Home লড়াই ও রাষ্ট্রবিপ্লব যে দায়িত্ব প্রতিটি মুসলমানের
যে দায়িত্ব প্রতিটি মুসলমানের PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 01 January 2011 19:02

মুসলমানের জীবনে যেটি অপরিহার্য তা হলো আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্যদান। এ সাক্ষ্য সত্য বা হক্বের পক্ষে। এ কাজ আজীবনের। ইসলামী পরিভাষায় এটিই হলো শাহাদাহ। মুসলিম হতে আগ্রহী প্রতিটি ব্যক্তিকে এ কালেমায়ে শাহাদাহ পাঠ করতে হয়। এ কালেমা পাঠ ছাড়া কেউ মুসলমান হতে পারে না। মুসলমানের জীবনে সকল বিপ্লবের উৎস হলো এটি। শাহাদাহ শব্দের অর্থ সাক্ষ্য দেওয়া। তাকে সাক্ষ্য দিতে হয়, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং রাসূলে পাক হযরত মহম্মদ (সাঃ) হচ্ছেন তাঁর গোলাম ও রাসূল। বস্তুতঃ শাহাদার মধ্য দিয়ে মুসলমান রূপে তার যাত্রা শুরু হয়। সে পায় সঠিক লক্ষ্য, বাঁচবার সঠিক পথ ও সঠিক এজেন্ডা। আল্লাহর নিবেদিত গোলাম ও তাঁর পক্ষে সাক্ষ্যদানের চেয়ে ব্যক্তির জীবনে যে উচ্চতর কোন মর্যাদা ও মিশন নেই সে চেতনাও তখন বদ্ধমূল হয়।

 

প্রতি সমাজে এমন সাক্ষ্যদাতার গুরুত্ব অপরিসীম। সত্যকে বিজয়ী করতে হলে তার পক্ষে সাক্ষ্যদানকারি চাই বিবেকের প্রতি আদালতে। সত্য যে প্রকৃতই সত্য এবং মিথ্যা যে প্রকৃতই মিথ্যা সে টুকু বলার জন্যও লোক চাই। নইলে সমাজের সাধারণ মানুষ সত্যকে জানবে কেমনে? মিথ্যাকেই বা পরিহার করবে কেমনে? আরবের বুকে সত্যের ঝান্ডা নিয়ে নবীজী (সাঃ) দাঁড়িয়েছিলেন বলেই অগনিত মানুষ সেদিন মহান আল্লাহকে চিনেছিলেন। চিনেছিলেন তাঁর দ্বীনকে। নবীজীর (সাঃ) সে সূন্নতকে সাহাবাগণ বাঁচবার মূল লক্ষ্য ও মিশনে পরিণত করেছিলেন। এ মিশন নিয়ে তারা বহু দেশে গিয়েছিলেন। ফলে সেসব দেশের মানুষের পক্ষেও সত্যপথ-প্রাপ্তি সম্ভব হয়েছিল। আল্লাহতায়ালা চান তাঁর সত্য পরিচয় ও সত্য দ্বীন প্রতি দেশে পরিচিতি পাক ও বিজয়ী হোক। এ কাজ তিনি ফেরাশতাদের দ্বারাও করতে পারতেন। করতে পারতেন নিজ কুদরত দ্বারাও। যে কুদরত বলে চন্দ্র-সূর্য নিজ কক্ষপথ থেকে বিচ্যূত হতে পারে না তেমনটি তিনি মানুষের জন্যও করতে পারতেন। কিন্তু সেটি হলে মানুষের জন্য পরীক্ষা ও পরীক্ষা পরবর্তী শাস্তি ও পুরস্কারের যে ব্যবস্থা রেখেছেন সেটি সম্ভব হতো না। আল্লাহপাক চান সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে পুরস্কৃত করতে। সত্যদ্বীনসহ লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠানোর মূল কারণতো এটাই। নবী-রাসূলদের সাথে এ কাজের দায়িত্ব প্রতিটি মুসলমানেরও। পবিত্র কোরআনে সে অর্পিত দায়িত্বের বর্ণনা এসেছে এভাবেঃ ” ওয়া কাযালিকা জায়ালনাকুম উম্মাতাও ওসাতাল্লিতাকুনু  শুহাদাআ আলান্নাস।” অর্থঃ অতঃপর এভাবে তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠা করলাম মধ্যমপন্থি একটি উম্মাহরূপে যাতে তোমরা সাক্ষ্য দাও সমগ্র মানব জাতির উপর (সূরা বাকারা - ১৪৩)। অতএব প্রতিটি মুসলমান মাত্রই আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্যদানকারি। এ সাক্ষ্যদান শুধু মৌখিক নয়। বরং তা হতে হবে প্রতিটি কর্ম, লেখনি, বুদ্ধিবৃত্তি, রাজনীতি এমনকি জীবন দিয়েও। কারণ, অন্যায় ও অসত্যের পক্ষটি পরাজয় মানতে রাজি নয়। তারা চায় মিথ্যাচর্চা এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার অব্যাহত সুযোগ। এটি নিশ্চিত করতেই তারা নিশ্চিহ্ন করতে চায় সকল সত্যপন্থিদের। মিথ্যার সাথে সত্যের সংঘাত এজন্যই অনিবার্য। নবীজীর (সাঃ) ন্যায় শান্তিপ্রিয় ব্যক্তির পক্ষেও তাই যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়নি। আর এ সংঘাতময় পরিণতির কথা আল্লাহপাকের চেয়ে আর কে বেশী জানেন? তাই মৌখিক সাক্ষ্যদানের সাথে তিনি জানমালের কোরবানীর কথাও বলেছেন। যারা প্রাণ দেয় তারা বস্তুতঃ আল্লাহর পক্ষে সর্বোচ্চ কোরবাণী পেশ করে। তাদের উপর তিনি প্রচন্ড খুশী। তাদেরকে বলেছেন মৃত্যুহীন। জান্নাতে প্রবেশ করবে বিনা হিসাবে। মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় বিজয় আর কি হতে পারে?

 

আর আল্লাহপাক এমন বিজয় দিতে চান প্রতিটি ঈমানদারকে। আর সে বিজয়কে নিশ্চিত করতেই মহান আল্লাহতায়ালা ইসলাম কবুলের সাথে সাথে প্রতিটি মুসলমানকে এক পবিত্র চুক্তিতে আবদ্ধ করেন। সেটি হলো, জান্নাতের বিনিময়ে ঈমানদারের জানমাল ক্রয়ের। সে চুক্তিটির ঘোষণা এসেছে এভাবেঃ ’ইন্নাল্লাহা আশতারা মিনাল মু’মিনিনা আনফুসাহুম ওয়া আমওয়ালাহুম বি আন্নালাহুমুল জান্নাহ। ইউকাতেলুনু ফি সাবিলিল্লাহি, ফাইয়াকতুলুনা ও ইয়ুকতালুন।” অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মুনিদের জানমাল কিনে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে। তারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে এবং অতঃপর তারা নিহত হয় বা (শত্র“দের) হত্যা করে (সুরা তাওবাহ -১১১)।  ফলে যে ইসলাম মুসলমানকে আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্য দানের সাথে অর্থদান, শ্রমদান, এমনকি প্রাণদানে নির্দেশ দেয় সে ইসলামে ধর্মনিরপেক্ষ থাকা জায়েজ হয় কি করে? ভিন্ন্ ধর্ম, ভিন্ন মতবাদ বা ভিন্ন শক্তির পক্ষে যাওয়া দূরে থাক, নিরপেক্ষ থাকাও তো আল্লাহর অবাধ্যতা তথা হারাম। এটি ইসলামের এতই মৌলিক বিষয় যে ১৪ শত বছর পূর্বের নিরক্ষর বেদূঈনগণও সেটি বুঝতেন। ফলে ইসলাম ও অনৈসলামের দ্বন্দে নিরপেক্ষ থাকার বিষয়টি তারা ভাবতে পারেননি। ফলে সেকুলারিজম বা ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে মুসলিম বিশ্বে আজ যেটি প্রচলিত সেটি নবীপাকের সময় যেমন ছিল না, তেমনি সাহাবায়ে কোরমের সময়ও ছিল না। এ মতবাদের জন্ম অমুসলিমদের হাতে। ফলে ইসলামের মৌলিক শিক্ষাতে যারা অজ্ঞ, নবীজীর (সাঃ) সূন্নতের সাথে যারা অপরিচিত এবং সুস্পষ্ট ভাবেই যারা পথভ্রষ্ট একমাত্র তারাই সেকুলার হতে পারে, কোন মুসলমান নয়। দুই শত বছরের উপনিবেশিক শাসনে মুসলিম ভূমিতে পতিতাবৃত্তি, সূদী লেনদেন, মদ্যপাণ, নগ্নতা ও নানা পাপকর্ম যেমন বাণিজ্য ও সংস্কৃতি রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তেমনি ধর্ম নিরপক্ষতার মত হারাম ধারণাটিও রাজনৈতিক মতবাদরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এরাই মুসলিম দেশগুলিতে শয়তানি শক্তির বিশ্বস্ত প্রতিনিধি। এদের কারণেই আফগানিস্তান বা ইরাক দখলে সাম্রাজ্যবাদীদের বন্ধুর অভাব হয় না। মুসলমানদেরকে ইসলামে অঙ্গিকারহীন ও নিষ্ক্রীয় করার লক্ষ্যে শত্র“পক্ষ এদের শাসনকেই দীর্ঘায়ীত করতে চায়। এসব পাশ্চাত্য-দাসদের শাসন বাঁচাতে এরা ঘাঁটি গেড়েছে মুসলিম বিশ্বেও কোণে কোণে। ইসলামের উত্থাণ রুখতে এরা গণবিধ্বংসী অস্ত্র প্রয়োগও করছে।
 

আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্যদান শুধু মুসলমান হওয়ার শর্ত্বই নয়, ঈমানের বড় পরীক্ষাও। এ সাক্ষ্যদান যেমন আল্লাহর পক্ষে, তেমনি শয়তানি শক্তির বিপক্ষে। দুর্বৃত্ত কবলিত সমাজে সশস্ত্র  দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যদান বিপদ ডেকে আনে। ফিরাউনের বিরুদ্ধে যে ক’জন মিশরীয় যাদুকর ঈমান এনেছিলেন তারা ফিরাউনের বিরুদ্ধে কোন অপরাধই করেনি। সমাজে কোন অঘটনও ঘটায়নি। তারা লা-শরিক আল্লাহর পক্ষে জনসম্মুখে সাক্ষ্য দিয়েছিল মাত্র। তাতেই তাদের হাত-পা কেটে অতি নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। একই অবস্থা হয়েছিল হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সাথে। তিনিও কারো বিরুদ্ধে কোন অপরাধ করেননি। আল্লাহর পক্ষে শুধু সাক্ষ্যদানের কারণে তাকে আগুণে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আগুণ থেকে রক্ষা পাওয়ার পর তাকে দেশ ত্যাগে বাধ্য হতে হয়েছিল। নবী পাক (সাঃ)এর সাথে যেটি ঘটেছিল সেটিও ভিন্নতর ছিল না। মক্কার কাফেরগণ তাঁর হত্যায় উদ্যোগী হয়েছিল। ফলে তাকেও হিজরত করতে হয়েছিল। অবস্থা আজও ভিন্নতর নয়। আজকের ফিরাউনগণ আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্যদানকারিদের বিরুদ্ধে সমান হিংস্র ও নৃশংস। আলজিরিরায় ইসলামপন্থিগণ যখন নির্বাচনে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে তখন তাদের উপর সামরিক  বাহিনী লেলিয়ে দেয়া হলো। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করো হলো এবং নেতাদের বিনা-বিচারে কারারুদ্ধ করা হলো। কারণ শয়তানি শক্তির কাছে ইসলামপন্থিদের বিজয় অসহ্য ছিল। তারা জানতো, ইসলামের বিজয়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, শিক্ষা, আইন-আদালত সবই আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। প্রতিষ্ঠিত হবে শরিয়ত। তাই ইসলামপন্থিদের ক্ষমতায় আসতে দেয়নি। আসতে দিতে চায় না ভবিষ্যতেও। ফলে ইসলামের বিজয় রুখতে অবিরাম নৃশংসতা চলছে এখনও। এবং এর পিছনে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল পাশ্চাত্য শক্তির সমর্থণ। তাদের আনন্দের কারণ এ জন্য যে, ইসলামপন্থিদের নির্মূেল কুফরকবলিত পাশ্চাত্যেও যে এজেন্ডা সেটিই বাস্তবায়ন করছে আলজিরিয়ার সেকুলার সেনাবাহিনী। আফগানিস্তানে যখন পাথরের মূর্তি ভাঙ্গা হলো তখন তা নিয়ে এসব শাসকেরা বিশ্বব্যাপী শোরগোল তুলেছিল, অথচ আলজেরিয়ায় যে প্রায় দুই লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হলো এবং এখনও যা অতি নৃশংস ভাবে চলছে তা নিয়ে এদের প্রতিবাদ নেই। আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গিকারবদ্ধ প্রতিটি মুসলমানই এভাবে পরিণত হয়েছে হত্যাযোগ্য শত্র“তে। ফলে ইসলামের প্রতিষ্ঠার পথে এ সংঘাত যে অনিবার্য সেটি নিশ্চিত। ফলে মুসলমান যতই শান্তিবাদী হোক এ চাপিয়ে দেওয়া লড়াই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। অথচ মুসলমান ইসলামের প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ না করে পারে না। মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো রাষ্ট্রে ইসলামের প্রতিষ্ঠায় শ্রম, মেধা ও শক্তি নিয়োগ করা। নইলে মুসলমানের মুসলমানত্ব থাকে না। তাই শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিষয়টি মুসলমানের কাছে নিছক রাজনীতি নয়, আখেরাত বাঁচানোর বিষয়। আল্লাহপাকের ঘোষণা হলোঃ মাল্লাম ইয়াহকুম বিমা আনযালাল্লাহু ফা উলায়িকা হুমুল কাফিরুন। অর্থঃ আল্লাহর নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী যারা বিচারকার্য পরিচালনা করে না তারা কাফের (সুরা মায়েদা-৪৪)। ফলে কাফের শুধু মূর্তিপূজকেরাই নয়, যারা শরিয়ত অনুযায়ী দেশ শাসন করে না তারাও। ফলে শয়তানি শক্তির সাথে সংঘাত যত অনিবার্যই হোক এবং শত্র“ যত ক্ষমতাধরই হোক, কোন মুসলমান কি শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কাজ থেকে পিছিয়ে থাকতে পারে? তাছাড়া,  অনন্ত অসীম কালের জান্নাত লাভে অবশ্যই তাকে মূল্য পেশ করতে হবে। এ জীবনের তুচ্ছ বস্তুটিও যেখানে বিনামূল্যে পাওয়া যায় না সেখানে বিনা মূল্যে কি সে জান্নাত  আশা করা যায়? দুনিয়ার সমূদয় স¤পদে জান্নাতের এক ইঞ্চি ভূমিক্রয়ও তো অসম্ভব। শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে সংঘাতে অর্থদান, রক্তদান বা প্রাণদানতো সে মূল্যদানেরই প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়াই হোল অতীতের নবী-রাসূল ও ঈমানদারগণের প্রক্রিয়া। এটিই হলো জিহাদ। নবী পাকের (সাঃ) সাহাবীগণ যত বৃদ্ধ, যত দরিদ্র বা যত নিরক্ষরই হোক, জিহাদে অংশ নেননি এমন নজির নেই। আশি বছরের বৃদ্ধ সাহাবীও শত্র“রর সামনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তাই এ যুগের মুসলমানেরা জিহাদে অংশ না নিয়ে আল্লাহকে খুশি করবেন সেটি কি হয়? নিছক কালেমা পাঠ ও নামাজ আদায়ে সেটি কি সম্ভব? এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের ঘোষণা, ”আম হাসিবতুম আন তাদখুলুল জান্নাতা ওয়া লাম্মা ইয়াতিকুম মাসালুল্লাযীনা খালাউ মিন কাবলিকুম মাস্সাতহুমুল বা’সায়ু ওয়া যারÍায়ু ওয়া জুলজিলু হাত্তা ইয়াকুলারÍাসূলু ওয়াল্লাযীনা আমানু মায়াহু মাতা নাসরুল্লাহ, আলা ইন্না নাসরুল্লাহিল কারিব। অর্থঃ তোমরা কি মনে করে নিয়েছো যে এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের কাছে সে পরীক্ষার দিন এখনও আসেনি যা পূর্ববর্তী নবী রাসূলদের উপর এসেছিল। তাদের উপর এমন বিপদ-আপদ ও ক্ষয়ক্ষতি মধ্যে পড়েছিল এবং তাদেরকে এমন ভাবে প্রকম্পিত করা হয়েছিল যে এমনকি রাসূল এবং তার সাথে যারা ঈমান এনেছিল তারা আওয়াজ তুলতো এই বলে যে আল্লাহর সাহায্য কোথায়? নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য অতিব নিকটবর্তী (সুরা বাকারা-২১৪)।

 

আজ ইসলাম পরাজিত একারণে যে মুসলমানের সংখ্যা বাড়লেও আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্যদানকারিদের সংখ্যা বাড়েনি। আল্লাহর আইন যে মানুষের গড়া আইনের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর সে সাক্ষ্য কি দিচ্ছে মুসলিম দেশের নাগরিকগণ? দিলে তার প্রতিষ্ঠা নেই কেন?  বরং নিজেরা মুসলিম রূপে পরিচয় দিলেও আল্লাহর পক্ষ নেওয়াকে তারা মৌলবাদ ভাবেন। তাদের অনাগ্রাহ ইসলামের প্রতিষ্ঠায়। ভাবেন, এসব যুদ্ধ-বিগ্রহ, ক্ষয়ক্ষতি ও অশান্তির পথ। অথচ আজ মুসলিম বিশ্ব জুড়ে আজ যে অশান্তি ও পরাজয় তার মূল কারণ হল আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায় অনাগ্রহ। কালেমা পাঠ, কোরআন তেলাওয়াত, নামাজ পড়া, রোযা রাখা বা হজ্ব করাকেই  আখেরাতের মুক্তির জন্য যথার্থ মনে করেন। মুখে আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্য দিলেও তাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজনীতি প্রমাণ করে তারা ইসলামে কতটা অঙ্গিকারহীন। বাংলাদেশের মত দেশে ইসলামের প্রতিষ্ঠাকে এরা সাম্প্রদায়িকতা বলে। মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলে ইসলামের শরিয়তকে। ইসলামের বিরুদ্ধে যারা প্রকাশ্যে অবস্থান নেয় তাদেরকে এরা শুধু অর্থ ও ভোটই দেয় না, তাদের পক্ষে অস্ত্র ধরে এবং রক্তও দেয়। এক্ষেত্রে কোরআনে ঘোষণা হলোঃ যারা ঈমানদার তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর পথে আর যারা কাফের তারা যুদ্ধ করে শয়তানের পথে। ফলে আল্লাহর পথে লড়াই করা ছাড়া মুসলমান থাকা আর কোন পথ খোলা আছে কি? তবে বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশগুলোতে মানুষ যে অর্থ, শ্রম ও রক্ত দিচ্ছে না তা নয়। বরং এ খাতে তাদের খরচের খাতা অতি বিশাল। তবে তাদের অর্থ, শ্রম ও রক্তদানে বিজয়ী হচ্ছে শয়তানী শক্তি, ইসলাম নয়। অথচ হওয়া উচিত ছিল এর উল্টোটি। ফলে পাপ শুধু ইসলামে অঙ্গিকারহীন সেকুলার রাজনৈতিক নেতাদেরই নন, বরং মুসলিম পরিচয় দানকারি  সাধারণ মানুষেরও। তাই মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মুসল্লিরা যখন আল্লাহর কাছে আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন বা কাশ্মিরের নির্যাতিত মুসলমানদের পক্ষে সাহায্য চেয়ে হাত তুলেন তখন তাদের দোয়া কবুল হয় না। কারণ, দোয়া কবুলের আগে আল্লাাহপাক মুসলমানদের নিজ বিনিয়োগটা দেখেন। আল্লাহপাক সাহাবায়ে কেরামের দোয়া কবুল করতেন। কারণ, ইসলামের বিজয়ের লক্ষ্যে জীবনের সমুদয় সম্পদই শুধু নয়, এমনকি নিজ জীবনখানি দান করতেও তারা সদাপ্রস্তুত ছিলেন। সত্যিকার অর্থেই তারা ছিলেন আল্লাহর বাহিনী তথা হিযবুল্লাহ। তারা আমৃত্যু লড়ছিলেন শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে। ফলে আল্লাহপাক তার নিজ বাহিনীর বিজয় না চেয়ে বিপক্ষ শয়তানের বিজয় সহয়তা দিবেন সেটি কি হতে পারে? তাই সেদিন আল্লাহর সাহায্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী বিশাল বিশাল শত্র“ বাহিনীর উপর বিজয়ী হয়েছে। শূণ্য থেকে তারা তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সভ্যতর সভ্যতার জন্ম দিয়েছেন। তাদের হাতে পরাজিত হয়েছে রোমান ও পারসিক সাম্রাজ্য। আল্লাহপাক আজও এমন মুসলিম বাহিনীর মদদে সদাপ্রস্তুত, পবিত্র কোরআনে সে প্রতিশ্র“তির কথা বার বার ঘোষিত হয়েছে। কিন্ত সে সাহায্য লাভে মুসলমানদেরও তো প্রস্তুত হতে হবে। এ সাহায্য লাভের শর্ত হলো আল্লাহর দ্বীনের পরিপূর্ণ সাহায্যকারী হওয়া। আর এ কাজ শুধু মুসলিম রাজনীতিবিদ বা ইসলামি সংগঠনসমূহের নেতা-কর্মীদের নয়, প্রতিটি মুসলমানের। আল্লাহর দরবারে প্রতিটি মুসলমানকে আলাদা ভাবে হাজির হতে হবে। ইসলামের বিজয়ে তার নিজ বিনিয়োগ বা কোরবানীটি কি ছিল সে হিসাব সেদিন দিতেই হবে? নেতারা কি করছেন সে প্রশ্ন তাই অবান্তর। আমরা কি করছি সে হিসাব নিতে হবে। একজন মুসলমান হিসাবে কোন ইসলামি নেতার দায়িত্ব যেমন আমাদের চেয়ে বেশী নয় তেমনি আমাদের নিজ দায়িত্বও তাদের চেয়ে কম নয়। আমরা পঙ্গু নই, নিঃস্ব নই, শারিরীক ও মানসিক ভাবে বিকল বা বোধশূণ্যও নই।

