Home ইতিহাস ইসলামের শত্রুপক্ষের একাত্তরের অপরাধ
ইসলামের শত্রুপক্ষের একাত্তরের অপরাধ PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Wednesday, 01 January 2014 14:27

কারা শত্রুপক্ষ এবং কি তাদের এজেন্ডা?

ইসলাম কোন কালেই শত্রুমুক্ত ছিল না।নির্মূলকামী শত্রুপক্ষ যেমন নবীজী (সাঃ)র যুগে ছিল, তেমনি তাঁর পূর্বে এবং পরেও ছিল। সে শত্রুপক্ষটি বাংলাদেশে উনিশ শ’ সাতচল্লিশে যেমন ছিল, তেমনি একাত্তরেও ছিল। এবং আজও  আছে। বরং বাংলাদেশ তো তাদের হাতেই আজ অধিকৃত। একাত্তরে তাদের নাশকতা ছিল বিশাল। ইসলামের শত্রু তো তারাই যারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের বিজয় রুখতে চায়। যারা শক্তিহানি ঘটায় মুসলিম রাষ্ট্রের।এবং যারা নির্মূল চায় ইসলামপন্থিদের।ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে নাশকতায় যুগে যুগে এরাই মিত্রতা গড়েছে চিহ্নিত কাফেরশক্তির সাথে। ইসলামের এ শত্রুপক্ষটি ইসলাম ও ইসলামপন্থিদের নির্মূলটি যে শুধু মনে মনে কামনা করে বা তাদের কর্মকে কথা ও লেখার মধ্যে সীমিত রাখে -তা নয়। বরং ইসলাম ও ইসলামপন্থিদের নির্মূলে তারা সর্বপ্রকার শক্তি ও সামর্থের বিনিয়োগও করে। মুসলিম রাষ্ট্রের বিভক্তি ও বিধ্বংসে তারা যুদ্ধেও নামে। সেসব যুদ্ধে তারা সর্বজাতের কাফের, মুশরিক, ফাসেক ও নাস্তিকদের সাথে কোয়ালিশনও গড়ে। সে কোয়ালিশনটি যেমন নবীর যুগে ছিল, তেমনি সাতচল্লিশে ও একাত্তরেও ছিল। এবং আজও তা রয়েছে।

 

 

 

 

ইসলাম ও মুসলমানের এরূপ শত্রু হওয়ার জন্য ইহুদি, খৃষ্টান, মুর্তি পুজারি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সেটি মুসলমানের পুত্র,পীরের পুত্র, আলেমের পুত্র এমন কি নবীর পুত্রও হতে পারে। হযরত নুহ (আঃ)র ন্যায় মহান নবীর পুত্রও শত্রু শিবিরে যোগ দিয়েছিল। সে শত্রুতা নিয়ে সে পিতার আহবানকে অবজ্ঞা করেছিল এবং প্লাবনে ডুবে মরেছিল। বিরোধী শিবিরে যোগ দিয়েছিল হযরত লুত (আঃ)র স্ত্রী।এসব শত্রুদের চিনতে হবে তাদের বংশ পরিচয় বা পিতার পরিচয় থেকে নয়,বরং তাদের রাজনীতিতে ইসলামবিনাশী এজেন্ডা থেকে। মানব সৃষ্টিকে জাহান্নামে নেয়ার শয়তানী প্রচেষ্টা প্রথম দিন থেকেই। শুরুতেই শয়তান ঘিরে ধরেছিল হযরত আদম (আঃ)কে। নবী করীম (সাঃ) এর ন্যায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটি যখন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে ময়দানে নামেন, তাঁর নির্মুলেও সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল তৎকালীন আরব জগতের সকল শত্রুশক্তি। আজও  সেরূপ কোয়ালিশন কাজ করছে আফগানিস্তান, মিশর, সিরিয়াসহ প্রতিটি মুসলিম দেশে। একাত্তরের আগে ও পরে এবং আজ বাংলাদেশের বুকে সংঘটিত ইসলাম বিরোধী জোটের বীভৎস অপরাধগুলো বুঝতে হলে মানব ইতিহাসের এ ঘটনা গুলোকে অবশ্যই সামনে রাখতে হবে।কারণ প্রতিযুগে শত্রু শক্তি ভিন্ন নামে ও ভিন্ন পরিচয়ে ময়দানে নামলেও তাদের চেতনা ও এজেন্ডাটি অভিন্ন। আজকের বাঙালী জাহিলিয়াত আর নবীজী (সাঃ)র যুগের আরব জাহিলিয়াতের মধ্যে পার্থক্য তাই অতি সামান্যই। মানব সমাজে একই রূপ রোগজীবাণূ যেমন বার বার একই রূপ রোগ নিয়ে ফিরে আসে, শয়তানের সৃষ্ট নৈতীক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাধিগুলোও তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রে বার বার একই ধরনের বিপর্যয় নিয়ে আসে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাই ইতিহাসের এরূপ বহু ঘটনাকে বার বার তুলে ধরেছেন।

 

 

 

চিহ্নিত এ শত্রুশক্তিগুলি শুধু মুসলিম নামধারি বা ইসলামের লেবাসধারি হওয়াতেই ইসলামের মিত্র হয় না। হযরত ইমাম হোসেনকে যারা হত্যা করেছিল এবং তার লাশের উপর দিয়ে যারা ঘোড়া দাবড়িয়েছিল তারা কেউ মুর্তিপুজারি ছিল না। কিন্তু ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের বিরুদ্ধে নাশকতায় তাদের এজেন্ডা বহু কাফেরের চাইতেও জঘন্য ছিল। আজও  যারা বাংলাদেশের বুকে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে নেমেছে,একাত্তরে যারা হাজার হাজার ইসলামপন্থিদের হত্যা করছে এবং এখনও যারা ফাঁসিতে ঝুলাচ্ছে তাদের বেশীর ভাগ হিন্দু, খৃষ্টান, ইহুদী বা কাফের পুত্র নয়। তাদের অনেকে নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং হজ-ওমরা করে। পীরের দরবারে হাজিরাও দেয়। একাত্তরে ইসলামের এমন শত্রুদের সংখ্যা ছিল বিপুল। একপাল নেকড়ের ন্যায় বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত পাকিস্তানকে তারা ঘিরে ধরেছিল, সেটি ১৯৪৭ সাল থেকেই। পাকিস্তানে কোন কালেই মুজিব ও হাসিনার বাকশালী বর্বরতা প্রতিষ্ঠা পায় না। ৯ মাসের যুদ্ধ বাদে ২৩ বছরে সবচেযে বড় রক্তপাত ঘটেছিল ১৯৫১ সালের ২১শে ফেব্রেয়ারিতে। তখন পুলিশের গুলিতে ৩ জন নিহত হয়েছিল। দেশটির মূল অপরাধ, এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বে সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। শত্রু শক্তির কাছে এটি কি কম অপরাধ? এ অপরাধে তুরস্কের ওসমানিয়া খেলাফত বাঁচেনি। তাছাড়া আরেক অপরাধ, দেশটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামের নামে।বসবাসের নিরাপদ স্থান দিয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের,এবং দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল বাঙালী মুসলমান। শয়তান ও তার পক্ষের শক্তি কি চায়, মুসলমানগণ একটি নিরাপদ দুর্গ পাক এবং বেড়ে উঠুক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি রূপে? তারা তো চায়,মুসলমান ভিক্ষা ঝুলি নিয়ে বিশ্বের দ্বারে দ্বারে ঘুরুক, কাপড়ের অভাবে মাছ ধরা জাল পড়ুক, উচ্ছিষ্টের খোঁজে কুকুর শৃগালের সাথে লড়াই করুক,আর ভারতের সীমান্তে লাশ হয়ে কাঁটাতারে ঝুলুক। মুসলমানদের তেমন একটি অবস্থায় ফেলতে পারলেই তো ইসলামের শত্রুদের মহাআনন্দ। মুজিবকে দিয়ে ভারত তো সে উদ্দেশ্যই সাধন করেছিল। শত্রুপক্ষ এভাবেই একাত্তরে ও তার পরে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাঙ্গার শাস্তি দিয়ে মজা পেতে চেয়েছিল। আজও সে শাস্তি দেয়ার পর্ব শেষ হয়নি।

 

 

 

 

রাজনীতি ষড়যন্ত্রের

শেখ মুজিবের এজেন্ডা কোন কালেই দেশগড়া,গণতন্ত্র বা দেশবাসীর কল্যাণ ছিল না। স্বৈরাচারের প্রতিষ্ঠা,দেশধ্বংস,দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতি ধ্বংস নিয়ে ছিল তার বাহাদুরি। মুজিবের রাজনীতির মূল হাতিয়ারটি ছিল ষড়যন্ত্র। এবং সেটি ভারতকে সাথে নিয়ে এবং ভারতের স্বার্থে। মুজিবের রাজনীতি থেকে পাকিস্তান যেমন লাভবান হয়নি, বাংলাদেশও কিছু পায়নি। তার হাত দিয়ে পাকিস্তান পেয়েছে একাত্তরের পরাজয় ও দেশের বিভক্তি। আর বাংলাদেশ পেয়েছে দুর্ভিক্ষ, সীমাহীন দূর্নীতি ও তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির বিশ্বজুড়া অপমান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মুজিবের বিজয়টি ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে এক ধ্বংসাত্মক দুর্যোগ। হাজার হাজার মানুষ সে রাজনৈতিক সুনামীতে লাশ হয়েছিল। খন্ডিত হয়েছিল সর্ববৃহৎ এ মুসলিম রাষ্ট্রটির মানচিত্র। মুজিব সেদিন মুসলমানদের পরাজয় বাড়িয়ে প্রচুর আনন্দ, বিজয় ও উৎসবের খোরাক জুগিয়েছিলেন ইসলামের দুষমনদের। দিল্লির শাসক সম্প্রদায় আজও তা নিয়ে প্রতিবছর প্রচন্ড উৎসব করে। নিজেদের অর্জন মনে করে প্রচন্ড অহংকারও করে।

 

ষাটের দশকে মুজিব যখন কারাগারে তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মিসেস আমেনা বেগম। মুজিবের ঘাড়ে তখন আগরতলা মামলা। সে মামলাকে সেদিন মুজিব-বিরোধী ষড়যন্ত্র বললেও খোদ আওয়ামী লীগারগণও আজ সেটিকে মিথ্যা বলেন না। বরং ভারতের চর রূপে পাকিস্তান ভাঙার কাজে মুজিবের সে সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তারা আজ গর্ব করেন। সেটিকে সাহসিকতাও বলেন। মুজিবের সে দূর্দিনে আওয়ামী লীগের ৬ দফার আন্দোলনকে সে সময় জিন্দা রাখার ক্ষেত্রে  আমেনা বেগমের অবদান ছিল অনেক। কারণ, ৬ দফা পেশের কারণে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৭ জেলার মধ্যে ১৪ জেলার আওয়ামী লীগ প্রধানই তখন দল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তারা পিডিএমপন্থি (পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক মুভমেন্ট) আরেক আওয়ামী লীগের জন্ম দিয়েছিলেন। সে দলে ছিলেন আওয়ামী লীগের অখন্ড পাকিস্তানপন্থি প্রবীন নেতারা। পরবর্তীতে তাদের বেশীর ভাগ নেতাকর্মী জনাব নূরুল আমীনের নেতৃত্বে পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টি (পিডিপি)তে শামিল হয়ে যান। রাজনীতির আকাশে তখন ঘন কালো মেঘ। মুজিবের রাজনীতি ভয়ানক সংঘাতের দিকে যাচ্ছে দেখে মিসেস আমেনা বেগম মুজিবকে বলেছিলেন,আপনি যে রক্তাত্ব যুদ্ধের পথে দেশকে নিয়ে যাচ্ছেন তাতে তো বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণনাশ হবে। কিন্তু মিসেস আমিনা বেগমের সে সাবধান বানি মুজিবের কাছে গুরুত্ব পায়নি। সেনাবাহিনী রাজনৈতিক ছাড় দিতে হয়তো রাজী হবে,কিন্তু দেশের বিভক্তিকে যে বিনাযুদ্ধে মেনে নিবে না –সেটি কোন চিন্তাশীল মানুষের কাছে অজানা থাকার কথা নয়। সেটি জানতেন আমিনা বেগমও। কারণ কোন দেশের সেনাবাহিনীই নিজ দেশের বিভক্তিকে বিনাযুদ্ধে মেনে নেয় না। তাছাড়া পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষায় প্রতিটি সেপাই যেখানে কোরআন শরীফ ছুঁয়ে কসম খেয়ে থাকে -তাদের থেকে সেরূপ গাদ্দারি কীরূপে আশা করা যায়? মুজিবের রাজনীতিতে নিরীহ মানুষদের রক্তদান ছিল মামূলী বিষয়। তিনি তার রাজনীতির নৌকাটি বেয়েছেন জনগণের রক্তের উপর দিয়ে। মিসেস আমেনা বেগম এরপর আর আওয়ামী লীগে থাকেননি। মুজিবের রক্ত ঝরানোর সে রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি তার মনের ক্ষোভটি পরে প্রকাশ করেছিলেন পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে।

 

জোসেফ স্টালিন সোভিয়েত রাশিয়ায় বহু লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল।বহু লক্ষ মানুষের প্রান নাশ ঘটেছিল হিটলারের হাতে। তেমনি চীনে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণনাশ ঘটেছিল মাও সে তুঙয়ের হাতে। হত্যাকারি এসব শাসকদের সবাই ছিল স্বৈরাচারি। প্রতিদেশে স্বৈরাচারিদের এটিই নীতি। তেমনি বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষের জীবননাশ ঘটেছিল মুজিবের হাতে। মুজিবের সাড়ে ৩ বছরের শাসনে লাশ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। তার আমলে এক সপ্তাহ বা এক মাসে যত মানুষ পুলিশ বা রক্ষিবাহিনীর হাতে লাশ হয়েছে যুদ্ধকালীন ৯ মাস ছাড়া পাকিস্তানের ২৩ বছরেও তত মানুষ নিহত হয়নি। এমন একজন অপরাধি মানুষ যে শুধু তার শাসনামলের তেহাত্তরে, চুহাত্তরে বা পঁচাত্তরে অপরাধি ছিলেন তা নয়, ভয়ানক অপরাধি ছিলেন সত্তর এবং একাত্তরেও। এমনকি তার আগেও। পাকিস্তান সরকারের হাতে কোন কালেই র‌্যাব ছিল না,রক্ষিবাহিনীও ছিল না। মিছিল রোধে রাস্তায় বড় জোর পুলিশ নামতো। কিন্তু বাংলাদেশে এখন যৌথ বাহিনী নামে।

 

লুকানো হয়েছে ইতিহাস

বাংলাদেশে শিক্ষার নামে প্রচন্ড কুশিক্ষা দেয়া হচ্ছে।এবং সেটি বেশী ইতিহাস চর্চায়। সেটি করা হয়েছে মুজিবের ন্যায় দেশ ও ইসলামের এক নৃশংস শত্রুকে মহামান্য করতে। একাত্তরের প্রকৃত সত্যকে ষড়যন্ত্র মূলক ভাবে গোপন করা হয়েছে। একাত্তরের চেতনা ও স্বাধীনতা যুদ্ধের নামে যে প্রচন্ড মিথ্যাচারকে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে তার ভিত্তিতেই কে শত্রু আর কে বন্ধু সেটিও কৃত্রিম ভাবে ছাত্রদের মগজে বদ্ধমূল করা হয়েছে। সে মিথ্যার ভিত্তিতেই ইসলামপন্থিদের ফাঁসিতে চড়ানোর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আব্দুল কাদের মোল্লার মত একজন নিরীহ ও নির্দোষ মানুষ তো সে মিথ্যাচারেরই শিকার। সরকারি খরচে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে শাহবাগে খাড়া করা হয়েছে, তাদের দিয়ে আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবীও উঠানো হয়েছে। আর আদালতকে দিয়ে সে দাবী বাস্তবায়নও করানো হযেছে। একাত্তরের অপরাধ ও প্রকৃত অপরাধীদের নিয়ে তাদের মাথা ব্যাথা নেই। তাদের এজেন্ডা একাত্তরকে অজুহাত বানিয়ে ইসলামের পক্ষের শক্তিকে নির্মূল করা। যুদ্ধ শুরু হলে সেখানে লাশ তো পড়বেই। যুদ্ধের তো সেটাই রীতি। বড় অপরাধী তো সেই ব্যক্তি যে যুদ্ধ ডেকে আনে। তাই যুদ্ধাপরাধের বিচার হতে হলে বিচার হতে হবে মুজিবের। কারণ সেই যুদ্ধ ডেকে এনেছিল। পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবস্থান শুধু একাত্তরে নয়, তার আগেও ২৩ বছর যাবত ছিল। বাঙালী নির্মূলে বা বাঙালী রমনীদের ধর্ষণে তাদের আগ্রহ থাকলে সে কাজ ১৯৭১ থেকে নয় তো তাদের ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করতো। অথচ আওয়ামী বাকশালীদের পক্ষ লাগাতর বলা হয়, বাঙালী নির্মূল ও বাঙালী রমনীদের ধর্ষন ছিল পাকিস্তান আর্মির লক্ষ্য। অথচ সত্য হলো, একাত্তরের আগে সেনাবাহিনী কোন জনপদে যায়নি। প্রয়োজনও পড়েনি। কারণ, একাত্তরের আগে হামলা হয়নি পাকিস্তানের সংহতির উপর।

 

