সেক্যুলারিস্ট বাঙালি মুসলিম ফ্যাসিস্টদের ফিতনা ও নাশকতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 সেক্যুলারিস্ট বাঙালি মুসলিমের ফিতনা 

বাঙালি মুসলিমদের বর্তমান ব্যর্থতা ও বিপর্যয়টি বিশাল। সেটি যেমন পরিশুদ্ধ ব্যক্তির নির্মাণে, তেমনি উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মাণে। মশা-মাছি ও রোগ-জীবাণু সবার দেহে বাসা বাধে না। সেগুলি দূষিত পরিবেশ ও প্রতিরোধের সামর্থ্যহীন দুর্বল মানুষ খোঁজে। তেমনি মুজিব-হাসিনার ন্যায় নৃশংস খুনি ও দুর্বৃত্ত ফ্যাসিস্ট শাসক সব জাতির উপর চেপে বসেনা। তারা চেপে বসে প্রতিরোধহীন দুর্বল জাতির ঘাড়ে। তাই হাসিনার ন্যায় খুনি ফাসিস্ট শাসককে ২১টি বছর ক্ষমতায় থাকতে দেখে সহজেই বুঝা যায় বাঙালি মুসলিমদের ব্যর্থতা ও বিপর্যয়টি কত গভীর। তবে সে ব্যর্থতা ও বিপর্যয় সামান্য কয়েক বছরে গড়ে উঠেনি। বরং এরও দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এবং সেটি সঠিক ভাবে বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে তাদের মাঝে বেড়ে উঠা বাঙালি সেক্যুলারিস্ট ফ্যাসিস্টদের হাতে সৃষ্ট ভয়ংকর ফিতনাটি।

ফ্যাসিস্টগণ যেমন উগ্র জাতীয়তাবাদী, তেমনি উগ্র স্বৈরাচারিও। তাদের উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনাটি গড়ে উঠে ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও ভূগোল ভিত্তিক পরিচয়ের ভিত্তিতে। ফিতনা একটি কুর’আনী পরিভাষা। এটি মানব সমাজের অতি গুরুতর রোগ; এবং এর নাশকতা অতি ভয়ংকর। ইসলামে ফিতনার সুস্পষ্ট সংজ্ঞাও রয়েছে। ফিতনা তো তাই -যা ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেণ্ডার প্রতিপক্ষ রূপে খাড়া করে এবং অসম্ভব করে সমাজে ও রাষ্ট্রে পূর্ণ ইসলাম ও ইসলামের বিজয়। ফিতনার লক্ষ্য, মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিবাদ, বিভক্তি, প্রাণহানী ও শক্তিহানী। এতে থাকে মুসলিমদের ইসলামের মূল মিশন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা।  ফিতনার অর্থ মহান আল্লাহ তায়ালার এজেণ্ডার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এ যুদ্ধের লক্ষ্য, তিনি যা চান সেটিকে অসম্ভব করা। অথচ মহান আল্লাহ তায়ালা চান, নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা অঞ্চলের মুসলিমদের মাঝে প্যান-ইসলামী মুসলিম  ভাতৃত্ব ও ঐক্য। তিনি চান, ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহ একাত্ম হোক পবিত্র কুর’আনে ঘোষিত তাঁর এজেণ্ডার সাথে। এবং পবিত্র কুর’আনে ঘোষিত সে এজেণ্ডাটি হলো, তাঁর সার্বভৌমত্ব ও তার শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। এজেণ্ডা হলো, অসত্য ও অন্যায়ের নির্মূল এবং সত্য ও সুবিচারের বিজয়। এবং তিনি চান, তাঁর সে এজেণ্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদে যুক্ত হয়ে মানুষ রক্ষা পাক জাহান্নামের আগুন থেকে এবং পাক নিয়ামত ভরা জান্নাত। প্রশ্ন হলো, যাদের লড়াই মহান আল্লাহ তায়ালার সে এজেণ্ডাকে ব্যর্থ করায় এবং মানুষকে জাহান্নামে নেয়ায় -তাদের চেয়ে বড় অপরাধী এ পৃথিবী পৃষ্ঠে আর কে হতে পারে? অথচ সে বাঙালি সেক্যুলারিস্ট ফ্যাসিস্টদের রাজনৈতিক এজেণ্ডা।  

