ইসলামের জাগরণ রোধে সেক্যুলার শক্তির অন্যতম স্ট্রাটেজী তাই এমন সাহিত্যের জোয়ার। দেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও সংস্কৃতির উপর সেক্যেুলার এ পক্ষটি দখলদারি প্রতিষ্ঠা করেছে অনেক আগেই। এখন অধিকার জমাতে চায় জনগণের মনের ভূবনে। এবং সেটি সাহিত্যের মাধ্যমে। তাই রাষ্ট্রীয় খরচে বাড়ানো হচ্ছে রবীন্দ্র চর্চা।বাংলাদেশের মুসলমানদের সামনে তাই বড় দুর্দিন। এ ময়দানটির উপর তার দখলদারি জমিয়েছে কোন যুদ্ধ না লড়েই।

 

শ্রেষ্ঠ অলংকার

মাছি চরিত্রের মানুষমাত্রই আবর্জনা খোঁঝে। এটাই তাদের সংস্কৃতির মূল বৈশিষ্ঠ। এ সংস্কৃতির কারণে পতিতাপল্লি,অশ্লিলতা,গানবাজনা,নাচের ঘর,মদ্যশালাই শুধু সমাজে স্বীকৃতি পায় না,মার্কস,লেনিন,মাও,গান্ধি,রবীন্দ্রনাথ,মুজিবের ন্যায় ব্যক্তিগণও পুঁজনীয় হয়ে উঠে। কিন্তু ঈমানদার মানুষের সংস্কৃতিটাই ভিন্ন। ঈমানগণ শুধু ভাল খাবারের সন্ধানই করে না,ভাল বইয়েরও সন্ধান করে। মানুষ রূপে কে কতটা বিবেকবান ও রুচিশীল সেটি কারো প্রাসাদ,ধনদৌলত বা পোষাক-পরিচ্ছদ থেকে ধরা পড়ে না। সেক্যুলারদের কাছে নবীজী (সাঃ) ও তার সাহবাগণ এজন্যই মর্যাদা পান না। অথচ তারাই ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। মানুষের মর্যাদা ও মূল্যমানটি নির্ণীত হয় তার বইয়ের তথা জ্ঞানের সংগ্রহ থেকে। নবীজী(সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম যে কারণে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ছিলেন তার কারণ,তাঁদের হাতে ছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বই। আর সে বইয়ের রচিয়েতা ছিলেন মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহ। জীবনে সকল নির্দেশনা ও দর্শন পেতেন এ মহান কিতাব থেকে। যাদের সম্বল কার্ল মার্কস,রবীন্দ্রনাথ বা অন্য কোন ব্যক্তির বই তারা কি তাঁদের ধারে কাছেও পৌঁছতে পারে?

 

মুসলমানদের গৌরব কালে তাদের মাঝে ভাল বইয়ের তালাশ ও ভাল বই লেখার আগ্রহ যেমন প্রচণ্ড ছিল,তেমনি প্রচণ্ড ছিল তা থেকে শিক্ষা লাভের আগ্রহ। সে তীব্র আগ্রহের কারণে গৌরব যুগের মুসলমানগণ পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত শোনার জন্য বহু শত মাইল দূর থেকে নবীজীর কাছে এবং নবীজীর পর তাঁর সাহাবাদের কাছে ছুটে আসতেন। এবং কোরআনের সে আয়াতগুলো শুধু শুনতেনই না, সেগুলো এতবার পড়তেন যে তাতে তাদের সেগুলো মুখস্থ্য হয়ে যেত। এভাবে হাজার হাজার মানুষ সমগ্র কোরআনকে মুখস্থ্য করে ফেলতেন। সে সাথে মনের মূলে বদ্ধমূল করতেন নবীজী (সাঃ)র হাদীস। জীবনের প্রতি পদে সেগুলো তারা মেনে চলতেন। সেটি জীবনে ব্যক্তি জীবনে তেমনি রাষ্ট্রীয় জীবনে। অথচ আজকের মুসলমানগণ ভাল শাড়ি,ভাল গাড়ি বা ভাল গহনার জন্য শহরের শপিং সেন্টারগুলো তন্য তন্য করে খোঁঝে,এমন কি বিদেশেও পাড়ি দেয়। শহরের কোথায় সেগুলি পাওয়া সে খবরও ঘরে ঘরে। কিন্তু কোথায় ভাল বই পাওয়া যায়,এবং ভাল বই-ই বা কোন গুলো সে খবর ক’জনের? ফলে আজ স্বচ্ছল মুসলমানদের ঘরে ঘরে শাড়ী,গহনা বা আসবাবপত্রের স্তুপ গড়ে উঠলেও লাইব্রেরি গড়ে উঠছে না।

 

অথচ গৃহের সবচেয়ে মূল্যবান অলংকার হলো বই। একমাত্র ভাল বই মনের পুষ্টি জোগায় এবং জ্ঞানবান ভাল মানুষ হতে সাহায্য করে। গাড়ি,পোষাক-পরিচ্ছদ বা গহনা নয়। এবং একমাত্র জ্ঞানবান মানুষের পক্ষেই মুসলমান হওয়া সম্ভব,এবং অজ্ঞতায় সেটি অসম্ভব। যে গৃহে বই নাই,এবং সে বইয়ের পাঠক নাই -বুঝতে হবে সে বাড়ীতে ভাল মানুষ গড়ে উঠার সম্ভাবনাও নাই। তেমনি কোন দেশ কতটা উন্নত হবে সেটির পরিমাপে সেদেশের কলকারখানা বা রাস্তাঘাট গণনার প্রয়োজন নেই। সেটি সঠিক ভাবে জানা যায় সেদেশে কতটা ভাল বই বিক্রি হয় এবং সেসব বইয়ের পাঠক কতজন তা থেকে।কিন্তু সে হুশ ক’জনের? আর এরূপ বেহুশ অবস্থা নিয়ে মুসলমান কি কোন কল্যাণ আশা করতে পারে? ২৩/০৯/১২



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.