Home লড়াই ও রাষ্ট্রবিপ্লব ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের রোডম্যাপ
ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের রোডম্যাপ PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 27 February 2011 01:00

ভূমিকা 

 মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ। সেটি যেমন নামায-রোযার ন্যায় ধর্মীয় অনুশাসনে, তেমনি প্রতি কর্মে। তখন সে কর্মের গন্ডির মধ্যে এসে যায় রাষ্ট্র এবং সমাজও। তাই মুসলমান মাত্রই স্বপ্ন দেখে এবং সে সাথে আত্মনিয়োগ করে ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের। যার মধ্যে যে স্বপ্ন এবং আত্মনিয়োগ নেই, বুঝতে হবে তার মধ্যে ইসলামও নেই। তাই সমস্যা এখানে ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লব নিয়ে স্বপ্ন দেখা নয়, বরং কীরূপে সেটি সম্ভব তা নিয়ে। এ প্রসঙ্গে নানা দল ও নেতার নানা মত। বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশে এমন ভাবনা নিয়ে বহু দল বহু বছর ধরে কাজ করছে। কিন্তু তাদের পথ ও প্রক্রিয়া নিয়ে কী আজও কোন গবেষণা হয়েছে? তাদের ত্রুটিগুলো কী এবং সফলতাই বা কতটুকু-তা নিয়েও কী কোন চিন্তাভাবনা হয়েছে? এ নিয়ে বিতর্ক নেই যে, বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলাম একটি পরাজিত জীবন বিধান। আল্লাহ-প্রদত্ত ব্যক্তি,সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের এ শ্রেষ্ঠ রোডম্যাপটি অতি সীমিত পরিসরে বেঁচে আছে। রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো দখলে গেছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে। যে কোন মুসলমানের কাছে এটি অসহ্য এক পীড়াদায়ক বিষয়। কোন মুসলমান কী ইসলামের এমন পরাজয় মেনে নিতে পারে? বিচার দিনে আল্লাহতায়ালার দরবারে এ পরাজয় নিয়ে তার নিজের কৈফিয়তটিই বা কি হবে?

 

আল্লাহর দেওয়া কোরআনী জীবনবিধানের প্রতি মুসলমানদের এমন অবহেলা নিজেই এক মহাপাপ। এমন পাপ শুধু আযাবই ডেকে আনতে পারে। ইসলামের বিজয়ে তাদের কি কোনই দায়বদ্ধতা নেই? আলোচ্য বইটি রচিত হয়েছে তেমনি এক দায়বদ্ধতা থেকে। এ বইটি আলোচিত হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লব কেন জরুরী এবং কী ভাবেই বা সেটি সফল হতে পারে তা নিয়ে। আলোচিত হয়েছে, বিপ্লবের পথে অনিবার্য মাইল ফলকগুলোই বা কী? আলোচ্য বইয়ের পুরা ধারণাটি এসেছে নবীজী (সাঃ) যে পর্যায়গুলো অতিক্রম করে একটি রাষ্ট্রীয় বিপ্লবে সফল হয়েছিলেন তা থেকে। আলোচনায় এসেছে, এ  বিষয়ে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহর দিক-নির্দেশনাই বা কী? তবে রোডম্যাপ তো তখনই গুরুত্ব পায়, যখন কাঙ্খিত গন্তব্যস্থলটিতে পৌঁছবার জন্য মানুষ রাস্তায় নামে। যারা পথেই নামে না, তাদের কাছে আবার রোডম্যাপের গুরুত্ব কী? কোনটি সঠিক আর কোনটি বেঠিক সে প্রশ্নটি তো আসে পরে। বাংলাদেশের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় পশ্চাদপদতা মূলতঃ এক্ষেত্রটিতে। তাই ঘুমন্তু মানুষের হাতে রোডম্যাপ তুলে দেওয়ার অর্থ হয় না। তাই এর আগে আরো বহু কিছু বলার থাকে। এ বইয়ে সে বিষয়ও আলোচিত হয়েছে। করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালা এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্ঠাকে কবুল করুণ। আমীন।

 ২০শে ডিসেম্বর ২০০৯

ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লব কেন? 


ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের ধারণাটি কোন ধর্মীয় নেতা, আলেম বা মুসলিম দার্শনিকের নয়। এর লক্ষ্য কোন ব্যক্তি বা দলকে ক্ষমতায় বসানোও নয়। ক্ষমতা দখলের এটি কোন রাজনৈতিক মতলবও নয়। বরং এ রাষ্ট্রবিপ্লবটি যিনি চান তিনি স্বয়ং মহান আল্লাহতায়ালা। ঈমানদার হওয়ার মূল দায়বদ্ধতা হলো, আল্লাহতায়ালার সে ইচ্ছার সাথে পুরাপুরি একাত্ম হওয়া। আল্লাহতায়ালার সে ইচ্ছাটি ঘোষিত হয়েছে এভাবেঃ “তিনিই সেই মহান সত্ত্বা যিনি হেদায়েত এবং সত্যদ্বীনসহ রাসূল পাঠিয়েছেন, যেন সেটি সকল ধর্ম ও সকল জীবন-দর্শনের উপর বিজয়ী হয়, যদিও সেটি মুশরিকদের কাছে অপছন্দনীয়।” -সুরা সাফ, আয়াত ৯। অবিকল অভিন্ন ভাষায় একই ইচ্ছার কথা ঘোষিত হয়েছে সুরা তাওবার ৩৩ নম্বর আয়াত ও সুরা ফাতাহ’র ২৮ নম্বর আয়াতে। সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে দ্বীনের প্রতিষ্ঠাই যে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নাযিলের লক্ষ্য সে ঘোষণাটি এসেছে সূরা শূরার ১৩ নম্বর আয়াতেও। বলা হয়েছে, “তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারিত করেছেন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি নাযিল করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা এবং ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না।”

উপরের আয়াতগুলীতে আল্লাহতায়ালা সুস্পষ্ট করেছেন, কেন তিনি নবী পাঠিয়েছেন এবং কেনই বা কোরআন নাযিল করেছেন এবং ঈমানদারের জীবন-মিশনই বা কি? মুসলমান হওয়ার অর্থ শুধু আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলকে মৌখিক স্বীকার করা নয়, বরং আল্লাহর এ মিশনটির সাথে একাত্ম হওয়া। ঈমানদারির মূল পরীক্ষা তো এখানেই। মহান আল্লাহতায়ালা দেখতে চান, বিশ্ববাসীর মধ্যে কারা তাঁর ইচ্ছার বাস্তবায়নে জানমাল, শ্রম, সময় ও মেধার বিনিয়োগ করে। পবিত্র কোরআনে সে বিনিয়োগে উদাত্ত আহবান এসেছে এভাবেঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাও।” -সুরা সাফ, আয়াত ১৪। ঈমান আনার মূল অর্থ তাই আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হওয়া। মু’মিনের প্রকৃত ঈমানের প্রকাশ তো ঘটে এ ভাবেই। ইসলামে অঙ্গিকারহীন কোন ব্যক্তি, দল বা কোন সেকুলার শক্তির পক্ষে অর্থ, শ্রম, সময় বা ভোটদান কোন ঈমানদার ব্যক্তির পক্ষে এ জন্যই অতি অচিন্তনীয় বিষয়। ইসলামে এটি হারাম। বরং সে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয় ইসলামের বিজয়ে। ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের কাজটি একারণেই আমৃত্যু মিশন ছিল মহান নবীজী (সাঃ)র ও তাঁর সাহাবাদের। এমন একটি রাষ্ট্রবিপ্লবের বিরোধীতার অর্থ, আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। আর এমন বিদ্রোহীকে কি ঈমানদার বলা যায়? নবীজী (সাঃ)র আমলে যারাই সে বিপ্লবে যোগ দেয়নি বা সামান্য বিরোধীতা করেছে তাদেরকে সেদিন কাফের বলা হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে একথাও বার বার ঘোষিত হয়েছে যে, যারা আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যায় তাদেরকে সাহায্য করাই মহান আল্লাহর সূন্নত। অপরদিকে জাতি, গোত্র, বর্ণ, দল বা কোন মতবাদের বিজয় আনতে যারা যুদ্ধ করে, তারা নামে মুসলমান হলেও তাদের পথ ইসলামের নয়। সে পথ গায়রুল্লাহর বা শয়তানের। তাদের এজেন্ডা আল্লাহর ইচ্ছার বিজয় নয়, মুসলমানের গৌরব বৃদ্ধিও নয়। তারা প্রতিপক্ষ মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। অতীতের ন্যায় আজও মুসলমানদের বিপুল মেধা, শ্রম, অর্থ, রক্ত ও সময় ব্যয় হচ্ছে এরূপ গায়রুল্লাহর পথে। তাদের কারণেই আল্লাহর কোরআনী আইন তথা শরিয়ত মুসলিম দেশের আইন-আদালত থেকে অপসারিত হয়েছে এবং বিজয়ী হয়েছে কাফেরদের আইন। তাদের হাতে মুসলিম উম্মাহর মানচিত্র খন্ডিত হয়ে ৫০টির বেশী রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলীতে বিশাল বিশাল সামরিক বাহিনী রয়েছে ঠিকই এবং এসব সেনাবাহিনীর পিছনে বিস্তর অর্থ, শ্রম ও রক্তও বিনিয়োগ হচ্ছে, তবে সেটি আল্লাহর দ্বীন বা বিধানকে সমুন্নত রাখতে নয়। মুসলমানদের ইজ্জত বাড়াতেও নয়। বরং সেটি শরিয়তের পরাজয়, দেশগুলীর খন্ডিত ভূগোল এবং ভাষা ও ভূগোল-ভিত্তিক জাতীয় সরকার বা ট্রাইবাল আধিপত্যকে দীর্ঘজীবী করতে। ফলে বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়লেও বিজয় আসছে না ইসলামের।

মানবজাতির হেদায়েতের লক্ষ্যে মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশেষ গ্রন্থ হলো কোরআন। এ গ্রন্থে তিনি শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের বিধান দেননি, পথ দেখিয়েছেন রাষ্ট্র-পরিচালনা, বিচার-আচার, সম্পদ-বন্টন, অর্থনীতি, যুদ্ধ-বিগ্রহসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে। তাই দ্বীনের পূর্ণ অনুসরণের অর্থ শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়া নয়, নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালনও নয়। সেটি ইসলামকে বিজয়ী করা। মুসলমান হওয়ার শর্ত হলো, কোরআনে ঘোষিত প্রতিটি নির্দেশের পূর্ণ অনুসরণ। এজন্যই যে কোন মুসলিম দেশে যে কাজটি অনিবার্য হয়ে পড়ে তা হলো ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লব এবং রাষ্ট্রজুড়ে ইসলামের পূর্ণ প্রয়োগ। পবিত্র কোরআনের বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে এরূপ রাষ্ট্রবিপ্লবের অসংখ্য নির্দেশাবলী। তাই ইসলামের লক্ষ্য নিছক আধ্যাত্মীক বিপ্লব নয়,রাষ্ট্রব্যাপী বিপ্লবও। মুসলমানের কাজ, রাষ্ট্র-বিপ্লবের এ কাজে নিজেকে পুরাপুরি সম্পৃক্ত করা। এমন রাষ্ট্র-বিপ্লবের কাজ সমাধা করতেই নবীজী (সাঃ)ও তাঁর সাহাবাদের মসজিদের বাইরে আসতে হয়েছে। বার বার রক্তাক্ষয়ী লড়াইয়ে জানমালের বিশাল কোরবানী পেশ করতে হয়েছে। রক্তাত্ব লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই তাদেরকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল নিতে হয়েছে। মুসলমানদের বেশীর ভাগ অর্থ, শ্রম ও রক্ত ব্যয় হয়েছে তো একাজে। বিশ্বের বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে ইসলামের রাষ্ট্রবিপ্লব এসেছে তো এভাবেই। ইসলামের পূর্ণ অনুসারি ও পূর্ণ মুসলমান হওয়ার জন্য সর্বকালে ও সর্বস্থানে এটিই মহান নবী(সাঃ)র অনুকরণীয় আদর্শ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সেকুলারিষ্ট বা ইসলামে অঙ্গিকারহীন দুর্বৃত্তদের জিম্মায় রেখে নামায-রোযায় মনযোগী হওয়া ইসলাম নয়। নবীজী (সাঃ)র সূন্নত বা সাহাবাদেরও ঐতিহ্য নয়। ইসলাম শান্তির ধর্ম, শান্তির প্রতিষ্ঠাই ইসলামের মূল এজেন্ডা। তবে সে শান্তি সুনিশ্চিত হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে অশান্তি সৃষ্টিকারী দুর্বৃত্তদের পরাজিত করার মধ্য দিয়ে। সে শান্তি আসে ইসলামের পূর্ণ অনুসরণে। অন্যধর্ম, অন্য দর্শন বা অন্য মতবাদের অনুসারীদের কাছে আত্মসমর্পণে সেটি অসম্ভব। তাছাড়া সেটি সম্ভব হলে ইসলামের প্রয়োজনীতাই বা কি? কোরআন-নায়িল ও নবী-প্রেরনেরই বা কি দরকার?

মানুষকে পথ দেখানোর দায়িত্ব একমাত্র মহান আল্লাহর। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেছেনঃ “ইন্না আলাইনাল হুদা।”  অর্থঃ নিশ্চয়ই পথ দেখানোর দায়িত্ব আমার।-সুরা লাইল আয়াত ১২। মহান আল্লাহতায়ালা সে দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যেই লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। কিন্তু নবীদের সে শিক্ষা থেকে যুগে যুগে মানুষ বিচ্যুত হয়েছে। বিভ্রান্ত সে মানুষদের পথ দেখাতেই কোরআন হলো সর্বশেষ প্রেসক্রিপশন। এটি রোগমুক্তি ঘটায় সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্ববিধ রোগের। মুসলমানের কাজ হলো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে সে প্রেসক্রিপশনের পূর্ণ প্রয়োগ। কিন্তু রাষ্ট্রজুড়ে সে প্রেসক্রিপশনের প্রয়োগে জরুরী হলো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বত্র জুড়ে ইসলামের বিজয়ে অঙ্গিকারবদ্ধ ব্যক্তিদের দখলদারি। নিছক নামায-রোযা-হজ-যাকাত বা ওয়াজ-নসিহতে সেটি কি সম্ভব? রাষ্ট্রই হলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। পাপ ও নেকী – উভয়ের বিস্তারে রাষ্ট্রের ক্ষমতা বিশাল। এমন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানকে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে রেখে ইসলামের বিজয় দূরে থাক,পরিপূর্ণ চর্চাও কি সম্ভব? তখন বরং পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ময়দানে ইসলামের পরাজয় শুরু হয়।

 

 

রোডম্যাপের গুরুত্ব

 

ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের কাজ কোত্থেকে শুরু হবে, কি হবে শেষ ঠিকানা, মাঝের মাইল ফলকগুলোই বা কি হবে - এগুলো অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যে কোন পথযাত্রার ন্যায় আল্লাহর পথে যাত্রাতেও রোডম্যাপটি তাই অপরিহার্য। নইলে বিভ্রান্তি আসে পথচলায়, তখন ব্যর্থ হয় জীবনের সকল মেহনত ও ত্যাগ-তিতীক্ষা। সেটি পথ না চিনে গাড়ী চালানোর মত। রোডম্যাপে জানা না থাকলে প্রকান্ড বিচ্যুতিও ধরা পড়ে না। কারণ, বিচ্যুতির বিচারে তখন কোন রেফারেন্স পয়েন্ট থাকে না। আল্লাহর পথে নিজের অবস্থানটি কোথায়, গন্তব্যস্থল থেকেই বা কতদূরে, সেটিই বা তখন জানা যায় কি করে? ইসলামে সে রোডম্যাপটি হলো পবিত্র কোরআনে বর্ণীত সিরাতুল মোস্তাকীম। তাই প্রয়োজন নাই এটি আবিস্কারের, বরং প্রয়োজন হলো সেটা জানা এবং পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ। ঈমানদার হওয়ার মূল শর্তই হলো এটি।

মুসলমানের জীবনে সে রোডম্যাপের অনুসরণ শুরু হয় জ্ঞানার্জনের মধ্য দিয়ে। কোরআনের প্রথম আয়াত তাই নামায-রোযার হুকুম নয়, সেটি “ইকরা” অর্থাৎ পড়। এভাবে ফরয করা হয়েছে কোরআনের জ্ঞানার্জন। ইসলামের পথে চলতে হলে এই ফরযটি প্রথমে পালন করতে হয়। জ্ঞানার্জনের মধ্য দিয়েই ঈমানদার জানতে পারে আল্লাহপ্রদত্ত রোডম্যাপ তথা সিরাতুল মোস্তাকিম। সে জ্ঞানার্জনটি যথার্থ না হলে সিরাতুল মোস্তাকিমটি চেনা যেমন অসম্ভব, তেমনি সে পথে চলাও অসম্ভব। ফলে অসম্ভব হয় মুসলমান হওয়া। তাই রোডম্যাপটির অনুসরণে শুরুর দিকটিতে তথা জ্ঞানার্জনের পর্বে কমতি বা ভ্রান্তি হলে বাঁকি পথচলাও সঠিক হয়না। কোন পথটি সঠিক আর কোনটি বিচ্যুতির- সেটুকুও তখন জানা হয় না। পর্বত-সমান বিচ্যুতির পরও অজ্ঞ-ব্যক্তি তখন ভাবে, সে সঠিক পথেই আছে। বাংলাদেশের মত দেশে সূদখোর, ঘুষখোর, দুর্বৃত্ত সন্ত্রাসী, বেপর্দা নারী ও সেকুলার রাজনীতির নেতা-কর্মীরা নিজেদের মুসলমান হওয়া নিয়ে যেরূপ গর্ব করে -তা তো এরূপ অজ্ঞতা নিয়েই। আর এ অজ্ঞতার ফলে ব্যক্তির জীবনে যেটি বাড়ে সেটি সীমাহীন পথভ্রষ্টতা। ইসলামের প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং সে লড়াইয়ে প্রাণদান -এজন্যই এসব ব্যাক্তির কাছে সন্ত্রাস মনে হয়।

রোডম্যাপ নিছক তেলোওয়াতের বিষয় নয়। মুখস্থ করার বিষয়ও নয়। এটি বুঝা ও অনুসরণের বিষয়। ঘরে তাই রোডম্যাপ তথা কোরআন থাকলেই চলে না, সেটি বুঝা এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের সামর্থও থাকা চাই। না বুঝে তেলওয়াত বা মুখস্ত করায় সেটি হয় না। বাংলাদেশে তেলাওয়াতকারির সংখ্যা তো লক্ষ লক্ষ। কিন্তু কাজের কাজ কি আদৌ হয়েছে? ক’জনের জীবনে মিলেছে সিরাতুল মোস্তাকিমের সন্ধান? সিরাতুল মোস্তাকিমে চললে সে পথে শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত আসে না। আসে নির্যাতন, আসে হিযরত, আসে জিহাদ। আসে ইসলামের প্রতিষ্ঠার লড়াই, আসে সে লড়াইয়ে অর্থদান, শ্রমদান ও প্রাণদান। তখন রাষ্ট্রজুড়ে আসে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও। আসে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির প্লাবন। নবীজী (সাঃ)র যামানায় যারাই সে পথে চলেছিলেন তাদের সবাইকে বহু ত্যাগ ও বহু নির্যাতন সয়ে এ ধাপগুলো অতিক্রম করতে হয়েছিল। সিরাতুল মোস্তাকিমের পথে এগুলোই হলো অনিবার্য মাইলফলক। যে পথে এ মাইলফলকগুলো নাই, সে পথটি আর যাই হোক সিরাতুল মোস্তাকিম নয়। ইসলামী দলের নেতা-কর্মী, পীর-উলামা ও তাদের মুরীদ এবং তাবলীগ জামাতের অনুসারীদের কে কতটা সিরাতুল মোস্তাকিম অনুসরণ করছে তা বুঝার উপায় তো তাদের জীবনের সাথে এ রোডম্যাপটি মিলিয়ে দেখা। তাদের মুখের বুলী নয়। নবীজী (সাঃ)র আমলে এ রোডম্যাপটি শুরু দিকটার অনুসরণ হয়েছিল অতি নিষ্ঠার সাথে। ফলে তাঁরা বাঁকি পথটাও সঠিক ভাবে চলতে পেরেছিলেন। শুরুর কাজটি হয়েছিল দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে। হিজরত, ক্ষমতা দখল, জিহাদ, রাষ্ট্রের বুকে ইসলামের বিজয়, ইসলামী সভ্যতার নির্মাণ এবং বিশ্বশক্তিরূপে মুসলমানের উত্থান -এ ধাপগুলো এসেছিল পরে। ইসলামী সভ্যতার মূল বুনিয়াদ নির্মিত হয়েছিল মূলতঃ সে সময়। কিন্তু বাংলাদেশের মত দেশে রোডম্যাপের শুরুর দিকটার অনুসরণ পূর্ণভাবে ও সঠিক ভাবে হয়নি। ফলে জানা বা বুঝা হয়নি খোদ রোডম্যাপটিই। সেটির অনুসরণ তো পরের কথা। আজ থেকে প্রায় ৮ শত বছর আগে বাংলাদেশ যেসব মুসলমানদের হাতে বিজিত হয়েছে তাদের মূল প্রায়োরিটি ছিল রাজ্য জয়, দ্বীনের প্রচার নয়। ছিল না ইসলামের জ্ঞানদান। ফলে আরবী ভাষার চর্চা যেমন বাড়েনি তেমনি বাড়েনি কোরআন চর্চা। যা বেড়েছে তা হলো অর্থ না বুঝে কোরআন তেলাওয়াত। ফলে ইসলামে অজ্ঞতা থেকে গেছে শুরু থেকেই।