সাধারণ মানুষের বিচারে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হলো মানব হত্যা। তাই প্রতি দেশে সে অপরাধের শাস্তি সর্বাধিক; বহু দেশে সেটি প্রাণদণ্ড। মহান আল্লাহ তা’আলার কাছেও একজন মানব হত্যা অতি গুরুতর অপরাধ। পবিত্র কুর’আনে বলা হয়েছে, যে একজন মানুষকে হত্যা করলো সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করলো। কিন্তু সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহ তায়ালার বিচারে মানব হত্যার চেয়েও গুরুতর আরেকটি অপরাধ রয়েছে, সেটি হলো ফিতনা। এ বিষয়ে মহান রব’য়ের বয়ান:

وَٱلْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ ٱلْقَتْلِ

অর্থ: “ফিতনা হলো হত্যার চেয়ে গুরুতর অপরাধ।” –(সুরা বাকরা, আয়াত ২১৭)। 

মহান আল্লাহ তায়ালার এই রায়টিতে রয়েছে যেমন গভীর ভাবে ভাববার বিষয়, তেমনি রয়েছে গবেষণার বিষয়ও। অপরাধের মাত্রা ও তার শাস্তি নির্ধারিত হয় তার নাশকতার মাত্রা থেকে। চুরিডাকাতি করলে এতো শাস্তি হয়না, যতটা হয় শত্রু রাষ্ট্রের গুপ্তচর রূপে কাজ করলে। কারণ, গুপ্তচরের কর্মে বিপন্ন হয় দেশের নিরাপত্তা। অতীতে সুনামী, ভূমিকম্প, মহামারী, সাইক্লোনে মুসলিম বিশ্বে বহু লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু তাতে মুসলিম উম্মাহ শক্তিহীন ও পরাধীন হয়নি। তাতে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান উসমানিয়া খেলাফা বা বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানও ভেঙ্গে যায়নি। দেশের ভূগোল এক ইঞ্চি বাড়াতে হলেও রক্ত ঢেলে যুদ্ধ করতে হয়। অথচ অসংখ্য মানুষের রক্তে গড়া উসমানিয়া খেলাফত ও পাকিস্তান ভেঙ্গে গেছে জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী, সেক্যুলারিস্ট ও ফ্যাসিস্ট দুর্বৃত্তদের ষড়যন্ত্র ও নাশকতার কারণে। বাঙালি মুসলিমদের সে নাশকতার পথে ঠেলে দিয়েছে বাঙালি সেক্যুলারিষ্ট ফ্যাসিস্ট ও বামধারার কাপালিকগণ। তাদের সে নাশকতার কারণে শক্তিহীন হয়েছে মুসলিম উম্মাহ; আর বিজয় ও শক্তি বেড়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের। 

 

মানব হত্যার চেয়ে ফিতনা কেন বড় অপরাধ?

 প্রশ্ন হলো, ফিতনা কেন মানব হত্যার চেয়েও বড় অপরাধ? সেটির কারণ, ফিতনা সৃষ্টিকারীরা শুধু হত্যা বা গণহত্যা ঘটায় না, তাদের নাশকতাটি বরং ইসলামের মূল এজেণ্ডার বিরুদ্ধে। ফিতনা সৃষ্টিকারীদের কারণেই এ পৃথিবীর বুকে মুসলিম রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়লেও কোন একটি রাষ্ট্রেও মহান নবীজি (সা:)’র প্রতিষ্ঠিত ইসলাম বেঁচে নাই। ফলে বেঁচে নাই মহান আল্লাহ তায়ালার সর্বভৌমত্ব ও তাঁর শরীয়তী বিধান। বেঁচে নাই প্যান-ইসলামী মুসলিম ভ্রাতৃত্ব। বেঁচে নাই দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ। এসবই হলো ফিতনা সৃষ্টিকারীদের নাশকতা। তারা যেমন এক দিকে জান্নাতের পথে চলা অসম্ভব করে, তেমনি সহজতর করে জাহান্নামের পথচলা। বস্তুত ফিতনা সৃষ্টিকারীদের এটি হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা ও অপরাধ।