বাকশালীরা প্রতি কথায় একাত্তরের যুদ্ধ ও মু্ক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে। কিন্তু কি সে মুক্তিযুদ্ধ এবং কি সে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? এ নিয়ে ইসলামপন্থিগণ খামোশ। কিন্তু সে কৌশলটিতে হিকমত নেই। ঈমানদারের দায়িত্ব তো সত্যকে সর্বসামর্থ দিয়ে প্রকাশ করা। তথা সত্যের পক্ষে সাক্ষি দেয়া। একাত্তরকে ঘিরেও তো বহু সত্য ঘটনা রয়েছে।  সে সত্য প্রকাশ না পেলে তো মিথ্যাই সত্যকে ঢেকে ফেলবে। একাত্তরকে ঘিরে তো সেটিই ঘটেছে। তাই একাত্তর নিয়ে প্রকৃত সত্যকে প্রবল ভাবে তুলে ধরাটি ঈমানদারের দায়িত্ব। বাকশালীদের লুকানো ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে। যা আজ মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতার যুদ্ধ রূপে মর্যদা পাচ্ছে সেটি ছিল পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধ। ভারতের কাশ্মীর, আসাম, নাগাল্যান্ড, মনিপুর, মিজোরামে তেমন একটি বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধ চলছে বিগত ৬০ বছর ধরে। সে যুদ্ধে এখনও বিজয় আসেনি।ফলে যারা সে বিচ্ছিন্নতার সাথে লিপ্ত তারা মুক্তিযোদ্ধার মর্যদা পায়নি। তাদের যুদ্ধটি স্বাধীনতার যুদ্ধ রূপেও চিত্রিত হয়নি। বরং যারা সে যুদ্ধটি প্রানপণে লড়ছে এবং অনেকে প্রানও দিচ্ছে তারা চিত্রিত হচ্ছে সন্ত্রাসী ও ভারতের সংহতির দুষমন রূপে।সেটি যেমন ভারতের কাছে তেমনি বাংলাদেশের বাকশালীদের কাছে। স্বাধীনতাকামী সে যোদ্ধাদের মধ্য থেকে যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল হাসিনা সরকার তাদেরকে সন্ত্রাসী আখ্যায়ীত করে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে। কথা হলো বাঙালীর একাত্তরের বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধ থেকে কাশ্মীর, আসাম, নাগাল্যান্ড, মনিপুর, মিজোরামের যুদ্ধগুলির পার্থক্য কোথায়? তাদের কাছে যদি নিজেদের পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতার চেতনাটি একাত্তরের চেতনা রূপে পুজনীয় হয় তবে তাদের সে চেতনাটি বাকশালীদের কাছে মর্যাদা পায় না কেন? তাদের বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে ভারতের সেনাবাহিনী। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তো একই ভাবে দাঁড়িয়েছিল নিজ দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাথে সহযোগিতা করছে হাসিনা সরকার। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সাথে রাজাকারদের সহযোগিতা যদি দোষের হয়ে থাকে তবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাথে সহযোগিতা নিন্দনীয় হবে না কেন? রাজকারগণ পাকিস্তানকে নিজ দেশ মনে করতো। নিজ দেশের পক্ষে লড়াইকে কি দালালী বলা যায়? বলা যায় কি মানবতা-বিরোধী অপরাধ? অথচ হাসিনা ও তার সহযোগীগণ যে ভারতকে সাহায্য করছে সেটি তাদের নিজেদের দেশ নয়।একাত্তরের চেতনার বুলি যে কতটা নীতি শূণ্য ও ভন্ডামিপূর্ণ সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে?

 

বাংলাদেশীদের ঘাড়ে এখন বাকশালী ফ্যাসীজমের মহাবিপদ।সেটির শুরু ২০১৩ সালে বা ২০০৮সালে নয়। একাত্তরেও নয়। শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ থেকেই। বাকশালীদের মূল অপরাধটিও তো সে আমল থেকেই। তাদের আজকের অপরাধের চেয়ে পুরনো সে অপরাধগুলি কি কম গুরুতর? সে অপরাধীদের সাথে তুলে ধরতে হবে ভারতের কুকর্মগুলিও। নইলে সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অগোচরে থেকে যাবে বাঙালী মুসলমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে এ জঘন্য শত্রু ও তার মিত্রদের নাশকতার ভয়ংকর চিত্র।সে কাজটি দ্রুত না হলে আরো বহু নিরীহ আব্দুল কাদের মোল্লাহকে এ মিথ্যুকদের হাতে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। শুধু তাই নয়, জীবননাশের পাশাপাশি অবিরাম চলতে থাকবে ইসলামপন্থিদের চরিত্রনাশও।

 

যা ঘটেছিল মার্চের সংলাপে

১৯৭১য়ের মার্চে মুজিবের সাথে ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বৈঠক বসেছিল। ভুট্টো্ও তখন ঢাকায়। সে বৈঠকে ইয়াহিয়া খান মুজিবের ৬ দফা নিয়ে প্রথমে দরকাষি করলেও পরে সবটুকুই মেনে নিয়েছিলেন। যে কোন মূল্যে আসন্ন যুদ্ধটি তিনি পরিহার করতে চেয়েছিলেন। মুজিব ১৯৭০ সালের নির্বাচন জিতেছিলেন ৬ দফার ভিত্তিতে পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষা ও  বাংলাদেশের স্বায়ত্বশাসন লাভের ঘোষনা দিয়ে। তখন পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা কোন এজেন্ডা ছিল না। পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ সে সব কথাও মুজিব মুখে আনেননি। অথচ একাত্তরের মার্চে এসে মুজিব তার গোলপোষ্টই পাল্টে ফেলেন। তিনি তার ৬ দফাকে একদফায় পরিণত করেন। সে এক দফাটি হলো পাকিস্তান ভাঙ্গা ও বিচ্ছিন্ন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। সে সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন জনগণ থেকে ম্যান্ডেট না নিয়েই। প্রেসেডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৬ দফা এতটুকু মেনে নিয়েছিলেন যে,ঢাকাতে বসেই তখন ঢাকায় উপস্থিত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী ও পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি কর্নেলিয়াসকে হুকুম দিয়েছিলেন ৬ দফার আঙ্গিকে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রের একটি খসড়া তৈরী করতে। আর তার পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এম আহম্মদকে বলেছিলেন ৬ দফা অনুসারে দুই মুদ্রা ও দুই প্রদেশের দুই পৃথক অর্থনীতির ভিত্তিতে আর্থিক পরিকল্পনার কাঠামোর বানাতে। ইয়াহিয়া খান চাচ্ছিলেন, আর যাই হোক পাকিস্তান বেঁচে যাক। কিন্তু মুজিব ২৩শে মার্চের বৈঠকে নতুন দাবী তুললেন, পূর্ব পকিস্তান থেকে সামরিক আইন তুলে নিতে হবে এবং সে সাথে সেনাপ্রত্যাহার করতে হবে। তার আরো দাবী ছিল, পূর্ব পকিস্তানে মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার গঠন নিয়ে মুজিবের কোন আগ্রহই ছিল না।

 

অথচ ইয়াহিয়া খান চাচ্ছিলেন, শেখ মুজিবকে প্রধান মন্ত্রী ও ভূট্টোকে উপপ্রধান মন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী করে কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। আওয়ামী লীগ যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পার্লামেন্টে কোন আসনই জিতেনি,শুধু তাদের হাতে ক্ষমতা দিলে তাতে পশ্চিম পাকিস্তানের অংশগ্রহন থাকতো না। অথচ সেখানে ৪টি প্রদেশ। ফলে ইয়াহিয়া খান একটি কোয়ালিশন সরকারের আপোষ ফর্মোলা খুঁজছিলেন। ১লা মার্চ জাতীয় পরিষদের বৈঠক মূলতবীর পিছনে এটিই ছিল তার যুক্তি। ইয়াহিয়া খান চাচ্ছিলেন জাতীয় পরিষদের বৈঠকের পূর্বেই নেতাগণ একটি সমাঝোতায় পৌছুক। তার প্রশ্ন ছিল,সরকার সামরিক আইন তুলে নিলে দেশ চলতো কোন আইন অনুযায়ী? সে সময় দেশে কোন শাসনতন্ত্র ছিল না। সামরিক আইনছাড়া দেশের সংহতি ধরে রাখার কোন আইনও ছিল না। মুজিবের দাবী মেনে নিলে পূর্ব পকিস্তান অটোমেটিক আলাদা হয়ে যেত এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান তখন বিপদে পড়তো। মারমুখী হামলার মুখে পড়তো তখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যগণ ও আাবঙালীরা। মুজিবের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি তখন সেনাবাহিনীর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে। তখন যেটি অনিবার্য হয়ে উঠে সেটি যুদ্ধ। আর দেশকে সে পথে যিনি ধাবিত করেন তিনি হলেন মুজিব। অথচ বাংলাদেশে ইতিহাসের বইয়ে মুজিবের ষড়যন্ত্রের এ ইতিহাস পড়ানো হয় না। পড়ানো হয় একাত্তর প্রসঙ্গে গাঁজাখোরি মিথ্যাচার -যা উৎপাদিত হয়েছে আওয়ামী লীগের নিজের কারখানায়। অথচ সে ইতিহাস জানা যায় বিদেশীদের লেখা বইয়ে। Richard Sisson and Leo Rose নামে দুই মার্কিন প্রফেসর তাদের গবেষণা মূলক বই War and Secession: Pakistan, India and Creation of Bangladesh বইতে একাত্তরে কি ঘটেছিল তার একটি বিষদ চিত্র তুলে ধরেছেন।

 