ভিশন ও মিশন

প্রতিটি মানুষই একটি স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে। সে স্বপ্নই তাকে সামনের দিকে টানে। ইংরেজীতে সেটিই হলো ভিশন। সে ভিশন থেকেই ব্যক্তি মিশন পায়। ভিশন হলো কাঙ্খিত শেষ ঠিকানার একটি স্পষ্ট ছবি যা চেতনায় সবসময় জ্বল জ্বল করে,পদে পদে সেটিই পথ দেখায় এবং প্রতি মুহুর্তে স্মরণ করায় শেষ ঠিকানার কথা। সেটি পাওয়ার ভাবনা শিহরণ তুলে তার মনের ভূবনে।দেয় পুলক, দেয় বজ্র ঝাঁকুনি। যার জীবনে সে ভিশন নেই, তার জীবনে কোন মিশনও নাই। তার বাঁচাটি হয় উদ্ভিদ বা পশুপাখীর ন্যয়। জন্ম নিল, কিছুকাল বাঁচলো, পানাহার করলো এবং অবশেষে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হারিয়ে গেল। ঈমানদারের মুখের ভাষা, কর্ম ও চরিত্রই শুধু কাফের থেকে ভিন্ন নয়, ভিন্ন হলো চেতনার চিত্রটিও। তার মনের ভূবনে যেটি প্রজ্বলিত সূর্য্যের ন্যায় সব সময় জেগে থাকে সেটি জান্নাতের চিত্র। গাছপালা এবং ফুল ও ফলে পরিপূর্ণ বিশাল বাগান। গাছের নীচ দিয়ে ধীরে ধীরে বহমান নদী। অভাবেরই অভাব। প্রাচুর্য্যের মহাভূবন। চাওয়া মাত্রই পাওয়ার আনন্দ। অভাবনীয় ও অতুলনীয় জীবনসঙ্গি এবং মৃত্যুহীন এক অনন্ত যৌবন। এমন আনন্দঘন অপূর্ব আয়োজন কি এ পার্থিব ভূবনে একটি মুহুর্তের জন্যেও সম্ভব? অথচ মু’মিনের জন্যে মহান আল্লাহর সে আয়োজনটি নিছক বহু লাখ বা বহু কোটি বছেরর নয়, অনন্ত-অসীম কালের। মৃত্যুকেই সে রাজ্যে তিনি হারাম করে দিয়েছেন।

মনের ভূবনের আনন্দঘন এ চিত্রটিই হলো মু’মিনের ভিশন। এটিকে সবসময় প্রজ্বলিত রাখার জন্যই মহান রাব্বুল আ’লামীন পবিত্র কোরআনে জান্নাতের সে চিত্রটি অপূর্ব ভাষায় বার বার বর্ণনা করেছেন। বলা হয়েছে,এমন জান্নাতের বিনিময়েই মহান আল্লাহতায়ালা মু’মিনের জানমাল ক্রয় করে নিয়েছেন। সুরা তাওবার ১১১ নং আয়াতে তিনি বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনদের থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত বরাদ্দ রয়েছে এর বিনিময়ে। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, (ইসলামের শত্রুকে) নিধন করে এবং নিজেরাও নিহত হয়। তাওরাত ইনজীল ও কুরআনে এ সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর আর কে আছে? তোমরা (আল্লাহর সাথে) যে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিতে আবদ্ধ হলে তার জন্য আনন্দিত হও এবং উহাই তো মহা সাফল্য।”

ঈমানের পূর্ণতা হলো, মনের ভূবনে এমন একটি চেতনার আমৃত্যূ উপস্থিতি। তখন মু’মিনের বাঁচাটি হয় একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে বাঁচা। এমন ব্যক্তির মনে জাত-পাত-ভাষা-ভুগোল ও বর্ণ নিয়ে গর্ব থাকে না। যার নিজের জীবনখানিই নিজের নয়, মহান আল্লাহর কেনা সম্পদ তার আবার এসব নিয়ে গর্ব কিসের? সে তখন প্রকৃত অর্থেই পরিণত হয় গর্বহীন, অহংকারহীন এক মাটির মানুষে। তার মধ্যে ক্ষতির ভাবনা আসে না যুদ্ধে প্রাণদানেও। বরং ভাবে, আল্লাহতায়ালার ক্রয়কৃত আমানতটি সে ফেরত দিচ্ছে।

মু’মিনের জানমাল ক্রয়-বিক্রয়ের এ চুক্তিনামাটিকে মহান আল্লাহতায়ালা নিজেই মু’মিনের জন্য মহাসাফল্য বলে অভিহিত করেছেন। সফলতার লক্ষ্যে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এটিই একমাত্র সার্টিফাইড রাজপথ। মানুষের জন্য কোনটি প্রকৃত সফলতা আর কোনটি বিফলতা সেটি মহান আল্লাহর চেয়ে আর কে ভাল জানেন? সে মহান আল্লাহতায়ালাই বলেছেন, মহান আল্লাহর সাথে এ চুক্তির পর এবার তো্মরা আনন্দ করো। আল্লাহতায়ালার বিচারে এর চেয়ে উত্তম কেনা-বেচা সমগ্র বিশ্বে দ্বিতীয়টি হতে পারে না। অতএব ব্যক্তির সমগ্র জীবনে যদি কোন উৎসব থেকেই থাকে তবে সেটি মহান আল্লাহর সাথে এ চুক্তির। উপরুক্ত আয়াতে মহান রাব্বুল আলামীনের বর্ণনাটি এতটাই স্পষ্ট যে, এটি জানার জন্য কি কোন পীর, মাওলানা বা কোন মুফতির কাছে যাওয়ার প্রয়োজন আছে? অথচ অনেকেই বলেন, কোরআন বুঝার সামর্থ সাধারণ মানুষের নাই। একাজ নাকি একমাত্র আলেমদের! অথচ নবীর যুগে নিরক্ষর রাখাল-কৃষক-শ্রমিকও কোরআন বুঝতেন। সে সময় মাদ্রাসা বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া লোক সমাজে ছিল না। কিন্তু তাতে কি জ্ঞানী ব্যক্তির অভাব হয়েছে? মানুষ তখন এতটাই জাগ্রত বিবেকের অধিকারি ছিল যে, আল্লাহর দ্বীন ও আল্লাহর অনুসারিগণ আক্রান্ত হলে সে সমাজে লড়াকু সৈনিকেরও অভাব হয়নি। নিরক্ষর রাখাল-কৃষক-শ্রমিকও তখন নিজ খরচে ঢাল-তলোয়ার গড়ে নিজের ঘোড়া বা নিজের উট নিয়ে জান বিলিয়ে দিতে রণাঙ্গণে ছুটতেন। এ যুদ্ধগুলো তাদের নিজ স্বার্থে ছিল না, ছিল দ্বীনের স্বার্থে। ছিল মহান আল্লাহর। তাঁর দ্বীনের প্রতি তাদের এ কোরবানী দেখে মহান আল্লাহও তাদের সাথে যু্দ্ধ লড়তে অসংখ্য ফেরেশতা পাঠাতেন। পবিত্র কোরআনে সে বিষয়ে বহু উল্লেখও আছে। ফলে তখন অসম্ভব হতো ঈমানদারদের বিরুদ্ধে কাফের শক্তির বিজয়। বিজয়ী হয়েছে মুসলমানেরা। অথচ আজ হচ্ছে বিপরীতটি। বাংলাদেশের মত দেশে মানুষ যে যুদ্ধ করেনি বা করছে না তা নয়। অর্থ, শ্রম ও রক্ত দিচ্ছে না, সেটিও নয়। অতীতে বহু বাঙ্গালী সৈনিক বহু রক্ত দিয়েছে ব্রিটিশ শাসনের পাহারাদারীতে। তেমনি ১৯৭১ য়ে দিয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রটির বিনাশে। অজ্ঞ শিশু যেমন আগুনে হাত দেয়, তেমনি কোরআনী-জ্ঞানে অজ্ঞ ব্যক্তিও ইসলামের শত্রুপক্ষে গিয়ে প্রাণ দেয়। তাই একাত্তরে ভারতীয় কাফের বাহিনীর বাংলাদেশে মুসলিম যোদ্ধা পেতে অসুবিধা হয়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে ইরাক ও ফিলিস্তিন দখল এবং সেখানে মুসলিম হত্যায় সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের সৈন্য পেতে তাই বেগ পেতে হয়নি। একই কারণেই মার্কিনীদেরও আজ অসুবিধা হচ্ছে না ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে নিষ্ঠাবান তাঁবেদার পেতে। তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদসহ ইসলামের সকল শত্রুপক্ষ এভাবেই কৈইয়ের তেলে কৈই ভেজেছে। আর সেটি সম্ভব হয়েছে, মুসলমানদের মনে অজ্ঞতা কারণে, বিশেষ করে কোরআনী জ্ঞানের ক্ষেত্রে। ফলে তাদের অজানা থেকে গেছে, মুসলমান রূপে কী তাদের ঈমানী দায়িত্ব। জানাই হয়নি,মুসলমান হওয়ার কারণে মহান আল্লাহর সাথে কী তাদের চুক্তি নামাটি। বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশে ইসলামের উপর অজ্ঞতার ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছে সেকুলারিজম। ফলে প্রচন্ড ভাবে বেড়েছে পার্থিব স্বার্থ চেতনা। আর পার্থিব স্বার্থ হাছিলের তাড়না বাড়লে বাড়ে দুর্বৃত্তিও। একমাত্র পরকালে জবাবদেহীতার ভয়ই পারে দুষ্কর্ম থেকে দূরে রাখতে। তাই সেকুলারিজম পরিচর্যা পেয়েছে অথচ দুর্বৃত্তি বাড়েনি সেটি হয়নি। সে পার্থিব স্বার্থচেতনাটি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে প্রবলতর হলেও তার শুরু স্বৈরাচারি মুসলিম রাজাবাদশাহদের হাতে। এমন পার্থিব স্বার্থচেতনাতেই ইয়াজিদ হযরত ইমাম (রাঃ)ও তাঁর সাথীদেরকে অতি নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করেছিল। মুসলিম ইতিহাসের বড় সেকুলার হলো এসব ইয়াজিদেরা। তাদের হাতে বার বার রচিত হয়েছে কারবালা। নিজেদের পার্থিব স্বার্থকে নিরাপদ করতে গিয়ে তারা এমনকি নিজেদের পিতা,ভাই ও সন্তানদের অন্ধ বা পঙ্গু করেছে, তাদেরকে কারারুদ্ধ বা হত্যাও করেছে। সেকুলারদের একই রূপ গভীর শত্রুরা মুসলিম উম্মাহর সাথে। তারা চায়, সাধারণ মুসলমানের কাছে অজানা থেকে যাক ঈমানের দায়বদ্ধতা। তখন সে অজ্ঞতার কারণে তাদের ন্যায় দুর্বৃত্তদের হটাতে তারা রাজপথে নেমে আসবে না, তখন সেটিকে তারা ইবাদত রূপেও গণ্য করবে না। বরং সে অজ্ঞ জনগণ তাদেরকে সহায়তা দিবে। তাই মুসলিম বিশ্বে যতই বাড়ছে স্বৈরাচার ততই বাড়ছে কোরআনী জ্ঞানের  অজ্ঞতা। একই লক্ষ্য ও স্ট্রাটেজী নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশের সেকুলার দুর্বৃ্ত্তগণও। মৌলবাদ রুখার নামে তারাও কোরআন চর্চা রুখতে চায়।

ইসলামী রাষ্ট্র-বিপ্লবের লক্ষ্যে রোডম্যাপের শুরুর পর্বটি সঠিক ভাবে শুরু হওয়াটি জরুরী। কোরআনে জ্ঞানে অজ্ঞ থাকার চেয়ে বড় পাপ নাই। তখন ভয়ানক বিচ্যুতি আসে জীবনের পথ চলায় প্রতি পদে। সব পাপ মোচনের আগে তাই অজ্ঞতার পাপমোচন চাই। নইলে ইসলামের পক্ষে কোরবানী পেশ দূরে থাক, ইসলামের মোজাহিদদের হত্যা করা বা মসজিদ-মাদ্রাসা ধ্বংস করাকেও উৎসবের কাজ মনে হবে। যেমনটি পাকিস্তানের সেকুলার সেনাবাহিনী মনে করেছিল ইসলামাবাদের লাল মসজিদ ধ্বংসের পর। একই কাজ হচ্ছে মিশর, আলজেরিয়া, ইয়েমেন, আফগানিস্তানের মত মুসলিম দেশে। বাংলাদেশে সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা সে অভিন্ন চেতনার কারণেই রাজপথে দাড়ি-টুপিধারীদের পিটিয়ে হত্যা করাকে উৎসবের কাজ মনে করে। আর এ অজ্ঞতা সরানোর কাজ শুরু করতে গেলেই লড়াই শুরু হবে। কারণ, সেটি হবে শয়তানী শক্তির হাত থেকে হাতিয়ার কেড়ে নেওয়ার নায় গুরুতর ব্যাপার। অজ্ঞতার সে হাতিয়ারটি তারা বিনা যুদ্ধে ছাড়তে রাজী নয়। নেশাগ্রস্ত হেরোইন সেবী যেমন হেরোইন ছাড়তে রাজী নয়, তেমনি এসব জাহেল ব্যক্তিরা অজ্ঞতা ছাড়তে রাজী নয়। এজন্য যখনই স্কুল-কলেজে কোরআন শিক্ষার প্রস্তাব উঠে তখনই তারা তার বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনে নামে। নবীজী (সাঃ)র আমলেও এরূপ অজ্ঞ জাহেলদের আচরণ অবিকল অভিন্ন ছিল। নবীজী (সাঃ) যখন মক্কার কাফেরদের ডেকে কোরআনের আয়াত শোনাতেন তখন তারা কানে আঙ্গুল ঢুকাতো যেন আল্লাহর পবিত্র কথাগুলো কানে প্রবেশে করতে না পারে। নবীজী (সাঃ)র আওয়াজ থামাতে তারা তাঁর মাথার উপর পাথর মারতো। সেকুলার শক্তিবর্গের হাতিয়ার শুধু ট্যাংক-কামান ও বোমারু বিমান নয়, বরং সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো মুসলিম মানসে কোরআনী জ্ঞানের অজ্ঞতার কালো মেঘ। এ মেঘ মুসলমানদের থেকে ইসলামকেই আড়াল করে রাখে। গোপন করে রাখে সিরাতুল মোস্তাকিম। নবীজী (সাঃ)র আমলের সনাতন ইসলাম এজন্যই বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে অতি অপরিচিত। রাশিয়ার কম্যুনিষ্ট কাফেরগণ এজন্যই নিজ দেশে শুধু হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসায় তালা লাগায়নি, নিষিদ্ধ করেছিল কোরআন চর্চা। আজও একই স্ট্রাটেজী পুঁজিবাদী ও জাতীয়তাবাদী সেকুলারিষ্টদের।

মহান আল্লাহতায়ালা মু’মিনের জানমালের ক্রয়বিক্রয়ের চুক্তি এবং চুক্তি শেষে মহাসাফল্যর যে কথাটি বলেছেন, সেটি পেতে হলে মু’মিনের কাজ হলো আল্লাহর সাথে সম্পাদিত চুক্তিনামাকে পদে পদে মেনে চলা। এ চুক্তিনামা থেকেই মুমিন পায় জীবনের ভিশন এবং মিশন। তার সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা এবং তার বাঁচামরাও তখন মহান লক্ষ্য খুঁজে পায়। তখন বাঁচবার উদ্দেশ্য হয়, আল্লাহর দ্বীনের বিজয়। সে তখন নিজেকে পেশ করে তাঁর আনসার বা সাহায্যকারি রূপে। কিন্তু বাংলাদেশে ক’জনের চেতনায় রয়েছে আল্লাহর সাথে সে চুক্তির ধারণা? যে ব্যক্তি জীবনে একটি বারও পবিত্র কোরআনকে বুঝে পড়লো না, তার চেতনায় সে উপলদ্ধিটি আসবে কোত্থেকে? বাংলাদেশের মত দেশে কোন নেতা বা দলের পক্ষে লাঠি ধরার লোকের অভাব হয়না। অভাব হয় না ইসলামের বিপক্ষ শক্তির পক্ষে ভোটদান, অর্থদান ও প্রাণদানকারির। এমন কি সাম্রাজ্যবাদী কাফিরগণও অতীতে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর যোদ্ধা পয়েছে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও জেনারেল আতাউল গনি ওসমানিরাও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বাহিনীতে নাম লিখিয়েছেন এবং তাদের পক্ষে যুদ্ধে প্রাণদানে হাজির হয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে তাদের মত ব্যক্তিদেরকেই সম্মানের আসন দেওয়া হয়েছে এবং পেশ করা হয়েছে অনুকরণীয় আদর্শ রূপে। এমন ব্যক্তিদের আদর্শ রূপে পেশ করায় সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের সমর্থক হওয়া বা তাদের বিজয়ে মেধা, শ্রম ও রক্তের বিনিয়োগ করা বাংলাদেশে আজ আর কোন অপরাধ নয়। তাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষক, বহু লেখক ও বহু বুদ্ধিজীবী এনজিও গড়ে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের বেতনভোগী সেবাদাসে পরিণত হয়েছে। অথচ আল্লাহর বিধানকে নর্দমায় ফেলা হলেও আল্লাহর দ্বীনের পক্ষে যুদ্ধ করা দূরে থাক, সেটির দাবী নিয়ে রাস্তায় নামার লোকও নাই। একারণেই তো বাংলাদেশে ইসলাম আজ পরাজিত। রাজনীতি কুক্ষিগত হয়েছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে। কথা হলো, মুসলমানদের কর্মের এমন দুর্গতি হলে কি তাদের ইজ্জত আবরু থাকে? জুটে কি আল্লাহর নেয়ামত?

 

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

ব্যক্তির ভিশন ও মিশন থেকেই আসে জীবনে বাঁচবার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ব্যক্তি বাঁচে তো সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে। ভিশন ও মিশন যেহেতু সবার এক নয়, তাই জনে জনে পার্থক্য হয় বাঁচবার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ঈমানদারের জীবনে মূল লক্ষ্য হবে সর্বকাজের মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। যে কাজের মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সম্ভাবনা নেই সে কাজে তার পদচারনাও  নেই।সে কাজে অর্থদান, শ্রমদান বা প্রাণদানের কথা সে ভাবতেই পারে না। মু’মিনের জীবনে প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণে উদ্দেশ্য হবে,আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্বগুলোকে সঠিকভাবে জানা এবং এ জমিনে আল্লাহর একজন যোগ্য খলিফা রূপে দায়ীত্ব পালনের সামর্থ অর্জনের লক্ষ্যে নিজ যোগ্যতায় লাগাতর উৎকর্ষ আনা।এজন্য দিক নির্দেশনা লাভে তাকে বার বার পবিত্র কোরআন ও হাদীসে ফিরে যেতে হবে।


কাজ ও কর্মক্ষেত্র

মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে মু’মিনের কাজ হবে সামর্থ অনুযায়ী নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র বেছে নেওয়া এবং নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর নির্দেশিত দায়িত্বপালনে সর্বশক্তি নিয়ে আত্মনিয়োগ করা। অন্যদেরকেও আল্লাহর অর্পিত দায়িত্বের অনুধাবন ও তা পালনে উদ্বুদ্ধ করা। তাদের মাঝে কোরআনের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া, তাদের যোগ্যতা বাড়াতে অন্যদের সাথে নিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া। সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামকে বিজয়ী করার কাজে সর্বতোভাবে সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা করা। কর্ম, নিষ্ঠা ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে নিজেকে আল্লাহর মাগফেরাত লাভ এবং সে সাথে জান্নাতের যোগ্য রূপে গড়ে তোলা।


স্ট্রাটেজি ও কর্মসূচী

জীবনের কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণ শুধু স্বপ্ন দেখলেই হয় না। এজন্য সুপরিকল্পিত স্ট্রাটেজী এবং সে স্ট্রাটেজী বাস্তবায়নে সুচিন্তিত কর্মসূচীও জরুরী। তাই মুসলমান হওয়ার অর্থ শুধু বাঁচার জন্য বাঁচা নয়, বিশেষ লক্ষ্য এবং সে লক্ষ্য পূরণে স্ট্রাটেজী ও কর্মসূচী নিয়ে বাঁচা। মু’মিনের জীবনে স্ট্রাটেজীগুলী হতে পারে নিম্মরূপঃ


প্রথম স্ট্রাটেজিঃ কোরআনের জ্ঞানার্জন এবং সে জ্ঞানের বিস্তার

ইসলামি রাষ্ট্রবিপ্লবের লক্ষ্যে প্রথম স্ট্রাটেজী হতে হবে, কোরআনের জ্ঞানলাভ ও সে জ্ঞানের প্রাপক বিস্তার। কোরআন নিয়ে অবিরাম চিন্তাভাবনা ও বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগের মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে মহান আল্লাহর সাথে মজবুত সম্পর্ক। রোডম্যাপের প্রথম মাইলফলকটি অতিক্রম করতে হবে এ স্ট্রাটেজী বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই। শুধু নিজেকে নয়, সাধারণ মুসলমানদের ঘরের দুয়ারে এবং মনের দুয়ারে কোরআনের দিকে নিয়ে যেতে হবে। তবে সেটি নিছক তেলাওয়াতের সামর্থ বাড়িয়ে নয়, বরং সেটি বুঝা ও তা নিয়ে চিন্তাভাবনায় ব্যাপক বিপ্লব এনে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এমন সমঝ-বুঝের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি সে গুরুত্বটি বুঝিয়েছেন বার বার এ প্রশ্নগুলি রেখে, “আফালাতাক্কারুন” “আফালাতাদাব্বারুন” “আফালাতা’ক্বীলুন” অর্থঃ “অতঃপর তোমরা কেন চিন্তা করনা, কেন গভীর ভাবে ভাব না, কেন বুদ্ধি কাজে লাগাও না?” যারা সেগুলো করেনা তাদেরকে আল্লাহতায়ালা মুসলমান দূরে থাক, গরু-ছাগলেরও অধম বলেছেন। বলেছেন, “উলায়েকা কা’আল আনয়াম, বালহুম আদাল” অর্থঃ তারাই হলো গবাদী পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও অধম। প্রশ্ন হলো, মুসলিম দেশে এদের সংখ্যা কি কম? মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো চিন্তাশীল মানুষ হওয়া। এ চিন্তাশীলতাই তাকে গবাদী পশু থেকে পৃথক করে, -পবিত্র কোরআনে সেটিই বার বার বুঝানো হয়েছে। মুসলমানের কাজ, কথা, লেখনি, সংস্কৃতি ও রাজনীতি -সবকিছুর মধ্যেই কাজ করে প্রবল চিন্তাশীলতা। তার জীবনে নৈতিক বিপ্লব তো ঘটে সে গভীর চিন্তাশীলতা থেকেই। নিছক মুসলমানের ঘরে জন্ম নেওয়ার কারণে সেটি আসে না। যার মধ্যে সে চিন্তাশীলতা নেই তার জীবনে নৈতিক বিপ্লবও নেই। তার পক্ষে তখন প্রকৃত মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাটিও অসম্ভব হয়। তাই মুসলমানের সামনে দু’টি পথ। একটি চিন্তাশীল নৈতিক মানব রূপে বেড়ে উঠার। অপরটি গরুছাগলে পরিণত হওয়া। আর গরুছাগল তো বেড়ে উঠে জবাই হওয়ার জন্য। তখন তাদের গর্দানে কাফেরদের ছুরি চলে বা মাথার উপর অবিরাম বোমাও পড়ে। গরুছাগলের ন্যায় তাদেরও তখন প্রতিবাদের ভাষা থাকে না, প্রতিরোধের সামর্থও থাকে না। মহাজ্ঞানী আল্লাহতায়ালা নৈতিক মানব রূপে বেড়ে উঠার উপর জোর দিয়েছেন। তাই বার বার জোর দিয়েছেন চিন্তাশীলতার উপর। ব্যক্তির এমন ভাবুক মন হলো ঈমানে বৃদ্ধির আনার পাওয়ার হাউস। ব্যক্তির ঈমানের মাত্রায় উঠানামা ঘটে এ পাওয়ার হাউস সচল ও বিকল হওয়ার কারণে। ব্যক্তির জীবনে বিস্ময়কর মূল্যসংযোজন বা ভ্যালু-এ্যাড করে এ চিন্তা-ভাবনা। মানুষ তখন ফেরেশতাদের চেয়েও উঁচুস্তরে পৌঁছতে পারে। তখন মানব পরিণত হয় মহা মানবে। মহান আল্লাহতায়ালা তো এমন মানুষদের নিয়েই ফেরেশতাদের মহলে গর্ব করেছিলেন। এমন চিন্তাশীলতার সৃষ্টিতে প্রাসাদতুল্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় লাগে না। বিশাল আকারের মাদ্রাসাও লাগে না। কুঁড়ে ঘরে বসবাস করেও সেটি সম্ভব। সবুজ প্রকৃতি, ধুসর মরু, মূক্ত আকাশের দিকে তাকিয়েও সেটি ঘটে। আল্লাহতায়ালার অতিশিক্ষণীয় আয়াত তথা নিদর্শণের সন্ধান মেলে এসবের মধ্যে। নবীজী (সাঃ)র আমলে সেটিই হয়েছে। সে আমলে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, কিন্তু প্রতিটি মুসলমানের মনের ভূবনগুলী প্রকান্ড পাওয়ার হাউসে পরিণত হয়েছিল। ফলে সমগ্র মানব ইতিহাসে মানব চরিত্রে ও কর্মে সবচেয়ে বেশী মূল্য সংযোজন বা ভ্যালু এ্যাড হয়েছিল সে সময়। সে মূল্য সংযোজনের ফলে আরবের অসভ্য মানুষগুলো ফেরেশতাদের থেকেও উপরে উঠতে পেরেছিলেন। তারাই জন্ম দিয়েছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে আজও তো তাঁরাই গর্বের। প্রাথমিক কালের সে মুসলমানগণ শুধু রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিরই জন্ম দেয়নি, জ্ঞানের বিশাল ভান্ডারও গড়ে তুলেছিলেন। অথচ কোরআনের অগে আরবী ভাষায় কোন লিখিত বই তাদের ছিল না।

মুসলমানেরা আজ তেল-গ্যাস, চা-পাট-তুলার গায়ে মূল সংযোজন নিয়ে ব্যস্ত। প্রায়োরিটির তালিকায় গুরুত্বই হারিয়েছে মানুষ। এতে মানুষ হয়েছে চরম অবমূল্যায়নের শিকার। আর এটি সবচেয়ে বেশী হয়েছে বাংলাদেশে। ফল দাঁড়িয়েছে, দুর্বৃত্তিতে ৫ বার তারা সমগ্র বিশ্বের সবাইকে হার মানিয়েছে। চারিত্রিক ধ্বস ও ইসলাম থেকে পথভ্রষ্টতার এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে? এটি সম্ভব হয়েছে ব্যক্তির চেতনা থেকে পরকালে জবাবদেহীতার ধারণা বিলুপ্ত বা দুর্বল হওয়ার কারণে। এবং সেটি ঘটেছে রাষ্ট্র ও সমাজ সেকুলারাইজড হওয়ার কারণে। বস্তুতঃ বাংলাদেশের গোলাম বানানোর সে ব্রিটিশ ধারাকেই অব্যাহত রেখেছে। মুসলমানদেরকে সেকুলারাইজড করতে গিয়ে তারা তাদেরকে ইসলাম থেকেই বিচ্ছিন্ন করেছে। এভাবে অচল করে দিয়েছে মানব মনে সুচিন্তা ও সত্য-উপলদ্ধির পাওয়ার হাউসগুলো। সেকুলারিজমের মূল বিপদ তো এখানেই। পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মূল স্ট্রাটেজী তাই মুসলমানদেরকে পুতুল পুজায় আবার ফিরিয়ে নেওয়া নয়, বরং দ্রুত সেকুলারাইজড করা। একাজে মুসলিম দেশে তারা মুসলিম সরকার ও তথাকথিত ইসলামি দলগুলোকেও পার্টনার হিসাবে বেছে নিয়েছে। যারা ইসলামী বিপ্লবের সৈনিক, ইসলামের শত্রুদের এ কৌশলটিকে অবশ্যই তাদের বুঝতে হবে এবং তাদের কাজের শুরু হতে হবে সেকুলারাইজেশনের এ প্রকল্পের কার্যকর মোকাবেলার মধ্য দিয়ে। দেশে শুধু বিজ্ঞান বা ইতিহাস-ভূগোল পড়িয়ে মুসলমানদের ঈমান যে বাঁচানো যাবে না,দুর্বৃত্তি থেকেও বাঁচানো যাবে না। এ বিপদ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় আল্লাহর দেওয়া প্রেসক্রিপশনে ফিরে যাওয়া। সে প্রেসক্রিপশনটির নিছক পাঠে নয়, মনোযোগী হতে হবে তা থেকে ঔষধ সেবনেও। নবীজী (সাঃ) তো সে কোরআনী প্রেসক্রিপশনের সাহায্য নিয়েই সে আমলের অতি নিরেট সেকুলারিজমের মোকাবেলা করেছিলেন। আজকের সেকুলারিষ্টদের চেয়ে সে আমলের সেকুলারিষ্টগণ ছিল অতি কট্টোর।

সেকুলারিজমের আভিধানিক অর্থ পার্থিবতা। রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ময়দানকে পরকালীন জীবনের ভাবনা বা স্বার্থ-চিন্তা থেকে দূরে রাখাই এ মতবাদটির মোদ্দাকথা। অথচ ইসলাম বলে উল্টোটি। ব্যক্তির পার্থিব কর্ম ও ভাবনাগুলো্ নিয়ন্ত্রিত হোক পরকালীন কল্যাণ বা জান্নাতপ্রাপ্তীর ভাবনা থেকে। এ ভাবনা থেকেই ঈমানদারের জীবনে অনিবার্য কারণে জ্বিহাদ চলে আসে। চলে আসে রাষ্ট্রদখল এবং সে রাষ্ট্রে আল্লাহর শরিয়তী বিধান প্রতিষ্ঠার জজবা। আসে শহীদ হওয়ার প্রেরণা। আমৃত্যু লড়াই তখন ঈমানদারের মিশনে পরিণত হয়। আর তখন হামলার মুখে পড়ে সেকুলারিষ্টদের কায়েমী স্বার্থ। ইসলামের সাথে সেকুলারিজমের শত্রুতা তো এখানেই। ব্যক্তিজীবনে যে তারা সবাই পরকালকে অবিশ্বাস করে তা নয়, তবে পরকালের সে বিশ্বাস তাদের পার্থিব জীবনের স্বেচ্ছাচারি জীবন-উপভোগকে নিয়ন্ত্রিত করুক সেটি তাদের কাম্য নয়। এমন সেকুলারিজমে যে শুধু নাস্তিকগণ আক্রান্ত হয় তা নয়। সমভাবে আক্রান্ত হতে পারে আলেম, পীর, মূফতি ও ইসলামি দলের নেতা। এমন সেকুলারিষ্ট আলেমদের বর্ণনা পবিত্র কোরআনে বার বার এসেছে। এক্ষেত্রে আল্লাহপাক বহু উদাহরণ দিয়েছেন বনি ইসরাইলের আলেমদের। তারা সামান্য ব্যক্তি স্বার্থে আল্লাহর কেতাবের বাণীকে বিক্রি করতো, সেগুলো বিকৃত করতো এবং নবীরাসূলদের হত্যা করতো। হযরত ঈসা (আঃ) এবং হযরত মুহম্মদ (সাঃ)কেও তারা হত্যার বহু চেষ্টা করেছে। অতীতের আসমানি কেতাবগুলো বিকৃত হয়েছে তো এরূপ সেকুলার বা পার্থিব স্বার্থ-শিকারি আলেমদের কারণেই। আজকের মুসলিম সমাজেও এমন আলেমদের সংখ্যা কি কম? এরাই যুগে যুগে দুর্বৃত্ত এজিদদের সমর্থন করেছে। মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে এরা হযরত আলী (রাঃ) ও ইমামা হাসান (রাঃ)ও ইমাম হোসেনের (রাঃ)এর ন্যায় মহান ব্যক্তিদের উপর অভিসম্পাত করে খুতবাও দিয়েছে। এদের কারণেই হালাকু খাঁ ও চেঙ্গিজ খাঁদের মত দুর্বৃত্তদের দরবারী কাজী পেতে কোন অসুবিধা হয়নি। আজকের মুসলিম সমাজেও এমন সেকুলার আলেম এবং ইসলামী আন্দোলনের সেকুলার নেতার সংখ্যা অসংখ্য। নিছক পার্থিব স্বার্থের কারণে এরা মক্কায় হজের দিনে শত শত হাজী হত্যা হতে দেখেও তার প্রতিবাদ করে না। সামান্যতম নিন্দাও করে না। তাদের সে নীরবতা দেখা গেছে আশির দশকে, যখন প্রায় ৪ শত ইরানী হাজীকে হত্যা করা হয়। আজকের যুগের সেকুলারিষ্টদের থেকে নবীজী (সাঃ)র জামানার সেকুলারিষ্ট কাফেরদের প্রধান পার্থক্যটি হলো, তারা পরকালকেই পুরাপুরি অবিশ্বাস করতো। মাটির সাথে মিশে যাওয়া হাড্ডিগুলোকে আবার জীবন্ত করা হবে, আবার বিচার বসবে তা নিয়ে তারা মস্করাও করতো। আর আজকের সেকুলারিষ্টগণ পরকালকে অবিশ্বাস না করলেও তাদের চেতনা, চরিত্র ও কর্মের উপর প্রবল প্রভাব বিস্তার করে আছে পার্থিব স্বার্থচেতনা। কিন্তু নবীজী (সাঃ) সে সেকুলারিজমকে পবিত্র কোরআন দিয়ে মোকাবেলা করেছেন। আজও এর চেয়ে কার্যকর হাতিয়ার নেই।

বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে মুসলমানদের এত নীচে নামার কারণ, চিন্তাশীলতার অভাব। চিন্তাশীলতার অভাব হলে, বার বার কোরআন খতম দিলেও কোরআন থেকে শিক্ষাগ্রহণ হয় না। তখন চরিত্রে বিপ্লব দূরে থাক, সামান্য পরিবর্তনও আসে না। কোরআনের এমন পাঠক তখন অফিসে বসে ঘুষ খায়, মানুষকে ধোকা দেয়, মিথ্যা বলে, চিহ্নিত দুর্বৃত্তকে ভোট দেয়, শত্রুর দালালকে নেতা বানায় এবং কাফেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করে। নির্বাচন ও রাজনীতি তখন ইসলামের প্রতিষ্ঠা রুখবার হাতিয়ারে পরিণত হয়। একজন কাফের বা মুনাফিকও কোরআন পড়তে পারে। কিন্তু পড়ার সে সামর্থ কি হেদায়েত-লাভের সামর্থও বাড়ায়? এজন্য কোরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও সেসাথে কোরআনী নির্দেশের অনুধাবনের সামর্থও চাই। এজন্য চাই, কোরআনের ভাষায় কোরআনকে বুঝার জ্ঞান। এবং সে সাথে তা নিয়ে গভীর ভাবনার অভ্যাস। কোরআনের অনুবাদ পড়ে তা থেকে আত্ম-বিপ্লব এবং সে সাথে রাষ্ট্র-বিপ্লবের প্রেরণা-লাভ প্রায় অসম্ভব। কোরআন যিনি বুঝে পাঠ করেনে তার বর্ণনা মহান আল্লাহপাক দিয়েছেন এভাবে, “নিশ্চয়ই মু’মিন তারাই যাদের হৃদয় প্রকম্পিত হয় যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয় এবং যখন তাঁর (কোরআনের) আয়াত পাঠ করে শোনানো হয় তখন তাদের ঈমানে বৃদ্ধি ঘটে এবং তারা ভরসা করে প্রতিপালকের উপর।-সুরা আনফাল, আয়াত ২।

মহান আল্লাহ মানুষকে অলৌকিক শক্তি দিয়েছেন। মগজের সৃষ্টিশীল সামর্থ বিস্ময়কর, এটি এক অভাবনীয় হার্ডডিস্ক। তবে সে হার্ডডিস্ক আরো বিস্ময়কর সামর্থ দেখাতে পারে, যদি সে হার্ডডিস্কে পবিত্র কোরআনের শিক্ষাকে ঢুকানো যায়। পবিত্র কোরআন হলো আল্লাহতায়ালার সেই বিস্ময়কর সফ্টওয়্যার যা নাযিল করা হয়েছে মানুষের মগজের উপযোগী করে। অপর দিকে মার্কসবাদ, সমাজবাদ, পুঁজিবাদ ও সেকুলারিজমের ন্যায় মানব-সৃষ্ট মতবাদগুলো হলো এমন সব সফ্টওয়ার যা শুধু বিপর্যয়ই বাড়ায়। এগুলোর ব্যর্থতার বড় সাক্ষী হলো ইতিহাস। আল্লাহর সৃষ্ট মগজের সাথে মানবসৃষ্ট এ সফ্টওয়্যারগুলো কমপাটিবল বা সামঞ্জস্যশীল নয়। আরবের নিঃস্ব, নিরক্ষর ও বর্বর মানুষগুলো স্বল্প সময়ে যেভাবে বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল এবং জন্ম দিয়েছিল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার -তা তো আল্লাহপ্রদত্ত বিস্ময়কর এ সফটওয়্যারের কারণেই। মানব তখন নৈতিকতায় বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। খলিফা তখন নিজে আটার বস্তা কাঁধে নিয়ে মধ্যরাতে গরীবের ঘরে ছুটেছেন। চাকরকে উটের পিঠে চড়িয়ে নিজে উটের রশি ধরে টেনেছেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে অন্যদের দ্বারা এমন নজির একটিও নেই। উচ্চতর নৈতিকতা ও শ্রেষ্ঠতর সভ্যতার নির্মানে কোরআনী শক্তির ন্যায় এত বড় শক্তি (civilizational force) বিশ্বে দ্বিতীয়টি নেই। আজও যে কোন দরিদ্রজাতি সেরূপ সভ্যতা ও বিশ্বশক্তির জন্ম দিতে পারে যদি সে সফ্টওয়্যারের ব্যবহার হয়। নইলে মানুষের নীচে নামা বন্ধ হবার নয়। শেষ হবার নয় পথভ্রষ্টতাও। এমন পথভ্রষ্টতার কারণেই মানুষের সে বিস্ময়কর মগজে সাপ-শকুন, পাহাড়-পর্বত ও গরু-ভেড়া দেবতা মনে হয়। নৃশংসতায় এমন মানুষ পশুর চেয়ে হাজার গুণ নিষ্ঠুর হয়। আজ  সে নিষ্ঠুরতারই চর্চা হচ্ছে আজ ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান ও ইরাকে। কিছুকাল আগে হয়েছে ভিয়েতনাম ও আলজেরিয়ায়। প্রচন্ড নিষ্ঠুরতা হয়েছে দু'টি বিশ্বযুদ্ধ চলা কালে।

সর্বময় শক্তি ও সর্বময় জ্ঞানের অধিকারি হলেন মহান আল্লাহ। যখন সে মহাজ্ঞানী ও মহাশক্তিময় আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত হয়, তখন জ্ঞান এবং বিজয় আসে ব্যক্তিরও। আর মহান আল্লাহর সাথে সংযোগ ঘটায় তো এই কোরআন। মহান আল্লাহতায়ালাও তখন এমন ব্যক্তির সাহায্যকারী হয়ে যান। আর সর্বসময় আল্লাহ যার সাহায্যকারি তার কি আর কোন সাহায্যকারির দরকার আছে? একথাটি পবিত্র কোরআনে বার বার এসেছে। আল্লাহর সাথে সে সংযোগ সুদৃঢ় করতেই পবিত্র কোরআনে তাগিদ এসেছে এভাবে, “ওয়া তাছিমু বিহাবলিল্লাহি ওয়া তাফাররাকু।” -(সুরা আল-ইমরান) অর্থঃ এবং তোমরা আল্লাহর রশিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়োনা। আল্লাহর সে রশিটি হলো কোরআন। এ রশিটি আঁকড়ে ধরার মধ্য দিয়েও মনের জগতে স্থান করে নেয় আল্লাহর সফটওয়্যার। এরপর শুরু হয়, ব্যক্তিজজীবনে মহাবিপ্লব। শুরু হয় রাষ্ট্রবিপ্লবও। আসে রাজনৈতিক বিজয়। মুসলিম উম্মাহ অতীতে বার বার বিজয়ী হয়েছে তো এভাবেই।


কীরূপে অর্জিত হতে পারে কোরআনী জ্ঞান?

কোরআনী জ্ঞান নিম্নরুপভাবে বাড়ানো যেতে পারেঃ


কোরআনের ভাষা তথা আরবী ভাষা শিক্ষা

ভাষাজ্ঞানকে এ পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে যাতে মহান আল্লাহর কোরআনকে সরাসরি বুঝা যায়। এটিকে বিশ্বাস করতে হবে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ রূপে। এটি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রাথমিক কালের মুসলমানগণ মাতৃভাষা শেখার চেয়ে আরবী ভাষা শেখার উপর বেশী জোর দিয়েছেন। কোরআন বোঝার কাজটি যথার্থভাবে সমাধা করার তাগিদে মিশর, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, সূদান, আলজেরিয়া, মরক্কোসহ বহু দেশের মানুষ নিজেদের মাতৃভাষাকেও কবরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। কোরআনের জ্ঞানলাভের খাতিরে জী্বনের সকল সঞ্চয় দিয়ে সন্তানদের শত শত মাইল দূরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠিয়েছেন। আজকের মুসলিম সন্তানেরা যে বিদেশী ভাষা শিখছে না বা মাতৃভাষা ভূলছে না তা নয়। বহু অর্থ ও বহু শ্রম ব্যয়ে বহু বছর ধরে ইংরাজী, ফরাসী, জাপানি এমন কি কোরিয়ান ও চাইনিজ ভাষাও তারা শিখছে। এবং সেটি চাকুরি-বাকুরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বাড়তি সুবিধা লাভের আশায়। সামান্য কয়েক বছরের আনন্দফুর্তি বাড়াতে মানুষ এভাবে বহু কষ্ট করে বিদেশী ভাষা শিখছে। অথচ ভ্রুক্ষেপ নাই মহান আল্লাহর কোরআনের ভাষা শিক্ষায়। ফলে বিপদে পড়ছে অনন্ত অসীম কালের পরকালীন জীবন। কারণ জান্নাত পৌঁছতে হলে তো তার রোডম্যাপটি জানা চাই। আর সেটি জানতে হলে তো সে রোডম্যাপের ভাষাটি জানা চাই। অথচ প্রচন্ড গাফলতি বাড়ছে সে ভাষা শিক্ষার কাজে।


অর্থবুঝে কোরআন তেলাওয়াত ও তাফসির পাঠ

আরবীতে কোরআন বুঝার সামর্থ অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ধীরে ধীরে অর্থ বুঝে ব্যাপক কোরআন তেলাওয়াত ও তাফসির পাঠ। এভাবে পড়তে হবে কোরআন শরিফের শুরু থেকে শেষ অবধি।কোরআনের সাথে সম্পর্ক মজবুত করতে আরো যা করা যেতে পারে তা হলোঃ


এক). প্রতিমাসে কোরআনের কিছু আয়াতকে মুখস্থ করা এবং নামাযে সেগুলোর ব্যবহার করা।

দুই). ঘরে-বাইরে, বিভিন্ন বৈঠকে কোরআনের বিভিন্ন আয়াত নিয়ে নিয়মিত পাঠচক্র করা ও চিন্তাভাবনা করা। দৈনন্দিন জীবনের প্রাত্যহিক আলোচনায় কোরআনের আয়াতগুলীকে কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা। কোথাও প্রশ্ন দেখা দিলে প্রখ্যাত তাফসিরকারকদের অভিমতগুলো নিয়ে আলোচনা করা।

তিন). কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের উপর গবেষণা করা এবং তার শিক্ষণীয় দিক নিয়ে লেখালেখি করা এবং সেগুলো পত্র-পত্রিকা বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া। কোরআন বুঝার কাজে জরুরী নয় যে, মাদ্রাসায় শিক্ষাপ্রাপ্ত আলেম হতে হবে। সাইয়েদ কুতুব, আল্লামা ইউসুফ আলী, মাওলানা মওদূদীর ন্যায় ব্যক্তিগণ -যাদের তাফসির বর্তমান বিশ্বে ব্যাপক ভাবে পড়া হয়, তারা কেউই দ্বীনী মাদ্রাসার ডিগ্রিধারী নন। এমন কি আহমেদ দিদাত, ডাঃ জাকের নায়েক ও ডাঃ ইসরার আহমদের মত ব্যক্তিগন যারা বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বা রেখেছেন, তারাও কেউ মাদ্রাসার ছাত্র নন। আরো লক্ষণীয়, মিশরের ন্যায় দেশে যারা আজ ইসলামের উপর লেখালেখি ও গবেষণার কাজ করছেন তাদেরও শতকরা সত্তর ভাগের বেশী হলো ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, সমাজবিজ্ঞানী, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা অন্যান্য পেশার লোক। মাদ্রাসা-শিক্ষিত ব্যক্তি বা মাদ্রাসার শিক্ষক তাদের মাঝে অতি নগন্য সংখ্যক। বড় কথা হলো, নবীজী (সাঃ)র আমলেও যারা কোরআনের উপর বিশাল বিশাল গবেষণার কাজ করেছেন তারাও উঠে এসেছেন ক্ষেতখামার থেকে। তাছাড়া কোরআনের জ্ঞানলাভ ফরয করা হয়েছে প্রতিটি নরনারীর উপর, নিছক মাওলানা-মৌলভীদের উপর নয়।


দ্বিতীয় স্ট্রাটেজিঃ গড়তে হবে সুদৃঢ় ঐক্য

ইসলামাইজেশন বা ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের পথে দ্বিতীয় যে কাজটিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো একতা। মুসলমানের মিশন শুধু্ ইসলামি রাষ্ট্র নির্মান নয়, এটি সভ্যতা নির্মানের কাজ। এ কাজ একার নয়, সবার। তথা প্রতিটি ঈমানদারের। তাই ইসলামের প্রতিষ্ঠার লক্ষে যারা আগ্রহী তাদের সবাইকে খুঁজে বের করা এবং তাদের সাথে একতাবদ্ধ হওয়াও ঈমানী দায়িত্ব। মুসলমানের কাজ শুধু আল্লাহর দ্বীনকে জানা নয়,বরং সেসব বান্দাহদেরও জানা যারা আল্লাহর দ্বীনে বিশ্বাস করে এবং সেটির প্রতিষ্ঠা চায়। সমাজে নামায কায়েম করতে হলে যেমন অন্য নামাযীদের খুঁজতে হয়,তাদেরকে নিয়ে মসজিদ গড়তে হয় এবং নিয়মিত আযান ও নামাযের আয়োজন করতে হয়, তেমনি রাষ্ট্রে দ্বীনের প্রতিষ্ঠার লক্ষেও সহযাত্রীদের খুঁজতে হয়। কে কোন দলের, কে কোন ভাষার, কে কোন দেশের বা বর্ণের সে বিচার যেমন জায়নামাযে দাঁড়িয়ে চলে না, তেমনি সে ভেদ-বিচার চলে না ইসলামের পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও। ইসলামে এমন বাছ-বিচার হারাম। একতার শর্ত এ নয় যে, সব বিষয়ে সবাইকে একমত হতে হবে। এক্ষেত্রে শর্ত হলো, আল্লাহ ও তাঁর মহান রাসূলের উপর ঈমান এবং আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠা নিয়ে অটুট অঙ্গিকার। আল্লাহর দরবারে মূলতঃ সেগুলীরই হিসাব হবে। কোন দলের সদস্যভূক্তি বা কোন নেতার আনুগত্য নয়। আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সবার জন্যই দ্বার উম্মুক্ত। একই ট্রেনে কত বর্ণ, কত ভাষা ও কত বিশ্বাসের মানুষ একত্রে ভ্রমণ করে। সেখানে কোন বিরোধ দেখা দেয় না। একত্রে ভ্রমনের ক্ষেত্রে যেটি কাজ করে সেটি এক অভিন্ন গন্তব্যস্থলে দ্রুত পৌঁছানোর প্রেরণা। কেউই চায় না সে যাত্রা পথে কোন বিভেদ সৃষ্টি হোক। তাই আল্লাহর সান্নিধ্যে যারা তাঁর অনুগত বান্দাহ রূপে পৌছতে চায় তাদের মাঝেও এই দুনিয়ার জীবনে বিরোধের অবকাশ কোথায়? বিরোধ হতে পারতো সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ নিয়ে। কিন্তু পবিত্র কোরআনে মহান রাব্বুল আ’লামিন নিজেই যেখানে সে পথ বাতলিয়ে দিয়েছেন এবং রাসূলে পাক (সাঃ) সেটির প্রয়োগ করে দেখিয়েও গেছেন, ফলে তা নিয়ে বিরোধেরই বা অবকাশ কোথায়? বিরোধ তখনই শুরু হয়, যখন সে রোডম্যাপের সাথে নিজের বা নিজ-দলের বা নিজ ফেরকার এজেন্ডা এসে যোগ দেয়। মুসলমানদের মাঝে আজকের সকল অনৈক্য ও সকল বিপর্যের মূল কারণ, এই ব্যক্তি, দল, দেশ, ভাষা বা ফেরকাগত চেতনা। ঐক্যের লক্ষ্যে কাজ কারতে হলে অনৈক্যের এ কারণগুলো জানা জরুরী। রোগের কারণ জানা না থাকলে কি তার চিকিৎস্যা সম্ভব? অনৈক্যের কারণগুলো জানার পর সেগুলীর অপসারণেও উদ্যোগী হতে হবে। নতুন দলগড়া বা পুরাতন দলে যোগ দেওয়া -এ সমস্যার সমাধান নয়। বরং এতে সমস্যা আরো বাড়বে। বরং জনগণের মাঝে এ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এমন দলীয় চেতনায় জড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ তখন সমস্যাকে আরো জটিলতর করবে। অতি মোখলেছ ব্যক্তিও তখন ঐসব দলীয় ট্রেনে গিয়ে উঠবে যারা বিগত প্রায় শত বছরেও ইসলামি রাষ্ট্রবিপ্লবের কোন সন্ধান দিতে পারেনি। মুসলিম উম্মাহর একতার ক্ষেত্রেও কোন ভূমিকা রাখেনি।

একতার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ এবং এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক অঙ্গিকার। মুসলমানদের ক্ষেত্রে সে অঙ্গিকারটি হলো, আল্লাহর দ্বীনের বিজয়। মহান নবীজী (সাঃ) এ পথেই ঐক্য গড়েছেন। এজন্য কোন দলগড়ার প্রয়োজন পড়েনি। একই পথে অগ্রসর হয়েছিলেন জামাল উদ্দিন আফগানি। ভাষা, বর্ণ, ভূগোল ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশের বড় বড় নেতা-কর্মীরা তার সাথে একতাবদ্ধভাবে কাজ করেছেন শুধু তার চেতনার সাথে একাত্ম হয়ে। তার কাজের ভূবন ছিল বিশাল, প্রায় সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে। ভারত, আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক, মধ্য-এশিয়া, মিশর, সূদানসহ নানা দেশে তিনি ঐকের বাণী নিয়ে ঘুরেছেন। প্রতিটি দেশকে তিনি আপন করে নিয়েছেন, বিস্ময়ের বিষয়, কোথাও তাঁকে বিদেশী মনে হয়নি। প্রতিটি মু’মিনের কাছে আরেক মু’মিন হলো তার বহুদিনের খুঁজে পাওয়া হারানো ভাই। ভাইয়ের এ খেতাবটি আল্লাহর দেওয়া। তাই আফ্রিকার কোন মুসলমান দেখে যদি এশিয়ার কোন মুসলমানের মন আনন্দে ভরে না উঠে তবে বুঝতে হবে ঈমানে রোগ আছে। নিছক মাতৃভাষা ভিন্ন হওয়ার কারণে অন্য ভাষার মুসলমানগণ যদি কোন মুসলমানকে হত্যা করে বা তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়, এমন ব্যক্তিকে কি মুসলমান বলা যায়? অথচ নবীজী(সাঃ) বলেছেন মুসলমান সেই যার হাত থেকে অন্য মুসলমানের জানমাল নিরাপদ। অথচ একাত্তরে বাংলাদেশে এবং ১৯১৭ সালে আরবদেশগুলোতে মুসলমান মুসলমানের নিধনে নেমেছে। এগুলী ঘটেছে দারুন চেতনাগত অসুস্থ্যতায় যা ঈমানেরই মৃত্যু ঘটায়।

আধুনিক কালে ইরানে ইমাম খোমেনীও রাষ্ট্রবিপ্লবের লক্ষ্যে একতা এবং একতা গড়ার লক্ষ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের পথ ধরেছিলেন। তিনি মানুষের মনে অঙ্গিকার বাড়িয়েছিলেন, এবং সেটি একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্রবিপ্লবের পক্ষে। জনগণের সে অটুট অঙ্গিকারের ফলেই লাগাতর ৮ বছর যুদ্ধ এবং পাশ্চাত্য দেশগুলীর লাগাতর অর্থনৈতিক বয়কটের পরও তিনি বিপ্লব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। সাতচল্লিশের পূর্বে উপমহাদেশের মুসলমানদের একতার কাজে যেটি কাজ করেছিল সেটিই ছিল এক বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ। সে কাজে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিল আল্লামা ইকবাল, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, আবুল কালাম আযাদ, কবি হালী, আকরম খাঁর মত বহু বু্দ্ধিজীবী। মুসলমানদের ঐক্য পালবাঁধা ভেড়ার ঐক্য নয়, কোন দলের সদস্যভূক্তির ঐক্যও নয়। বরং সেটি একটি মহৎ লক্ষ্যে অসংখ্য জাগ্রত আত্মার অটুট অঙ্গিকার। সেটি হলো ঈমানের এক প্রবল অভিব্যক্তি এবং সেটি ঘটে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের ফলে। উপমহাদেশের যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ১৯৪৭ য়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল তাদের ক’জন মুসলিম লীগের নেতা বা কর্মী ছিলেন? তারা তো ছিল হাতে গুনা। সেদিন লক্ষ লক্ষ শিয়া-সূন্নী, দেওবন্দি-বেরেলভী, বাঙ্গালী-বিহারী, পাঠান-পাঞ্জাবী এবং সিন্ধি ও বেলুচ একতাবদ্ধ হয়েছিল মূলতঃ অন্তরের টানে, দলের টানে নয়। সেদিন ইসলামের পক্ষে মুসলমানদের মনের ভূবনে প্লাবন এসেছিল। আর সে প্লাবন মুসলমানদের জমা করেছিল এক মোহনাতে। আজও একতা গড়ার এছাড়া ভিন্ন পথ নাই।


একতা প্রতিষ্ঠায় করণীয় কাজ

আল্লাহতায়ালার কাছে এটি বিচার্য বিষয় নয়, কে কোন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় দলের সদস্য। গুরুত্বপুর্ণ হলো, জীবনের পথচলায় সে কোনপথটিকে বেছে নিয়েছে? সিরাতুল মোস্তাকিমের পথ না সিরাতুশ শায়তানের পথ? অর্থাৎ আল্লাহর পথ না শয়তানের পথ? সে পথে সে একাকী চলেছে না অন্যদের সাথে একতা গড়েছে? একতার পথে তার নিজের অঙ্গিকারই বা কি? আল্লাহর বিধানের প্রতিষ্ঠায় তার নিজের কোরবানী কতটুকু? একতার প্রতিষ্ঠায় যে কাজগুলো করা যেতে পারে তা নিম্মরূপঃ

এক).  কোরআন-হাদীসের আলোকে সর্বপ্রথম একতার গুরুত্ব বুঝা এবং সে জ্ঞানের প্রচার জোরেশোরে করা। একতা প্রতিষ্ঠা পায় মূলতঃ ঈমানের টানে। ঈমানের মজবুতির আগে তাই একতাও প্রতিষ্ঠ পায় না। অনৈক্য তাই স্বাস্থ্যের নয়, ঈমানের রোগাগ্রস্ততার লক্ষণ। একতা বাড়াতে হলে তাই প্রথম ঈমানকে শক্তিশালী করতে হবে।

দুই) অনৈক্যের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা। মুসলিম ইতিহাসে অনৈক্য কীরূপ বিপর্যয় এনেছে তা নিয়ে গবেষণা করা, সে গবেষণালদ্ধ জ্ঞান অন্যদের কাছে পৌছাতে আলোচনা সভা ও প্রকাশনার ব্যবস্থা করা।

তিন) একতা তাদের মধ্যেই গড়ে উঠে যারা একে অপরের কল্যাণে আত্মনিবেদিত। অন্যের কল্যাণ-চিন্তা যার মধ্যে নাই তার মধ্যে আগ্রহও নেই অন্যের সাথে ভাতৃত্ব গড়ায়। তাই ঐক্য গড়তে হলে সমাজে ভাল কাজের শুরু করতে হবে। ঐক্য শুধু কথার মধ্য দিয়ে নয়, কাজের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে হবে।

চার)  সুস্বাস্থ্য যে সমাজেই গড়ে উঠে যেখানে রোগ নিরুপণ ও সে রোগের চিকিৎসার সুব্যবস্থা রয়েছে। চিকিৎস্যকগণ এভাবেই মহাকল্যাণটি করে রোগীর। এবং এরূপ কল্যাণের মধ্য দিয়েই রোগীর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠে চিকিৎস্যকের। হাদীসে এক মু’মিনকে অপর মু’মিনের আয়না বলা হয়েছে। সে আয়নায় অপর মু’মিনের ত্রুটিগুলো ধরা পড়বেই। কোন মু’মিনই ফেরেশতা নয়। মু’মিনের দায়িত্ব হলো অপর মু’মিন ভাইয়ের ত্রুটিগুলো যথাসময়ে তুলে ধরা,যেন মৃত্যুর পূর্বেই সে নিজেকে সংশোধন হতে পারে। এভাবেই এক মু’মিন অপর মু’মিনের মহাকল্যাণটি করে। তেমনি ইসলামী সংগঠনের ভূল-ত্রুটি লুকিয়ে কল্যাণ নেই। বরং প্রকৃত কল্যাণ তো সেগুলির নিরুপণ ও আশু সংশোধনের মধ্যে। কিন্তু আজকের মুসলিম সমাজে সে সংস্কৃতি গড়ে উঠেনি। কারো গায়ে দুর্গন্ধময় ময়লা লেগে থাকলেও অন্যরা তা দেখেও কথা বলে না। ভাবে,কিছু বললে সম্পর্কের অবণতি হবে। ফলে ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনগুলির ত্রুটি তা যত বড়ই হোক, সেটির সংশোধনে কোন উদ্যোগ নেই। আর রোগ না সারালে তা যেমন দিন দিন বাড়তে থাকে, তেমনি বাড়ছে মুসলিম সমাজে নৈতিক রোগ। কর্ম ও স্ট্রাটেজীর ভূলত্রুটি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয় উন্নততর স্ট্রাটেজীর নির্মানে। জিহাদের ময়দানে যারা সক্রিয় তাদের মাঝে নিজেদের ভূল-ত্রুটি নিয়ে আলোচনার অভ্যাস এজন্যই অপরিহার্য। আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়ার আগে নিজের হিসাব নিজে নেওয়ার অভ্যাস তো এভাবেই গড়ে উঠে। সমাজ ও রাষ্ট্রে এভাবেই গড়ে উঠে প্রজ্ঞা,সততা, সচ্ছতা ও বিশুদ্ধতা। গড়ে উঠে উত্তম স্ট্রাটেজী। এমন সততা ও সচ্ছতার মাঝে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার মানুষের সাথে একতাবদ্ধ জীবনযাপন সম্ভব। অথচ শঠতা ও অসচ্ছতা নিয়ে আপন ভাইয়ের সাথেও সুসম্পর্ক গড়ে তুলা অসম্ভব। যাদের মাঝে আত্মসমালোচনা নাই, নাই অন্যদের থেকে নিজের সমালোচনা শুনার আগ্রহ, তারা আগ্রহী নয় একতা গড়াতেও।আগ্রহী নয় বিজয় আনাতেও।


তৃতীয় স্ট্রাটেজিঃ শত্রুপক্ষকে পরাজিত করতে হবে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে

 

ইসলামকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ লড়াইটি হবে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। এ ময়াদানে পরাজিত হলে কোন ময়দানেই বিজয়ের সম্ভাবনা নেই। বুদ্ধিবৃত্তির এ লড়াইয়ে জিততে জরুরী হল জ্ঞান। আর ইসলামে জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। সে গুরুত্ব বুঝাতে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, একমাত্র জ্ঞানীরাই আমাকে ভয় করে। অর্থাৎ যার মধ্যে জ্ঞান নেই তার মধ্যে আল্লাহর ভয়ও নেই। নবীজী (সাঃ) বলেছেন, সামান্য সময়ের জ্ঞানচর্চা সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়েও উত্তম। জ্ঞান বিপ্লব আনে চেতনার ভূবনে, তখন পাল্টে যায় জীবনদর্শন ও সংস্কৃতি। পাল্টে যায় মনের এবং সে সাথে বিশাল ভূগোল জুড়ে আদর্শিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্র। কার্ল মার্কসকে তাই মার্কসাবদের প্রতিষ্ঠায় দেশে বিদেশে ঘুরতে হয়নি। তার লেখনি সেটি করে দিয়েছে। এ কাজটি মুসলমানেরাও করতে পারতো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক’জন মুসলমান এ বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইকে গুরুত্ব দিচ্ছে? অথচ এ লড়াইয়ে পরাজিত হলে যুদ্ধের ময়দানে সৈনিক পাওয়া দায় হয়। বরং তখন শুরু হয় রণেভঙ্গ দিয়ে পলায়ন। কারণ, যুদ্ধের জন্য তো জরুরী মনের বল। আর মনের বল তো আসে ঈমানের বল থেকে। সৈনিকের হাত পা তো তখনই যুদ্ধ করে যখন তার ঈমান সে যুদ্ধে অনুপ্রেরণা জুগায়। আর ঈমান তো বেড়ে উঠে কোরআনী জ্ঞানের অনুপাতে। আজ মুসলিম বিশ্বজুড়ে ইসলামের যে পরাজয় তার মূল কারণ তো এটাই, জনসম্পদ বা প্রাকৃতিক সম্পদে কমতির কারণে নয়। সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে আজ গভীর মেঘের ন্যায় ছেয়ে আছে অজ্ঞতা। তারা অন্যদের কি বুঝাবে, কোরআন তাদের নিজেদের কাছেই অজানা। তারা বরং নিজেদের চারিত্রিক কদর্যতা দিয়ে আড়াল করে রেখেছে ইসলামের আসল পরিচয়। এবং নিজেরা ভেসে চলছে অন্যদের সৃষ্ট আদর্শিক তথা বুদ্ধিবৃত্তিক স্রোতে। কিছুদিন আগেও গণ-ধর্মান্তরের ন্যায় মুসলমান সন্তানেরা লাখে লাখে দীক্ষা নিয়েছে মার্কসবাদ বা সমাজতন্ত্রে। আর এখন ভাসছে জাতিয়াতবাদ, পুঁজিবাদ, সেকুলারিজমের স্রোতে। কোরআনী জ্ঞানের শূণ্যতা তাদের মধ্যে প্রচন্ড শিকড়শূণ্যতার জন্ম দিয়েছে। ফলে বুদ্ধিবৃত্তির প্রবল স্রোত তা যেদিক দিয়েই আসুক সে স্রোতের টানে ভাসতে থাকে। এখন ভাসছে পাশ্চাত্য স্রোতে। একারণে মুসলিম দেশে ধর্মান্তর না হলে কি হবে, প্রচন্ডভাবে বেড়েছে সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক কনভার্শন। তারা রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও আচার-আচরণের শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা যেখান থেকে পায় সেটি ইসলাম নয়। মুলমানদের ঐতিহ্য তো স্রোতে ভাসা নয়, বরং বহমান স্রোতের বিপরীতে নতুন স্রোত সৃষ্টি করা। নবীজী(সাঃ)র এটিই বড় সূন্নত। নবীজী যে সত্যদ্বীনের জোয়ার সৃষ্টি করেছিলেন তা কয়েক দশকের মধ্যে ছেয়ে ফেলেছিল এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিশাল ভূ-ভাগ। অথচ মুসলমানরা আজ সে সূন্নতকে ভূলে গেছে। ফলে জোয়ারের বদলে প্রবল ভাটা শুরু হয়েছে।

বুদ্ধিবৃত্তির লড়াইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারটি একমাত্র মুসলমানদের হাতে। মহাশক্তিশালী সে হাতিয়ারটি মহান আল্লাহতায়ালার দেওয়া। সেটি পবিত্র কোরআন। মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় নিয়ামত মহান আল্লাহতায়ালা থেকে আর কোন কালেই আসেনি। অথচ সবচেয়ে বড় খেয়ানত হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ সে নেয়ামতটির সাথে। নির্ভূল ঔষধ থাকা সত্ত্বেও যদি কোটি কোটি মানুষ ঔষধ সেবন না করার কারণেই মারা যায় তবে সেটি কি কম অপরাধ? অথচ সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে সে অপরাধটাই হচ্ছে বিগত বহু শত বছর ধরে। এখন সে অপরাধ ছেয়ে গেছে সর্বত্র। অথচ আল্লাহতায়ালার কাম্য ছিল, তাঁর বিশ্বজুড়ে একমাত্র তাঁর দ্বীনেরই বিজয় আসবে। সে বিজয়ে তার ঈমানদার বান্দারা আনসার রূপে কাজ করবে। কিন্তু সেটি হয়নি। তারা বরং রাস্তায় নেমেছে এবং যুদ্ধ লড়ছে তার শত্রুপক্ষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। এভাবে মুসলিম দেশে ইসলামী বিধানের পরাজয় তো তাদের নিজেদের কামাই। মুসলিম ভূমি আজ ৫০ টিরও বেশী টুকরায় বিভক্ত তো তাদের রক্ত ও অর্থদানের ফলেই। আল্লাহর দ্বীনের সাথে এর চেয়ে বড় গাদ্দারী আর কি হতে পারে? এটিই কি মহান আল্লাহর আযাব নামিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট নয়? বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের কাজে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো তায়াক্কুল, তাফাক্কুর ও তাদাব্বুর। শুধু কোরআনের তেলাওয়াত বা পাঠ বাড়িয়ে সে লড়াই হয় না। যাদের মধ্যে বুদ্ধির প্রয়োগ (তায়াক্কুল) নেই, চিন্তার সামর্থ (তাফাক্কুর) নেই এবং গভীর বিচার-বিশ্লেষনের যোগ্যতা নেই, তাদের দ্বারা কি সভ্যতার নির্মাণ হয়? এব্যর্থতা ছেড়ে গেছে সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে। ফলে তাদের দ্বারা মানবিকতায় সমৃদ্ধ একটি রাষ্ট্রিও গড়ে উঠছে না। সংখ্যায় প্রায় দেড় শত কোটি হলেও তাদের হাতে বাড়ছে না ইসলামের গৌরব। তারা আজ ৫০টির বেশী রাষ্ট্রের জন্ম দিলেও, কোন একটিকে নিয়েও কি গর্ব করা যায়?


বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে বু্দ্ধিবৃত্তিক কাজগুলো অতি জরুরী

 

এক. শিক্ষা ও জ্ঞানার্জন:

ক). শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন একটি লাগাতর পদ্ধতি যা অবশ্যই চলতে হবে আমৃত্যু। এব্যাপারে মহান নবীজী (সাঃ)র হাদীস হলো, “ধ্বংস সে ব্যক্তির জন্য যার জীবনে দুটি দিন আসলো অথচ তার জ্ঞানের ভান্ডারে কোন বৃদ্ধি ঘটলো না।” তাই সময়ের তালে মু’মিনের জীবন থেকে তার মূল্যবান বছর বা দিনগুলী নিছক হারিয়ে যাবে না, বরং হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঘন্টা ও প্রতিটি মুহুর্তের সাথে তার জীবনে যোগ হবে অমূল্য সম্পদ। এবং তা হলো নতুন জ্ঞান ও নতুন উপলদ্ধি।  যার জীবনে সে সম্পদ যোগ হলো না সে শুধু সময়ে স্রোতে হারিয়েই গেল, পেল না কিছুই। মহাক্ষতি বা ধ্বংস বস্তুত এমন ব্যক্তির জন্যই। সময়ের কসম খেয়ে সে সত্যটি মহান আল্লাহ বলেছেন সুরা আসরে। জ্ঞানার্জনে তাই সদা সচেষ্ট থাকতে হবে প্রতিটি ঈমানদারকে। জ্ঞানার্জনে শুধু পড়ার সামর্থকে কাজে লাগাবে চলবে না, কাজে লাগাতে হবে দর্শন, শ্রবন এবং ভাবনার সামর্থকেও। জ্ঞানার্জনে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে গুলোকে সনাক্ত করার ক্ষেত্রে। বিদ্যার্জনে গুরুত্ব দিতে হবে নিম্নোক্ত বিষয়েঃ


•    কোরআনী জ্ঞান
•    নৈতিক চরিত্র,
•    রাজনৈতিক একতা, সামাজিক সংহতি ও সোসাল ক্যাপিটাল
•    বাংলাদেশের মুসলমানদের বিপর্যয় বা পতনের কারণ
•    ইতিহাস ও দর্শন শিক্ষা,
•    সাহিত্য ও সংস্কৃতি
•    রাজনীতি ও সমাজনীত
•    পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়া
•    কৃষি,শিল্প ও বিজ্ঞান

খ). বিপক্ষ শক্তির স্ট্রাটেজী ও কর্মসূচী সম্মন্ধে অবহিত হওয়ার লক্ষ্যে ব্যাপক পড়াশুনা হতে পারে নীচের ক্ষেত্রগুলীত
•    শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তি ও গবেষণা
•    রাজনীতি ও সমাজনীতি
•    পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়া

গ). গবেষণা করতে হবে ইসলামের পক্ষে যেসব দল বা সংগঠন কাজ করছে তাদের দূর্বল দিকগুলোকে চিহ্নিত করার লক্ষ্যে। সে গবেষণা হতে পারে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রেঃ
• ইসলামী দলগুলোর দর্শনগত বিভ্রান্তি ও সেকুলারাইজেশন
• বুদ্ধিবৃত্তিক পশ্চাতপদতা
• সাংগঠনিক দূর্বল দিকগুলো
• স্ট্রাটেজীক বা কৌশলগত বিভ্রান্তি
• রাজনৈতিক ভূল সিদ্ধান্ত সমূহ

দুই. দাওয়াহ:
দাওয়াতিমূলক কাজের পদ্ধতি হতে পারে এভাবে:
• ইসলামের বক্তব্যকে ছড়িয়ে দেওয়ায় লক্ষ্যে ব্যাপকতর ব্যক্তিসংযোগ, আলোচনা সভা, বইপত্র ও প্রচারপত্র বিলি।
• পত্র-পত্রিকা ও ইন্টারনেটে ব্যাপক লেখালেখি।
• নিজেদের ওয়েবসাইট ও ব্লগ গড়ে তোলা।
• স্থানীয় পর্যায়ে দাওয়াহ ও গবেষণা গ্রুপ গড়ে তোলা
• একসাথে বসে নিজেদের চিন্তা-ভাবনাগুলো নিয়ে অন্যদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করা, চলমান চিন্তাগুলোকে পর্যালোচনা করা

তিন. গবেষণা ও প্রশিক্ষণমূলক:
• গবেষণা, লেখালেখি ও প্রকাশনারর সামর্থবৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণমূলক ওয়ার্কশপের আয়োজন করা
• গবেষণা করা ও তার ফলাফল সেমিনারে পেশ করা ও প্রকাশ করা

স্টাডি বা গবেষণার বিষয়গুলো হতে পারেঃ
• মুসলিম চিন্তা-চেতনার সেকুলারাইজেশন
• শিক্ষা ব্যবস্থার সেকুলারিকরণ
• বাংলাদেশের মুসলমানদের উপর সেকুলার সাহিত্যের প্রভাব
• সেকুলার মিডিয়ার ভূমিকা
• বাংলাদেশের উলামাদের দূর্বল দিকগুলো
• বাংলাদেশে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির স্ট্রাটেজী ও কর্মকান্ড
• বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিদেশী শক্তি বিশেষ করে ভারতের স্ট্রাটেজী ও কর্মকান্ড
• বাংলা সাহিত্যে ইসলাম-বিদ্বেষ
• ইসলামী শক্তির পরাজয়ের কারণ
• ইসলামের বিজয়ের সম্ভাব্য উপায়
• বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ক্ষতিকর দিকগুলো
• বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলাম প্রসঙ্গ ও নেতাদের এ যাবতকালের অঙ্গিকার
• উপমহাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
• মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে মুসলিম স্বার্থচিন্তা
• পাশ্চাত্যদেশে মুসলমানদের বর্তমান ও ভবিষ্যত


চতুর্থ স্ট্রাটেজিঃ  ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ

ঈমানদারদের প্রতি আল্লাহতায়ালার হুকুমঃ “তোমাদের মধ্যে এমন একটি উম্মাহ অবশ্যই থাকতে হবে যারা মানুষকে কল্যাণের পথে ডাকবে, ন্যায়ের আদেশ দিবে এবং অন্যায়কে রুখবে। এবং তারাই হলো সফলকাম।” –সুরা আল-ইমরান,আয়াত ১০৪। তাই সফলকাম হওয়ার আল্লাহতায়ালা-আরোপিত শর্ত হলো, এমন এক উম্মাহর জন্ম দেওয়া যার কাজ, মানুষকে কল্যাণের পথে ডাকা, ন্যায়ের আদেশ এবং অন্যায়ের প্রতিরোধ করা। প্রশ্ন হলো, ন্যায়ের আদেশ এবং অন্যায়ের প্রতিরোধ কি ধর্মকর্মকে নিছক মসজিদে বা জায়নামাযে সীমিত করে সম্ভব? এজন্য তো তাকে রাজনীতির ময়দানেও নামতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রন হাতে নিতে হবে। এটিই তো নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। এর বাইরে জাতিয়তাবাদ, রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র  ও অন্য মতবাদ নিয়ে মুসলিম রাজনীতিতে আজ যা কিছু ঘটছে তা সবই নব-আবিস্কার বা বিদয়াত। ইসলাম ও নবীজী(সাঃ)র সূন্নতের সাথে এসবের কোন সম্পর্ক নেই। ঈমানদারগণ যেদিন রাষ্ট্রক্ষমতা সেকুলারিষ্ট, দুর্বৃত্ত স্বৈরাচার, রাজতন্ত্রি তথা আল্লাহর শত্রু পক্ষের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজেদের ধর্মকর্মকে জায়নামাযে সীমাবদ্ধ করলো তখনই শুরু হলো ইসলামের পরাজয়। তখন থেকেই রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিণত হয় মিথ্যাচার ও দুর্বৃত্তি বিস্তারের হাতিয়ারে। বন্ধ হয় ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং জোয়ার শুরু হয় অন্যায় ও নানাবিধ পাপাচারের। মুসলিম দেশগুলোতে আজ সেটি এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে যে তারা বিশ্বে দুর্বৃত্তিতে রেকর্ড গড়ছে। ইসলামি রাষ্ট্রবিপ্লব শুধু এরূপ দুর্গতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই জরুরী নয়, জরুরী হলো পরকালে মুক্তি পাওয়ার জন্যও। কারণ আখেরাতের সফলতা তো এ দুর্গতি থেকে মূক্তি পাওয়ার মধ্যেই। এমন রাষ্ট্র-বিপ্লবে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়েই পরীক্ষা হয় ঈমানদারির। পরীক্ষা হয় ইসলামের বিজয়ের লড়াইয়ে সে কি মহান আল্লাহর হুকুমের প্রকৃত অনুসারি না বিদ্রোহী?

পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে যে বিষয়টি মহান আল্লাহতায়ালা বার বার উল্লেখ করেছেন তা হলো, পরীক্ষা না দিয়ে পরকালে মুক্তির সম্ভাবনা নাই। মু’মিনের জীবনে সে মূল পরীক্ষাটি হয় “ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ” এর কাজে আত্মবিণিয়োগ ও আত্মত্যাগের  মধ্য দিয়ে। ঈমানের দাবীতে কে সাচ্চা এবং কে ভন্ড –সেটি দেখার জন্যই তিনি প্রতিটি ঈমানদারদেরকে সশস্ত্র শয়তানী শক্তির মুখোমুখি হাজির করেন। মুখে কালেমা পাঠ, নামায আদায়, রোযা ও হজ পালনে সে পরীক্ষা হয় না। কাফের অধ্যুষিত দেশেও সেগুলির পালন সম্ভব। এ পার্থিব জীবনের পুরা মেয়াদটাই হলো মু’মিনের পরীক্ষাকালীন সময়। পরীক্ষার পরই আসে প্রমোশন। সফল মু’মিনের জীবনে সে অচিন্তনীয় প্রমোশনটি আসে জান্নাতপ্রাপ্তির মধ্যে দিয়ে। এজীবনে কোন কিছুই এমনিতে জুটে না, মূল্য পরিশোধ করতে হয় এমনকি অতি ক্ষুদ্র বস্তুর জন্যও। তেমনি জান্নাতের জন্যও। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাদেরও সে মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। সে মূল্যটি পরিশোধ করতে হয় জীবন-ভর আল্লাহর প্রতিটি হুকুম পালনের মধ্য দিয়ে। অর্থ, শ্রম, মেধা, সময় ও রক্তদানের মধ্য দিয়ে। আল্লাহতায়ালার যেকোন একটি হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা পরীক্ষা-পাশের সম্ভাবনা ধুলিস্যাৎ করে দেয়। মহান আল্লাহ বিষয়টি সুস্পষ্ট করেছেন এভাবেঃ

“মহামহিমান্বিত তিনি, সর্বময় কর্তৃত্ব যাঁর করায়ত্ব; তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিময়। যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য – কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম। তিনি মহাক্রমশালী এবং ক্ষমাশীল।” –(সুরা মুলক, আয়াত ১-২) অর্থাৎ পৃথিবীটা মু’মিনের জন্য পরীক্ষা-ক্ষেত্র। সে পরীক্ষাটি দিচ্ছে জীবনের প্রতিটি দিন ও প্রতিটি ক্ষণ জুড়ে। নবী-রাসূলদেরও সে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কোরআনে সে বিবরণ বহু সুরাতে বহু ভাবে এসেছে। এখানে সে পরীক্ষা নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের বর্ণনাটি শোনা যাকঃ

“তোমরা কি মনে করে নিয়েছো যে তোমরা এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ এখনও তোমাদের নিকট তোমাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা আসেনি? অর্থ সংকট ও দুঃখ-ক্লেশ তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত ও কম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল এবং তাঁর সাথের সঙ্গিরা যারা ঈমান এনেছিল তারা বলে উঠেছিল, ”আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে?” জেনে রাখ, আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই নিকটে।” –সুরা বাকারা, আয়াত ২১৪।

মক্কার কাফের সমাজেও নামায পড়া অসম্ভব ছিল না, কিন্তু অতি কঠিন ছিল ইসলামের সামাজিক সুবিচারের। তখন আবু জেহেল ও আবু লাহাবদের ন্যায় দুর্বৃত্তদের নেতৃত্বে বিজয়ী ছিল অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-শোষন, শিশুহত্যা, অশ্লিলতা ও ব্যাভিচারের ন্যায় দুর্বৃত্তি।  মহান আল্লাহ চান, নামায-রোযার পাশাপাশি দুর্বৃত্তির নির্মূলও । নামায, রোযা, হজ, যাকাত এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ মাত্র। সে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে একজন ঈমানদার কতটুকু পেল ঈমানী গভিরতা ও কতটুকু  পেল  আত্মত্যাগের যোগ্যতা -তারই পরীক্ষা হয় জিহাদের ময়দানে। নবীজীর আমলে কেউ ঈমান এনেছে অথচ ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় ও অন্যায়ের প্রতিরোধে ময়দানে নামেনি এমন কোন নজির নেই। কিছু অন্ধ ও কিছু বধির ব্যক্তি জিহাদের ময়দানে নামতে পারেনি শারীরিক পঙ্গুত্বের কারণে, ঈমানের দুর্বলতার কারণে নয়। মসজিদে অন্য মু’মিনদের সাথে নামায আদায়ের মধ্য দিয়ে নামাযীর জীবনে প্রতিদিন যেটি ঘটে তা হলো, আল্লাহতায়ালার প্রতি আনুগত্যের ৫ বার অঙ্গিকার। সে অঙ্গিকারকে কর্মে রূপ দিতে হয় সমাজে আল্লাহর বিধান পালনের কাজে নেমে। যাকাত গড়ে অর্থ কোরবানীর অভ্যাস। রোযা দেয় ক্ষুধা ও পীপাসা সহ্যের সামর্থ - যা প্রতিটি লড়াইয়ে নিত্য সহচর। হজ দেয় বিপুল অর্থ ও কষ্ট স্বীকার করে বহু শত বা বহু হাজার মাইল দূরে গিয়ে আল্লাহুর হুকুমের প্রতি ‘লাব্বায়েক’ তথা ‘আমি হাজির’ বলার সামর্থ। মু’মিনের কাজ হলো এগুলোকে আজীবন অভ্যাসে পরিণত করা। তাই হাজী হওয়ার অর্থ শুধু মক্কায় গিয়ে হজ মওসুমে লাব্বায়েক বলা নয়, জীবন ভর আল্লাহর প্রতিটি হুকুমে লাব্বায়েক বলা। এমন লাব্বায়েক বলাই তো হযরত ইব্রাহীম (আঃ)র সূন্নত। সেটি বলতে হবে “ন্যায়ের নির্দেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ” এর ন্যায় কোরআনী হুকুম বিজয়ী করার ক্ষেত্রেও।

মহান আল্লাহতায়ালার এ হুকুমটি পালনের লক্ষ্যে এ কাজগুলো হাতে নেওয়া যেতে পারেঃ

 

• সমাজ ও রাষ্ট্রে বিরাজমান অন্যায়, দুর্বৃত্তি ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা, এ লক্ষ্যে প্রথমে মুখের ভাষা ও কলমকে হাতিয়ার রূপে বেছে নেওয়া।
• পাপ শুধু ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধ্বংসকে করে তা নয়, সাধারণ মানুষের জন্য সিরাতুল মোস্তাকিমকে খুঁজে বের করা অসম্ভব করে। অনৈসলামিক সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাসের মহা বিপদ তো এখানেই। সে বিপদের কথাগুলো ঘরে-বাইরে নানা ফোরামে জোরেশোরে বলা।
• দুর্বৃত্তির নায়ক এবং তাদের কৌশলকে চিহ্নিত করা এবং জনগণের মাঝে সেগুলো তুলে ধরা। তারা যে শুধু ইসলামের শত্রু তা নয়, তারা মানবতারও শত্রু –এ সত্যটি তুলে ধরে নিয়মিত লেখালেখি করা, বক্তৃতা দেওয়া এবং এ বিষয়ে ঘন ঘন সেমিনারের আয়োজন করা।
• গ্রাম, মহল্লা, ইউনিয়ন, থানা ও জেলা পর্যায়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করা এবং দুর্বৃত্তির প্রতিরোধ এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যারা আগ্রহী তাদের সবার সাথে অন্ততঃ এ ইস্যুতে কোয়ালিশন গড়ে তোলা।
• মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক পরস্পরে যোগাযোগ গড়ে তোলা এবং মানুষকে দায়িত্ব সচেতন করা। নিজ নিজ দায়িত্বপালনে ময়দানে তাদেরকেও নেমে আসতে উদ্বুদ্ধ করা।

 

পঞ্চম স্ট্রাটেজিঃ ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের শুরু মাঠপর্যায় থেকে

কোন রাষ্ট্র বা সমাজ বিপ্লবের কাজই দলীয় দফতর, সেনাদপ্তর বা কনভেনশনে ঘটে না। সরকারি পরিকল্পনা কমিশন থেকেও রাষ্ট্র বিপ্লবের সূচনা হয় না। রাষ্ট্র বিপ্লব শুরু করে এবং তা সফলতার দ্বারে পৌছে দেয় জনগণ। বিশেষ কোন দল বা পার্টি নয়, সরকারও নয়। শত সহস্র ঝর্ণা ধারা যখন একক ধারায় মিলিত হয় কেবল তখনই প্রবল প্রমত্তা স্রোতস্বী নদীর জন্ম নেয়। তখন সে নদীটি ফুলে-ফলে শস্যে ভরা বিপ্লব আনে এমন কি মরুভূমিতেও। অথচ একক ঝর্ণাধারা মরুপথে অচীরেই পথ হারিয়ে ফেলে। তেমনি রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের ক্ষেত্রেও। কোন একক দল সে দায়িত্ব নিলে সেটি সহজে পরাজিত হয় এবং পরাজয় শেষে হারিয়ে যায়। ইসলামি রাষ্ট্র বিপ্লবের কাজে তাই উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে হয় এবং ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে হয় বিভিন্ন গুণের লক্ষ লক্ষ মানুষের মহামিলনে। ফরাসী বিপ্লব, খেলাফত আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন, ইরান বিপ্লব – কোনটিই কোন এক দলের ফসল ছিল না। এমন একটি রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের লক্ষ্যে রাষ্ট্র বিপ্লবের এ বাণীকে সাধারণ মানুষের ঘরের দোয়ারে নিয়ে যেতে হবে। নিরক্ষর হওয়া বা গ্রামের বাসিন্দা হওয়া এখানে কোন অপরাধ নয়, অসামর্থতাও নয়। বরং প্রচন্ড অসামর্থতা বাড়াতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডিও। আজকের মুসলিম দেশগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে, মুসলিম দেশগুলো শত্রুদের দ্বারা অধিকৃত হচ্ছে এবং সেখানে কুফরি আইন ও সেকুলার সংস্কৃতির প্লাবন বইতে শুরু করেছে –তা এসব ডিগ্রিধারীদের জন্যই। নিরক্ষর গ্রামের মানুষদের জন্য নয়। বরং মুসলিম ইতিহাসের অতি গর্বের কাজ করেছেন মরুবাসী নিরক্ষরেরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারিরা নয়। ইসলামকে বিজয়ী করতে তারা শুধু শ্রম, অর্থ ও সমেই দেননি, প্রাণও দিয়েছেন। অথচ সে সামর্থ আজকের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ডিগ্রিধারীদের ক’জনের? আফগানিস্তানে এরূপ ডিগ্রিধারী সেকুলারদের সংখ্যা কম হওয়ার কারণেই ৪০টি অমুসলিম দেশের সম্মিলিত বাহিনী সেদেশে শরিয়ত বিরোধী আইনের প্রয়োগ ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠায় বাধার সম্মুখিন হচ্ছে।

আল্লাহর কোরআনী সত্যকে অনুধাবনে যেটি অপরিহার্য সেটি হলো বিবেকের সুস্থ্যতা। বিবেকের সে সুস্থ্যতা বিনষ্ট হতে পারে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার বিকৃত শিক্ষায়। নবী (সাঃ)র যুগে ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের কাজে যারা এগিয়ে এসেছিলেন তারা ছিলেন হযরত আলী (রাঃ), বেলাল (রাঃ), খাব্বাব (রাঃ), আম্মার (রাঃ)র মত অতি সাধারণ মানুষ। তারা নামায, রোযা, হজ, যাকাতকেই শুধু কবুল করেননি। কবুল করেছিলেন ইসলামের সবটুকু। তারা ইসলামের বিধান ও দর্শন নিয়ে শুধু জায়নামাযে বসেননি, রাষ্ট্র জুড়ে ইসলামের বিজয় এনেছেন এবং সে বিজয়কে টিকিয়ে রাখার জন্য নিজেদের জানমাল নিয়ে সব সময় ময়দানে থেকেছেন। বার বার জ্বিহাদে নেমেছেন। দুর্বৃত্তদের জন্য রাজনীতির ময়দান একদিনের জন্যও খালি করে ঘরে গিয়ে উঠেননি। বেতনভূগী সার্বক্ষনিক সৈনিক না হয়েও তারা অধিক সার্বক্ষনিক ছিলেন। এসব আত্মত্যাগী সার্বক্ষণিক সৈনিকেরাই আল্লাহর দ্বীনের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধে তরবারী কোষমূক্ত করেছেন এমনকি হযরত আবু বকরের ন্যায় নিবেদিত প্রাণ খলিফার সামনেও। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, “হে আমিরুল মোমিনূন! আপনি যদি আল্লাহর কোরআন ও রাসূলুল্লাহর সূন্নাহ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা না করেন তবে এ তরবারী দিয়ে আপনাকে দ্বিখন্ডিত করে ফেলবো।” তারা হযরত ওমরের ন্যায় মহান খলিফর গায়ে বৃহৎ আকারের পিরহান দেখে জুম্মার খোতবা থামিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, “এতবড় জামা তৈরীর কাপড় কোত্থেকে পেলেন?” ইসলামের ন্যায়নীতি ও অনুশাসনের প্রতি এই ছিল অঙ্গিকার। ইসলামী খেলাফতকে বাঁচাতে হযরত আম্মার (রাঃ) তার ৮০ বছরের বৃদ্ধ বয়সে হযরত আলী(রাঃ)র সাথে জ্বিহাদে নেমেছেন এবং শহীদ হয়েছেন। আজও মুসলমানদের জন্য তো তারাই আদর্শ। যে সমাজে এমন ঈমানদারের সংখ্যা অধিক সে সমাজে মীর জাফরদের মত বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমতায় আসা অসম্ভব হয়ে উঠে। মীরজাফরদের নির্মূলে সার্বক্ষনিক সৈনিকেরা তখন গ্রাম-গঞ্জ থেকে ছুটে বের হয়। এ মোজাহিদরা তখন সমাজ থেকে হযরত ওমর (রাঃ) বা হযরত আলী (রাঃ) এর মত লোকদের খুঁজে বের করে এনে ক্ষমতায় বসায়। এবং তাদের শাসনের নিরাপত্তা দিতে নিজেরা অস্ত্র ধরে। বর্তমান সময়ের কাজ তাই দল গড়া নয়, এরূপ চেতনা সমৃদ্ধ মানুষ গড়া। মু’মিনের জীবনে বিরামহীন এ পার্থিব পরীক্ষাটির শেষ ঘন্টা যখন তখন বেজে উঠতে পারে। এবং বেজে না উঠা পর্যন্ত কোন ঈমানদার কি দায়িত্ব থেকে অবসর নিতে পারে? প্রকৃত ঈমানদার তো তার জীবনের শেষ মুহুর্তটিকেও ব্যবহার করবে পরীক্ষার নম্বর বাড়াতে। মোমেনের জীবনে এজন্যই তো অবসর জীবনের ধারণা বা কনসেপ্ট নেই। এটি নিতান্তই সেকুলার ধারণা। এজন্যই হযরত আম্মার ৮০ বছর বয়সে জিহাদে নেমেছেন এবং শহিদ হয়েছেন। জিহাদকে তারা ভাবতেন এ জীবনে প্রমোশন লাভে তখা জান্নাত লাভে সর্বোচ্চ পরীক্ষা। তাই সে পরীক্ষায় উত্তির্ণ হওয়া নিয়ে তাদের মাঝে সব সময় একটি তাড়াহুড়া থাকতো। সে শিক্ষাটি তারা পেয়েছেন পবিত্র কোরআন থেকে। কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের কি ধারণা, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনও পরীক্ষা করেননি তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে এবং কে ধৈর্যশীল।” –সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৪২। জীবনের সে চরম পরীক্ষা ও পরম পাওয়াটি নিয়ে তাড়াহুড়া করতে বলেছেন মহান আল্লাহতায়লা। মু’মিনদের তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন এভাবে, “তোমরা তাড়াহুড়া কর তোমাদের প্রভূর মাগফেরাত ও জান্নাত পাওয়ার জন্য, যে জান্নাত আসমান ও পৃথিবীর ন্যায় প্রশস্ত  -যা তৈরী হয়েছে পরহেযগারদের জন্য।” –সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১৩৩।  অপর এক আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমাদের প্রভূর মাগফেরাত ও জান্নাত পাওয়ার জন্য তোমরা পরস্পরে প্রতিযোগিতা কর যা আসমান ও পৃথিবীর ন্যায় প্রশস্ত।”- সুরা হাদীদ, আয়াত ২১।  সাহাবাগণ মহান আল্লাহর এ হুশিয়ারি ঘোষণা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। তাই তাদের জীবনের আল্লাহর মাগফেরাত লাভে প্রচন্ড তাড়াহুড়া ছিল, ছিল পরস্পরের মাঝে প্রচন্ড প্রতিযোগিতা। মাগফেরাতের লাভে তারা শ্রেষ্ঠ পথ রূপে বেছে নিয়েছিলেন মহান আল্লাহর ইচ্ছা পূরনে তথা তাঁর দ্বীনের বিশ্বব্যাপী বিজয়ে নিজেদের সমগ্র সামর্থের বিনিয়োগ, এমনকি প্রাণের কোরবানীও। তাই বেশীর ভাগ সাহাবা শহিদ হয়েছেন। তাদের সে সার্বক্ষনিক জিহাদী প্রস্তুতির কারণেই সে সেময় সমাজের দুর্বৃত্তরা মুসলমানদের মাথার উপর শাসক রূপে বসতে পারেনি।

রাষ্ট্র হলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিস্টিটিউশন। মানবের জীবনে সংস্কার, সমৃদ্ধি ও সুখশান্তি আনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকাই চুড়ান্ত। আল্লাহর দ্বীনের বিজয়েও এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। তাই কোন মু’মিন কি এটি থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারে? এটি কি নবীজী (সাঃ)র সূন্নত? অথচ নবীজী(সাঃ)র জীবনে চুড়ান্ত লড়াই হয়েছে রাষ্ট্রকে দখলে নেওয়া নিয়ে। কোরআনী আইনের বাস্তবায়ন এবং বিশ্বব্যাপী তার প্রসারের কাজে রাষ্ট্রের বিকল্প নেই। আর রাষ্ট্রীয় সে শক্তিটি হাতছাড়া হয়ে গেলে বিপন্ন হয় শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। তখন বিপন্ন হয় ন্যায়-নীতি ও কল্যাণের পথ। তখন বিপদ-সংকুল হয়ে পড়ে সিরাতুল মুস্তাকিমে চলা। তখন আজাদী পায় পাপাচারে মত্ত সমাজের অতিশয় মিথ্যাবাদী ও ক্ষমতালোভী দুবৃর্তরা। বাংলাদেশের মত অধিকাংশ মুসলিম দেশগুলী তো এখন তাদেরই দখলে। তখন রাষ্ট্রে নামায-রোযা আদায়ে বাঁধা না থাকলেও অসম্ভব হয় আল্লাহর আইন অনুযায়ী জীবন পরিচালনা।

সভ্যতার নির্মাণ তো হয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারের নেতৃত্বে। মুসলমানগন অতীতে মানব ইতিহাসের যে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতাটির জন্ম দিতে পেরেছিলেন সেটি সম্ভব হয়েছিল রাষ্ট্র জুড়ে ইসলামের প্রতিষ্ঠার ফলে। এ মোদ্দাকথাটি বোঝার জন্য কি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জ্ঞান লাগে? সাহাবায়ে কেরাম বিষয়টিকে এতটা গভীর ভাবে বুঝেছিলেন যে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সেটির পাহারাদারীদর কাজ করেছেন আমৃত্যু। তারা কাজ করেছেন বেতন ভোগী সৈনিক হিসাবে নয়, বরং জনগণের স্তর থেকে সার্বক্ষণিক মোজাহিদ রূপে। একাজকে তারা আল্লাহর পথের পবিত্র জিহাদ মনে করেছেন। এবং সে জিহাদে নিজ খরচে যোগ দিয়েছেন এবং জীবনও বিলিয়ে দিয়েছেন। যখনই মুসলমানদের মধ্যে এমন সার্বক্ষণিক সৈনিকদের সংখ্যা লোপ পেল, তখনই মুসলিম রাষ্ট্র ও খেলাফত হাইজ্যাক হলো ইয়াজিদদের মত দুর্বৃত্তদের হাতে। তখন মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী এ প্রতিষ্ঠানটি শয়তানের হাতিয়ারে পরিণত হলো। এবং সেটি ব্যবহৃত হলো জনগণকে বিভ্রান্ত ও দুর্বৃত্ত রূপে গড়ে তুলার কাজে। দুর্বত্ত কবলিত রাজনীতি ও প্রশাসনের কারণে এভাবেই ব্যাপক পথভ্রষ্টতা নেমে আসে জনগণের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আচরণে। ফলে সাধারণ জনগণের জন্য অসম্ভব হয়ে উঠে সেটি সিরাতুল মোস্তাকিম প্রাপ্তি। বরং নিজ খরচে গড়ে তোলে শয়তানে পথ তথা দুর্বৃত্তির পথ। জনগণের রাজস্বের অর্থে ও তাদের ভোটের বলে স্থাপিত সরকারই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে শয়তানের পথ তথা জাহান্নামের পথ গড়ায়। অথচ রাষ্ট্রে ইসলামী বিপ্লব হলে কঠিন হয় শয়তানের পথ গড়া। তখন সমাজে নানা পথের বিভ্রান্তি থাকে না। পথ তখন একটাই থাকে, সেটি হলো জান্নাতের পথ। নিরক্ষর মানুষও তখন সে পথ খুঁজে পেতে অসুবিধায় পড়ে না। ইসলামী রাষ্ট্র বিপ্লবের এটাই হলো বড় নিয়ামত। সূদী ব্যংক, পতিতা পল্লী, মদের দোকান, ঘুষখোর প্রশাসন তখন সমাজ ও রাষ্ট্রে শিকার ধরার জাল পাততে ব্যর্থ হয়। একাজ পরিণত হয় জঘন্য ফৌজদারি অপরাধে। শয়তানের পথের আকর্ষণীয় সাইনবোর্ড ও মাইল ফলকগুলোকে তখন বিলুপ্ত করা হয।


পথভ্রষ্টতা যেখানে সর্বস্তরে

রাষ্ট্রে শয়তানের পথ অসংখ্য। সেখানে সে কাজ করে মানুষের রূপ ধরে। সে পথ গড়ে নানা ধর্ম, নানা ফিরকা, নানা ভাষা, নানা ভূগোল, নানা কালচার ও নানা মতবাদের নামে। এরূপ অসংখ্য পথের মাঝে সঠিক পথটি খুঁজে পাওয়াটিই মানব জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। এখানেই বিচার হয় ব্যক্তির মূল সামর্থ ও যোগ্যতার। সঠিক পথ পাওয়ায় ব্যর্থ হলে ব্যর্থ হয় পুরা জীবন। তবে সে সঠিক পথটি জুটে একমাত্র মহান আল্লাহর রহমতের বরকতে। মানবের জন্য সেটিই মহান রাব্বুল আলামীনের সর্বশ্রেষ্ঠ দান। ধনসম্পদ, ছেলে সন্তান, ঘরবাড়ী বা রাজক্ষমতাও নয়। সে পথটি দেখাতেই মহান আল্লাহ লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছন। তাই মু’মিনের জীবনে সর্বাধিক প্রায়োরিটি পাওয়া উচিত সে সঠিক পথ পাওয়াটিই। সে প্রায়োরিটির প্রতিফলিত হওয়া উচিত তার মোনাজাতের মধ্যেও। কারণ ব্যক্তির জীবনের মূল প্রায়োরিটি ধরা পড়ে তার মোনাজাতের মধ্যে। চিন্তাচেতনায় কে সেকুলার তথা পার্থিব, আর কে ইসলামী তা ধরা পরে সেখানে। মু’মিনের জীবনে কোনটি প্রায়োরিটি পাবে মহান আল্লাহ সেটি শিখিয়েছেন নামাজের প্রতি রাকাতে “ইহদিনাস সিরাতুল মোস্তাকিম” ন্যায় দোয়া পাঠটি বাধ্যতামূলক করে। এখানে ধন-সম্পদ, সন্তান, ঘরবাড়ী ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কোন আকুতি নেই। কোরআনে বর্ণীত সর্বশ্রেষ্ঠ এ দোওয়াটিতে এগুলো গুরুত্ব পায়নি। অথচ আজকের মুসলমানদের কাছে আল্লাহতায়ালার শেখানো প্রায়োরিটিই গুরুত্ব হারিয়েছে। তাই ঘরে ঘরে মোল্লা ডেকে যেসব দোয়ার মজলিস বসানো হয় সেখানে গুরুত্বপায় ধনলাভ, সন্তান লাভ, চাকুরী ও ব্যবসায় উন্নতি লাভের পার্থিব স্বার্থচেতনা। সত্যপথ তথা ‘সিরাতুল মোস্তাকিম’ প্রাপ্তির বিষয়টি সেখানে কোন বিষয় নয়। বরং দোয়ার মহফিল বসানো লোকগুলো মহফিল থেকে বেরিয়েই সজ্ঞানে বেছে নেয় ভ্রান্ত পথে পথ চলা। তারা লাঠি ধরে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের বিরুদ্ধে, এটি কে তারা সাম্প্রদায়ীকতা বলে। বেছে নেয় সেকুলার রাজনীতি, বিজয়ী করে সে রাজনীতির দুর্বৃত্তদের। এবং এভাবে অসম্ভব করে সিরাতুল মোস্তাকিমের প্রতিষ্ঠা। সূদী ব্যাংকে চাকুরী, সেসব ব্যাংকের সাথে লেন দেন, ঘুষ খাওয়া, মহিলাদের বেপর্দা চালচলনের ন্যায় পথভ্রষ্টতাও তখন তাদের জীবনে অলংকারে পরিণত।

বাংলাদেশের মত দেশে পথভ্রষ্টতার শিকার কি শুধু সাধারণ ছাত্র ও আম-জনতা? বরং সে পথভ্রষ্টতা আচ্ছন্ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জাঁদরেল প্রফেসর, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, লেখক,বুদ্ধিজীবী এবং প্রবীন রাজনীতিবিদদেরও। তার প্রমাণ, সমাজতন্ত্রের ন্যায় আবর্জনাকে মাথায় তুলে তারা কিছুদিন আগেও পথে ঘাটে জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়েছে। আর এখন দিচ্ছে জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ ও সেকুলারিজমের নামে। বাংলাদেশে সূদী ব্যাংকের ন্যায় হারাম প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এমনই পথভ্রষ্ট নেতা-কর্মী, বুদ্ধিজীবী ও প্রশাসনের হাতে। এরাই পতিতাবৃত্তির ন্যায় ব্যাভিচারকে দেশ জুড়ে পাহারাদারির ব্যবস্থা করেছে। বিমান বন্দরে মদবিক্রির ন্যায় হারাম কাজটিও তারা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়। এমন একটি পথভ্রষ্ট প্রশাসন, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির কারণে দেশের বিভ্রান্ত জনগণ অতীতে বার বার পরিণত হয়েছে ইয়াজিদদের মত দুর্বৃত্তদের পাহারাদার লাঠিয়ালে। অধিকাংশ মুসলিম ভূমি আজ এদের মত বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদের হাতে অধিকৃত। সাধারণ মুসলমানদের মাঝে ঈমানে উত্তাপ এতটাই ক্ষীণ যে আল্লাহর শরিয়ত আস্তাকুঁড়ে গিয়ে পড়লেও তাদের মাঝে এনিয়ে মাতম জাগে না। শরিয়তের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতেও কোন আগ্রহ জাগে না। বরং শরিয়তের প্রতিষ্ঠার দাবীকে তারা মৌলাবাদ বা জিহাদী ইসলাম বলে। এবং যারা শরিয়তের পক্ষ নেয় তাদের হত্যাকে জায়েজ মনে করে। মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি বাড়াতেই মুসলিম দেশের নগর-বন্দরে ও কোনে কোনে বসছে আনন্দমেলা, উৎসবমেলা, সঙ্গিত মেলা, উলঙ্গ নাচ ও অশ্লিল গানের আসর। এভাবে রাষ্ট্রজুড়ে শুধু পথভ্রষ্টতাই বাড়ানো হয় না, বিপুল ভাবে খরিদদার গড়ে তোলা হয় নিষিদ্ধ পল্লির পতিতাদের।

মিথ্যার এ অন্ধকার দূর করতে হলে দেশজুড়ে আলো জ্বালাতে হবে এবং সে আলো কোরআনী জ্ঞানের। আর আলো জ্বলে উঠলে আধার যত গভীরই হোক তা দূর হতে সময় লাগে না। তাছাড়া নবী(সাঃ)র আমলে আরবে যে অন্ধকার ছিল বাংলাদেশে সে অন্ধকারের গভীরতা এতটা নয়। আলো জ্বালালে ঘুমও ভেঙ্গে যাবে জনগণের। তখন জাগ্রত জনগণ নিজেদের অনন্ত অসীম কালের আখেরাত বাঁচাতে নিজেরাই ময়দানে নেমে আসবে। বাংলাদেশের মত দেশের ১৬ কোটি মানুষের মাঝে যদি ২০ বা ৩০ লাখ মানুষ আল্লাহু আকবর বলে রাস্তায় নেমে আসে এবং আল্লাহর কোরআনী আইনের প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে রাস্তায় অবস্থান নেয় তবে কি কোন সরকার না মেনে পারে? কয়েক লাখ মানুষের রাস্তায় নেমে আসাতেই বহু দেশের বহু সরকারের পতন ঘটেছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে থাইল্যান্ড, ইউক্রেন, রোমানিয়া, জর্জিয়ায় সেটি ঘটেছে। সেটির জন্য কাউকে কোন রক্তদিতে হয়নি, জেলেও যেতে হয়নি। একটি তীরও ছুড়ার প্রয়োজন পড়েনি।


শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় ভোট লাগবে কেন?

মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো, নিজ দায়িত্বে আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠায় জ্বিহাদে নামা। অথচ শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে অনেকেই ভোটে দিতে বলেন। এটি এক ভয়ানক অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি-প্রসূত। যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলমান, নামায-রোযা আদায়ের ন্যায় শরিয়তী-আইন অনুযায়ী বিচারপ্রাপ্তীও তাদের, মৌলিক অধিকার। মুসলিম বিশ্বে বিগত ১৪০০ বছরে অসংখ্য স্বৈরাচার এসেছে। কিন্তু নামায-রোযা আদায়ের ন্যায় শরিয়তী বিধানের প্রয়োগে কোন মুসলিম শাসকই হস্তক্ষেপ করেনি। এটি যেমন মোঘল আমলে ছিল, তেমনি নবাব সিরাজুদ্দৌলার শাসনামলেও। তখন যে ভারতবর্ষে মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত হিন্দুদের চেয়ে বেশী ছিল তাও নয়। শরিয়তি শাসনকে ছিনতাই করেছিল মুসলিম দূষমন ব্রিটিশ সরকার। প্রশ্ন হোল, ছিনতাইয়ের মাল ফেরত নিতে ভোট লাগবে কেন? তাছাড়া যে দেশের জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমান সেদেশে শরিয়তে বিষয়টি ভোটে দিলে সেটি তো জনগণকে বেঈমান ভাবার মত জঘন্য অপরাধ হবে। তাছাড়া এরূপ ভোটে তাদেরকেও মহাবিপদের মুখে ফেলা হবে। এটি কোরআনকে বা নামায-রোযার বিধানকে জনগণের ভোটে অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার মত। জনগণকে এভাবে ভয়ানক ফিতনায় ফেলা হবে। যদি অজ্ঞতার কারণে কেউ যদি শরিয়তের পক্ষে ভোট না দেয়, তবে সে মুরতাদে পরিণত হবে। আর মুরতাদের শাস্তি তো মৃত্যুদন্ড। মুসলমান হওয়ার এটিও শর্ত যে, আল্লাহর সে মৃত্যুদন্ডের বিধানটির বাস্তবায়নেও সে সচেষ্ট হবে। যদি রাষ্ট্র ইসলামের সে বিধানটি বাস্তবায়নে অনাগ্রহী হয় তবে অন্য কোন সংগঠন বা ব্যক্তি সেটির প্রয়োগে আসতে পারে। তখন দেশজুড়ে অরাজকতা বাড়বে। উলামাদের মাঝে নানা বিষয়ে মতভেদ থাকলেও মুরতাদের শাস্তি যে মৃত্যুদন্ড তা নিয়ে কোন কোন মতভেদ নাই। আর মুরতাদ বা কাফের হওয়ার জন্য কি পুরা কোরআনকে অস্বীকার করার প্রয়োজন আছে? কোরআনে বর্নীত আল্লাহর একটি বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাই তো কাফের হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সেটি শরিয়তের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশের মধ্য দিয়েও হতে পারে। এব্যাপারে আল্লাহতায়ালার আয়াত হলো, - “…আল্লাহ যা কিছু (পবিত্র কোরআনে) অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার কার্য পরিচালনা করেনা তারাই কাফের।.... তারাই জালেম। …তারাই ফাসেক।” -সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪, ৪৫, এবং ৪৬। আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন সুস্পষ্ট ঘোষণা আসার পরও কি শরিয়তের প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে মুসলমানদের থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন আছে? এমন প্রশ্ন কাফের দেশে উঠতে পারে, কিন্তু কোন মুসলিম দেশের রাজনীতিতেও কি এটি কোন প্রশ্ন? তাছাড়া নির্বাচন তো অর্থশালী দুর্বৃত্তদের ভোট কেনার বৈধ অধিকার দেয়। তাদের অর্থের সাথে বিপুল অর্থায়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বহু অমুসলিম দেশের, - যারা মুসলিম দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার মধ্যে নিজেদের অকল্যাণ দেখতে পায়। এখানে বিষয় হলো, মুসলমানদেরকে মুসলমান হওয়ার দায়বদ্ধতা বুঝিয়ে দেওয়া। ঈমানদার হওয়ার অর্থ যে শুধু নামায-রোযা আদায় নয়,বরং শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় ময়দানে নামা -সেটি সুস্পষ্ট করা। সেটি বুঝাতে পারলে প্রতিটি ঈমানদার ব্যক্তিই নিজ উদ্যোগে শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় নিজ নিজ সহায়-সম্বল নিয়ে জিহাদে নামবে। এবং সে জিহাদে অর্থদান, শ্রমদান ও প্রাণদানকে জীবনে সবচেয়ে বড় সফলতা গণ্য করবে।

মুসলমানদেরকে তাদের দায়িত্ব বুঝানোর কাজে নামতে হবে পবিত্র কোরআনকে নিয়ে। পবিত্র কোরআনের চেয়ে বিপ্লবী গ্রন্থ কি বিশ্বে দ্বিতীয়টি আছে? মহান আল্লাহর এ গ্রন্থটি পড়ে প্রাথমিক যুগের মুসলমানেরা এতটাই অনুপ্রাণীত হতো যে, খেজুর খেতে বসা ক্ষুদার্ত মানুষটি, জ্বিহাদের ডাক শুনে মুখের খেজুর ফেলে দিয়ে জ্বিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং শহিদ হয়েছে। খেজুর চিবাতে দেরী হয়ে যাবে এবং তাতে দেরী হবে জান্নাতে পৌছতে, সে দেরীটুকুও তাদের সয়নি। মিশর, সিরিয়া, ইরাক, আলজেরিয়া, সূদান, মরক্কো, ইরানসহ ইসলাম যেখানেই গেছে সেখানেই আল্লাহর এ কিতাবটি রাষ্ট্রজুড়ে বিপ্লব এনেছে। মুসলমানের কাজ হলো কোরআনের শিক্ষাকে সর্বজনের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সেটি হলে বাঁকি কাজটুকু কোরআন নিজেই করবে। চারিদিকে ছিটনো বীজের কিছু বীজ পাথরের উপর পড়ে, সেগুলো গজায় না। কিছু বীজ ঝোপঝাড়ে পড়ে, সেগুলো গজালেও প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে উঠেনা। কিন্তু কিছু বীজ উর্বর ভূমিতেও পড়ে। সেগুলো যত্ন পেলে প্রবলভাবে বেড়ে উঠবে এবং উত্তম ফসলও দিবে। তেমনি কোরআনী জ্ঞানের বেলায়ও। তাই স্ট্রাটেজী হতে হবে কোরআনের জ্ঞানকে প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। মু’মিনের জীবনে এর চেয়ে বড় নেকীর কাজ নেই। অন্য কোন মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় কল্যাণকর কাজও নেই। ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের লক্ষ্যে বস্তুতঃ এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই মুসলমানদের জন্য প্রায়োরিটি কোন দলের ক্যাডার হওয়া নয়, পার্টির প্রচার পত্র বিলিও নয়, বরং সেটি হতে হবে পবিত্র কোরআনের নিষ্ঠাবান পাঠক ও প্রচারক হওয়ায়। একমাত্র এ পথেই সে যেমন নিজের জন্য সিরাতুল মোস্তাকিম খুঁজে পাবে তেমনি সেটির সন্ধান দিতে পারবে লক্ষ লক্ষ মানুষের। এটাই তো পয়গম্বরদের কাজ। আর আল্লাহর খলিফা রূপে সে কাজ তো প্রতিটি মুসলমানের।


সংগঠন ছাড়াই সংগঠিত হতে হবে

ইসলামের শত্রুপক্ষের সবচেয়ে বড় শত্রুতা হলো আল্লাহর কেতাবের সাথে। এক্ষেত্রে বিধর্মী কাফের, আগ্রাসী মার্কিনী বা ভারতীয় ও স্বদেশী সেকুলারদের উপলদ্ধি ও স্ট্রাটেজী অভিন্ন। তাই তাদের অভিন্ন কৌশল হলো, মুসলমানদেরকে কোরআন থেকে দূরে সরানো। আল্লাহতায়ালার এ কিতাবের সাথে বাংলাদেশের মুসলমানদের আচরণটি কি কম বেদনাদায়ক? তারা কোরআনের তেলাওয়াতকে যথেষ্ট মনে করেছে, কোরআন বুঝা নয়। দেশে বহু হাজার মাদ্রাসা, লক্ষ লক্ষ মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, কিন্তু তাদের মাঝেই বা ক’জন পুরা কোরআনটি অন্ততঃ একবার বুঝে পড়েছে? ক’জন সে কোরআনের নির্দেশাবলীকে বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছে? শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও ইসলামী রাষ্ট্র বিপ্লবের জন্য কি দেশ তৈরী? একটি দেশ যখন একটি বিপ্লবের জন্য তৈরী হয়ে যায় তখন সেদেশের রাজপথ পূর্ণ হয়ে যায় লাখো লাখো মানুষে। জনতার সে সমুদ্র কি কোন স্বৈরাচারী শাসকের কামান এবং গোলাবারুদ থামাতে পারে? ১৭৮৯ সালের ফরাসী বিপ্লব কালে ফ্রান্সের রাজা যেমন পারেনি, তেমন ১৯১৭ সালে রাশিয়ার জার পারেনি এবং ১৯৭৯ সালে ইরানের শাহও পারেনি। বিপ্লব থামাতে ইরানের শাহ রাস্তায় ট্যাংক নামিয়েছিল। সে ট্যাংকের মোকাবেলা করেছে নিরস্ত্র মানুষের বিশাল জোয়ার। ট্যাংক আর কত মানুষকে হত্যা করতে পারে? ট্যাংকের তলায় বহু হাজার মানুষ পিষ্ট করার পর অবশেষে ট্যাংকের চালকেরাই ক্ষ্যান্ত দিয়েছিল। হাজার হাজার নিরীহ মানুষের হৃদয়-নিংড়ানো রক্ত সে দিন সাধারণ সৈনিকদের বিবেকও জাগিয়ে তোলে। বুঝতে পারে, নিজদেশের নিরপরাধ মানুষ হ্ত্যা কখনই কোন সৈনিকের চাকুরি হতে পারে না। এবং সেটি কি জায়েজ হতে পারে কোন দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারকে বাঁচাতে? এটি তো জঘন্য যুদ্ধাপরাধ। সৈনিকের কাজ তো আগ্রাসী শত্রু হত্যা, নিজ দেশের নিরীহ নাগরিক হত্যা নয়। ফল হলো, শহিদের রক্ত সেদিন ট্যাংকের উপর বিজয়ী হয়েছিল। আর এভাবেই সেদিন মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে সেকুলার, সবচেয়ে স্বৈরাচারি এবং সবচেয়ে পাশ্চাত্য-প্রভাবিত দেশে ইসলামপন্থিদের বিজয় এসেছিল। বিপ্লবের আগে সে দেশে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব এতটাই বেশী ছিল যে হোটেল ও রেস্টুরেন্টগুলোতে পানির চেয়ে মদই বেশী ব্যবহৃত হত। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে সেকুলারিষ্টগণ কি ইরানের সেকুলারিষ্টদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী? মূল পার্থক্যটি হলো, কোরআনের জ্ঞান সে দেশের হাজার হাজার আলেম, নারী-পুরূষ ও যুবক-বৃদ্ধের মনের ভূবনে আমূল বিপ্লব এনেছিল। আর মনের সে ব্যাপক বিপ্লবই তাদেরকে রাষ্ট্রে বিপ্লব আনতে ভীষণ ভাবে উদ্যোগী করে। জনগণের কাছে রাজনীতি তখন পবিত্র জিহাদে পরিণত হয়।

ঘোড়ার আগে গাড়ী জুড়া যায় না। তেমনি জনগণের মনের ভূবনে বিপ্লবে না এনে রাষ্ট্রীয় বিপ্লব অসম্ভব। বিপ্লবের শুরুতে জ্ঞানী বা বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকাটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কোরআনের প্রথম হুকুম “ইকরা” অর্থ “পড়” অবতীর্ণ করে মহান আল্লাহতায়ালা জ্ঞানার্জনের সে গুরুত্বটি সুস্পষ্ট করেছেন। ইসলামী বিপ্লবের ক্ষেত্রে এটি শুরুর দিকের মাইলফলক। একটি দেশে যখন বিপ্লবী চেতনার জোয়ার বইতে থাকে, তখন সে জোয়ারে আন্দোলিত হয় সমগ্র দেশের লোক। আর জ্ঞানের জোয়ার সৃষ্টি করতে কোন দল লাগে না, বিশাল দলীয় দফতরও লাগে না। মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষগুলো গড়ে উঠেছিল তখন যখন তাদের কোন দল এবং কোন দলীয় দফতর ও চেতনা ছিল না। বরং দলীয় চেতনা সব সময় ব্যবহৃত হয়েছে জনগণের স্বাধীন জ্ঞানচর্চাকে ব্যহত করতে। ১৭৮৯ সালে স্বৈরাচারি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সফল ফরাসী বিপ্লব শুরু করতেও কোন রাজনৈতিক দল,দলীয় দফতর বা নেতার প্রয়োজন পড়েনি। মূলে ছিল রুশো-ভল্টেয়ারের ন্যায় বহু দার্শনিকদের বিপ্লবী দর্শন -যাতে গুরুত্ব পেয়েছিল মানুষের সমতা (equality), স্বাধীনতা (liberty) এবং ভাতৃত্বের (brotherhood) ন্যয় বিপ্লবী দর্শন। এ দর্শনের চর্চা যতটা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়েছে তার চেয়ে বেশী হয়েছে নগর-বন্দর, গ্রাম ও মহল্লার হাজার হাজার চায়ের দোকানে, কফি শপে, ক্লাবে ও ঘরোয়া বৈঠকখানায়। ফ্রান্সের প্রতিটি শহর ও প্রতিটি গ্রাম তখন প্লাবিত হয়েছিল এ বিপ্লবী চিন্তায় প্লাবনে। সে প্লাবনে দোল খাচ্ছিল তখন ফ্রান্সের কৃষক-শ্রমিক-যুবক-বৃদ্ধ তথা সর্বস্তরের মানুষ। এক অভিন্ন দর্শন এবং অভিন্ন স্বপ্ন তাদের মধ্যে সেদিন অটুট ঐক্যের জন্ম দিয়েছিল। ঐক্য গড়তে সেদিন কোন দল বা দলের সদস্যপদের প্রয়োজন পড়েনি। মানুষ আদর্শের টানে তখন একতাবদ্ধ হয়েছিল।

১৯৭৯ সালে ইরান-বিপ্লবের নায়ক ইমাম খোমেনীর কোন রাজনৈতিক দল বা দলীয় দফতর ছিল না, ছিল শক্তিশালী একটি দর্শন। সে দর্শন ইরানের বিপুল সংখ্যক জনগণের অন্তরে অভিন্ন স্বপ্ন ও অভিন্ন জীবন লক্ষ্যের জন্ম দিয়েছিল। আর সে স্বপ্নের রাজ্যে ও সে লক্ষ্যে পৌঁছতেই তারা রাজপথে হাজির হয়েছিল। তখন জনতার মাঝে জন্ম নিয়েছিল অটুট একতা। জীবনের দর্শন, স্বপ্ন ও কাঙ্খিত লক্ষ্যটি যখন অভিন্ন হয়, তখন কি একতা গড়তে দলের প্রয়োজন হয়? অনৈক্য তো তখনই অনিবার্য হয় যখন ধর্ম, দর্শন ও বাঁচবার লক্ষ্যটা হয় জনে জনে বিভিন্ন । ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যে চলা লোকগুলো যেমন পৃথক পৃথক ট্রেন বেছে নেয়, তেমনি বিভিন্ন দলও বেছে নেয়। দলাদলিও শুরু হয় বিভিন্ন দর্শনের রাজনীতিতে। নবীজী (সাঃ)র যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদার আমলে মুসলমানদের মাঝে যে একতা গড়ে উঠে তা তো অভিন্ন দর্শন ও লক্ষ্যের কারণে। তখন সে একতা গড়তে কোন দল ময়দানে ছিল না। জীবন-দর্শন অতি শক্তিশালী হওয়ায় সেদিন কোন দলীয় সদস্যপদের বাঁধনে জনগণকে বাঁধার প্রয়োজনও পড়েনি। দলীয় বন্ধন তো তখনই অপরিহার্য হয় যখন চিন্তা-চেতনা ও দর্শন অতি দূর্বল। মুসলিম সমাজে কঠোর দলীয় ক্যাডার পদ্ধতি,  প্রচন্ড ফেরকাপরস্তি ও কট্টোর পীরমুরীদের যে বন্ধন তার কারণ তো দর্শনের এ দূর্বলতা। কোরআনের দর্শন ব্যক্তিকে প্রচন্ড অনুপ্রেরণা দেয় অন্য ভাইয়ের সাথে মিলিত হতে। বহু দিনের হারানো ভাইকে ফিরে পাওয়ার আনন্দটাই ভিন্ন। আর এক মুসলমানকে অপর মুসলমানের ফিরে পাওয়া সেরূপ এক হারানো ভাই বলা হয়েছে। আর সেটি মুখের কথা নয়, কাজের কথাও। মদিনা মহান আনসারেরা তাদের বসত বাড়ীর সমান দুই ভাগ করে মক্কা থেকে আসা তাঁর মোহাজির ভাইকে দিয়েছিলেন, তা তো তেমনি এক গভীর ভাতৃত্ব বোধ থেকেই। অথচ বাংলাদেশে ইসলামের নামে দল গড়া হয়েছে, প্রতি দলে অসংখ্য ক্যাডারও গড়া হয়েছে। কিন্তু তাতে মুসলমানদের একতা বাড়েনি। দেশে ইসলামের বিজয়ও আসেনি। বাড়েনি আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠাও। বরং দল গড়ে জঘন্য কবীরা গুনাহর চর্চা বাড়ানো হয়েছে। আর তা হলো, নিজ দল এবং নিজস্ব মত ও পথের সাথে একমত নয় এমন মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃনা করার অভ্যাস। আর এতে একতার বদলে গভীরতর হচ্ছে অনৈক্য। অথচ একতার বিষয়টি মুসলমানের রাজনীতির বিষয় নয়, এটি এক ধর্মীয় দায়বদ্ধতা। সে দায়বদ্ধতাটি গড়ে উঠে ব্যক্তির মনে ইসলামের দর্শন সবল করার মধ্য দিয়ে। দলীয় এজেন্ডা, দলীয় নেতার দর্শন ও পার্থিব স্বার্থউদ্ধারের দলীয় বিষয়টি গুরুত্ব পেলে সেখানে একতা আসবে কি করে? তখন একতার শূন্যতা দূর করতে সেক্যুলারিষ্টদের ন্যায় তারাও দল ও দলীয় বন্ধনকে গুরুত্ব দেয়।


দর্শনকে নিয়ে যেতে হবে আম-জনতার মাঝে

ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের লক্ষ্যে ইসলামের দর্শনের চর্চা শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, সেটি হতে হবে চায়ের দোকান, ড্রয়িং রুম, পার্ক, কর্মক্ষেত্র, রাস্তাঘাটসহ মানব-মিলনের প্রতিটি অঙ্গণে। আর এজন্য কি দল, দলীয় দফতর, নেতা ও ক্যাডার পদ্ধতির প্রয়োজন আছে? দলীয় পরিচিতি থাকলে দর্শনের প্রসার বরং বাধাগ্রস্ত হয়। যেমন পানিকে পাত্রে ভরলে সেটি আর চারদিকে ছড়ায় না। তাছাড়া দল ও দলীয় নেতার পরিচয়ে ইসলামী রাষ্ট্র বিপ্লবের কাজ শুরু হলে সাথে সাথে সেটি শত্রুর টার্গেটে পরিণত হয়। তখন সে দলীয় নেতাদের ক্রয়ে দুর্বৃত্ত সরকার ও কাফের শক্তির বিপুল অর্থ বিনিয়োগ শুরু হয়ে যায়। অনেকে তখন লাখো টাকায় বিক্রি না হলেও কোটি টাকায় বিক্রি হয়। দুর্বৃত্ত ও আগ্রাসীদের হাতে জঘন্য অপরাধ ঘটলেও অধিক অর্থপ্রাপ্তীর লোভে বিক্রিত হওয়া এসব নেতারা তখন প্রতিবাদে টু’শব্দটি পর্যন্ত করেনা। আফগানিস্তান বা কাশ্মিরে মুসলিম নিধন হলেও তারা রাস্তায় নামে না। শত্রুরা তখন সফলতা পায় ইসলামী দলকে নিষ্ক্রিয় করতে ও নেতাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টিতে। অথচ শুধু দর্শন নিয়ে তৃণমূলে নামলে শত্রুদের জন্য ইসলামের প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়ে। বিপ্লবের বীজ যদি সারা দেশের শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ, প্রতিটি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছড়িয়ে দেওয়া হয় তখন শত্রুপক্ষটি তা খুঁজে পাবে কি করে? তারা তখন সংগঠন খুঁজে পায়না, নেতাও খুঁজে পায় না। যেটি পায় সেটি দর্শন। কিন্তু দর্শনকে কারাগারে আটক করা যায় না, কামানের গোলায় হত্যাও করা যায় না। এমন একটি অবস্থার জন্যই ইরানের বিপ্লবের মুখে ইরানের শাহ ও তার মিত্র মার্কিনীরা দিশেহারা অবস্থায় পড়েছিল। তাছাড়া মুসলমানদের শক্তির মূল উৎস্য তো মহান আল্লাহ। রোড ম্যাপ হলো আল-কোরআন। শত্রুপক্ষ তখন দৃশ্যমান শত্রু না পেয়ে আঘাত হানবে কোরআনী দর্শনের বিরুদ্ধে। এতে সুবিধা হবে ইসলামের পক্ষের শক্তির। তখন লড়াইটি একটি দলের বিরুদ্ধে অন্য একটি দলের না হয়ে হবে সরাসরি ইসলাম সাথে অনৈসলামের। এতে সাধারণ মুসলমানদের সামনে আর এ নিয়ে কোন অস্পষ্টতা থাকবে না, কোন পক্ষে তাদেরকে যোগ দিতে হবে। কোনটি জ্বিহাদ আর কোনটি জ্বিহাদ নয়, -অস্পষ্টতার এ কালো মেঘ তখন মুসলমানদের চেতনার আকাশ থেকে বিলুপ্ত হবে। সূর্যের আলোর মত সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও তখন সুস্পষ্ট হবে। ইসলামি রাষ্ট্র বিপ্লবের পথে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কারণ, ইসলামি রাষ্ট্র বিপ্লবের লড়াইটি যে শতকরা শত ভাগ খালেছ জ্বিহাদ –জনগণে সে ধারণাটিই এ বিপ্লবের জন্য প্রবল শক্তি। শত ভাগ খালেস জিহাদে মুসলমানের কোন কিছু হারানোর ভয় থাকে না। মৃত্যুও তখন মহাবিজয় মনে হয়। মু’মিন তখন দিব্যচোখে দেখতে পায় অফুরন্ত নেয়ামত ভরা জান্নাতের রাজপথ - যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মহান আল্লাহ। মহা আনন্দের সাথে সে দিকেই সে বিদ্যুৎ বেগে ধাবিত হয়। জান্নাতের এক ইঞ্চি ভূমিও হিমালয়-সম সোনা দিয়ে কেনা যায়। অথচ সেখানেই সে পাবে এক মৃত্যুহীন অনন্ত জীবন। দুনিয়াদার সেকুলার মানুষ বেশী টাকার চাকুরি লোভে নিজ দেশ ও নিজ ঘর ছেড়ে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দেয়। অথচ প্রকৃত মুসলমানরা শত শত মাইল ব্যাপী মরুভূমি পাড়ি দেয়, সাগর অতিক্রম করে ১০০% খালেছ জিহাদের ময়দান খুঁজতে।

তবে যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে, জান্নাতই তাদের জন্য একমাত্র প্রতিদান নয়। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে সামরিক বিজয়েরও। সে বিজয়টি ত্বরান্বিত করতে আল্লাহতায়ালা অতীতে হাজার হাজার ফেরেশতাকে রণাঙ্গনে পাঠিয়েছেন। অতীতে আল্লাহর নির্দেশে ক্ষুদ্র পাথরও মিজাইলে পরিণত হয়েছিল। যেমনটি হয়েছিল মক্কার উপর হামলাকারি আবরাহার বিশাল হাতিবাহিনীকে ধ্বংস করতে। শত্রুর ধ্বংসে সাগরও তখন আগ্রাসী রূপ নেয়। এভাবে ধ্বংস করেছিল ফিরাউনের বাহিনীকে। কাফের শক্তির পক্ষে এজন্যই যুগে যুগে অসম্ভব হয়ে পড়েছে প্রকৃত ঈমানদারদের পরাজয় করা। ইখতিয়ারউদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির ১৭ জন সৈনিকের ভয়ে বাংলার রাজা পালিয়েছিল তো সেটুকু জানার কারণেই। তবে এরূপ বিজয়ের লাভের জন্য শর্ত হলো, লড়াইকে শতভাগ জ্বিহাদে পরিণত করা। এমপি ও মন্ত্রী হওয়ার স্বার্থে চিহ্নিত সেকুলারদের সাথে যৌথ রাজনীতিকে আর যাই হোক জ্বিহাদ বলা যায় না। এবং তাতে আল্লাহর সাহায্যও আশা করা যায় না। কোন সাচ্চা ঈমানদার কি আল্লাহর দ্বীনের বিদ্রোহীর সাথে কোয়ালিশন গড়তে পারে? ইসলামপীন্থদের এমন আপোষমূলক রাজনীতি মার্কিনীদের থেকে প্রশংসা আনতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সাহায্যও কি তাতে জুটে? আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশিয়ার মত বিশ্বশক্তির পরাজয় এবং পতন হয়েছে তো সে খালেছ জ্বিহাদের কারণে। এমন খালেছ জিহাদ আল্লাহর সাহায্য লাভ অনিবার্য করে তুলে। মহান রাহমানুর রাহীম তেমন সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পবিত্র কোরআনে একবার নয় বহু বার দিয়েছেন। সেরূপ সাহায্যপ্রাপ্তি জুটেছিল বদরের যুদ্ধে। সে সময় মুসলমানদের নিজেদের বিনিয়োগটিও ছিল অতুলনীয়। বদরের যুদ্ধটি মুসলমানদের জন্য ছিল অতিশয় ক্রান্তিকাল। সে যুদ্ধে ৩১৩ জন মুসলমান মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন মক্কার কাফের বাহিনীর বাছাই করা ১ হাজার সৈন্যের বিরুদ্ধে। যে কোন ব্যক্তির এতে ঘাবড়িয়ে যাওয়ারই কথা। তাছাড়া সেদিন মদিনা থেকে তাঁরা পুরাপুরি একটি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে বের হননি। মদিনা থেকে তাঁরা বেরিয়েছিলেন সিরিয়া থেকে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে যে বাণিজ্য-বহর মক্কার দিকে ফিরছিল সেটিকে একটি উচিৎ শিক্ষা দিতে। এটি বুঝাতে যে, মুসলমানদের উপর হত্যা ও নির্যাতনের নীতি অব্যাহত থাকলে মক্কার কাফেরদের রুটি-রুজীর উপরও আঘাত পড়বে। কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্য রকম। ফলে ঘনিয়ে আসে যুদ্ধ। যুদ্ধের শুরুর আগে নবীজী (সাঃ) সাহাবাদের মনের কথা জানতে চাইলেন, বিশেষ করে আনসারদের থেকে। আনসারদের মধ্যে থেকে তাদেরই এক নেতা উঠে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা বনী ইসরাইলের মত নই যে বলবো, আপনি ও আপনার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা অপেক্ষায় থাকলাম। বরং আপনি যদি সাগরেও ঝাঁপ দেন তবুও আপনি আমাদেরকে সাথে পাবেন। এ ছিল সে যুদ্ধে সাহাবাদের বিনিয়োগ। একজন মানুষ এর চেয়ে অধিক কি বিনিয়োগ করতে পারে? তাদের সে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্তিকেও সুনিশ্চিত করেছিল। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তার সে সাহায্য প্রেরণের কথা বলছেন এভাবে,“আর বদরের যুদ্ধে যখন তোমরা হীনবল ছিলে আল্লাহ তো তোমাদেরকে সাহায্য করেছিলেন। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।”- সুরা আল ইমরান, আয়াত ১২৩। “স্মরণ কর, যখন তুমি মু’মিনদেরকে বলছিলে, ”তোমাদের জন্য কি যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের প্রতিপালক তিন সহস্র ফেরেশতা নাযিল করে তোমাদেরকে সহায়তা করবেন?”- সুরা আল ইমরান, আয়াত ১২৪। “হ্যাঁ নিশ্চয়ই, যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং সাবধান হয়ে চল তবে তারা দ্রুতগতিতে তোমাদের উপর আক্রমণ করলে আল্লাহ পাঁচ হাজার চিহ্নিত ফিরিশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন।”-সুরা আল ইমরান, আয়াত ১২৫। যুদ্ধ শেষে মুসলমানগণ সেদিন রণাঙ্গণে অনেক ছেড়া মস্তক পেয়েছিলেন যাতে কোন ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল না। বলা হয়, এগুলো ছিল ফিরেশতাদের দ্বারা ছিন্ন লাশ।  

আল্লাহর সাহায্যের বরকতেই ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী পরাজিত করেছে বিশাল রোমান বাহিনীকে। পরাজিত করেছে সে আমলের বিশ্বশক্তি পারস্য সাম্রাজ্যকে। মুসলমানদের লড়াই কোন ভাষা, ভূগোল বা সম্পদের বিবাদ নিয়ে ছিল না। ছিল না কোন ব্যক্তি বা রাজ পরিবারের সাম্রাজ্য বাড়াতে। বরং সে লড়াই ছিল আল্লাহর জমিনে তাঁরই শরিয়তী বিধান প্রতিষ্ঠার। এ লড়াইগুলো ছিল পরিপূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের। এ লড়াই মহান আল্লাহর ইচ্ছা “লি ইউযহিরাহু আলাদ্দীনে কুল্লিহী” অর্থাৎ সকল ধর্ম ও জীবনদর্শন বা ইজমের উপর ইসলামকে বিজয়ী করার। ফলে এ লড়াইয়ের চেয়ে খালেছ জিহাদ আর কি হতে পারে? এমন লড়াইয়ে মহান আল্লাহতায়ালা তার ফেরেশতাদের জমিনে নামিয়ে সাহায্য করবেন– তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? যে ব্যক্তি সন্দেহ করে তাকে কি মুসলমান বলা যায়? সেটি তো কোরআনী সত্যের অস্বীকার। ইসলামকে বিজয়ী করার লড়াই তো খোদ মহান আল্লাহর। ফলে এমন লড়াইয়ে বিজয় আনার বিষয়টি একান্তই তাঁর। ঈমানদারগণ সে লড়াইয়ে আল্লাহর সাহায্যকারি মাত্র। আর এরূপ সাহায্যকারী হওয়ার মধ্য দিয়েই চুড়ান্ত পরীক্ষাটি হয় বান্দাহর ঈমানদারীর। নইলে সে কাজটি মহান আল্লাহর সামান্য নির্দেশেই হতে পারতো। ইসলামের শেষ নবী (সাঃ)এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু মহান রাব্বুল আলামীন তো আছেন। এবং চিরকাল থাকবেন। আছে তাঁর বিশাল ফেরেশতা বাহিনীও। মুসলমানদের হাতে রোমান সাম্রাজ্য পরাজিত হয়েছে, রোমান রাজধানী কন্সটান্টিনোপল দখল হয়েছে, পারস্য ও সোভিয়েত রাশিয়ার মত বিশ্বশক্তি পরাজিত ও বিলুপ্ত হয়েছে - তা তো নবী (সাঃ)এর ইন্তেকালের পর। তবে সাহায্য প্রেরণের আগে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলমানদের নিজস্ব বিনিয়োগটি দেখতে চান। সে দেখাটিই মহান আল্লাহর সর্বকালের সূন্নত। তাই ইসলামী রাষ্ট্র বিপ্লবের কাজের শুরু হতে হবে মহান আল্লাহর এ মিশনে ঈমানদারদের নিজস্ব বিনিয়োগ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে। সেটি নিজেদের সময়, মেধা, শ্রম, অর্থ ও রক্তের বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে। এরপরই শুরু হয় মহান আল্লাহর বিনিয়োগ। তখন শুরু হয় লাগাতর বিজয়ও। মহান আল্লাহ সে বিজয়ের খোশখবর শুনিয়েছেন এভাবে, “তোমরা হীনবল হয়ো না, দুঃখিতও হয়ো না। তোমরাই বিজয়ী, যদি তোমরা মু’মিন হও।”-সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৩৯। ফলে তখন যেটি শতভাগ অসম্ভব হয় তা হলো পরাজয়। পবিত্র কোরআনে সে সুখবরটিও এসেছে এভাবে, “আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করলে তোমাদের উপর জয়ী হবার কেউ থাকবে না।”- সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৬০। আর প্রকৃত ঈমানদারদের বিজয় সে সুনিশ্চিত এবং পরাজয় যে অসম্ভব সেটি শুধু পবিত্র কোরআনের শিক্ষাই নয়, মুসলিম ইতিহাসেরও। মুসলমানদের আজকের সকল ব্যর্থতা ও পরাজয়ের কারণ ইসলামের ব্যর্থতা নয়। ব্যর্থতা নয় রোড ম্যাপের। বরং এ ব্যর্থতার কারণটি হলো, নিজেদের প্রকৃত মুসলমান রূপে বেড়ে না উঠায়। সেটি সিরাতুল মোস্তাকিম থেকে পথভ্রষ্টতায়। এরই ফলে বিপুল বিফলতা বেড়েছে নিজেদের কল্যানে নিজেদের জানমালের বিনিয়োগে। যা উচিত ছিল তার উল্টোটি হয়েছে। বিশাল শ্রম, অর্থ ও মেধার বিনিয়োগ বেড়েছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে দুর্বৃত্তি ও পাপাচার বাড়াতে। ফলে দুনিয়ার ব্যর্থতার সাথে বেড়ে চলেছে আখেরাতে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাও। তাই বিজয় আনতে হলে বিপুল বিনিয়োগ বাড়াতে হবে মুসলমানদের প্রকৃত ঈমানদার রূপে গড়ে তোলায়। নইলে রাজনীতির সংস্কার, অর্থনীতির সংস্কার, শিক্ষার সংস্কার বা সাংস্কৃতিক সংস্কার -কোন সংস্কারই সফল হবে না। ইসলামের নামে গন্ডায় গন্ডায় দল গড়েও তখন লাভ হবে না। যারা ইসলামী রাষ্ট্র বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন অন্ততঃ তাদের চেতনায় এ সত্য বিষয়গুলোকে সূর্য্যের ন্যায় সব সময় জ্বল জ্বল থাকা উচিত। ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের সমগ্র পথটি চলতে হবে সে জ্ঞানের আলোতেই। নইলে অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতেও অসম্ভব হবে পথভ্রষ্টতা ও পরাজয় এড়ানো ।

 

 



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.