ফিতনার ভয়াবহ নাশকতাটি অন্য ভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। ঘর ভাঙ্গলে দাঁড়াবার জায়গা থাকে না, তখন অন্যের দোয়ারে সহায়-সম্বলহীন উদ্বাস্তু রূপে খাড়া হতে হয়। গৃহ হারালে তাই ইজ্জতও হারাতে হয়। তেমনি দেশের অখণ্ডতা না বাঁচলে দেশবাসীর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বাঁচে না। তখন পরাধীন, ইজ্জতহীন ও নিরাপত্তাহীন হতে হয়। সভ্য মানুষেরা তাই শুধু মজবুত গৃহ নির্মাণ করে না, শক্তিশালী রাষ্ট্রও নির্মাণ করে।  সে রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে যাওয়া থেকে বাঁচাতে সর্বসামর্থ্য দিয়ে যুদ্ধও করে। অন্যদের কাছে এটি দেশপ্রেম; কিন্তু ইসলামে এটি সর্বোচ্চ ইবাদত তথা জিহাদ -যা নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোটি কোটি মানুষের নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত, তাহাজ্জুদ ও দোয়া-দরুদে মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা ও ইজ্জত বাঁচে না। যেমন আজ বাঁচছে না ফিলিস্তিন, কাশ্মীর ও আরাকানের অসহায় মুসলিমদের জান ও মাল। এজন্যই নবীজী ও তাঁর সাহাবীদের জিহাদে নামতে হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালার এজেণ্ডাকে বিজয়ী করার জন্য জিহাদ এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে তিনি শুধু নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাত ফরজ করেননি, ফরজ করেছেন জিহাদকেও। বস্তুত জিহাদই মুমিনদেরকে মুনাফিকদের থেকে আলাদা করে। নামাজ-রোজা-হজ্জ বহু ঘুষখোর-সূদখোরও পালন করে। কিন্তু তারা কখনোই নিজের জান ও মালের কুরবানী দিতে জিহাদে হাজির হয়না। জিহাদ না হলে মুসলিম দেশের স্বাধীনতা ও অখণ্ড ভূগোল বাঁচেনা। যেদিন থেকে মুসলিমগণ জিহাদ থেকে দূরে সরেছে, সেদিন থেকেই মুসলিম ভূমি তার অখণ্ডতা ও স্বাধীনতা হারিয়েছে। দেশের ভূগোল ভাঙ্গা ও মুসলিম উম্মাহকে দুর্বল করার যে কোন প্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্রই হলো ফিতনা। এবং সে ফিতনার নাশকতা ভয়াবহ। সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা এজন্যই ফিতনাকে মানব হত্যার চেয়ে অধিক গুরুতর অপরাধ বলেছেন। 