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় বাঙালী মুসলমানের ত্যাগ

পাকিস্তান গড়ার ন্যায় দেশটির ভাঙ্গার বিষয়টি বাঙালী মুসলমানদের জন্য ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।কারণ বিশ্বের সর্ববৃহৎ এ মুসলিম দেশটির প্রতিষ্ঠায় তাদের অবদানটাই ছিল সবচেয়ে বেশী। সেটি যেমন ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের ঢাকায় প্রতিষ্ঠায়, তেমনি ১৯৪০ সালে লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব পাশে এবং ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট কলকাতায় পাকিস্তানের পক্ষে জিন্নাহ ঘোষিত ডাইরেক্ট এ্যাকশন দিবসে অসংখ্য মানুষের কোরবানীতে। তখন কলকাতায় ছিল সহরোয়র্দির নেতৃত্বে মুসলিম লীগের সরকার। সমগ্র ভারতে তখন বাংলাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। কলকাতা ছিল সমগ্র ভারতে সর্ববৃহৎ নগর। ছিল বুদ্ধিবৃত্তির মূল কেন্দ্র। ভারতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারীত হতে এ নগর থেকে। সে শহরে বসে অবিভক্ত বাংলা শাসন করতো মুসলিম লীগ। ১৯৩৫ সালে ভারত শাসনের আইনে যখন প্রদেশ গুলোকে শায়ত্বশাসন দেয়া হয়, তারপর থেকে হিন্দুরা কখনোই বাংলা শাসন করতে পারিনি। কলকাতা শহরে হিন্দুরা ছিল শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ। ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট কলকাতার গড়ের মাঠে ছিল ডাইরেক্ট এ্যাকশন দিবস উপলক্ষে মুসলিম লীগের জনসভা। কলকাতার রাজপথে মুসলমানদের মুখে সেদিন গর্জে উঠেছিল “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” তথা লড়াই করে নেব পাকিস্তানের স্লোগান। কলকাতার বাবুদের সে ধ্বনি পছন্দ হয়নি। জনসভা শেষে নিরস্ত্র মুসলমানরা যখন ঘরে ফিরছিল তখন সশস্ত্র হিন্দু গুন্ডারা নেকড়ের মত তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে মুসলিম বিরোধী গণহত্যা তিন দিন তিন রাত ব্যাপী চলতে থাকে। মুসলিম লীগ সরকারের হাতে সে দাঙ্গা থামানোর মত পুলিশ ছিল না। প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার মুসলমানের নৃশংস হত্যার মধ্য দিয়ে কংগ্রেস ও হিন্দুমহাসভার সন্ত্রাসীরা সেদিন মনের ঝাল মিটিয়েছিল। হত্যায় নেমেছিল কলকাতার মুসলিম বস্তিগুলোতেও। সে দাঙ্গার নিজ চোখে-দেখা ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বাঙালী প্রফেসর ড. তপন রায় চৌধুরী তার লেখা “বাঙাল নামা” বইতে।

 

প্রফেসর ড.তপন রায়চৌধুরি লিখেছেন, “নিজের চোখে দেখা ঘটনার বিবরণে ফিরে যাই। হস্টেলের বারান্দা থেকে দেখতে পেলাম রাস্তার ওপারে আগুন জ্বলছে। বুঝলাম ব্যাপারটা আমার চেনা মহাপুরুষদেরই মহান কীর্তি। হস্টেলের ছাদে উঠে দেখলাম –আগুন শুধু আমাদের পাড়ায় না, যতদূর চোখ যায় সর্বত্র আকাশ লালে লাল। তিন দিন তিন রাত কলকাতার পথে ঘাটে পিশাচনৃত্য চলে। … দাঙ্গার প্রথম ধাক্কা থামবার পর বিপজ্জনক এলাকায় যেসব বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন ছিলেন, তাঁদের খোঁজ নিতে বের হই। প্রথমেই গেলাম মুন্নুজন হলে। ..নিরঙ্কুশ হিন্দু পাড়ার মধ্যে ওদের হস্টেল। তবে ভদ্র বাঙালি পাড়া। সুতরাং প্রথমটায় কিছু দুশ্চিন্তা করিনি। কিন্তু দাঙ্গা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শিক্ষিত বাঙালির রুচি-সংস্কৃতির যেসব নমুনা দেখলাম, তাতে সন্দেহ হল যে, মুন্নুজান হলবাসিনী আমার বন্ধুদের গিয়ে আর জীবিত দেখবো না। …হোস্টেলের কাছে পৌঁছে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে ভয়ে আমার বাক্যরোধ হল। বাড়ীটার সামনে রাস্তায় কিছু ভাঙা স্যুটকেস আর পোড়া বইপত্র ছড়ানো। বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে। ফুটপথে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন – একটু আগে পুলিশের গাড়ি এসে মেয়েদের নিয়ে গেছে।…শুনলাম ১৬ই আগষ্ট বেলা এগারোটা নাগাদ একদল সশস্ত্র লোক হঠাৎ হুড়মুড় করে হস্টেলে ঢুকে পড়ে। প্রথমে তারা অশ্রাব্য গালিগালাজ করে যার মূল বক্তব্য –মুসলমান স্ত্রীলোক আর রাস্তার গণিকার মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। …হামলাকারিরা অধিকাংশই ছিলেন ভদ্রশ্রেণীর মানুষ এবং তাঁদের কেউ কেউ ওঁদের বিশেষ পরিচিত, পাড়ার দাদা। ” –(তপন রায়চৌধুরী, বাঙাল নামা,২০০৭)। তিনি আরো লিখেছেন, “খুনজখম বলাৎকারের কাহিনী চারি দিক থেকে আসতে থাকে। …বীভৎস সব কাহিনী রটিয়ে কিছু লোক এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পায়। তার চেয়েও অবাক হলাম যখন দেখলাম কয়েকজন তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত লোক মুসলমানদের উপর নানা অত্যাচারের সত্যি বা কল্পিত কাহিনি বলে বা শুনে বিশেষ আনন্দ পাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে দু-তিনজন রীতিমত বিখ্যাত লোক। প্রয়াত এক পন্ডিত ব্যক্তি, যাঁর নাম শুনলে অনেক নিষ্ঠাবান হিন্দু এখনও যুক্তকরে প্রণাম জানায়, তাঁকে এবং সমবেত অধ্যাপকদের কাছে নিকাশিপাড়ার মুসলমান বস্তি পোড়ানোর কাহিনি বলা হচ্ছিল। যিনি বলছিলেন তিনি প্রত্যক্ষদর্শী এবং বিশ্বাসযোগ্য লোক। বেড়া আগুন দিয়ে বস্তিবাসীদের পুড়িয়ে মারা হয়। একজনও নাকি পালাতে পারিনি। ছেলেটি বলছিল, কয়েকটি শিশুকে আগুনের বেড়া টপকে তাদের মায়েরা আক্রমণকারীদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যাতে ওদের প্রাণগুলি বাঁচে। বাচ্চাগুলিকে নির্দ্বিধায় আবার আগুনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। আমরা শুনেছিলাম, এই কুকীর্তির নায়ক কিছু (হিন্দু) বিহারী কালোয়ার। তাই ভয়াবহ বর্ণনাটি শুনে সুশোভনবাবু মন্তব্য করেন, “এর মধ্যে নিশ্চয়ই বাঙালি ছেলেরা ছিল না?” শুনে সেই পন্ডিতপ্রবর গর্জে উঠলেন, “কেন, বাঙালি ছেলেদের গায়ে কি পুরুষের রক্ত নেই?” –(তপন রায়চৌধুরী, বাঙালা নামা,২০০৭)।

 

তবে সেদিন কলকাতায় হাজার হাজার নিরীহ বাঙালী মুসলমানের রক্ত দান বৃথা যায়নি। সে গভীর রক্তে অখন্ড ভারতমাতার পুজারিদের মনবল চুরমার হয়ে গিয়েছিল। জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার যুক্তি যাদের মগজে এতদিনও ঢুকেনি সেদিন তারা ঠিকই সেটি বুঝেছিল। অখন্ড ভারতের পক্ষে এতকাল অটল থাকা কংগ্রেসী নেতা গান্ধি, বল্লভ ভাই প্যাটেল ও নেহেরুর মনবল সে রক্তের স্রোতে ত্বরিৎ টলে যায়। সে বিশাল কোরবানীর পর পাকিস্তানে অপরিহার্যতা বুঝাতে মুসলিম লীগ নেতা মুহাম্মদ জিন্নাহকে আর কোন দীর্ঘ ব্ক্তৃতা দিতে হয়নি। কংগ্রেসের ন্যায় ব্রিটিশ সরকারও তখন দ্রুত পাকিস্তান দাবী মেনে নেয়। কারণ,তারাও বুঝতে পারে,পাকিস্তান মেনে না নিলে সমগ্র ভারত জুড়ে যুদ্ধ শুরু হবে। ব্রিটিশের দুশ্চিন্তা বাড়ে, তেমন একটি যুদ্ধ শুরু হলে ভারতের বুক দিয়ে তাদের দেশে ফেরার নিরাপদ রাস্তা পাওয়াও অসম্ভব হবে। তাদেরও তখন লাশ হতে হবে। বাঙালী মুসলমানদের ১৯৪৬ সালের সে রক্তদান তাই ভারতের মানচিত্রই পাল্টে দিয়েছিল। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা তখন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে। অথচ বাকশালী বুদ্ধিজীবীরা বলে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মুসলিম  লীগের প্রতি ব্রিটিশের পক্ষপাতিত্বের কারণে! পাকিস্তানকে বলে এক সাম্প্রদায়িক সৃষ্টি।অথচ দেশটি প্রতিষ্ঠা নিয়ে গণভোট হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হলো, পাকিস্তান গড়ার ব্যাপারে ১৯৪৬ সালের গণভোটে বাঙালী মুসলমানের মতামত নেয়া হলেও ১৯৭১য়ে পাকিস্তান ভাঙ্গার ব্যাপারে মুজিব তাদের মতামত নেননি। ১৯৭০য়ের নির্বাচনে তিনি ভোট নিয়েছিলেন ৬ দফা ভিত্তিক স্বায়ত্বশাসন ও পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ওয়াদা দিয়ে,পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে তিনি ভোট নেননি। পাকিস্তান ভাঙ্গার সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন মুজিব একা। এবং সেটি ভারতীয় শাসক চক্রের সাথে মিলে। এমন একটি মুহৃর্তের জন্য পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই ভারত অপেক্ষা করছিল।

