একাত্তরের স্মৃতি PDF Print E-mail
Written by ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন   
Wednesday, 04 January 2017 00:36

'৪০ সাল থেকে '৪৭ সাল পর্যন্ত যে অসংখ্য তরুণ পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েছিল, আমি তাদের অন্যতম। কৃতিত্বের জন্য একথা বলছি না, নিজের পরিচয় দেবার জন্য কথাটি উল্লেখ করছি। ৪১-৪২ সালে আমি যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের ছাত্র, তখন আমাকে সভাপতি করে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ গঠিত হয়। সৈয়দ আলী আহসান ছিল এ সংসদের সেক্রেটারী। আমাদের লক্ষ্য ছিল, বাংলা ভাষায় মুসলিম কালচারের পরিচয় থাকে এমন সাহিত্য সৃষ্টিতে লেখকদের উদ্বুদ্ধ করা। ১৯৪৪ সালে কলকাতা ইষ্ট পাকিস্তান রেনেসাঁস সোসাইটি (এর সভাপতি ছিলেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন) যে সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে তাতে ২৪ বৎসর বয়সে সাহিত্য শাখার সভাপতির দুর্লভ সম্মান লাভ করেছিলাম। এরপর সে বছর জুলাই মাসে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে লেকচারার হিসাবে যোগ দেই।

 

 

আবুল কালাম শামসুদ্দীনের অনূরোধে, দৈনিক আজাদে সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখতাম। ১৯৪৬ সালে যখন মাওলানা আকরম খাঁ ইংরেজি সাপ্তাহিক কমরেডের স্বত্ব খরিদ করে পত্রিকাটি পুনঃপ্রকাশের ব্যবস্হা করেন, নেপথ্যে থেকে সেটা সস্পাদনার ভারও আমি গ্রহণ করেছিলাম। তখন দু-একঢি ব্যতিক্রমের কথা বাদ দিলে সমগ্র মুসলিম সমাজ এই পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য দিনরাত খেটেছে। আমরা এ স্বপ্নে বিভোর হয়েছিলাম যে, ভারতের পূর্বাঞ্চল যদি পাকিস্তানে যোগ দিতে পারে, তাহলে প্রায় দু'শ বছরের গ্লানি এবং অত্যাচার থেকে তারা রক্ষা পাবে। আমি এ ইতিহাসের উল্লেখ করলাম এই কারণে যে, পাকিস্তানের প্রতি আমার এবং আমার মতো আরো অনেকের যে অনুভূতি সেটা সন্তানের প্রতি জনকের অনুভূতির মতো। এ রাষ্ট্র আমরাই সৃষ্টি করেছিলাম, কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলার মুসলিম জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন না পেলে, এ অঞ্চল কখনও পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারত না।

আমি পাকিস্তানের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত - কর্মী হিসেবে। আমি রাজনীতিক নই, কোনকালে মুসলিম লীগের সদস্যও ছিলাম না। কিন্তু যে আদর্শের ওপর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়, তার প্রতি ছিল আমার অকুণ্ঠ সমর্থন। অথচ লক্ষ্য করলাম ৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট এ নতুন রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এক বছর না যেতেই পূর্ব পাকিস্তানিদের বুঝানো হল যে, তাদের অর্থনীতি এবং তামুদ্দনিক দুর্গতির কারণ পাকিস্তান।

৪৮ সাল থেকে ৭১ পর্যন্ত লক্ষ্য করেছি ষড়যন্ত্রের এ অঙ্কূর কিভাবে বিরাট মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এর প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আমার মত ব্যক্তির ছিল না। কিন্তু তা করবার যথাসাধ্য চেষ্টা করতাম। কিন্তু নসিবের এমন পরিহাস যে, ১৯৫৯ থেকে আইয়ুব খানের আমলে আমরাই চিহ্নিত হলাম পাকিস্তানের প্রধান শক্র হিসাবে। ঐ সালে যখন রাইটার্স গিল্ড গঠনের আলোচনা হচ্ছিল, তখন পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য অধিকারের কথা বলায় আইয়ুব খানের সেক্রেটারী কূদরত উল্লাহ শাহাব চিৎকার করে আমাকে শাসিয়েছিলেন প্যরিটি বা সমতার কথা যেন উচ্চারণ না করি। আমি যেটা দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি সে ঘটনা হলো এই যে, একদিকে পূর্ব পাকিস্তানে যেমন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটা গভীর ষড়যন্ত্র ঘনীভূত হয়ে উঠছিল, অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে কতিপয় রাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবীর অদূরদর্শিতার কারণে পাকিস্তানের ভিত্তি ক্রমশঃ দূর্বল হতে আরম্ভ করে। একবার করাচীতে ডক্টর কোরায়শীর মত ব্যক্তিত্বকে আমি প্রকাশ্য সভায় এই বলে ভর্তসনা করি যে, তিনি অকারণে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে হতাশা ব্যক্ত করতে শুরু করেছেন।

গোলাম মুহাম্মদ যেদিন খাজা নাজিম উদ্দীনকে বরখাস্ত করেন এবং তার কিছু কাল পর গণপরিষদ ভেঙ্গে দেন তখন থেকেই অবক্ষয়ের স্রোত আরো দ্রুত গতিতে প্রবাহিত হতে থাকে। এরপর আসে মিলিটারী শাসন। তখন ক্রমান্বয়ে পাকিস্তানের মৌলিক আদর্শ এবং লক্ষ্য চাপা পড়ে যায়। পাকিস্তানের রাজনীতি পরিণত হয় নিছক একটা ক্ষমতার দ্বন্ধে। এদিকে বিরোধী দলের চাপের মুখে ক্রমশঃ কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক, সরকার এমন কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করে যার পরিণতিতে বিচ্ছিন্নতাবাদ আরো মজবুত হয়ে দাড়ায়। প্রতিবেশী ভারতের কোন অঙ্গ রাজ্যের যে সমস্ত ক্ষমতা ছিল না, সে সমস্ত ক্ষমতাই পূর্ব পাকিস্তানকে প্রদান করা হয়। রেলওয়ে, সিভিল সার্ভিস সব ব্যাপারেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বাতন্ত্র্য স্বীকৃতি হয়েছিল। কিন্তু অর্বাচীন, নির্বোধ রাজনীতিকদের আচরণে বিরোধী দল পাকিস্তানের জনসাধারণকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, তাদের কোন অধিকার নেই। তারা হিন্দু সমাজের অচ্ছুতদের চেয়েও এক নিকৃষ্ট জাতে পরিণত হয়েছে। সমাজের বহুলোক সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, পাকিস্তানে আমরা স্বাধীন হতে পারিনি। ১৯৪৭ সালে নাকি শুধু শাসক বদলের ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশের পরিবর্তে আসে পাকিস্তানীরা। এই যে, শত সহস্র লোকজন রাজনীতিবিদ, উকিল, ডাক্তার, মোক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ছাত্র যারা ৪৬ সালে ভোট দিয়ে মুসলিম লীগকে জয়ী করেছিল, বেঙ্গল এসেম্বলির যে মুসলিম সদস্যদের ভোটে মাউন্ট ব্যাটেন প্ল্যান গৃহীত হয়, তারা রাতারাতি হয়ে গেলেন বিদেশীদের অনুচর। এখনও এসব কথা শুনি আর ইতিহাসের পরিহাস সম্পর্কে ভাবি।

আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করে চিরকালই অত্যন্ত পীড়িতবোধ করি। আমাদের লোকজন অত্যন্ত অস্থিরচিত্ত। যে ফজলূল হক সাহেব ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব পেশ করেন, ১৯৪৬ সালের ইলেকশনে তিনি মুসলিম লীগের বিরোধিতা করেন। যে ভাসানী সাহেব সিলেটের গণভোটের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তিনি ১৯৫৪ সালে কাগমারীতে এক সম্মেলনের অনুষ্ঠান করে প্রায় প্রকাশ্যেই পাকিস্তানের আদর্শের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। যে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ১৯৪৬ সালে ইলেকশনে মুসলিম লীগের পক্ষে জয়লাভ করা সম্ভব হয়েছিল, তিনি গোস্বা করে মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ইউনিভার্সিটির যে সমস্ত মুসলিম শিক্ষকের উৎসাহ এবং অনূপ্রেরণায় ৪০ এর দশকে আমরা ছাত্ররা, পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েছিলাম, কয়েক বছরের মধ্যে তাদের দু'-একজনের মতামতের একটা আমূল পরিবর্তন ঘটে। বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান ডঃ শহীদুল্লাহ। কার্জন হলের এক সভায় ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে তিনি ঘোষণা করেন, আমরা প্রথমে বাঙালী পরে মুসলমান। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এত ধার্মিক ছিলেন যে, একটা সময় ছিল যখন তিনি ছবি তোলাকেও নাজায়েজ মনে করতেন। আবুল মনসুর আহমদের মতো তীক্ষ্ণবুদ্ধির লেখক, যিনি লাহোর প্রস্তাব এবং পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস জানতেন, তিনি বিশ্বাস করতে আরম্ভ করেন যে, প্রথমাবধি ভারতের উত্তর-পূর্বে এবং উত্তর-পশ্চিম দু'টো আলাদা রাষ্ট্র হলেই ভাল হতো। ৭১ সালে বাংলাদেশ আবির্ভূত হওয়ার পর তিনি ইত্তেফাকে প্রবন্ধ লিখে দেশবাসীকে জানান যে, বাংলাদেশের অভ্যূদয় আসলে লাহোর প্রস্তাবের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন। অথচ, তিনি অবশ্যই জানতেন যে, ৪৭ এর ১৪ই আগস্টের আগে আমাদের যে অবস্থা ছিল তাতে, স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম করার মতো কোন সামর্থ্য এ অঞ্চলের ছিল না।

এসব অসংগতির কথা যতই মনে হয় ততই এ বিশ্বাস জন্মে যে, চরিত্রগত কারণেই হয়তো আমরা কোন বিশ্বাসকে বেশীদিন অকড়ে ধরে রাখতে পারি না। চারিত্রিক দূর্বলতার কারণে ইতিহাসে বহুবার আমাদের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছে। ৭১ সালে শুরু হয়েছিল স্বাধীন রাষ্ট্রকে নতুন করে স্বাধীন করার এক অদ্ভুত নাটক। স্মৃতিকথায় আমি বলেছি, যে সমস্ত ঐতিহাসিক কারণে পাকিস্তান অনিবার্য হয়ে ওঠে, তার কথা স্মরণ থাকলে পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতা বন্টনের সমস্যা আমরা অনায়াসে সমাধান করতে পারতাম। আমি আরো দেখিয়েছি যে, ৭১ সালের ২৫শে মার্চ আর্মির যে ক্র্যাকডাউন শুরু হয়, তার পিছনে ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের উস্কানি। আর নির্বোধ আর্মি অপরিকল্পিতভাবে জনসাধারণের ওপর হামলা করে ষড়যন্ত্রের এ ফাঁদে পা দেয়।

আমি জানি অনেকেই হয়তো আমার মতামত গ্রহণ করবেন না। কিন্তু আমাদের দিক থেকে যেভাবে সমস্যাটা দেখেছি, তার একটা রেকর্ড ভবিষ্যতের জন্য রেখে যাওয়া অত্যাবশ্যক। যে হারে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটছে তাতে আরো কত আজগুবি কাহিনী ৭১ সাল সম্পর্কে শুনতে হবে, তা কে বলবে?

আমার মনে আছে ১৯৭২ সালে আমরা যখন জেলে, তখন ইংরেজী অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক মরহুম আবদুস সালাম নতুন বাংলাদেশ সরকারের বৈধতা (Legitimacy) সম্বন্ধে একটা প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, যে উপায়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলো, সেটা একটা বিপ্লব। কিন্তু এই বিপ্লবকে আইনের চোখে বৈধ করতে হলে আরও পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সেদিনকার পত্রিকার সংখ্যা বের হবার সঙ্গে সঙ্গে সালাম সাহেবকে বরখাস্ত করা হয়। কারণ বাংলাদেশ সরকার কোন সমালোচনাই বরদাশত করতে রাজী ছিল না। আজও সে অসহিষ্ণুতার ভাব পুরোপুরি কাটেনি। সে জন্য আমি আশা করি না যে, সব পাঠক সহিষ্ণুভাবে আমার বক্তব্যকে গ্রহণ করবে। বাঙালী জাতীয়তাবাদ সম্বন্ধে সালাম সাহেব পরোক্ষভাবে যে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন এবং যে কথা আমরা আগাগোড়াই বলে এসেছি, তার যথার্থতা প্রমাণিত হয় তখন, যখন - প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘোযণা করেন যে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদই হবে এদেশের মূলনীতি। এ ঘোষণার মধ্যে এই স্বীকৃতিই ছিল যে, এ অঞ্চলে সংখ্যাগুরু সমাজের যে বিশ্বাস এবং জীবনধারা তার উপর নির্ভর করেই নতুন রাষ্ট্রকে এগুতে হবে। বাঙালী জাতীয়তাবাদ বললে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্যের কোন যৌক্তিকতা থাকে না। একথা ভারতীয় সাংবাদিক বসন্ত চ্যাটার্জী পর্যন্ত স্বীকার করে গেছেন। বাংলাদেশেরই একশ্রেণীর লোক এই দিব্য সত্যকেও মানবে না। তারা মনেপ্রাণে, ভাবাদর্শে এবং জীবনধারায় নিজেদের এক কাল্পণিক প্রাণীতে রুপান্তরিত করার স্বপ্নে মেতে আছেন।

আরো আশ্চর্য লাগে এই ভেবে, যারা পূর্বাঞ্চলের অধিকার এবং বাংলা ভাষার দাবী নিয়ে এ অঞ্চলকে বিচ্ছিনতার সংগ্রামে উদ্বূদ্ধ করেন তাদেরই একদল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করতে নারাজ। এরা চাচ্ছে যত শীঘ্র এ অঞ্চলটা ভারতের অন্তর্ভূক্ত হয়, ততই যেন মঙ্গল। এসব প্রস্তাব তারা যখন তোলে তখন বাংলা ভাষার দাবীর কথা তাদের মনে থাকে না, মনে থাকে না এ অঞ্চলের অধিবাসীদের বিভাগপূর্ব দুর্দশার কথা। ৬০ এর দশক থেকে আমাদের অনবরত বলা হতো যে, পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের ঠেলায় এদেশের জনগণ নাকি মৃতপ্রায় হয়ে উঠেছিল। অনেকে বই লিখে এ শোষণের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছিলেন। পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য সম্বন্ধে অভিযোগ ৬০ এর দশকের শেষদিকে এমন পর্যায়ে পৌছায় যে, পশ্চিম পাকিস্তানেও কেউ কেউ বলতে শুরু করেন যে, পূর্বাঞ্চলের লোকেরা যদি পাকিস্তানে থাকতে না চায়, তাদের বেরিয়ে যেতে দিলেই পাকিস্তানের মঙ্গল হবে। ৭০ সালে আমি যে ডেলিগেশনের নেতা হিসেবে তেহরান গিয়েছিলাম তার একজন সদস্য ছিলেন লয়ালপুর এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটির ভিসি। তিনি একদিন কথায় কথায় বললেন যে, ইষ্ট পাকিস্তান যদি সত্যিই বেরিয়ে যেতে চায় তাদের বাধা দেওয়া উচিত নয়। কারণ এই যে, অনবরত অভিযোগের ফলে রাষ্ট্রের কাঠামো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। '৭১ সালে যুদ্ধ করে আমরা সত্যিই বেরিয়ে এসেছি। আজ পাকিস্তান পারমাণবিক বোমা তৈরীর ক্ষমতা অর্জন করেছে। তাদের রুপীর মুল্য আমাদের প্রায় তিনগুণ। পাকিস্তান এক সমৃদ্ধ দেশ। কিন্তু আমরা এই বিশ বছরে কী পেয়েছি? আমাদের ভোগান্তির শেষ নেই। কল-কারখানা দুর্নীতির চাপে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশে স্রোতের মত ইন্ডিয়ার পণ্য আসছে, তা নিয়ে কেউ কেউ চিৎকারও করে। দেশের জনগণের অবস্থা ১৯৭০ সালের তুলনায় অনেক নেমে গেছে। বার্মার মত সর্বধিকৃত রাষ্ট্রের সঙ্গে মোকাবেলা করার শক্তিও আমাদের নেই। ওরা যখনই ইচ্ছা লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এর জোরালো প্রতিবাদ করার সাধ্য আমাদের নেই।

ইন্ডিয়ার কথা তো আলাদা। ইন্ডিয়ায় মুসলমানদের উপর শত অত্যাচার হলেও আমাদের প্রতিবাদ করার সাহস হয় না। কাশ্মীরের অধিবাসী যারা ইন্ডিয়ার নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে তাদের বাংলাদেশী খবরের কাগজে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলতে আমাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা হচ্ছে না। কাশ্মীর নিয়ে '৪৭ সালেই বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং জাতিসংঘের সামনে প্রশ্নটা উপস্থাপিত হলে সর্বসম্মতিক্রমে স্থির হয় যে গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরবাসীরা তাদের ভবিষ্যত নির্ধারিত করবে। কিন্তু আজ আমাদের সরকার এ ব্যাপারে কোন উচ্চবাচ্য করতে সাহস পান না। কারণটা স্পষ্ট।

১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর যখন বিজেপি'র লোকেরা চারশত বছরের পুরানো ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধূলিসাৎ করে দেয়, তখন এর বিরুদ্ধে সরকার প্রবল প্রতিবাদ করতে পারেনি। সামান্য একটু কথা বলা হয়েছিল তাতেই ইন্ডিয়া উষ্মা প্রকাশ করে। এই তো আমাদের স্বাধীনতার স্বরূপ।... আমি জন্মগতভাবে পূর্ব বাংলার সন্তান। এ অঞ্চলের স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব সম্বন্ধে কথা বলার অধিকার আমার নেই বলে শুনছি। অধিকার দখল করে বসেছেন প্রধানতঃ এমন একদল যারা, '৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাতারাতি প্রমোশন এবং উন্নতি লাভের আশায় এ নতুন রাষ্ট্রে ছুটে এসেছিলেন। এদের মধ্যে কেউ ছিলেন উকিল, কেউ সাংবাদিক, কেউ লেখক, কেউ শিল্পী, কেউ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার যারা কলকাতার জগতে প্রতিযোগিতায় বেশীদূর এগুতে পারতেন না, বিখ্যাত হওয়াতো দূরের কথা। অনেকে নিঃস্ব অবস্থায় এসে পাকিস্তানে বহু সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। যারা পাকিস্তান না হলে উচ্চ শিক্ষা লাভ করার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতেন তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতম পদগুলো দখল করতে পারলেন। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এদের মুখেই শুনলাম শোষণ এবং বঞ্চনার কথা সবচেয়ে বেশী। এবং এদেরই একদল আজ বাংলাদেশকে আবার ভারতে প্রত্যাবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন।

এই দুঃস্বপ্নের রহস্য আমরা কি করে বুঝবো?

বাংলাদেশ আজ একটা বাস্তব সত্য। এর স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব যদি রক্ষিত হয় তবে আমরা যে স্বকীয়তার কথা বলতাম সেটা কিছুটা রক্ষা পাবে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ এ অঞ্চলকে পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান, বাংলাদেশ যাই বলি না কেন এর মাটিতে কোন পরিবর্তন ঘটেনি এবং ঘটতে পারে না। সে আকাশ, সে বাতাস, সে গাছপালা, সে নদ-নদী সবই রয়ে গেছে। আমরা এর শুধূ ভৌগোলিক নাম বদলিয়েছি। তবে বর্তমানে যে অপচেষ্টা চলছে তার লক্ষ্য হলো, আমাদের শত শত বছরের ইতিহাস এবং সংস্কৃতিকে একেবারে মুছে ফেলা। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে এ বিপদের আশঙ্কায় খুবই শঙ্কিত হয়ে পড়তে হয়। আমার বক্তব্য তাই লিপিবদ্ধ করে গেলাম। কেনো পাকিস্তান চেয়েছিলাম, ৭১ সালে আমরা কেনো বিচ্ছিন্নতাবাদের সমর্থন করতে পারিনি এবং বর্তমানে কেন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সম্বন্ধে আমাদের উৎকণ্ঠা সবচেয়ে বেশী তার কৈফিয়ত হিসাবে এই স্মৃতিচারণার মূল্য।

... '৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট আমি কোলকাতায় ছিলাম। এ কারণে ব্যক্তিগতভাবে ঢাকায় যে উন্মাদনাময় পরিবেশের মধ্যে পাকিস্তান জন্ম লাভ করে তাতে আমি অংশ গ্রহণ করতে পারিনি। কিন্তু মিছিল, শোভাযাত্রা ইত্যাদির বিবরণ পড়ে কল্পনার নেত্রে সে দৃশ্য অবলোকন করতে অসুবিধা হয়নি। তার একটা বড় কারণ, আমি নিজেও এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমরা বিশ্বাস করতাম যে ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক সমস্যার একমাত্র নির্ভরযোগ্য সমাধান এই উপমহাদেশকে বিভক্ত করে হিন্দু ও মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করা। ভাষা বা ভৌগলিক বৈচিত্রের কোন গুরুত্ব নেই, এ কথা কখনো আমরা বলিনি। কিন্তু ভাষা এবং আঞ্চলিক কালচারের ভিত্তি মেনে নিলে ভারতবর্ষকে অন্ততঃ বিশটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করার প্রয়োজন হবে, কারণ 'ভারতীয়তা' বলে কোন বস্তুর অস্তিত্ব ছিল বলে আমরা বিশ্বাস করতাম না। যদি বলা হয় যে পাঞ্জাবী মুসলিম বা পাঠান মুসলিমের সঙ্গে বাঙ্গালী মুসলিমের তফাত অনেক, এ কথা তো হিন্দু সম্প্রদায় সম্পর্কে আরো সত্য। মুসলমানের ধর্ম বিশ্বাস এবং ধর্মীয় আচার পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বিশেষ কোন পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে না। কিন্তু ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু ধর্মের রূপ বিভিন্ন। যে সমস্ত দেবতা দক্ষিণ ভারতে বা পশ্চিম ভারতে অর্চিত হন, বাংলা বা আসামে তাদের কেউ পূজা করে না। রাম উত্তর ভারতে দেবতা বলে স্বীকৃত, বাংলায় তিনি রামায়ণের নায়ক মাত্র। এ রকমের আরো ভিন্নতার কথা উল্লেখ করা যায়। সে জন্য জওহরলাল নেহেরুর মতো যাঁরা সেকুলার ভারতীয়তার কথা বলতেন তাঁরা প্রকারান্তরে বুঝাতে চাইতেন যে ভারতীয় কালচারের অর্থ হিন্দু ধর্মভিত্তিক কালচার।

১৯৬২ সালে - '৪৭ সালের ১৫ বছর পর নেহেরুরর এক বক্তৃতায় যে কথা স্বকর্ণে শুনেছিলাম তাতে আমার ঐ উক্তির সমর্থনই ছিল। দিল্লীর এক সভায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন যে, ভারতীয় সংস্কৃতির সৌধ সম্পূর্ণভাবে সংস্কৃত ভাষার উপর প্রতিষ্ঠিত। অবশ্য এ কথাই ৪০-এর দশকে প্রকাশিত তাঁর 'ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া' বইটিতে তিনি আরো সবিস্তারে বিবৃত করেছেন। ভারতবর্ষের যে রূপ তিনি আবিষ্কার করেছিলেন বলে দাবী করেন তার মধ্যে সাতশ' বছর ধরে ভারতের বুকেই মুসলমানেরা যে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলো তার কোন সন্ধান ছিলো না। এই সত্যের উপরই পাকিস্তান আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে। তাই তখন যে যাই বলুক ধর্ম বিশ্বাসকে আমরা এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান পরিচয় রূপে স্বীকার করে নিয়েছিলাম এবং এই কারণেই উত্তর এবং দক্ষিণ ভারতের অনেক মুসলমান যেমন পশ্চিম পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিলো তেমনি বিহার-উড়িষ্যা এবং আসাম থেকে বহু মুসলমান বিতাড়িত হয়ে পাকিস্তানে নীড় বাঁধবার চেষ্টা করে। ৭০-৭১ সালে আমরা শুনলাম যে এই নবাগতরা সবই বিদেশী, তাদের না তাড়ালে এ অঞ্চলের আদিবাসীদের পরিত্রাণ নেই।

আরো দুঃখ্য পেলাম এই ভেবে যে ১৯৪৭ সালে যারা এক রকম জোর করে আমাদের বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করতে বাধ্য করে এবং যারা তাদের রাষ্ট্রের ঐক্য এবং সংহতির খাতিরে নির্দ্বিধায় হিন্দীকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে তারাই সেদিন আমাদের শিখিয়েছিলো যে পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ফেললেই আমরা সমস্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে রক্ষা পাবো। অথচ দিল্লীর শাসন বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ আন্দোলনে যোগ দেয়ার কথা কেউ বলেননি।

পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ কোন সমস্যা ছিলো না তা নয়। দুই অঞ্চলের মধ্যে বৃটিশ যুগের দুঃশাসনের কারণে একটা অর্থনৈতিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয় যার জের পাকিস্তানকে টানতে হয়েছে। ক্লাইভ ১৭৫৭ সালে এ অঞ্চলেই প্রথম বৃটিশ সাম্রাজ্যের পত্তন করেন। তারপরের দেড়শ' বছরের কাহিনী শুধু বঞ্চনা, লুণ্ঠন এবং প্রতারণার কাহিনী - যে কাহিনীর সত্যতা কোনো বৃটিশ বা হিন্দু ঐতিহাসিকও অস্বীকার করেননি। পূর্ব বঙ্গের সম্পদ দিয়ে গড়ে উঠেছিল বৃটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী কোলকাতা। সারা পূর্ব বঙ্গে শহর বলে কোন কিছু ছিলো না। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা প্রভৃতি শহরকে আধুনিক অর্থে কেউ শহর বলতো না। আমার বেশ পরিস্কার মনে আছে, পঞ্চাশের দশকে যখন গুলিস্তানের রাস্তা নির্মিত হয়েছে এবং দু' একটা বড় দালান-কোঠা আজিমপুর এবং মতিঝিলে গড়ে উঠেছে তখন আমার এক আমেরিকান বন্ধুকে নারিন্দা অঞ্চলে নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, আজ রুরাল বেঙ্গল সম্পর্কে একটা আইডিয়া করতে পারলাম। আমি চমকে উঠেছিলাম সত্য কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছিলো যে ইউরোপ বা আমেরিকাবাসীর কাছে নারিন্দা অঞ্চলের সঙ্গে তাদের পল্লীর তফাৎ থাকতে পারে না। বরঞ্চ অনেক ইউরোপীয় বা আমেরিকান গ্রাম আরো সুন্দর ও সুঠাম। এই ঢাকাই হলো আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী।

অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসীরা লাহোর এবং করাচীর মতো দু'টো বড় শহর পেলো। করাচী অপেক্ষাকৃতভাবে নতুন নগর কিন্তু লাহোরের বয়স পাঁচ ছ'শ বছরের। এ দু'টি শহরই ছিলো দু'টি প্রদেশের রাজধানী। কিন্তু হঠাৎ করে লাহোর এবং করাচীর সঙ্গে ঢাকার বৈষম্যের জন্য দায়ী করা হলো পাকিস্তানকে। আরো বলা হলো যে পাটের টাকা দিয়ে করাচী এবং লাহোর স্ফীত হয়ে উঠেছে। ঢাকার ভাগ্যে কিছুই জোটেনি।

১৯৫৬ সালে করাচীতে একদিন হঠাৎ করে একজন বিখ্যাত আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তাঁকে ৪৪ সাল থেকেই চিনতাম। আমি যখন ইসলামিয়া কলেজের লেকচারার শেখ মুজিবুর রহমান তখন সেখানে ছাত্র এবং আমাদের মতো তিনিও এককালে পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। যখন তিনিই বললেন, স্যার দেখেছেন, এলফিন্টস্টোন রোডের সমস্ত চাকচিক্যের মূলে রয়েছে পূর্ব বঙ্গের পাট, আমি বিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলাম এ নতুন তথ্য তিনি আবিষ্কার করলেন কোথায়? এ রাস্তাটির বয়সও যেমন কমপক্ষে পঞ্চাশ-ষাট বছর তেমনি দোকানগুলিও প্রাক-পাকিস্তান যুগের। কিন্তু তিনি তখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে পশ্চিম পাকিস্তানের সবকিছুর মূলে রয়েছে বঞ্চিত, অবহেলিত, শোষিত পূর্ববঙ্গের দান। কিন্তু এই যুক্তি আমরা কিভাবে স্বীকার করি? অথচ '৭১ সালে যে বিষ্ফোরণ ঘটে তখন লাখ লাখ বাংগালী তরুণ এই বিশ্বাস নিয়েই সংগ্রামে নেমে ছিলো যে পাকিস্তানে থেকে তারা শোষণ ছাড়া আর কিছুই প্রত্যাশা করতে পারে না।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি আইয়ুব খানের আমলে এক সেমিনারে আঞ্চলিক বৈষম্যের কথা আমি নিজেও তুলেছিলাম। বলেছিলাম যে এ বৈষম্যের ঐতিহাসিক কারণ যাই হোক, বৈষম্য নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক আবহাওয়া ধোঁয়াটে হয়ে উঠেছে; জনসাধারণের মনে এই বিশ্বাস সৃষ্টি করা হয়েছে যে কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলা এই বৈষম্যের হেতু। আমি আরো বলেছিলাম যে বাস্তব রাজনীতিতে অনেক ক্ষেত্রে সত্যের চাইতে অনুভূতি প্রধান হয়ে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের এক বিরাট অংশ যেখানে সত্য সত্যই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে বৈষম্যের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার দায়ী, সেখানে অবিলম্বে জাতীয় সংহতির খাতিরে কতকগুলি পদক্ষেপ নেয়া অত্যাবশ্যক। সিনিয়রিটির দোহাই দিয়ে যদি প্রশাসনে এবং মিলিটারিতে কোনো পূর্ব পাকিস্তানীকে স্থান দেয়া না হয় তবে তার পেছনে যত যুক্তিই দেখানো হোক তার ফলে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হবে, পাকিস্তানের ভিত্তিমূল দূর্বল হয়ে উঠবে। কিন্তু বৈষম্যের কারণে পাকিস্তানকে টুকরো করে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারতে হবে এই ধারণা বা অশঙ্কা আমার মাথায় কখনো আসেনি। আমার সে বক্তৃতা পরদিন বড় হরফে ইত্তেফাকে বেরিয়েছিল।

... আসল কথা হচ্ছে যে আমাদের আমলা, শিক্ষাবিদ প্রমুখ যাঁরা পাকিস্তানের কারণে, বহুক্ষেত্রে কোটার জোরে, গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, অভিজ্ঞতায় এবং কর্মক্ষমতায় তাঁদের অধিকাংশই অবাঙালী কর্মচারীদের সমকক্ষ ছিলেন না। তাঁদের সামনে এঁরা কাবু হয়ে পড়তেন এবং নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকবার উদ্দেশ্যে বাইরে এসে অভিযোগ করতেন যে ওঁদের ষড়যন্ত্রের কারণে তাঁরা কিছু করতে পারেননি। ষড়যন্ত্রের অজুহাত দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের পশ্চাদপদতা ব্যাখ্যা দেবার প্রবণতা এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়ায় যে ষাটের দশকে এসে শেখ মুজিব এবং তাঁর সহকর্মীরা যত্রতত্র ষড়যন্ত্রকারীদের সন্ধান পেতেন। অথচ সত্য কথা হচ্ছে পাকিস্তানে গণতন্ত্র এবং শাসনতান্ত্রিক বৈধতার বিরুদ্ধে যতগুলি ষড়যন্ত্র হয়েছে তার মূলে ছিলেন এ অঞ্চলের নেতৃবৃন্দ। এঁদের সমর্থন নিয়েই গোলাম মোহম্মদ প্রথম গণপরিষদ ভেঙ্গে দিয়েছিলেন।

১৯৫৮ সালে ইস্কান্দর মির্জা এবং জেনারেল আইয়ুব খানের ষড়যন্ত্রের সঙ্গেও পূর্ব পাকিস্তানের বগুড়ার মোহম্মদ আলী এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী জড়িত ছিলেন। মোহাম্মদ আলী তো বটেই সোহরাওয়ার্দী সাহেবও ইস্কান্দর মির্জার অধীনে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করতে রাজি হয়ে তাঁর আসন সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মতো ব্যক্তি যাঁকে তাঁর স্তাবকেরা গণতন্ত্রের মানসপুত্র ও অতন্দ্র প্রহরী বলে চিহ্নিত করে রেখেছে তিনি কোন যুক্তিতে ইস্কান্দর মির্জার মতো গণতন্ত্রের শক্রর সঙ্গে সহযোগিতা করতে গিয়েছিলেন, সেটা আমার কাছে রহস্যময়। সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রী সভায় আবুল মনসুর আহমদের মতো ব্যক্তিও ছিলেন। এঁদের সহযোগিতা ও সাহায্য না পেলে মিলিটারি শাসন স্থায়ীভাবে কায়েম হতে পারতো না। যে ব্যক্তিটিকে গোলাম মোহাম্মদ বরখাস্ত করে প্রথম গণপরিষদ ভেঙ্গে দিয়েছিলেন সেই নাজিমুদ্দিন সাহেবকে আওয়ামী লীগ মহলে নানাভাবে কুৎসিত ভাষায় গালাগালি করা হয়। অথচ তিনি একবারও ক্ষমতার লোভে কোনো মন্ত্রিত্বও গ্রহণ করেননি এবং সামরিক শাসনের সঙ্গে সহযোগিতাও করেননি। বরঞ্চ মোহতারিমা ফাতেমা জিন্নাহ যখন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ইলেকশনে দাঁড়িয়ে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন খাজা নাজিম উদ্দিন। অদৃষ্টের এমন পরিহাস যে বাংলাদেশের ইতিহাসবেত্তারা তাঁকে বলছেন পশ্চিম পাকিস্তানের তাবেদার, গণতন্ত্রের দুশমন ইত্যাদি।

১৯৫৮ সালে যে ক্যুর মাধ্যমে শাসনতন্ত্র একেবারে বাতিল করে ইস্কান্দর মির্জা এবং আইয়ুব খান ক্ষমতা অধিকার করেন তার পিছনেও রয়েছে এক কলংকের ইতিহাস। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানে না যে ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান যখন একক ক্ষমতার মালিক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং ইস্কান্দর মির্জাকেও সরিয়ে দেন তার পিছনে জনমতের একটা বিরাট অংশের সমর্থন ছিলো। দেশের দুই অংশেই চরম অরাজকতার ফলে একটা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিলো। সে বছরই পূর্ব পাকিস্তানে ডেপুটি স্পীকার শাহেদ আলী আওয়ামী লীগের কতিপয় সদস্যের হাতে নিহত হন। তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তানে শহীদ সাহেবের দল প্ল্যান করেছিলো যে যেমন করেই হোক তারা ইলেকশনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে। দেশের সর্বত্র গুন্ডা বাহিনী নিয়োজিত করা হয় যাদের উপর ভোট কেন্দ্র দখল করে ব্যালট বক্স ছিনতাই করার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়। এ রকম গুজব সারা পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে গিয়েছিলো। নেজামে ইসলাম পার্টির সদস্য সৈয়দ কামরুল আহসান-যাঁর নাম আমি আগে উল্লেখ করেছি - তাঁর আত্মজীবনীমূলক Portraits From Memory নামক বইয়ে লিখেছেন যে আওয়ামী লীগের এই ষড়যন্ত্র না হলে আইযুব খান জনমতের সমর্থন লাভ করতে পারতেন না। আজ ৩৩-৩৪ বছর পর এ সমস্ত কথা অনেকেই ভুলে গেছেন। যাদের বয়স পঞ্চাশের নীচে তাদের এ সমস্ত কথা জানবারও কথা নয়।

কিন্তু কেনো এবং কি উপায়ে ষাটের দশকের শেষদিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটা গণবিক্ষোভ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছিলো সেটা বুঝতে হলে এ সমস্ত ঘটনার উল্লেখ করা একান্ত প্রয়োজন। ১৯৬৫ সনের যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তানে অবাঙালী বিরোধী মনোভাব যখন তীব্রতর হতে শুরু করে তখন আগাখানী এবং বোহরা সম্প্রদায়ের অনেক ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতি বাড়ীঘর এবং ধন-সম্পত্তি বিক্রয় করে এ অঞ্চল থেকে সরে পড়েন। তাঁরা এসেছিলেন স্থায়ীভাবে এখানে বসবাস করে ব্যবসা-বাণিজ্য করবেন এ উদ্দেশ্য নিয়ে। কিন্তু তার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল আওয়ামী লীগের অবাঙালী বিরোধী অভিযান। এর ফলে এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক অবস্থার আরো দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে।