 

ইসলামের বিজয়ে যে সব সাহাবায়ে কেরাম তাদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন তাদের চেয়ে আমাদের শারিরীক ও আর্থিক যোগ্যতা কি কম? আমাদের বাড়ী-গাড়ি, অক্ষরজ্ঞান ও বাঁচবার আয়োজন বরং তাদের চেয়ে সমৃদ্ধতর। ফলে বিচার দিনে এ প্রশ্ন উঠবেই, তাদের তুলনায় আমাদের বিনিয়োগটি কি? কোরআনে বলা হয়েছেঃ ছুম্মা লা তুসআলুন্না ইওয়ামা ইজিন আনিন্নায়ীম। অর্থঃ অতঃপর সেদিন এ প্রদত্ত নিয়ামতের ব্যাপারে অবশ্যই প্রশ্ন করা হবে (সুরা তাকাছূর)। আমাদের এ জীবন, এ সময়, এ সহায়-সম্পদ - সব কিছুই আল্লাহর দান। এগুলি আমাদের নিজ সৃষ্টি যেমন নয় তেমনি কোন নেতা বা শাসকের দানও নয়। ফলে আল্লাহ প্রদত্ত এ নেয়ামত খরচ হওয়া উচিত ছিল আল্লাহরই রাস্তায়। অথচ সেটি বিনিয়োগ হচ্ছে ইসলামে অঙ্গিকারহীন শক্তির ক্ষমতাসীন করার কাজে। আমাদের শ্রম ও ভোটদানের ফলেই আমাদের মাথার উপর বসে আছে আল্লাহর বিরুদ্ধচারিদের আধিপত্য। আমাদের জাতীয় সংগীত, সংস্কৃতি, শিক্ষাব্যবস্থা, স্কুল-কলেজের সিলেবাস, পঠিত পুস্তক, আইন আদালত, রেডিও টেলিভিশন এগুলি কিসের প্রতীক? মুসলমানেরা শুধু মুখে আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্য দিবে তা নয়। বরং একই রূপ সাক্ষ্য দিবে তাদের প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি লেখনী ও তাদের গড়া প্রতিটি প্রতিষ্ঠান। আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের পক্ষে সাক্ষ্যদানের মধ্যে দিয়ে প্রতিটি সত্যেও পক্ষে সাক্ষদান তাই প্রতিটি মোমেনের জীবনে অভ্যাসে পরিণত হয়। তাই মুসলিম দেশে আদালতে সত্যবাদী সাক্ষীর অভাব হয়না।

 

যে সব প্রতিষ্ঠান বা দল আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠা না বাড়িয়ে সেকুলার বা শয়তানী শক্তির বিজয় পতাকা উড়ায় সে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে শ্রমদান যেমন হারাম তেমনি অর্থদান ও সমর্থণদানও। কারণ এতে ইসলামের পরাজয়ই শুধু ত্বরান্বীত হয়। অথচ আল্লাহর দেওয়া সকল সামর্থ ও নেয়ামত ব্যয় হবে একমাত্র আল্লাহরই জন্য। এ নিয়ে কোন আপোষ চলে না। মুসলমানের মুখ বা কলমের কালি ইসলামের শত্র“দের গুণগান গাবে তা কি কল্পনা করা যায়? মূর্তিপুজার ন্যায় এগুলিও কি পরিতার্য নয়? তেমনি মুসলমানের অর্থে কোন কুফরি ও সেকুলার শক্তি পরিচর্যা পাবে সেটিও কি ভাবা যায়? মুসলমানের হালাল-হারাম সচেতনতা শুধু ইবাদত বা উপার্জনে নয়, বরং জীবনের প্রতিটি কাজে ও অর্থের প্রতিটি বিণিয়োগে। তাই মুসলমান কোন নাস্তিক, সেকুলারিস্ট বা পৌত্তলিক বা পৌত্তলিকভক্তকে ক্ষমতায় বসাবে বা তার মতবাদের প্রসারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়বে বা তার বই ক্রয়ে বা বিতরণে অর্থ যোগাবে তার তা হতে পারে না। অমুসলমান থেকে মুসলমানের প্রকৃত পার্থক্য তো এখানেই। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানেরা নিজেদের অর্থদান ও ভোটদানে যেসব রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়েছে সেগুলি কি এসব কাজ করে? দেয় কি সিরাতুল মোস্তাকিমের সন্ধান? বরং দেশ জুড়ে ইসলামে অঙ্গিকারহীন চেতনার বিজয়ের মূল কারণ কি এগুলি নয়? এদের কারণেই কি গড়ে উঠেনি তথাকথিত বুদ্ধিজীবীর নামে একপাল পথভ্রষ্ট মিথ্যাজীবী। অথচ তারা বেড়ে উঠেছে সাধারণ মুসলমানের আর্থিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সমর্থনে। ফলে বাড়ছে শুধু রাষ্ট্রের ব্যার্থতাই নয়, বরং নিজস্ব নিষ্ক্রিয়তা ও নিজ বিনিয়োগের কারণে বাড়ছে নিজেদের পাপের অংকটাও। ফলে ব্যর্থতা ও আযাব শুধু দুনিয়াতেই বাড়ছে না, আখেরাতের আযাবের পথও প্রশস্ততর হচ্ছে। কোন মুসলমান কি এসব মেনে নিতে পারে? আখেরাতের ভাবনা যাদের জীবনে সবচেয়ে রড় ভাবনা এবং যাদের জীবনে সর্বাধীক গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়া - তারা কি এ নিয়ে নীরব থাকতে পারে?   লন্ডন, ২০/৭/২০০৩


 



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Sunday, 27 February 2011 00:50
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.