 

বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপরাধ

দেশের আয়োতন ছোট হলে স্বাধীনতা না বেড়ে বরং কমে যায়। তখন ইজ্জতও লুন্ঠত হয়। তাই স্বাধীনতা ও ইজ্জত বাড়াতে প্রতিটি দেশই সুযোগ পেলে তার ভূগোল বাড়ায়। সে তাগিদেই তূর্কী বীর ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী বাংলা অবধি ছুটে এসেছিলেন। বাঙালী মুসলিম নেতাগণও তাই ১৯৪৭সালে উপমহাদেশের একমাত্র মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোল ও শক্তি বাড়াতে পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিলন। এমন একটি সাধারণ বিষয় বুঝার সামর্থ মুজিবের যে ছিল না তা নয়। মীর জাফরগণ তো বুঝে সুজেই গাদ্দারি করে। এখানে দোষটি কম বুঝার নয়। বরং গরজটি মনিবের পদসেবার। মীর জাফরেরা কখনই দেশ ও দেশেবাসীর স্বার্থ দেখে না। দেখে মনিবের স্বার্থ। মুজিবের জীবনে সে মনিবটি ছিল ভারত। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার সাথে তার যে একাত্তরের বহু আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল সেটি এখন আর গোপন বিষয় নয়। ভারতীয় সাংবাদিক অশোক রায়নার ‘ইনসাইড র’ বইতে তার বিষদ উল্লেখ আাছে। আগরতলা ষড়যন্ত্রও তাই মিথ্যা ছিল না।

 

 

পাল ছাড়া ভেড়াটিই নেকড়ের পেটে সর্বপ্রথম যায়। তেমনি মোগল সাম্রাজ্য থেকে পৃথক হওয়ার কারণে তৎকালীন স্বাধীন বাংলা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেশের পেটে সর্বপ্রথম ঢুকেছিল। সে গোলামী থেকে প্রতিরক্ষার সামর্থ বাংলার মুসলমানদের ছিল না। অথচ দিল্লির মোগল শাসকগণ যত দুর্বলই হোক তারা আরো একশত বছর নিজেদের স্বাধীনতা বাঁচিয়েছিল। দিল্লির পতন ঘটে ১৮৫৭ সালে। ফলে তাদের জীবনে গোলামীর মেয়াদ ছিল মাত্র ৯০ বছর। অথচ বাঙালীর জীবনে সেটি ১৯০ বছরের।  দীর্ঘ ১৯০ বছরের গোলামীতে বাংলার মুসলমানদের ক্ষতিটা ছিল বিশাল। রাজনীতি, অর্থনীতি,শিক্ষা-দীক্ষা ও সংস্কৃতিতে বাঙালী মুসলমানের জীবনে যে পতনটি আসে তা উত্তর ভারতের মুসলমানদের জীবনে তা ততটা শোচনীয় হয়নি। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে বাঙালী মুসলমানের অপমান বেড়েছিল ব্রিটেশের সবচেয়ে সিনিয়র গোলাম রূপে।

 

বিচ্ছিন্নতার রাজনীতি মুসলিম উম্মাহর জীবনে অতিশয় শক্তিহানিকর ও সম্মানহানিকর প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামে এমন ক্ষতিকর রাজনীতি জায়েজ হয় কি করে? মদ্যপানে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমান অধিক, তাই সেটি হারাম। কিন্তু বিচ্ছিন্নতায় কোন লাভ নেই, বরং ক্ষতিটি বিশাল। সে ক্ষতিটি সমগ্র উম্মাহর। মুসলিম দেশের বিভক্তি এই জন্যই ইসলামে হারাম। আলেমদের মাঝে নানা বিষয়ে বিভেদ থাকলেও এনিয়ে মতভেদ নাই। ঈমানদারগণ তাই প্যান-ইসলামিক হয়। আব্বাসী খেলাফত এবং পরে ওসমানিয়া খেলাফত বহুশত বছর বেঁচেছিল তো তেমন একটি প্যান-ইসলামিক চেতনার উপর ভর করে। সে আমলে এশিয়া,আফ্রিকা ও ইউরোপব্যাপী বিশাল মুসলিম রাষ্ট্রের একতা ধরে রাখতে কি বিশাল সেনাবাহিনী প্রয়োজন পড়েছিল? অথচ সে রাষ্ট্রের আয়োতন ছিল শতাধিক বাংলাদেশের সমান। তেমন এক বিশাল দেশের প্রতিরক্ষায় বিশাল সেনাবাহিনী প্রতিপালনের অর্থবল ওসমানিয়া খলিফাদের ছিল না। তাদের হাতে বড় বড় ক্যান্টনমেন্ট ছিল না। আধুনিক অস্ত্রও ছিল না। মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব তো শুধু বেতনভোগী সৈন্যদের নয়, এ দায়িত্ব তো প্রতিটি ঈমানদারের। সাহাবায়ে কেরামের যুগে তাই সেনানীবাসের প্রয়োজন পড়েনি। সাহাবাগণ নিজ অর্থ, নিজ অস্ত্র ও নিজ বাহন নিয়ে রণাঙ্গনে যেতেন। বলকানে বিচ্ছিন্নতার যুদ্ধ দেখা দিলে এমনকি বাংলা থেকেও তখন মুজাহিদগণ ওসমানিয়া খলিফার সাহায্যে গেছেন। খলিফাকে সাহায্য করতে বাংলার মুসলমানগণ ঘরে ঘরে মুষ্টির চালের হাঁড়ি বসিয়েছে। মুজাহিদগণ এসেছেন সুদূর আফ্রিকা থেকে। কারণ মুসলিম ভূমির উপর কাফের হামলার প্রতিরোধের যুদ্ধ তো শত ভাগ জিহাদ। সে জিহাদে প্রান গেলে শাহাদত জুটে। মুসলিম রাষ্ট্রের সংহতির বিরুদ্ধে যারাই মাথা তুলেছে তাদের রুখতে জনগণ নিজেরাই সেদিন রাজাকার তথা স্বেচ্ছাসেবক রূপে দায়িত্ব পালন করেছে। সীমিত সেনাবাহিনী বরং নজর দিয়েছে সীমান্তের ওপারে নতুন নতুন শত্রু দেশ দখলে।

 

রাজাকারের চেতনা

ইসলামি চেতনাধারি মুসলমানদের মাঝে তেমন একটি প্রবল চেতনা একাত্তরেও কাজ করেছিল। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার হাজার হাজার ছাত্র তখন অখন্ড পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় স্বেচ্ছায় রাজাকার হয়েছেন। অনেকে নিজের চাষাবাদ ও ব্যাবসা-বানিজ্য ফেলেও রাজাকার হয়েছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল,আওয়ামী বাকশালী ও তাদের হিন্দুস্থানী প্রভুদের ছোবল থেকে পাকিস্তানকে বাঁচানো। একাজকে তারা মনে প্রাণে জিহাদ মনে করেছে। নিজেদের মধ্যে কেউ নিহত হলে রাজাকারগণ মনের শত ভাগ ব্শ্বিাস নিয়ে তাকে শহীদ গণ্য করতো। এনিয়ে তাদের মনে সামান্যতম সন্দেহ ছিল না। পাকিস্তানকে তারা ভাবতো দক্ষিণ এশিয়ার বুকে মুসলামানদের নিরাপদ দুর্গ। পাকিস্তানকে তারা নিজেদের দেশ মনে করতো। এ দুর্গের পতন হলে মুসলমানদের দুর্দশা যে চরমে পৌছবে তাতে তাদের সামান্যতম সন্দেহ ছিল না। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভারতের এজেন্টদের হাতে আজকের বাংলাদেশে যা কিছু হচ্ছে বা মুজিবামলে হয়েছে বা আগামীতে হবে –তা নিয়ে একাত্তরের রাজাকারদের মনে কোনরূপ দ্বিধাদ্বন্দ বা সন্দেহ ছিল না। বাকশালী রাজনীতির বীভৎস চিত্রটির আশংকা একাত্তরেই তাদের মনে বদ্ধমূল হয়েছিল। কারণ আওয়ামী বাকশালীরা যে কতটা নৃশংস,বর্বর, বিবেকহীন সেটি তাদের কাছে অজানা ছিল না। উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসে রাজাকার শব্দটির আরেকটি গৌরব জনক অধ্যায় রয়েছে। অগ্রাসী ভারতীয় হানাদার বাহিনী ১৯৪৮ সালে যখন নিজামের রাষ্ট্র হায়দারাবাদের উপর আক্রমণ করে তখন যে হাজার হাজার মুসলিম যুবক নিজেদের রক্ত দিয়ে সে হিন্দু হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তারা সেদেশের ইতিহাসে রাজাকার নামে পরিচিত।অথচ বিস্ময়ের বিষয় হলো, কাফের, ফাসেক,জালেম ও বাকশালী খুনিদের সাথে সুর মিলিয়ে ইসলামি সংগঠনের বহু আহম্মক নেতা-কর্মী রাজাকারদের গালি দেয়! শুধু তাই নয়, ইসলামি চেতনাশুণ্য এসব ব্যক্তিরা সেক্যুলারিস্টদের সাথে গলা মিলিয়ে রাজাকার শব্দটিকেও গালির শব্দ রূপে ব্যবহার করে! এদের চেতনা রাজ্যের পচনটি যে কত গভীর এবং উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাস নিয়ে অজ্ঞতা যে কতটা প্রকট সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে?

 

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ, পিডিপি, জামায়াতে ইসলামি, নেজামে ইসলাম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফতে রাব্বানি পার্টি, কৃষক শ্রমিক পার্টি, ফারায়েজী আন্দোলনসহ বহু মুসলিম ও ইসলামি দল ছিল। বহু হাজার আলেমও ছিল। কিন্তু কোন মুসলিম দল ও কোন আলেম কি পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সেদিন সমর্থণ দিয়েছিল? দেয়নি। সেটি ছিল নিছক বাঙালী জাতিয়তাবাদী, সমাজতন্ত্রি, নাস্তিক ও মুসলিম স্বার্থবিনাশী হিন্দুদের নিজেদের প্রজেক্ট। আলেমগণ সে বিচ্ছিন্নতাকে হারাম বলেছে। সে হারাম কাজ রুখতে অনেকে অত্যাচারিত হয়েছেন এবং জানও দিয়েছেন। বাকশালীরা সেটি জানে। তাই আলেমের লেবাসধারি কাউকে দেখলেই তারা রাজাকার বলে। সুযোগ পেলে লগি বৈঠা নিয়ে হত্যা করতে ধেয়ে আসে। হত্যার কাজে আদালতের বিচারকদেরও নামিয়েছে। শয়তান তার শত্রু চিনতে ভূল করে না। বাকশালীরাও করেনি। বাকশালীদের প্রভু দিল্লির শাসকচক্রও করেনি। তবে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তো তারাই বন্ধু রূপে গণ্য হয়,যারা শয়তানের কাছে কঠোর শত্রু রূপে স্বীকৃতি পায়। কাফের, মুশরিক বা পৌত্তলকদের কাছে বন্ধু রূপে স্বীকৃতি পাওয়ার বিপদ তো ভয়ানক। সে বিপদ জাহান্নামে পৌঁছার। কারণ যারাই তাদের বন্ধু,মহান আল্লাহ রাব্বুলআলামীন তাদেরকে কখনই নিজের বন্ধু রূপে গ্রহন করেন না। মহান আল্লাহতায়ালার সে ঘোষণাটি পবিত্র কোরআনে বহুবার উল্লেখিত হয়েছে। বলা হয়েছে, “মু’মিনগন যেন মু’মিন ব্যতীত কাফেরদের বন্ধু রূপে গ্রহণ না করে। যে ব্যক্তিই এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোনরূপ সম্পর্ক থাকবে না।” –(সুরা আল ইমরান আয়াত ২৮)। তাই ভারতের কাফের শাসকদের সেবাদাস হওয়া আর আল্লাহর উপর ঈমানদার হওয়ার কাজ একসাথে চলে না। কাফের, মুনাফিক, নাস্তিক ও মুশরিকদের কাছে প্রিয় হওয়ার খেসারত দিতে হয় আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব হারিয়ে। বরং নির্দেশ দিয়েছেন, কাফেরদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে। মু’মিনের বর্ণনায় মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে তাদেরকে চিত্রিত করেছেন “আশাদ্দু আলাল কুফ্ফার ওয়া রুহামাও বায়নাহুম’ অর্থাৎ কাফেরদের প্রতি কঠোর হৃদয়ের ও পরস্পরে দয়াপূর্ণ দিলের মানুষ রূপে। অথচ আওয়ামী বাকশালীদের নীতিটি সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের নির্মূলমুখি কঠোর নীতিটি কাফেরদের বিরুদ্ধে নয়, বরং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে। অপর দিকে মুসলিম নিধনকারি ভারতীয় কাফেরদের শুধু বন্ধু রূপেই গ্রহণ করেনি,গ্রহণ করেছে রক্ষাকর্তা রূপে।

 

আদি পিতা শয়তান

বিশেষ কোন শারিরীক বৈশিষ্ঠ বা গুণাগুণ নিয়ে জন্ম লাভে গর্ব করাটি শয়তানের স্বভাব। আল্লাহতায়ালা কাউকে যেমন মাটি দিয়ে সৃষ্টি করতে পারেন, তেমনি আগুন দিয়েও জন্ম দিতে পারেন। কাউকে পঙ্গু বা অসুস্থ্য রূপে যেমন সৃষ্টি করতে পারেন, তেমনি সুস্থ্যতা দিয়েও জন্ম দিতে পারেন। কাকে কীরূপে জন্ম দিবেন সে ফয়সালাটি একমাত্র মহান আল্লাহর।তা নিয়ে মানুষের,জ্বিনের বা অন্য কোন জীবের কৃতিত্ব কোথায়? ব্যক্তি তো একমাত্র তা নিয়েই বড়াই করতে পারে যা তার নিজের অর্জন। তছাড়া আল্লাহর কাছে বান্দাহর মর্যাদার মানদন্ড হলো তাকওয়া তথা সদা আল্লাহভীতি ও তাঁর হুকুমের প্রতি আনুগত্য। অথচ শয়তান অহংকার করেছিল আগুনে সৃষ্ট হওয়া নিয়ে। এবং অবাধ্য হয়েছিল আল্লাহর হুকুম পালনে।সে অহংকার নিয়েই শয়তান হযরত আদম (আঃ)কে সিজদা করতে অস্বীকার করেছিল। এরূপ অহংকার ও অবাধ্যতা যে কতটা শাস্তি যোগ্য সেটির প্রমাণ মেলে শয়তানের প্রতি আল্লাহতায়ালার কঠোর শাস্তি থেকে। শয়তানকে শুধু জান্নাত থেকেই বহিস্কৃত করা হয়নি, বরাদ্দ হয়েছে অনন্ত অসীম কালের জন্য জাহান্নামের আযাবও। আর সে শাস্তিযোগ্য অহংকার ও অবাধ্যতা নিয়ে যে রাজনীতি সেটিই হলো জাতিয়তাবাদ ও বর্ণবাদ। সে রাজনীতির ব্যবসায় নেমেছিলেন মুজিব ও তার অনুসারিরা। মুসলিম বিশ্ব আজ খন্ডিত ও শক্তিহীন হয়েছে এ জাতিয়তাবাদী অপরাধিদের হাতে। ভেঙ্গে গেছে পাকিস্তানও। আরবগণ তো ট্রাইবালিজমের দিকে ধাবিত হয়েছে এবং আরবভূমিকে ২০টুকরোর বেশী খন্ডে বিভক্ত করেছে।এরূপ খন্ডিত ভূগোল নিয়ে কি মুসলিম উম্মাহ বিজয় বা গৌরব লাভ করতে পারে? একাত্তরে বাঙলী জাতিয়তাবাদীদের অবজ্ঞা ও ঘৃনা গিয়ে পড়েছিল অবাঙালীদের উপর। জাতিয়তাবাদ বা বর্ণবাদের আদি পিতা তাই শয়তান।হিটলার,মুজিব বা অন্য কেউ নয়। মুজিবের ন্যায় জাতিয়তাবাদী ও বর্ণবাদীরা শয়তানের অনুসারি মাত্র। দেশে শরিয়তের বিধান থাকলে সে অপরাধি চেতনা ও কর্মের কারণে মুজিব ও তার অনুসারিদের অবশ্যই শাস্তি হতো। প্রশ্ন হলো, জাতিয়তাবাদের ন্যায় এরূপ হারাম ধ্যান-ধ্যারণা মুসলিম দেশ ভাঙ্গার দলীল হয় কি রূপে? বাংলার মুসলমানদের দুর্ভাগ্যের কথা, ২০০৮ সালের ন্যায় ১৯৭০ সালেও সে জাতিয়তাবাদীরাই বিজয়ী হয়েছিল। মুসলিম দেশতো এভাবেই শয়তানের অনুসারিদের হাতে বার বার অধিকৃত হয়েছে। মুসলমানের লাগাতর জিহাদ তো সে অধিকৃতি থেকে মুক্তির।

 

