Home লড়াই ও রাষ্ট্রবিপ্লব ইসলামের বিজয় যে পথে অনিবার্য হয়
ইসলামের বিজয় যে পথে অনিবার্য হয় PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 01 January 2011 18:40

দুর্বলতা যেমন ভদ্রতা নয় তেমনি মহৎ গুণও নয়। এটি শুধু অযোগ্যতাই নয়, ভীরুতাও। জাতির জীবনে এমন দুর্বল মানুষের সংখ্যা বাড়লে পরাজয় ও অসম্মানের পাশাপাশি বিপদগ্রস্ত হয় তখন জাতির বেঁচে থাকাটিও। কারণ, বন্য জগতের চেয়েও বিপদজনক হলো এ মনুষ্য জগত। হাজার টন বোমা বন-জঙ্গল বা পশুপাখির মাথায় নিক্ষিপ্ত হয় না, হয় ঘনবসতি পূর্ণ জনপদে। যেটি হচেছ ইরাক, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান ও চেচনিয়ায়। তাই বাঁচতে হলে বাঁচবার প্রস্তুতিও চাই। বুদ্ধিবিবেক ও পেশীশক্তি নিছক উপার্জন বাড়ানোর জন্য নয় বরং জীবন ও ইজ্জত বাঁচানোর জন্যও। তাই আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তি পানাহারের সাথে প্রতিরক্ষায়ও মনযোগী হয়। সে শুধু চাষাবাদ বা ব্যবসাবাণিজ্যই করেনা, যুদ্ধও করে। বিষয়টিকে আল্লাহপাক গুরুত্ব দিয়েছেন এভাবেঃ “ওয়া আয়িদ্দুউলাহুম মাস্তাতা’তুম মিন ক্বুউওয়া” (সুরা আনফাল ৬০) অর্থঃ “এবং (তাদের মোকাবেলায়) নিজেদের প্রস্তুত কর সমস্ত শক্তি দিয়ে।” এ ঘোষণা এসেছে নির্দেশের ভাষায়।

 

