Home লড়াই ও রাষ্ট্রবিপ্লব জামায়াতে নীতি বদলের সুর
জামায়াতে নীতি বদলের সুর PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Saturday, 10 March 2012 11:13

বাদ পড়ছে কি শরিয়তের প্রতিষ্ঠা?

সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর নেতা জনাব ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের একটি প্রবন্ধ গত ৬ই ফেব্রেয়ারি, ২০১২ তারিখে দৈনিক নয়া দিগন্তে ছাপা হয়েছে। উক্ত প্রবন্ধে জনাব আব্দুর রাজ্জাক এমন কিছু কথা লিখেছেন যা জামায়াতের কোন নেতা এর পূর্বে এতটা স্পষ্ট ভাবে পত্রিকায় লেখেননি। ক্যাডার ভিত্তিকে সংগঠনে এমন বক্তব্য দলীয় প্রধান ছাড়া অন্য কেউ দেয় না। তাছাড়া তিনি জামায়াতের কোন অবাধ্য নেতাও নন। হতে পারে তিনি যা লিখেছেন তা শুধু তাঁর নিজের কথা নয়,নেতাদেরও কথা। দলের প্রধান প্রধান নেতাকর্মীরা জেলে থাকায় তাদের পক্ষ হয়ে কথা বলার দায়িত্ব হয়তো তাঁকে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া কারারুদ্ধ বড় বড় নেতাদের তিনিই উকিল। নেতাদের উকিল হয় তিনি আদালতে কথা বলছেন। তবে কি এখন নেতাদের পক্ষ থেকে জামায়াত কর্মী এবং জনগণের সামনেও বলা শুরু করেছেন?

 

 

জামায়াতের দ্বিধা-দ্বন্দ মূলতঃ দুটি বিষয়ে। এক; শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, দুই,একাত্তরের ভূমিকা। জামায়াত তার রাজনৈতিক শত্রুদের পক্ষ থেকে প্রচণ্ড হামলা ও নিন্দার মুখে পড়ে মূলতঃ এ দুটি বিষয়ে। এতকাল প্রতিটি নির্বাচনে তারা আল্লাহর আইন এবং সৎলোকের শাসনের কথা বলে ভোট চেয়েছে। আল্লাহর আইনের অর্থ শরিয়তের আইন।। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল পাশ্চাত্যশক্তির দৃষ্টিতে চরমপন্থি এবং শত্রু রূপে চিন্হিত হওয়ার জন্য অস্ত্রহাতে মার্কিনীদের সামনে জিহাদে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই,শরিয়তের আইন প্রতিষ্ঠার কথা মুখে আনাই যথেষ্ঠ। শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকামী এরূপ ইসলামি শক্তির নির্মূলে কোন সরকার যদি উদ্যোগ নেয়,তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,ভারত,ইসরাইলসহ তাবত ইসলামবিরোধী শক্তি সে সরকারকে পার্টনার রূপে গ্রহণ করে। সর্ব-প্রকার সাহায্য-সমর্থনও জুগায়। নিজেরাও যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও ড্রোন নিয়ে হাজির হয়। যেমনটি আফগানিস্তানে হচ্ছে। তাদের পার্টনার সরকারটি যত স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিষ্টই হোক সেটি তাদের কাছে গৌণ হয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সকল ইউরোপীয় শক্তিবর্গ মিসরের হোসনী মোবারক, তিউনিসিয়ার বিন আলি, ও আলজেরিয়ার জেনারেলদের স্বৈরাচারি শাসনের শেষদিন পর্যন্ত সমর্থণ দিয়েছে তো একারণেই। একই কারণে অতীতে ইরানের শাহকেও সমর্থন দিয়েছিল। আল্লাহর শরিয়তী আইন প্রতিষ্ঠার মধ্যে তারা নিজেদের পাপাচারপূর্ণ সংস্কৃতি ও সভ্যতার মৃত্যু দেখতে পায়। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি নিয়ে গ্লোবাল ভিলেজ নির্মানের স্বপ্ন এতে নস্যাৎ হয়ে যায়। মার্কিন প্রফেসর মি.হান্টিংটন তাঁর “ক্লাশ অব সিভিলাইশন” বইতে যে সভ্যতার সংঘাতের কথা বলেছেন সেটি সেক্যুলার মুসলমানদের সাথে পাশ্চাত্যের সংঘাত নয়। বরং তাদের সে লড়াই শরিয়তের অনুসারিদের বিরুদ্ধে। এ লড়াই তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি বাঁচানোর লড়াই।

 

২০০১সালের ১১ই সেপ্টেম্বরেরর পর পৃথিবীর নানা দেশে সে যুদ্ধ শুরুও হয়ে গেছে। বলা যায় এটিই হলো তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ। প্রথম ও বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও এ যুদ্ধ শেষ হওয়ার নাম নিচ্ছে না। এ যুদ্ধের রণক্ষেত্র ও ফ্রন্টলাইন শুধু আফগানিস্তান,ইরাক, ফিলিস্তিত, কাশ্মির, সোমালিয়া, চেচনিয়া বা পাকিস্তানে সীমিত নয়,বরং বিস্তৃত প্রতিটি মুসলিম দেশে। প্রতিটি মুসলিম দেশে এমন বহু লোকের বাস যারা নামে মুসলিম হলেও ইসলামের শরিয়তী বিধানের প্রচণ্ড বিরোধী। তারা নিজেরাও নিজেদেরকে ইসলামের বিপক্ষ শক্তি রূপে পরিচয় দিয়ে থাকে। এরাই পাশ্চাত্যের বিশ্বস্ত মিত্র। তাদেরকে নিয়ে পাশ্চাত্য গড়ে তুলেছে আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন। এ কোয়ালিশনে আফগানিস্তানে যেমন কারজাই,পাকিস্তানের যেমন জারদারি,বাংলাদেশে তেমনি সেক্যুলার দলগুলির নেতাকর্মীগণ। একাত্তরের ন্যায় চলমান এ যুদ্ধের কম্যান্ড হেডকোয়ার্টার ঢাকায় নয়। কাবুল বা বাগদাদেও নয়,বরং ওয়াশিংটন, দিল্লী ও তেলআবীবে। শেখ হাসিনা ও তাঁর মিত্ররা এ যুদ্ধে পদাতিক সৈন্য মাত্র।  ফলে ১৯৭২ থেকে ৭৫ অবধি দেশের ইসলাম ও ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যে নীতি ছিল এখন সে নীতি আরো কঠোর। সে সময় শেখ মুজিব সরকারি প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রাম থেকে কোরআনের আয়াত খসিয়েছিলেন,এবং সকল ইসলামপন্থিদলকে নিষিদ্ধ করেছিলে। আর এখন শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও জিহাদের ন্যায় ইসলামের মৌল বিশ্বাসকে জঙ্গিবাদ বলে তার চর্চাকে নিষিদ্ধ করেছে। এক কালে পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী কোয়ালিশন মার্কসবাদকে নিজেদের রাজনীতি,অর্থনীতি ও সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ মনে করতো। এখন প্রতিপক্ষ গণ্য করছে তাদের যারা ইসলামের শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চায়।

 

বাস্তবতা হলো,আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নামার অর্থ শুধু দেশীয় সেক্যুলারদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়, রণাঙ্গনে মার্কিনীদের মুখোমুখি দাঁড়ানোও নয়, বরং ভারতসহ সকল অমুসলিম শক্তির প্রতিপক্ষ রূপে দাঁড়ানোও। ফলে শরিয়তের দাবী নিয়ে রাজনীতিতে থাকলে তাদের বিপদ কমবে না,বরং বাড়বে। নূন্যতম হিউমান রাইট্স বা মানাধিকার বলে তাদের ভাগে কিছু নাই। নেতাকর্মীদের পায়ে ডান্ডাবেড়ী পড়ালেও তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশে কোন প্রতিবাদ উঠবে না। বরং দেশে দেশে গোয়ান্তোনামো বে’র আদলে কারাগার বানিয়ে যদি ইসলামের প্রতিষ্ঠাকামী নেতাকর্মীদের আজীবন বিনা বিচারে বন্দী রেখে অত্যাচার করলে বরং বাড়তি সাহায্য মিলবে। যুদ্ধাপরাধী বিচারের নামে জামায়াত কর্মীদের গ্রেফতারের মধ্য সেটি শুরুও হয়েছে। এ  সত্যটি জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক যেমন বুঝেন,তেমনি দলটির বহু নেতাকর্মীও বুঝেন। তাই সে বিপদ কমানোর জন্যই জনাব আব্দুর রাজ্জাক আলোচ্য প্রবন্ধে এতকালের শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দাবী থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

 

 

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জামায়াতে?

জামায়াতের জন্য সমস্যা,তাদের সামনে একাত্তরের ভূমিকা অস্বীকারের উপায় নেই। অপর দিকে মিথ্যার জোয়ারের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াবার মত রাজনৈতিক শক্তি যেমন নাই, তেমনি জুলুম-নির্যাতন সয়ে সত্য কথাগুলো বলার নৈতিক বলও নাই। আরো বাস্তবতা হলো,তাদের কাছে একাত্তর নিয়ে সত্য বলা ছেড়ে দেয়া যতটা সহজ, ততটাই কঠিন হলো মন্ত্রি ও এমপি হওয়ার রাজনীতি ছেড়ে দেয়া। মন্ত্রি ও এমপি হওয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনগণের সাথে একাত্ম হওয়া। এবং একাত্ম হওয়ার জন্য জরুরী হলো জনগণের বিশ্বাসকে গ্রহণ করা। দেশের অধিকাংশ মানুষ যদি মুর্তিপুজারি হয় তবে মুর্তিপুজা নিয়ে তাদের সাথে বিতর্কে নামলে তাতে ভোট জুটে না। বরং মুর্তিপুজা যে শ্রেষ্ঠ ধর্ম সে কথাটি তখন জোরে শোরে বলতে হয়। মুর্তিপুজারিদের ভোটপ্রাপ্তি তখনই নিশ্চিত হয়।একেই বলা হয় রাজনীতিতে গণমুখিতা।শেখ হাসিনা সে গণমুখিতার টানেই দুর্গাপুজার মন্ডপে যান এবং সেখানে গিয়ে দুর্গাকে মা দুর্গা বলেন। এবং একথাও বলেন, “মা দুর্গা গজে চড়ে এসেছে বলেই দেশে ফসল ভাল হয়েছে।” এ কথাটি ২০১১ সালে ঢাকায় পুজামন্ডপে গিয়ে বলেছিলেন যা দেশের পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। যে নেত্রী হিন্দুদের এরূপ পৌত্তলিক বিশ্বাসকে আপন করে নেয়,হিন্দুরা তাকে ভোট না দিয়ে কি জামায়াতকে দিবে? গণতান্ত্রিক রাজনীতি এভাবেই নেতাদেরকে জনগণের বিশ্বাসের স্রোতে ভাসায়। মিসরে যখন ফিরাউনদের শাসন তখন কি সে দেশটি মেধা শূণ্য ছিল? বরং বুদ্ধিমত্তার বিচারে তারা যে সমগ্র বিশ্বমাঝে শ্রেষ্ঠ ছিল তার স্বাক্ষর তো পিরামিড। কিন্তু সে দেশের প্রতিভাবান মানুষের সে বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তা তাদেরকে মিথ্যার গণস্রোত থেকে বাঁচাতে পারিনি। তারাও ফিরাউনকে খোদা রূপে বিশ্বাস করতো। অথচ গণস্রোতের উজানে চলার সাহস দেয় নবী-রাসূলগণ ও তাদের অনুসারিরা। তাই ফিরাউনের দরবারে সে স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্য কথাটি উচ্চারণ করেছিলেন হযরত মূসা (আঃ),তাঁর ভাই হারুন (আঃ) এবং তিনি জন সদ্য মুসলমান -যারা যাদুকর রূপে হযরত মূসা (সাঃ)র সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে ফিরাউনের দরবারে এসেছিল। তাদের সে ঈমান ও সাহসিকতা মহান আল্লাহর কাছে এতটাই ভাল লেগেছিল যে তাদের সে কাহিনী পবিত্র কোরআনে নিজের কালামে পাকের পাশাপাশি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। একবার নয়, বহু বার। এভাবে অমর ও অনুকরণীয় করেছেন সমগ্র মানব জাতির জন্য। অথচ ভোটের রাজনীতিতে এমন আল্লাহমুখী ও সত্যমুখী চেতনা গড়ে উঠে না। আল্লাহকে খুশি করার চেয়ে গুরুত্ব পায় জনগণকে খুশি করা। গণতান্ত্রিক রাজনীতির এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ। বাংলাদেশে একাত্তর নিয়ে যে ধারণাটি প্রবল বিজয়ী সেটি আওয়ামী লীগের। তারা সে চেতনাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে। যে চেতনাকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা কতটা আপন করে নিয়েছেন তার কিছু উদাহরণ নিচে দেয়া হবে। জামায়াত আজ  একাত্তর সত্য ঘটানগুলো যে জনসম্মুখে বলে না তার মূল কারণ জনগণের ভোট হারানোর ভয়। সে সাথে গালী খাওয়ার ভয়। অথচ ইসলামের বিপক্ষশক্তির গালী খাওয়া এবং তাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারানো নবীজী(সাঃ)র সূন্নত। জামায়াতের হাজার হাজার কর্মী একাত্তরে পাকিস্তানের হেফাজত করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছে। প্রাণ দিয়েছে অন্যান্য ইসলামি দলের ও নির্দলীয় হাজার হাজার মানুষ। তাদের অপরাধ তারা ছিল প্যান-ইসলামি চেতনার। একাত্তর নিয়ে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের ভাষ্যকে কবুল করার অর্থ তাদেরকে ভ্রান্ত ও অপরাধী রূপে গণ্য করা।

 

জামায়াতের নেতাকর্মীগণ এখন একাত্তরের নিজেদের ভূমিকার স্মৃতি ভূলতে চান। হয়তো কারণ,সে স্মৃতিতে ভেসে আসে নিজেদের পরাজয়ের স্মৃতি। একাত্তরের ঘটনাবলীর আলোচনা এজন্যই তাদের কাছে সময়ের অপচয় মনে হয়। ফলে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও জানা সত্য কথাগুলো যেমন বলতে চায় না,তেমনি লিখতেও চায় না। তাদের রয়েছে হাজার হাজার নেতা-কর্মী। কিন্তু বিদেশী শর্মিলা বোস যে মাপের একখানা বই লিখলেন তেমন একখানা বইও বিগত ৪০ বছরে তারা জনগণের সামনে পেশ করতে পারেননি। এটি কি কম ব্যর্থতা? অথচ শর্মিলার বোসের চেয়ে হাজার গুণ বেশী তথ্য তাদের জানা। শর্মিলা বোস মাত্র কয়েক মাস কাটিয়েছেন বাংলাদেশে।আর এ স্বল্প সময়েই তিনি বুঝতে পেরেছেন,কতবড় মিথ্যার পাহাড় গড়া হয়েছে একাত্তরকে নিয়ে। কুঠির শিল্পে পরিণত হয়েছে বই লেখার নামে একাত্তর নিয়ে মিথ্যা রটনা। সে মিথ্যার মধ্যেই জামায়াত নেতা-কর্মীদের বছরের পর বছরের বসবাস। অথচ সে মিথ্যার বিরুদ্ধে তাদের পক্ষ থেকে কোন প্রতিবাদ নেই। মিথ্যার বিরুদ্ধে কথা বলা জিহাদ। অথচ জামায়াতের পলিসি, একাত্তরে যা হবার তা হয়ে গেছে,সে সব ভূলে সামনে এগুনোর। একাত্তরের উপর বিতর্ক করে জনগণের সাথে তারা দুরত্ব বাড়াতে চায় না। অথচ একাত্তরের স্মৃতি বাঙালী মুসলমানদের জীবনে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি। এমন স্মৃতি কি চাইলেই ভোলা যায়? যে কোন জাতির জীবনে এরূপ স্মৃতি তো হাজার হাজার বছরবেঁচে থাকে এবং ইতিহাসকে প্রভাবিত করে। তাছাড়া শুধু আজকের রাজনীতি নয়,শত শত বছরের রাজনীতি,চিন্তা-চেতনা ও ইতিহাস নিয়ন্ত্রিত হবে একাত্তরের স্মৃতি থেকে। একাত্তরের সে স্মৃতির উপর গড়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের আজকের সমগ্র রাজনীতি ও সংস্কৃতি। তাছাড়া জাতি কি শুধু বিজয়ের স্মৃতি থেকে প্রেরণা পায়? পরাজয়ের স্মৃতিও অনেক সময় জাতিকে দ্রুত বলবান করে। দেয় নতুন হিকমত, দেয় নতুন দিকনির্দেশনা। অতীতের এমন স্মৃতি থেকেই একটি জাতির মন ও মানস গড়ে উঠে। সে স্মৃতি থেকেই পায় শত্রু-মিত্র সনাক্তের কম্পাস। হাজার বছর আগে ক্রসেড যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু সে স্মৃতি ইউরোপ ও আমেরিকার খৃষ্টানদের স্মৃতিতে আজও  জীবিত। ব্রিটিশদের হাতে ফিলিস্তিন দখলএবং পরবর্তীতে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা এবং মার্কিন বাহিনীর হাতে আফগানিস্তান ও ইরাক দখলের পিছনে যে প্রেরণাটি কাজ করছে, সেটি তো অতীত ক্রুসেডের। জর্জ বুশ তাঁর একবক্তৃতায় তার পরিচালিত যুদ্ধকে ক্রসেড বলে উচ্চারণও করেছিলেন।

 

প্রতি যুদ্ধে দুটি পক্ষ থাকে।সে যুদ্ধ নিয়ে দুটি পক্ষের ভিন্ন বক্তব্য ও ভিন্ন অভিজ্ঞতার স্মৃতিও থাকে। সেটি যেমন এক পক্ষের বিজয়ের,তেমনি অপর পক্ষের পরাজয়ের।সে দুটি ভিন্ন স্মৃতি নিয়ে দুটি পক্ষ শত শত বছরবেঁচে থাকে। সে স্মৃতি নিয়ে দুটি ভিন্ন ইতিহাস,ভ্ন্নি সাহিত্য ও ভিন্ন চেতনা গড়ে উঠে। সেটি যেমন ক্রসেড নিয়ে,তেমনি ১৯৫৭,১৮৫৭, ১৯৪৭ ও ১৯৭১ নিয়েও। তাই তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরেও একাত্তরে এক করুণ স্মৃতি আছে। সেটি ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের পক্ষের পরাজয়ের স্মৃতি, তেমনি ইসলামের বিরুদ্ধে মুসলিম নামধারি সেক্যুলারিস্টদের গাদ্দারীর স্মৃতি।সে সাথে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম শক্তির বিরুদ্ধে কাফের শক্তির আগ্রাসন ও ব্যাপক নাশকতার স্মৃতি। বাংলাদেশের ইসলাম বিরোধী সেক্যুলার পক্ষ যেমন সে যুদ্ধে তাদের বিজয়ের স্মৃতি ধারণ করে হাজার হাজার বেঁচে থাকবে তেমনি পরাজয়ের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকবে ইসলামের পক্ষটিও।কিন্তু তাজ্জবের বিষয়,ইসলামের পক্ষের স্মৃতিটি কি করে ভূলা যায় তা নিয়েই জামায়াতের ব্যস্ততা। অথচ আওয়ামী বাকশালীরা নিজেদের স্মৃতিকে বলবান করতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। তারা জানে এর উপরই তাদের রাজনীতির বাঁচা-মরা। মুর্তিপুজার ন্যায় মিথ্যাকে বাঁচাতে হাজার হাজার মন্দির চাই। লক্ষ লক্ষ পুরোহিতও চাই। তেমনি বাকশালীদের সেক্যুলার চেতনাকে বাঁচাতে হলেও হাজার হাজার বই চাই। মিডিয়া এবং হাজার হাজার সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীও চাই।এজন্যই বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের শতকরা ৯০ ভাগ বই সেক্যুলারিস্টদের লেখা। এক রবীন্দ্রনাথের উপর বছরে শতাধীক বই ছাপা হচ্ছে। অথচ ১৫ কোটি মুসলমানের দেশে তার সিকি ভাগ বইও কি নবীজী(সাঃ)এরজীবনী নিয়ে লেখা হচ্ছে? বুদ্ধিবৃত্তির এমনদৈন্যতায় কি জনতার মনে ইসলাম বাঁচে? শক্তি পায় কি ইসলাম প্রতিষ্ঠার রাজনীতি?

 

প্রশ্ন হলো,ইসলামের বিপক্ষশক্তির সৃষ্ট স্রোতে ভাসায় কি ইসলামপন্থিদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে? আসে কি ইসলামে বিজয়? অথচ মিথ্যার স্রোতে ভাসাটি বহু আগেই শুরু হয়েছে,জামায়াতের পক্ষ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর ও ২৬ শে মার্চ পালন তো তারই প্রমাণ। কিন্তু দুরত্ব তাতেও কমছে না। এখন ভাবছে,চলমান স্রোত ভাসা জনতার কাছে গ্রহনযোগ্যতা বাড়াতে হলে আরেকটু এগুতে হবে। সে ভাবনা থেকেই দলের অনেকেই চাচ্ছে একাত্তরের ভূমিকার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে। সে পরামর্শটিই জনাব আব্দুর রাজ্জাক তাঁর নিবন্ধে রেখেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো,ক্ষমা চাওয়ার চিন্তা তাদের মধ্যে আসে কি করে? একাত্তরে অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নেয়ার অর্থ কি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতা? একাত্তরের আগে কি পূর্ব পাকিস্তান পরাধীন ছিল? পৃথিবীর কোন দেশের কোন দলীলে,কোন বইয়ে বা পত্রিকায় কি পূর্ব পাকিস্তানকে পরাধীন দেশ রূপে দেখানো হয়েছে? দেখানো হয়েছে কি পাকিস্তানের উপনিবেশ হিসাবে? বরং পৃথিবী ব্যাপী দেখানো হয়েছে পাকিস্তানের একটি প্রদেশ রূপে। পাকিস্তানের প্রদেশ হওয়ার অর্থ কি বাঙালীর পরাধীনতা? পশ্চিম বাংলা আজ ভারতভূক্ত একটি প্রদেশ,তাই বলে কি পশ্চিম বাংলা পরাধীন? তাছাড়া ক্ষমা চাইলেও যে তাদের পিছনে ভোটের জোয়ার শুরু হবে সে প্রমাণ কোথায়? সে জোয়ার কি পাকিস্তানেও শুরু হয়েছে? নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ তো অন্যত্র? খুলনার খান আব্দুস সবুর খান মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। তিনি কি একাত্তরের ভূমিকা জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন? অথচ তিনি একাত্তরের পরও সংসদ নির্বাচনে তিনি সিট থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তেমনি কুষ্টিয়ার শাহ আজিজুর রহমান। তিনি পাকিস্তানের পক্ষে বক্তব্য রাখতে একাত্তরে জাতিসংঘে গিয়েছিলেন। কিন্তু সে ভূমিকার জন্য কি ক্ষমা চেয়েছেন? অথচ তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন,এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন।

 

তাছাড়া একাত্তরে বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধীতার অর্থ কি আজকের বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতা? তাহলে তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সবচেয়ে বড় দুষমন হলো ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। তারা তো ১৯৪৭ সালে অখন্ড ভারত নির্মাণে অটল ছিল। আর অখন্ড ভারতে তো স্বাধীন বাংলাদেশের কোন ধারণাই নেই্। বাংলাদেশ ভারতভূক্ত হলে ভারত ভেঙ্গে কি তারা স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মানের অনুমতি দিত? সে অধিকার কি কাশ্মিরীদের দিয়েছে? দিচেছ কি স্বাধীনতাকামী নাগা,মিজো,আসামী ও মনিপুরীদের? বাংলাদেশকে উপনিবেশ করা বা বাঙালীর নির্মূলের জন্য পাকিস্তান গড়া হয়েছিল -এটি কি বিশ্বাসযোগ্য? পাকিস্তান প্রস্তাবের উত্থাপক ছিলেন বাংলার সন্তান শেরে বাংলা ফজলুল হক। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় যে সংগঠনটি নেতৃত্ব দিল সে সংগঠনটির জন্মও ঢাকায়। পাকিস্তানের লক্ষ্য বাঙালী ও বাংলা ভাষার নির্মূল হলে সেটি একাত্তর থেকে নয়, ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু হত। কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর তবে কেন তার স্থানে ঢাকার খাজা নাযিমুদ্দীনকে বসানো হলো? আওয়ামী লীগ নেতা সহরোয়ার্দিকে কেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বানানো হলো? তাছাড়া শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা না দেয়ার অর্থ কি বাঙালীর নির্মূল করা বা পরাধীন করা? শেখ মুজিবের লক্ষ্য কি শুধু পাকিস্তানের ধ্বংস করায় সীমাবদ্ধ ছিল? তাঁর হাতে বাংলাদেশেরও কি কম ক্ষতি হয়েছে? তিনি ভারতের সাথে শুধু আগরতলা ষড়যন্ত্র চুক্তিই করেননি,২৫ সালা দাসত্ব চুক্তিও করেছিলেন।ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন পদ্মার পানি,হস্তান্তর করেছেন বেরুবাড়ি ছিটমহল,ভারতীয় পণ্যের জন্য খুলে দিয়েছেন দেশের সমগ্র সীমান্ত এবং বাংলাদেশের বাজার। ভারতীয় লুন্ঠনকারিদের হাতে দেশকে সঁপে দিয়ে তিনি দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছেন,এবং মৃত্যু ঘটিয়েছেন লক্ষ লক্ষ বাঙালীর। একাত্তরে এমন আত্মবিক্রীত ব্যক্তির ভারতসেবী প্রজেক্টকে সমর্থণ না করার অর্থ কি বাঙালী মুসলমানের স্বাধীনতার বিরোধীতা করা? পাকিস্তানে অনেক অবিচার হয়েছে,কিন্তু সে সব অবিচারের কি কোন শান্তিপূর্ণ সমাধান ছিল না? তাছাড়া অবিচার কোন দেশে নাই? হানাদার ও লুটেরা ভারতীয় সৈন্যদের ডেকে আনা কি এতটাই অনিবার্য ছিল? লুন্ঠনে ভারতীয় বাহিনী যে কতটা নৃশংস ও বেপরওয়া ছিল সেটির প্রমাণ কি বাংলাদেশে তারা রেখে যায়নি? বাংলাদেশে তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বহু হাজার কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র ছিল। সে অস্ত্র ক্রয়ে পূর্ব পাকিস্তানীদের অর্থ ব্যয় হয়েছিল। কিন্তু সে অস্ত্র লুন্ঠন করে তারা নিজ দেশে নিয়ে যায়। তাছাড়া একাত্তরের ঘটনাবলির একটি শরয়তি দিকও রয়েছে। একটি মুসলিম দেশে বিদেশী কাফের সৈন্যদের আগমনকে কি সে দেশের ইসলামী দল সমর্থণ করতে পারে? সেটি তো হারাম। ফলে সেরূপ আগ্রাসনের প্রতি একজন ঈমানদার সমর্থন জানায় কি করে? তাই শুধু জামায়াতে ইসলামী নয়,কোন ইসলামী দলই সেদিন পাকিস্তানের ভূমিতে ভারতের আগমনকে সমর্থণ করেনি। এটি কি অপরাধ?

 

লক্ষ্য ক্ষমতার রাজনীতি

জনাব আব্দুর রাজ্জাকের উপরুক্ত পরামর্শের পিছনে যেটি কাজ করেছে সেটি স্রেফ বিপদ কমানো নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক মহলে গ্রহনযোগ্য হওয়ার বিষয়টিও। এখানে গুরুত্ব পেয়েছে ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি। রাজনীতি যখন নিছক ক্ষমতায় যাওয়ার বাহন হয় তখন অনেক অসত্য কথাকে যেমন মেনে নিতে হয় তেমনি অনেক স্বৈরাচারি দুর্বৃত্ত এবং ইসলাম বিরোধী শক্তির সাথেও আঁতাত করতে হয়।তখন ইসলামি মূল্যবোধ দূরে ছুঁড়ে ফেলা হয়। তেমনি এক প্রয়োজনে জামায়াত যেমন অতীতে আওয়ামী লীগের সাথে জোট বেঁধে আন্দোলনে নেমেছে, তেমনি স্বৈরাচারি এরশাদের অধীনে নির্বাচনেও গেছে। আবার বিএনপির সাথেও জোট বেঁধেছে। সবই ক্ষমতার রাজনীতির স্বার্থে। খালেদে জিয়া প্রথম বার যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন তখন অধ্যাপক গোলাম আযমকে গ্রেফতার করে দীর্ঘদিন জেলে রেখেছিলেন। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে জনাব গোলাম আযম লন্ডনে এসেছিলেন। বিলেতের জামায়াত সমর্থকগণ তখন লন্ডনের কুইন মেরী কলেজের হলে বিশাল অভ্যর্থনা দিয়েছিল। সে অভ্যর্থণা সভাতে তিনি হাসিনাকে ভাল মানুষ বলে প্রশংসা করেছিলেন,এবং শেখ হাসিনা যে তাহাজ্জুদ নামায পড়েন সে সাক্ষ্যও পেশ করেছিলেন। তাঁর সে সাক্ষ্যদানের পিছনে রাজনীতি ছিল। ইংরাজীতে এ্যাপিজমেন্ট বলে একটি কথা আছে। এর অর্থ হলো কারো রাগ বা গোস্বা ভাঙানোর জন্য কিছু করা। আওয়ামী লীগ তখন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি করে জামায়াতের কর্মসূচীকে সর্বস্থানে বাধাগ্রস্ত করছিল। জনাব গোলাম আযাম জামায়াতের প্রতি আওয়ামী লীগের রাগ ভাঙিয়ে সম্পর্ক উন্নোয়নের জন্য এ কথাটি বলেছিলেন। জনাব গোলাম আযম তখন জামায়াতের আমীর। শেখ হাসিনা সম্পর্কে তাঁর এ অভিমত শুনে লন্ডনের জামায়াত সমর্থকগণ সেদিন বিস্মিত হয়েছিল। একই কৌশল নিয়েছিলেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। “দৈনিক প্রথম আলো” পত্রিকাটি ৪ই নভেম্বর ২০০৯ তারিখে খবর ছাপে,"গত ২৫ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জামায়াত আয়োজিত আলোচনা সভায় দলের আমির নিজামী বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রের স্থপতি বলেন। পরদিন তিনি বলেন,"মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা যতটা না শ্রদ্ধা করে, আমি নিজে শ্রদ্ধা করি তার চেয়ে বেশি।" প্রথম আলো একই দিনে আরো লিখেছে,"গত ৬ ফেব্রুয়ারি শিবিরের সমাবেশে জামায়াতের নির্বাহী কমিটির সদস্য জনাব মীর কাসেম আলী বলেন,‘স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপ্ন না দেখলে আমরা ১৪ কোটি মানুষ বঙ্গীয় এই ব-দ্বীপে স্বাধীনতা লাভ করতে পারতাম না।’

 

কথা হলো,একজন মানুষকে শ্রদ্ধা করার অর্থ তার চেহারা-সুরতকে শ্রদ্ধা করা নয়,বরং তার আদর্শকে শ্রদ্ধা করা। শেখ মুজিবের সে আদর্শটি কী? তাঁর সে আদর্শটি তো হলো, ইসলাম প্রতিষ্ঠার রাজনীতি নিষিদ্ধ-করণ,ইসলামপন্থিদের গ্রেফতার,নির্যাতন ও হত্যা। কোন ঈমানদারের কাছে কি তা প্রশংসনীয় হতে পারে? একজন মু’মিন শুধু আল্লাহ-রাসূলের পক্ষেই সাক্ষ্য দেয় না।শয়তানও যে শয়তান, ডাকাতও যে ডাকাত, স্বৈরাচারিও যে স্বৈরাচারি সে সাক্ষ্যটাও তাকে দিতে হয়।কারণ এগুলোও তো সত্য। মু’মিনের উপর এমন সাক্ষ্যদান ফরয। সামনে খুণ বা ডাকাতি হতে দেখেও আদালতে গিয়ে যদি প্রত্যক্ষদর্শি ব্যক্তিটি খুণি ও ডাকাতকে ভাল মানুষ বলে সাক্ষ্য দেয় তবে কি ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পায়? ন্যায় বিচার তো তখন মাঠে মারা পড়ে। তেমনি স্বৈরাচারি শাসককে কেউ যদি জনসভায় ভাল মানুষ বলে সাক্ষ্য তবে কি সৎ লোকের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়? নির্মূল হয় কি দুর্বৃত্তদের শাসন? সাক্ষ্যগোপন করা বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া ইসলামে এজন্য কবীরা গুনাহ। নবীজী (সাঃ) প্রত্যেক ঈমানদারকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে বলেছেন। পারলে অন্যায়কারিকে হাত দিয়ে রুখতে বলছেন। সেটিও সম্ভব না হলে মনের গভীর থেকে ঘৃণা করতে বলেছেন। শুধু মন থেকে ঘৃনার করার সামর্থকে ঈমানের সবচেয়ে নিচের দরজা বলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো,ঘৃনা দুরে থাক ইসলাম বিরোধী দুর্বৃত্ত শাসক বা নেতা-নেত্রীকে যারা জনসম্মুখে প্রশংসা করেন বা ভোট দেন তাদেরকে কি বলা যাবে? নবীজী (সাঃ)র কাছে উত্তম জিহাদ রূপে গণ্য করেছেন জালেম শাসকের বিরুদ্ধে হক কথা বলা। খোলাফায়ে রাশেদার আমলে শৃঙ্খলা বা খলিফার আনুগত্যের নামে মুসলমানদের চোখে ও মুখে টুসি লাগান নেই। বরং চোখ-কান খুলে ইসলামি রাষ্ট্রে সচেতন নাগরিকে দায়িত্ব পালনে উৎসাহি করেছেন। তাই খলিফা নির্বাচিত হওয়ার প্রথম দিনেই হযরত আবু বকর (রাঃ)বলেছিলেন, “আমি যদি কোরআন-সূন্নাহর খেলাফ কিছু করি তবে তোমরা আমরা রুখবে।” মু’মিনকে তাই প্রতি মুহুর্তে ন্যায়কে ন্যায়, অন্যায়কে অন্যায়, দুর্বৃত্তকে দুর্বৃত্ত বলে সাক্ষ্য দিতে হয়। ইসলামে এটিই শাহাদাতে হক তথা সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য। কিন্তু স্বৈরাচারি জালেমদের ভাল মানুষ বললে কি সেটি পালিত হয়?