পোষাক-পরিচ্ছদ, ভাষা ও খাদ্যের ভিন্নতাও কি দেশ-বিভাগের দলিল হতে পারে? পোষাক-পরিচ্ছদ, ভাষা ও খাদ্যের ভিন্নতা কোন দেশে নাই? ভারতে সে ভিন্নতা তো প্রচুর। কিন্তু তাই বলে কি ভারত ভেঙ্গে গেছে? তাছাড়া প্রতিবেশী হিন্দুর ঘরের মাছভাত বা মাংস যতই বাংলার হোক,কোন মুসলমান কি তা মুখে দিতে পারে? অথচ পাঞ্জাব,সিন্ধু,বেলুচিস্তান ও পাঠান মুলুকে এক মুসলমানের ঘরের রুটি-গোশত যত অবাঙালী হোক তা সে মহাতৃপ্তি নিয়ে খেতে পারে। কারণ তা হালাল। তাদের ঘরের ছেলে বা মেয়েকে নিজের ঘরে জামাই বা বউ বানিয়ে আনা যায়।কিন্তু পাশের ঘরের হিন্দু পরিবার থেকে কি তা সম্ভব? প্রতিবেশী হিন্দুগণ যতই প্রতিবেশী হোক তাদের সাথে মিলের চেয়ে অমিলটাই কি তাই বেশী নয়? সে অমিল গুলো এতই প্রকট যে তা নিয়ে ইংরেজ আমলেও একত্রে রাজনীতি করা সম্ভব হয়নি। মুসলমানগণ মুসলিম লীগ গড়েছে,হিন্দুরা গড়েছে কংগ্রেস ও হিন্দুমহাসভা। সে অমিলের কারণে ভারতকেও ভাঙ্গতে হয়েছে। অথচ বাঙালী কাপালিকগণ সেগুলি কখনই বিচারে আনেনি। তাছাড়া দুই প্রদেশের মাঝে দুরত্ব হাজার মাইল বা দুই হাজার মাইল হওয়াটিও কি মুসলিম দেশ ভাঙ্গার দলীল হতে পারে? বাংলা তো সাত সমুদ্র পারের ইংরেজ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত থেকেছে ১৯০ বছর।অথচ পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের দূরত্ব ছিল মাত্র ১২ শত মাইল। ইংল্যান্ড ৫ হাজার মাইল দূরে। হযরত ওমর (রাঃ)র আমলে ইরানের খোরাসান থেকে মিশরের দূরত্ব ছিল ২ হাজার মাইলের অধিক। সে সময় উড়োজাহাজ,স্টীমার, মটর গাড়ি বা রেলগাড়ি ছিল না। উট, গাধা ও ঘোড়া ছিল যোগাযোগের বাহন। অথচ সে আমলেও মুসলিম সাম্রাজ্যের সংহতি বেঁচেছে শত শত বছর। দিল্লির সাথে বাংলা থেকেছে বহুশত বছর। অথচ সে সময় দিল্লির শাসক মহলে বাঙালী মুসলমানের প্রবেশ ছিল না। অথচ কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর বাঙালী নাযিমুদ্দিনই তো পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন সহরোয়ার্দি ও বগুড়ার মহম্মদ আলী। অনেকে জাতীয় পরিষদের স্পীকার হয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিও হয়েছেন। পাকিস্তানে বাঙালীরাই ছিল দেশটির  সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক। ফলে সে দেশে থাকতে বাঙালী মুসলমানের অসুবিধা ছিল কোথায়? আওয়ামী লীগ নেতা সহরোয়ার্দি যখন জানতে পারেন মুজিবের মনে পাকিস্তান ভাঙ্গার কুমতলব বাসা বেঁধেছে,তাকে তিনি সাবধান করে দিয়েছিলেন। হিন্দুদের আগ্রাসী রূপটি জনাব সহরোয়ার্দি স্বচোখে দেখেছিলেন। ফলে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতা ও ভারতের অধীনতার মাঝে তিনি বাঙালী মুসলমানের ভয়ানক বিপদ দেখেছিলেন। কিন্তু মুজিব যে তার চিন্তা-চেতনা, কেবলা ও নেতা উভয়ই পাল্টিয়েছেন সেটি জনাব সহরোয়ার্দি তাঁর মৃত্যুর আগে দেখে যেতে পারেননি। আর এরূপ পরবর্তীত চেতনা ও কেবলার কারণেই আওয়ামী বাকশালীদের কাছে পুজণীয় ব্যক্তি এখন আর আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সহরোয়ার্দি নন, তাদের চেতনার মানচিত্র দখলে নিয়েছে গান্ধি, নেহেরু,ইন্দিরা ও রবীন্দ্রনাথ। এবং কেবলা রূপে গৃহিত হয়েছিল দিল্লি।

 

অপরাধি মুজিব

মুসলমানের রাজনীতির মিশনটি তার নিজের গড়া নয়। পবিত্র সে মিশনটি সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন মহান আল্লাহতায়ালা। সেটি যেমন “আমারু বিল মারুফ ওয়া নেহী আনিল মুনকার” তেমনি “ওয়া তাছিমু বি হাবলিল্লাহি জাময়াঁও ওয়া লা তাফাররাকু”। অর্থঃ “প্রতিষ্ঠা করো সুবিচার এবং নির্মূল করো অন্যায়” এবং “সমবেত ভাবে আঁকড়ে ধরো আল্লাহর রশি (তথা কোরআনকে) এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না।”–(সুরা আল ইমরান)। মুসলমান তাই স্রেফ ক্ষমতাদখলের লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করে না, শুধু সে লক্ষ্যে দলও গড়ে না। রাজনীতি করে রাষ্ট্রের বুক থেকে অবিচারের নির্মূল ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। এ বিশাল কাজ যেহেতু একাকী করা যায় না, এজন্য সে দলও গড়ে। তার রাজনীতি তখন গুরুত্ব পায় মুসলিম উম্মাহর জীবনে শক্তি ও সংহতি বৃদ্ধি। মু’মিনের রাজনীতিতে তাই মুসলিম দেশকে খন্ডিত করার এজেন্ডাটি অভাবনীয়। বরং থাকে ঐক্য ও সংহতি বাড়ানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্ঠা। দেশের ভূগোল ক্ষুদ্র করার বদলে থাকে ভূগোল বাড়াতে জানমালের বিপুল বিনিয়োগ। সে মিশন নিয়েই তুর্কি বীর ইখতিয়ার বিন বখতিয়ার খিলজি বাংলাকে কাফেরদের শাসন থেকে মুক্ত করেছিলেন।

 

ঘরে হিংস্র জানোয়ার ঢুকলে সেটি তাড়ানোতেই বুদ্ধিমত্তা। “নির্মূল করো অন্যায়” মহান আল্লাহর হুকুমটি তো এভাবেই পালিত হয়। কিন্তু সে হামলাকারি জন্তুটির কারণে ঘরে আগুন দেয়াটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দেশও তেমনি স্বৈরাচারের দখলে যেতে পারে। সে স্বৈরাচারি শাসক নানারূপ অবিচারও প্রতিষ্ঠা করতে পারে। মুসলমানগণ তো তখন লড়বে দেশ থেকে স্বৈরাচার সরাতে। লড়বে সুবিচারের প্রতিষ্ঠায়। সে স্বৈরাচারের কারণে দেশ ভাঙ্গা তো ফৌজদারি অপরাধ। অথচ মুজিব ও তার অনুসারিরা তো সে গুরুতর অপরাধের সাথেই জড়িত। দেশে স্বাধীনতা,সুবিচার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে মুজিবের কোন আগ্রহই ছিল না। সেগুলি বরং তিনি নিজ শাসনামলে বাংলাদেশেও প্রতিষ্ঠা হতে দেননি। তার একমাত্র এজেন্ডা ছিল যেকোন মূল্যে পাকিস্তান ভাঙ্গা ও মুসলমানদের শক্তিহীন করা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই মুজিব তাই দেশটির শত্রুতে পরিণত হন। সেটি বুঝা যায় পাকিস্তানের জেল থেকে ফিরে এসে ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারির সহরোয়ার্দি উদ্যানে দেয়া তার ভাষনে। সে জনসভায় মুজিব বলেছিলেন, পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির লক্ষে কাজ তিনি একাত্তরে শুরু করেননি,শুরু করেন ১৯৪৭ সাল থেকেই। অর্থাৎ পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম বছর থেকেই। (লেখক নিজ কানে সে কথাটি শুনেছেন।) পাকিস্তান ভাঙ্গার এ এজেন্ডা নিয়ে ভারতীয় শাসকচক্রের সাথে মুজিবের মনের মিলটি ছিল গভীর। ভারতের শাসক চত্রুটিও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই দেশটিকে মেনে নিতে পারিনি। ফলে মুজিবকে রিক্রট করা ভারতের জন্য এজন্যই অতি সহজ হয়ে যায়। পাকিস্তান ভাঙ্গার অভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে মুজিবের সাথে দিল্লির শাসক চক্রের গড়ে উঠে নিবীড় কোয়ালিশন। একাত্তরে পাকিস্তান ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু আজও বেঁচে আছে ভারতের সাথে আওয়ামী বাকশালীদের কোয়ালিশনটি।এখন লক্ষ্য,বাংলাদেশ থেকে ইসলামপন্থিদের নির্মূল। কারণ,বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের বিজয় ঘটলে পাকিস্তান ভাঙ্গার মূল লক্ষ্যটি বানচাল হয়ে যাবে। এ এজেন্ডাটি নিয়েও ভারতের সাথে বাকশালীদের মনের মিলটি অতি গভীর। ফলে বিপুল ভাবে বেড়েছে বাকশালীদের উপর ভারতের বিনিয়োগ।

 

গাদ্দারি বাঙালী মুসলমানের বিরুদ্ধে

ধোকাবাজগণ মনের আসল কথাটি কখনো বলে না। মুজিবও বলেননি। সেটি বললে জনগণকে ধোকা দেয়া যায় না। তাই সত্তরের নির্বাচন কালে পাকিস্তান ভাঙ্গাকে তিনি যেমন কোন ইস্যু বানাননি, তেমনি ভারতে আশ্রয় নেয়া, বাংলার বুকে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ডেকে আনার ন্যায় বড় বড় বিষয়গুলি নিয়েও জনগণ থেকে কোন ম্যান্ডেট নেননি। চাকর-বাকরেরা একমাত্র মনিবের হুকুমের তাঁবেদার, অন্যদের মতামত তাদের কাছে গুরুত্বহীন। মুজিবের কাছে তাই গুরুত্ব হারিয়েছিল দেশবাসীর মতামত। বাংলাদেশের জনগণ কি চাইলেো না চাইলো তা নিয়ে কোন ভ্রুক্ষেপ ছিল না। পাকিস্তান ভাঙ্গা নিয়ে এমনকি নিজ দলের এমপিদের নিয়েও তিনি কোন বৈঠক করেননি। কোন প্রস্তাবও পাশ করেননি। বিমান একবার হাইজ্যাক হলে সেটি কোন শহরে নামবে সে সিন্ধান্তটি হাইজ্যাকার যাত্রীদের মতামত নিয়ে নেয় না। মুজিব কোন বিমান হাইজ্যাক করেননি, হাইজ্যাক করেছিলেন একটি দেশ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনি বিজয়ের পর তিনি এক দেশবিনাশী হাইজ্যাকারে পরিণত হন। তিনি পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে নামেন একমাত্র ভারতীয়দের স্বার্থে,এবং ভারতীয়দের সাথে নিয়ে। মুজিব ভোট নিয়েছিলেন পাকিস্তানের সংবিধান রচনার এজেন্ডা নিয়ে। অথচ সে কাজে তার কোন আগ্রহই ছিল না। বরং দেশকে হাজির করেছিলেন ভারতের পদতলে। বলেছিলেন গণতন্ত্রের কথা,কিন্তু দিয়েছিলেন একদলীয় বাকশাল। দিয়েছিলেন সোনার বাংলার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু উপহার দিয়েছিলেন ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। বলতেন বাক স্বাধীনতার কথা। কিন্তু তালা ঝুলিয়েছিলেন সকল বিরোধী মতের পত্র-পত্রিকায়।

