শেখ মুজিবের মুখোশ ও রাজনীতি

ফিরোজ মাহবুব কামাল

মুখোশের আড়ালে ষড়যন্ত্র

শেখ মুজিব প্রায়ই বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা বলতেন। বলতেন,‍জনগণের বাকস্বাধীনতাসহ মৌলিক অধিকারের কথা।বলেছেন শক্তিশালী পাকিস্তানের কথাও।প্রতিটি নির্বাচনি জনসভায় –এমন কি নির্বাচনের পর একাত্তরের ৭ই মার্চে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্দানের জনসভাতেও উচ্চকন্ঠে “‍‍‍‍‌‍পাকিস্তান জিন্দাবাদ” ধ্বনি দিয়েছেন। তবে এসবই ছিল তার রাজনীতির মুখোশ।সে মুখোশের আড়ালে ছিল পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ নির্মানের প্রকল্প।ছিল,একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার নেশা।ছিল নানারূপ ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। মুজিবের সে রাজনীতিতে বিরোধীদের জন্য কোন স্থান ছিল না।তার শাসনামলে বিরোধী পত্র-পত্রিকার জন্যও কোন স্থান ছিল।বরং নিজের রাজনীতিতে স্থান করে দিয়েছেন বিদেশী শত্রুদের।ভোটের আগে যা বলেছেন,নির্বাচনি বিজয়ের পর করেছেনে তার উল্টোটি।ফলে “পাকিস্তান জিন্দাবাদ”য়ের বদলে স্থান পায় পাকিস্তান ধ্বংসের রাজনীতি।পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে তিনি যে আগরতলায় গিয়েছিলেন এবং তৎকালীন ভারতীয় সরকারের কাছের যে সাহায্য চেয়েছিলেন -সেটি আজ আর গোপন বিষয় নয়।

গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল কথা,দেশ ও দেশের রাজনীতি পরিচালিত হবে জনগণের রায়ের ভিত্তিতে।এখানে ক্ষমতাসীনদের খেয়ালখুশি চলে না।সেটি হলে তাকে গণতন্ত্র না বলে নিরেট স্বৈরাচার বলা হয়।শেখ মুজিব জনগণ থেকে রায় নিয়েছেন ঠিকই,কিন্তু যে ওয়াদা দিয়ে রায় নিয়েছেন,নির্বাচনের পর তার ধারে কাছেও যাননি।নির্বাচনি বিজয়ের পর নিজের রাজনৈতিক গোলপোষ্টই পাল্টে ফেলেছেন।পাকিস্তান ভাঙ্গার সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন নির্বাচনের বহুবছর আগেই।নিজের রাজনীতির গোলপোষ্ট পরিবর্তনের সময় জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার দিকে তাকাননি।সত্তরের নির্বাচনে তিনি ভোট নিয়েছেন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য অধিক প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন আদায়ের ওয়াদা দিয়ে। কোন নির্বাচনি জনসভাতেই স্বাধীনতার কথা বলেননি।বরং আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতিহারে ছিল পাকিস্তানকে মজবুত করার অঙ্গীকার।অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে শেখ মুজিব ৮ দফা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কেও স্বাক্ষর করেছেন।পূর্ব পাকিস্তানের অধিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে এমন কি অখণ্ড পাকিস্তানের অস্তিত্বে বিশ্বাসীর আপত্তি থাকার কথা নয়;ফলে তাদেরও অনেকে সরল বিশ্বাসে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে।কিন্তু মুজিব তাদেরকে ধোকা দিয়েছেন। 

বাংলাদেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে যারা জাতীয়তাবাদী, সমাজতন্ত্রি ও তীব্র ইসলাম বিরোধী তাদের পক্ষ থেকে সচারাচর বলা হয়, সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগেরবিজয় ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পক্ষে গণরায় বা রেফারেন্ডাম। বলা হয়, এ গণরায় বাস্তবায়ন করতেই নাকি একাত্তরের যুদ্ধ। বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। তারা একথাও বলে, সে চেতনাটির নাকি বিজয় ঘটেছিল সত্তরের নির্বাচনে। তাদের কাছে মুজিবের অপরাধ, নির্বাচনে বিজয়ের পরও কেন তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়ে পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক সমস্যা ও কেন্দ্রে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে ইয়াহিয়া ও ভূট্টোর সাথে আলাপে বসেছেন? সুতারাং তাদের অভিযোগ, মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। অভিযোগ, স্বাধীনতা চাইলে তিনি ভারতে না গিয়ে কেন পাকিস্তানীদের কাছে ধরা দিলেন? এ অপরাধে তাদের অনেকে মুজিবকে স্বাধীনতার শত্রু বলে অভিহিত করে থাকে। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ মূলত সেসব চীনপন্থীদের,যারা এক সময় ভাষানী ন্যাপের সাথে জড়িত ছিল এবং পরে জিয়াউর রহমানের গড়া বিএনপি’তে যোগ দেয়। তাদের এরূপ প্রচারের মূল মতলবটি হলো,স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় মুজিবর রহমানের চেয়ে জিয়াউর রহমানকে বড় করে দেখানো। সে লক্ষ্য পূরণে জিয়াউর রহমানকে তারা স্বাধীনতার ঘোষক বলে অধিক গুরুত্ব দেয়। এসব কথা বিএনপি প্রতিষ্ঠার আগে ও মুজিবের জীবদ্দশাতে তেমন প্রচার পায়নি। অথচ চীন যে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টিকে ভারতীয় আধিপত্যবাদী প্রজেক্ট মনে করতো এবং আজকের বাংলাদেশ যে তারই শিকার -সে কথাটি এসব বামপন্থীরা বলে না।

 

নির্বাচন ও প্রতারণা

প্রশ্ন হলো, সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে কি আদৌ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষে গণরায় বলা যায়? এ নিয়ে মিথ্যাচারটি বিশাল। বিষয়টি তাই বিচারের দাবী রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে সে বিচার আজও হয়নি। অগণিত মানুষ এখনো মিথ্যার জোয়ারে ভাসছে। সত্য তাদের কাছে এখনো তুলে ধরা হয়নি। প্রশ্ন হলো, বিষয়টি কি এতোই দুর্বোধ্য? সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়টি স্বাধীনতার প্রশ্নে জনগণের রায় বা রেফারেন্ডাম গণ্য হলে শেখ মুজিব কেন মার্চে ইয়াহিয়া খান ও ভূট্টোর সাথে পাকিস্তানে সরকার গঠন ও শাসনতন্ত্র নিয়ে আলোচনায় বসলেন? অথচ রেফারেন্ডাম হলে সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশে স্বাধীন দেশ রূপে নির্বাচনের পরপরই আত্মপ্রকাশ করতো। তা নিয়ে কারো মনে কোন সংশয় বা প্রশ্ন উঠতো না। নির্বাচনের পর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধও হত না। এবং হাজার হাজার পূর্বপাকিস্তানী পাকিস্তান বাঁচাতে রাজাকার হত না। একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে জনগণের মাঝে যে বিভক্তি জন্ম নিয়েছে তা তো মূলত রেফারেন্ডাম না হওয়ার কারণে। এমন কি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও সত্তরের নির্বাচনে স্বাধীন বাংলাদেশের ইস্যু তোলা হয়নি। ভোট চাওয়া হয়েছে, ৬ দফার আলোকে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। আওয়ামী লীগযে নির্বাচনি মেনিফেস্টো প্রকাশ করে,তাতেও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কোনরূপ অঙ্গীকার ছিল না। সে মেনিফেস্টোতে কোন চেতনার কথাও ছিল না। বরং ছিল কোরআন-সূন্নাহ বিরোধী কোন আইন না তৈরির অঙ্গীকার।

পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকোন মামুলি বিষয় ছিল না, এটি ছিল অতি গুরুতর বিষয়। বাঙালীদের উপর পাকিস্তানের মানচিত্রটি কোন পশ্চিম পাকিস্তানী জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়নি। ১৯৪৭ সালে কোন পাঞ্জাবী সেনাদল যুদ্ধ করে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানভূক্ত করেনি। বরং পাকিস্তানের সৃষ্টিতে মূল ভূমিকাটি ছিল বাঙালী মুসলিমদের। মাত্র ২৪ বছর আগে ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান প্রশ্নে শতকরা প্রায় ৯৬% ভাগ বাঙালী মুসলিম ভোটার ভোট দিয়ে দেশটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে সে দেশটির বিনাশ কি একটি সাধারণ নির্বাচনের ভোটে করা যায়? সাধারণ নির্বাচন হয় রাজনীতি,অর্থনীতি, বিদেশনীতির নানা ইস্যু নিয়ে; দেশটি থাকবে কি থাকবে না সে ইস্যুতে নয়। এরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যে কোন দেশের বুদ্ধিজীবী, সমাজবিজ্ঞানী, আলেম-উলামা, রাজীনীতিবিদ ও সাধারণ জনগণ দেশভাঙ্গার পরিণতি নিয়ে বহুবছরধরে চিন্তা-ভাবনা করে। পরস্পরে পক্ষে-বিপক্ষে বিষদ আলাপ-আলোচনা হয়। জমি কেনা, ভিটায় ঘর তোলা বা নতুন ব্যবসা শুরুর ব্যাপারেও মানুষ মাসের পর মাস চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। আর দেশের মানচিত্র বদলানোর বিষয় তো বিশাল। এর সাথে জড়িত দেশবাসীর শত শত বছরের ভবিষ্যৎ। পাকিস্তান নামে নতুন একটি

রাষ্ট্র নির্মাণ নিয়ে ভারতীয় মুসলিমগণ কয়েক দশক ব্যাপী চিন্তাভাবনা করেছে। পক্ষে-বিপক্ষে তা নিয়ে চুলচেড়া বিচার-বিশ্লেষণও হয়েছে। ভারত ভেঙ্গে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলি নিয়ে আলাদা রাষ্ট্রের প্রস্তাবটি প্রথমে পেশ করেন দার্শনিক কবি আল্লামা ইকবাল। রাজনীতির ময়দানে পাকিস্তান গড়ার প্রস্তাবটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রূপে প্রথমে পেশ করা হয় ১৯৪০ সালে লাহোরের মিন্টো পার্কে মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় সম্মেলনে।সে প্রস্তাবটি রাখেন বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা ফজলুল হক। এরপর ৬ বছর ধরে চলে পক্ষে-বিপক্ষে লাগাতর  বিতর্ক ও চিন্তাভাবনা। বিষয়টির উপর জনমত যাচায়ে ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত হয় রেফারেন্ডাম। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিষয়টি যখন রিফারেন্ডামে ৯৬% ভাগের বেশী ভোটে অনুমোদিত হয় তখন তৎকালীন ব্রিটিশ শাসক ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কাছে সে রায়ের বিরোধীতায় আর কোন দলিল থাকেনি।

 

ফ্যাসিবাদ ও জালিয়াতি

কিন্তু পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সে বিষয়ে কোন রূপ জনমত যাচাই না করেই। জনগণের বিরুদ্ধে এটি হলো আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অপরাধ। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে তারা ভোট নিয়েছে পাকিস্তানের জন্য শাসনতন্ত্র নির্মাণের অঙ্গীকার দিয়ে, অথচ সে সাংসদগণ শাসনতন্ত্র তৈরি করেছেন বাংলাদেশের। এভাবে বাংলাদেশের সৃষ্টিতেই ঘটেছে বিশাল জালিয়াতি। বিষয়টিকে তারা দলের কিছু নেতার গোপন বিষয় রূপেই রেখেছে। এবং জনগণকে আস্থায় নেয়নি। জনগণের বদলে মুজিব আস্থায় নিয়েছেন ভারত সরকার ও ভারতীয় গুপ্তচরদের। তাই ১৯৭০য়ের নির্বাচনকে স্বাধীনতার প্রশ্নে রেফারেন্ডাম বা গণরায় বলার প্রশ্নই উঠেনা। হঠাৎ করেই একাত্তরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে দলটির নেতাকর্মীগণ পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলা শুরু করে। শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানোর উৎসব। আওয়ামী লীগের বাইরেও দেশে বহুদল ছিল, বহু আলেম-উলামা ও বুদ্ধিজীবী ছিল, এবং ছিল বিশাল জনগণ। কিন্তু তাদেরকে এ বিষয়ে মত প্রকাশের সুযোগ দেয়া হয়নি। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’য়ের ন্যায় পাকিস্তান বিরোধী দলগুলোও দেশটির প্রতিষ্ঠা রুখতে সর্বশক্তি দিয়ে প্রচার চালানোর সুযোগ পেয়েছিল। অথচ আওয়ামী লীগের জঙ্গিদের পক্ষ থেকেই মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই দেশে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করা হয়। এবং বিলুপ্ত হয় শান্তিপূর্ণ সভা-সমিতি ও আলাপ-আলোচনার পরিবেশ। দেশে প্রতিষ্ঠা পায় প্রচণ্ড ফ্যাসিবাদী প্রক্রিয়া। সৃষ্টি হয় ত্রাসের রাজত্ব। দেশ কোন দিকে যাবে বা দেশের ভবিষ্যৎ কি হবে -তা নিয়ে কথা বলেছে একমাত্র মুজিব ও তার সঙ্গিরা। ছিনতাইকারির কবলে পড়লে অধিকাংশ মানুষের মুখে ভাষা থাকে না; সবাই টের পায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীর সাথে আলোচনা অর্থহীন। চারিদিকে তখন নিরবতা ছেয়ে যায়। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দি দলগুলোর নেতাকর্মীদের অবস্থাটি ছিল অবিকল তাই। উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় ছিনতাইয়ের ঘটনা। অথচ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বহু প্রবীন রাজনীতিবিদ,আলেম-উলামা ও বুদ্ধিজীবী ছিলেন। ফ্যাসিবাদের উগ্রমুর্তি দেখে তারাও সেদিন নিরব হয়ে যান। নিরব হয়ে যায় সাধারণ জনগণও।সন্ত্রাসের সামনে সে নিরবতাকেই বাঙলী জাতীয়তাবাদীগণ তাদের পাকিস্তান ভাঙ্গার প্রজেক্টের প্রতি গণসমর্থণ বলেছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি কালে এভাবে কাউকে নিরব হতে হয়নি।

স্বাধীনতার বিষয়টিকে নির্বাচন কালে আলোচিত না হলেও নির্বাচনের পর এটিকেই মূল ইস্যু বানানো হয়। জনগণের উপর দলীয় সিদ্ধান্তকে চাপিয়ে দেয়া হয়।এতোবড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিছক আওয়ামী লীগ, মস্কোপন্থী ন্যাপ, চীনপন্থী ন্যাপের একাংশ এবং কম্যুনিস্ট পার্টির ন্যায় ইসলাম থেকে দূরে সরা দলগুলির নিজস্ব প্রজেক্টে পরিণত হয়। এভাবে স্বাধীনতার প্রশ্নে যুদ্ধ শুরু করা হয় জনগণের রায় না নিয়েই। এভাবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যাত্রাটি শুরু হয় জনগণের মাঝে গভীর বিভক্তি নিয়ে।এবং সে বিভক্তিকে আজও নানা ভাবে গভীরতর করা হচ্ছে। ১৯৭১’য়ের মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই সমগ্র দেশে নিরস্ত্র অবাঙালী এবং তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের উপর হামলা শুরু  হয়। অপরদিকে ভীতসন্ত্রস্থ রাখা হয় পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর নিরস্ত্র নেতাকর্মীদের। সৃষ্টিকরা হয় আইনশৃঙ্খলাহীন এক যুদ্ধকালীন অবস্থা। সমাজের দুর্বৃত্তদের জন্য সৃষ্টি হয় লুটপাটের মোক্ষম সময়। এরূপ অবস্থায় কি রাজনৈতিক বিচার-বিবেচনার সুযোগ থাকে? যুদ্ধ শুরুর কারণ, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের (পার্লামেন্ট) ৩রা মার্চ অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকটি ১লা মার্চ মুলতবি করেছিলেন। কিন্তু সেটি কি পাকিস্তান ভাঙ্গা ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর কারণ হতে পারে? বৈঠক মুলতবি হলে সেটি আবার শুরুও করা যায়। কিন্তু দেশ ভেঙ্গে গেলে তা কি আবার জোড়া লাগানো যায়? কিন্তু ইয়াহিয়া খানের বৈঠক মুলতবি করার ঘোষণাটিকেই স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর কারণ রূপে ঘোষণা দেয়া হয়।

 

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের রাজনীতি

নির্বাচনি বিজয়ের পর শেখ মুজিবের হাতে কেন সেদিন ক্ষমতা দেয়া হয়নি –আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের সেটিই মূল অভিযোগ। জাতীয় পরিষদ তথা সংসদের বৈঠককে মুলতবি করাকে তারা মুজিবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করে। ইয়াহিয়া খান কেন বৈঠক কেন মুলতবি করলেন -সেটির কারণও তারা খতিয়ে দেখতে রাজী নয়। মনে রাখতে হবে, তখন দেশে কোন শাসনতন্ত্র ছিল না। তাই সত্তরের নির্বাচনের পর নির্বাচিতদের প্রথম দায়িত্বটি ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের জন্য একটি শাসনতন্ত্র তৈরি। স্মরণযোগ্য হলো, যে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক দলিলটি স্বাক্ষর করে শেখ মুজিব ও তার দল নির্বাচনে অংশ নেয় তাতে নির্বাচনের পর পরই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের শর্ত ছিল না। দেশের সামরিক শাসক রূপে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দেশ চালাতেন সামরিক আইন অনুযায়ী; ক্ষমতা হস্তান্তর হলে সে আইনও তুলে নিতে হত।প্রশ্ন হলো, নির্বাচন শেষে সাথে সাথে ক্ষমতা অর্পণ করলে দেশ চলতো কোন আইন অনুযায়ী? ফলে একমাত্র শাসনতন্ত্র তৈরির পরই সুযোগ ছিল সে শাসনতন্ত্র অনুযায়ী দেশ শাসনে নির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের।শাসনতন্ত্র তৈরির জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল ১২০ দিন তথা ৪ মাস। এটিই ছিল ৮ দফা লিগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্কের সুনির্দিষ্ট বিষয়। শাসতন্ত্র তৈরির কাজ শেষ না অবধি এ ৪ মাস দেশ চলবে সামরিক আইন অনুযায়ী –এ নীতিমালায় স্বাক্ষর করেই শেখ মুজিব নির্বাচনে অংশ নেন। অথচ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর শেখ মুজিব নিজের স্বাক্ষীরিত সে নীতিমালাকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেন এবং ইচ্ছকৃত ভাবেই ভূলে যান, সেরূপ কোন নীতিমালা আদৌ ছিল এবং তাতে তিনি স্বাক্ষর করেছিলেন। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে ইয়াহিয়া ও ভূট্টোর সাথে আলোচনা চলা কালে দাবি তোলেন, সামরিক আইন তুলে নেয়ার ও আশু ক্ষমতা হস্তান্তরের। ইতিহাসে মুজিবের এরূপ আচরণ যে তার নিজ ওয়াদার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা গণ্য হবে –তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? বাঙালী সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীগণ মুজিবের এরূপ ওয়াদাভঙ্গের বিষয়টিকে ইচ্ছাকৃত ভাবেই ইতিহাসের বই থেকে লুকিয়েছেন।

যে কারণে সংসদের বৈঠক মুলতবি করা হয়েছিল –তা নিয়েও কি কোন নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হয়েছে? বৈঠক মুলতবির ঘোষণাকে বাঙালী বা মুজিবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলা হয়েছে। বিষয়টি কি তাই? মুলতবির কারণটি ছিল, মুজিব, ভূট্টো ও পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মাঝে শাসনতান্ত্রিক ইস্যুগুলি নিয়ে অচলাবস্থা। পাকিস্তানে তখন ৫টি প্রদেশ। কোন একটি প্রদেশ কি অন্য প্রদেশগুলির উপর তার নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারে? সেটি তো সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার। ভারতীয় হিন্দুগণ তেমন একটি স্বৈরাচার মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দিবে -সে ভয়েই তো পাকিস্তান সৃষ্টি হলো। গণতন্ত্রের রাজনীতি হলো আপোষরফা ও সমাঝোতার রাজনীতি। এ রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘিষ্ঠ –উভয়ের স্বার্থই গুরুত্ব পায়; কেউ কারো উপর অবিবেচক হয় না। তাই পাকিস্তানের আর ৪টি প্রদেশের নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনা না করে শাসনতন্ত্র তৈরী অসম্ভব ছিল। অথচ মুজিব তাতে রাজী ছিল না। মুজিব ও তার আওয়ামী লীগের দাবী ছিল, যেহেতু তার দল পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের মেজোরিটি, অতএব শাসনতন্ত্র রচনার দায়িত্বটি তাদের। এবং অন্য কারো সে অধিকারে হস্তক্ষেপের অধিকার নেই। এমন একটি সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র রচনার সময়।তখনও ছিল ৫টি প্রদেশ। ভারতীয় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের অনুকরণে সংসদের নিন্ম ও উচ্চ পরিষদ রাখার কথা উঠেছিল। নিন্ম পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হবে জনসংখ্যার অনুপাতে,কিন্তু উচ্চ পরিষদে প্রতিটি প্রদেশ সমান সংখ্যক সদস্য পাঠাবে যেমনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে হয়ে থাকে। এরূপ শাসনতন্ত্রে শর্ত থাকে,নিন্ম পরিষদে পাশ হওয়া যে কোন আইনকে অবশ্যই উচ্চ পরিষদ দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে। তখন পূর্ব পাকিস্তানে ছিল মাত্র একটি প্রদেশ, এবং  পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান -এ ৪টি প্রদেশ। ফলে নিন্ম পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও উচ্চ পরিষদে তাদের আসন সংখ্যা হত ৫ ভাগের মাত্র এক ভাগ। তখন সে সমস্যা এড়াতে দেশের উভয় অংশের সংসদ সদস্যদের মাঝে আপোষরফা হয়। মীমাংসা হয়, পশ্চিম পাকিস্তানের ৪টি প্রদেশকে ভেঙ্গে একটি প্রদেশ করার এবং দেশের জাতীয় সংসদে পূর্ব ও পশ্চিমের উভয় প্রদেশের সমান সংখ্যক আসন বরাদ্দের। আওয়ামী লীগের নেতা সোহরাওয়ার্দীসহ অন্যান্য পূর্ব পাকিস্তানীরা সে  সমতার বিধানকে মেনে নেন। কিন্তু ১৯৭১য়ে এসে সে মীমাংসিত বিষয়গুলো আবার নতুন করে উত্থিত হয়। এবং উত্থিত হয় নানা প্রদেশ থেকে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের বিষয়ও। তাই বিষয়টি এতো সহজ-সরল ছিল না যে, সংসদের বৈঠক বসবে এবং সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যগণ নিজেদের ইচ্ছা মত একটি সংবিধান প্রণোয়ন করে ফেলবে। অথচ আওয়ামী লীগ সেটিই চাচ্ছিল। তেমন প্রচেষ্টা হলে অন্য প্রদেশের সংসদ সদস্যগণ যে সে সংসদে যোগ দিবে না –সে ঘোষণাটিও বার বার দেয়া হচ্ছিল। তাই জরুরী ছিল সংসদের বৈঠক বসার আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে আপোষরফা।      

 

ট্রোজান হর্সদের দখলদারি

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান চাচ্ছিলেন, সংসদে বসার আগে নানা দলের মাঝে বিরাজমান বিরোধগুলি নিয়ে আলোচনা ও সমাঝোতার একটি পরিবেশ সৃষ্টি হোক। তাছাড়া শাসনন্ত্র প্রণয়োনের জন্য বরাদ্দকৃত সময়টি ছিল মাত্র ১২০দিন। পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচনায় লেগেছিল ৯ বছর। সংসদে প্রবেশের আগে বিরোধগুলির মীমাংসা না হলে রাজপথের হিংসাত্মক লড়াই তখন সংসদের অভ্যন্তরে শুরু হতো। সংসদের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল ঢাকায়। রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে এমন সহিংস লড়াইয়ে ঢাকায় ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের বৈঠকে ডেপুটি স্পীকার জনাব শাহেদ আলী খুন হয়েছিলেন। সে খুনে আওয়ামী লীগের নেতারা জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আরো সময় দেয়াই ছিল জাতীয় পরিষদের বৈঠক মুলতবির মূল উদ্দেশ্য। অথচ ক্ষমতা হাতে পেতে দেরি হওয়ায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তখন পাগলপ্রায়। কোনরূপ দেরি তাদের সইছিল না। ইয়াহিয়ার পক্ষ থেকে সে মুলতবিকে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ বাঙালীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রূপে আখ্যায়ীত করে এবং গোটা পরিস্থিতিকে আরো অস্থির করে তোলে।  