ফলে প্রতিরক্ষার কাজে প্রস্তুত না থাকাটি হলো আল্লাহতায়ালার এ নির্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ইসলামে এটি কুফর। এটি মহাপাপ। এ মহাপাপের শস্তি পেতে হয় স্বাধীনতা ও ইজ্জত খুইয়ে। ১৭৫৭ সালে বাংলার মুসলমানেরা সে শাস্তি পেয়েছিল ১৯০ বছরের জন্য স্বাধীনতা খুইয়ে। কারণ স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব তারা পালন করেনি। মুসলিম বিশ্বের আজকের ইজ্জতহানী ও উপর্যপুরি পরাজয়ের কারণও হলো এটি। মুসলমানরা আজ যেভাবে জালেমের হাতে নিহত, আহত ও লুণ্ঠিত হচ্ছে এবং মুসলিম দেশগুলি যেভাবে একের পর এক অধিকৃত হচ্ছে তার মুল কারণ শক্তিহীনতা। এটি হল আল্লাহর নেয়ামতকে কাজে না লাগানোর শাস্তি। সম্পদকে তারা শুধু ভোগ-বিলাসেই কাজে লাগিয়েছে, প্রতিরক্ষায় নয়। ফলে শরীরে মেদ বাড়লেও, বেড়েছে শক্তিহীনতা। শক্তিহীনের এমন পরাজয় ও দুর্ভোগকে সবসময়ই নিয়তি ভাবা হয়। নেকড়ে শিকার ধরলে তা নিয়ে যেমন নিন্দাবাদ হয়না, তেমনি নিন্দাবাদ হয় না মার্কিন, রুশ, চীন, ভারত বা ইসরাইলী জবরদখলের বিরুদ্ধে। হাজার হাজার টন বোমা ফেলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে ইরাকে। সেখানে ৫ লাখেরও  বেশী মানুষের হত্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্রোজনী পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তুপে। ধ্বংস করা হয়েছে দক্ষিণ লেবাননকে। ধ্বংসকাজ চলছে ফিলিস্তিনে। এসব নৃশংস ঘটনার প্রতিরোধ দূরে থাক মৌখিক নিন্দা করার সামর্থও জাতিসংঘের নেই। বরং জাতিসংঘের কাজ এগুলিকে ন্যায্যতাও দেয়। ফলে ফিলিস্তিন যখন অধিকৃত হলো এবং মূল-অধিবাসীগণ নিহত বা নির্বাসিত হলো তখন সে বর্বরতাকে জাতিসংঘ স্বীকৃত দিয়েছিল। একই ভাবে মার্কিন বাহিনীর হাতে আফগানিস্তান ও ইরাক অধিকৃত হওয়ার পর জাতিসংঘ সেখানে গেছে আফগান ও ইরাকীদের পোষ মানাতে। খুণীকে খূণী বলা, হানাদারকে হানাদার বলতে যে ণ্যূনতম মূলবোধ, বিবেকবোধ ও নৈতিকতা লাগে সেটি জাতিসংঘের নাই। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট, ইসরাইল বা রাশিয়ার ন্যায় বিশ্বের সবচেয়ে জঘন্য খুণীগুলো এখানে নিন্দিত না হয়ে বরং নন্দিত হয়। তাছাড়া জাতিসংঘ নিজেই বহু হত্যাকান্ডের নায়ক। নব্বইয়ের দশকে বসনিয়ার সেব্রেনিৎসা নগরিতে জাতিসংঘের দায়িত্বশীলেরা নিজেদের ক্যাম্প থেকে ৭ হাজার মুসলমানকে সার্ব খুনীদের বাসে তুলে দিয়েছিল। সার্বরা তাদেরকে বধ্য ভূমিতে নিয়ে হত্যা করে। এতবড় হত্যা কান্ডের জন্য সার্ব খুণীদের কোনরূপ গোপন পরিকল্পনা করতে হয়নি। প্রয়োজন বোধ করেনি এটি রাতের আঁধারে করার। কফি আনানসহ জাতিসংঘের বহু কর্তা ব্যক্তি তখন বসনিয়ায় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত ছিল। কিন্ত তারা নিরীহ মানুষ বাঁচাতে কোন দায়িত্বই পালন করেনি। যেমন করছে না আজ ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, চেচনিয়াসহ বিশ্বের কোনে কোনে মুসলিম হত্যারোধে।

 

দূর্বল ও প্রতিরক্ষাহীন থাকার বিপদ যে কতটা নৃশংস সেটিই সম্প্রতি প্রমাণিত হলো থাইল্যান্ডে। গত ২৬ শে অক্টোবর ৮৪ জন নিরীহ ও নিরস্ত্র থাই মুসলমানকে হত্যা করা হলো অতি বর্বর ভাবে। জঘন্যতার বিচারে হত্যাকান্ডটির চেয়েও নিষ্ঠুরতর হলো যেরূপ নৃশংস ভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছে সেটি। প্রায় ২ হাজার ছাত্রকে পিঠমোড়া করে হাত বেধে রাস্তায় উপুড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা থাই পুলিশ লাথিয়েছে। এভাবে আধমরা করে আটার বস্তার ন্যায় গাদাগাদি করে ট্রাকে সাজিযেছে। ৬ ঘন্টার যাত্রা পথে দমবন্ধ হয়েই তারা মারা গেছে। তাদের অপরাধ, গ্রেফতারকৃত নেতাদের তারা মূক্তি দাবি করছিল। পশুর সাথেও মানুষের আচরণ এতটা নিষ্ঠুর হয়না। এমনকি খুণি বা ডাকাতেরাও এমন বর্বরতা প্রকাশ্য দিবালোকে করতে লজ্জাবোধ করে। কিন্তু থাই পুলিশ সেটি করেছে টিভি ক্যামেরার সামনে। এটি করেছে স্পোর্টসরূপে। আরও অবাক করার বিষয়, এ বর্বর চিত্র টিভিতে দেখানোর পরও জাতিসংঘ বা অন্যদেশ দূরে থাক খোদ মুসলিম দেশগুলোতেও প্রতিবাদ নেই। রাজ পথে কোন মিছিলও নেই। মুসলিম উম্মাহ যে আজ কতটা মৃত, খন্ডিত ও প্রাণহীন এটি হলো তারই প্রমান। কারণ মৃত দেহ অত্যাচারিত হলেও তাতে সাড়া জাগে না। অথচ কোন ইউরোপীয় বা মার্কিন নাগরিক মুসলিম দেশে সহিংসতায় মারা গেলে সমগ্র বিশ্ব তাতে সোচ্চার হয়।

 

প্রশ্ন হলো, দুর্বৃত্ত কবলিত এ বিশ্বে নিজেদের বাঁচাতে মুসলমানেরা নিজেরা কি করেছে? কোনকালেই এ বিশ্ব জালেমমূক্ত ছিল না। আজকের বুশ-ব্লেয়ার-পুটিন-শ্যারনের ন্যায় অতীতেও আবু লাহাব, আবু জেহেল, নমরুদ ও ফেরাউন ছিল। আল্লাহর দ্বীনের অনুসারিদেরকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র অতীতে যেমন হয়েছে তেমনি আজও হচ্ছে। কোরআন শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের তাগিদই দেয় না। এমন জালেমের বিরুদ্ধে কি করণীয় কি সেটিও শেখায়। তাই ইসলাম অতীতে শুধু নামাযী, রোযাদার, হাজী বা দ্বায়ীই সৃষ্টি করেনি, মোজাহিদ এবং শহিদও গড়েছে। নেকড়ের দয়ার উপর ভরসা করে জীবন বাঁচে না। সভ্যতা নির্মানে তাই শুধু বুদ্ধিবৃত্তি, শিক্ষা ও সংস্কুতিই গুরুত্বপূর্ণ নয়, অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো সামরিক শক্তি। শত্র“র হামলা থেকে বাাঁচার এ ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। হামলার মুখে লড়াই এজন্যই ফরয। এভাবেই বাড়ে আত্মরক্ষা। আত্মরক্ষায় অমনযোগী হলে মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ গড়েও জানমাল বাঁচে না। হালাকু-চেঙ্গিজের হাতে বাগদাদ যখন ধ্বংস হয় এবং নিহত হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ তখন মসজিদ-মাদ্রাসা কম ছিল না। তেমনি স্পেনের মুসলমানরা যখন গণহত্যার শিকার হয় তখনও সেখানে মসজিদ মাদ্রাসা কম ছিল না। কিন্তু তাতে মুসলমানের জানমাল ও ইজ্জত বাঁচেনি। সামরিক শক্তির বিকল্প সামরিক শক্তিই। তাই সাহাবায়ে কেরাম যেমন নামায-রোযায় কাটিয়েছেন তেমনি অস্ত্র শান দিয়ে যুদ্ধেও নেমেছেন। কোরআন মোমেনের সে বিশেষ গুণের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবেঃ ওয়া ইয়াকতুলুনা ও ইয়ুকতালুন। অর্থঃ তারা নিজেরা যেমন হত্যা করে তেমনি নিহতও হয়।

 

মুসলমানগণ পঙ্গু নয়। আকার-আকৃতি, শারীরিক বল, মাথা-মগজ কোনদিক দিয়েই কাফেরদের থেকে তাদের কম দেয়া হয়নি। কম দেয়া হয়নি প্রাকৃতিক সম্পদ। বরং প্রাকৃতিক সম্পদে অতি সমৃদ্ধ হলো মুসলমানেরা। তেল, গ্যাস, টিন, রাবার, ইউরেনিয়াম, তুলা, গমসহ নানা প্রাকৃতিক ও কৃষি-সম্পদের বৃহৎ অংশ উৎপাদিত হয় মুসলিম দেশে। বিশ্বের সর্বাধিক সৌর শক্তিও রয়েছে তাদের দেশগুলিতে যা অচিরেই শক্তির অতি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হবে। মুসলিম বিশ্বের তেলে শুধু গাড়ীই চলে না, বিশ্বের অর্থনীতিও চলে। তেলের মূল্য বাড়লে তাই মন্দা দেখা দেয় বিশ্ব-অর্থনীতিতে। তাদের আরেক সম্পদ রাবারও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গাড়ি, বিমান ও সামরিক যানের টায়্যার এ ছাড়া নির্মিত হয় না। তাদেরই রয়েছে সর্বাধিক জনশক্তি, তথা আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। পরিচর্যা পেলে যাদের প্রত্যেকে তেলের বা সোনার খনির চেয়েও মূল্যবান প্রমাণিত হতে পারে। যে জনশক্তির অভাবে মার্কিনীদের পার্টনার খুঁজতে হয় সে সমস্যা মুসলমানদের নেই। তারা ছড়িয়ে আছে বিশ্বের সর্বত্র। মুসলিম দেশে মার্কিন বসতি নেই। অথচ কুয়েত, কাতার ও জর্দানের ন্যায় কয়েকটি রাষ্ট্রের সমুদয় জনসংখ্যার চেয়ে বেশী মুসলমান বাস করে আমিরিকায়। মুসলিম দেশে ইউরোপীয় বসতিও নেই। অথচ আফগানিস্তানের জনসংখ্যার সমান সংখ্যক মুসলমান রয়েছে ইউরোপে। মুসলমান রয়েছে এমনকি দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও চীনে। তেমনি বাংলাদেশের জনসংখ্যার চেয়েও বেশী মুসলমান রয়েছে ভারতে। মুসলিম দেশগুলির ভূগোলসংলগ্ন হলো সুয়েজ, বসফরাস, জিব্রাল্টার ও মালাক্কা জলপথের ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ বানিজ্যপথ। বিশ্ব রাজনীতির ক্ষেত্রে এগুলি গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানদের প্রাকৃতিক সম্পদ, জনশক্তি ও ভৌগলিক অবস্থান - এর প্রতিটিই হলো আল্লাহর আমানত। আর সর্বশ্রেষ্ঠ আমানত হলো পবিত্র কোরআন। এ আমানতের দায়িত্ব পালনই মুসলমানদের সবচেয়ে বড় কাজ। নিছক মানুষ হওয়ার কারণে নয়, বরং এ দায়িত্ব অর্পিত হওয়ার কারণেই মুসলমান পেয়েছে আল্লাহর খলিফার মর্যাদা। আরবী ভাষায় সম্পদের হেফাজত বা ওয়াদাপালনের অঙ্গিকারকে বলা হয় আমানত। এবং এর বিপরীত হলো খেয়ানত। আরবীতে খেয়ানতকারিকে বলা খা’য়েন বা গাদ্দার। বাংলা অর্থ বিশ্বাসঘাতক। আল্লাহর উপর ঈমান আনার অর্থঃ মহান আল্লাহর নির্দেশালী পালনেও অঙ্গিকার বদ্ধ হওয়া। মোমেনের প্রকৃত আমানতদারি হলো এটি। এবং এ আমানতদারি আল্লাহর রহমত বয়ে আনে। এবং  খেয়ানত আনে আযাব। আমানতের দায়িত্ব পালনে মূসা (আঃ)কে ফিরাউনের দরবারে যেতে হয়েছিল। আজকের ফিরাউনদের চেয়ে সে আমলের ফিরাউন কম নিষ্ঠুর ছিল না। ইহুদীদের প্রতিটি পুরুষ শিশুকে সে হত্যা করতো। ফলো এমন নিষ্ঠুর জালেম শাসকের সামনে আল্লাহর ফরমান নিয়ে হাজির হওয়াই ছিল বিপদজনক। একালের ন্যায় সেকালের ফিরাউনের সামনে কথা বলতেও মানুষ ভয় পেত। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ পালনে মূসা (আঃ) শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত রেখেছেন। আল্লাহপাক তাঁর সাহসিকতায় এতই মুগ্ধ হয়েছেন যে সেটিকে শিক্ষানীয় করতে পবিত্র কোরআনে বার বার বর্ণনা করেছেন। এ আমানতদারির পুরস্কার স্বরূপ তাঁকে ও তাঁর কওমকে বাঁচাতে আল্লাহপাক সমুদ্রকে বিভক্তকরে মাঝখানে শুকনো রাস্তা করে দিয়েছেন এবং ডুবিয়ে হত্যা করছেন ফিরাউন ও তার বিশাল বাহিনীকে। অপর দিকে আল্লাহর বানী পৌছে দেওয়ার কাজ থেকে পিছু হটার কারণে নবী হয়েও মাছের পেটে ডুকতে হয়েছিল হযরত ইউনূস (আঃ)কে।

 

সাহাবায়ে কেরামও আমানতের দায়িত্ব পালনে নিজেদের সকল সামর্থ বিণিয়োগ করেছিলেন। তাদের বিণিয়োগ দেখে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর নিজের বিণিয়োগটিও বাড়িয়েছিলেন। তাঁদের সাহায্য করতে নেমে এসেছিলেন অসংখ্য ফেরেশতা।  আরবের দরিদ্র ও মুষ্টিমেয় মুসলমানেরা সেকালের বিশাল আরব, রোমান ও পারস্য বাহিনীর উপর সে সাহায্য বলেই বিজয়ী হযেছেন। আজও বিজয়ের এছাড়া ভিন্ন পথ নেই। মুসলমানরা যখনই আল্লাহতায়ালার উপর বিশ্বাস না করে নিজ সামর্থের উপর ভরসা করেছে তখনই পরাজিত হয়েছে। তাই পাকিস্তানের বিশাল সেনাবাহিনী ও আনবিক বোমা তাদের ইজ্জত বাড়াতে পারেনি। বরং পরিণত হয়েছে যুক্তরাষ্টের কাছে আত্মসমর্পনকারি একটি দেশে। মার্কিনীদের নির্দেশে দেশটির সরকার নিজ দেশের নাগরিকদের তুলে দিচ্ছে মার্কিনীদের হাতে। তেমনি মিশর, সিরিয়া, জর্দানের সম্মিলিত বাহিনী অতীতের যুদ্ধে ইসরাইল-অধিকৃত একইঞ্চি ভূমিও উদ্ধার করতে পারিনি। অথচ গাজার নিরস্ত্র কয়েক লাখ মানুষ ইসরাইলকে পিছু হটতে বাধ্য করছে। একই ভাবে সাদ্দামের বিশাল আর্মি ইরাকের প্রতিরক্ষায় ব্যর্থ হলেও ফালুজার স্বল্পসংখ্যক মানুষ শহরটিকে দীর্ঘদিন হানাদার ম্ক্তু রেখেছে। আল্লাহর সাহায্য লাভে যেটি অপরিহার্য সেটি সংখ্যা নয়, খালেস নিয়ত ও আত্মবিণিয়োগ। এবং সে বিণিয়োগই আল্লাহর বিণিয়োগকে আসমান থেকে নামিয়ে আনে।   জাতীয়তাবাদী বা বর্ণবাদী যুদ্ধে সেটি হয় না। কারণ আল্লাহপাক তাঁর দ্বীনের তরে আত্মদানকারিদেরকে সাহায্য করতে ওয়াদাবদ্ধ, পতাকা, মাটি বা ভূগোলের জন্য নয়। মুসলমানদের পরাজযের পালা তখনই শুরু যখন তারা আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের স্বার্থ ভূলে মাটি বা ভূগোলের জন্য লড়তে শুরু করেছে। এবং কাফেরদের সাথে আঁতাত গড়েছে।

 

যে কারণে হযরত ইউনূস (আঃ) মাছের পেটে ঢুকতে বাধ্য হয়েছিলেন সেই একই কারণে প্রায় সমগ্র মুসলিম বিশ্বই আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেটে। তেল ও গ্যাসশিল্পই শুধু নয়, মুসলিম বিশ্বের অর্থনীতি, আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ সামরিক ও বেসামরিক প্রায় সকল স্থাপনা আজ মার্কিনীদের নিয়তন্ত্রে। ফলে নিজ দেশ থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রভাবমূূুক্ত হওয়ার সামর্থ নেয় সৌদিআরব, কাতার, কুয়েত বাহরাইন, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, উযবেকিস্তান, তাযাকিস্তান ও পাকিস্তানসহ কোন মুসলিম দেশেরই। এমন কি এসব দেশগুলির সামর্থ নেই কোরআন সূন্নাহর আলোকে শিক্ষা ও আইন প্রণয়নের। অধিকার নেই স্বাধীন বানিজ্যনীতি বা আনবিক প্রকৌশল উন্নয়নের। গোলামকে যেমন সবকিছূ মনিবের খেয়ালখূশী অনুযায়ী করতে হয় তেমনি অবস্থা মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের। মুসলমানদের উপর এটিই হলো সবচেয়ে বড় আযাব। এমন আযাব বনি ইসরাইলীদের জীবনেও এসেছিল যখন তারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করা থেকে বিরত থেকে আব্দার ধরেছিল আল্লাহ যেন নিজেই তাদের জন্য যুদ্ধ লড়েন। তাদের এ আচরণই মহা আযাব ডেকে এনেছিল। শত শত বছর নানা দেশের নানা পথে তাদেরকে ঘুরতে হয়েছিল। কথা হলো. আজকের মুসলমানদের আব্দারও কি তা থেকে ভিন্নতর? মুসলমান মারা পড়ছে আফগানিস্তানে, ইরাকে, ফিলিস্তিনে ও কাশ্মীরে। এককালে মুসলমানরা জালেমের নির্যাতন থেকে হিন্দুদের বাঁচাতে যুদ্ধ করেছেন। যেমন মহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে করেছেন। অথচ মুসলমান শাসকেরা আজ মজলুম মুসলমানদের সাহায্য না করে সাহায্য করছে হানাদারকে। মার্কিন অর্থনীতি বাঁচাতে সৌদি আরবসহ বহু আরব রাষ্ট্র তেলের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। হানাদার সৈনিকদের নিরাপত্তা বাড়াতে নিজ দেশে ঘাঁটি বানানোর অনুমতিও দিচেছ। অথচ ইরাক, ফিলিস্তন বা সূদানের পুষ্টিহীন শিশুদের বাঁচাতে তাদের উদ্যোগই নেই। যারা নামাযী তারাও কর্মকান্ড সীমিত রেখেছে নিছক দোয়ার মধ্যে। তাদের দাবী, আল্লাহতায়ালা যেন ফিরেশতা পাঠিয়ে অধিকৃত ভুমিকে উদ্ধার করে দেন এবং পরাজিত করেন হানাদারদের। 

 

কোন কিছুই এ বিশ্বে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া হয় না। ইসলামের এটি মৌল বিশ্বাস। অথচ মুসলিম বিশ্বে আজ যেটি হচ্ছে সেটিকে কি আল্লাহর রহমত বলা যায়? লক্ষ লক্ষ মানুষের এমন মৃত্যুকে রহমত বললে আযাব কোনটি? এ আযাব থেকে মুক্তির উপায় একটিই। তা হলো, হযরত ইউনূস (আঃ) যেমন তওবা করে আল্লাহর আদেশ পালনে আত্মনিয়োগ করেছিলেন তেমনি মুসলমানদের দায়িত্ব হবে তওবা করে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্টায় সচেষ্ট হওয়া। নইলে আযাবই ত্বরান্বিত হবে। নামায রোযা যেমন প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরয তেমনি ফরয হলো আল্লাহর দ্বীন-প্রতিষ্টার এ কাজ। এ পথে যেমন যুদ্ধ আছে তেমনি নির্যাতনও আছে। দ্বীন-প্রতিষ্টার এ কাজ যেমন মৌলবাদ নয় তেমনি সন্ত্রাসও নয়। বরং এটিই হলো অতি সরল ও সনাতন ইসলাম। অতীতে এ সরল ও সনাতন ইসলামের অনুসারিরাই আল্লাহর পথে যুদ্ধ করেছেন, নিহত বা আহতও হয়েছেন। এমন যুদ্ধ যেমন নবীজীর (সাঃ) আমলে ছিল তেমনি আজও থাকবে। এটিই জিহাদ। এবং জিহাদের মর্যাদা নামায রোযার চেয়েও শ্রেষ্ঠ। কারণ, এখানে বিণিয়োগ নিছক ক্ষণিকের রুকু সেজদা নয়, বরং,মোমেনের সমগ্র অস্তিতেÍ। নামায রোযায় বাঁচবার স্বপ্নসাধ এবং আনন্দ-আহল্লাদ বিলুপ্ত হয় না, কিন্তু এখানে হয়। আল্লাহতায়ালা মোজাহিদের এমন প্রাণদানে এতই খুশী হন যে তার জীবন থেকে মৃত্যুকেই বিলুপ্ত করেন। সে পায়  মৃত্যূহীন জীবন। পায় অনন্তকালের রেজেক। পায় বীনা হিসাবে জান্নাত।

 

নামায-রোযা যেমন সর্বসাধারনের ইবাদত, তেমনি ইসলামের জিহাদও সর্বজনের। তাই পেশাদার সৈনিকের বা জেনারেলের যুদ্ধগমনে অন্য মুসলমানের ইবাদত পালিত হয়না। মুসলমানের প্রতিটি য্দ্ধু এ জন্যই গণযুদ্ধ। তাই অতীতের যুদ্ধে প্রতিজন সাহাবী অংশ নিয়েছেন। অতীতের জিহাদগুলির ন্যায় আফগানিস্তানের জিহাদে রাশিয়ার বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের বড় কারণ ছিল এটি। কোরআনে বলা হয়েছেঃ “ইনফিরু খিফাফাও ওয়া ছিকালাও ওয়া জাহিদু বি আমওয়ালিকুম ও আনফুসিকুম (সুরা তাওবা)।” অর্থঃ তোমাদের প্রস্তুতি কম হোক ও বেশী হোক বেরিয়ে পড়, এবং জিহাদ কর নিজের সম্পদ ও প্রান দিয়ে।” নবীজী তাই অতি স্বল্প সংখ্যক সাহাবী নিয়ে তারা দ্বীন প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করেছিলেন। যারা ভাবে আনবিক বোমা, বোমারু বিমান ও উন্নতমানের কামান ও ট্যাংক আবিস্কার না করে কি যুদ্ধে নামা যায়? এ চেতনা আল্লাহর নির্দেশের পরিপন্থি। জালেমের মোকাবেলায় এরাই রণেভঙ্গ দেয় এবং চুক্তি করে আত্মসমর্পনের। এরাই জাতিকে আত্মবিশ্বাসহীন করে। পরাজয় তখন অনিবার্য হয়ে উঠে। বিপুল অস্ত্র ফেলে সাদ্দামের বাহিনীর পলায়নের মূল কারণ যুদ্ধকে তারা বেতনভোগীদের মাঝে সীমাবদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু লেবাননের হিযবুল্লাহ জিহাদকে সর্বজনের ইবাদতে পরিণত করেছিল। প্রস্তুতি যা ছিল তা নিয়েই ঝাঁপিয়ে পরেছিল। ফলে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তিকে তারা পরাস্ত করতে পেরেছিল।

 

মুসলমানের প্রতিটি কর্ম যেমন হবে ইবাদত তেমনি প্রতিটি যুদ্ধকে হতে হবে জিহাদ। ফেরাস্তেরা এমন জিহাদে সৈনিকের কাতারে হাজির হয়। কিন্তু সেটি সাদ্দামের দ্বারা হয়নি। সে এটিকে একটি জাতিয়তাবাদী যুদ্ধে পরিণত করেছিল। ফিলিস্তিনের গাজা, ইরাকের ফালুজার মুসলমানেরা আজও যে বিশাল হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অবিরাম লড়ে যাচ্ছে তার মুল কারণ, এটি  বেতনভোগী সৈনিকের যুদ্ধ নয়। পরিণত হয়েছে জান্নাতমুখি মোজাহিদের জিহাদে। কাফের যেমন জীবনকে ভালবাসে মোমেনেরা তেমনি শাহাদতকে ভালবাসে। শাহাদতকে তারা জান্নাতের প্রবেশের নিশ্চিত চাবি হিসাবে বিশ্বাস করে। একারণেই মার্কিন বাহিনী ইরাক বা আফগানিস্তানের রাস্তায় বেরুতে ভয় পায়। সেখানে মানুষ পরিণত হয়েছে চলমান বোমায়। প্রতিরোধের দায়িত্ব যখন প্রতিটি নাগরিক নেয় তখন সে জাতিকে কি বিদেশী হানাদাররা পরাজিত করতে পারে? মার্কিন বাহিনী কোন কালেই এমন সৈনিকদের মুখোমুখী হয়নি। ইরাকে ও আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর যে ব্যর্থতা শুরু হয়েছে সেটিই তাদের সামগ্রিক ব্যর্থতা ডেকে আনবে। এবং বিলুপ্ত হবে বিশ্বনেতৃত্বের স্বপ্নসাধ। শত শত আনবিক বোমা, হাজার হাজার বোমারু বিমান ও অসংখ্য মিজাইল থাকা সত্ত্বেও সোভিয়েত রাশিয়ার পরাজয় হয়েছে। দেশটি খন্ডিত হয়েছে। তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্টকেও বাঁচাতে পারবে না তার আনবিক বোমা, মিজাইল ও যুদ্ধ জাহাজ। কারণ যুদ্ধের জয়-পরাজয়ের শুধু সামরিক শক্তিরই হিসাব হয় না। এ হিসাব-নিকাশের বাইরেও আরেকটি অদৃশ্য শক্তি কাজ করে। এবং সেটিই মূল। সে অপরাজেয় অদৃশ্য শক্তি হল মহান আল্লাহ। তার সে শক্তির বিরুদ্ধে কেউ কি দাঁড়াতে পারে? নমরুদ, ফিরাউন ও আবরাহার বাহিনীর বিনাশে তাই কাউকে একটি তীরও ছুড়তে হয়নি। সে শক্তি আজও বিদ্যমান, এবং অনিবার্য ভাবেই পাশে এসে দাঁড়ায় যখন একমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য যুদ্ধ শুরু হয়। পবিত্র কোরআনে সে প্রতিশ্র“তি বার বার এসেছে। আল্লাহর এ প্রতিশ্র“তি বিশ্বাস না করলে কি ঈমান থাকে? বহু পরাজয়ের পর আশার কথা হলো, আজ ইরাকে, আফগানিস্তানে ও ফিলিস্তিনে তেমনই একটি যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মানুষ সন্ধান পেয়েছে সনাতন ইসলামের। ফলে ইরাক যুদ্ধে বহু শত বিলিয়ন ডলার খরচ করেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট হিমসিম খাচ্ছে। সাহায্য চেয়ে হাতে-পায়ে ধরছে তাদের যাদেরকে তারা ক’দিন আগেও এ্যাকসিস অব ইভিল বা দুষ্ট চক্র বলে গালি দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে অপরাজেয় নয় সেটি যেমন ভিয়েতনামে প্রমাণিত হয়েছে সেটিই আজ প্রমাণিত হচ্ছে ইরাকে ও আফগানিস্তানে। ইসলামের বিজয় তো যুগে যুগে অনিবার্য হয় এ পথেই। লন্ডন, (১৯/১১/২০০৬)



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Sunday, 27 February 2011 00:45
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.