 

মুজিবের গাদ্দারিটা শুধু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছিল না। সেটি ছিল মূলত বাংলার মুসলমানদের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠি রূপে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের রাজনীতিতে এবং সে সাথে বিশ্বমুসলিম রাজনীতি ও বিশ্ব-রাজনীতিতে যে প্রভাব রাখতে পারতো মুজিব তা থেকে বঞ্চিত করেছেন। পূর্ব পাকিস্তানকে শুধু পৃথক করেই মুজিব বসে থাকেননি। দেশকে সুপরিকল্পিত ভাবে পরিণত করেন তলাহীন ভিখারীর ঝুলিতে। বাঙালী মুসলমানদের সে ভয়ানক ক্ষতিটা মুজিব করলো সেটি বুঝবার সামর্থ কি আওয়ামী নেতাকর্মীদের আছে? অথচ সেটি শুধু জানমালের ক্ষতি নয়, বরং বিশ্বের এ প্রান্তে ইসলামি সভ্যতার নির্মান কাজের ক্ষতি। ভারত ও তার সেবাদাস বাকশালীদের একাত্তর নিয়ে মূল উৎসবের মূল হেতুটি তো ইসলামের বিরুদ্ধে এই সফল নাশকতা। এমন কি প্রখ্যাত বাঙালী বুদ্ধিজীবী নিরোদ চন্দ্র চৌধুরিও বাঙালী মুসলমানের সে আসন্ন ক্ষতিটি একাত্তরে বিপর্যয়ের পূর্বেই বুঝতে পেরেছিলেন এবং তিনি তাঁর একাধিক ইংরেজী প্রবন্ধে ইন্দিরা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করতে। কারণ স্বচোখে তিনি দেখেছিলেন কলকাতার বাঙালীদের আত্মঘাতি রূপ। তাতে যে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানেও ভয়ানক আত্মঘাত শুরু হতে যাচ্ছে সেটি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। অথচ এই নিরোদ চৌধুরীই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙালী মুসলমানদের সাহিত্যে ও বুদ্ধিবৃত্তির মাঝে কলকাতার আত্মঘাতি বাঙালীদের তুলনায় জাগরণের সুর লক্ষ্য করেছিলেন।

 

স্বাধীনতা,গণতন্ত্র ও দেশবাসীর কল্যাণ –এসব ছিল মুজিবের ফাঁকা বুলি।এসব বুলি হাজারো বার আওড়ানো হয়েছিল স্রেফ জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্য। তার সে গণতন্ত্রের বুলি যে কতটা ধোকাবাজিপূর্ণ ছিল তা মৃত্যুর আগে মুজিব নিজেই প্রমাণ করে গেছেন। সেটি একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে। স্বাধীনতার সাথে তার গাদ্দারিটা প্রকাশ পায় ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি ও বাংলাদেশে উপর ভারতের একচ্ছত্র বাজার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। সীমান্ত বানিজ্যের নামে মুজিবই বিলুপ্ত করেছিলেন বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমান্ত। ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশর ভূমি বেরুবাড়ি। বিনিময়ে তিন বিঘা করিডোর ভারত থেকে আদায় করতে পারেননি। ভারতকে অধিকার দিয়েছিলেন পদ্মার পানি তুলে নেয়ার। অধিকার দিয়েছিলেন পাকিস্তান আর্মির অব্যবহৃত হাজার হাজার কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র লুন্ঠনেরও। অথচ সে অস্ত্র কেনায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানীদের। সেগুলি চীন বা রাশিয়ার ছিল না। বরং কেনা হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স থেকে। উন্নত মানের সে বিপুল অস্ত্র পরিকল্পিত ভাবে ভারতে নেয়া হয় বাংলাদেশকে সামরিক ভাবে পঙ্গু রাখার স্বার্থে। আজও্ বাংলাদেশ সে পরিমাণ অস্ত্রের মালিক হতে পারিনি যা একাত্তরে ছিল। কোন স্বাধীন দেশ কি বিদেশীদের এমন সুযোগ দেয়? কিন্তু মুজিব দিয়েছিলেন। মীর জাফরেরা সব সময়ই দেখে মনিবের স্বার্থ। মুজিবের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। দেশবাসীর জন্য মুজিবের উপহারটি ছিল নিছক দুর্ভিক্ষ, সে দুর্ভিক্ষে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু, রক্ষি বাহিনীর সন্ত্রাস, সীমাহীন অরাজকতা ও ভারতীয় শোষন। ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে এভাবেই একাত্তরে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বাঙালী মুসলমানের।

 

বন্দী ১৬ কোটি মানুষ

একাত্তরে পাকিস্তানের নিজের ক্ষতির অংকটি ছিল বিশাল। ভারতীয় হিন্দুদের হাতে একটি মুসলিম দেশের পরাজয়ের গ্লানিটা ছিল বেদনাদায়ক। কিন্তু পাকিস্তান নিজের ক্ষতিটা পুষিয়ে নিয়েছে। দেশটি এখন পারমাণবিক শক্তি। এদিক দিয়ে মর্যাদায় মুসলিম বিশ্বে দেশটির স্থান র্শীর্ষে। এ বিশাল মর্যাদা তাদের একাত্তরের অপমান ভূলিয়ে দিয়েছে। বহু পারমাণবিক বোমার পাশাপাশি দেশটি গড়ে তুলেছে শত শত দূরপাল্লার মিজাইলের ভান্ডার। ভারতের বৃহৎ শহরগুলো সে মিজাইলের আওতায়। ভারতীয়দের হাতে তাই কোন পাকিস্তানীকে সীমান্তে লাশ হতে হয় না। সেদেশের কাউকে গুলি খেয়ে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলতেও হয়না। পাকিস্তানের কেশাগ্র স্পর্শের সাহসও ভারতের নাই। ফলে দেশটির বিরুদ্ধে প্রথম ২৩ বছরে তিনবার যুদ্ধ হলেও বিগত ৪২ বছরে একবারও ভারতীয় তোপের মুখে পড়তে হয়নি। বড় কথা হলো,দেশটি ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত নয়।তাই ইসলামপন্থিদের সে দেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে ফাঁসিতে ঝুলতে হয় না। সে দেশে নিষিদ্ধ নয় কোরআনের তাফসির ও জিহাদ বিষয়ক বই। অথচ বাংলাদেশের চিত্রটি ভিন্ন।

 

একাত্তরে ৯২ হাজার পাকিস্তানী ভারতের হাতে পূর্ব পাকিস্তানে বন্দী হয়েছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলমান ভারত ও তার মিত্রবাহিনীর হাতে বন্দী। জেলখানায় খাদ্যপানীয় পাওয়া যায়। শয়নেরও জায়গা পাওয়া যায়। কিন্তু সেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকে না। কারারুদ্ধ অবস্থায় তাফসির মহফল,রাজনৈতিক সভা ও মিছিলে হাজির হওয়ার স্বাধীনতা থাকে না। স্বাধীনতা থাকে না নির্বাচনে অংশ নেয়ার। সেখানে দল গড়া বা দলীয় দফতর খোলা যায় না। অধিকার থাকে না পত্রিকা প্রকাশের এবং স্বাধীন ভাবে লেখা বা কথা বলার। বাংলাদেশে তো একই চিত্র। জেলখানা শুধু দেয়াল ঘেরা কারাগারগুলা নয়। বরং সমগ্র দেশ। আর আওয়ামী বাকশালীরা হলো এ জেলখানার কারারক্ষি। বাঙালী মুসলমানের এরূপ বন্দীশালায় রাখার কারণ, একাত্তরে পাকিস্তানা ভাঙ্গা সম্ভব হলেও ইসলামের চেতনাধারিদের নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। কোটি কোটি মানুষকে তো আর নির্মূল করা যায় না। কিন্তু তাদের জেলখানা রাখায় যায়। বাংলাদেশকে একটি জেলখানায় রূপ দেয়ায় গরজ তো এখানেই। ফলে ভারতের কাছে আওয়ামীবাকশালীদের কদর বেড়েছে জেলের নৃশংস পাহারাদার রূপে। ০১/০১/১৪



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Comments (1)
Article
1 Thursday, 27 February 2014 10:37
Mohammed Amirul Islam

Alhamdulillah. I get motivation and knowledge from your article. Pls keep up with the good work. Amirul Isalm

Last Updated on Friday, 28 February 2014 21:36
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.