একাত্তরের মার্চের শুরুতেই মনে হচ্ছিল একটি সুযোগসন্ধানী মহল স্রেফ যুদ্ধাবস্থা ও অরাজকতা সৃষ্টির বাহানা খুঁজছিল। এরা ছিল আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একটি জঙ্গি গ্রুপ,অখণ্ড পাকিস্তানের নিয়ে যাদের কোন আগ্রহই ছিল। তাদের পাকিস্তানে ভাঙ্গার প্রকল্প ছিল ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকেই। -(আব্দুর রাজ্জাক, ১৯৮৭)। ইয়াহিয়া খানের বৈঠক মুলতবি ঘোষণাটিকে তারা নিজেদের লক্ষ্য পূরণে মোক্ষম বাহানা হিসাবে বেছে নেয়।সুযোগসন্ধানী ভারতও তেমন একটি মওকার অপেক্ষায় ছিল। এ জঙ্গিগ্রুপের নেতাকর্মীরা ছিল ভারতের ট্রোজান হর্স (Trojan Horse)-যারা পাকিস্তানের ধ্বংসকল্পে দীর্ঘকাল উৎপেতে বসে ছিল। খোদ আওয়ামী লীগ এদের হাতে জিম্মিতে পরিণত হয়। হঠাৎ শুরু করা পাকিস্তান ভাঙ্গার এ যুদ্ধকে জায়েজ করতেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ বলা শুরু করে সত্তরের নির্বাচনই স্বাধীনতার পক্ষে রেফারেন্ডাম। অথচ এটি ছিল রিফারেন্ডামের ভূল ব্যাখ্যা। পাকিস্তান ভাঙ্গা ও স্বাধীন বাংলাদেশ গড়া নিয়ে রেফারেন্ডাম হলে সাধারণ মানুষতাতে বিপুল হারে অংশ নিত। কারণ পাকিস্তান ভাঙ্গার বিষয়টি মামুলি বিষয় ছিল না। সেটি ছিল বাঙালী মুসলমানদের আগামী বহুশত বছরের জন্য ভাগ্য নির্ধারণের বিষয়। নিছক ক্ষমতা দখলের নির্বাচনে অনেকেই ভোট কেন্দ্রে যায় না এবং ভোটও দেয় না। সত্তরের নির্বাচনে প্রধান বিষয়গুলি ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন লাভ, কেন্দ্রীয় সরকারে ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব এবং পাকিস্তানের দুই প্রদেশের মাঝে বৈষম্য কমিয়ে আনা। সে নির্বাচনটি কখনোই পাকিস্তান ভাঙ্গার বিষয় রূপে বিবেচিত হয়নি। এবং এ বিষয়টি ধরা পড়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সে সময়ের পত্রিকাগুলির পাতায় নজর বুলালে। 

 

নির্বাচন ও মুজিবের মুখোশ

সরকার গঠনে নির্বাচন আর স্বাধীনতা ইস্যুতে জনমত যাচাই –এ দুটি বিষয় এক নয়।সরকার গঠনে একটি দল কতটি আসন পেল মাত্র সেটিই গণনায় আনা হয়, প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত নয়।যে দলটি বেশী সিট পায় তাকেই সরকার গঠন করতে বলা হয়। তাই বহুদলীয় নির্বাচনে ভোট ভাগাভাগীর ফলে শতকরা তিরিশ বা পঁয়ত্রিশ ভাগ ভোট পেলেই সরকার গঠন করা যায়, শতকরা ৫১ ভাগ ভোট লাগে না। বিলেত,ভারত বা বাংলাদেশের নির্বাচন তার উদাহরণ। কিন্তু কোন একটি বিষয়ে রেফারেন্ডাম হলে তাতে বিজয়ী হতে কমপক্ষে ৫১% ভাগ ভোট লাগে। সত্তরের নির্বাচনে শতকরা মাত্র ৫৬ জন পূর্ব পাকিস্তানী ভোটার ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়েছিল। ভাষানী ন্যাপসহ অনেকেই নির্বাচন বর্জন করেছিল। অর্থাৎ শতকরা ৪৪ জন ভোটারের কাছে নির্বাচন কোন আকর্ষণই সৃষ্টি করতে পারিনি। তাদের মধ্যে শতকরা ৭৫ জন ভোট দিয়েছিল আওয়ামী লীগকে। এর অর্থ দাঁড়ায়, আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তালিকাভূক্ত সমগ্র ভোটারের শতকরা মাত্র ৪২ ভাগ। ভোটদাতাদের অধিকাংশ তথা শতকরা ৫৮ ভাগ আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি। অথচ মাত্র ৪২% ভাগ ভোট পেয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে দলটি সিট পেয়েছিল মাত্র ২টি সিট বাদে সবগুলি। বহুদলীয় নির্বাচনে সচারাচর এমনটিই ঘটে। ফলে এ কথা কি করে বলা যায়, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষে ভোট দিয়েছিল? তাছাড়াও কথা রয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা তো নির্বাচনে কোন ইস্যুই ছিল না।

১৯৭০’য়ের নির্বাচনে স্বাধীনতা কোন ইস্যু হলে তার পক্ষে-বিপক্ষে সেদিন একটি রেফারেন্ডাম অপরিহার্য ছিল। রেফারেন্ডামে প্রার্থী থাকে না। ভোট হয় একটি বিশেষ ইস্যুর পক্ষে বা বিপক্ষে। ফলে প্রার্থীর মাঝে ভোট বিভক্ত হয় না। যদি পাকিস্তান ভাঙ্গানিয়ে রেফারেন্ডাম হত তখন মুসলিম লীগের তিন গ্রুপ, নুরুল আমীনের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, নিজামে ইসলামী, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামীর মত তৎকালীন পাকিস্তানপন্থী দলগুলোর মধ্যে কি ভোট ভাগ হত? দেশের আলেম-উলামা ও পীর-মাশায়েখগণযারা মুসলিম দেশের বিভক্তিকে হারাম মনে করেছিলেন -তারা কি নির্লিপ্ত থাকতেন? এমন কি  আওয়ামী লীগেরও বহু প্রবীন সদস্য অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে থাকতো। মুজিব যখন ৬ দফা প্রস্তাব পেশ করেন তখন পূর্ব পাকিস্তানের ১৭টি জেলার মাঝে ১৪টি জেলার আওয়ামী লীগ নেতাই দলে ছেড়ে দিয়েছিল। -(আব্দুর রাজ্জাক, ১৯৮৭)। তখন দলটি ৬ দফাপন্থী ও পিডিএমপন্থী -এ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। (পিডিএম: এটি হলো পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক মুভমেন্ট -যা ছিল আইয়ুবের স্বৈরাচার বিরোধী বহুদলীয় জোট)। তাই পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি নিয়ে রেফারেন্ডাম হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলিম যে ১৯৪৬’য়ের ন্যায় অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে রায় দিত –তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে? খোদ মুজিব সেটি বুঝতেন –তাই পাকিস্তান ভাঙ্গার বিষয়টি তিনি নিজ মনে গোপন রেখেছেন। তা নিয়ে রেফারেন্ডামের কথা তিনি কখনোই মুখে আনেননি। নির্বাচন কালে তার মুখোশটি ছিল একজন পাকিস্তানীর। তাই যখনই তাকে প্রশ্ন করা হয়েছে যে ৬ দফা পাকিস্তানকে দুর্বল করবে তখনই বলেছেন, ৬ দফা পাকিস্তানকে আরো মজবুত করবে। অথচ নির্বাচনের পর তিনি পুরা নির্বাচনী ফলাফলকেই হাইজ্যাক করেছেন। পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র নির্মানের ওয়াদা দিয়ে নির্বাচন জিতে সে নির্বাচনের ফলাফকে পাকিস্তান ভাঙ্গার হাতিয়ারে পরিণত করেছেন। পার্লামেন্ট কাউকে প্রধানমন্ত্রী বানাতে পারে, আইন বা বাজেট বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু দেশকে বিভক্ত করতে বা অন্যদেশের কাছে বিক্রয় করতে পারে না। সেটি আদৌ পার্লামেন্টারী বিষয় নয়, বরং দেশের জনগণের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়। অথচ মুজিব এক্ষেত্রে জনগণকে সে অধিকার দেননি। পাকিস্তান ভাঙ্গা বা স্বাধীনতার বিষয়ে জনগণ থেকে কোন কালেই রায় নেয়া হয়নি। এমনকি তার নিজ দলেও এ নিয়ে কোন আলোচনা হয়নি। সিদ্ধান্ত তিনি একা নিয়েছেন। নির্বাচনে বিজয়ের পর তিনি তার রাজনীতির গোলপোষ্টই পাল্টিয়ে ফেলেছেন। ৮ দফা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের যে রুল মেনে তিনি নির্বাচনে নেমেছেন সেটি রুলগুলিও তিনি মানেননি। এটি কি গণতান্ত্রিক রাজনীতির নীতি?

 

মুখোশটি প্রতারণার

মুজিবের মুখোশটি ছিল প্রতারণার। তিনি বলতেন গণতান্ত্রিক রাজনীতির কথা। অথচ তার ভিতরের রূপটি ছিল স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্টের।তবে সে মুখোশটি খসে পড়তে যেমন দেরী হয়নি;ফলে তার মূল চরিত্রটি জনগণের কাছে বেশী দিন গোপন থাকেনি। মুজিবের রাজনীতির লক্ষ্যটি ছিল স্রেফ নিজ স্বার্থ হাসিল। জনগণের মতামতের প্রতি তার সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ ছিল না।একবার নির্বাচিত হলে তিনি আর জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা করতেন না। ভাবতেন, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাকে যা ইচ্ছা তাই করবার অধিকার দিয়ে দিয়েছে। রাজনীতি নিয়ে তার নিজের স্বপ্ন ছিল। কিন্তু নিজের সে স্বপ্নের কথা জনগণকে বলেননি। জনগণ থেকে সে স্বপ্নের পক্ষে অনুমোদনের প্রয়োজনও বোধ করেননি। অথচ সে স্বপ্ন পূরণে দেশের চিহ্নিত শত্রু বা শয়তানের সাহায্য নিতেও তার আপত্তি ছিল না। নিজের সে স্বপ্ন পূরণে যুদ্ধ, মানব হত্যা বা গণতন্ত্র হত্যাতেও তার বিবেকে দংশন হত না। সেটিই মুজিবের রাজনীতিতে বার বার দেখা গেছে। বাংলাদেশীদের জীবনে একাত্তরের যুদ্ধ, বাকশালী স্বৈরাচার ও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ তো তখন এসেছে যখন তিনি ছিলেন দেশটির রাজনীতির কর্ণধার। ইচ্ছা করলে তিনি এগুলো রুখতে পারতেন। তিনি বরং ষড়যন্ত্র করেছেন ভারতীয় গুপ্তচরদের সাথে মিলে -যা ছিল এমন কি আওয়ামী লীগের দলীয় নীতিবিরুদ্ধ।–(অশোক রায়না, ১৯৯৬)। জনগণ ও জনমতের বিরুদ্ধে মুজিবের অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধার বিস্ফোরণটি ঘটে তার শাসনামলে।

শেখ মুজিবের মনে পাকিস্তান ভাঙ্গার স্বপ্নটি ছিল পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই। সেটি ১৯৪৭ সাল থেকেই।  সে কথাটি তিনি সদর্পে বলেছেন পাকিস্তান থেকে ফেরার পর ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি রেসকোর্সের জনসভায়। (মুজিবের সে উক্তিটি লেখক নিজ কানে শুনেছেন।) পাকিস্তান ভাঙ্গার স্বপ্নটি দেখতো ভারতও। ফলে ভারতের সাথে অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করাটি মুজিবের কাছে সহজ হয়ে যায়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তান ভাঙ্গার স্বপ্ন না দেখে ১৪ আগষ্ট উদযাপন করেছে স্বাধীনতা দিবস রূপে। একাকী স্বপ্ন দেখা আর গণতান্ত্রিক রাজনীতি করা তো এক কথা নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতি চলে জনগণের মতামত ও রায়ের ভিত্তিতে, কারো গোপন স্বপ্নের ভিত্তিতে নয়। নিজ স্বপ্নের ভিত্তিতে শত্রু দেশের সাথে ষড়যন্ত্র করা যায়,কিন্তু সেটি তো গণতান্ত্রিক রাজনীতির রীতি নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতি চলে জনগণের স্বপ্নে ভিত্তিতে। মুজিবের স্বপ্নে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন থাকলে -সেটি তার নিজের ব্যক্তিগত বিষয়।বাংলাদেশের জনগণ কেন তার ভূক্তভোগী হবে? তার স্বপ্নের ভূবনে ভারতের গোলামী মধুর লাগলে সেটিও তার নিজের ব্যাপার, জনগণ কেন তা কবুল করবে? অথচ তিনি তার নিজের পছন্দের বিষয়কে জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। এখানেই মুজিবের গুরুতর অপরাধ। ভয়ানক অপরাধীরাও সমাজে বন্ধু পায়, দলে লোকও পায়। কিন্তু তাতে অপরাধ কি জায়েজ হয়?

মুজিবের উচিত ছিল, পাকিস্তান ভাঙ্গা নিয়ে তার নিজ স্বপ্নের কথাটি ১৯৭০ এর নির্বাচনের বহু বছর পূর্বেই জনগণকে জানিয়ে দেয়া। তাতে জনগণ একটি যুদ্ধ থেকে বেঁচে যেত। গণতান্ত্রিক রাজনীতির সেটিই তো রীতি। নিজ স্বপ্ন মনে লুকিয়ে রেখে অন্য কথা বলে জনগণকে ধোকা দেয়াটি নিরেট ষড়যন্ত্র, রাজনীতি নয়। মুজিবের রাজনীতি ছিল মূলত সেরূপ একটি গভীর ষড়যন্ত্র –যা করা হয়েছিল ভারতীয় গুপ্তচরদের সাথে নিয়ে, বাংলাদেশের জনগণকে নিয়ে নয়।মুসলিম লীগ স্বাধীন পাকিস্তান সৃষ্টির কথাটি বলেছিল সাতচল্লিশের ৭ বছর আগে ১৯৪০ সালে। অথচ মুজিব ঘুনাক্ষরেও স্বাধীন বাংলাদেশের কথা মুখে আনেননি। বরং প্রতি জনসভায় পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়েছেন। এমনকি রেসকোর্সের ময়দানে ১৯৭০’য়ের নির্বাচনি জনসভাতে এবং ১৯৭১’য়ের ৭ই মার্চের জনসভাতেও দিয়েছেন। (লেখক নিজে সে জনসভা দু’টিতেই উপস্থিত ছিলেন এবং মুজিবের সে উক্তিও নিজ কানে শুনেছেন)। জনগণের সামনে তিনি হাজির হয়েছেন নিরেট পাকিস্তানী রূপে। এসবই ছিল মুখোশ পরা রাজনৈতিক অভিনয়; এবং সেটি জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্য। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার দেয়া ৮ দফা লিগাল ফ্রেমওয়ার্কে স্বাক্ষর করে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে তিনি লিখিত ভাবে কসম খেয়েছেন। আওয়ামী লীগের ১৯৭০’য়ের নির্বাচনি মেনিফেস্টোতেও অখণ্ড পাকিস্তানের প্রতি অঙ্গীকার ছিল। এসব দেখার পর কি কারো মনে সন্দেহ জাগে যে মুজিব পাকিস্তান ভাঙ্গার স্বপ্ন দেখতেন ১৯৪৭ সাল থেকে? তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানীরা সেটি ভাবেনি। পাকিস্তান সরকারও সেটি ভাবেনি। কথা হল, কোন মুসলমান যখন কোন কিছুতে স্বাক্ষর দেয় বা ওয়াদা দেয় -সেটি কি এতোই তুচ্ছ? মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় সেটি তো তার জন্য এক অলংঘনীয় কসম বা অঙ্গীকারে পরিণত হয়। কোন মুসলমান কি সে কসম বা অঙ্গীকার ভাঙ্গতে পারে? ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে জনগণ তো তাকে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষের ব্যক্তি রূপে জেনেই ভোট দিয়েছে। অথচ ১৯৭০’য়ের নির্বাচনের পর সে স্বাক্ষরিত কসম বা অঙ্গীকার ভঙ্গ আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল এজেন্ডায় পরিণত হয়। কথা হলো,নেতাগণই যদি ওয়াদা ভঙ্গ করেন এবং বিশ্বাসযোগ্য না হন -তবে সে সমাজের রাজনীতি,রীতি নীতি ও ব্যবসাবাণিজ্যে পারস্পারিক আস্থা বা বিশ্বাস বেঁচে থাকে কি করে? ঈমান বা বিশ্বাসই মুসলিমের প্রধান গুণ। কিন্তু ওয়াদাভঙ্গই যাদের রাজনীতি তাদের সে ঈমানটি কোথায়?  

 

অপরাধ নিহতদের বিরুদ্ধে

দূর্যোগে বা যুদ্ধে নরনারী দূরে থাক গবাদী পশু মারা গেলেও সভ্য দেশে একটি শুমারি হয়, ক্ষয়ক্ষতিরও পরিমাপ হয়। অথচ একাত্তরের গৃহযুদ্ধে কতজন মানুষ মারা গেল সে পরিসংখ্যান গ্রাম-গঞ্জ থেকে তিনি নেয়া হয়নি। অসংখ্য মানুষ যেমন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে মারা গেছে, তেমনি মারা গেছে মুক্তি বাহিনীর হাতেও। হাজার হাজার বিহারি যেমন মারা গেছে, তেমনি মারা গেছে হাজার হাজার বাঙালী মুসলমান ও হিন্দু। লুটতরাজ ও দেশত্যাগের মুখে পড়েছে যেমন বহু লক্ষ হিন্দু, তেমনি লুটতরাজ ও নিজ ঘর থেকে বহিষ্কারের মুখে পড়েছে বহু লক্ষ অবাঙালীও। তাদের সবাই ছিল মানুষ। এসব ভয়ানক অপরাধগুলি শুধু পাক-আর্মি বা বিহারীদের হাতে ঘটেনি। মুক্তিবাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাতেও ঘটেছে। অন্ততঃ মৃতের খাতায় তাদের প্রত্যেকের নামটি আসা উচিত ছিল। দেশের প্রতিটি জেলা, প্রতিটি থানা ও প্রতিটি ইউনিয়নের লোকদের জানার অধিকার ছিল একাত্তরে তাদের মধ্য থেকে কতজন নিহত হয়েছিল। আফগানিস্তান ও ইরাকের উপর হামলায় মার্কিন বাহিনী কতজন আফগান ও ইরাকীকে হত্যা করেছে সে হিসাব রাখেনি। মশা-মাছি মারলে যেমন গণনা হয় না, তেমনি গণনা হয়নি নিহত আফগান ও ইরাকীদেরও। কিন্তু নিজেদের লোকদের মাঝে কত হাজার নিহত বা আহত হয়েছে সে হিসাব তারা ঠিকই রেখেছে। ইরাকীদের মার্কিনীরা যে কতটা তুচ্ছ ভাবতো এবং তাদের সাথে তাদের আচরণ যে কতটা বিবেকহীন ছিল এ হল তার প্রমাণ। সে দেশ দুটিতে  মার্কিনারা ছিল আগ্রাসী হানাদার। প্রশ্ন হলো, একাত্তরে মৃত নরনারী ও শিশুদের সাথে মুজিবের আচরণও কি ভিন্নতর ছিল?

বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ শুধু এ নয় যে, যুদ্ধে তারা আপনজনদের হারিয়েছে। বরং বড় দুঃখ, তাদের মৃত আপনজনেরা সরকারের কাছে কোন গুরুত্বই পেল না। কোথায়, কিভাবে এবং কাদের হাতে তারা মারা গেল সে হিসাবটিও হল না। কোন রেজিস্টারে বা নথিপত্রে তাদের কোন নাম নিশানাও থাকলো না। শেখ মুজিব ও তাঁর সরকারের অপরাধ তাই নিহতদের সাথেও। গদীদখল ছাড়া আর সব কিছুই যে শেখ মুজিব ও তার দলের কাছে গুরুত্বহীন -এটি হলো তারই প্রমাণ। আওয়ামী বাকশালী পক্ষ শুধু নিজ দলের ক্ষয়ক্ষতিটাকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। অন্য পক্ষের ব্যথা-বেদনা ও ক্ষয়ক্ষতি সামান্যতম ধর্তব্যের মধ্যেও আনেনি। পরিবারের প্রতি সদস্যই জানতে চায় তার আপনজন কিভাবে মারা গেল এবং কে তার হত্যাকারি। বাংলাদেশের ইতিহাসে মুজিব ও তার দলীয় নেতাদের প্রচণ্ড গুণকীর্তন থাকলেও অতি প্রয়োজনীয় সে তথ্যটিই নেই। জাতির তথ্যভাণ্ডার এক্ষেত্রে শূন্য। আর এভাবে অসম্ভব করা হয়েছে সঠিক ইতিহাস রচনা। অথচ তথ্য সংগ্রহ ও তা সংরক্ষণের দায়িত্ব ছিল মুজিব সরকারের। কোন দেশপ্রেমিক সরকার কি এতোটা দায়িত্বহীন হতে পারে? কথা হল, বাংলাদেশের মত একটি জনবহুল দেশে কি গণনাকারিরও অভাব ছিল? বস্তুত যেটির অভাব ছিল সেটি সরকারের সদিচ্ছার। বরং প্রকট ভাবে কাজ করেছে সত্যকে গোপন করার তাড়না। তাই সঠিক পরিসংখ্যান এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ না করেই চলছে ইতিহাস লেখার কাজ।

 

যে প্রশ্ন হাজার বছর পরেও উঠবে

মিথ্যা ভাষণে পরিসংখ্যান লাগে না।মাঠঘাট ও গ্রামগঞ্জ খুঁজে তথ্য সংগ্রহ করাও লাগে না। সেজন্য প্রয়োজন একখানি জ্বিহবা এবং লাগামহীন খেয়াল খুশি। নিখুত পরিসংখ্যানের গরজতো তাদেরই যারা সত্য বলায় অভ্যস্থ, সে সাথে মিথ্যা পরিহারেও সতর্ক। স্বাধীনতার লক্ষ্যে রক্তদান যে কোন জাতির জন্যই অতি গর্বের। কিন্তু রক্তদানের নামে মিথ্যাচার হলে তাতে ইজ্জত বাড়ে না, বরং বিশ্বব্যাপী পরিচিতি বাড়ে নীতিভ্রষ্ট মিথ্যুক রূপে। আর প্রতিটি সভ্য মানুষই মিথ্যুককে ঘৃনা করে। ফলে মিথ্যাচারে যা বৃদ্ধি পায় তা হলো বিশ্বজোড়া অপমান। মুজিব নিজে অসত্য তথ্য দিয়ে সেটিই বাড়িয়েছেন। আর মিথ্যা তো সর্বপ্রকার দুর্বৃত্তির জনক। বাংলাদেশ যে ভাবে পরপর ৫ বার বিশ্ব মাঝে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের খেতাব পেল -তার ভিত্তিমূলটি তো এরূপ মিথ্যাচর্চার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল। ভূয়া গর্ব বাড়ানোর সহজ হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হয় মিথ্যা। সে তাগিদে শেখ মুজিবও তাঁর চিরাচিরত অভ্যাসটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি, মুখে যা এসেছে তাই বলেছেন। তিরিশ লাখ নিহতের তথ্যটি যে বিশ্বাসযোগ্য নয় -সেটিও তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। বুঝার চেষ্টাও করেননি। সম্ভবতঃ তার বিশ্বাস ছিল, পাকবাহিনী এখন পরাজিত, দেশবাসীও তার অনুগত, ফলে তিরিশ লাখ বা ষাট লাখের কথা বললেও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস ক’জনের? সেটিকে আরো রঙ চঙ লাগিয়ে বিশ্বময় প্রচারের কাজে মোসাহেবী লেখকের সংখ্যাও বাংলাদেশে সেদিন কম ছিল না। কেউ সেদিন প্রতিবাদ করেনি ঠিকই, কিন্তু এতে তাঁর নিজ চরিত্র যে নিরবে মারা গেল সে হুশ কি তার ছিল? ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তিনি চিহ্নিত হয়ে গেলেন মিথ্যুক রূপে।

শত শত বছর পরও প্রশ্ন উঠবে –শেখ মুজিব কোথা থেকে পেলেন তিরিশ লাখ নিহতের সংখ্যা? প্রশ্ন উঠবে,কারা, কবে, কিভাবে এবং কতদিনে তিরিশ লাখ মানুষ গণনার কাজটি সমাধা করেছিল? কোথায় সে গণনার কাগজপত্র? তারা তখন নিহতদের পরিচয় জানতে চাইবে। অসত্য চর্চার নায়কগণ ইতিহাসে এভাবেই সবার সামনে বিবস্ত্র  ও ব্যক্তিত্বহীন হয়। ইসলামের ইতিহাসে অতি বিজ্ঞ ব্যক্তি হলেন হযরত আলী (রাঃ)। তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নিয়ে মহান নবীজী (সাঃ) বলেছিলেন, “আমি ইলমের ঘর, আর আলী হল তার দরজা।” হযরত আলী (রাঃ)’র জ্ঞানসমৃদ্ধ বহু মূল্যবান কথা আজও মুসলিম বিশ্বে বহুল প্রচারিত। মানুষের ব্যক্তিত্বের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন,“ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব তার জিহ্বাতে।” অর্থাৎ ওয়াদা পালন ও সত্য কথনে। যে কারণে ব্যক্তির ঈমান ভেঙ্গে যায় সেটি মিথ্যা বলায়। মিথ্যুক ওয়াদা ভঙ্গকারীগণ তাই শুধু ঈমানহীনই নয়, ব্যক্তিত্বহীনও। মানুষের মূল্যমান নির্ধারণে আজও সত্যাবাদিতাই সবচেয়ে বড় মাপকাঠি;বিপুল দেহ, দেহের বল বা বড় বড় বক্তৃতামালা নয়। একজন ব্যক্তি যে দুর্বৃত্ত সেটি প্রমাণের জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে সে মিথ্যাবাদী। দুর্বৃত্তদের মাঝে তার যত সমাদরই থাক,সভ্য সমাজে সে তখন মূল্য হারায়। কোন মিথ্যাচারী ব্যক্তিকে ভক্তি করা বা মান্য করা কোনঈমানদারী নয়। ইসলামী রাষ্ট্রে কোন মিথ্যাবাদির হাতে শাসনক্ষমতা দেয়া দূরে থাকে, তাকে আদালতে সাক্ষ্যদানের অধিকারও দেয়া হয় না। কোন হাদীস বর্ণনাকারি মিথ্যাচারী প্রমাণিত হলে তার থেকে বর্ণিত কোন হাদীসই গ্রহণ করা হয় না। বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্মানজনক স্থানলাভে এখানেই মুজিবের মূল বাধা। এবং সেটি তার নিজের সৃষ্ট। তাই মুজিবকে নিয়ে তার ভক্তরা যাই বলুক, মুজিব তার নিজের মান নিজেই নির্ধারণ করে গেছেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *