কাভারিং ইসলাম PDF Print E-mail
Written by এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাইদ   
Wednesday, 07 September 2016 08:16

"... ‘কাভারিং ইসলাম প্রকাশিত হয় পনের বছর আগে (বইটির প্রথম প্রকাশ ১৯৮১ সালে) এর মধ্যে মার্কিন পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমের নজর তীব্রভাবে ঘনীভূত হয়েছে মুসলমান ইসলামের উপর। এর অনেকটাই অতিরঞ্জিত, ছাঁচ-বানানোর দোষে দুষ্ট এবং উন্মত্ত বৈরিতায় আচ্ছন্ন; আমার বইয়ে যতটা বর্ণনা করেছিলাম তার চেয়ে বেশী। আসলে ছিনতাই সন্ত্রাসে ইসলামের ভূমিকা, আমাদের (পশ্চিমাদের) এবং আমাদের জীবনযাপনের রীতিনীতির ওপর ইরানের মত কট্টর দেশগুলোর হুমকি প্রদানের বর্ণনা এবং দালান-কোঠা উড়িয়ে দেয়া, বাণিজ্যিক বিমান বিস্ফোরণ পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিষ প্রয়োগের সর্বশেষ ষড়যন্ত্র প্রভৃতি আন্দাজী কথাবার্তা ক্রমেই উস্কে দিচ্ছে পশ্চিমের চৈতন্য। ইসলামী বিশ্বের ব্যাপারে একদল বিশেষজ্ঞ এখন খ্যাতনামা। জরুরী পরিস্থিতিতে সংবাদ প্রোগ্রাম বা টকশোয় গৎবাঁধা ধারণার ভিত্তিতে বুদ্ধিবৃত্তিক ফতোয়া জারির জন্য এদেরকে সামনে খাড়া করা হয়। কিছুকাল আগেও মনে করা হতো মুসলিম বা -শ্বেতাঙ্গদের সম্পর্কে প্রাচ্যতাত্ত্বিক ধারণা পোষণ করা একরকম নেতিবাচক ব্যাপার। এখন ওসবেরই যেন পুনরুজ্জীবন শুরু হয়েছে। এই মুহূর্তে এমন এক সময়ে ঐসব ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে যখন অন্য কোনো সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানুষদেরকে বর্ণ বা ধর্মের দিক থেকে ভুলভাবে তুলে ধরলে অত সহজে পার পাওয়া যায় না। পশ্চিমে এখন ভিনদেশী সংস্কৃতিকে ছোট করার সর্বশেষ গ্রহণযোগ্য উপায় হলো ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিত সাধারণীকরণ (Generalization) সামগ্রিকভাবে মুসলমান মন বা চরিত্র কিংবা ধর্ম অথবা সংস্কৃতি সম্পর্কে যা বলা হয় তা আফ্রিকান, ইহুদি, অন্যান্য প্রাচ্যজাতি কিংবা এশীয়দের সম্পর্কিত মূলধারার আলোচনায় বলা অসম্ভব।

 

 

 


...
ইসলামী বিশ্বে আবেগের বিস্ফোরণ ঘটছে। এবং অনেক সংগঠিত বা অসংগঠিত সন্ত্রাসী ঘটনাও ঘটেছে মার্কিন ইসরাইলী লক্ষ্যবস্তু ঘিরে। ইসলামী বিশ্বে উৎপাদনহীনতা নিম্ন জীবনমান, মত প্রকাশের নিষেধাজ্ঞা, গণতন্ত্রের তুলনামূলক অনুপস্থিতি, একনায়কত্বের ভয়ংকর উত্থান, কঠোর নিয়ন্ত্রণ দমনমূলক সরকার ইত্যাদির কোনো কোনোটি সন্ত্রাস, নির্যাতন লিঙ্গচ্ছেদের মত ঘটনা উৎসাহিত করে।সব মিলিয়ে ইসলামী বিশ্বের অবস্থা অবনতির দিকে। এর মধ্যে আছে সৌদি আরব, মিশর, ইরাক, সুদান, আলজিরিয়া প্রভৃতি প্রধান প্রধান ইসলামী দেশ। ছাড়াও বেশ কিছু সংখ্যক মুসলমান আছেন যারা সাম্প্রতিক মুসলিম বিশ্বের সকল দুর্দশার পথ্য হিসেবে সরলীকরণসূত্রে সাত দশকের মক্কার অস্পষ্ট কল্পনার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছেন। এদের কর্মকান্ডও যে প্রবলভাবে নিরুৎসাহব্যাঞ্জক তা অস্বীকার করা ভণ্ডামীর শামিল।

 

ইরাক, লিবিয়া, চেচনিয়া বসনিয়ার ঘটনাগুলো ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের চোখে একটা জায়গায় এগুলোর সাদৃশ্য আছে। তা হলো পশ্চিমা, বিশেষত খ্রিষ্টিয় শক্তি ইসলামের বিরুদ্ধে এক বিরতিহীন যুদ্ধে রত। এভাবে মেরুকরণ আরো পোক্ত হয়েছে এবং দুই সংস্কৃতির মধ্যে আলাপ-আলোচনার সুযোগ হয়েছে অন্তর্হিত। অনেক মুসলমান লিখেছেন যে, যদি বসনীয়, ফিলিস্তিনী চেচনিয়রা মুসলমান না হতো এবং যদি সন্ত্রাস ইসলাম থেকে উদ্ভূত না হতো, তাহলে পশ্চিমা শক্তিগুলো আরো কিছু করতো। ইসরাইল তো আরব মুসলমানদের জায়গা দখল করে নিজের অঙ্গীভূত করে নিয়েছে, তার কোন শাস্তি হয়নি। তা হলে কেবল মুসলমানরা কেন লজ্জাজনক পক্ষপাতমূলক শত্রুতার শিকার? বহু আমেরিকানের কাছে ইসলাম সমস্যা ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমার কথা হলো ইসলামকে ব্যাখ্যা করা বা নির্বিচারে দোষারোপ করার জন্য ইসলাম লেবেলটির ব্যবহার এখন আক্রমণের একটা কায়দায় পরিণত, যা ইসলাম পশ্চিমের স্বঘোষিত প্রতিনিধিদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইসলামী বিশ্ব কোটি কোটি মানুষ, বহু সংখ্যক দেশ, সমাজ, ঐতিহ্য, ভাষা এবং অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার সমাবেশ। সেখানে যা হচ্ছে ইসলাম কথাটি তার ক্ষুদ্র একটি অংশের পরিচায়ক মাত্র। এই বিপুল ব্যাপারগুলোকে কেবল ইসলামী লেবেলে সংকুচিত করা সরল মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়; যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ইসরাইলে সক্রিয় প্রাচ্যতাত্ত্বিকেরা (Orientalist) যত উচ্চস্বরে জোরের সাথেই বলুন না কেন যে, ইসলামী সমাজের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত পরিচালিত হয় ইসলামের দ্বারা, দারুল-ইসলাম একটি একক সংসক্ত সত্তা, এবং ইসলামে মসজিদ রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো ফারাক নাই ইত্যাদি। এগুলো সবচেয়ে দায়িত্বহীন ধরনের সাধারণীকরণ (Generalization),যা অন্য কোন ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, পরিসংখ্যানগত গোষ্ঠী সম্পর্কে প্রয়োগ করা অসম্ভব। পশ্চিমা সমাজের জটিল তত্বমালা, সমাজ-সংগঠন, ইতিহাস, সংস্কৃতি নিয়ে ক্রমশ বদলে যাওয়া বিচিত্র বিশ্লেষণ, অন্বেষার সাজানো পরানো ভাষা সম্পর্কে আমরা যেমন আশাবাদী, তেমনি আশা করি ইসলামী সমাজ সম্পর্কে তাদের বিশ্লেষণও যেন ওরকম হয়।

...
অথচ পন্ডিতি বিশ্লেষণ এর বদলে আমরা পাই সাংবাদিকসুলভ অতিরঞ্জিত বিবৃতি। এগুলোর ওপরই আরেকদফা রঙ চড়ায় প্রচার মাধ্যম।এদের কাজের ওপর অস্পষ্ট ভীতির মতো ঝুলে থাকে মৌলবাদ নামের ধারনাটি, প্রায়ই তারা এর উল্লেখ করে। অথচ কথাটির সাথে গাঢ় - বর্তমানে অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া - সম্পর্ক রয়েছে হিন্দুত্ববাদ, খ্রিষ্ট ধর্ম, ইহুদি ধর্ম সংস্কৃতির। ইসলাম মৌলবাদের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্ট সম্পর্ক পাঠকদের মনে ধারণাই নিশ্চিত করে যে ইসলাম মৌলবাদ একই ব্যাপার। ইসলামের বিশ্বাস, এর প্রতিষ্ঠাতা অনুসারীদের সম্পর্কে সাধারণীকরণ এবং ইসলামকে কিছু রীতিনীতি ছাঁচ (mold) সংকুচিত করে নিয়ে আসার এই যে প্রবণতা তা ইসলামের সাথে জড়িত প্রতিটি নেতিবাচক ব্যাপার সন্ত্রাস, আদিমতা, ভীতিকর বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বাড়িয়ে দেয়ার পেছনে অব্যাহত কারণ হিসেবে বর্তমান।এইসব করা হচ্ছে অথচ মৌলবাদ কে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি, চরমপন্থী, ফান্ডামেন্টালিষ্ট কথাগুলোর পরিস্কার অর্থ বা পটভূমি নির্দেশ করা হয়নি।(যেমন এভাবে বলা যে মুসলমানদের %, ১০% কিংবা ৫০% মৌলবাদী)

...
আমি বলছি না যে ইসলামের নামে ইসরাইলী পশ্চিমাদেরকে আক্রমণ আহত করেনি মুসলমানরা। আমি বলছি লোকেরা প্রচার মাধ্যমে যা পড়ে এবং দেখে তার অধিকাংশ এমন একটা অবস্থা তুলে ধরে যেন আগ্রাসন ব্যাপারটার উদ্ভবই ইসলাম থেকে, যেন ইসলাম আসলে তা-ই। এভাবে স্থানিক নিরেট পরিস্থিতি আড়ালে চলে যায়। অন্য ভাবে বলা যায় যে,কাভারিং ইসলাম হলো একরকম পক্ষপাতমূলক তৎপরতা যা আমাদের (পশ্চিমাদের) কৃতকর্ম অস্পষ্ট করে রাখে, এবং মুসলমান আরবরা ত্রুটিপূর্ণ স্বভাবের কারণে কী তা তুলে ধরে।

... সাংবাদিক বা প্রচার মাধ্যমের কারো আছে কেউ এমন আশা করবে না যে তিনি বা তারা অনেক সময় দিয়ে পড়াশোনা করে এক একজন পন্ডিত হয়ে উঠবেন, ভিন্ন মত খুঁজে বেড়াবেন কিংবা এমন জ্ঞানার্জনের চেষ্টা করবেন যাতে মনে হয় ইসলাম আদিম বা আগ্রাসী নয়। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে সংকুচিত যুক্তির ওপর জোর দেয় এমন মতামত বিনা সমালোচনায়, অন্ধের মত মেনে নেয়া কেন? ইসলামকে দায়িত্বহীন ভাবে চিত্রিত করার উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেয়া সরকারী ভাষ্যগুলো গ্রহণ করতে এত আগ্রহ কেন? আমি বোঝাতে চাচ্ছি ইসলাম সম্পর্কে যথেচ্ছা সন্ত্রাস শব্দটি ব্যবহারের প্রবণতাকে, ইসলামী বিপদ বিষয়ে ইসরাইলী মতামতকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় নীতির স্তরে নিয়ে এসেছে যে মনোভাব, সেই মনোভাবকে।


...
পৃথিবীর নতুন নতুন রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক যে সব বিন্যাস আমাদের পছন্দ হয়না তাই ইসলামের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার যৌথ মনোভঙ্গী লক্ষ্য করা যায়। ডানপন্থীদের কাছে ইসলাম বর্বরতা, বামপন্থীদের মতে মধ্যযুগীয় ধর্মতন্ত্র; আর মাঝপন্থীরা মনে করেন এটি রুচি বিনষ্টকারক, আকর্ষণীয় রহস্যময় ব্যাপার। সকল দলের মধ্যে একটা সাধারণ ঐক্য এই যে ইসলামী বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জানার পরিধি যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন, অনুমোদন করার মত বিশেষ কিছু নেই ইসলামে। ইসলামের যা মূল্যবোধের ব্যাপার তা মূলত এন্টি-কমিউনিজম; এবং মজার ব্যাপার হলো ইসলামের এন্টি-কমিউনিজম দমন-মূলক মার্কিন শাসনব্যবস্থারই একটি রূপ।


... ‘
ইসলামশব্দটি যেন বৈচিত্রপূর্ণ মুসলিম বিশ্বের সকল বৈশিষ্ট্যর ধারক, যেন তা সবকিছুকে সংকুচিত করে পরিণত করে অশুভ, অচিন্তনীয় এক সত্তায়। এরই পরিণতি হলো বিশ্লেষণ উপলব্ধির পরিবর্তে সবখানে আমরা-ওরা পরিকাঠামো সৃষ্টি। যখন ইরানী মুসলমানরা তাদের ন্যায়বিচারবোধের কথা বলে, তাদের দমনের ইতিহাসের কথা বলে, নিজেদের সমাজের ভবিষ্যত কল্পনা করে তখন এগুলোকে মনে হয় অপ্রাসঙ্গিক। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই মুহুর্তে ইসলামী বিপ্লব ঠিক কি করছে, খোমাইটদের হাতে কত লোক মারা গেছে, আয়াতুল্লাহ কতগুলো উদ্ভট দৌরাত্ন্যপূর্ণ কাজের নির্দেশ দিয়েছেন ইসলামের নামে, ইত্যাদি। কিন্তু কেউ কখনো জোনসটাউনের গণহত্যা বা ইন্দোচীনের ধবংসযজ্ঞের সাথে খ্রিষ্টান ধর্মকে কিংবা পশ্চিমা বা মার্কিন সংস্কৃতিকে এক করে দেখেনা। রকম মিল দেখানোর রীতি তুলে রাখা আছে কেবল ইসলাম' এর জন্য।

 

কেন বিশাল একরাশ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, এমনকি অর্থনৈতিক ঘটনাবলীকে এমন প্যাভলোভিয়ান কায়দায় ইসলাম শব্দটিতে সংকুচিত করে আনা হয়? এই ইসলাম এর ব্যাপারটাই বা কি যা দ্রুত লাগামহীন প্রক্রিয়ার জন্ম দেয়?পশ্চিমের কাছে ইসলামী জগত কোন দিক দিয়ে তৃতীয় বিশ্বের অবশিষ্ট অংশ থেকে ভিন্ন, কিংবা স্নায়ুযুদ্ধকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে অন্যরকম? জটিল প্রশ্ন এগুলো। কাজেই জবাব দেয়া উচিত ভেঙ্গে ভেঙ্গে, যথাযথ বৈশিষ্ট্য পার্থক্য বিবেচনায় রেখে। খুবই বিস্তৃত জটিল বাস্তবতাগুলোকে আখ্যায়িত করার জন্য নাম উদ্ভাবনের ব্যাপার আসলে জঘণ্যরকম অস্পষ্ট একটি বিষয়, আবার তা এড়ানোও যায় না। যদি ইসলাম লেবেলটি বেঠিক হয়ে থাকে এবং মতাদর্শের ভারে বোঝাই হয়ে থাকে, তাহলে এও সত্য যে পশ্চিম এবং খ্রিষ্টানত্ব কথাগুলোও বিতর্কিত। অথচ জাতীয় লেবেলগুলো এড়ানো কঠিন। কারণ মুসলমানরা ইসলামের কথা বলে - খ্রিষ্টানরা খ্রিষ্টানত্বের, ইহুদিরা ইহুদিবাদের এবং অন্য সবাই সংশ্লিষ্ট ধারণাগুলোর কথা বলে থাকে; বলে এমনভাবে যেন এগুলো খুবই গ্রহণযোগ্য সোজাসাপ্টা সত্য। এই লেবেলগুলো এড়িয়ে যাবার উপায় না বাৎলে বরং আপাতত স্বীকার করে নেয়া ভালো যে, এগুলো আছে এবং উদ্দেশ্যমূলক শ্রেণীবিভাজনরূপে নয়, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যাদের প্রয়োজনে এবং যাদের দ্বারা এগুলো বানানো আমি তাদের নাম দিয়েছি তাফসীরকারী দল। কাজেই আমাদের মনে রাখতে হবে ইসলাম, পশ্চিম, খ্রিষ্টান বিশ্ব ইত্যাদি ধারণা যখনই ব্যবহৃত হয় তখনই এগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে অন্তত দুভাবে এবং সৃষ্টি করে দুই রকম অর্থ। প্রথমটি হলো চিহ্নিত করার কাজ; যেমন আমরা যখন বলি খোমেনী একজন মুসলমান বা পোপ দ্বিতীয় জন পল একজন খ্রিষ্টান। ধরণের বিবৃতি আমাদেরকে বলে কোনো একটি জিনিষ বা বিষয় বা মানুষ নূন্যতম কী; তা জানায় অন্যসব কিছুর বৈপরীত্যের ভিত্তিতে। এস্তরে আমরা কমলা বা আপেলের (বা মুসলিম খ্রিষ্টানের) পার্থক্য এইটুকু বুঝতে পারি যে এগুলো ভিন্ন ফল একেকটা একেক গাছে জন্মায়। বহুস্তরের দ্বিতীয়টির কাজ সৃষ্টি করে অনেক জটিল অর্থ। পশ্চিমে ইসলাম কথাটি উচ্চারণ করার অর্থ হলো অনেক অপ্রিয় ব্যাপার বোঝানো যেগুলো এতক্ষণ ধরে উল্লেখ করেছি। আবার ইসলাম এমন অনেক কিছুই বোঝায় না শ্রোতা চাইলে যা বিষয়মুখীভাবে সরাসরি জানতে পারবেন। একই কথা খাটে যখন আমরা বলি পশ্চিম যারা ক্ষোভ বা নিশ্চয়তা নিয়ে নামগুলো ব্যবহার করে তাদের কয়জন পাশ্চাত্য ঐতিহ্য বা ইসলামী নীতিমালা অথবা ইসলামী বিশ্বের আসল ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান রাখে? সত্ত্বেও প্রবল আত্নবিশ্বাসের সাথে ইসলাম বা পশ্চিম ধারণাগুলোর ব্যবহার বন্ধ হয় না। এই বিশ্বাসেও চিড় ধরে না যে, বিষয়টি সম্পর্কে তারা যা জানে তা- পরম সত্য।

 

কারণে এইসব লেবেলকে গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। যে মুসলমান পশ্চিম সম্পর্কে বলেন কিংবা যে খ্রিষ্টান কথা বলেন ইসলাম সম্পর্কে, তার জন্য আছে এই বহু বিস্তৃত সাধারণীকরণের (Generalization) পেছনের এক দীর্ঘ ইতিহাস; তা তাদেরকে যেমন সক্ষম করে, তেমনি অক্ষমও বানায়। এগুলো মতবাদভিত্তিক মার্কা, তীব্র আবেগের মধ্যে গড়ে ওঠা। এগুলো পার করে এসেছে অনেক অভিজ্ঞতা; এগুলো নতুন তথ্য বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াতে সক্ষম। এই মুহূর্তে ইসলাম পশ্চিম নতুন জরুরী গুরুত্বের সাথে জড়ানো। এবং সাথে সাথে এও লক্ষণীয় যে, খ্রিষ্টান বিশ্ব নয়, বরাবর পশ্চিমই ইসলামের বিরুদ্ধে সক্রিয়। কেন? কারণ ওরা অনুমানে ধরে নিয়েছে যে, পশ্চিম তার প্রধান ধর্ম খ্রিষ্টানত্বের স্তর ছাড়িয়ে আরো বিস্তৃত বড় হয়ে গেছে; কিন্তু ইসলামী বিশ্ব এখনো তার ধর্মীয় আদিমতা পশ্চাৎপদতার পাঁকে আটকা। অথচ ইসলামী বিশ্ব সম্পর্কে এমন অনুমানের ক্ষেত্রে এই জগতটির বিচিত্রধর্মী সমাজ, ইতিহাস ভাষার প্রসঙ্গটি তাদের বিবেচনায় আসেনি। সুতরাং পশ্চিম আধুনিক, এর বিভিন্ন অংশের যোগফলের চেয়েও বড়, সমৃদ্ধিকারক বৈপরীত্যে পরিপূর্ণ; সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নে তা বরাবরই পশ্চিমা অন্যদিকে ইসলামের জগত কেবলই ইসলাম - কিছু অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্যে সংকুচিত করার যোগ্য, আর কিছুই নয়। অথচ পশ্চিমের মত ইসলামেও রয়েছে প্রচুর আভ্যন্তরীণ সংঘাত, অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য॥" (সংক্ষেপিত ঈষৎ পরিমার্জিত)
-
এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাইদ / কাভারিং ইসলাম (অনু : ফয়েজ আলম / ভিন্টেজ সংস্করণ থেকে ভাষান্তরিত)

 



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.