এমন কি ঢাকা ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন ভাইস চান্সেলর ডক্টর মাহমুদ হাসান ও ডক্টর মাহমুদ হোসেন যাঁরা উভয়েই ঢাকায় বাড়ীঘর তৈরী করেছিলেন, তাঁরা এসব বিক্রি করে ফেলেন। ডক্টর আহমদ হাসানদানীর মতো অধ্যাপক যিনি প্রথমে পূর্ব পাকিস্তানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং যাঁর চেষ্টায় পাকিস্তান এশিয়াটিক সোসাইটি স্থাপিত হয়, তিনিও চলে যান। এ রকম আরো অনেকে যাঁদের সুবিধা ছিলো, পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে যান। এঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে এ অঞ্চলে একটা বিশেষ দল যে জাতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করে যাচ্ছে তাতে একটা বিস্ফোরণ ঘটবার আশংকা সৃষ্টি হচ্ছিলো। আগে সেখানে কাবুলী, পেশোয়ারী, বিহারী, উত্তর প্রদেশের আগ্রা-দিল্লীর লোকেরা ঢাকায় এবং অন্যান্য স্থানে অবাধে বসবাস ও ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারতো এবং তাদের কেউ বিদেশী মনে করতো না। কারণ তারা ছিলো মুসলমান। সেই পরিবেশে একটা আমূল পরিবতর্ন ঘটছিলো। আমি যে বাসায় শিক্ষা জীবন কাটিয়েছি সেখানে চাকর-বাকর সবই ছিলো বিহারের দার ভাঙ্গ এবং মুংগের জেলার। একজন হিন্দু উড়িয়া মালিও ছিলো। বাড়ীতে দারোয়ান বা নৈশ প্রহরী ছিলো একজন পাঞ্জাবী। কখনো মনে হয়নি এরা বিদেশী। কারণ ঐ উড়িয়াকে বাদ দিলে আর সবাই ছিলো মুসলমান। আমরা মনে করতাম ঐ উড়িয়া মালিই বিদেশী। আর অন্য সবাই এক জাতের।

 

৬০ দশকের ক্রমাগত প্রচারণার ফলে এবং ভাষা আন্দোলনের প্রভাবে পাকিস্তানের ভিত্তিমূল ক্রমশঃ দূর্বল হয়ে পড়তে থাকে। উর্দূভাষী একজন সাধারণ কুলিকে দেখলেও বলা হতো এরা শোষকের দলের লোক। বৃটিশ আমলে এবং পাকিস্তানের প্রথম দিকে রেলওয়ে স্টেশনে, স্টিমারঘাটে বহু উর্দূভাষী গরীব বিহারী কুলিগিরি করতো। বাস্তবিক পক্ষে কুলিদের সঙ্গে উর্দুতেই কথা বলতে হয়। এই অভ্যাস প্রায় সবারই হয়ে গিয়েছিলো। ১৯৪৭ সালের পর আরো কয়েক লক্ষ মোহাজের বিহার-উড়িষ্যা এবং কোলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় গ্রহণ করে। তখন ৪০/৫০ বছর আগে থেকে যে সমস্ত উর্দূভাষী এ অঞ্চলে স্থায়ী বসবাস করছিলো এবং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছিলো। তাদেরও এখন চিহ্নিত করা হলো চক্রান্তকারী দুশমন হিসাবে। অল্প পুঁজির ব্যবসায়ীদের কথা জানতাম যারা ঢাকার চকবাজার, মৌলবীবাজার, উর্দু রোড, মোগলটুলি প্রভৃতি এলাকায় জর্দার দোকান, পান-বিড়ির দোকান, টুপির দোকান প্রভৃতি ছোট ছোট ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতো, তারাও হলো আমাদের দুশমন। এবং ৭১ সালে এরা অনেকে তথাকথিত মুক্তিবাহিনীর হাতে নির্মমতার শিকার হয়েছে।

এ কথা স্বীকার করবো যে ৪৭-এর আগে যে সমস্ত অবাঙালী অফিসার বা সাধারণ লোক কোনো কালে পূর্ব বাংলায় আসেনি তাদের একটা ধারণা ছিলো যে বাংলাভাষী মুসলমানরা সম্ভবত ভালো মুসলমান নয়। তারা কেউ কেউ ইসলাম এবং উর্দুকে সমান করে দেখতো। এরকম কথাবার্তায় অনেক বাংলাভাষী ক্ষুদ্ধ হতো। ফিরোজ খান নুন, যখন এই প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত হোন তিনি এই ধারণা নিয়ে এসেছিলেন যে এ অঞ্চলে মুসলমানদের মধ্যে খতনা প্রথা নেই। তিনি আরো এক কান্ড করেন। বিনা মূল্যে গ্রামে গ্রামে কোরআন বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। যেনো এ অঞ্চলের মুসলমানরা ভালো করে কোরআন শরীফের সাথে পরিচিত নয়। অথচ পূর্ববঙ্গের এমন কোনো পাড়া-গাঁ নেই যেখানে মসজিদে এবং অধিকাংশ মুসলমান বাড়িতে কোরআন পাওয়া যেতো না। কোরআন বিতরণ করা কোনো দোষের কাজ নয়, কিন্তু যে ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি কোরআন প্রচারের প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছিলেন সেই ধারণার মূলে সত্য কিছুই ছিলো না। আবার সঙ্গে সঙ্গে ফিরোজ খান নুন-(যিনি ইংরেজীতে একটা উপন্যাস এবং একটি আত্মজীবনী প্রকাশ করেন এবং পরে এককালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন)-এটা বুঝতেন যে পূর্বাঞ্চলের ভাষা বাংলার সঙ্গে পরিচিত না হলে এখানে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করা দুরূহ। আমার পরিচিত ঢাকা ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের এক অধ্যাপককে তাঁর জন্য বাংলা টিউটার নিযুক্ত করা হয়। ঢাকায় ভিকারুননেসা স্কুলটি তাঁর বৃটিশ স্ত্রীর প্রচেষ্টার ফল।

তাই বলছিলাম যে এ অঞ্চলের ভাষা এবং কালচার সম্পর্কে অজ্ঞতা থেকেই কোনো কোনো অবাঙালী অফিসার বা প্রশাসক যে সমস্ত মন্তব্য করতেন বলে শুনেছি সেগুলি পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে ইন্ধন হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এঁদের সংখ্যা ছিলো মু্ষ্টিমেয়। কিন্তু তবুও তাঁরা যে অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছিলেন তাকে কোন রূপেই মার্জনীয় মনে করা যায় না। পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম এডুকেশন সেক্রেটারী এক অবাঙালী আইসিএস মিঃ ফজলে করীম প্রস্তাব করে বসেন যে বাংলা আরবী লিপিতে লেখা উচিত। একথা আমরা অনেকেই ভুলে গেছি যে হরুফুল কোরআন বলে একটা আন্দোলন অনেক দিন থেকে এ অঞ্চলে চালু ছিলো। এক মওলানা সাহেব আরবী লিপিতে চাটগাঁ থেকে একটা বাংলা সাপ্তাহিক প্রকাশ করতেন। এ কথা সত্য যে এ আন্দোলনের পিছনে বাংলাভাষী কিছু কিছু লোকের সমর্থন ছিলো। কিন্তু অবাঙালী আইসিএস অফিসার যখন এ প্রস্তাব উত্থাপন করলেন তখন সবাই বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন তুললো যে বাংলা কিভাবে লিখিত হবে সে সম্বন্ধে কথা বলার অধিকার তাঁর কোথায়?

পশ্চিম বঙ্গের বিখ্যাত পন্ডিত সুনীতি চ্যাটার্জী বিশ্বাস করতেন যে ভারতবর্ষের সমস্ত ভাষাগুলির জন্য একটা সাধারণ লিপি গৃহীত হওয়া বাঞ্ছনীয়। এবং তিনি বলতেন রোমান লিপির কথা। সুভাষ চন্দ্র বসুও কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হিসাবে তাঁর অভিভাষণে ঐ প্রস্তাবের পুনরাবৃত্তি করেন। তারপর একথাও শুনেছি যে তারাশংকর বন্দোপাধ্যায় নাকি তাঁর উপন্যাসগুলি দেবনাগরী অক্ষরে ছাপাবার পক্ষপাতী ছিলেন। এ সমস্ত প্রস্তাব যাঁদের কাছ থেকে এসেছিলো তাঁরা সবাই ছিলেন বাংলাভাষী। সুতরাং অবাঙালীরা কেউ বাংলা ভাষার চরিত্র বদলাবার চক্রান্তে নেমেছে তখন এ কথা বলা চলতো না। কিন্তু মিঃ ফজলে করীম ফজলীর প্রস্তাবে যারা আরবী লিপির সমর্থন করতো তারাও অস্বস্তিবোধ করেছে। তারপর ইতিমধ্যেই ৪৭ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে তমুদ্দুন মজলিস গঠিত হওয়ায় বাংলা ভাষা নিয়ে একটা পাকিস্তান বিরোধী ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত হয়ে গিয়েছিলো। সেই পরিস্থিতিতে যখন ফজলে সাহেবের প্রস্তাব শোনা গেলো সেটা চক্রান্তকারীদের জন্য হলো সোনায় সোহাগা।

এ সমস্ত ছোটোবড়ো নানা ঘটনার সমন্বয়ে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছিলো যে যখনই কোনো পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিবিদ বা কর্মচারী অবাঙালী কোনো অফিসারের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতেন, সঙ্গে সঙ্গে অবাঙালী ব্যক্তিটিকে পূর্ব পাকিস্তানের চরম শক্র বলতে দ্বিধা করেননি। ফলে অনেক অবাঙালী অফিসার হতাশ হয়ে এ অঞ্চল থেকে ট্রান্সফার নেয়ার চেষ্টা করতেন। নতুবা রাগের মাথায় ঝগড়া-বিবাদ করতে শুরু করতেন। এ ঘটনা পরম্পরাও হলো চক্রান্তকারীদের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। বাঙালী অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ, আমলা, কারিগর যে পর্যাপ্ত সংখ্যায় নেই এ কথা যেনো পাকিস্তান সৃষ্টির কয়েক বছরের মধেই চাপা পড়ে গেলো। তখন কোন কোন রাজনীতিকের মাথায় এই বুদ্ধি এলো যেকোন রকমে এই অবাঙালী ও কারিগরদের তাড়িয়ে দিলে পূর্ব পাকিস্তানের উন্নতির পথে সমস্ত অন্তরায় অপসারিত হবে। এ সমস্ত রাজনীতিক সবাই যে সজ্ঞানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চক্রান্তে নেমেছিলেন, মোটেই নয়। কিন্তু যে পরিপ্রেক্ষিত জ্ঞান এবং বাস্তবতাবোধ থাকলে- তাঁরা পূর্ব পাকিস্তানের সত্যিকারের ভবিষ্যৎ কোথায় তা বুঝতে পারতেন, সেটা তাঁদের ছিলো না। বাংলায় আমরা বলি ফলেন পরিচয়তে অর্থাৎ ফল দিয়ে বৃক্ষের পরিচয়। এদেঁর দূরদৃষ্টি অভাবজনিত সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষিত হলো না। এই অনস্বীকার্য সত্যের আলোকে পূর্ববর্তী ২২ বছরের ইতিহাস বিচারের অপেক্ষা রাখে। এঁদের মধ্যে যাঁরা এখন সমস্ত দোষ পশ্চিম পাকিস্তানের উপর চাপিয়ে দিয়ে প্রমাণ করতে চান যে তাঁরা হলো একমাত্র দেশপ্রেমিক তাদের নিজেদের কর্মকান্ডের বিশ্লেষণ করলেই এই যুক্তি আর ধোপে টেকেনা॥"

- ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন (সাবেক ভিসি - ঢা.বি) / একাত্তরের স্মৃতি ॥ [ নতুন সফর প্রকাশনী - নভেম্বর, ১৯৯২ । পৃ: ভূমিকা / ২৯-৩১ / ২০৩-২০৭ ]



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2017 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.