 

অথচ মুজিব ও শেখ হাসিনার প্রশংসার মধ্যেই জামায়াত নেতারা তাদের স্তুতিকে সীমিত রাখেননি। তারা ময়দানে নেমেছেন প্রশংসার সাথে পোষ্টার নিয়ে। ২০১১ সালে সার্ক গেমস উপলক্ষ্যে জামায়াত কর্মী-সমর্থকদের পরিচালিত ইসলামি বাংক বিপুল অর্থ ব্যয়ে শেখ মুজিবের হাজার হাজার ছবি ছেপে ঢাকা শহরে লাগানোর ব্যবস্থাও করেছে। অধ্যাপক গোলাম আযম, মাওলানা নিজামী ও মীর কাসেম আলী শেখ মুজিব ও শেখ হাসীনার প্রশংসায় যা কিছু বলেছেন এবং ইসলামি ব্যাংকের পক্ষ থেকে যা কিছু করা হয়েছে সেটি ক্ষমতার রাজনীতির স্বার্থে। এসব কিছুর লক্ষ্য,আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মনজয় করা এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের জন্য কিছু জায়গা সৃষ্টি করা। সেটি করা হয়েছে ইসলামের চেতনা থেকে বহু দূর সরে এসে এবং আওয়ামী লীগের সেক্যুলার চেতনার সাথে একাকার হয়ে। বাস্তবতা হলো,সব পশুকে যেমন পোষ মানানো যায় না তেমনি সব রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বন্ধু বানানো যায় না। তাদের রাগও ভাঙানো যায় না। বিশেষ করে লক্ষ্য যখন ইসলামের প্রতিষ্ঠা হয়। বাঘ-ভালুকের নেশাই হলো মনুষ্যশিকার,এবং মানুষের রক্তমাংস ভক্ষন। তাই পোষ-মানাটি এমন হিংস্র পশুদের স্বভাব-বিরুদ্ধ। তেমনি যারা ইসলামের শত্রু এবং শয়তানের অনুসারি তাদের হিংস্রতাটিও কম নয়। নিজেদের রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থেই তারা ইসলামপন্থিদের নির্মূল চায়। তারা জানে সেটি না হলে তারা নিজেরাই নির্মূল হবে। তাই ইসলামপন্থিদের নির্মূলে বিশ্বের তাবত কাফেরশক্তির সাথে তারা জোট বাঁধতেও রাজী। দিল্লির শাসকদের সাথে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের গভীর সম্পর্কের মূল কারণ তো এটাই। ফলে তাদের রাগ ভাঙানোর চেষ্টায় কোন ফল দেয়নি। বরং জামায়াত নেতাদের জেলে যেতে হয়েছে। জামায়াতের সমস্যা এখানে অন্তঃদৃষ্টির।বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি না থাকলেও প্রাণে বাঁচাটি বিপদে পড়ে না। কোটি কোটি মানুষ তো ডিগ্রি ছাড়াই বেঁচে আছে। কিন্তু বাঁচাটি বিপদে পড়ে যদি বিষাক্ত গোখরাকে কেউ চিনতে ব্যর্থ হয়। এচেনার সামর্থটুকু হলো ন্যূনতম লাইফস্কিল। রাজনীতির ক্ষেত্রে সে ন্যূনতম সামর্থটি হল শত্রুকে চেনার সামর্থ।

 

বড় বিচ্যুতিটি ঘটে রাজনীতিতে

সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে বড় বিচ্যুতিটি নামায-রোযা,হজ-যাকাত পালনে আসে না। এমনকি বড় বড় মুনাফিকগণও নামায-রোযা ও হজ-যাকাত পালনে কোরআন-সূন্নাহর বিধানকে পুরাপুরি অনুসরণ করে। তাছাড়া সিরাতুল মোস্তাকীম শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাতে সীমিত নয়,সেটি বিস্তৃত রাজনীতি,সংস্কৃতি,অর্থনীতি,বিচার-আচার,যুদ্ধবিগ্রহ তথা সর্বকর্মে। মুসলমানের জীবনে সবচেয়ে বড় বিচ্যুতিটি আসে রাজনীতি,সংস্কৃতি,অর্থনীতি,বিচার-আচার ও যুদ্ধবিগ্রহের ক্ষেত্রে। কারণ শয়তান এসব ক্ষেত্রে দুনিয়াবী স্বার্থের লোভ দেখায়। আর দুনিয়াবী স্বার্থের সে লোভটি নিয়ে বাঁচাই হলো সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ পার্থিব স্বার্থচেতনা,এখানে বর্জনীয় হলো আখেরাতের ভাবনা। সে পার্থিব স্বার্থ-চিন্তাটি হাজির হয় ব্যক্তিস্বার্থ,পারিবারীক স্বার্থ,আঞ্চলিক স্বার্থ,বর্ণস্বার্থ, গোত্রীয় ও দলীয় স্বার্থের চেতনা নিয়ে। এসব স্বার্থের মোহে ব্যক্তি তখন সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হয়। তখন প্রতিষ্ঠা ন্যাশনালিজম,সোসালিজম,সেক্যুলারিজম,ট্রাইবালিজম,রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের ন্যায় নানা পথভ্রষ্টতা। একজন নামাযী ব্যাক্তি তখন এরূপ সেক্যুলার স্বার্থচেতনায় দুর্বৃত্তকে ভোট দেয়,এবং ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের গলায় ছুড়ি চালায়। আরব বিশ্ব ২২ টুকরায় বিভক্ত হয়েছে এবং পাকিস্তান ভেঙ্গে গেছে তো এরূপ সেক্যুলারদের কারণেই। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে আল্লাহর শরিয়তি বিধান যে ভাবে পরাজিত সেটি কি কাফেরদের ভোটে? এসব বিভ্রান্তদের হাতে রাজনীতি জিহাদ না হয়ে স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ারে পরিণত হয়।

 

যারা প্রকৃত ঈমানদার তারা স্রেফ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনীতি করে না, দল বা জোটও গড়ে না। সে রাজনীতি করে ইসলামের বিজয় আনার জন্য। ক্ষমতায় যাওয়াটি তার কাছে দ্বীন প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার মাত্র -রাজনীতির মূল লক্ষ্য যেমন নয়,তেমনি বাঁচবার মূল লক্ষ্যও নয়। ঈমানদারের রাজনীতি এজন্যই নিছক রাজনীতি নয়,এটি পবিত্র জিহাদ।এ জিহাদ চলে সিরাতুল মোস্তাকীম বেয়ে। তাই পেন্ডুলামের ন্যায় ডানে বামে মু’মিনের রাজনীতি সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে কক্ষ্যচ্যুত হয় না। নীতিও পাল্টায় না। নামাযে যেমন কাফেরদের সাথে কাতার বাঁধা যায় না,তেমনি জিহাদের এ ময়দানটিতে অমুসলমান, সেক্যুলারিস্ট ও ইসলামে অঙ্গিকারহীনদের সাথে নিয়ে দল বা জোট গড়া যায় না। জোট বাঁধতে হয় ইসলামপন্থিদের সাথে,এবং সেটি ইসলামকে বিজয়ী করার স্বার্থে। কিন্তু জামায়াতের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে কখনো বিএনপি, কখনো বা আওয়ামী লীগ, কখোনা বা এরশাদ। নামায-রোযার ন্যায় ইবাদতের আহকাম যেমন একমাত্র ইসলাম থেকেই নিতে হয়, তেমনি ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদেও কোরআন-হাদীসের নির্দেশ মেনে চলতে হয়। তবে ইসলামকে বিজয়ী করার কাজে কোন অমুসলিম যদি সাহায্য দেয় তবে সে সাহায্য নেয়া জায়েজ। তাদের সাথে তখন চুক্তিও করা জায়েজ। নবীজী (সাঃ) নিজেও সেটি করেছেন মদিনার আশেপাশের কাফের গোত্রের সাথে। আফগান মোজাহিদগণ তেমন সাহায্য নিয়েছেন রাশিয়ার পরাজয় ও নিজেদের বিজয় আনতে। কিন্তু অপরাধ হলো, ইসলামে অঙ্গিকারহীনদের বিজয়ী করায় ও তাদেরকে ক্ষমতায় নেয়ার বাহন হওয়া।

 

অনীহা শরিয়ার প্রতিষ্ঠায়

জনাব আব্দুর রাজ্জাক তাঁর নিবন্ধে তিউনিসিয়ার নেতা জনাব রশিদ ঘানুশির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। জনাব ঘানুশি  বলেছেন,“ক্ষমতায় গেলে তার দল ইসলামি শরিয়া বাস্তবায়ন করবে না। তুরস্কের একে পার্টির আদলেই সরকার পরিচালনা করবে।” জনাব রশিদ ঘানুশির কাছে তুরস্কের রজব তৈয়ব এরদোগানের নেতৃত্বাধীন একে পার্টির পলিসি অনুকরণীয় গণ্য হয়েছে। প্রবন্ধে জনাব নাজিমুদ্দিন আরবাকানের চেয়ে তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহগুল ও প্রধানমন্ত্রী রজব তৈয়ব এরদোগানের নীতিকে প্রশংসা করা হয়েছে। আরবাকানের দোষ হলো তিনি সরাসরি ইসলামের কথা বলতেন এবং পাশ্চাত্যের সমালোচনা করতেন। অপরদিকে জনাব আব্দুল্লাহগুল ও জনাব এরদোগানের বৈশিষ্ঠ হলো তারা সেক্যুলারিজমকে নানা ভাবে সমর্থণ করেন। তবে সেক্যুলারিস্টদের কাছে জনাব নাযিমুদ্দিন আরবাকানের আসল দোষ,তিনি তার বিজয়কে ধরে রাখতে পারেননি। তাছাড়া সরাসরি ইসলামের কথা বলায় এবং পাশ্চাত্যের নীতির নিন্দা করার কারণে তিনি মার্কিনীদের কাছে গ্রহণযোগ্যও হতে পারেননি। তুরস্ক ন্যাটোর পার্টনার,দেশটির হাতে রয়েছে ন্যাটোভূক্ত ইউরোপীয় দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক বাহিনী। সেদেশে ক্ষমতায় মসনদে বসার জন্য ন্যাটোর মোড়লদের কাছে গ্রহনযোগ্য হওয়ার বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমীন সম্মন্ধে জনাব আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন,“তারা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির নামে আলাদা একটি প্লাটফর্ম সৃষ্টি করেছেন। ঘোষণা করেছেন একজন ক্যাথলিক খ্রিষ্টানকেও মিসরের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মেনে নিতে তাদের কোনো আপত্তি থাকবে না।”

 

তিউনিসিয়া,মিসর,তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে সংঘটিত বিপ্লবের বিশ্লেষণে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের কাছে যা অত্যাধিক গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো বাংলাদেশে কি করে বিজয়ী হওয়া যায় তা নিয়ে। তাদের কৌশল থেকে বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের তিনি শিক্ষা নেয়ার আহবান জানিয়েছেন। অথচ কোন  বিপ্লবের বিচারে একজন ঈমানদার মুসলমানের কাছে যেটি গুরুত্ব পাওয়া উচিত সেটি কোন দল বা ব্যক্তির বিজয় নয়,এমন কি পাশ্চাত্যের কাছে গ্রহনযোগ্যতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কতটা অর্জিত হলো সেটিও নয়। বরং ইসলামের মৌলনীতিগুলো কতটা বিজয়ী হলো সেটি। আল্লাহতায়ালার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো,বান্দাহ কতটা শক্তভাবে কোরআনকে আঁকড়ে ধরলো এবং ইসলামের শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠায় কতটা আপোষহীন হলো সেটি। নবীজী তাজমহল গড়ায় বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনায় ইতিহাস গড়েননি, বরং ইতিহাস গড়েছেন ফিরাশতুল্য মানুষ গড়ায়। ইতিহাস গড়েছেন আাল্লাহর পরীক্ষায় উত্তির্ণ হাজার হাজার মানুষ সৃষ্টিতে। তিনি সফল হয়েছিলেন জাহান্নামের দিকে ডাকতে বসা লোকদের ব্যবসা বন্ধে। মুসলমানদের কাছে আজও  তো সে সূন্নতই অনুকরণীয়। পবিত্র কোরআনে তো সে কথাটির উপরই জোর দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে,“তোমরাই হচ্ছ শ্রেষ্ঠ জাতি যাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে এজন্য যে,ন্যায়ের নির্দেশ দিবে এবং অন্যায়কে রুখবে।” কিন্তু সে কাজে তুরস্কের একে পার্টির কি আদৌ কোন ইচ্ছা আছে? অন্যায় পাপকর্ম থেকে জনগণকে বাঁচানোর কাজে তাদের যে আদৌ আগ্রহ নাই সেটি বুঝা যায় তুরস্কের রাস্তাঘাটে ও সমুদ্র সৈকতগুলোয় বেপর্দা ও উলঙ্গতা দেখে। সেগুলো আজও  তেমনি উম্মুক্ত যেমনটি সেক্যুলারিস্টদের সময় ছিল। দেশজুড়ে এখনো খোলা রয়েছে অসংখ্য পতিতাপল্লি ও মদ্যশালা। খোলা রাখার পিছনে যুক্তি, তুরস্কের অর্থনীতিকে মজবুত করতে অর্থ চাই। তাই গুরুত্ব পেয়েছে বিশ্বের নানা দেশের ব্যাভিচারি ও মদ্যপায়ীদের জন্য দুয়ার খোলা রাখার নীতি। অন্যায় আর কি রুখবেন? তিনি তো সৈন্য পাঠিয়েছেন মার্কিন বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আফগানিস্তানের স্বাধীনতাকামী মানুষের বুকে গুলি চালানোর জন্য। অথচ আফগানদের অপরাধ,তারা শরিয়তের শাসন চায় এবং মার্কিনী সৈন্যের অধিকৃতি থেকে মুক্তি চায়।

 

তিউনিসিয়ার আন নাহদা পার্টির নেতা জনাব শেখ রশিদ ঘানুশি বলেছেন,তার দল ইসলামি শরিয়া আইনের প্রতিষ্ঠা নিয়ে আগ্রহী নয়। এ আবার কেমন কথা? শরিয়তে প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী না হয়েও তিনি ইসলামী? শরিয়তে অনাগ্রহী এমন মুসলমান কি সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে একজনও পাওয়া যাবে? হযরত আবু বকর (রাঃ)এর সময় অনেকে যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল। এটি ছিল শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, বিদ্রোহের সে অপরাধে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, নবীজী (সাঃ) সময় মুসলমানেরা যাকাতের উঠের সাথে উঠ বাঁধার রশিটিও দিত। আমার খেলাফতের আমলে কেই যদি উঠের সাথে সে রশি দিতে অস্বীকার করে তবে তাকে রেহাই দেয়া হবে না। প্রশ্ন হলো,জনাব ঘানুশি শরিয়তের বদলে তবে কিসে আগ্রহী? এমন কথায় কি মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হতে পারেন? এ দুনিয়ায় বিধান দুই প্রকার। এক). আল্লাহর, দুই). গায়রুল্লাহর তথা শয়তানের। শয়তানী বিধানের মূল কথা হলো,আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তথা অবাধ্যতা। শয়তানের এ দলে ইবলিস একা নয়,আল্লাহর বিধানের সকল অবাধ্যরাই তার অনুসারি। এমন অবাধ্য ও বিদ্রোহী মানুষরা অসম্ভব করে তোলে সিরাতুল মোস্তাকীমের রাজনীতি।

 

মহান আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়। ফলে তাঁর শরিয়তী আইনও এক ও অভিন্ন। কিন্তু গায়রুল্লাহ বহু,তাই শয়তানী আইনের রূপও বহু।কখনো তার পোষাক গণতান্ত্রিক,কখনো বা হাজির হয় রাজতান্ত্রিক,স্বৈরাচারি,সমাজতান্ত্রিক বা জাতিয়তাবাদী রূপ নিয়ে। মানুষ যখনই আল্লাহর আইনকে পরিহার করে তখন তার ঘাড়ে ভর করে শয়তানী বিধান। সমাজে এছাড়া তৃতীয় কোন বিধান নাই। প্রশ্ন হলো, জনাব রশিদ ঘানুশি যদি ইসলামের শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা যদি না ঘটান তবে তিনি কোন আইনের প্রতিষ্ঠা ঘটাবেন? আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা বাদ দিয়ে অন্য আইনে প্রতিষ্ঠা করলে তিনি আল্লাহর দরবারে ইসলামী নেতা বা শেখ রূপে দূরে থাক,ঈমানদারের পরিচয় নিয়ে খাড়া হতে পারবেন কি? তিনি কি সূরা মায়েদার সে আয়াত পড়েননি যাতে অতি স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে, “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করে না তারা কাফের…, তারা জালেম, ... তারা ফাসেক।” –(সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪, ৪৫, ৪৭)।

 

তবে শরিয়তি আইন প্রসঙ্গে জনাব ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের নিজের অভিমতটি কি সেটিও দেখা যাক। কিছু বছর আগে তিন মার্কিনীদের দাওয়াতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি নানা সাংবাদিকদের সাথে কথাও বলেছেন। জামায়াতের শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করতে চায় সে অভিযোগ তুলেছিলেন সাংবাদিকরা। জবাবে তিনি বলেছিলেন, "Shariah law is misinterpreted. It is about fighting poverty, establishing social justice and ensuring the rule of law." এ উদ্ধৃতিটি The Washington Times-এ প্রকাশিত সংবাদ থেকে নেওয়া।  লক্ষ্যণীয় হলো, শরিয়ত যে মহান আল্লাহর কোরআনী আইন সে সত্য কথাটি বলার সাহস তিনি দেখাননি। শরিয়ত নিছক দারিদ্রমোচন কর্মসূচী নয়, নিছক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাও নয়, এটি হলো আল্লাহর আইনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সে কথাগুলো তিনি বলেননি। আল্লাহ, ইসলাম, ইমান ও জ্বিহাদের ন্যায় শরিয়াহও একটি ইসলামি পরিভাষা বা জার্গন যেগুলি উচ্চারণের সাথে সাথে পুরা দর্শনটি চলে আসে, এবং সনাতন ইসলামের প্রতি প্রবল অঙ্গিকারও প্রকাশ পায়। মার্কিনীরা তা বুঝে। জনাব আব্দুর রাজ্জাকও সেটি বুঝেন। তাই ইচ্ছা করেই শরিয়াহ শব্দটি তিনি এড়িয়ে গেছেন। কথা হলো, এভাবে ইসলামের সত্য কথাগুলো লুকিয়ে হয়তো মার্কিনীদের মন জয় করতে পারবেন। কিন্তু আল্লাহকেও কি খুশি করতে পারবেন? মুসলমানের কাজ তো সত্যকে প্রকাশ করা, লুকানো নয় বা বিকৃত করাও নয়।

 

জনাব আব্দুর রাজ্জাকের কাছে যে ভাবনাটি অত্যাধিক গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের সত্বর বিজয়। আরব বিশ্বে ইসলামপন্থিদের বিজয় দেখে তেমন একটি বিজয় তিনি বাংলাদেশেও দেখতে চান।সে লক্ষ্যে কিছু পরামর্শও রেখেছেন। তবে বিজয় নিয়ে তাড়াহুড়ায় আল্লাহর আযাব ডেকে আনে। মুসলমানকে বিজয়ী করার দায়ভার একমাত্র মহান আল্লাহর। মুসলমানের তাড়াহুড়া হতে হবে একমাত্র আল্লাহর হুকুম পালনে ও তাঁর দ্বীনের বিজয়ে কোরবানী পেশে। তখন বিজয় আসে সে কোরবানীর পুরস্কার রূপে। মহান আল্লাহতায়ালা মুসলমানদের বিপুল বিজয় দিয়েছিলেন বদরের যুদ্ধে। এ যুদ্ধে কাফেরদের নেতৃস্থানীয় ৭০ জন নিহত হয়। মক্কার কাফেরগণ বলতে গেলে নেতাশূণ্য হয়ে পড়ে। নেতাদের মাঝে বেঁচে গিয়েছিল একমাত্র আবু সুফিয়ান। সে তখন বাণিজ্যসূত্রে সিরিয়ায় গিয়েছিল। তবে মুসলমানদের সে বিজয় তাদের নিজ-শক্তিতে আসেনি। এসেছিল মহান আল্লাহর সাহায্যের বলে। আর আল্লাহতায়ালার সাহায্য যখন আসে তখন কি পরাজয় আসে? আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সে সাহায্যলাভ ঘটেছিল আল্লাহর উপর তাদের বলিষ্ঠ ঈমান ও কোরবানীর বদলে। নবীজী (সাঃ)কে তাঁর সাহাবীগণ পুরা এক্বীনের সাথে সেদিন বলেছিলেন,“হে আল্লাহর রাসূল আমরা বনি ইসরাইলীদের লোক নই যে বলবো আপনি এবং আপনার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করুন আমরা অপেক্ষায় থাকলাম। বরং আপনি যদি আল্লাহর পথে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন তবে আমরাও আপনার সাথে ঝাঁপিয়ে পড়বো।” বদরের যুদ্ধে যে সাহায্যপ্রাপ্তি ঘটেছিল স্বয়ং আল্লাহতায়ালা তার বিবরণ দিয়েছেন এভাবে, “স্মরণ কর, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে সাহায্যের প্রার্থনা করেছিলে; তখন তোমাদের প্রতিপালক জবাব দিয়েছিলেন, “আমি তোমাদেরকে সাহায্য করবো এক হাজার ফিরিশতা দিয়ে। যারা আসবে একের পর এক সারিবদ্ধ ভাবে।… এবং সাহায্য তো শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে; আল্লাহ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। ” সুরা আনফাল,আয়াত ৯-১০)।

 

তরিৎ বিজয়ের লোভে ঈমানদারেরাও যে অনেক সময় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হয়,মুসলমানদের ইতিহাসে সেটির উদাহরণও আছে। তেমন অবাধ্যতা ঘটেছিল এমন কি নবীজী (সাঃ)র জীবদ্দশায় ওহুদের ময়দানে। আল্লাহতায়ালা মুসলমানদের বিজয় প্রায় দিয়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু বিজয় পুরাপুরি অর্জিত হওয়ার আগেই রণাঙ্গনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের প্রহরার কাজ ছেড়ে দিয়ে সাহাবাগণ গণিমতের মাল সংগ্রহে লেগে পড়েন। অথচ নবীজী (সাঃ)র কড়া হুকুম ছিল সে স্থল ত্যাগ না করার। সুযোগ বুঝে খালেদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে কাফের বাহিনীর সৈন্যরা তখন পশ্চাত ভাগ থেকে হামলা করে, মুসলমানদের হাত থেকে তাদের প্রায় অর্জিত বিজয় অকস্মাৎ ছিনিয়ে নেয়। ওহুদের ময়দানে সেদিন হযরত হামজা (রাঃ)সহ ৭০ জন প্রথম সারির সাহাবা শহীদ হন। আল্লাহর রাসূলের হুকুমের বিরুদ্ধে এমন অবাধ্য আচরনের কারণেই মহান আল্লাহপাক তাদের উপর এক বিপর্যয় চাপিয়ে দেন যাতে তারা শিক্ষা হাসিল করে। মুসলমানদের উপর দুনিয়ার সকল মানুষের নেতৃত্বের দায়িত্ব। তাদের সামনে অবিরাম লড়াই। কিন্তু সে লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য শুরু থেকেই পূর্ণ প্রস্তুতি চাই। আর সে প্রস্তুতির শুরু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতিটি হুকুমের প্রতি বিরামহীন আনুগত্যের মধ্য দিয়ে। সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যে ভয়ানক বিপর্যয় আনবে ওহুদের যু্দ্ধের মূল শিক্ষা তো সেটাই।

 

মু’মিনের জীবনে সাফল্য তো সর্বপ্রকার অবাধ্যতা ও বিচ্যুতি থেকে বাঁচায়। বিচ্যুতি থেকে বাঁচার মধ্যেই তাঁর জান্নাতপ্রাপ্তি। তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় কাজ,সিরাতুল মোস্তাকীমে লাগাতর টিকে থাকা। বিজয় অর্জনটি তার দায়িত্বে পড়ে না,সেটি অর্জিত না হলেও তার কোন ক্ষতি নেই। বিজয় অর্জনের জন্য আলাদা কোন পুরস্কার নাই। বরং মহাক্ষতি তো কোরআন-সূন্নাহর পথ থেকে বিচ্যুতিতে। সে বিচ্যুতি জাহান্নামে পৌঁছায়। তাই প্রকৃত মুসলমানের সর্বক্ষণের ফিকর বিজয় নিয়ে নয়,বরং বিচ্যুতি থেকে বাঁচায়। সিরাতুল মোস্তাকীমে টিকে থাকা এবং বিচ্যুতি থেকে বাঁচার মধ্যেই ঈমানের পরীক্ষা। বিজয় আনাটি পরীক্ষার অংশ নয়। হযরত ইয়াসির (রাঃ),হযরত সুমাইয়া(রাঃ),হযরত হামযা(রাঃ)র মত বহু সাহাবী তো বিজয় দেখে যেতে পারেননি। সে জন্য কি তারা ব্যর্থ? বরং তারা তো চরম বিজয়ী। সুরা সাফে আল্লাহতায়ালা বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট করেছেন। তিনি মু’মিনদের বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ তোমাদেরকে কি এমন ব্যবসার কথা বলে দিব যা তোমাদেরকে কঠিন আযাব থেকে বাঁচাবে? সেটি হলো, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস আনো। এবং জিহাদ করো আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের মাল ও জান দিয়ে। এটিই তোমাদের জন্য কল্যানকর যদি তোমরা বুঝতে। (এমন কাজের বরকতে) তোমাদের গুনাহকে মাফ করে দেয়া হবে এবং প্রবেশ করানো হবে জান্নাতে যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত। এবং দেয়া হবে জান্নাতুল আদেনে তোমাদের জন্য বাসস্থান। এবং (দেয়া হবে) আরো বিষয় যা তোমরা পছন্দ করো তা হলো আল্লহার পক্ষ থেকে সাহায্য ও বিজয়। -(সুরা সাফ,আয়াত ১০-১৩ )। মহান আল্লাহতায়ালার উপরুক্ত ঘোষণায় ঈমানদারের জান্নাতপ্রাপ্তির শর্তরূপে যেটির উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান;এবং তাঁর রাস্তায় আজীবন জিহাদে জানমালের বিনিয়োগ। একমাত্র এ বিনিয়োগের বদলেই ঘটবে জান্নাতপ্রাপ্তি। সে লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়া বা না হওয়ার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। তবে মানুষের জীবনের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়াদী নিয়েও আলীমুল গায়েব মহান আল্লাহতায়ালা বেখবর নন। তিনি জানেন তাঁর বিশ্বাসী বান্দারা তাঁর সাহায্য চায় এবং সে সাথে বিজয়ও চায়। তবে সেটিও যে জুটবে,সে আশ্বাসও তিনি দিয়েছেন। তবে সে বিজয় কোন আরোপিত বিজয় নয়,বরং আসবে মু’মিনের জানমালের বিনিয়োগের পুরস্কার রূপে।

 

কিন্তু বিজয়ের জন্য যারা উদগ্রীব তাদের জীবনে সে বিনিয়োগ কই? বিচ্যুতি থেকে বাঁচার প্রয়াসই বা কই? মর্কিন অধিকৃত আফগানিস্তানে গিয়ে কাফেরদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুসলমান হত্যার কাজটি নিশ্চয়ই আল্লাহর নির্দেশিত পথ নয়। সিরাতুল মোস্তাকীমও নয়। এটি তো চরম বিচ্যুতি। এ যুদ্ধ শুধু আফগান মুজাহিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়,আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধেও। অথচ তুরস্কের সেনাবাহিনী তো সেটিই করছে। এক সময় আফগানিস্তানের ন্যাটো্ বাহিনীর কমান্ডের দায়িত্বে ছিল এক তুর্কী জেনারেল। এমন অপরাধের দায়ভার থেকে তুরস্কের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এরদোগান কি মুক্তি পেতে পারেন? তুরস্কের সমুদ্র সৈকত, নগর-বন্দর, হোটেলগুলি বিদেশী টুরিস্টদের প্রমোদ ভ্রমন ও ব্যাভিচারের জন্য এখনও ততটাই পরিচিত যতটা পূর্ববর্তী সেক্যুলার সরকারগুলির আমলে ছিল। আস্তাকুঁড়ের আবর্জনা যেমন মশামাছি ডেকে আনে,তেমনি বিশ্বের নানা কোন থেকে তুরস্কও ডেকে আনছে লক্ষ লক্ষ যৌনবিলাসী সেক্স ট্যুরিস্টদের। হারাম পথে তাদের জন্য মেহমানদারিও হচ্ছে। অথচ সে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোগান ও তাঁর একে পার্টির রাজনৈতিক কৌশলকে জনাব আব্দুর রাজ্জাক বাংলাদেশের জন্য অনুকরণীয় মডেল রূপে আখ্যায়ীত করেছেন! বিপ্লব নবীজীও এনেছিলেন। বিপ্লবের স্ট্রাটেজী তাঁরও ছিল। তাঁর আমলে অন্যায়-অত্যাচার, উলঙ্গতা, ব্যাভিচার, পতিতাবৃত্তি, সুদী অর্থনীতি, দাসপ্রথা, জুলুমবাজী, সামাজিক অসমতা বিলুপ্ত হয়েছিল। অথচ এক্ষেত্রে এরদোগানের সফলতা কোথায়? অথচ জনাব আব্দুর রাজ্জাক তাঁর প্রবন্ধে এরদোগানের সফলতা নিয়ে প্রশংসা করলেও রাসূলের অনুসৃত স্ট্রাটেজীর কথা একটি বারও উল্লেখ করেননি।

 

বিভ্রান্তি ইসলামের উপলব্ধিতে

পবিত্র কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে জনাব আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন,“দ্বীনের পথে কোনো কাজে সঙ্কীর্ণতা নেই।”-(সুরা হজ ২২:৭৮)। সঙ্কীর্ণতা বলতে তিনি কি বুঝেছেন? প্রশস্ততা বলতেই বা তিনি কি বুঝেছেন? প্রশস্ততার অর্থ যদি আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে আলিঙ্গণ করা হয়,তবে তা তো হারাম। তিনি সুরা আনকাবুতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন,“যারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে আল্লাহ তাদের পথ দেখিয়ে দেন। -(সুরা আনকাবুত ৬৯:২৯)। এটি ঠিক,জনাব এরদোগানের মত ব্যক্তি কোন একটি পথ বেয়েই চলছেন। দুনিয়ার সবাই কোন না কোন পথ বেয়ে চলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সে পথ কি আল্লাহ রাসূলের প্রদর্শিত পথ? প্রদর্শিত সে পথটি কি কখনো সেক্যুলারিজমের পথ হতে পারে? হতে পারে কি ন্যাটোর বাহিনীর সাথ আফগানিস্তানে মুসলিম হত্যার পথ? হতে পারে কি মদ্যসেবী সেক্স-ট্যুরিস্টদের নিজ দেশে আপ্যায়নের পথ? আল্লাহতায়ালা তো উপরুক্ত আয়াতে বলেছেন, তিনি তো তাদেরকে পথ দেখান যারা একমাত্র তাঁর রাস্তায় জিহাদ বা সংগ্রাম করে। কিন্তু যারা লড়াই করে ন্যাটোর বিজয় আনতে বা সেক্যুলারিজমের প্রতিষ্ঠা বাড়াতে বা নিছক দেশে অর্থনৈতিক উন্নত আনতে তাদেরকে কি আল্লাহতায়ালা পথ দেখান?

 

মালয়েশিয়ার ইসলামি দল পিএএস’এর উদাহরন দিয়ে জনাব ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন,“দলটি ইসলামি রাষ্ট্রের কথা বাদ দিয়ে শুধু ন্যায়বিচারের কথাই বলছে।” এ আবার কেমন কথা? তারা কি ইসলাম বাদ দিয়েই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন? এ যেন ইসলাম বাদ দিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা! আর সেটি সম্ভব হলে দ্বীন ইসলামের প্রয়োজনটাই বা কি? সুরা সাফের (৬১:৯) এর বরাদ দিয়ে জনাব আব্দুর রাজ্জাক নিজে রায় দিয়েছেন,“তুরস্ক,তিউনিসিয়া,মালয়েশিয়া,মিসর ও ভারতে ইসলামি আন্দোলনের এই কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের আসল লক্ষ্য হচ্ছে দ্বীনের বাস্তবায়ন।” অথচ তিনি ভূলে গেছেন,এ দলগুলো নিজেরাই বলছে তারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী নয়। আর শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না হলে দ্বীনের বাস্তবায়ন কীরূপে সম্ভব? ইসলামের বিজয় বলতে কি তিনি একে পার্টি (তুরস্ক), আন নাহদা পার্টি (তিউনিসিয়া), ফ্রিডম এ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (মিসর),পিএএস পার্টি (মালয়েশিয়া) ও ওয়েল ফেয়ার পার্টি (ভারত) এর দলীয় মেনিফেস্টোর বাস্তবায়ন বুঝেন? মহান আল্লাহতায়ালা সুরা সাফে ৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “তিনি সেই আল্লাহ যিনি সত্যদ্বীনসহ রাসূল প্রেরণ করেছেন যেন সমগ্র ধর্মের উপর তা বিজয়ী হয় –যদিও মুশরিকদের কাছে তা অপছন্দীয়।” আর দ্বীনের মূল বিষয়টি নিছক নামায-রোযা, হজ-যাকাত নয়,বরং সেটি আল্লাহর পূর্ণ শরিয়তি বিধান মেনে চলা। তাই ইসলামের সাথে যেমন নামায-রোযা ও হজ-যাকাত আসে তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রে ইসলামী শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠার কথাও আসে। মাথা টানলে মুখ,নাক,চোখ ও কান সব কিছু এক সাথে আসার মত ব্যাপার। শরিয়তী বিধান ছাড়া যেমন ইসলাম কল্পনা করা যায় না,তেমনি শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠা ছাড়া ইসলামি রাষ্ট্রেরও কল্পনা করা যায় না। নবীজী (সাঃ) তো সেটিই শিখিয়ে গেছেন। অথচ জনাব আব্দুর রাজ্জাক সে শরিয়ত বাদ দিয়েই ইসলামি রাষ্ট্রবিপ্লবের কথা বলছেন।

 

তিনি লিখেছেন,“কৌশলগত সঠিক সিদ্ধান্ত ছাড়া দ্বীনের বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ধীরগতিতে চলা ছিল রাসূলগণের সবচেয়ে বড় সূন্নত।” এখানে তিনি ধীরগতীতে চলার পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে শরিয়ত বাদ দিয়ে শুধু সুশাসন,অর্থনিতক ও সামাজিক কল্যাণের ন্যায় মত কর্মসূচী নিয়ে এগুতে বলেছেন। লক্ষণীয় হলো,যে ইসলামী বিপ্লব মাত্র ২৩ বছরের মধ্যে শুধু আরব বিশ্বেই বিজয় আনেনি,বরং উত্থান ঘটেয়েছিল একটি বিশ্বশক্তির। নবীজী (সাঃ) তাঁর হিজরতের মাত্র দশ বছরের মধ্যে ৫০টির বেশী যুদ্ধ করেছেন। খন্দরেক যুদ্ধে তাকে আরবদের সম্মিলিত হামলার মুখোমুখি দাড়াতে হয়েছে। বিশাল যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হয়েছে তৎকালীন বিশ্বশক্তি রোমান সেনা বাহিনীর হামলার বিরুদ্ধেও। এর মধ্যে তিনি পুরনো সমাজকে নতুন ভাবে ঢেলে সাজিয়েছেন। শুধু মানুষের ধর্ম পাল্টিয়ে দেননি,পাল্টিয়ে দিয়েছেন সমাজ,শিক্ষা-সংস্কৃতি,মূল্যবোধ,রাজনীতি,বিবাহনীতি,অর্থনীতি, প্রশাসন,আইন –আদালতসহ সবকিছুর। জন্ম দিয়েছেন ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার। অথচ শুরু করেছিলেন মদিনার ন্যায় এক নগন্য গ্রাম থেকে - পৃথিবীর মানচিত্রে তার কোন পরিচয়ই ছিল না। মানব ইতিহাসের আর কোন বিপ্লবই এত দ্রুত এগুয়নি। অথচ এমন এক দ্রুত বিপ্লবকে জনাব আব্দুর রাজ্জাক ধীর গতি সম্প্নন বিপ্লব বলছেন! এবং জামায়াত নেতাকর্মীদের নসিহত করছেন আরো ধীরে গতিতে চলার। অথচ জামায়াতে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ১৯৪১ সালে। প্রতিষ্ঠার পর ৭০ বছর চলে গেছে। কোন দেশ দূরে থাক,কোন থানাতেও ইসলামী বিধানের পক্ষে তারা জনমত গড়ে তুলতে পারেননি। এ সংগঠনটি তো এমনিতেই অতি ধীরে গতিতে এগিয়েছে। তারপরও কি গতি আরো কমাতে হবে? তাছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,ইসলাম হলো মহান আল্লাহর একটি পরিপূণ প্রেসক্রিপশন।একটি প্রেসক্রিপশনে ঔষধ শুধু একটি থাকে না,থাকে অনেকগুলি। পরিপূর্ণ আরোগ্যের জন্য সবগুলো সেবন করতে হয়। কোন একটি বাদ দিলে রোগ সারে না। তাই আল্লাহর দেয়া প্রেসক্রিপশন থেকে শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাত, সম্পদ-বন্টনের আইন, বিয়ে-শাদীর আইন –এরূপ কিছু বিধান নিয়ে এগুলে চলে না। সব গুলো একত্রে নিয়ে এগুতে হয়। জনাব এরদোগান ও জনাব ঘানুশি সবগুলো নিয়ে এগুতে রাজী নন। আর সেটিই জনাব আব্দুর রাজ্জাকের কাছে প্রশংসনীয় মনে হয়েছে।

 

 

নসিহত ক্ষমাভিক্ষার

জনাব আব্দুর রাজ্জাক তার প্রবন্ধে বলেছেন,“অতীতের ভূলের জন্য ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে কোন দোষ নেই।” কিন্তু সেটি কোন ভূল তা নিয়ে সাহস করে তিনি কোন বক্তব্য রাখেননি। সেটি কি একাত্তরে জামায়াতের পক্ষ থেকে অখন্ড পাকিস্তানের প্রতি সমর্থণ? আজ থেকে ৭-৮ বছর আগে জনাব আব্দুর রাজ্জাক একই রূপ কথা লন্ডনে এক সেমিনারে বলেছিলেন। সে সেমিনারে তিনি ইসলামপন্থিদের একাত্তরের ভূলের কথাও বলেছিলেন। সে ভূল স্বীকার করে নেয়াতে দোষ নাই সে কথাও বলেছিলেন। একটি বিষয় এখানে লক্ষণীয়। সেটি হলো, তিনি সবসময়ই একাত্তরের বিচার বিশ্লেষণটি করেন চিন্তা-চেতনার সেক্যুলার মডেল নিয়ে। তার এ বিশ্লেষণে ইসলামী দর্শন কোন গুরুত্বই পায়নি। অথচ বিচারের মডেল পাল্টে গেলে বিচারও পাল্টে যায়। তাই সেক্যুলার মডেলের একজন বিচারকের কাছে একজন পুরুষ ও নারীর সম্মতিতে ঘটিত ব্যাভিচার কোন অপরাধই নয়। বরং সেটি প্রেম। শাস্তি যোগ্য তো নয়ই,বরং প্রশংসনীয়। অথচ বিচারের ইসলামি মডেলে সেটি শুধু নিন্দনীয়ই নয়,হত্যাযোগ্য এক ফৌজদারি অপরাধ। তেমনি চিন্তা-চেতনার সেক্যুলার মডেলধারিদের কাছে ভিন্ন মূল্যায়ন হয় ১৯৭১য়ে ঘটনাবলি নিয়ে। অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নেয়াটি তাদের কাছে গণ্য হয় যুদ্ধাপরাধ রূপে। অথচ ইসলামী বিচারে যে কোন মুসলিম দেশ ভাঙ্গা শুধু একটি হারাম কাজই নয়,গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধও। এ অপরাধ মুসলিম উম্মাহর শক্তিহানীর –এবং সে সাথে কাফের শক্তির শক্তিবৃদ্ধির। তাই এ অপরাধ খোদ আল্লাহতায়ালা ও তার দ্বীনের বিরুদ্ধে। বহু ভাষা-ভাষী উমাইয়া, আব্বাসীয় ও ওসমানিয়া খলিফার বিশাল মানচিত্র যোগাযোগে দুরাবস্থা সত্ত্বেও শত শত বছর অটুট থেকেছে এমন এক চেতনার কারণেই। সে বৃহৎ ভূগোলের পিছনে বিশাল সামরিক বল ছিল না। নইলে সে ভূগোল ভেঙ্গে একশতের বেশী বাংলাদেশ নির্মিত হতে পারতো।

 

 

জনাব ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের বিশ্লেষণে একাত্তরের প্রেক্ষাপট গুরুত্ব পায়নি। এবং গুরুত্ব পায়নি প্যান-ইসলামিক চেতনা এবং দর্শনের বিচার যা ইসলামপন্থিদেরকে একাত্তরে অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নেয়ায় আপোষহীন করেছিল। সে দর্শন ও চেতনা তার মাথায় না থাকার কারণেই তিনি অতি সহজে সিদ্ধান্তে পৌছে গেছেন,জামায়াতের পক্ষ থেকে একাত্তরে ভূল হয়ে গেছে। তিনি এ রায়ও দিয়েছেন, সে ভূলের জন্য মাফ চাওয়ায় দোষ নেই। কোন ঐতিহাসিক ঘটনার বিশ্লেষণে তার প্রেক্ষাপট দেখতে হয়। একাত্তরের প্রেক্ষাপট শুধু একাত্তরে নয়। এ যুদ্ধ ৭ই মার্চ বা ২৬শে মার্চ যেমন শুরু হয়নি তেমনি ১৬ই ডিসেম্বরে শেষও হয়নি। আগরতলা ষড়যন্ত্রই একাত্তরের একমাত্র প্রেক্ষাপট নয়। একাত্তরের ইতিহাসের শুরু তো ১২০২ সালে ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয় থেকে। ইসলামের প্রতিপক্ষটি বাংলার মানুষের ব্যাপক হারে মুসলমান হওয়া নিয়ে যেমন খুশি হতে পারিনি,তেমনি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান সৃষ্টিতেও খুশি হতে পারিনি। তারা তাই ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ যেমন ১৯১১ সালে সে ভন্ডুল করতে পেরেছে তেমনি ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান সৃষ্টিও ১৯৭১ সালে এসে আংশিক ভাবে রদ করতে পেরেছ। এজন্য প্রতিদিনই তাদের বিজয়-উৎসব। ১২০২ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তারা পলাশির নাটক মঞ্চস্থ্য করেছে। আর বাংলার মানুষের মুসলমান হওয়ার প্রতিশোধ নিতে চায় বাংলাদেশীদের ডি-ইসলামাইজড করে। সেজন্যই ডি-ইসলামাইজেশন প্রজেক্ট নিয়ে বাংলাদেশে ময়দানে নেমেছে বহুহাজার এনজিও। ইসলামের বিপক্ষ শক্তিটি এ অব্যাহত যুদ্ধে বিজয়ের জন্য যেমন অসংখ্য মীরজাফর ও ঘসেটি বেগম চায় তেমনি অসংখ্য শেখ মুজিব এবং হাসিনাও চায়। এখন বাংলাদেশে যা চলছে সেটি তো সেই অব্যাহত যুদ্ধেরই ধারাবাহিকতা। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক তার রায়ে এতটা গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি।

 

 

যে কোন ঘটনার বিচার-বিশ্লেষণে আর যে বিষয়টি অতি গরুত্বপূর্ণ সেটি হলো ঘটনার সাথে জড়িতদের মটিভ। জনাব আব্দুর রাজ্জাক একজন আইনবিদ। তার জানা থাকার কথা,আদালতে যে কোন খুনের মামলায় খুনের প্রেক্ষাপট এবং খুনির মটিভ নিয়ে সবচেয়ে বেশী বিচার-বিশ্লেষন হয়। খুনের মটিভ নিয়ে ঠান্ডা মাথায় কোন ব্যক্তি যদি পরিকল্পিত ভাবে হত্যাকান্ড ঘটায় তবে তার শাস্তি সর্বোচ্চ হয়। কিন্তু যার মনে খুনের মটিভই ছিল না,যার মাথায় খুনের চিন্তাই কোন দিন উদয় হয়নি তাকে কি খুনের শাস্তি দেয়া যায়? জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ তারা নাকি বাংলাদেশে স্বাধীনতার বিরোধী। এমন অভিযোগের অর্থ, বাংলাদেশের মানুষকে পরাধীন করার মটিভ নিয়েই তারা একাত্তরে ময়দানে নেমেছিল। এ নিয়ে বিতর্ক নেই,জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দলের নেতাকর্মীগণ একাত্তরে অখন্ড পাকিস্তানে পক্ষে আপোষহীন ছিল। সে অখন্ডতা বজায় রাখার জন্যই বাংলাদেশ সৃষ্টির তারা প্রচন্ড বিরোধীতাও করেছে। কিন্তু তার অর্থ কি এই,তাদের মটিভ ছিল বাংলাদেশের জনগণকে পরাধীন করা? অখন্ড পাকিস্তানের অধীনে থাকার অর্থ যদি বাঙালীর পরাধীনতা হয় তবে সে অপরাধে বিচারের কাটগড়ায় সর্বপ্রথম যাদেরকে হাজির করা উচিত তার হলেন শেখ মুজিব ও তাঁর নেতা সহরোয়ার্দী। কারণ সহরোয়ার্দী যখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী তখন তিনিই মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী পার্টির দিল্লি সম্মেলনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত করার প্রস্তাব আনেন। এবং লাহোর প্রস্তাবে সংশোধনী আনেন। নইলে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে বাংলার পাকিস্তানভূক্তির কোন পরিকল্পনাই ছিল না। আর শেখ মুজিবের অপরাধ,সহরোয়ার্দীর পিছনে তিনি কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” শ্লোগানে বহু মিছিল করেছেন,এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সংগঠিত করেছেন। শেখ মুজিব ও তার আওয়ামী লীগের সহচরগণ সাতচল্লিশের সে প্যান-ইসলামিক চেতনার সাথে গাদ্দারি করেছেন, কিন্তু সে গাদ্দারি জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামি দল করেনি। আর সে গাদ্দারি না করার জন্য তাদেরকে কি স্বাধীনতা-বিরাধী ও যুদ্ধাপরাধী বলা যাবে? পাকিস্তানের অখণ্ডতার সমর্থণে জামায়াত এবং অন্যান্য ইসলামি দলের নেতাকর্মীদের মনে যে মটিভটি কাজ করেছিল জনাব আব্দুর রাজ্জাকের বিশ্লেষণে সেটি গুরুত্ব পেলে তার নিজের মনে এমন পরাজিত মানসিকতা সৃষ্টি হতো না। ইসলামপন্থিদের ভূলও আবিস্কার হতো না। একজন মানুষকে অপরাধী রূপে দন্ডিত করার ষড়যন্ত্রের শুরুটি হয় তার উপর মিথ্যা মটিভ আরোপিত করার মধ্য দিয়ে। তখন শুরু হয় তার নিয়তের উপর হামলা। জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তো সেটিই হচ্ছে।

 

 

কোন আদর্শিক আন্দোলনের সৈনিকের কাছে সবচেয়ে বড় পরাজয়টি হলো তার নীতির পরাজয়। আদর্শিক আন্দোলনের মূল প্রতিরক্ষা তো আসে তার দর্শন থেকে। সে প্রাণ দেয় শুধু মুসলিম ভূমি বাঁচাতে নয়, ইসলামের দর্শন বাঁচাতেও। তাই একাত্তরে বহু নিরীহ রাজাকার বাঙালী জাতিয়তাবাদীদের হাতে নির্মম ভাবে প্রাণ দিয়েছে, সিগেরেটের আগুনে বহু রাজাকারের দেহ দগ্ধ করা হয়েছে তবুও জাতিয়তাবাদের কালেমা “জয় বাংলা” পাঠ করেনি। কারণ সে শ্লোগান মুখে আনলে পরাজয় ঘট্তো তার ঈমানের। কারণ সেটি জাতিয়তাবাদের শ্লোগান, ইসলামের নয়। নবীজী (সাঃ)“জয় আরব”,“জয় ইরান” বা “জয় বাংলা”র মত কোন ভাষাভিত্তিক জাতিয়তাবাদী শ্লোগান তার উম্মতকে শিখিয়ে যাননি। ভাষার সীমারেখা দিয়ে ভূগোল গড়া এবং সে ভূগোলের জন্য প্রাণ দেওয়ার সূন্নতও প্রতিষ্ঠা করেননি। কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে কোন মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেও বলেনি। বরং তাগিদ দিয়েছেন,ভাষা,বর্ণ ও অঞ্চলভিক্তিক ক্ষুদ্রতার উর্দ্ধে উঠে বৃহত্তর মুসলমান উম্মাহ গড়তে। আরব-তুরানী-ইরানী-কুর্দি সবাই মিলে মুসলমানগণ বিশ্বশক্তির জন্ম দিয়েছিল সে শিক্ষার বরকতেই। তাই মুসলমানদের শ্লোগানটি প্রতি যুগেই আল্লাহু আকবার ছিল,জয়বাংলা নয়। জয় ইরান বা জয় ভারতও নয়। সে চেতনাটি লোপ পেলে যা অনিবার্য হয় সেটি অনৈসলামের কাছে আত্মসমর্পণ।বাংলাদেশে ভারতসেবী আওয়ামী বাকশালী চক্র তো সেটিই চায়। একাত্তরের যুদ্ধকে তাই পাঞ্জাবীর বিরুদ্ধে বাঙালীর স্বাধীনতা যুদ্ধ রূপে চিত্রিত করা হলে প্রকৃত সত্যের সাথে সুবিচার হয় না।তাতে ইসলামের শত্রুদের ভয়ানক ষড়যন্ত্রটিও প্রকাশ পায়না। মুজিব সেদিন আবির্ভূত হয়েছিলেন ভারতের সেবাদাস রূপে। আগরতলা ষড়যন্ত্রের সময় সেটি গোপন থাকলেও পরে গোপন থাকেনি। তাই একাত্তরে হিন্দু,খৃষ্টান সোসালিস্ট, নাস্তিক ও সেক্যুলারিস্ট বাঙালীরা মুজিবের সাথে একাত্ম হলেও ইসলামে অঙ্গিকারবদ্ধ বাঙালী মুসলমানদের পক্ষে তাঁর অনুসৃত ভারতমুখি পথে চলা সম্ভব হয়নি। কিন্তু সে জন্য কি তাদেরকে বাঙালীর শত্রু বলা যাবে? অথচ সে প্রকান্ড সত্যকে জনাব আব্দুর রাজ্জাক তাঁর নিবন্ধে এড়িয়ে গেছেন ।

 

 

১৯৪৭ য়ের ন্যায় ১৯৭১য়ে বাংলার মুসলমান দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি সেক্যুলার শিবির, আরেকটি ইসলামী শিবির। সেক্যুলার শিবিরের লোকেরা ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলার পাকিস্তানের যোগ দেয়ার যেমন বিরোধীতার করেছিল তেমনি একাত্তরে বিরোধী ছিল অখন্ড পাকিস্তানে থাকায়। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা যেমন তারা চায়নি, তেমনি দেশটি বেঁচে থাকুক সেটিও চায়নি। অপরদিকে ইসলামপন্থিরা ১৯৪৭ এবং ১৯৭১-য়ে অখন্ড পাকিস্তানের মধ্যে থাকার মধ্যেই বাংলার মুসলমানদের স্বাধীনতার সুরক্ষা ভেবেছিল। তাছাড়া কোন দেশের সংখ্যাগরিষ্ট নাগরিকগণ তাদের নিজ দেশে পরাধীন হয় -রাষ্ট্র বিজ্ঞান সেটি বলে না। নিজের দেশ ভেঙ্গে সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকরা তাই আলাদা হয় না। সে প্রবনতা থাকে বরং সংখ্যালঘিষ্টদের।তাই বাংলাদেশের সেক্যুলার নেতাকর্মীগণ একাত্তরে যেটি করেছেন সেটি শুধু ইসলামবিরোধীই নয়,বিবেকবর্জিতও। একমাত্র ইসলামের শত্রুগণই তাতে খুশি হয়েছে।

 

 

 

কোন দেশে মুর্তিপুজা যখন প্রবলভাবে বেড়ে উঠে তখন শুধু গ্রামে গঞ্জে শুধু মন্দিরই গড়ে উঠে না, সে সাথে বেড়ে উঠে আল্লাহর দ্বীনের উপাসনাকারিদের বিরুদ্ধে নির্মূলের উদ্যোগও। মক্কা থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করা হয়েছিল তো তেমনি একটি চেতনার কারণে। একই কারণে ভারতে মসজিদ ভাঙ্গা হয় এবং মুসলিম বিরোধী দাঙ্গাও হয়। তবে ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে বিপদ বাড়ে শুধু মুর্তিপুজারি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে নয়। সে বিপদ বাড়ে সেক্যুলারিস্ট,সোসালিস্ট,নাস্তিক ও জাতিয়তাবাদীদের সংখ্যাবৃদ্ধিতেও। বাংলাদেশ তো আজ তাদের হাতেই অধিকৃত। ফলে বিপদ বেড়েছে ইসলামের চেতনাধারি মুসলমানদের। এ কারণেই বাংলাদেশে আজ  ইসলামপন্থিরা নিন্দিত হচ্ছে এবং যুদ্ধাপরাধী রূপেও গণ্য হচ্ছে। বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের মূল পরাজয়,তারা হেরে গেছে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে ইসলামের প্যান-ইসলামিক চেতনাকে তুলে ধরতে। অথচ সেটি হলে জনগণের কাছে তখন চরমভাবে ধিকৃত হতো কাফেরদের বন্ধু এবং ইসলামী চেতনাশূণ্য এ জাতিয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টগণ। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের ১৯০ বছর শাসনেও বাংলার মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে এতবড় পরাজয় আসেনি। প্যান-ইসলামিক চেতনা তখনও বেঁচে ছিল। ফলে বাংলার সীমানার বাইরে বসবাসকারি তাদের মুসলিম ভাইদের সাথে মিলে এক পাকিস্তানে গড়ার বিষয়টি তখন গুরুত্ব পেয়েছিল। অথচ আজ  সে প্যান-ইসলামিক চেতনার মৃত্যুর ফলে অপরাধ গণ্য হচ্ছে ১৯৪৭ ও ‌১৯৭১য়ে একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষ নেয়া।

 

সেক্যুলারিস্টদের অপরাধ

অপরাধীদের বিচার না হওয়াটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ। সেটি না হলে অপরাধীরাই নিরাপরাধদের হাতে পায়ে ডান্ডাবেড়ি পড়ায়। ডাকাতদের শাস্তি না দিলে তারা গৃহস্থের হাতে পায়ে রশি বেঁধে ডাকাতি করবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশে তেমন বিচার যেমন আগরতলা ষড়যন্ত্রের অপরাধীদের বিরুদ্ধে হয়নি তেমনি ১৯৭১য়ের ষড়যন্ত্রকারি এবং ১৯৭৪য়ের গণতন্ত্র হত্যাকারির বিরুদ্ধেও হয়নি। ডাকাতপাড়ায় ডাকাতদের বিচার হয় না।তেমনি সেক্যুলারিস্টগণ বিজয়ী হওয়ার ফলে তাদের অপরাধ নিয়েও বিচার বসেনি। বরং জঘন্য অপরাধীরা নন্দিত হচ্ছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ রূপে। এমন এক প্রেক্ষাপটে ফিরাউন তো খোদা বলে গৃহীত হয়েছিল। বাংলাদেশেও বস্তুত তাই হয়েছে। ফলে যিনি গণতন্ত্র হত্যা করলেন,হত্যা করলেন বাকস্বাধীনতা,হত্যা করলেন ৪০ হাজার রাজনৈতিক কর্মী,ভারতের বিকিয়ে দিলেন দেশের ভূমি বেরুবাড়ী,বিলিয়ে দিলেন পদ্মার পানি,ডেকে আনলেন দুর্ভিক্ষ,অভাবে অভাবে জাল পড়তে বাধ্য করলেন মহিলাদের -তাকেও এসব সেক্যুলারিস্টগণ সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালীর খেতাব দিয়েছে। এই হলো বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের বিবেকের মান!

 

পশুর জীবনে পানাহার ছাড়া কোন ভিশন থাকে না। কিন্তু প্রত্যেক বিবেকমান মানুষই ভিশন নিয়ে বেঁচে থাকে। ভিশন হলো কাঙ্খিত ভবিষ্যত নিয়ে এক মানসচিত্র। ঈমানদারের সে মানসচিত্র বা ভিশনে যেমন দুনিয়ার জীবন থাকে তেমনি জান্নাতও থাকে। প্রত্যেকটি সজ্ঞান মানুষের চেতনায় সে চিত্র বা ভিশনটি প্রতিক্ষণ বেঁচে থাকে। এবং প্রতিদিনের কর্মে এবং বেঁচে থাকায় তাকে প্রেরণা জোগায়। তাই ভিশনের মৃত্যু ঘটলে ব্যক্তির বাঁচাটি পশুর বাঁচা থেকে ভিন্নতর হয় না। ভিশনের কারেণ মানুষ শুধু পরিবার গড়ে না, সমাজ এবং রাষ্ট্রও গড়ে। শুধু রুজিরোজগারে নামে না, রাজনীতিতে নামে, এবং যুদ্ধও করে। অর্থব্যয় এবং রক্ত ব্যয়ও করে। শুধু রাষ্ট্রই গড়ে না, উন্নত সংস্কৃতি ও সভ্যতাও গড়ে। বিশ্বে সভ্যতা গড়েছে এমন জাতির সংখ্যা খুবই কম। শুধু ভাষা,বর্ণ বা ভূগোলের পরিচয়ে সেটি সম্ভব হয় না। এজন্য অতি উন্নত আদর্শ লাগে। ইসলাম তেমনই একটা মহান আদর্শ –যা মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া। তাই যারা প্রচন্ড মুসলিম তারা প্রচণ্ড ভিশনারিও। নবীজী (সাঃ)র জীবনে সবচেয়ে বড় সফলতা তিনি সে আদর্শের আলোকে ভিশনারি মুসলমান গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। তারা শুধু নামায-রোযা,দোয়া-দরুদ ও হজ-যাকাতের মাঝে ধর্মকর্মকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শুধু রাষ্ট্রই গড়েননি,গড়ে তুলেছেন তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তি। গড়ে তুলেছেন মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।প্রতি যুগের প্রতিটি মুসলমান এমন এক ভিশন নিয়েই বাঁচবে –সেটিই তো মহান আল্লাহর খলিফা রূপে উপর অর্পিত দায়িত্ব। সে দায়িত্ব কতটা পালিত হলো, পরকালে সে হিসাব প্রতিটি মুসলমানকে দিতে হবে। নবীজী (সাঃ)র প্রায় ৭০ ভাগ সহচর (সাহাবা) শহিদ হয়েছেন তো সে দায়িত্ব পালনের চেতনায়।

 

কিন্তু আজকের মুসলমানদের বড় ব্যর্থতা তারা সে ভিশন থেকে দূরে সরেছে। তাদের চেতনার মানচিত্রের সে স্থানটুকু দখল করে নিয়েছে ন্যাশনালিজম,ট্রাইবালিজম,সেক্যুলারিজম,সোসালিজমের ন্যায় নানা মানবসৃষ্ট মতবাদ যা শুধু ধর্ম-কর্মেই পথভ্রষ্টতা বাড়ায়নি,ভ্রষ্টতা বাড়িয়েছে সভ্যতা গড়ার রাজনীতি থেকেও। ফলে দায়িত্ব পালনের বদলে প্রচন্ড খেয়ানত হয়েছে এক্ষেত্রে। উপরে উঠার বদলে মুসলমানদের জীবনে শুরু হয়েছে লাগাতর পতন যাত্রা। ফল দাঁড়িয়েছে অমুসলমানদের থেকে তারা সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। হিন্দু,খৃষ্টান,ইহুদী,চীনাদের এ পৃথিবীতে নিজ নিজ সভ্যতার পতাকাধারি রাষ্ট্র আছে। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও চীন তেমনি রাষ্ট্র। সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরণের রাষ্ট্রগুলি হলো “মেল্টিং পট”। সিভিলাইজেশনাল স্টেট মানেই মেল্টিং পট। নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মানুষে সেখানে একাকার হয়ে কাজ করে। এরই ফলে বাঙলার এক মুসলমান অতীতে মক্কা বা মদিনায় গিয়ে দোকান বসাতে পারতো। লেবানন বা লিবিয়ার মুসলমান ইস্তাবুলে গিয়ে বাসা বাধতে পারতো। কোন পাসপোর্ট-ভিসার প্রয়োজন পড়তো না। একই চেতনায় বাঙালী,মারাঠী,বিহারী,পাঞ্জাবী,তামিল,গুজরাতি এরূপ নানা ভাষার হিন্দু ভারতে একত্রে বসবাস করছে। নিজেদের নানারূপ বিভক্তি ভূলে হিন্দুস্থানকে একটি বিশ্বশক্তি ও বিশ্বসভ্যতা রূপে প্রতিষ্ঠার জন্য সবাই এখানে একত্রে কাজ করছে। খৃষ্ঠানদের জন্য তেমন রাষ্ট্র হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে ইংরেজ, ফরাসী, জার্মান, ইটালীয়, স্পেনীশ ও অন্যান্য ভাষী খৃষ্টানেরা একত্রে কাজ করছে। অভিভাবক বা রক্ষকে পরিণত হয়েছে সমগ্র পাশ্চাত্য সভ্যতার। তেমনি আরব, ইরানী, রুশ, জার্মান, পোলিশ ভাষী ইহুদী একত্রে কাজ করছে ইসরাইলে। কিন্তু এখানেই মুসলমানদের প্রচন্ড ব্যর্থতা। তেমন সিভিলাজেশনাল রাষ্ট্র অতীতে ছিল, কিন্তু এখন নাই। সেটি সম্ভব হয়নি জাতিয়তাবাদী ও ট্রাইবাল নেতাদের কারণে। মুসলিম দেশে তারা বিভক্তির পতাকাবাহী। তাদের কারণে মুসলমানদের আজ বহু রাষ্ট্র; সে রাষ্ট্রগুলো বহন করছে ভাষা,বর্ণ ও গোত্রভিত্তিক পতাকা। মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যথা নেই। অথচ বিভক্তি গড়া ইসলামে কবীরা গুনাহ।

 

পাকিস্তানের বৃহৎ অঙ্গণে ভাষা,বর্ণ ও ভৌগলিকতার সীমান্ত ডিঙ্গিয়ে যে সিভিলাইজেশনাল স্টেট বানানোর প্রচেষ্টা চলছিল তাতে ভারতীয় হিন্দুরা যেমন খুশি ছিল না,তেমনি খুশি ছিল না খৃষ্টান,ইহুদী এবং ধর্মে অঙ্গিকারহীন বাঙালী সেক্যুলারগণ। খুশি ছিল না কম্যুনিস্টগণও। পাকিস্তান মেনে নেয়া দূরে থাক,বাঙালী কাপালিকরা “পাকিস্তানের কৃষ্টি ও সভ্যতা” নামের একখানি বইও স্কুলে পাঠ্যপুস্তক রূপে মেনে নিতে রাজী হয় নি। এমন বইয়ের বিরুদ্ধে তারা আন্দোলন করেছে এবং সে বই প্রত্যাহার করতে পাকিস্তানে সরকারকে বাধ্য করেছে। পাকিস্তান ধ্বংসে শেখ মুজিবকে তাই পার্টনার পেতে অসুবিধা হয়নি। বরং প্রচন্ড আগ্রহে তারা তাকে নিজ টিমে নিয়ে নেয়। শেখ মুজিবের বড় সাফল্য হলো,বাংলাদেশের ১৫ কোটি মুসলমানদেরকে সে সভ্যতা নির্মানের সে ইসলামী উদ্যোগ থেকে তিনি সরিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছেন। এক্ষেত্রে শেখ মুজিবের অর্জন বিশাল। মিরজাফর একটি মাত্র অঞ্চলের শাসনভার ইংরেজদের হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু শেখ মুজিবের হত্যা করেছেন মুসলিম উম্মাহর বিশ্বশক্তি রূপে বেড়ে উঠার স্বপ্ন। ভারতীয় হিন্দু ও তাদের বাংলাদেশী মিত্রদের বিগত হাজার বছরের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। ফলে একাত্তরের বিজয় নিয়ে ইসলামের শত্রুপক্ষের উৎসবের দিন শুধু ১৬ ডিসেম্বর বা ২৬ই মার্চ নয়,বছরের ৩৬৫ দিনই। প্রতিটি দিনই তাদের বিজয়ের দিন। বিস্ময়ের বিষয়, সে উৎসবে ইসলামপন্থিরাও আজ যোগ দিচ্ছে। একাত্তরে এসছিল তাদের সামরিক পরাজয়, আর এখন এসেছে আদর্শিক ও নৈতিক পরাজয়।  মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্রের ন্যায় বহু ষড়যন্ত্র থেকেই ছাড়া পেয়ে গেছেন। কিন্তু তিনি মুসলিম উম্মাহর শক্তিহানীতে এবং ভারতের শক্তিবৃদ্ধিতে যা কিছু করেছেন তা থেকে কি আল্লাহর দরবারেও ছাড়া পাবেন?

 

তবে বাংলাদেশের মুজিব-অনুসারি সেক্যুলারিস্টদের অপরাধ এবং বিকেহীনতা মিথ্যাচারেও কম নয়। মুর্তি, শাপ-শকুন ও গরু-ছাগলকে ভগবান বানানোর চেয়ে তাদের মিথ্যাচার কম জঘন্য নয়। মিথ্যা বিষের ন্যায় সংহারি। বিষে দেহ প্রাণ হারায়,আর মিথ্যায় ঈমান মারা যায়। মিথ্যাচর্চা আর ঈমান তাই একসাথে বাঁচে না। মিথ্যুকদের দেশে তাই ঈমানহীন দুর্বৃত্তদের সংখ্যা বিপুল ভাবে বাড়ে। এমন দেশ তখন দুর্নীতিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে। নবীজী তাই মিথ্যাকে সকল পাপের মা বলেছেন। ইসলামি শরিয়তে বিষ পান করানোর ন্যায় মিথ্যা বলাও তাই ফৌজদারি অপরাধ। খলিফায়ে রাশেদার যুগে এ অপরাধে চাবুক মারা হত। কোন জাতিকে বাঁচাতে হলে শুধু বিষপান থেকে বাঁচালে চলে না, মিথ্যাচর্চা থেকেও বাঁচাতে হয়। বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি,বরং ভয়ানক ভাবে মিথ্যাকেই আরো বাড়ানো হয়েছে। এবং সেটি জনগণের রাজস্বের অর্থে। স্রেফ মিথ্যাকে বাজারজাত করার লক্ষ্যে লক্ষ লক্ষ বই লেখা হয়েছে। এমন ব্যব্মিথ্যাচর্চায় ফল হলো,মহামারি শুরু হয়েছে দেশবাসীর ঈমান ও আমলে।

 

নানা মিথ্যার ন্যায় যে মিথ্যাটি বাংলাদেশের ঘরে ঘরে প্রবল ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তা হলো একাত্তরের নিহতদের সংখ্যা নিয়ে। বলা হয় একাত্তরে তিরিশ লাখ বাংলাদেশী মারা গেছে। কিন্তু এটি যে প্রকান্ড মিথ্যা,সেটি সনাক্ত করা কি এতই কঠিন? মগজে মিথ্যা ঢুকলে বিচারবুদ্ধির সামর্থও যে বিলুপ্ত হয় তার প্রমাণ হলো এ মিথ্যাটির জনপ্রিয়তা। ১৯৭১য়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি তথা ৭৫ মিলিয়ন। ৭৫ মিলিয়নে তিন মিলিয়ন (৩০ লাখ) মারা গেলে প্রতি গ্রাম ও প্রতি শহরে প্রতি ২৫ জনে ১ জনকে মারা যেতে হয়। যে কোন স্কুল ছাত্রও সেটি বলে দিতে পারে। একজন মানুষের পক্ষে সারা দেশের তথ্য জানা সম্ভব নয়,কিন্তু তার নিজ গ্রামে ও পাশের গ্রামে এবং নিজ শহরে ক’জন মারা গেছে সেটি কি সে জানে না? কোন গ্রামে ও কোন শহরে প্রতি ২৫ জনে এক জন নিহত হয়েছে সে প্রমাণ নেই। সেটি হলে যে গ্রামে ১ হাজার লোকের বাস সে গ্রামে ৪০ জনকে মারা যেতে হয়। হাওর-বাউর,চর,দ্বীপ,নদী-নালা নিয়ে বাংলাদেশ। সে সময় শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ বাস করতো গ্রামে। এমন দেশের ৬৮ হাজার গ্রামের মাঝে ১০ হাজার গ্রামেও কি পাকিস্তান আর্মি পৌছতে পেরেছিল? বিষয়টি কেউ কি এ ভেবে দেখেছে? সত্যের সামান্য আঘাতেই সেটি ভেঙ্গে যায়। মাকড়সার জালের মত অতি দুর্বল হলো মিথ্যার এ জাল। কিন্তু বাংলাদেশে সে সত্যটিকে তুলে ধরারই চেষ্টা হয়নি। বরং শুরু হয়েছে মিথ্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া। অথচ ঈমানদারি হলো সত্য বলা এবং মিথ্যার প্রচারণাকে প্রতিহত করা।

 

কিউবার ন্যায় শতাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে কম্যুনিস্টগণ ক্ষমতায় গেলেও তারা বিশ্বশক্তিতে পরিনত হত না। সেটি সম্ভব হয়েছিল রাশিয়ার ন্যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ দেশ তাদের হাতে যাওয়ায়। শুধু শ্রেষ্ঠ আদর্শের কারণেই একটি দেশ বা জাতি মর্যাদা পায় না। সে লক্ষ্যে বৃহৎ ভূগোল চাই। বৃহৎ সামরিক শক্তিও চাই। সাহাবায়ে কেরাম তাই ইসলামী রাষ্ট্র আরব ভূ-খন্ডে সীমাবদ্ধ রাখেননি,ইরাক, পারস্য,মিসর,তুরস্কের ন্যায় বিশাল ভূ-ভাগকেও তারা ইসলামের পতাকাতলে এনেছিলেন। কাফের শক্তিও তাই মুসলমানের কোরআনে হাত দেয়নি। হাত দিয়েছিল তাদের উসমানিয়া খেলাফতের ভূগোলেবস্তু। সেটিই ছিল এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ রাষ্ট্র। কিন্তু সেটিকে তার কর্তিত করে তিরিশেরও বেশী টুকরায় বিভক্ত করেছে। সেক্যুলারিস্টদের বড় অপরাধ,তারা মুসলমানদের স্বপ্নই কেড়ে নিয়েছে। উপমহাদেশের মুসলমানেরা স্বপ্ন দেখেছিল পৃথিবীর বুকে সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র নির্মানের এবং সে রাষ্ট্রে ইসলামের প্রতিষ্ঠার। স্বপ্ন দেখেছিল, পৃথিবীতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি রূপে আবির্ভাবের। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল বস্তুত তেমনি একটি স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু দেশের সেক্যুলারিস্টরা স্বপ্ন দেখেছিল ভিন্ন ভাবে। সেটি মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে দুরে সরানোর মধ্য দিয়ে। তাদের শক্তিহীন করায়। তেমন একটি স্বপ্ন নিয়েই তারা বাংলাদেশের ১৫ কোটি মুসলমানদের সঁপে দিয়েছে শত্রুর পদতলে। মুসলমানদের কোমরই তারা ভেঙ্গে দিয়েছে। সেটি যেমন মুসলিম মানস থেকে ইসলামকে বিলুপ্ত করে,তেমনি মুসলিম ভূগোলকে খন্ডিত করে। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাদের সম্পদে নয়,জনসংখ্যাতেও নয়। বরং তাদের বিভক্ত ভূগোলে। আর ভূগোলে এ বিভক্তি এসেছে বিদেশী ও দেশী শত্রুদের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের ফলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,চীন,রাশিয়া ও ভারতের চেয়ে অধিক সম্পদ মুসলিম জাহানে, কিন্তু বিভক্ত ভূগোলের কারণে তারা বিশ্বশক্তি হওয়া দূরে থাক ভারতের চেয়েও গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।

 

একাত্তরের ইতিহাসকে বুঝতে হলে দৃষ্টিকে শুধু একাত্তরে সীমাবদ্ধ রাখলে সুবিচার হবে না, আরো গভীরে যেতে হবে। বুঝতে হবে ইসলামপন্থিদের স্বপ্ন এবং সে সাথে সেক্যুলারিস্টদের মটিভ ও অপরাধ। বিশ্বে সর্ববৃহৎ মুসলিম জনসংখ্যার বসবাস ভারতীয় উপমহাদেশে। ফলে তাদের উপর দায়ভারও বিশ্বের অন্য যে কোন মুসলিম দেশের থেকে অধিক। সে দায়ভার পালনের তাগিদে ভারতের মুসলিম মনিষীগণ নানা ভাবে উদ্যোগী হন। সে উদ্যোগে বাঙালী-অবাঙালী মুসলমানের মাঝে কোন বিভেদ ছিল না। এমনই এক উদ্যোগ ছিল খেলাফত আন্দোলন। মুসলমানদের একতার প্রতীক হল খেলাফত। ইসলামের এটি হলো অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যা নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন। সেটি বিলুপ্ত করার বহুদিনের প্রকল্প ছিল কাফেরদের। বহু রক্তব্যায়ে মুসলমানগণ সেটি ১৩শত বছরেরও বেশী কাল বাঁচিয়ে রেখেছিল। কিন্তু অবশেষে বাঁচেনি। খেলাফত বিলুপ্ত হয়েছে শুধু কাফেরদের চেষ্টায় নয়,বরং তাদের ষড়যন্ত্রের সাথে গাদ্দার মুসলমানদের সহযোগিতায়। লক্ষ্যণীয় হলো, সে খেলাফত বাঁচাতে আরব দেশে কোন আন্দোলন হয়নি,বরং সেটি হয়েছে ভারতে। খেলাফত আন্দোলন ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে প্রথম গণআন্দোলন। আরব বিশ্ব তখন গোত্রভিত্তিক,অঞ্চল-ভিত্তিক বিভক্তির নেশায় বিভোর। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের অস্ত্র নিয়ে মক্কার শরিফ হোসেন এবং নযদের সউদ পরিবার তখন তুর্কি মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত করছিল আরব ভূখন্ডকে। লক্ষ্য, তুর্কিদের হটিয়ে তারা নিজেরা রাজা হবে। কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, দুবাইয়ের ন্যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূ-খন্ডের গোত্রপতিরাও তখন আলাদা রাজ্য গড়ার নেশায় পদ-সেবা করছে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীদের। ভারতে তখন মাওলানা মোহম্মদ আলী জওহর ও আল্লামা ইকবালের ন্যায় অসংখ্য চিন্তানায়ক। সে সময় সমগ্র মুসলিম জাহানের আর কোথাও এত চিন্তানায়কের সমাবেশ ছিল না। ভারতীয় মুসলমানদের হাতে তখন ইসলামের নব জাগরণের নেতৃত্ব। অন্য মুসলমানেরা যখন বিভক্তির দিকে,তারা তখন ভাষা,বর্ণ ও আঞ্চলিক ক্ষুদ্রতার উর্দ্ধে উঠে মুসলমানদের একতাবদ্ধ করায় লিপ্ত। মুসলিম ইতিহাসে এটি প্যান-ইসলামিক আন্দোলন রূপে পরিচিত। খেলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যায়। কিন্তু ভারতীয় মুসলামানগণ সে ব্যর্থতার পর বসে থাকেনি। শুরু করে আরেক আন্দোলন। সেটি ছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্যেই তারা মুসলিম সভ্যতার রেনেসাঁর স্বপ্ন দেখতো। সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের নজর তখন পাকিস্তানের দিকে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সে দেশকে নিয়ে তাদের স্বপ্নটা এতই প্রবল ছিল যে মহম্মদ আসাদের ন্যায় প্রখ্যাত ইউরোপীয় নও-মুসলমান পাকিস্তানের সেবার নিজ দেশ ছেড়ে পাকিস্তানে এসেছিল।এসেছিল ভারত,বার্মা থেকেও অনেকে।

 

দুনিয়ার মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ এক শক্তি রূপে আবির্ভূত হওয়ার সে উদ্যোগে থেকে বাংলার মুসলমানগণও সেদিন দূরে থাকেনি। বরং সে রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের লক্ষ্যেই বাংলার মুসলিম নেতাগণ লাহোর প্রস্তাবে সংশোধন এনে বাংলার পাকিস্তান ভূক্তির সিদ্ধান্ত নেন। অখন্ড পাকিস্তান আজ  বেঁচে থাকলে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে দেশটির ৩২ কোটি মুসলমানের যে ভূমিকা হতো তা বাংলাদেশ দূরের কথা,ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক,মিসর,ইরান বা সৌদি আরব কোন কালেও অর্জন করতে পারবে? পাকিস্তানের হাতে আজ  পারমাণবিক অস্ত্র। এ দেশটির প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট বা সংসদ-সদস্য রূপে বাঙালী মুসলমান কি বিশ্বমুসলিমের কল্যানে কি অধিক ভূমিকা রাখতে পারতো না? কিন্তু শক্তিশালী পাকিস্তানের নির্মান ইসলামের শত্রুপক্ষের ভাল লাগেনি। ভাল লাগেনি প্রতেবেশী ভারতেরও। সে প্যান-ইসলামিক প্রজেক্ট থেকে বাঙালী মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করাই ছিল ভারতের স্ট্রাটেজী। এবং সেটি ১৯৪৭ সাল থেকেই। মুজিব একাত্ম হয়েছেন সে ভারতীয় প্রকল্পের সাথে। বাংলার মুসলমানদের সাথে এটিই মুজিব এবং তাঁর সাথীদের সবচেয়ে বড় অপরাধ। ভারতের সাথে মুজিবের সহযোগিতার ফলে নানা ভাষাভাষী মুসলমানদের সম্মিলিত প্রজেক্ট পাকিস্তানই শুধু ভেঙ্গে যায়নি,ভেঙ্গে গেছে বিশ্বমাঝে মুসলমানদের মাথা তুলে দাঁড়াবার সর্বশেষে প্রচেষ্টা। কিন্তু সেক্যুলারিস্টদের সে ঘৃন্য অপরাধ নিয়ে আজ  কোন প্রশ্ন উঠছে না। প্রশ্ন তুলছে না এমনি কি জনাব আব্দুর রাজ্জাকের মত তারাও যারা নিজেদের ইসলামের পক্ষের শক্তি রূপে দাবী করে। বরং অপরাধী সাব্যস্ত করা হচ্ছে তাদের যারা মুসলমানদের কল্যাণ নিয়ে স্বপ্ন দেখতো এবং সে স্বপ্ন পূরণে নিজেদের জানমালের বিনিয়োগও করেছিল।

 

 

ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বড় বিপদটি শুধু ভাষা-ভিত্তিক সংঘাত ও বিভিক্ত নয়,বরং সেটি হলো,কোথায় মুসলমানদের বৃহত্তর স্বার্থ সেটি বুঝবার সামর্থই কেড়ে নেয়। তাদের অন্ধত্ব মনে। অন্ধ হওয়াতে বা হাতপা ভেঙ্গে যাওয়াতে কোন ব্যক্তি এতটা বিকলাঙ্গ হয় না,মুসলিম উম্মাহর জন্য ক্ষতিকরও হয় না। কিন্তু মনের অন্ধত্বের কারণে সে পরিণত হয় ইসলামের এক ভয়ানক শত্রুতে।মুসলিম বিশ্ব আজ  যেরূপ ৫০টির বেশী টুকরায় বিভক্ত ও শক্তিহীন সেটি কাফেরদের কারণে ততটা নয় যতটা এ মনের অন্ধদের কারণে। বিভক্ত ভূগোল সৃষ্টি নবীজীর সূন্নত যেমন নয়,তেমনি সাহাবাদের ঐতিহ্যও নয়। বাংলাদেশের বিপদও দিন দিন ঘোরতর হচ্ছে এদের কারণে। মুসলিম উম্মাহর যে মহা কল্যাণের বিষয়টি মাথায় রেখে ইসলামপন্থিরা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং ১৯৭১ সালে অখন্ড পাকিস্তানের সমর্থণ করেছিল সে দর্শনটি যেমন তারা দেখতে পায়না ও তেমনি বুঝতেও পারেনা। আরো বিপদের কারণ, এমন মনের অন্ধত্ব নেমে এসেছে জামায়াতসহ বহু ইসলামী দলের নেতা-কর্মীদের মনেও। বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের ন্যায় তারাও ইসলামপন্থিদের একাত্তরে অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নেয়ার মধ্যে অপরাধ দেখতে পায়। জনাব আব্দুর রাজ্জাকের নিবন্ধে তো সেটিই মনে হয়।

 

মুসিবত পরিহার না ইসলাম পরিহার?

“মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-মুসিবত বাড়ানোর জন্য আল্লাহ পবিত্র কোরআন নাজিল করেননি” - সুরা ত্বোয়া-হা”র দ্বিতীয় এ আয়াতটি উল্লেখ করেছেন জনাব আব্দুর রাজ্জাক। বুঝাতে চেয়েছেন,ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে নেতা-কর্মীদের উপর মুছিবত বাড়ানো যাবে না। অর্থাৎ শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কথা বলে ইসলামের বিপক্ষ শক্তিকে রাগানো যাবে না,কারণ তাতে জামায়াতের নেতাকর্মীদের উপর জেলজুলুম নেমে আসবে। এখানে গুরুত্ব পেয়েছে,বাতেলী শক্তির সাথে সংঘাত পরিহারের চিন্তা। অথচ আয়াতটির শানে নযুলই ভিন্ন। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত মুফাচ্ছেরে কোরআন মুফতি শফি সাহেব তাঁর “মারেফুল কোরআন” তাফসিরে লিখেছেন,নবীজী(সাঃ)রাতে এত অধীক কাল তাহাজ্জুদ নামাযে দাড়িয়ে কোরআন তেলাওয়াতে করতেন যে তাঁর পায়ের পাতা ফুলে যেত। তাছাড়া কাফেরগণ কেন ইসলাম কবুল করছে না সে ফিকিরেও তিনি সবসময় পেরেশান থাকতেন। তাই আল্লহতায়ালা তাঁকে নসিহত করছেন,সারারাত ধরে নামায আদায় বা কোরআন তেলাওয়াতের প্রয়োজন নেই। কাফেরগণ ইসলাম কবুল করছে না তা নিয়ে এত পেরেশান হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাই এ আয়াত পেশ করে ইসলামী বিপ্লবের কঠিন পরীক্ষাকে সহজ করার কোন ভিত্তি নেই। সেটি সহজ হলে শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবার শহীদ হওয়ার কি কোন প্রয়োজন ছিল? নবীজী (সাঃ) পাথর খাওয়ার কি প্রয়োজন ছিল? প্রয়োজন কি ছিল ওহুদের ময়দানে আহত হওয়ার? ঈমানদারদেরকে দুঃখ-কষ্ট ও জেল-জুলুমের পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েই জান্নাতে ঢুকতে হবে। এটিই মহান আল্লাহর পলিসি।

 

তাছাড়া ইসলামপন্থি কোন নেতা বা দল কি দেশবাসীর দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-মুসিবত বাড়িয়ে চলেছে? ইসলামের প্রতিষ্ঠাকামীদের বিরুদ্ধে এরূপ অভিযোগ সব সময়ই উত্থাপিত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষ থেকে। মক্কার কাফের পক্ষ নবীজী (সাঃ)র বিরুদ্ধে দোষারপ করতো,তারা তো মুর্তিপুঁজা নিয়ে শান্তিতেই ছিল; মহম্মদ (সাঃ) নতুন ধর্ম এনে সে শান্তিতে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। একই রূপ অভিযোগ ছিল হযরত ইব্রাহীম আঃ)র বিরুদ্ধে নমরুদের এবং হযরত মূসা (আঃ)র বিরুদ্ধে ফিরাউনের। ইসলামের পথে প্রতিকদম লড়াই  করে এগুতে হয়। ইসলাম কবুলের প্রথম দিন থেকেই সাহাবায়ে কেরাম জীবনে পরীক্ষা শুরু হয়। যে জীবনে প্রমোশন আছে সে জীবনেও পরীক্ষা আছে। প্রতি মুহুর্তের কাজের উপর তখন মনিটরিং হয়। পশুর জীবনে প্রমোশন নাই,তাই পরীক্ষাও নাই। ফলে খাদ্য-পানি ও প্রজনন ছাড়া তাদের জীবনে উন্নত কোন কাজও নাই। কিন্তু এ পৃথিবীতে মানুষের পোষ্টিং আল্লাহর খলিফা রূপে। আর তার প্রমোশনটি হয় জান্নাতপ্রাপ্তি মধ্য দিয়। ফলে এখানে পরীক্ষাটি বিশাল। বস্তুত এ পৃথিবীর পুরা জীবনটাই ঈমানদারের জন্য পরীক্ষাগার। তাই কোন মু’মিন যদি একাকী কোন বিজন মরুভূমিতে ঘর বাঁধে সেখানেও তাঁর পিছনে শয়তান লেগে যায়। পরীক্ষা যে অনিবার্য সে বর্ণনা পবিত্র কোরআনে এসেছে এভাবেঃ “তোমরা কি ভেবেছো যে,এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে,অথচ সে লোকদের মত অবস্থা তোমাদের উপর এখনও আসেনি যারা অতীত হয়ে গেছে তোমাদের পূর্বে। তাদের উপর এসেছে অর্থসংকট ও দুঃখ-কষ্ট। তারা (সে বিপদ-মুছিবতে) ভীত হতো এবং কেঁপে উঠতো। এমন কি রাসূল এবং তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছিল তারা বলে উঠতো,আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? জেনো রাখ, আল্লাহর সাহায্য নিকটে। -(সুরা বাকারা আয়াত ২১৪)।

 

মধ্যপ্রাচ্যের বিপ্লব ও ইসলাম

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে বিপ্লবের নামে যা ঘটলো সেটি স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিপ্লব। এ বিপ্লবকে ইসলামী বিপ্লব বলার কোন কারণ নেই। তবে ইসলামপন্থিদের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে সে কথা অস্বীকারের উপায় নেই। মিসরের ইসলামপন্থিরা বিগত ৬০ বছর ধরে রক্ত দিয়ে আসছে। শহীদ হাসানূল বান্না, সৈয়দ কুতুবের ন্যায় বহুনেতা ও শত শত কর্মীকে নির্মম নির্যাতন এবং নির্যাতন শেষে শহীদ হতে হয়েছে। ইখওয়ানূল মুসলিমীন বিগত প্রায় ৫০ বছর ধরে আইনগত ভাবে নিষিদ্ধ। একই অবস্থা তিউনিসিয়ায়। একই অবস্থা লিবিয়া, ইয়েমেনসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশে। আজ বিপুল রক্ত দিতে হচ্ছে সিরিয়ার বিপ্লবীদের। আশির দশকের শুরুতে হোমস নগরীর ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছিল বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পিতা হাফিজ আল আসাদের হাতে। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যের এ বিপ্লবে ইসলামপন্থিদের পাশাপাশি সেক্যুলারিস্ট, সোসালিস্ট এবং ন্যাশনালিস্টদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। একটি বিল্ডিং ধ্বংসের পরই আরেকটি বিল্ডিংয়ের ভিত্তি গড়া যায়। তেমনি বিপ্লবের বেলায়ও। স্বৈরাচারেরর পতন ঘটেছে, এখন এ বিপ্লব কোনদিকে মোড় নিবে সেটিই এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইরানে শাহানশাহী খতম হওয়ার পরও তেমনি একটি অবস্থা সেদেশে সৃষ্টি হয়েছিল। লড়াই হয়েছিল তৃমুখি -জাতিয়তাবাদী, সমাজতন্ত্রি ও ইসলামপন্থিদের মাঝে। অবশেষে বিজয়ী হয়েছিল ইসলামপন্থিরা। মধ্যপ্রাচ্যে তেমনি একটি বিপ্লব শুরু হওয়ার পথে। তাই এ মুহুর্তে এ বিপ্লবকে ইসলামপন্থিদের বিজয় বলার সুযোগ নেই।

 

 

তুরস্ক, তিউনিসিয়া, মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যের অধীকাংশ দেশে সেক্যুলারিজমের প্রভাব অতি প্রবল। এজন্যই এসব দেশ পাশ্চাত্যদেশের ট্যুরিস্টদের কাছে অতি প্রিয়। আর এরই প্রেক্ষিতে এরদোগান, রশিদ ঘানুশি ও মিসরের ফ্রিডম ও জাস্টিস পার্টির নেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা থেকে নিজেদের দূরে রাখাটি। কারণ তাতে বন্ধ হয়ে যাবে পাশ্চাত্যে টুরিষ্টদের আগমন।।এতে বন্ধ হয়ে যাবে  বহু বিলিয়ন ডলারের উপার্জন। বিদেশে জনশক্তি ও পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রতিবছর সর্বসাকুল্যে যা উপার্জন করে তুরস্ক তার চেয়ে বেশী আয় করে টুরিজম থেকে। তাদের কাছে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার চেয়ে ট্যুরিজম তাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় বন্ধ হয়ে যাবে মদ্যপান,মদবিক্রি,পতিতাবৃত্তি,সমুদ্র সৈকতে উলঙ্গতা। ফলে বন্ধ হয়ে যাবে টুরিষ্টদের জোয়ার। তখন টান পড়বে অর্থ ভান্ডারে। এরূপ পার্থিব স্বার্থ ভাবনায় নিজেদের সেক্যুলার সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও অর্থনীতির সাথে ইসলাম পালনকে তারা খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এটি হলো সমাঝোতামূলক ইসলাম। কিছু ইসলাম এবং কিছু অনৈসলামের মিশ্রণ। এরদোগান ও রশিদ ঘানুশির প্রশংসায় যারা পঞ্চমুখ তারা বাংলাদেশে একই রূপ নীতির অনুসরণ চায়। কিন্তু এমন নীতিতে অর্থনীতিতে উন্নয়ন এবং দেশের ও বিদেশে সেক্যুলারি শক্তির সাথে সম্পর্ক বাড়লেও ভয়ানক দূরত্ব বাড়বে মহান আল্লাহর সাথে।এমন পলিসিতে ক্ষমতায় যাওয়াটি সহজ হলেও তাতে ইসলামের বিজয় আসবে না। তাছাড়া এমন ইসলাম পালনে কি মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হবেন? আর মহান আল্লাহতায়ালা খুশি না হলে বিশাল বিজয় দিয়েই বা কি হবে? তাতে তো জান্নাত মিলবে না। বরং মিলবে জাহান্নাম। আল্লাহপাকের নির্দেশ হলো,“উদখুলো ফিস সিলমে কাফ্ফা”। অর্থঃ “ইসলামে প্রবেশ করো পরিপূর্ণ ভাবে।” তাই শরিয়তের বিধানকে বাদ রেখে ইসলাম পালন হয় না। রশিদ ঘানুশি এবং ইখওয়ান নেতাদের কথা শুনে মনে হয় মধ্যপ্রাচ্যের এ বিপ্লবকে তারা ইসলামের দিকে নিয়ে যেতে রাজী নন। ইরানের বিপ্লবের থেকে এক্ষেত্রে তাদের বিরাট পার্থক্য। ইরানে আায়াতুল্লাহ খোমিনীর মত যে শক্তিশালী নেতৃত্ব ছিল মধ্যপ্রাচ্যে তেমন নেতা নেই। সেখানে ইসলামপন্থিদের যেরূপ মনবল,মানসিক প্রস্তুতি ও জিহাদী চেতনা ছিল ইখওয়ান ও আল নাহাদা পার্টির নেতাকর্মীদের মাঝে সেটিও নেই। মনে হচ্ছে ইসলামী বিপ্লবের শুরুর আগেই তাদের মাঝে প্রতিবিপ্লব এসে গেছে। ইরানে বিপ্লব সফল হবার সাথে সাথে সে দেশে মদ্যশালা, পতিতাপল্লি, বিদেশী ট্যুরিষ্টদের প্রমোদ ভ্রমন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাদের লক্ষ্য যে ইসলাম সেটিও লুকায়নি। কিন্তু মিসরে ও তিউনিসায় সেসব কিছুই হয়নি। সেরূপ কিছু করা নিয়েও এসব দেশের প্রধান প্রধান ইসলামী দলগুলোর কোন আগ্রহ নেই। অথচ সে বিপ্লবকে ইসলামপন্থিদের বিজয় বলা হচ্ছে।

 

অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী দলগুলোর এমন অবস্থার কিছু কারণও আছে। ইরানে বিপ্লব হওয়ার পরই মার্কিন প্রশাসন দুশ্চিন্তা বাড়ে অন্যান্য মুসলিম দেশে ইসলামী বিপ্লব নিয়ে। শত শত  মার্কিন গবেষক এ নিয়ে গবেষণায় নামে কি করে এধরণের বিপ্লবকে প্রতিরোধ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত র‌্যান্ড কর্পোরশের রিপোর্ট মূলত এমনই এক বিশাল গবেষণার ফসল। তাদের সে রিপোর্ট মার্কিন সরকারসহ সকল পাশ্চাত্য সরকারের কাছে যে পরামর্শ রাখে তা হলোঃ ১). মুসলিম দেশে সেক্যুলার রাজনৈতিক দল ও এনজিও গুলোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে অর্থদান, পরামর্শ দান ও প্রশিক্ষণদানের ব্যবস্থা করা। ২) ইসলামী দলগুলোর মধ্যে যারা জিহাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ তাদের নির্মূল করা,৩).ইসলামী দলগুলোর মধ্যে যারা জিহাদবিমুখ তাদেরকে দ্রুত সেক্যুলারাইজড করা। র‌্যান্ড কর্পোরশনের সে রিপোর্ট নিয়েই মার্কিন ও ব্রিটিশসহ সকল অমুসলিম রাষ্ট্রের সরকারগুলো ময়দানে নামে। পাকিস্তানে পিপলস পার্টি এবং বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আনার পিছনে মার্কিনীদের বড় আগ্রহের কারণ হলো সেটি। তাদেরকে তারা ব্যবহার করছে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে হাতিয়ার রূপে। দ্রুত সেকুলারাইজেশনের প্রজেক্টকে সামনে রেখে তারা পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিশর ও ইন্দোনেশিয়ার মত প্রধান প্রধান মুসলিম দেশে তারা গড়ে তুলেছে  হাজার হাজার এনজিও। এসব এনজিওর লক্ষ লক্ষ কর্মি যে ঘরে ঘরে গিয়ে ইসলামের শিক্ষা ও ইসলামী মূল্যবোধের বিরুদ্ধে তাবলিগ করে তা নয়,প্রয়োজনে হাজার হাজার মানুষ নিয়ে রাস্তায় মিছিলও করে। একই লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকার অফিসার,রাজনৈতিক কর্মী,সাংস্কৃতিক কর্মী,ধর্মীয় নেতা, গৃহকর্তা,গৃহবধু ও ছাত্র শিক্ষকদের নিয়ে হাজার হাজার সেমিনার এবং ওয়ার্কশপও করে। দ্বিতীয় স্ট্রাটেজীর অংশ রূপেই শত শত ড্রোন হামলা হচ্ছে পাকিস্তানের ইসলামপন্থিদের ঘরবাড়ী, ব্যবসাবাণিজ্য ও মাদ্রাসার উপর। তৃতীয় স্ট্রাটেজীর অংশ রূপে মার্কিনীদের উঠাবসা বেড়েছে তুরস্কের একে পার্টি, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী,মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমীন,তিউনিসিয়ার আন নাহদা পার্টির ন্যায় মুসলিম দেশগুলির ইসলামী দলের নেতা ও বু্দ্ধিজীবীদের সাথে। মার্কিনী খরচে তাদের ঘন ঘন মার্কিন যু্ক্তরাষ্ট্রে ভ্রমনেরও ব্যবস্থা হয়।

 

মার্কিনীদের এ বিনিয়োগের ফলেই বহু ইসলামী দলের নেতারাই আর ইসলামী বিপ্লবের কথা বলে না। শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কথাও মুখে আনে না। সেক্যুলারাইজড প্রজেক্ট এতটাই সফল হয়েছে যে বহু ইসলামপন্থি নেতাই এখন সেক্যুলারিজমের পক্ষে কথা বলেন। তিউনিসিয়ার আল নাহদা পার্টির নেতা রাশিদ ঘানুশি এক সময় প্রবল বিপ্লবী ছিলেন। অথচ এখন তিনি ইসলামী রাষ্ট্রোর কথা মুখেও আনেন না। ইখওয়ানূল মুসলিমেরও অনেক নেতা এখন কথা বলছেন শহীদ কুতুবের বিরুদ্ধে।শহীদ কুতুবের বিখ্যাত বই “মায়ালিম ফিত্তারিক” (মাইল স্টোন) এর প্রকাশনা ও প্রচার নিয়েও তাদের আপত্তি। তাদের অভিযোগ,এ বই পড়ে মানুষ লড়াকু জিহাদী হয় এবং তাতে মার্কিনীরা রেগে যায়। রেগে যায় মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারি রাজা-বাদশাহরা। এতে তাদের সাহায্য লাভ অসম্ভব করে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামের দর্শন ও দাওয়াহকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে শহীদ কুতুবের যে ভূমিকা তা বহু সংগঠনের সম্মিলিত জনশক্তিরও নেই। তিনি নিজেই ছিলেন এক বিশাল সংগঠন। অনেকে যুক্তি দেখাচ্ছেন,ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রকল্পটি শুধু মাওলানা মওদূদী,শহীদ কুতুব ও আয়াতুল্লাহ খোমেনীর ন্যায় কিছু ব্যক্তিবর্গের,তা কোরআন-সূন্নাহর নয়।এবং অধিকাংশ আলেমেরও নয়!

 

শৃঙ্খলিত স্বাধীনতা ও ইসলাম পালন

মধ্যপ্রাচ্যের হাওয়া কেন বাংলাদেশে লাগছে না সে ক্ষেদাক্তি করেছেন জনাব আব্দুর রাজ্জাক। কথা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের বিপ্লবের কৌশল কি বাংলাদেশে ফল দিবে? মধ্যপ্রাচ্য ও বাংলাদেশ এক নয়। এক নয় উভয় এলাকার মানুষের মন-মেজাজ,ভূ-রাজনীতি,সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তি। মধ্যপ্রাচ্যে ভারত নেই,ভারত-অনুগত লক্ষ লক্ষ সেবাদাসও নেই। বাঘের থাবায় আটকা পড়া ভেড়ার পক্ষে কি বেড়িয়ে আসা এত সহজ? তেমনি সহজ নয় ভারতের ন্যায সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কবল থেকে বেড়িয়ে আসাও। ৭ হাজার মাইল দূরের ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের শাসন থেকে বেড়িয়ে আসতে বাংলাদেশের ১৯০ বছর লেগেছিল। তবে ভারতীয় উপনিবেশিক শাসন থেকে কাশ্মির বেরুতে পারছে না। পারছে না নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মনিপুর। বাংলাদেশীদের গোলামীও শেষ হয়নি,১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের নাগপাশ থেকে বেরিয়ে গেলেও ১৯৭১ য়ে ফিরে এসেছে ভারতের খাঁচায়।ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার অবস্থান এখন সমগ্র দেশজুড়ে।

 

ভারতীয় শাসকগোষ্ঠি ও বাংলাদেশী ভারতভক্তদের দাবী,বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে ভারতীয়দের হাতে। তাদের কথা, ভারতের প্রতি নতজানু হওয়াটা বাংলাদেশীদের জন্মসূত্রে পাওয়া উত্তারাধিকার;সেটি অস্বীকার করা নিমকহারামী। যে সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে ছিনিয়ে এনেছে তাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইচ্ছামত ঢুকাটি যেন তাদের নৈতিক অধিকার। সে অধিকারের ন্যায্যতা তাজুদ্দীন দিয়েছিল ভারতের সাথে ৭ দফা চুক্তির মাধ্যমে, তেমনি মুজিব দিয়েছিল ২৫ দফা চুক্তির মাধ্যেমে। মুজিবামলে তো তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে বাজারও বসিয়েছিল। অনুরূপ অধিকার শেখ হাসিনাও দিয়েছে। বরং কিছু বেশীই দিয়েছে। ফলে ভারতীয় ভারী যানবাহন এখন বাংলাদেশের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে যাচ্ছে। সেজন্যই ভারতীয় মন্ত্রী প্রনব মুখার্জি কোনরূপ গোপনীয়তা না রেখেই বলেছেন,শেখ হাসিনার কিছু হলে ভারত বসে থাকবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরিমান কতটুকু সেটি কি এরপরও বুঝতে বাকি থাকে?আরোপিত এ পরাধীনতা ভারতীয় সেবাদাসদের কাছে স্বাধীনতা মনে হতে পারে, তা নিয়ে তারা উৎসবও করতে পারে,কিন্তু স্বাধীনতার সাথে এমন মস্করা কি কোন দেশপ্রেমিকের কাছে গ্রহনযোগ্য হতে পারে?

 

বাংলাদেশে ইসলামী বিপ্লবের বড় বাঁধা শুধু দেশের স্বৈরাচারি ফ্যাসিস্ট শাসকবর্গ নয়,প্রতিবেশী ভারতও। ভারত সরকারের মন্ত্রীগণ একবার নয়,বহুবার ঘোষণা দিয়েছে,বাংলাদেশের সংবিধান থেকে সেক্যুলারিজমের বিলুপ্তি ভারত সরকার মেনে নিবে না। বলা হয়ে থাকে ১৯৭২এর সংবিধান আমদানি করা হয়েছিল দিল্লি থেকে। তবে দিল্লি থেকে এসে না থাকলেও দিল্লির শাসকগণ সে শাসনতন্ত্র নিয়ে প্রচন্ড খুশি ছিল। কারণ তাতে শাসনতান্ত্রিক ভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছিল ইসলামের শরিয়তি বিধানের প্রতি অঙ্গিকার। নামায-রোযার ন্যায় মুসলমানের প্রতি কর্মে আল্লাহর স্মরণ,তাঁর শরিয়তের অনুসরণ এবং আল্লাহকে খুশি করার নিয়ত থাকতে হয়। তেমনি  রাষ্ট্র বা শাসনকার্য পরিচালনা করার ক্ষেত্রেও। ব্যক্তির জীবন থেকে নামায-রোয লোপ পেলে সে ব্যক্তি যেমন আর মুসলমান থাকে না, তেমনি রাষ্ট্র থেকে শরিয়তি বিধান লোপ পেলে সে রাষ্ট্রেরও আর ইসলামি চরিত্র থাকে না। তখন সে রাষ্ট্রের মুসলমানদের জন্য অসম্ভব হয় পরিপূর্ণ ভাবে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলা। ১৯৭২এর সংবিধান নিয়ে দিল্লির খুশি হওয়ার কারণ তো এটাই। রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে তখন ধর্মীয় বিধি-বিধান তখন গুরুত্ব পায়নি। সরকারের সেটি সাংবিধানিক দায়িত্বও ছিল না। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সেক্যুলারিজম হওয়ায় রাষ্ট্রয়ীয় প্রতিষ্ঠান সমূহকে বরং তেমন একটি ইসলামী অঙ্গিকার থেকে দূরে রাখা সরকারের ঘাড়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়ায়। মুসলিম রাষ্ট্র তো এভাবেই সাংবিধানিক ভাবে ডি-ইসলামাইজড হয়।

 

আগামীতেও যে কোন শাসতান্ত্রিক পরিবর্তনে দিল্লিকে খুশি করার বিষয়টি যে গুরুত্ব পাবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? দিল্লি তখনও চাইবে ইসলাম থেকে রাষ্ট্র দূরে থাক। এভাবে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের গলায় লাগাম পড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা হবে,এবং সেটি শাসনতন্ত্রের নামে। ফলে অসম্ভব হবে ইসলামের দিকে চলা। সাংবিধানিক ভাবে পরাধীন করা এবং মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে দূরে রাখার এটি এক সনাতন সাম্রাজ্যবাদী কৌশল। শুধু ইসলামের প্রতিষ্ঠা নিয়ে নয়,স্বাধীনতা সুরক্ষার ক্ষেত্রেও অতি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হলো এটি। স্বাধীনতা না থাকলে সে দেশের মানুষের স্বাধীন ভাবে সংবিধান রচনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার থাকে কি? বাংলাদেশের জন্য এটি এক ভয়ানক সমস্যা। জনাব আব্দুর রাজ্জাক তাঁর বিশ্লেষণে সে বিষয়টির উপর গুরুত্বই দেননি। অথচ বাংলাদেশে ইসলামী বিপ্লবের পথে এটি এক প্রবল বাঁধা। এ বাঁধার মুখে জামায়াতের নীতির বদল ইসলামের পথ থেকে শুধু বিচ্যুতিই বাড়াবে। ভারত ও তার সেবাদাসেরা তো সেটাই চায়। এমন নীতির বদলে শয়তানী শক্তির শুধু আনন্দই বাড়বে, ইসলামের বিজয় আসবে না। ০৯/০৩/১২



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Comments (2)
What we have to do now....???
2 Monday, 17 September 2012 09:25
Fahmid Al Farid

Assalamualaikum. In what way we have to do daowah? Is it necessary to join in an Islamic organization to establish Islam? Please tell me the proper way of Islamic movement. Which Islamic organization is better in BD or all over the world? What is your specific advice to us ? Explain with reference.


Reply from Firoz Mahboob Kamal: ওয়ালাইকুম আসসালাম। ধন্যবাদ আপনার ইমেলের জন্য। আপনার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। আমি এ বিষয়ে বিষদভাবে আলোচনা করেছি "রাষ্ট্র বিপ্লবের রোডম্যাপ" নামক নিবন্ধে। আপনি সেটি আমার ওয়েব সাইটে "লড়াই ও রাষ্ট্র বিপ্লব" বিভাগে পাবেন।

বাদ পড়ছে কি শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ?
1 Tuesday, 13 March 2012 18:01
Akmal hossain

খুব্ ভাল লাগল । কিন্তু জামায়াত নেতারা ঘুমিয়ে আছে । এধরনের একটির লেখা পড়ার আপনাকে অনুরোধ করছি । ঠিকানা হল - www.sonarbangladesh.com/blog/abunishat 

Last Updated on Sunday, 11 March 2012 10:22
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.