গণহত্যা যেমন উমাইয়া শাসন আমলে ঘটেছে, তেমনি ঘটেছে আব্বাসীয় শাসনামলেও। তাদের নৃশংসতা থেকে ইমাম হোসেনও বাঁচেননি। লক্ষণীয় হলো, সেসব হত্যাকান্ডের সাথে ফিতনার মিশ্রণ ঘটেনি, ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে ইসলাম পালন বন্ধ হয়নি।  মুসলিম উম্মাহ তাতে বিভক্ত ও দুর্বল হয়নি। ফলে মুসলিম ভূমি তখন কাফির শক্তির দখলে যায়নি। অথচ ভয়ানক নাশকতা ঘটে যখন ফিতনা শুরু হয়। ফিতনা সৃষ্টিকারীরা শুধু গণহত্যাই সংঘটিত করে না, মুসলিম উম্মার মেরুদণ্ড ভাঙার কাজটিও করে -যেমনটি ১৯১৭ সালে হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে এবং ১৯৭১’য়ে হয়েছে পাকিস্তানে। ফিতনা সৃষ্টিকারীদের কারণে মুসলিম উম্মাহ বিভক্ত, পরাজিত এবং শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত হয়েছে। মুসলিম বিশ্বে ফিতনা সৃষ্টিকারী দুর্বৃত্তরা হলো জাতীয়তাবাদী, গোত্রবাদী, বর্ণবাদী ও রাজতন্ত্রবাদী অপশক্তি। এরা প্রচন্ড রকমের ক্ষমতালোভী। এরা মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ দেখে না, দেখে শুধু নিজেদের স্বার্থ। ফিতনা সৃষ্টিকারী এ দুর্বৃত্তগণ শুধু উসমানিয়া খেলাফাকেই বিলুপ্ত করেনি, আরব ভূমিকেও টুকরা টুকরা করেছে। এরাই পাকিস্তানকে দুই টুকরা করছে।

 

বাঙালি মুসলিমদের রাজনীতিতে ফিতনা

বাঙালি মুসলিমদের রাজনীতিতে ফিতনা সৃষ্টিকারীদের সংখ্যাটি বিশাল। মুখে এরা নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দিলেও পূর্ণ ইসলাম পালন নিয়ে ভাবে না। মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়েও তারা ভাবে না। তারা ভাবে গোত্র,বর্ণ, ভাষা ও ক্ষুদ্র অঞ্চল ভিত্তিক ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এরাই হলো জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী, আঞ্চলিকতাবাদী, সেক্যুলারিস্ট ও ফ্যাসিস্ট। শেখ মুজিব আবির্ভুত হয়েছে ফিতনা সৃষ্টিকারী দুর্বৃত্ত বাহিনীর নেতা রূপে। শেখ মুজিব ও তার কন্যা শেখ হাসিনা শুধু বার আর গণহত্যাই করেনি বরং অসম্ভব করেছিল পূর্ণ ইসলাম পালনকে। ইসলাম পালনের অর্থ শুধু নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ পাঠ নয়, বরং মহান আল্লাহতায়ালার রাজনৈতিক, সামরিক, বৈচারিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক এজেণ্ডার সাথে একাত্ম হয়ে বাঁচা -যেমন বেঁচেছিলেন নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ। সেরূপ বাঁচতে হলে নবীজী (সা:)’র ন্যায় প্রতিষ্ঠিত দিতে হয় ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়তী আইনের বিচার, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ। অথচ হাসিনা এমন ইসলামকে জঙ্গিবাদ বলতো। মুজিব-হাসিনার যুদ্ধ ছিল এ সনাতন ইসলামের বিরুদ্ধে। ঘরে ইসলাম বিষয়ক বই রাখা, ওয়াজের মাহফিল করা, পবিত্র কুর’আনের তাফসীর করা, মিডিয়ায় ইসলামের পক্ষে কথা বলা, শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দাবী তোলা, ইসলামের নামে সংঘটিত হওয়া  -এগুলি যেমন মুজিব নিষিদ্ধ করেছিল, তেমনি হাসিনাও নিষিদ্ধ করেছিল। নবীজী (সা:)’র যুগে সে অভিন্ন ফ্যাসিবাদী নীতি ছিল মক্কার কাফেরদেরও। জার্মানিতে হিটলারের নাযী পার্টি এবং রাশিয়ায় জোসেফ স্টালিনের কম্যুনিস্ট শাসন ছিল একই রূপ বিশুদ্ধ ফ্যাসিবাদী শাসন। তাদের যুদ্ধ ছিল বিরুদ্ধ মতবাদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে নির্মূলমুখী। জার্মানি ও রাশিয়াতে বহু লক্ষ মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয় । 

মহান আল্লাহ তায়ালার এজেণ্ডাকে বিজয়ী করতে হলে অনিবার্য প্রয়োজন দেখা দেয় ইসলামী রাষ্ট্রের। কারণ, তাঁর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠার কাজটি স্রেফ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়লে চলে না, তেমনি শুধু নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাতের আয়োজন বাড়ালে চলে না। মহান আল্লাহ তায়ালার এজেণ্ডাকে বিজয়ী করতে গৌরব যুগের মুসলিমদের তাই ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে হয়েছিল এবং সে রাষ্ট্রকে বিশ্বশক্তিতে পরিণত করতে হয়েছিল। ক্ষুদ্র এক খানি রাষ্ট্র গড়লেও সেটি সম্ভব হতো না। কারণ শয়তানী শক্তির রাষ্ট্রগুলি তখন কোয়ালিশন গড়তো এবং সে রাষ্ট্রকে সম্মিলিত ভাবে ধ্বংস করে দিত। পৃথিবীর বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে সেদিন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল বলেই শয়তানী শক্তি শত চেষ্টা করেও সে শক্তিকে পরাজিত ও বিলুপ্ত করতে পারেনি। ফলে সেদিন সম্ভব হয়েছিলে সে বিশাল রাষ্ট্রে মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। তখন পৃথিবীর সে বিশাল ভূ-ভাগ থেকে নির্মূল হয়েছিল দুর্বৃত্তি ও মিথ্যাচার এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সত্য ও সুবিচার। সমগ্র মানব ইতিহাসে সেটিই ছিল মহান আল্লাহতায়ালা এজেণ্ডার সবচেয়ে বড় বিজয়। 

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিমগণ সে বিজয় ধরে রাখতে পারিনি; শুরু হয় পরাজয়। সে পরাজয়ের কারণ, মুসলিম নামধারি সেক্যুলারিস্টদের সৃষ্ট ফিতনা। ফিতনার এ নায়কদের লক্ষ্য হলো মুসলিম উম্মাহর একতার বদলে বিভক্তি। বস্তুত তাদের কারণেই মুসলিম বিশ্ব টুকরো টুকরো হয়েছে ও শক্তিহীন হয়েছে। তারা নানা রূপ প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জনগণকে তারা ইসলাম থেকে দূরে সরায় এবং জাতীয়তাবাদী, গোত্রবাদী, বর্ণবাদী ও আঞ্চলিকতাবাদী রূপে তাদেরকে গড়ে তোলে এবং যুদ্ধে খাড়া করে মহান আল্লাহতায়ালার এজেণ্ডার বিরুদ্ধে। তাদের লক্ষ্য হয়, নানা ভাষা ও নানা অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে গড়ে উঠা বিশাল উসমানিয়া খেলাফতকে টুকরো টুকরো করা। তারা শুধু খেলাফতকেই ভাঙ্গেনি; আরব ভূমিকেও ২২ টুকরোয় বিভক্ত করেছে। তারা খণ্ডিত করেছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকেও। ইসলামের এ শত্রুদের আনন্দ স্রেফ মুসলিম ভূমি ভাঙ্গাতে, গড়াতে নয়। এভাবেই তারা বিজয়ী করেছে শয়তানের এজেণ্ডাকে। 

 

এক পাপ কখনোই আরেক পাপকে জায়েজ করেনা    

মুসলিমের যুদ্ধ হতে হয় জালেম শাসকের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়। রাষ্ট্র নিরপেক্ষ ও নির্দোষ; নিরাপত্তা ও গৌরব নিয়ে বেড়ে উঠার রাষ্ট্রের বিকল্প নাই। দেশের ভূগোল যত বাড়ে, ততই বৃদ্ধি পায় স্বাধীন ভাবে ইজ্জত নিয়ৈ বেড়ে উঠার সুযোগ। বিশ্বশক্তি রূপে বেড়ে উঠতে হলে তাই বাড়াতে হয় দেশের ভূগোল। সেটিই হলো নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের সূন্নত। নবীজী (সা:) তাঁর ১০ বছরে যে রাষ্ট্র গড়েছিলেন তা থেকে জন্ম নিয়েছে ৬টি রাষ্ট্র।  ইসলাম জালেম শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ফরজ করেছে, কিন্তু হারাম করেছে দেশ ভাঙ্গার যুদ্ধকে। প্রতিটি হত্যাকান্ড ও গণহত্যাই হারাম, কিন্তু সে হারামকে বাহানা বানিয়ে দেশভাঙ্গার হারাম পথটি বেছে নেয়া আরেক জঘন্য হারাম। অথচ সে ভয়ঙ্কর হারাম পথটিই বেছে নিয়েছিল বাঙালি সেক্যুলারিস্ট ফ্যাসিস্টগণ। তারা পাকিস্তান ভাঙ্গতে ভারতের ন্যায় একটি আগ্রাসী শত্রু শক্তির সাথে কোয়ালিশন গড়েছিল। তারা এক পাপকে বাহানা বানিয়ে আরেক ভয়ংকর পাপের পথ বেছে নিয়েছিল। তারা ভারতের ন্যায় এক রাক্ষুসী শত্রুকে চিনতেও ভূল করেছে। তারা এতোটাই অন্ধ ছিল যে, ভারতের ইতিহাস থেকেও শিক্ষা নেয়নি। ভারত কখনোই অন্য কোন জনগোষ্ঠিকে স্বাধীনতা এনে দেয়নি, বরং অন্য দেশের স্বাধীনতা গ্রাস করাই দেশটির নীতি। ভারত সেটি প্রমাণও করেছে হায়দারাবাদ, কাশ্মীর, মানভাদাড়, গোয়া ও সিকিম গ্রাস করে। বাংলাদেশকেও পরিণত করেছিল একটি আশ্রিত করদ রাজ্যে।

 

বিভক্তি পরাজয় আনে

সুনামী, মহামারী, ভূমিকম্প ও সাইক্লোনে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রান নাশ ঘটে। সে প্রাননাশে কোন জাতি ধ্বংস হয়না। কিন্তু ধ্বংস নেমে আসে যদি সে জাতির ভূগোল টুকরো টুকরো হয়। তাই গণহত্যার ফলে মুসলিম উম্মাহর যে ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী ক্ষতি হয় মুসলিম উম্মাহর ভূমি খণ্ডিত হওয়াতে। এতে মুসলিম উম্মাহ স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা হারিয়েছে। এমন বিভক্তি শত শত বছরের জন্য মুসলিম জীবনে পরাধীনতা আনে। তাই মুসলিম  উম্মাহর ভূগোলকে ক্ষুদ্রতর করাটি কখনোই কোন মুসলিমের এজেণ্ডা হতে পারেনা, সেটি শয়তানী শক্তির এজেণ্ডা। সে এজেণ্ডা পূরণে শুরু থেকেই মুসলিম ভূগোলের উপর কাফির শক্তির বার বার হামলা হয়েছে। সে হামলা থেকে মুসলিম উম্মাহর ভূগোল বাঁচাতে মুসলিমগণ জিহাদ করেছে।  প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি মানুষ নিহত হয়; কিন্তু তাতে গ্রেট ব্রিটেন, জার্মানী, ফ্রান্স, ইতালীর মত ইউরোপীয় দেশগুলি ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায়নি, দুর্বলও হয়নি। কিন্তু উসমানিয়া খেলাফত হারিয়ে গেছে। কারণ, খণ্ডিত হয়েছিল দেশটির বিশাল মানচিত্র। একই কারণে অখণ্ড পাকিস্তান খণ্ডিত হওয়াতে দুর্বল হয়েছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয়ই। এতে বিজয় ও শক্তি বেড়েছে ভারতের ন্যায় একটি শত্রু রাষ্ট্রের।  

১৯৭১’য়ে পাকিস্তানকে খণ্ডিত করার শয়তানী এজেণ্ডা নিয়ে ভারত ও তার মিত্রদের ময়দানে দেখা গেছে। পাকিস্তানের মূল অপরাধটি গণহত্যা ছিল না। গণহত্যা তো বহুগুণ বেশী হয়েছে এবং এখনো হয় ভারতে। ভারতীয় সৈন্যদের দ্বারা লক্ষাধিক মুসলিমকে হত্যা করা হয় নিজাম শাসিত হায়দারাবাদে -সেটি ১৯৪৮ সালে সে স্বাধীন দেশকে ভারতভূক্ত করার আগ্রাসনে। এক লাখের বেশী মুসলিমদের হত্যা করা হয়েছে কাশ্মীরে। বার বার গণহত্যা হয়েছে ভারতের গুজরাত, মহারাষ্ট্র, আসাম, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশসহ নানা প্রদেশে। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে পাকিস্তানকে অপরাধী রাষ্ট্র বানানো হয়েছে  শুধু এ কারণে যে, দেশটি ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। সেটিই হলো দেশটির বড় অপরাধ। অখণ্ড পাকিস্তান বেঁচে থাকলে দেশটি হতে পারতো পারমানবিক অস্ত্রধারী বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। তাতে বিশ্ব রাজনীতিতে মুসলিম উম্মাহর প্রভাব বাড়তো। সে সম্ভাবনাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করাই ছিল শয়তান ও তার অনুসারীদের মূল এজেণ্ডা। সে এজেণ্ডাকে বিজয়ী করার লক্ষ্যেই শয়তানের পৌত্তলিক খলিফা ভারত তার বাঙালি এজেন্টদের সাথে কোয়ালিশন গড়ে রণাঙ্গণে হাজির হয়। ইসলামপন্থী সকল দল ও ব্যক্তি সেদিন ভারতের সে ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরেছিল এবং সেটি রুখতে ময়দানে নেমেছিল। নিজেদের সীমিত সামর্থ্য নিয়ে তারা সেদিন তাদের নিজ দেশ অখণ্ড পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় নেমেছিল।

কিন্তু ১৯৭১’য়ে বাঙালি সেক্যুলারিস্টগণ ভারতের কোলে গিয়ে উঠেছে এবং ভারতের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তান ভাঙ্গতে যুদ্ধে নেমেছে। কোন ঈমানদার কি এমনটি করতে পারে? মহান আল্লাহ তায়ালা মুসলিম দেশের ভূ-গোল বাঁচানোকে ফরজ করেছেন এবং ভাঙ্গার কাজকে হারাম করেছেন। বস্তুত বাঙালি সেক্যুলারিস্ট ফ্যাসিস্টগণ ইচ্ছে করেই ইতিহাস থেকে কোন শিক্ষা নেয়নি। কারণ, মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণকর কিছু করা তাদের নিয়তেই ছিল না। তারা বরং পরিচালিত হয়েছে জাতীয়তাবাদ ও ফ্যাসিবাদের ন্যায় হারাম মতবাদ নিয়ে। এ মতবাদগুলির লক্ষ্য কখনোই মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ ছিল না, বরং ছিল ক্ষতিসাধন। সেক্যুলারিস্ট ফ্যাসিস্টদের বিজয়ে মুসলিম উম্মাহর সে ক্ষতিটাই ভয়ানক ভাবে হয়েছে। উমাইয়া ও আব্বাসিয়া খেলাফতের আমলেও বহু গণহত্যার কান্ড ঘটেছে। কিন্তু সে হত্যা ও গণহত্যাকে বাহানা বানিয়ে সে সময় মুসলিম ভূমিকে খণ্ডিত করা হয়নি। কারণ মুসলিম উম্মাহর রাজনীতিতে তখনও সেক্যুলারিস্ট ফ্যাসিস্টগণ বিজয় পায়নি।  ফলে অটুট থেকেছে মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা ও  নিরাপত্তা। 

 

সবচেয়ে বড় নাশকতা ও আত্মঘাত

বিশেষ একটি ভাষা, বর্ণ বা ধর্মের মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করাই হলো গণহত্যা। বাঙালি পরিচয়ের কারণে হত্যা করা হলে সেটি যেমন গণহত্যা; তেমনি বিহারী পরিচয়ের কারণে কাউকে বিনা বিচার হত্যা করা হলে সেটিও নিরেট গণহত্যা। হাসিনার আমলে শাপলা চত্বরের যে হত্যাকান্ড চালনা হলো -সেটিও ছিল নির্ভেজাল গণহত্য। প্রতিটি হত্যাকাণ্ড বা গণহত্যাই অতি মর্মান্তিক ও নিন্দনীয়। একাত্তরে গণহত্যার শিকার শুধু বাঙালি হয়নি, অবাঙালিরাও হয়েছে। বরং বেশী নিহত, বেশী ধর্ষিতা ও বেশী লুটপাটের শিকার হয়েছে বিহারী মুসলিমরা। কারণ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরাজয়ের পর তাদের প্রতিরক্ষা দেয়ার কেউ ছিল না। তাই একাত্তরের গণহত্যাকারী শুধু পাকবাহিনী নয়, অপরাধী বাঙালিরাও। বিশেষ করে সেক্যুলারিস্ট ফ্যাসিস্ট বাঙালি। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের বইয়ে বাঙালি চরিত্রের সে কদর্যতার কোন বিবরণ নাই।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একাত্তরে যে গণহত্যা হয়েছে -তা নিয়ে বিতর্ক নাই। বরং অতিশয় নিন্দার বিষয় হলো, সে গণহত্যাকে কারণ দেখিয়ে যেভাবে পাকিস্তান ভাঙ্গা হলো -তা নিয়ে। এখানেই সেক্যুলারিস্টদের সাথে ইসলামপন্থীদের মূল বিরোধ। সেক্যুলারিস্টগণ একাত্তরের গণহত্যার ন্যায় একটি হারাম কর্মকে কারণ দেখিয়ে দেশভাঙ্গার ন্যায় ভয়ানক একটি হারাম কাজকে জায়েজ করে নিয়েছে। অতীতে মুসলিমগণ দেশ ভাঙ্গার এই হারাম নীতি গ্রহন করলে হাজার বছর আগেই মুসলিম ভূমি আজকের নয় ৫০টির বেশী টুকরায় বিভক্ত হতো। আজকের ন্যায় সেদিনও তাদেরকে পরাজয়, গোলামী ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে বাঁচতে হতো। কারণ, নির্বিচারে গণহত্যার কাজটি সে আমলে কম হয়নি। কিন্তু সেদিনের একতা তাদেরকে বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়েছিল। কিন্ত সে বিপর্যয়কে অনিবার্য করেছে আজকের বিভক্তি। আর সে বিভক্তিকে অনিবার্য করেছে সেক্যুলারিস্ট ফ্যাসিস্টরা। মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে এটিই হলো তাদের সবচেয়ে বড় নাশকতা।

একাত্তরে পাক বাহিনীর গণহত্যা যা নাশকতা ঘটিয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ অধিক নাশকতা ঘটেছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান খণ্ডিত হওয়াতে। অখণ্ড পাকিস্তান বেঁচে থাকলে দেশটি হতো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পারমানবিক শক্তি। অথচ দেশটি ১৯৭১’য়ে ভেঙ্গে যাওয়াতে দেশটির সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠি রূপে বাঙালি মুসলিমগণ হারিয়েছে বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ। বরং অর্জন করেছে ভারতের গোলামী। বাঙালি মুসলিম জীবনে এরচেয়ে বড় নাশকতা এবং বড় আত্মঘাত আর কি হতে পারে?  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *