মুসলিমদের হাতে পবিত্র কুর’আন অবমাননা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

বোখারী শরিফের প্রথম হাদীসটি হলো: প্রতিটি কর্মের ছওয়াব মিলে তার নিয়ত অনুসারে। নিয়ত যদি হয় মহান রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জন তথা তাঁকে খুশি করা -তবে সে নিয়ত নিয়ে কোন ভাল কাজ করলে অবশ্যই তা সওয়াব আনে। নেক কর্মের সাথে নেক নিয়ত থাকাটি তাই জরুরি। কোটি কোটি টাকা দান করেও কোন সওয়াব নাই -যদি সে দানের লক্ষ্য হয়, আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করার বদলে নিজের আত্মপ্রচার। এমন কি যুদ্ধের ময়দানে নিজের প্রাণ বিলিয়েও কোন সওয়াব মিলবে না, বরং জাহান্নামে যেতে হবে -যদি নিয়ত হয় আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার বদলে জাতীয়, দলীয়, রাজতন্ত্রী বা মতবাদী এজেন্ডাকে বিজয়ী করা। প্রশ্ন হলো,  যারা না বুঝে কুর’আন পড়ে তাদের নিয়তটা কি? সেটি কি শুধু সওয়াবের জন্য তেলাওয়াত? সওয়াব কি শুধু তেলাওয়াতে মেলে? সওয়াব তো তখনই মেলে যখন নিয়তটি হয় মহান আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করা। তাকে খুশি করার জন্য জরুরি হলো, কুর’আন নাযিলের পিছনে মহান রাব্বুল আলামীনের কি উদ্দেশ্য ছিল -সে জানা। বান্দার কুর’আন তেলাওয়াতের উদ্দেশ্য হতে হবে, মহান আল্লাহ তায়ালার সে উদ্দ্যেশের সাথে একাত্ম হওয়া।  প্রশ্ন হলো, কুর’আন নাযিল হয়েছে কি শুধু তেলাওয়াতের জন্য? পবিত্র কুর’আন নাযিলের উদ্দেশ্য কখনোই এটি ছিল না যে, মানুষ এ কিতাবটি শুধু তেলাওয়াত করবে, মুখস্থ করবে ও ভক্তিভরে চুমু খাবে, এবং যা পড়বে তা বুঝবে না এবং অনুসরণও করবে না। পরিতাপের বিষয় হলো, পবিত্র কুর’আনের সাথে আজকের মুসলিমদের আচরণ বস্তুত সেরূপই।

 মহান আল্লাহ তায়ালার নিজের ভাষায় কুর’আন হলো হিদায়েতের কিতাব (হুদালিন নাস)। অর্থাৎ এ পবিত্র কিতাব পথ দেখায় জান্নাতের। তাই যারা জান্নাতে যেতে চায় তাদেরকে অবশ্যই এই কুর’আন বুঝতে হয় ও অনুসরণ করতে হয়। নইলে জান্নাতের পথে চলা অসম্ভব। সে জন্য কুর’আন বুঝা জরুরি। কারণ, বুঝার কাজটি ভাল ভাবে না হলে অনুসরণের কাজটি হবে কিরূপে? কুর’আন বুঝা ও অনুসরণের কাজটি না হলে সে পথ হারাবে এবং জাহান্নামের পথে যাবে -সেটিই স্বাভাবিক। নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাত ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু সে ইবাদতগুলি পথ দেখায় না; পথ দেখায় কুর’আনের জ্ঞান। কুর’আনের সে জ্ঞান না থাকাতে তাই নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাত পালন করেও অনেকে সূদ খায়, ঘুষ খায়, স্বৈরাচারি হয়, সেক্যুলার রাজনীতি করে এবং আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে নামে। এবং তারা খাড়া হয় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে। এটি তো ভয়ানক পথভ্রষ্টতা -যা নিশ্চিত জাহান্নামে নেয়। সে পথভ্রষ্টতার বিপদ থেকে বাঁচাতেই মহান আল্লাহ তায়ালা ৫ ওয়াক্ত নামাজ ও মাহে রমযানের রোজা ফরজ করার প্রায় এক যুগ আগে কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছেন। না বুঝে তেলাওয়াতে কুর’আন যে উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে সে উদ্দেশ্য হাছিল হয় না। প্রশ্ন হলো, বান্দার এমন কাজে কি মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হন?    

 বান্দার কুর’আন তেলাওয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা তো তখনই খুশি হন, যখন তার কুর’আন তেলাওয়াতের লক্ষ্য হয় কুর’আন বুঝা এবং তা থেকে হিদায়েত লাভ। আর হিদায়েত তো তারাই পায়, যারা পবিত্র কুর’আনের বাণী বুঝার সামর্থ্য রাখে। না বুঝে কুর’আন তেলাওয়াতে কুর’আন নাযিলের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। যাদের আগ্রহ নাই কুর’আন অনুসরণে -কুর’আন বুঝায় তাদের আগ্রহ থাকার কথা নয়। ফলে না বুঝে তেলাওয়াতেই তারা খুশি থাকে। পবিত্র কুর’আনে প্রতি এর চেয়ে বড় অবমাননা এবং এর চেয়ে বড় বেয়াদবী আর কি হতে পারে? বুঝতে হবে, মহান আল্লাহ তায়ালা না বুঝে কুর’আন তেলাওয়াতকে ফরজ করেননি, এমন কি কুর’আনের হাফিজ হওয়াও ফরজ করেননি।  বরং ফরজ করেছেন কুর’আন বুঝা ও তার অনুসরণকে। যারা কুর’আন বুঝে ও অনুসরণ করে একমাত্র তারাই সিরাতাল মুস্তাকীম পায় তথা জান্নাত পায়। অথচ আজকের মুসলিমদের দ্বারা কুর’আন বুঝার কাজটি যেমন হচ্ছে না, তেমনি হচ্ছে না অনুসরণের কাজও। এর অর্থ হলো, সর্বজ্ঞানী আল্লাহতায়ালা যে উদ্দেশ্যে কুর’আন নাযিল করেছিলেন, সে উদ্দেশ্যের সাথে হচ্ছে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। ফলে তারা ইতিহাস গড়েছে সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হওয়ায়। এবং তাদের সে বিচ্যুতি দেখা যায় সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ, গোত্রবাদ, রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, পুঁজিবাদ ও  ফ্যাসিবাদের ভ্রান্ত পথে ধাবিত হওয়া দেখে।  

 পবিত্র কুর’আনের সাথে বাঙালি মুসলিমদের গাদ্দারীটি বিশাল। তারা কুর’আন তেলাওয়াত করে না বুঝেই। সেটিকে তারা সওয়াবের কাজ মনে করে। তারা আছে সওয়াবের সন্ধানে; এবং আগ্রহ নাই কুর’আন থেকে হিদায়েত নেয়ায়। মহান আল্লাহ তায়ালার ভাষায় কুর’আন হলো হিদায়েতের কিতাব। এটি হলো জান্নাতের সিরাতাল মুস্তাকীম তথা রোড ম্যাপ। নেকী বা সওয়াব হাছিলের জন্য দান-খয়রাত, তাসবিহ পাঠ, নফল ইবাদতসহ হাজারো নেক আমল আছে। কিন্তু কুর’আন পাঠে মূল লক্ষ্যটি হতে হবে হিদায়েত লাভ তথা পথ নির্দেশনা লাভ। কুর’আন পাঠ এজন্যই ফরজ। এ ফরজ পালিত হলে সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার ফরজটিও পালিত হবে। এটি এজন্যই এক বিশাল নেক আমল। প্রশ্ন হলো, যারা এ কিতাব বুঝে না, তারা এটি অনুসরণ করবে কিরূপে? কুর’আন বুঝার ফরজটি সঠিক ভাবে আদায় না হলে, কুর’আনের পথে চলার ফরজটি আদায় হবে কিরূপে?

 মসজিদে দিকে পথ চলায় প্রতি কদমে সওয়াব আছে। তবে সে জন্য কদম ফেলতে হয় মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে। স্রেফ মসজিদ দর্শনে গেলে কোন সওয়াব নাই। তেমনি পবিত্র কুর’আনের প্রতিটি হরফ তেলাওয়াতে ১০টি নেকি আছে -এটি নবীজী (সা:)’র হাদীস। তবে সে তেলাওয়াতের লক্ষ্য হতে হবে কুর’আন বুঝার ফরজ আদায়ের লক্ষ্যে। স্কুলের কোন শিশুও কি কোন বই না বুঝে পড়ে? যে বই স্কুলের শিশু বুঝে না, সে বই সে কখনো স্পর্শ করে না। এটিই হলো শিশুর কান্ডজ্ঞান। প্রশ্ন হলো, শিশুর কান্ডজ্ঞান যেমন এরূপ, একজন সাবালক মুসলিম কেন না বুঝে কুর’আন পাঠ করবে? এর চেয়ে বড় আহম্মকি আর কি হতে পারে? নবীজী (সা:)’র মনে কি কখনো এরূপ অস্বাভাবিক ভাবনার উদয় হয়েছে যে তাঁর উম্মতগণ কুর’আন পড়বে, কিন্তু বুঝার চেষ্টা করবে না? একজন শিশু থেকেও কেউ কি এরূপ অস্বাভাবিক আচরণ আশা করে? ফলে নবীজী (সা:) বা কেন তেমনটি আশা করবেন সাবালক মুসলিমদের থেকে?

 কুর’আন না বুঝে পড়ার চেয়ে বড় আহাম্মকি আর কি হতে পারে? মহান আল্লাহতায়ালা কি এমন আহাম্মকদের সওয়াব দিয়ে পুরস্কৃত করবেন? এরূপ আশা করাটিও তো আরেক আহাম্মকি। মুসলিমদের গৌরব কালে কুর’আনের সাথে এরূপ আচরণ কখনোই হয়নি। সেকালের মুসলিমগণ কখনোই না বুঝে কুর’আন পাঠ করেননি। বরং কুর’আন বুঝার প্রয়োজনে মিশর, ইরাক, সিরিয়া, সুদান, লিবিয়া, আলজিরিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়া, মৌরতানিয়ার ন্যায় দেশগুলির জনগণ মাতৃভাষাকে কবরে পাঠিয়ে আরবী ভাষাকে গ্রহণ করেছিল। ফলে তারা কুর’আনের পথ তথা সিরাতাল মুস্তাকীম পেয়েছিল এবং গৌরবময় ইতিহাসও গড়েছিল। মুসলিমদের পতনের শুরু তখন থেকে যখন তারা শুধু কুর’আন তেলাওয়াতে মনযোগী হয়েছে, কুর’আন বুঝায় এবং অনুসরণে নয়। তারা সওয়াব লাভে মনযোগী হয়েছে; কিন্তু হিদায়েত লাভে নয়।     

পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, “ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা”। অর্থ: একমাত্র জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে। অর্থাৎ একমাত্র জ্ঞানীরাই আল্লাহভীরু তথা মুত্তাকী হয়। তাকওয়া হলো জান্নাতের টিকেট। যারা মুত্তাকী তথা তাকওয়ার অধিকারী হয় তারাই জান্নাত পায়। এবং মুত্তাকী হতে হলে যা অপরিহার্য তা হলো ওহীর জ্ঞান তথা আল্লাহ-প্রদত্ত জ্ঞান। আর সে জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাণ্ডার হলো পবিত্র কুর’আন। আর কুর’আন থেকে তো তারাই জ্ঞানবান হতে পারে যারা কুর’আন বুঝে। না বুঝে  হাজারো বার তেলাওয়াত করেও জ্ঞানী হওয়া অসম্ভব; তখন অসম্ভব হলো মুত্তাকী হওয়াও। এজন্যই বাংলাদেশে কুর’আন পাঠ করে এমন মানুষের সংখ্যা বহু কোটি, কুর’আনের হাফিজও বহু লক্ষ; কিন্তু মুত্তাকীর সংখ্যা অতি নগন্য। ফলে দেশটিতে ১৬ কোটি মুসলিম নামধারী মুসলিম থাকলেও প্রতিষ্ঠা পায়নি নবীজী (সা:)’র ইসলাম -যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, ছিল আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং ছিল শরিয়ত আইনের বিচার। এবং ছিল দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠার জিহাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *