Home ইতিহাস বাঙালী মুসলিমের এত ব্যর্থতা কেন?
বাঙালী মুসলিমের এত ব্যর্থতা কেন? PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Wednesday, 05 March 2014 21:36

মূল রোগটি কী?

অসুস্থ্য দেহে নানা রূপ রোগভোগ ও ব্যাথা-বেদনা থাকে।শুধু দুর্ভোগ ও যাতনাই নয়,কোন কোন ব্যাধি দ্রুত প্রাণনাশও ঘটায়।অসুস্থ্য জনগোষ্ঠির জীবনেও তেমনি দ্রুত ধ্বংস বা বিপর্যয় ডেকে আনে কিছু গুরুতর সামাজিক ব্যাধি।ডেকে আনে মহান আল্লাহর গজবও।সে ধ্বংস বা গজব থেকে বাঁচতে হলে চিকিৎস্যকদের ন্যায় রাষ্ট্রনায়কদের দায়িত্ব হলো জাতিধ্বংসী সে মূল রোগটিকে দ্রুত সনাক্ত করা ও চিকিৎসা করা। প্রশ্ন হলো,বাঙালী মুসলমানের জীবনে সে মূল রোগটি কি? ক্যান্সার নানারূপ লক্ষণ নিয়ে হাজির হয়।এ রোগে যেমন ক্ষুধা লোপ পায়,তেমনি শক্তি ও ওজনও কমতে থাকে।শরীরে লাগাতর ব্যথা-বেদনাও দেখা দেয়।তবে মূল রোগটি ব্যাথা-বেদনা,ওজনহ্রাস বা শক্তিহানি নয়,বরং সেটি হলো ক্যান্সার।ফলে ব্যাথা-বেদনা,ওজনহ্রাস বা শক্তিহানি সারাতে হলে ক্যান্সারের চিকিৎসায় হাত দিতে হয়।তেমনি অসুস্থ্য জাতির জীবনেও মিথ্যাচার,ব্যাভিচার,দুর্বৃত্তি,সন্ত্রাস,খুন-গুম,লুটতরাজ ও নানারূপ কুকর্মগুলো মূল রোগ নয়,বরং সেগুলি হলো মূল রোগের উপসর্গ। মূল রোগটি হলো জ্ঞানহীনতা।ইসলামের পরিভাষায় এটি জাহেলিয়াত।

 

অজ্ঞতাই যে সকল ধর্মীয়,নৈতীক,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাস্থ্যহানীর মূল কারণ এবং সেটি যে জাহান্নামের পথে টানার শয়তানি কৌশল -সে রায়টি কোন বক্তির ন্যয় বরং মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালার।অজ্ঞতার কারণে চেতনার ভূবনে তখন সৃষ্টি হয় ঘন কালো অন্ধকার।সে অন্ধকারের কারণেই মানুষ পথ হারায়,এবং জাহান্নামে পৌঁছে। মহান আল্লাহতায়ালা যেখানে আলোকিত পথে নেন,শয়তানের নেয় ঘন কালো অন্ধকারে। পবিত্র কোরআনের ভাষায়ঃ “আল্লাহই ঈমানদারদের অভিভাবক,তিনিই তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে নিয়ে আসেন।আর কাফেরদের অভিভাবক হলো শয়তান। সে তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়,তারাই হলো জাহান্নামের বাসিন্দা যেখানে তারা চিরকাল থাকবে।” -(সুরা বাকারা,আয়াত ২৬৭)।এখানে আলোকিত পথটি হলো কোরআনী জ্ঞানের।শয়তানসৃষ্ট অন্ধকারটি হলো জ্ঞানহীনতার।সে জ্ঞানহীনতাটি মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত ওহীর জ্ঞান না থাকার। ইসলামের মূল লড়াইটি তাই অজ্ঞতা হটিয়ে ওহীর জ্ঞানে বিশ্বকে আলোকিত করার।এ নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ঘোষণাঃ “আল্লাহ চান,সত্যকে তিনি সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং কাফেরদের শিকড় কেটে দিবেন। সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য হলো সেটি,যদিও অপরাধীগণ তা পছন্দ করে না।”-(সুরা আনফাল,আয়াত ৭-৮)।একমাত্র ওহীর জ্ঞানই দেয় জান্নাতের সঠিক পথটি খুঁজে পাওয়ার জ্ঞান।সে জ্ঞানের অভাব দেখা দিলে মানুষ নানারূপ ধর্মীয়,নৈতীক ও সাংস্কৃতিক রোগ নিয়ে বেড়ে উঠে। বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে বা বুদ্ধিবৃত্তিক সৃষ্টিশীলতায় সে রোগ থেকে মুক্তি ঘটে না।পিরামিড়ের নির্মাতারা ফিরাউনকে খোদা বলেছে তো সে অজ্ঞতার কারণেই।একই কারণে,শতকোটির বেশী মানুষের মাঝে মুতিপুঁজা আজও  বেঁচে আছে;এবং এখনও দেবতা রূপে গণ্য হয় গরু-বাছুর।এরূপ পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচাতে মহান আল্লাহতায়ালা নামায-রোযার আগে ওহীর জ্ঞানার্জনকে ফরয করেছেন।দেহের খাদ্য গাছপালা,কীট-পতঙ্গ এবং পশুপাখিও জোগার করতে জানে। এজন্য নবীরাসূলের প্রয়োজন পড়ে না।আসমান থেকে ফেরেশতা নেমে আসারও প্রয়োজন পড়ে না।কিন্তু জান্নাতের পথ খুঁজে পাওয়া ও সুস্থ্য চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠার জন্য অপরিহার্য যে জ্ঞান সেটি একমাত্র অহীর জ্ঞানেই পাওয়া যায়।এজন্য মানবসৃষ্টির পর অপরিহার্য হয় নবী-রাসূলে প্রেরণ,এবং প্রথম মানুষটি নিজেও ছিলেন একজন নবী।মুসলমানদের হাতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ যে সভ্যতাটি নির্মিত হয়েছিল তার মূলে ছিল মহান আল্লাহতায়ালার প্রদত্ত ওহীর এই জ্ঞান।সে জ্ঞানের বলেই আরবের আদিম বর্বরতা থেকে তারা মহামানবের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন।পাশ্চাত্যবাসী ক্ষেত-খামার বা কলকারখানায় উৎপাদন বাড়ালেও ওহীর জ্ঞানের অভাবে মানবতায় সমৃদ্ধ মানুষ গড়তে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ব্যর্থ হয়েছে মানবিক সভ্যতা গড়ায়। বরং বাড়িয়েছে অসভ্যতা। সে অসভ্যতার প্রমাণ শুধু উলঙ্গতা,অশ্লিলতা,ব্যভিচার ও সমকামিতা নয়,বরং সেটি বিশ্বজুড়া সাম্রাজ্যবাদি লুন্ঠন,গণহত্যা ও সম্পদের বিনাশে। মাত্র বিগত দুটি বিশ্বযুদ্ধেই তারা সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করেছে। বিনাশ করেছে বিপুল সম্পদ যা দিয়ে বহু শত বছরের জন্য সমগ্র মানবজাতির পানাহার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা যেত। তারা উৎসব ভবে নির্মূল করেছে আমিরিকার রেড-ইন্ডিয়ান,অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের আদিবাসীদের।নিরস্ত্র মানুষের উপর ড্রোন নিক্ষেপ ও গণহত্যা এখনো শেষ হয়নি।

 

যে ফরজটি পালিত হয়নি

ওহীর জ্ঞান প্রতিষ্ঠা না পেলে অসম্ভব হয় রাষ্ট্রে বা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা।ওহীর জ্ঞান ছাড়া শান্তি আসতে পারে -এমনটি বিশ্বাস করাই মহান আল্লাহতায়ালার সাথে বেঈমানি। ঈমান তো হলো আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত কোরআনী বিধানের প্রতি অটল আস্থা নিয়ে বেড়ে উঠা।এখানে সামান্যতম আপোষ চলে না।যে রাষ্ট্রে সে বিধানের প্রয়োগ নাই সে রাষ্ট্র ইতিহাস গড়ে ব্যর্থতায়।সে সাথে ভয়ানক ব্যর্থতা দেয় পরকালে -সেটি জাহান্নামের আগুনে পৌঁছিয়ে।ওহীর জ্ঞানার্জন এজন্যই ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ।এ ফরজটি পালিত না হলে অন্যান্য ফরজ পালন অসম্ভব হয় পড়ে।কিন্তু বাঙালী মুসলমানের জীবনে জ্ঞানার্জনের ফরজটি যথার্থ ভাবে পালিত হয়নি।এটিই বাঙালী মুসলমানের মূল রোগ।এ ব্যর্থতা থেকেই জন্ম নিয়েছে অন্যান্য ব্যর্থতা।এ মূল রোগটির চিকিৎস্যা নিয়ে যে শুধু অবহেলা হয়েছে -তা নয়। এ ঘাতক রোগটি যে তাদের মধ্যে প্রবল ভাবে বাসা বেঁধে আছে,সেটি জানতেও তারা আগ্রহ দেখায়নি।অথচ মানব সৃষ্টির জন্য মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দান সন্তান-সন্ততি বা ধনসম্পদ নয়,সেটি হলো পবিত্র কোরআন। কোরআনের মাধ্যমেই মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর বান্দাহর সাথে কথা বলেন। মানুষকে তিনিই জান্নাতের পথ দেখান এবং রক্ষা করেন জাহান্নামের আগুন থেকে। চলার পথে এটিই একমাত্র সঠিক পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকীম। মানুষের এ মহাউপকারটি জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যকোন শাখা কি করে? বিজ্ঞানীরা বিস্ময়কর যন্ত্র আবিস্কার করে,ভোগের আয়োজনও বাড়ায়। কিন্তু জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচার পথ কি দেখায়? সে মহাকল্যাণটি করেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা।সে সামর্থটি একমাত্র তাঁর। মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ভাষায়,“ইন্না আলায়নাল হুদা।” অর্থঃ নিশ্চয়ই পথ দেখানোর দায়িত্বটি আমার।” এবং প্রদর্শিত সে পথটি হলো পবিত্র কোরআনের পথ।মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে বান্দাহর জন্য এটিই হলো সবেচেয়ে বড় দান।এ দানটি না জুটলে জাহান্নাম জুটে।তাই মু’মিনের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া বা সর্বশ্রেষ্ঠ চাওয়াটি ধনসম্পদ বা সন্তান-সন্ততি চাওয়া নয়,বরং সিরাতুল মুস্তাকীম চাওয়া।“এহদিনাস সিরাতুল মুম্তাকীম” অর্থাৎ সিরাতুল মুস্তাকীম দেখাও হে করুণাময় মহান আল্লাহও –এ দোয়াটিও তিনি শিখিয়ে দিয়েছেন। প্রতিটি নামাযে সে দোয়াটি পাঠ করতে হয়। বান্দাহর সে চাওয়াটি পুরণ করতেই মহা আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআন নাযিল করেছেন। তাই কোরআনের জ্ঞান ছাড়া কি সিরাতুল মুস্তাকীম পাওয়া যায়? ভাবা যায় কি জান্নাতপ্রাপ্তির কথা? সম্ভব কি মুসলমান হওয়া? ঈমানের মূল পরিচয়টি তো সিরাতুল মুস্তাকীমে পথচলার মধ্যে। কিন্তু যে ব্যক্তিটি কোরআনে বর্নিত সিরাতুল মুস্তাকীমটি জানতেই চেষ্টা করলো না এবং কোরআন বুঝার সামর্থই অর্জন করলো না -সে ব্যক্তি সে পথটি পাবে কেমনে? মানব জীবনের এটিই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। মানুষ তখন ভ্রান্ত পথে ভোট দেয়,শ্রম দেয় এবং অর্থ ও প্রাণ দেয়। অতিশয় বেঈমান ও দুর্বৃত্তরাও তখন জাতির নেতা বা পিতার মর্যাদা পায়। তখন মুসলিম ভূমিতে জাতিয়তাবাদী,সমাজবাদী,স্বৈরাচারি,ফেরকাবাদী,রাজতন্ত্রি ও সেক্যুলারিস্ট পথভ্রষ্টগণও অগণিত সমর্থক ও সৈন্য পায়। তাই কোরআনী জ্ঞানের আলেম হওয়া শুধু মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের কাজ নয়,সেটি ফরজ প্রতিটি মুসলিম নরনারীর উপর। নইলে সে ব্যক্তির মুসলমান হওয়াটিই বিপদে পড়ে। পবিত্র কোরআনের ঘোষণাঃ “ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহি উলামা” অর্থঃ সমগ্র মানবসৃষ্টির মাঝে একমাত্র (ওহীর জ্ঞানে)আলেমগণই আমাকে ভয় করে।” অর্থাৎ মনে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি তথা ঈমান সৃষ্টির জন্য আলেম হওয়াটি পূর্বশর্ত। এছাড়া ভিন্ন পথ নেই।তাই নবীকরীম (সাঃ)এর আমলে এমন কোন সাহাবী ছিলেন না যিনি কোরআনের জ্ঞানে জ্ঞানী ছিলেন না। কিন্তু ক’জন বাঙালী মুসলমানের সামর্থ আছে সে কোরআন বুঝার? অথচ কোরআন বুঝার সে সামর্থটি অর্জনের তাগিদেই মিশর,সূদান,মরক্কো,আলজিরিয়া,তিউনিসিয়া,লিবিয়া,ইরাক,ইয়েমেনসহ বহুদেশের জনগণ মাতৃভাষাকে দাফন করে আরবি ভাষাকে নিজেদের ভাষা রূপে গ্রহণ করেছিল।অথচ নিছক চাকুরি-বাকুরি ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে কোটি কোটি বাঙালীর কাছে ইংরেজী,হিন্দি,ফরাসী,এমনকি চায়নিজ ভাষার ন্যায় ভাষা শিক্ষা গুরুত্ব পেলেও কোরআনের ভাষা ও কোরআন শিক্ষা কি গুরুত্ব পেয়েছে? গুরুত্ব না পাওয়ার কারণ,অর্থলাভ ও চাকুরি লাভ যতটা গুরুত্ব পেয়েছে,সেরূপ গুরুত্ব আল্লাহর হুকুম পালন ও মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাটি পায়নি।মহান আল্লাহর কাছে কি এ অবহেলার জবাব দিতে হবে না? কোরআনের যে পাঠটি মহান আল্লাহরাব্বুল আলামিন বাধ্যতামূলক করলেন সেটি পালন না করায় কি মহান আল্লাহর করুণা বাড়বে? ১৯কোটি বাঙালী মুসলমানদের ক’জন জীবনে অন্ততঃ একবার মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান পবিত্র কোরআন অর্থসহ একবার পড়ার চেষ্ঠা করেছে? ক’জন চেষ্টা করেছে কোরআনের ভাষা শিক্ষার? পথচলাটি সঠিক পথে না হলে প্রতিকদম চলায় বিপদ বাড়ে। সে বিপদ থেকে বাঁচতে হলে পদে পদে রোড-ম্যাপটি দেখতে হয়। সে জন্য জরুরী হলো রোড-ম্যাপটি পড়া ও বুঝার সামর্থ। কিন্তু সে সামর্থ ক’জন বাঙালী মুসলমানের? ফলে তাদের জীবনে বেড়েছে সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে লাগাতর ভ্রষ্টতা।বেড়েছে আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।এবং বাড়েনি আল্লাহর শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ।বাংলার মুসলিম জনপদে এজন্যই তো এত খুন-গুম,এত ব্যাভিচার ও এত অশ্লিলতা।এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে অসংখ্য সূদী ব্যাংক,পতিতাপল্লি ও কুফরি আদালত।একটি জনগোষ্ঠি যে কতটা বিকট ভাবে পথভ্রষ্ট এগুলো তো তারই পরিমাপ দেয়। এ পথভ্রষ্টতা যে জাহান্নামে পৌঁছার সোজা পথ -সে হুশই বা ক’জনের?

 

মিথ্যাচার যেখানে ক্রিয়েটিভিটি

গড়ার কাজে শর্ত হলো,সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সর্বপ্রথম শুরু করতে হয়। প্রাসাদ গড়তে হলে তাই ভিতটি প্রথমে গড়তে হয়। তেমনি উচ্চতর সভ্যতা গড়ার কাজে মানুষ গড়াকে প্রায়োরিটি দিতে হয়ে। মানুষ গড়ার সে কাজটি শুরু করতে হয় কোরআনের জ্ঞানার্জন দিয়ে। সে জ্ঞান দিয়েই নির্মিত হয় ব্যক্তির তাকওয়া ও চরিত্র। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে তাই প্রাসাদ,পিরামিড বা তাজমহল গড়ার চেয়ে প্রায়োরিটি পেয়েছিল কোরআনি জ্ঞানের প্রসার। ফলে সে আমলে কোরআনী জ্ঞানের যত আলেম সৃষ্টি হয়েছেন তা আর কোন কালেই হয়নি।অথচ বাংলাদেশে সে কাজটির শুরু প্রথমে যেমন হয়নি,পরেও হয়নি। বরং সৃষ্টিশীল সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তির নামে যা হয়েছে তা হলো নিরেট মিথ্যাচার।কোরআনের তাফসির,হাদীসগ্রন্থ, নবীচরিত্র,ইতিহাস,দর্শন,বিজ্ঞান,সমাজবিজ্ঞান,কৃষিবিজ্ঞান,গবেষণাগ্রন্থের চেয়ে বহুগুণ বেশী লেখা হচ্ছে কবিতা,গল্প ও উপন্যাস। দেশে এগুলিই বেশী বিক্রি হয়। চেতনায় পুষ্টির বদলে এগুলী বিষই বেশী চড়াচ্ছে।বিষ ব্যবসায়ীদের সে মিথ্যাচারকে বলা হয় ক্রিয়েটিভিটি।প্রশ্ন হলো,মিথ্যুকের মিথ্যা থেকে গল্প,উপন্যাস বা কবিতায় যে মিথ্যার জাল বুনা হয় তার পার্থক্যটি কোথায়? বঙ্গিম চন্দ্র উপন্যাসের নামে মিথ্যার জাল বুনেছিলেন মুসলিম চরিত্র হননে।রবীন্দ্রনাথও সৃষ্টিশীলতার নামে দরিদ্র মুসলিম প্রজা অসিমদ্দিনকে হিন্দু জমিদারের জারজ বানিয়েছেন।আর আজ সেটি হচ্ছে ইসলাম ও ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে।

 

যে সমাজে মিথ্যানির্ভর এরূপ ক্রিয়েটিভিটি ব্যাপকতর হয় সে সমাজে বেড়ে উঠে নানারূপ নৈতিক বিপর্যয়।এমন ক্রিয়েটিভিটির দোহাই দিয়ে সালমান রুশদি তার “স্যাটানিক ভার্সেস” এর ন্যায় শয়তানি মিথ্যাচার রচনা করেছিল মহান আল্লাহতায়ালা¸তাঁর রাসূল ও ফিরেশতাদের বিরুদ্ধে। সাহিত্যের নামে সে মিথ্যাকে বিশ্বময় প্রচারের আইনগত  বৈধতাও চেয়েছিল। অপরদিকে নারী-পুরুষের যৌন ক্ষুধায় উত্তেজনা সৃষ্টির লক্ষ্যে গল্প,কবিতা ও উপন্যাসকে হাতিয়ার রূপে বেছে নিয়েছে বাংলাদেশের সাহিত্যিকেরা।সে সাথে তারা লাগাতর মিথ্যার জাল বুনছে এবং বিষ ছড়াচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধেও। বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তির নামে জ্ঞানচর্চা নয়,বরং এরূপ মিথ্যা উৎপাদন বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে। বইমেলার নামে সে শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের মেলা বসে প্রতিবছর পুরা ফেব্রেয়ারি মাস ধরে। মিথ্যাকে বাজারজাত করণের এ বইমেলার পরিসর যতই বড় হচ্ছে,ততই বাড়ছে বাঙালীর চারিত্রিক রোগ ও বিপর্যয়। মুসলমানগণ অতীতে যখন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মাণ করে তখন কি ক্রিয়েটিভিটির নামে এরূপ মিথ্যার জাল বুনা হয়েছিল? লিখিত হয়েছিল কি এরূপ গল্প,উপন্যাস,কবিতা ও নাটক? মিথ্যা সর্বত্রই পাপ,সেটি যেমন কবিতায়,তেমনি গল্পে ও উপন্যাসে।ক্রিয়েটিভিটি বা সৃষ্টিশীলতার নামে ভয়ানক মিথ্যাচার যেমন সাহিত্য ও শিল্পের ময়দানে হতে পারে,তেমনি হতে পারে ধর্মের ময়দানেও। ধর্মের ময়দানে সে সীমাহীন ক্রিয়েটিভির ফলে সৃষ্টি হয়েছে শত শত ধর্মমত,ফেরকা ও তরিকা।সে সৃষ্টিশীলতায় যেমন নানা অবয়বের লক্ষ লক্ষ মুর্তি যেমন গড়ে উঠেছে,তেমনি সেসব মুর্তির নামে প্রচার পেয়েছে নানারূপ মিথ্যা কল্পকথা ও উপখ্যান।শয়তানের বড় হাতিয়ারে হলো মানব মনের এরূপ উর্বর ত্রিয়েটিভিটি। এর ফলে যীশু খৃষ্ট যেমন আল্লাহর পুত্র রূপে প্রচার পেয়েছেন,তেমনি ভগবানে পরিণত হয়েছে ফিরাউন,নমরুদ,শ্রীকৃষ্ণ,রাম,গনেশের সাথে বানর,হনুমান,গরুবাছুর,শাপ-শকুন ও আরো কতকিছু।আর গাঁজাখোর উলঙ্গ কাপালিকগণ পরিণত হয়েছে পবিত্র ব্যক্তিতে।

 

কবিরা গুনাহর রাজনীতি

বাঙালী মুসলমানের রাজনৈতিক ব্যর্থতাটিও বিশাল। মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের দায়ভারটি স্রেফ কলকারখানা প্রতিষ্ঠা,স্বাস্থ্যসেবা,রাস্তাঘাট নির্মান,ডাক যোগাযোগ বা চাকুরি-বাকুরি দেয়া নয়। মূল দায়িত্বটি হলো আল্লাহর নির্দেশিত সিরাতুল মুস্তাকীমে চলায় ও কোরআনের জ্ঞানার্জনে মুসলিম নাগরিকদের সর্বপ্রকার সহায়তা দেয়া। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রজার সবচেয়ে বড়কল্যাণটি একমাত্র তখনই হয়। প্রজাদের ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠা ও জান্নাত প্রাপ্তিটির সম্ভাবনাটি তখন বৃদ্ধি পায়। এবং মুক্তি মেলে জাহান্নামের আযাব থেকে। একাজ নবী-রাসূলদের। রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে তাই স্বয়ং মহান নবীজী(সাঃ) বসেছেন। এবং নবীজী (সাঃ)র ইন্তেকালের পর তাঁর মহান খলিফাগণ সে আসনে বসেছেন।কিন্তু বাংলাদেশে সেটি ঘটেনি।দেশটির শাসনক্ষমতায় বসেছে শয়তানের খলিফাগণ। আল্লাহর শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করা ও ইসলামপন্থিদের হত্যা করাই যাদের মিশন।এটিই হলো একটি মুসলিম রাষ্ট্রের বুকে মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ,এবং সবচেয়ে বড় অপরাধ। সাহাবায়ে কেরামের সময় এমন বিদ্রোহ ও অপরাধ হলে মুসলমানগণ জিহাদ শুরু করে দিত। কিন্তু লক্ষ লক্ষ আলেম-উলামা ও মসজিদের দেশে তেমন কিছুই হয়নি। সাধারণ মুসলমানগণ দূরে থাক,এমনকি আলেমগণও মসজিদের মিম্বর বা মাদ্রাসার আঙ্গিণা ছেড়ে ময়দানে নেমে আসেননি।দুর্বৃত্ত শাসকদের বিরুদ্ধে তারা কোনরূপ প্রতিবাদ করেননি। তাদের এ নিরবতার কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কবিরা গুনাহর রাজনীতি। শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা রোধ ও জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানোই সে রাজনীতির মূল লক্ষ্য।তাদের উদ্দেশ্য,আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বদলে নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা,এবং সেটি জনগণের সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে।তখন বিপুল সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগে জোয়ার আসে কবিরা গুনাহর। তখন সূদভিত্তিক ব্যাংক,বীমা,লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন বাড়ে,তেমনি বাড়ে জুয়া,মদ্যপান,অশ্লিলতা,পতিতাবৃত্তি ও ব্যাভিচার। বাড়ে চুরি-ডাকাতি,সন্ত্রাস,খুন ও নানারুপ দুর্বৃত্তি।দুর্বৃত্তিতে বাংলাদেশের বিশ্বরেকর্ড গড়ার হেতু তো এটাই।

 

বাঙালী মুসলমানগণ সংখ্যায় প্রায় ১৯ কোটি। এর মধ্যে ১৫ কোটির বাস বাংলাদেশে। বাঁকি প্রায় ৪কোটি বাস করে ভারতের পশ্চিম বাংলা,আসাম ও অন্যান্য রাজ্যে।পশ্চিম বাংলার শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ এবং আসামের প্রায় ৩৫ ভাগই মুসলমান।বহুলক্ষ মুসলমানের বাস মায়ানমারের আরাকানে।আরো প্রায় এক কোটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সারা বিশ্বে।সংখ্যা-বিচারে বাঙালী মুসলমানগণ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তৃতীয়। ইন্দোনেশিয়ান ও আরবদের পরই তাদের স্থান। গাছের সংখ্যা বাড়লে ফলের উৎপাদনও বাড়ে।তেমনি জনসংখ্যা বাড়লে শক্তি-সামর্থ এবং ইজ্জতও বাড়ে। কিন্তু বাঙালীর মুসলমানের ক্ষেত্রে সেটি ঘটেনি। বরং ইতিহাস গড়েছে শক্তিহীনতা,ব্যর্থতা ও অপমানে। সামনে না এগিয়ে বাংলাদেশ দ্রুত পিছনে ছুটছে।দুর্নীতির দমনের চেয়ে প্রসারে কাজ করছে দেশের সরকার,পুলিশ ও প্রশাসন। ফলে অপরাধে ছেয়ে গেছে দেশ।দেশ বা জাতির জীবনে ইঞ্জিনের কাজ করে রাজনীতি। সেটি যখন হাইজ্যাক হয় অপরাধীদের হাতে তখন মসজিদ-মাদ্রাসায় ফেরেশতাদের বসিয়েও লাভ হয়না। এজন্যই নবীজী ও সাহাবাদের আমলে দেশের সবচেয়ে যোগ্যমান ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে বসানো হয়েছে।তাই নবীজী(সাঃ)বেঁচে থাকতে অন্য কাউকে সেখানে বসানো হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো,ইসলামের সে ইতিহাস থেকে কি আদৌ শিক্ষা নেয়া হয়েছে? ফলে গুরুতর প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দেয়,আলেমগণ বছরের পর বছর ধরে মাদ্রাসায় কি শেখেন বা শেখান তা নিয়ে।

 

বিজয়োৎসব শত্রুপক্ষের

প্রতিটি জীবেরই ভাষা থাকে।বাঙালী মুসলমানেরও তেমন একটি ভাষা আছে। বাঙালীর প্রচন্ড গর্ব বাংলা ভাষা নিয়ে। এ ভাষাকে অনেকে খোদার সেরা দানও বলেন। কিন্তু ভাষার কাজ তো শুধু কথা বা ভাবের বাহন হওয়া নয়,জনগণের ঈমান ও চেতনায়ও তাকে পুষ্টি জোগাতে হয়। নইলে মারা পড়ে ঈমান ও মানবতা। রাষ্ট্রে তখন মনুষ্য রূপী পশুর আবাদ বাড়ে।বাড়ে ভয়ানক বিবেকহীনতা।নল বেয়ে যেমন পানি আসে,তেমনি ভাষার মাধ্যমে আসে জ্ঞান।তবে জীবনরক্ষাকরি পানিও ভয়ানক প্রাণনাশী হতে পারে যদি তা রোগ-জীবাণূর বাহন হয়। মহল্লায় তখন মহামারি লাগে।তেমনি দুষিত ধ্যানধারনার বাহন হয়ে জনগণের চেতনা রাজ্যে মহামারি আনতে পারে ভাষা। তখন কি সে ভাষাকে খোদার সেরা দান বলা যায়? খোদার সেরা দান তো তখনই বলা যায় যখন সেটি সেরা কল্যাণটি করে। সে সেরা কল্যাণটি তো জান্নাতপ্রাপ্তি। কিন্তু সে সামর্থ বাংলা ভাষার কতটুকু? রবীন্দ্রসাহিত্য,বংকিমসাহিত্য,শরৎসাহিত্য বা পুঁথিসাহিত্যে কি সে সামর্থ বাড়ে?

 

১৯ কোটি বাঙালী মুসলিমের চেতনায় পুষ্টির প্রয়োজনটি বিশাল। অথচ আজ  থেকে মাত্র ৬০ বা ৭০ বছর আগে বাংলা ভাষায় পবিত্র কোরআনের একখানি তর্জমা বা তাফসির গ্রন্থও প্রকাশিত হয়নি।প্রকাশিত হয়নি কোন পরিপূর্ণ হাদীস গ্রন্থ।রচিত হয়নি নবীচরিত,ইসলামের দর্শন ও ইতিহাস বিষয়ক কোন নির্ভরযোগ্য বই। রচিত হয়নি আরবি,ফার্সি বা উর্দু ভাষা শিক্ষার কোন অভিধান। যা হয়েছে তা তর্জমা। মৌলিক বই লেখার সামর্থ ক’জনের? আজ  থেকে হাজার বছর আগে আরবি ও ফারসী ভাষা যে মানে পৌছেছিল বাংলা ভাষা আজও  সে মানে পৌঁছতে পারেনি।ভাষার এ ব্যর্থতাই বলে দেয় আগামী প্রজন্ম কোন দিকে যাবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যর্থ খাতটি কৃষি,ব্যবসা-বাণিজ্য বা শিল্প-কলকারখানা নয়।বরং সেটি শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তির খাত। ফলে স্কুল-কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়লেও দেশবাসীর সুশিক্ষা বাড়েনি।এমন ব্যর্থতার কারণ,বাঙালী মুসলিম গায়ে-গতরে খাটলেও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে সময়,শ্রম ও অর্থের বিনিয়োগ তেমন করেনি।অথচ সন্তান জন্মদানের পর পিতামাতার বড় দায়িত্বটি শুধু খাদ্য জোগানো নয়,শিক্ষা জোগানোও।পশু থেকে এখানেই মানুষের পার্থক্য।পশু শুধু খাদ্য জোগায়। কিন্তু মানুষকে খাদ্যের পাশাপাশি জ্ঞানও জোগাতে হয়।উন্নত দেশে তাই শুধু ফসলের আবাদই বাড়ে না¸বিপুল ফসল ফলে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানেও। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ পাট-মাছ-চা রফ্তানি করে যা আয় করে ইংল্যান্ডের সাড়ে ৫ কোটি মানুষ তার চেয়ে বেশী আয় করে বই বিক্রি করে।একটি জনগোষ্ঠির আসল পরাজয়টি তো ঘটে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে।বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পরাজয়টি বিশাল। এমন একটি পরাজিত ভূমি দখলে শত্রুশক্তির কাছে অস্ত্রযুদ্ধ তখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সে কারণে বাংলাদেশ তো যুদ্ধ ছাড়াই শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত একটি দেশ।শত্রুর পক্ষে বরং যুদ্ধটি লড়ে দিচ্ছে মুসলিম নামধারি বিপুল সংখ্যক বিপথগামি সেক্যুলারিস্টরা।এ যুদ্ধটি যেমন কলমের,তেমনি অস্ত্রের।এককালে যারা ব্রিটিশ বাহিনীর সৈন্যরূপে ইরাক,ফিলিস্তিনে গিয়ে যুদ্ধ লড়ে মুসলিম ভূমি ব্রিটিশের হাতে তুলে দিয়েছিল তারাই এখন নিজভূমিকে শত্রুর হাতে তুলে দিচ্ছে। তাই শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা রুখতে,আলেম-উলামাদের লাশ ফেলতে,কোরআনের তাফসির বন্ধ করতে ও জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করতে বিদেশী কাফের সৈনিকদের নামতে হচ্ছে না।

 

দেশে খাদ্যের অভাব দেখা দিলে ভিন দেশ থেকে খাদ্য আমদানি করাই রীতি। নইলে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং তাতে বহু মানুষের জীবননাশ হয়। তেমনি মাতৃভাষায় জ্ঞানের পর্যাপ্ত আয়োজন না থাকলে ভিন ভাষা শিখে সে জ্ঞান সংগ্রহ করতে হয়।নইলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় জ্ঞানের রাজ্যে। তখন পুষ্টিহীনতায় মৃত্যু ঘটে মানবতার।চেতনায় পুষ্টি জোগানোর সে সামর্থ বাংলা,পাঞ্জাবি,সিন্ধি,পশতু,বেলুচ,তামিল,গুজরাটির ন্যায় অধিকাংশ ভারতীয় ভাষার ছিল না। কিন্তু সামর্থটি আরবি-ফার্সির যেমন ছিল,তেমনি উর্দুরও ছিল। ফলে বিভিন্ন ভাষার ভারতীয় মুসলমানগণ শত শত বছর ধরে আরবি-ফার্সি যেমন শিখেছে এবং পরবর্তীতে তেমনি উর্দু শিখেছে এবং বাঁচিয়ে রেখেছে নিজেদের ঈমান ও ইসলামি চেতনা।ইংরেজরা ফার্সিকে বিদায় দিয়েছে। উর্দুকেও দাবিয়ে রাখার চেষ্ঠা করেছে। কিন্তু ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মুসলমানগণ নিজেদের চেষ্টায় উর্দুকে শুধু বাঁচিয়েই রাখেনি,সমৃদ্ধও করেছে। কিন্তু ইসলামের দুষমণদের সেটি ভাল লাগেনি। তারা তো চায়,মুসলমানগণ ওহীর জ্ঞানের সাপ্লাই লাইন থেকে বিচ্ছিন্ন হোক,এবং মারা পড়ুক তাদের ঈমান ও ইসলামি ধ্যান-ধারনা। ফলে তাদের কাছে গুরুত্ব পায় উর্দুর সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কাজ। এলক্ষ্যে গড়ে তোলে উনিশ’শ বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন। বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের শত্রুপক্ষের এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিজয়। সেটি ছিল সেক্যুলারিজমের বিজয়। বাঙালী মুসলমানের ব্যর্থতার বড় কারণ এই ভাষার দৈন্যতা। বাংলাদেশের মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজ মূলতঃ তখনই বেগবান হয়। মারা পড় প্যান-ইসলামিজম। ভাষা আন্দোলনের সফলতার সে ফসলটি ইসলামের শত্রুপক্ষ এখনও মহোৎসবে ঘরে তুলছে। উর্দুর সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্নতার ফলে ইসলামের যে কত বড় ক্ষতি হয়েছে সেটি ইসলামপন্থি বহু নেতাকর্মী না বুঝলেও ইসলামের শত্রুপক্ষ বুঝে। এ খুশিতেই ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের উৎসবটি তারা ফেব্রেয়ারির পুরা একটি মাস ধরে উদযাপন করে।সে বিজয়কে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তারা দেশের আঁনাচে কাঁনাচে শহীদ মিনারের নামে বিজয় স্তম্ভ গড়েছে।

 

বুদ্ধিবৃত্তিতে আত্মঘাত

যে প্রাণনাশী আঘাতটি একান্তই নিজের পক্ষ থেকে ঘটে –সেটিকেই বলা হয় আত্মঘাত। বাঙালী মুসলমানের জীবনে এমন আত্মঘাত কি কম? সেটি বেশী বেশী হয়েছে সাহিত্যের নামে বিষপানের মধ্য দিয়ে। মুসলমানের চেতনার খাদ্য আর হিন্দুর চেতনার খাদ্য এক নয়। মুসলমানের হারাম-হালাম শুধু খাদ্য-পানীয়ে নয়,সাহিত্যেও। যে ভাষায় ওহীর জ্ঞান তথা কোরআন-হাদীসের জ্ঞান নেই সে ভাষায় অসম্ভব হয়ে পড়ে ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠা।বাংলার তুলনায় আরবি,ফারসী ও উর্দুর এখানেই শ্রেষ্ঠত্ব যে এ তিনটি ভাষায় রয়েছে ইসলামি জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার –যা গড়ে উঠেছে শত শত বছর ধরে। অপরদিকে আধুনিক বাংলা ভাষাটি গড়ে উঠেছে বাঙালী হিন্দুদের মনের ক্ষুধা পুরণের লক্ষ্যে। বাংলা ছাপাখানার কাজটি প্রথম শুরু করেছিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ব্রিটিশ পাদ্রীগণ। তাদের এজেন্ডা ছিল বাঙালীর মাঝে খৃষ্টান ধর্মের প্রচার।ছাপাখানার সে অগ্রগতি থেকে ফায়দা নিতে ময়দানে নামেন ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর,রাজা রামমোহন রায়,ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত,বংকিমচন্দ্র,রবীন্দ্রনাথ নবীনচন্দ্র,হেমচন্দ্র,মোহিতলাল ও শত শত হিন্দু সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা। তাদের সাহিত্যের মূল লক্ষ্যটি ছিল হিন্দুদের মাঝে রেনাসাঁ আনা -সেটি বেদ-পুরান-রামায়ন-মহাভারতের চেতনায়। সে সাথে প্রবল অব্জ্ঞা বাড়ানো হয় প্রতিবেশী মুসলমানদের বিরুদ্ধে। বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে মুসলমান সেটি কি তাদের সাহিত্য পড়লে বুঝা যায়? নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে বাঙালী মুসলমানদের এ জন্যই অন্য পথ ধরতে হয়। তারা সাহায্য নেয় উর্দু ও ফার্সির ন্যায় দুটি সমৃদ্ধ ভাষার।

 

মাতৃভাষা আর বুদ্ধিবৃত্তির ভাষা বহু জাতির জীবনেই এক নয়। কিছু গান,কিছু কবিতা,কিছু কিচ্ছা-কাহনী বা পুঁথিই একটি ভাষার জন্য যথেষ্ট নয়।প্রয়োজনটি আরো ব্যাপক। অথচ বাংলা ভাষায় ইসলামি সাহিত্য বলতে দীর্ঘকাল যা জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তা হলো মধ্যযুগীয় মুসলিম কবিদের রচিত কিছু কবিতা ও পুঁথি সাহিত্য।পরে রচিত হয় মীর মোশাররফ হোসেনের রচিত বিষাদসিন্ধু -যা ছিল কল্পকথায় পরিপূর্ণ। বুদ্ধিবৃত্তিক পুষ্টি জোগানোর সামর্থ অর্জনে যে কোন ভাষার জীবনে বহুশত বছর লেগে যায়। হাজার বছরের অধিক কাল ধরে কাজ করছে আরবি ও ফার্সি ভাষা। ইংরেজি ভাষার এমন একটি সমৃদ্ধ অবস্থার জন্যই মাতৃভাষার বদলে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেন বিলেতের আইরিশ,ওয়েল্শ ও স্কটিশ সাহিত্যিকরা।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও শতাধিক ভাষার মানুষের বাস,কিন্তু সেদেশেও বুদ্ধিবৃত্তির ভাষা রূপে গৃহিত হয়েছে ইংরেজি। বাঁচার স্বার্থে মানুষ বাজারে পুষ্টিকর খাদ্য খোঁজে। সে খাদ্যটি কোন দেশে উৎপাদিত সেটি নিয়ে কোন বিবেকবান মানুষই ভাবে না। সে দেখে গুণাগুণ বা পুষ্টির মান।নিজ দেশের এমনকি নিজের মায়ের তৈরী খাবার দুষিত হলে সে খাবারকে আবর্জনার স্তুপে ফেলতে হয়। নইলে শরীর বাঁচে না। তেমন সতর্কতা নিতে হয় রুহের বা চেতনার খাদ্যের বেলায়ও।বাংলা,পাঞ্জাবী,সিন্ধি,গুজরাতি, তামিল বা পশতু ভাষায় সে আমলে যে সাহিত্য ছিল না নয়।কিন্তু রুহ বা চেতনার উন্নততর পুষ্টি নিশ্চিত করার স্বার্থেই বাঙালী,পাঞ্জাবী,বিহারি,পাঠান,গুজরাতি,মারাঠি,তামিল,সিন্ধি ও অন্যান্য ভাষার মুসলমানগণ উর্দুর সাহায্য নেয়।কারণ উর্দুই ছিল ভারতীয় মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তির ভাষা। উর্দু ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে উপমহাদেশের সকল ভাষার মুসলমানগণ শত শত বছর ধরে সম্মিলিত ভাবে কাজ করেছে। দার্শনিক কবি ইকবালের মাতৃভাষা ছিল পাঞ্জাবী। কিন্তু তিনি সাহিত্যচর্চার বাহন রূপে গ্রহণ করেছিলেন উর্দু ও ফার্সি ভাষাকে। এতে তিনি বৃহত্তর উম্মাহর কল্যাণ দেখেছিলেন। তার সাহিত্য থেকে উপকার পেয়েছে সমগ্র ভারত, ইরান ও আফগানিস্তানের মানুষ। অতীতে বহু বাঙালী আলেমও একই পথ বেছে নিয়েছিলেন। ব্রিটিশ আমলে সবচেয়ে বেশী উর্দু পত্রিকা বের হতো বাংলার রাজধানী কলকাতা থেকে। এমনকি রবিন্দ্রনাথের পরিবারেও ফার্সির চর্চা ছিল। কিন্তু উর্দু থেকে দূরে সরার ফলে বাঙালী মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক অপুষ্টি বা পচনটি নতুন মাত্রা পায়। প্রচন্ড ভাবে বাড়ে নীচে নামার গতি। পৃথিবীর দুই শত রাষ্ট্র্রকে হারিয়ে দুর্বৃত্তিতে ৫ বার প্রথম হওয়ার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক পতনটা যতটা গভীর হওয়ার প্রয়োজন ছিল সেটি অতি দ্রুত অর্জিত হয়। যে উর্দু ভাষাটি বাঙালী মুসলিমের চেতনায় শত শত বছর যাবত ইসলামকে বাঁচিয়ে রাখলো সে ভাষার বিরুদ্ধে বাঙালী জাতিয়তাবাদীদের অভিযোগ,পাকিস্তান আমলে উর্দুর প্রচলন ঘটানো হয়েছিল বাঙালীর মুখের ভাষা কেড়ে নেয়ার লক্ষ্যে।সেটি কি বিশ্বাস করা যায়? যেন পাকিস্তানের পাঞ্জাব,সিন্ধু,পাখতুনখায়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশের লোকদের মুখ থেকে মাতৃভাষাগুলো কেড়ে নেয়া হয়েছে!

 

পানির সংযোগ কেটে দিলে সে ঘরের বাসিন্দাদের মরণ দ্রুত ঘনিয়ে আসে।তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক ভান্ডারের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলে মৃত্যু ঘটে দর্শন ও চেতনার।উর্দু ভাষার সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় সে মরণটি লেগেছে বাঙালী মুসলমানের চেতনায় ও দর্শনে। ফলে আজ  থেকে শত বছর আগে বাঙালী মুসলমানের চেতনায় যতটা ইসলাম ছিল,সেটি এখন ভাবাও যায় না। মারা পড়েছে বিশ্বমুসলিম ভাতৃত্ব তথা প্যান-ইসলামিজম। আজ  থেকে শত বছর আগেও হাজার হাজার মাইল দূরের তুর্কির উসমানিয়া খেলাফত বাঁচাতে বাঙলার ঘরে ঘরে মুষ্টির চালের হাঁড়ি বসানো হয়েছিল।কেউ কেউ খলিফার বাহিনীর সাথে লড়তে বলকানে ছুটে গেছে। ব্রিটিশের ষড়যন্ত্র রুখতে “খেলাফত আন্দোলন” নামে গড়ে তোলা হয়েছে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রথম গণআন্দোলন। বাঙালী-অবাঙালী মিলে সমগ্র ভারতব্যাপী গড়ে তুলেছিল সে গণ-আন্দোলন।

 

মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো কসমোপলিটান হওয়া। সেটি হলো নানা ভাষার মানুষের সাথে একত্রে বসবাসের সামর্থ। আল্লাহর উপর ঈমান আনার সাথে সাথে তাকে যেমন নামায-রোযার সামর্থ অর্জণ করতে হয়,তেমনি অর্জণ করতে হয় অন্য ভাষা ও অন্য বর্ণের মুসলমানকে ভাই রূপে গ্রহণ করার সামর্থ।কারণ সে যে ভাই সে পরিচয়টি তো মহান আল্লাহর দেয়া।আর ভাই রূপে গ্রহণ করার সে সামর্থটি অর্জিত না হলে বুঝতে হবে ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠায় দারুন সমস্যা রয়েছে।বাংলার ভূমি এবং বাংলার নগর ও গ্রামগুলি বহুশত বছর পূর্ব থেকেই কসমোপলিটন ছিল। তখন উপমহাদেশের নানা ভাষার অবাঙালী মুসলমানগণ বাঙালী মুসলমানদের কাছে ভাই রূপে গণ্য হত। তখন একই জনপদে বাঙালীর সাথে একাকার হয়ে বসবাস করেছে আরব,তুর্ক,পাঠান,আফগান ও মোগলসহ নানা ভাষার মানুষ।কেউ কাউকে শত্রু ভাবেনি। কলহ-বিবাদও দেখা দেয়নি। ইখতিয়ার বিন বখতিয়ার খিলজি,ঈসা খান,সিরাজুদ্দৌলার ন্যায় অবাঙালী শাসকেরাও তাদের কাছে অতি আপন রূপে গণ্য হয়েছে। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতার লড়াইয়ে কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ন্যায় অবাঙালীকেও তারা নেতা রূপে গ্রহণ করেছে। কিন্তু সে চেতনাটি ভাষা আন্দোলনের পর আর বাঁচেনি। একাত্তরে বাংলার মাটিতে অবাঙালীরা গণ্য হয়েছে হত্যাযোগ্য শত্রু রূপে। সর্বস্ব লুন্ঠন করে বস্তিতে বসানো হয় ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা কয়েক লক্ষ বিহারীকে। তেমনি গলাধাক্কা দিয়ে সাগরে ফেরত পাঠানো হয়েছে মিয়ানমার প্রাণ বাঁচাতে থেকে আসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের।ইসলামশূণ্য হলে মানুষ যে কতটা মানবতাশূণ্য হয় এ হলো তার প্রমাণ।বাঙালী মুসলমানের চেতনা ও চরিত্রে এ ভয়াবহ পচনটি একদিনে আসেনি। বরং সৃষ্টি করা হয়েছে বহু বছরের পরিকল্পনায়।সে পরিকল্পনার মূলে ছিল,ইসলামি জ্ঞানার্জনকে বাধাগ্রস্ত করা।পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানশুণ্য মানুষদের জন্তু-জানোয়ারের চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন।সে ঈমানশূণ্যতা আসে ইসলামী জ্ঞানের পুষ্টিহীনতায়।যে রাষ্ট্রে মানুষরূপী এরূপ পশুরা বেড়ে উঠে,সে রাষ্ট্রের পক্ষে পৃথিবীর দুই শত রাষ্ট্রের মাঝে দুর্র্বত্বতে বার বার প্রথম হওয়ার মত নিকৃষ্ট কাজটিও অতি সহজ হয়ে যায়। অতি সহজ হয়ে যায় ভোট-ডাকাতি,ব্যাংক-ডাকাতি,খুন-গুম,ব্যভিচার ও নানারূপ সন্ত্রাস।বুদ্ধিবৃত্তিক পচন এবং দুর্র্বত্তিতে বিশ্ব-রেকর্ড গড়ার কাজটির শুরু তো তখন থেকেই্। বাঙালী মুসলমানদের সমগ্র ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় আত্মঘাত।

 

শিক্ষা যেখানে দূষণের হাতিয়ার

শিক্ষালাভের অর্থ ডিগ্রিলাভ নয়। স্রেফ অক্ষর জ্ঞানও নয়। সেটি হলো সিরাতুল মুস্তাকীম চেনার সামর্থ।শিক্ষা দেয় ন্যায়-অন্যায়,দেয় সত্য-অসত্যের মাঝে পার্থক্য করার যোগ্যতা।দেয় চেতনা ও চরিত্রে পরিশুদ্ধি। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষানীতি পরিণত হয়েছে পরিশুদ্ধির বদলে দূষণের হাতিয়ারে।দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যায়ে ডিগ্রিদান হলেও তাতে কি সিরাতুল মুস্তাকীম চেনার সামর্থ বেড়েছে? বেড়েছে কি ন্যায়-অন্যায়,সত্য-অসত্যের মাঝে পার্থক্য করার যোগ্যতা? সে লক্ষ্য যে অর্জিত হয়নি সেটি তো প্রমাণিত হয়েছে রাজনীতি,সংস্কৃতি,অর্থনীতি,আইন-আদালত তথা জীবনের প্রতিক্ষেত্রে ভ্রান্তি পথে চলায়। শিক্ষা ব্যবহৃত হয়েছে পথভ্রষ্ট করার হাতিয়ারে।বাংলাদেশের রাজনীতি,অর্থনীতি, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা যে দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত তারা তো কোন বনজঙ্গলে বেড়ে উঠেনি, বরং উৎপাদিত হয়েছে বাংলাদেশের কলেজ­-বিশ্ববিদ্যালয়ে। অশিক্ষা বা কুশিক্ষায় মৃত্য ঘটে ধর্মীয় চেতনা,নৈতীক মূল্যবোধ ও মানবতার।অশিক্ষা ও কুশিক্ষার কারণেই অসম্ভব হয়েছিল আরবের কাফেরদের মানবতা নিয়ে বেড়ে উঠা।শয়তান ও তার অনুসারিদের মূল কাজটি তাই সুশিক্ষার কাজটি বন্ধ করে দেয়া। মানুষকে জাহান্নামে টানার এটিই হলো শয়তানের প্রধান স্ট্রাটেজী। নমরুদ ও ফিরাউনগণ তাই হযরত ইব্রাহীম(আঃ)ও হযরত মূসা (আঃ)র মত মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শিক্ষদের জনপদে নামতে দেয়নি।একই কারণে মক্কার কাফেরগণও নবীজী (সাঃ)কে তাঁর জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করে ছেড়েছে।আজও  দেশে দেশে শয়তানি শক্তির একই রূপ এজেন্ডা।সে অভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়েই মুসলিম দেশে তারা স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে। এজন্যই সূদখোর,ঘুষখোর,ব্যাভিচারি ও খুনিদের শাস্তি দেয়া বা পতিতাবৃত্তির উচ্ছেদ নিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সেক্যুলার শক্তির কোন আগ্রহ নেই।বরং তাদের মূল আগ্রহটি হলো,কোরআন-হাদীস শিক্ষার মূল পথগুলোকে বেছে বেছে বন্ধ করে দেয়া।সে সাথে শেখানো হচ্ছে,জিহাদ হলো সন্ত্রাস।পুলিশ এবং সৈনিকদের কাজ হয়েছে জিহাদ বিষয়ক বইগুলোকে বাজেয়াপ্ত করা।

 

অপরাধ ইতিহাস বিস্মৃতির

ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিবিলুপ্তির ন্যায় ইতিহাস বিস্মৃতির বিপদ বিশাল। মানুষ তখন তার নিজের পরিচয় ভুলে যায়। ভূলে যায় আপনজনদের। বাঙালী মুসলমানদের জীবনে সে ইতিহাস বিস্মৃতিটি বিশাল। সেটির ফলে বাঙালী মুসলমানগণ ভূলেই গেছে তাদের কাঙ্খিত ভূমিকা ও ঈমানী দায়িত্বের কথা। ফলে অতীতে বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠি মুসলিম উম্মাহর কল্যানে বড় বড় ভূমিকা রাখতে পারলেও ব্যর্থ হচ্ছে ১৯ কোটির বিশাল বাঙালী মুসলিম জনগোষ্ঠি। মুসলমান হওয়ার সাথে সাথে অনিবার্য ভাবেই প্রতিটি মুসলানের উপর কিছু দায়িত্ব এসে যায়। সেটি খেলাফতের তথা আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের। প্রতিনিধিত্বের মূল দায়িত্বটি হলো,আল্লাহর দ্বীনের বিজয় আনা। সে দায়িত্বপালনের তাগিদেই তুর্কি সৈনিক ইখিতিয়ার মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি তাঁর মাতৃভূমি ছেড়ে ছুটে এসেছিলেন হাজার হাজার মাইল দূরের বাংলায়। মাত্র ১৭ জন সৈনিক নিয়ে বাংলা বিজয় করে দেশটির সমগ্র ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি তিনিই এনেছিলেন। সে বিপ্লবের মাধ্যমে তিনি এদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের ঘাড় থেকে নামিয়েছিলেন মুর্তিপুজার ন্যায় আদিম অসভ্যতার জোয়াল। প্রশস্ত পথ করে দিয়েছিলেন ইসলামের। বাংলার মাটিতে অনেক যুদ্ধ হয়েছে, অনেকের হাতেই এদেশ বিজিত হয়েছে। কিন্তু বাংলার মুসলমানদের এতবড় উপকার কি আর কেউ করেছে? অথচ বাঙালী মুসলমানগণ তাঁকে একরকম ভূলেই গেছে। অথচ মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্র-হত্যাকারি,মানব-হত্যাকারি,মুসলিম দেশধ্বংসকারি এক ভারতীয় এজেন্টকে অমর করার কত আয়োজন! তবে ইখিতিয়ার মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজিকে ভূলিয়ে দেয়ার বিষয়টি কোন আকস্মিক ভূল নয়,বরং সুপরিকল্পিত।বাঙালী মুসলমানদের চেতনার পট থেকে তার স্মৃতিকে ভূলিয়ে দেয়া হয়েছে একটি বিশেষ প্রয়োজনে।সেটি ইসলামের শত্রুদের বাংলার রাজনীতিতে স্থান করে দেয়ার লক্ষ্যে। মুর্তিপুজা বাঁচাতে হলে মন্দির চাই,সে মন্দিরে মুর্তিও চাই। তাই বাংলাদেশে ইসলাম ঠ্যাকাতে হলে ইখিতিয়ার মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির মত ব্যক্তিদের স্মৃতিকে মুছে ফেলে সেখানে অসংখ্য মুজিব চাই,জনপদে সে মুজিবদের ছবিতে ফুলের মালা দেয়ার অনুষ্ঠানও চাই।

 

শুধু তাই নয়,পরিকল্পিত ভাবে ভূলিয়ে দেয়া হচ্ছে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্টের স্বাধীনতাও। লেখা হচ্ছে মিথ্যাপূর্ণ নতুন ইতিহাস। যেন স্বাধীনতার শুরু একাত্তর থেকে।বাঙালী মুসলমানের ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট যে গুরুত্বপূর্ণ সে কথার কোথাও উল্লেখ নেই।অথচ পাকিস্তান আমলের ২৩ বছর যাবত এ দিনটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি নগরে ও বন্দরে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে স্বাধীনতা দিবসরূপে উদযাপিত হয়েছে। ১৯৭১য়ের পর সারা বছরধরে কত দিবস উদযাপিত হয়,কিন্তু সে তালিকায় এ দিনটি নেই।অথচ ইখিতিয়ার মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে বাংলা বিজিত হওয়ার পর বাংলার মুসলিম ইতিহাসে পাকিস্তান সৃষ্টি ছিল সবচেয়ে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।পশ্চিম বাংলা,আসাম ও কাশ্মিরের মুসলমানদের জীবনে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা আসেনি বলে তারা আজও  স্বাধিন হতে পারেনি।ফলে তাদের কাঁধে আজও  পরাধীনতার জোয়াল। অথচ সংসদ ভবন,সুপ্রিম কোর্ট ভবন,বঙ্গভবন,গণভবন,বায়তুল মোকাররম,বাংলা এ্যাকাডেমী,সেনা ক্যান্টনমেন্টসহ সকল বড় বড় প্রতিষ্ঠান যে পাকিস্তানের সৃষ্টি সেটি কি অস্বীকারের উপায় আছে?

 

প্রচন্ড ইতিহাস বিকৃতি হচ্ছে বাংলায় ইসলামের প্রচার নিয়েও। বলা হয়,বাংলাদেশে ইসলাম এসেছে সুফিদের উত্তম চরিত্র ও আধ্যাত্মীকতার বলে। ইসলামের সমগ্র ইতিহাসের সাথে এটি এক মিথ্যাচার। একথা বলা হয়,মুসলিম জীবনে জিহাদ বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে। সমগ্র মানব-ইতিহাসে মহান নবীজী (সাঃ)র চেয়ে উত্তম চরিত্র,আধ্যাত্মীকতা ও দ্বীনের দাওয়াত পেশের সামর্থ আর কার ছিল? এমন কি কাফেরগণ তাঁকে আল-আমীন বলতো। তাঁর কাছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে বানি নিয়ে তাঁর ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আঃ) আসতেন। নবীজী (সাঃ)র নবুয়ুতের মাত্র কয়েক বছর আগে মক্কাবাসী মহান আল্লাহতায়ালার কুদরত স্বচোখে দেখেছে।ক্বাবা ধ্বংসে আগত  ইয়েমেনের রাজা আবরাহার বাহিনীর হাজার হাজার সৈনিক ও তার হাতিগুলোর ধ্বসে সেদিন কোন বিশাল বাহিনী লাগেনি। ছোট ছোট পাখিদের মুখ থেকে নিক্ষিপ্ত ছোট ছোট কংকরই সে কাজে যথেষ্ট ছিল। এতসব দেখার পরও নবীজী (সাঃ)র ১৩ বছরের মক্কি জীবনে ক’জন আল্লাহর সে দ্বীনকে কবুল করেছে? মাত্র তিন শত জনের মত। অপর দিকে মানব ইতিহাসের আরেক মহান নবী হযরত নূহ (আঃ)সাড়ে সাত বছর চেষ্টা করেও সফলতা পাননি।মক্কার কাফেরগণ যে শুধু ইসলাম কবুলে অস্বীকার করেছে তা নয়,নবীজী (সাঃ)কে তারা মিথ্যুক,গনক এবং পাগলও বলেছে। তাঁর উপর অকথ্য নির্যাতন করেছে এবং তাঁকে সামাজিক বয়কটও করেছে। এমন কি তার বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে। তাদের সে ষড়যন্ত্রের কারণে নবীজী (সাঃ)কে অবশেষে নিজ জন্মভূমি ছাড়তে হয়েছে।অথচ ইসলাম কবুলের জোয়ার শুরু হয়েছে মক্কা বিজয়ের পর। সামরিক শক্তির যে বিকল্প নেই এ সত্য কি তাই অস্বীকারের উপায় আছে?

 

হিরোইনসেবী বা মদ্যসেবীদের ন্যায় মিথ্যা ধর্ম বা অধর্ম নিয়ে বাঁচাতেও প্রচন্ড নেশাগ্রস্ততা থাকে। এমন নেশাগ্রস্তদের উপর নবী-রাসূলদের ন্যায় মহৎ মানুষদের ওয়াজ-নসিহতও কাজ দেয়না।যেমন ঔষধ কাজ দেয় না দুষিত পানি সেবনকারির উপর। এরা যে শুধু নিজেদের জীবনে ধ্বংস ডেকে আনে তা নয়,সমাজ ও রাষ্ট্রেরও ভয়ানক ক্ষতির কারণ হয়। ফলে তাদের উপর নিয়ন্ত্রণটি জরুরী। প্রয়োজন পড়ে নেশার সামগ্রীর উপর কঠোর নিয়ন্ত্রন। সে জন্য চাই সামরিক শক্তি। ইউরোপ-আমেরিকায় হাজার হাজার মসজিদ আছে। বহু হাজার ধর্মপ্রচারকও আছে। বইয়ের দোকানগুলি ভরপুর কোরআন-হাদীস ও ইসলামি বইপুস্তকে। কিন্তু সেগুলি পড়ে ক’জন ইসলাম কবুল করছে? কারণ এসব দেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যারা প্রতিষ্ঠিত তারা প্রচুর পরিচর্যা দেয় কুফরির। এবং প্রচলিত ভ্রান্ত ধ্যানধারণার প্রতি নেশাগ্রস্ততা বাড়িয়ে চলেছে দেশের মিডিয়া ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। রাষ্ট্র ও বিশাল বিশাল প্রতিষ্ঠানগুলো যে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে পরিচর্যা দেয় জনগণ তো সেটিই গ্রহণ করে। সোভিয়েত রাশিয়ার বিলুপ্তির পর কম্যুনিজম সে রাষ্ট্রীয় পরিচর্যা পায়নি। ফলে জনগণের মন থেকে দ্রুত বিলুপ্ত হয়েছে কম্যুনিজম।

 

মক্কার মুর্তিপুজারিগণ নবীজী (সাঃ)র চরিত্র দেখে মুসলমান হয়নি। তাঁর পুতঃপবিত্র চরিত্র মক্কা বিজযের পূর্বে তারা বহুবার দেখেছে। কিন্তু মক্কা বিজয়ের পর সে কাফেরগণই দলে দলে মুসলমান হয়েছে। মক্কা বিজয় কালে নবীজী(সাঃ)র চরিত্রে এমন কিছু যোগ হয়নি যা মক্কায় বসবাস কালে তাঁর মধ্যে ছিল না।সে সময় মূল বিপ্লবটি এসেছিল মুসলমানদের সামরিক শক্তিতে।শক্তিবলে মক্কা বিজয়ের পরই তাদের মধ্যে ইসলাম কবুলের জোয়ার শুরু হয়। মহান আল্লাহতায়ালা সে সত্যটি তুলে ধরেছেন এ ভাবেঃ “আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় যখন আসলো,তখন তুমি দেখলে দলে দলে মানুষ আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে” –(সুরা নছর, আয়াত ১-২)। তাই মানুষ দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করবে এমন পবিবেশ সৃষ্টির জন্য যেমন উন্নত চরিত্র চাই,তেমনি সামরিক শক্তি এবং বিজয়ও চাই। সামরিক শক্তির বিকল্প শুধু সামরিক শক্তিই। ঈসা (আঃ)র জন্মই ছিল এক বিশাল মোজেজা। মহান আল্লাহতায়ালার রহমতের বরকতে তিনি বহু মৃত মানুষকে জীবিত করেছেন। তার হাতের স্পর্শে বহু কুষ্ট রোগী আরোগ্য পেয়েছে। কিন্তু সে মোজেজা দেখে কি ১০০ জনও মুসলমান হয়েছে। অথচ রোমান সম্রাট কন্সটান্টাইনের খৃষ্টান হওয়ার সাথে সাথে ইউরোপের বিশাল ভূ-ভাগের মানুষ খৃষ্টান হয়ে যায়। ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার স্বার্থে জরুরী শুধু উন্নত চরিত্র নয়,বরং অপরিহার্য হলো রাষ্ট্রের উপর পূর্ণ দখলদারি।সেটিই নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। মুসলমানদের চরিত্র ফেরেশতাদের মত হলে শুধু তাতেই ইসলাম কবুলের জোয়ার শুরু হবে -সেটি এক ভিত্তিহীন কল্পনা।মুসলমানদের পরাজয় ও ইসলামের গৌরবহানির শুরু তো তখন থেকে যখন মুসলিম ভূমি একের পর স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হয়েছে।

 

বাঙালী মুসলমানদের অধঃপতনের বড় কারণ,তাদের উপর ইসলামের শত্রুপক্ষের দীর্ঘকালীন শাসন।সেটি ঘটেছে মুসলমানদের সামরিক শক্তিহ্রাসের কারণে। গরুভেড়া ঘরে একদিন অবস্থান নিলে বিস্তর মলমূত্র রেখে যায়। বাংলাদেশের বুকে সাম্রাজ্যবাদী শত্রুদের শাসন ১৯০ বছরের। শত্রুপক্ষের এত দীর্ঘকাল ব্যাপী দখলদারি বিশ্বের আর কোন মুসলিম দেশে আসেনি। তাদের প্রত্যক্ষ শাসন শেষ হলেও ধর্মবিরোধী দর্শন,কুফরি আইন,ব্যভিচারের সংস্কৃতি, পতিতাবৃত্তি,সূদভিত্তিক অর্থনীতির ন্যায় আবর্জনার দখলদারি আজও  শেষ হয়নি।দিন দিন সেটি বরং বর্বরতর হচ্ছে।সে বর্বরতার হিংস্র রূপটি হলো,দেশে জিহাদ বিষয়ক বই যেমন বাজেয়াপ্ত হচ্ছে,তেমনি আলেমদের হত্যা বা কারারুদ্ধ করা হচ্ছে। দখলদারি বেড়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রশ্রয়পুষ্ট সেক্যুলারিস্ট দাসদের।এমন দাসদের উৎপাদন নিয়ে মিশরে ব্রিটিশ শাসনের খলিফা লর্ড ক্রমার বলেছিলেন,মুসলিম দেশে সমচেতনার একটি শ্রেণী গড়ে না উঠা পর্যন্ত কোন মুসলিম ভূমির স্বাধিনতা দেয়ার প্রশ্নই আসে না।বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে কুফরি আইন,সূদী ব্যাংক, পতিতাবৃত্তির ন্যায় ব্যাভিচারের সংস্কৃতি বলবৎ রেখেছে তো এই সম-চেতনার দাসশ্রেণী। ঔপনিবেশিক শাসকদের ন্যায় এরাও যে ইসলামের শত্রু শক্তি তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে?

 

সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতা

শয়তানের বিশাল বিনিয়োগটি সংস্কৃতির ময়দানে। মানুষকে জাহান্নামমুখি করায় এটি এক সনাতন কৌশল।সে বিনিয়োগের ফলে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতাটি বিশাল। প্রতি জনপদে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে নানা নামে নানা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও দিনক্ষণ। নববর্ষ, নববসন্ত,ভ্যালেন্টাইন ডে, থার্টি ফাস্ট নাইট -এসব নামেও বহু উৎসব।এগুলি হলো ইসলাম ও সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে মনযোগ হটানোর শয়তানি কৌশল। শয়তান জানে,বাঙালী মুসলমানদের পুঁজার নামে মন্দিরে ফুল দিতে হাজির করা যাবে না।কিন্তু সংস্কৃতির নামে একুশের স্তম্ভে ফুল দিতে বিপুল সংখ্যায় নেয়া যাবে। তাই মন্দিরের পুজামন্ডপ বা বেদীমূল নামিয়ে এনেছে বাংলাদেশের রাজপথে ও শিক্ষাঙ্গনে।গড়ে তুলেছে একুশে ফেব্রেয়ারির অসংখ্য স্মৃতিসৌধ।অথচ এমনটি কোনকালেই ইসলামের রীতি ছিল না। সংস্কৃতিও ছিল না। তাছাড়া শহীদ তো তারাই যারা মহান আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে বা শত্রুর হামলা থেকে মুসলিম ভূমির ঐক্য-সংহতির হেফাজতে প্রাণ দেয়। একুশে ফেব্রেয়ারি স্মরণে যারা স্তৃতিস্তম্ভ গড়ে তারাও একথা বলে না যে,একুশে ফেব্রেয়ারির লড়াইটি ছিল আল্লাহর পথে। বরং তাদের দাবী,পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ গড়ার কাজটি শুরু হয় ভাষা আন্দোলন থেকে।সেদিন থেকেই শুরু হয় রাজনীতি ও সংস্কৃতির অঙ্গন থেকে ইসলাম হঠানোর কাজ।অথচ কোন মুসলিম দেশে খন্ডিত করা যেমন হারাম,তেমন হারাম হলো দেশের রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে ইসলাম সরানো। কারণ এতে দুর্বল হয় ইসলামের শক্তি। ফলে আল্লাহতায়ালার কাছে তা অতি ঘৃণীত কাজ। কোন ঈমানদারের কাছে তাই এমন আন্দোলন গুরুত্ব পেতে পারে না। মুর্তিপুজা বাঁচিয়ে রাখতে যেমন মন্দির চাই,সেক্যুলারিজম বাঁচাতেও তেমনি তীর্থস্থান চাই।একুশের স্মৃতিস্তম্ভগুলো পরিণত হয়েছে সেরূপ তীর্থস্থানে।সেখানে হাজিরা দেয়াটি সাংস্কৃতিক আচারে পরিণত হয়েছে।তাই যতই বাড়ছে সেক্যুলারিজমের তান্ডব,ততই বাড়ছে একুশের স্তম্ভে ফুল দেয়ার হিড়িক।অথচ স্মৃতিস্তম্ভ গড়া জায়েজ হলে সবচেয়ে বেশী স্তম্ভ গড়া হতো মদিনায়। কারণ,সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী মানুষ শহীদ হয়েছেন মদিনার বুকে।

 

একমাত্র পথ

নানারূপ বিপদ ও বিভ্রাট বাঙালী মুসলমানদের ঘিরে ধরেছে।সবচেয়ে ভয়ংকর বিপদটি অর্থনৈতিক নয়,রাজনৈতিকও নয়।বরং সেটি হলো জাহান্নামে পৌছার।শয়তানের এজেন্ডা শুধু ইহকালকে বিফল করা নয়,আখেরাতকে বিফল করাও। ইসলামের শত্রুপক্ষ যেভাবে দখল জমিয়েছে তাতে কঠিন হয়ে পড়েছে জান্নাতের পথে পথচলা। জান্নাতের পথে পথচলার সামর্থটি আসে পবিত্র কোরআন ও হাদীসের জ্ঞানার্জন থেকে।সেটি অর্জিত হয় ইসলামি রাষ্ট্র নির্মাণ এবং সে রাষ্ট্রে মহান আল্লাহর শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। অথচ সেটিই বাংলাদেশে আজ  অসম্ভব করা হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে কোরআনের জ্ঞানার্জন যেমন বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে,তেমনি অসম্ভব করা হচ্ছে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও শরিয়তের প্রচলন। ক্ষমতাসীন শাসকচক্রের মূল লক্ষ্যটি হলো,ইসলামের আন্তর্জাতিক শত্রুশক্তির পদতলে আত্মসমর্পণে দেশবাসীকে বাধ্য করা। অথচ এমন আত্মসমর্পণের বিপদট ভয়াবহ।সেটি জাহান্নাম প্রাপ্তির। ইসলামের শিক্ষা এরূপ দাসত্ব মেনে নেয়া নয়,নবীজী (সাঃ)র সেটি সূন্নতও নয়।জান্নাতে চলার পথটি লাগাতর লড়াইয়ের।সে লড়াইয়ের মূল লক্ষ্য,শয়তানি শক্তির দখলদারি থেকে মুক্তি। সে লড়াইয়ে মু’মিনকে যেমন জানমালের বিপুল বিনিয়োগ ঘটাতে হয়,তেমনি শহীদও হতে হয়। এরূপ লড়াই থেকে নবী-রাসূলগণও রেহাই পাননি।হাজার নবী-রাসূলকে যেমন দেশ ছাড়তে হয়েছে,তেমনি শহীদও হতে হয়েছে। মু’মিনের জীবন মাত্রই জিহাদের। যে জীবনে জিহাদ নেই,সে জীবনে ঈমান বাঁচে না। তাই রাসূলে পাক (সাঃ)র হাদীসঃ “যে ব্যক্তি জিহাদ করলো না এবং জিহাদের নিয়েতও করলো না সে মুনাফিক।”

 

জিহাদের দুটি পর্ব। একটি বুদ্ধিবৃত্তিক, অপরটি অস্ত্রের। অস্ত্রের জিহাদটি সব সময় আসে না। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তির যুদ্ধটি মু’মিনের জীবনে লাগাতর। মু’মিনের রাজনীতি, সংস্কৃতি, আক্বিদা-বিশ্বাস এমনকি পোষাক-পরিচ্ছদের বিরুদ্ধে শয়তানি শক্তির গোলাবর্ষণটি লাগাতর। মু’মিনের বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধটি হলো মিথ্যার সে হামলা থেকে ঈমান বাঁচানোর। সে যুদ্ধে পরাজিত হলে কুফরি চেতনার ধারকেরা মুসলমানের গলায় নানারূপ ভ্রান্ত মতবাদের শিকল পড়িয়ে দেয়। এমন শিকল-পড়া ব্যক্তির পক্ষে অস্ত্রের যুদ্ধ তখন অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন কি নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও পোষাক-পরিচ্ছদের প্রতি সম্মান দেখানোর সামর্থও তারা হারিয়ে ফেলে। ইসলামি খেলাফাহ, শরিয়ত ও জিহাদের ন্যায় ইসলামের বুনিয়াদি বিষয়গুলো নিয়েও তখন তাদের মনে অবিশ্বাস বা সন্দেহ দেখা দেয়। জিহাদও সন্তাস মনে হয়। এবং শরিয়তের পবিত্র শাসন মনে হয় বর্বরতা। বাঙালী মুসলমানের জীবনে সে বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়টি বিশাল। ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক দখলদারি চলে গেছে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। বাঙালী মুসলমানের জীবনে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদটি সত্যিকার অর্থে শুরুই হয়নি। তাই হাজী, নামাযী, রোযাদার ও ইসলামপন্থি দলের কর্মীদের পায়েও দেখা যায় জাতিয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম, পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের বেড়ি। এরা যেমন আল্লাহর দ্বীনের মুজাহিদদের হত্যাযোগ্য মনে করে, তেমনি ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে মুসলিম দেশ ভাঙ্গাও প্রশংসনীয় গণ্য করে। পবিত্রতা মনে করে নগ্নপদে একুশের স্তম্ভে হাজিরা দেয়াকে। এগুলো হলো বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়ের আলামত। সমস্যা তাই শত্রুর কারাগারে বসবাস নিয়ে নয়, বরং গর্দানে গোলামীর রশি নিয়ে বসবাস করা। এমন পরাধীন মানুষের ইবাদত কি বিশুদ্ধ হয়? ফলে ইস্যু এখানে জনগণের গলা থেকে শত্রুর পরানো এ রশি সরানোর। এখানে যুদ্ধটি বুদ্ধিবৃত্তির।

 

বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধটির মূল হাতিয়ারটি হলো কোরআনের জ্ঞান। আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত এ অস্ত্রটি ছাড়া এ যুদ্ধে বিজয় অসম্ভব। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে জীবনে সে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদটি নবুয়ত প্রাপ্তির প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছিল। অস্ত্রের জিহাদটি শুরু হয়েছিল হিজরতের পর।তবে বুদ্ধিবৃত্তির জিহাদে বিজয়ী না হলে স্রেফ অস্ত্রের জিহাদে ইসলামী দর্শন ও বিধান রাষ্ট্রের বুকে বিজয়ী করা যায় না। প্রতিষ্টাও পায় না। তখন অস্ত্রযুদ্ধের বিজয় নিছক সামরিক বিজয় থেকে যায়। ভারতে মুসলিম বিজয়টি সে পর্যায়েই রয়ে গেছে। মহান আল্লাহতায়ালা চান, প্রতিটি ঈমানদার বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদের আমৃত্যু সৈনিকে পরিণত হোক।তাই,ফরজ করেছেন কোরআনের জ্ঞানার্জনকে। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ শুধু যে অস্ত্রের জিহাদে শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ শহীদ হয়েছেন তা নয়, বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানেও সবচেয়ে বড় বিজয়টি একমাত্র তারাই এনেছিলেন।ফিকাহ, তাফসির, ইসলামের আইন ও দর্শন নিয়ে বড় বড় গবেষণা তো হয়েছে তাদের দ্বারাই। ফলে আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর যে অটল বিশ্বাস এবং শরিয়তি বিধানের প্রতি যে অনড় আস্থা সে আমলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল –সেটি কি আজ ভাবা যায়?

 

বাঙালী মুসলমানের জীবনে বুদ্ধিবৃত্তিক এ লড়াইটি শুরু থেকেই গুরুত্ব পায়নি। ফলে তাদের চেতনার মানচিত্রে বেড়েছে ইসলামের পরাজয়। সে পরাজিত ভূমিটুকু দখল করে নিয়েছে সেক্যুলারিজম, জাতিয়তাবাদ, ফেরকাবাদ, সুফিবাদ, পীরতন্ত্র ও তাবলিগ জামায়াতের ধর্মবিশ্বাস। ফলে সুফি বা পীরের খানকায় বা তাবলিগ জামায়াতের ইজতেমায় লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হলেও বুদ্ধিবৃত্তির জিহাদে সৈনিক নেই। এর ফলে সৈনিক মিলছে অস্ত্রের জিহাদেও। ফলে বিজয় বেড়ে চলেছে শুধু শয়তানি শক্তির। অলস ও নিষ্ক্রীয়দের সহায়তা দেয়া মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত নয়।মুসলমানদের শুরু থেকেই লড়াই করে বাঁচতে ও বেড়ে উঠতে হয়েছে।যে কোন লড়াই বিপুল কোরবানি চায়।জান-মাল,শ্রম ও মেধার বিপুল বিনিয়োগের বরকতেই মুসলমানগণ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল এবং ভেঙ্গেছিল নানা রূপ জাহিলিয়াতের শিকল। এটিই তো সিরাতুল মুস্তাকীম তথা জান্নাতের পথ। বাঙালী মুসলমানদের সামনেও কি এছাড়া ভিন্ন পথ আছে? ০৫/০৩/২০১৪



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Thursday, 06 March 2014 19:14
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.